Friday, 14 December 2018

ভক্তিযোগ ও শ্রীকৃষ্ণ-গীতা




ভক্তিযোগ  ও   শ্রীকৃষ্ণ-গীতা 


শুধুমাত্র অনন্যা ভক্তি থাকলেই আমাকে জানা যায়, বোঝা যায়। আমার জন্য যে ব্যক্তি কর্ম  করেন, যিনি আমার শরণাপন্ন ও আসক্তিশুন্য,সর্বভূতে শত্রূ শুন্য, ইনিই আমাকে প্রাপ্ত হন।  ১১/৫৫.........

মৎ কর্ম কৃৎ মৎ পরমঃ মৎ ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ। 
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মাম এতি পাণ্ডব। ।  


ভগবান কথা : ১৪/০৬/২০১৭ (ভক্তিযোগ)

পরম শ্রদ্ধা সহকারে যাদের মন আমাতে নিবিষ্ট করে আমাকে উপাসনা করেন, তারাই শ্রেষ্ট যোগী।

যাঁরা  সর্বদা সমবুদ্ধি যুক্ত, সর্ব ভূতে হিতে রত, সর্বত্র গমনকারী, অব্যক্ত, কূটস্থ, অচল, অচিন্তনীয়, ধ্রূব, ক্ষয়োদয় রোহিত, ব্রহ্মের উপাসনা করে তারাও আমাকে প্রাপ্ত হয়। অব্যক্ত বা নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসকদের মুক্তিলাভ কষ্টকর  হয়। কারণ, দেহধারীর নির্গুণ ব্রহ্মলাভ খুবই কষ্টসাধ্য। 
কিনতু যাঁরা আমাপরায়ণ হয়ে, সর্ব কর্ম আমাতেই  সমর্পন করে, স্থির চিত্তে, আমাকেই চিন্তা করতে করতে আমার উপাসনা করে, সেই সকল সাধককে আমি মৃত্যুপূর্ণ সংসার সমুদ্র হতে অচিরেই রক্ষা করি। আমাতেই মন নিবিষ্ট কর।  আমাতেই বুদ্ধিযুক্ত হও, তাহলে দেহান্তে আমাকেই প্রাপ্ত হবে। স্থির ভাবে আমাতে চিত্ত স্থির করতে যদি সমর্থ না হও, তা হলে অভ্যাসের সাহায্যে আমাকে পেতে চেষ্টা করো। যদি অভ্যাসেও সামর্থ না হও, তাহলে আমার কাজে চিত্ত স্থির করো। আমার প্রীতির জন্য কর্ম করলেও তুমি সিদ্ধি লাভ করবে। তাও যদি সম্ভব না হয়, তবে আমার শরণাপন্ন হয়ে, সংযত চিত্ত হয়ে, সমস্ত কর্মফল ত্যাগ করো। অভ্যাস থেকে জ্ঞান শ্রেষ্ট - জ্ঞান হতে ধ্যান শ্রেষ্ট - কর্মফল ত্যাগ ধ্যান হতেও শ্রেষ্ট।  ত্যাগেই পরম শান্তি। 
যে ব্যক্তি সর্বভূতে হিংসা শূন্য, মৈত্রী ভাব সম্পন্ন, সবাকার প্রতি করুণা, মমতা শূন্য, অহংকার শূন্য, সুখ-দুঃখ সমান জ্ঞান করেন, ক্ষমাশীল, সর্বদা তুষ্ট,দৃঢ় বিশ্বাসী, মন বুদ্ধি যার আমাতে অর্পিত - সেই যোগী আমার ভক্ত ও প্রিয়। 
যার দ্বারা উদ্বেগ প্রাপ্ত হয় না, নিজেও কারো ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন না, অপরের আনন্দ লাভে যিনি অসহিষ্ণু নহেন, ভয় ও উদ্বেগ শূন্য - সে-ই  আমার প্রিয়। ১২/১৬.....

যে  ব্যক্তির আনন্দের প্রকাশ নেই, চিত্ত ক্লেশ শূন্য, কামনা হীন, শুভ অশুভ ফল ত্যাগী সে ভক্তই আমার প্রিয়। যিনি শত্রূ-মিত্র, মান-অপমানে, শীত-গ্রীষ্মে, সুখে-দুঃখে অবিচলিত, সর্ব বিষয়ে আসক্তিহীন, নিন্দা প্রসংশায় সম জ্ঞানকারী, স্থির চিত্ত, নির্দিষ্ট বাসস্থান শুন্য, সেই ভক্তই আমার প্রিয়। যারা ভক্তি পূর্বক মৎপরায়ণ হয়ে, এই ধর্ম-অমৃত পান করেন, তারাই আমার অত্যন্ত প্রিয়। 

১২/২০.........

আমি এই ভক্তি যোগটা একটু ভালো করে বোঝার চেষ্টা করবো :

এই ভক্তিযোগ অর্থাৎ দ্বাদশ অধ্যায়ে মাত্র কুড়িটা শ্লোক আছে। 

এখানে প্রথমেই অর্জুন প্রশ্ন করছে :

এবং সততযুক্তা যে ভক্তাঃ ত্বাং পর্যা-উপাসতে
যে চ অপি অক্ষরম-অব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমা।

অর্থাৎ  যে ভক্ত তোমাতে সততযুক্ত হয়ে তোমার (রূপের) উপাসনা করে আর যারা তোমার অব্যক্ত অক্ষর রূপের সাধনা করে, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ট যোগবিদ কে ?


ভগবান তার উত্তরে বলছেন :

ময়ি-আবেশ্যমান যে মাং নীতিযুক্ত উপাসতে 
শ্রদ্ধয়া পরয়া-উপেতা-অস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।

যারা আমাতে মন নিবিষ্ট করে, আমাতে নীতিযুক্ত হয়ে আমার উপাসনা করে, আমার মতে  তারাই শ্রেষ্ট।


শুনলে মনে হয়, এতো  অহংকারের কথা। এ কথা হয় বুদ্ধু  বলতে পারেন নতুবা বুদ্ধ বলতে পারেন। ভগবান আগেই বলেছেন ঈশ্বর  অব্যক্ত। এই অব্যক্ত ঈশ্বরের কথা পুরাতন ব্রহ্মবিদগণ, বেদবিদগণ বলে গেছেন।  তো যারা অব্যক্ত পরম-ঈশ্বরের সাধনা করছে, তাদের থেকে তোমার এই মনুষ্যরূপী শ্রীকৃষ্ণের সাধনা করা, কি করে শ্রেষ্ট হয়। তাছাড়া এই শ্রীকৃষ্ণের জন্মের আগেও  ঈশ্বর ছিলেন, এবং তার উপাসক-ও  ছিলেন , তবে তারা সবাই নিকৃষ্ট সাধনা করে ছিল ? আর শ্রীকৃষ্ণের আমলেও তো শ্রীকৃষ্ণের পূজা হতো না। কেউ কেউ হয়তো তাকে ভগবানের অবতার বলে স্বীকার করতো। কিনতু তখনও  শ্রীকৃষ্ণকে  ঘিরে সাধন পদ্ধতির উদ্ভব হয় নি। তাহলে শ্রীকৃষ্ণ এসব কি বলছেন ?

এইখানেই গীতার সংযোজন। এর আগে বেদ-নির্দিষ্ট পথে সাধন হতো।  বেদে কর্মকাণ্ড অর্থাৎ জাগযজ্ঞ করবার পদ্ধতি ছিল।  আর ছিল জ্ঞান কাণ্ড, অর্থাৎ নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা। চিত্ত-নিরোধের পদ্ধতি যা পতঞ্জলি প্রবর্তন করেছেন -  আশ্রমীদের এই চিত্তনিরোধের পদ্ধতি বা অষ্টাঙ্গ যোগ করতে দেখা গেছে। 

শ্রীকৃষ্ণ এসে জ্ঞানযোগের সঙ্গে যোগ করলেন নিষ্কাম কর্মযোগ। 

অর্থাৎ বাসনাহীন বা আসক্তিহীন  কর্ম। আর একটা নতুন পদ্ধতি তা হলো ভক্তিযোগ। আশ্রমীদের মধ্যে গুরুভক্তি আগেও ছিল, কিনতু  ভগবানে ভক্তি কথাটার প্রচলন ছিল না, নির্ভরতা ছিল।  আর দেবতা বলতে ছিল প্রকৃতি।  বিশেষ করে আর্যদের মধ্যে নিরাকার সাধনাই প্রচলিত ছিল। শ্রীকৃষ্ণ এসে এই ভক্তিযোগ চালু করলেন। এবং এটা ভারতবর্ষের আবিষ্কার। শ্রীকৃষের আবিষ্কার। ব্যাসদেবের আবিষ্কার।  অন্য কোনো ধর্মে এই ভক্তিবাদ আজও আসেনি। এবং এই ভক্তিবাদের আকর্ষণেই লক্ষ লক্ষ্য বিদেশী হিন্দু-ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আশ্চার্য্য ব্যাপার হচ্ছে এই ভক্তি আমাদের অন্তরে জন্ম থেকেই আছে।  এটা জাগ্রত করার জন্য শুধু বলছেন শ্রীকৃষ্ণ। নতুন কিছু সংগ্রহ নয়।  

এখন সাধন পদ্ধতি দুই প্রকার - দ্বৈতবাদ আর অদ্বৈতবাদ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দ্বৈতবাদের আবিস্কারক। শ্রীকৃষ্ণ একদিকে বলছেন ঈশ্বর অব্যক্ত, আবার বলছেন : যারা আমাতে মন নিবিষ্ট করে,আমাতে নিত্যযুক্ত হয়ে ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে আমার উপাসনা করে, তারাই শ্রেষ্ট। এখন কেন  শ্রেষ্ট ? প্রশ্ন এখানেই। আর একটা প্রশ্ন শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে ভগবান বলছেন, এটা কি তার অহমিকা নয় ? নিজেকে জাহির করা নয় ?  তিনি যদি ভগবান হন তবে তার কর্মেই আমরা তার ভগবানত্ব বুঝবো বা দর্শন করবো। নিজেকে কেন বলতে হবে আমি ভগবান, আমার পূজা করো। এর থেকে আমরা কি শিখবো ? আমরা কি নিজের ঢাক নিজে পেটাতে শিখবো না ? 

এই প্রসঙ্গে আমি দুটো উদাহরণ দেই।  এক : স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ, ভারত সেবাশ্রম এর প্রতিষ্ঠাতা। ইনি একটা সময়ে, তার শিষ্যদের কাছ থেকে আক্ষরিক অর্থে পূজা গ্রহণ করতেন। স্বামীজী আসনে বসতেন, ভক্তরা তাকে মালা পড়াতেন, ভোগ দিতেন, ফুল, বেলপাতা , ধুপ, প্রদীপ দিয়ে তার পূজা করতেন, আরতি  করতেন। প্রণবানন্দজি নিজেকে শিব ভাবতেন। আর শিষ্যদের বলতেন পূজা করতে।  এখন, তার সমবয়সী যে সব সন্যাসী, যারা তার মানবসেবা কর্মের সহযোগী ছিলেন, তাদের কাছে এটা অশোভন লাগতে লাগলো। তারা একদিন, একথা স্বামী প্রনাবনান্দকে বললেন। প্রণবানন্দ তাদের বলে ছিলেন : দেখো, মা বাবাকে যদি পূজা করা যায়, তবে আমার পূজায় দোষ  কোথায় ? আমি যেটা বলতে চাইছি - মহাপুরুষরা নিজের পূজার প্রচলন নিজেরাই করেছেন। পূজা পাবার জন্য অনেক দেবতা, নানান ভাবে ভক্তদের বিড়ম্বনায় ফেলতো, এমন গল্পতো বহু আছে। 

আর ঠাকুর রামকৃষ্ণ নিজেকে অবতার বলে প্রচারের ভাগিদার ছিলেন। ভৈরবী যজ্ঞেশ্বরী  যখন তাকে অবতার বলে প্রচার করতে চেয়েছিলো, এবং পান্ডিত্সভা ডাকবার জন্য বলছিলেন।  তখন ঠাকুর  রামকৃষ্ণই মাথুরবাবুকে এই পান্ডিত্সভা ডাকবার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা। তাহলে এও তো এক প্রকার নিজেকে ভগবানের অবতার বলে প্রচার করা , এবং সেটা  নিজে থেকেই করা। আসলে ভগবানকে আমরা তো চিনি না। তাই ভগবানরাও নিজেকে ভগবান বলে প্রচার করে।  আবার ভন্ডরাও নিজেকে ভগবান বলে প্রচার করে। কালের গতিতে ভগবান বেঁচে থাকে, ভন্ডরা হারিয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণের আমলেও দ্বিতীয় বাসুদেব ছিল পৌন্ড্র।  ইনি আসামের দিকে কোনো রাজ্যের রাজা ছিলেন, তার কাকার পুত্রের নাম ছিল বলরাম।  তার সুদর্শন চক্র ছিল।  নিজেকে বাসুদেব বলে প্রচার করতেন। অতএব  শ্রীকৃষ্ণ একা নিজেকে ভগবান বললেন, বা নিজের প্রচার নিজেই করেছেন এমন নয়। এইরকম প্রচার আকছার এখনো হচ্ছে।  আগেও হয়েছে। যাই হোক এখন আমরা অদ্বৈত বাদ সম্পর্কে আলোচনা করবো।  

যারা অদ্বৈতবাদের সাধনা করেন, তারা নিজেরা জানেন এটি একটি সময়সাপেক্ষ, এমনকি জন্ম জন্মান্তর লেগে যেতে পারে, এই উপলব্ধিবোধের চূড়ান্তে পৌঁছাতে। এছাড়া ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ আর তথাকথিত পাগলের মধ্যে প্রায়শই কোনো পার্থক্য থাকে না। একজন চৈতন্যবান পুরুষ আর একজন চৈতন্যহীন। যার জন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণের মতো ব্রহ্মজ্ঞানীকে তখনকার অনেক পণ্ডিত পাগল বলতো।  যার যেমন জ্ঞানের বহর আর কি ? তবুতো রামকৃষ্ণ দ্বৈত - অদ্বৈত দুরকম সাধনা করেছিলেন। 
অষ্টাবক্র তার সংহিতায় ব্রহ্মজ্ঞানী সম্পর্কে এক জায়গায় বলছেন :

নির্বাসন নিরালম্বঃ স্বচ্ছন্দো মুক্তবন্ধনঃ। 
ক্ষিপ্তঃ সংস্কারবাতেন চেষ্টতে শুস্কপর্নবৎ।

অর্থাৎ বাসনারাহীত, কর্তব্যবুদ্ধিবিহীন, রাগদ্বেষের অনধীন বন্ধনহেতু অজ্ঞানশূন্য জ্ঞানী প্রারবদ্ধকর্মরুপ বায়ুদ্বারা প্রেরিত হয়ে পবন-সঞ্চালিত শুস্কপত্রের ন্যায় কর্ম প্রচেষ্টা করে থাকেন। 

তাহলে ভাবুন তো এই ব্রহ্মজ্ঞানী কেমন আছেন। ব্রহ্মবিদ তো জড়বৎ। না আছে দুঃখ না আছে আনন্দ।  না আছে কর্তব্যকর্ম। না আছে দ্বেষ, না আছে রাগ, না আছে মমতা, না আছে স্নেহ।  উনি কাঁদেন না, হাসেন না।  অথবা ওনার হাঁসা-কাঁদার সাধারণ মানুষ কি বোঝে ? ওনার থাকা না থাকা সমান। উনি স্ব -স্বরূপে স্থিত। 

তাহলে ব্রহ্মজ্ঞানী হতে সময় লাগে, আর তার পরে যা হয় তা আর  কোনো কম্মে লাগে না। তাহলে অদ্বৈতপথে এই ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে কি লাভ ? যার দেহ জ্ঞান থাকে না। 

আর ভক্তিযোগের সাধনার ফল আলোচনার আগে আমরা সাকার সাধনা আর নিরাকার সাধনার পার্থক্যটা একবার আমরা বুঝে নেই। 

ঈশ্বর নিরাকার, নির্গুণ, অব্যক্ত, অব্যয়, সর্বত্র। কয়েকজন লোক নির্বাক হয়ে আকাশ দেখছে। কেউ আকাশে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কেউ আকাশের নীল বর্ণ দেখছে।  কেউ আকাশের ক্ষনে ক্ষনে পরিবর্তিত মেঘ দেখছে। কেউ সে মেঘের মধ্যে শিবের মূর্তি দেখছে, কেউ শিব লিঙ্গ দেখছে,  কেউ ইস্ট মূর্তি দেখছে, কেউ হাতি  দেখছে। আবার কেউ  কিছুই দেখছে না, শুধুই মেঘ দেখছে, আর  সে বিরক্ত হচ্ছে। যে মেঘ দেখছে, সে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছে। যে ইষ্টমূর্তি দেখছে সে আনন্দে আত্মহারা হচ্ছে। আপনি কি বিরক্ত হতে চান ? ধৈর্য্য হারাতে চান ? নাকি আনন্দ পেতে চান ? আনন্দ আকারেই দিতে পারে।  নিরাকারে আনন্দ সুদুর্লভ। 

ঈশ্বরকে কি দেখা যায় ? কিভাবে দেখা যায় ? ঈশ্বর কি আকার নেয় ?

ঈশ্বরকে অবশ্যিই দেখা যায়। কিভাবে ঈশ্বরকে দেখা যায় না,  সেটা আগে ভাবুন।  তবেই ঈশ্বরকে দেখতে পারবেন। ঈশ্বরকে না দেখার কোনো উপায় নেই। বরং ঈশ্বরকে দেখতে না পারাটাই আশ্চর্য্য। ঈশ্বর অবশ্যই  আকার নেন।  আপনি যেমন তাকে দেখতে চান, তেমন ভাবেই তিনি আপনাকে দেখা দেবেন। আপনি দেখছেন কিনতু সনাক্ত করতে পারছেন না।  তাই ভাবছেন আমি দেখতে পারছি না। আসলে ঈশ্বর আপনি, আপনার ভিতর, বাহির, সর্বত্র যা কিছু দেখছেন সবই ঈশ্বর। তবে আমি দেখছি না, এটা কত বড়ো ভুল, বুঝতে পারছেন ? ঈশ্বর-সমুদ্রের মধ্যে বুদ্-বুদ্ আমি।  এখানেই জন্ম, এখানেই লয়। মানুষের শরীরের  মধ্যে যেমন অসংখ্য কোষ, আমিও তেমনি ঈশ্বরের বিরাট শরীরের কোষ মাত্র।  শরীরেই জন্ম, শরীরেই মৃত্যু। যতদিন বাঁচি, ঈশ্বর থেকেই খাদ্য সংগ্রহ করি, বা ঈশ্বরই  খাদ্য যোগায়। এক সময় ঈশ্বরেই লয়  প্রাপ্ত হই। আমি বা অহং বলে কিছু নেই।  এগুলো  মন-বুদ্ধির খেলা। মন বুদ্ধির ওপারে আমি বলে কিছু থাকে না।

নিরাকারই সাকার হয়।  আবার সাকার থেকে নিরাকার। জলের তিন রকম অবস্থা। বায়বীয়, তরল, কঠিন।তাপমাত্রার তারতম্যে এই প্রকারভেদ।  বায়বীয় জল সর্বত্র। তরল জল নদী, নালা, পুকুরে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পৃথিবীর মধ্যেও পাওয়া যায়। কঠিন জল আমরা বরফের আকারে দেখতে পাই। বায়বীয় জল আমাদের ভোগ্য বস্তু নয়। কঠিন জলের আইচক্রীম খাই, তরল জলে তৃষ্ণা মেটাই। বায়বীয়  জলে আমাদের তৃষ্ণা মেটায় না।  বাহ্যিক কোনো কাজ বায়বীয় জলে আমাদের হয় না। অর্থাৎ নিরাকারে আমরা আনন্দ পাই না। কোনো কাজে লাগে না। তৃষ্ণা পেলে, হা করে থাকলে বায়বীয় জল, আপনার তৃষ্ণা মেটাবে ? তাহলে বায়বীয় জল সত্য কিনতু আনন্দ দেয় না। তাই ঈশ্বর সাধনায় যদি আনন্দ পেতে চান তবে সাকারের সাধনা করুন। 

নিরাকারের শক্তি সাকারের মধ্যেই প্রকাশ পায়। আকাশের একটা গুন্ - শব্দ, বাতাসের দুটো গুন্  - শব্দ, স্পর্শ। আগুনের তিনটি গুন্ শব্দ, স্পর্শ, রূপ। জলের চারটি  গুন্ -শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস।  মাটির পাঁচটা  গুন্ - শব্দ, স্পর্শ, রূপ,রস, গন্ধ।  তাহলে দেখতে পাচ্ছেন, নিরাকার থেকে সাকারের দিকে যত  যাচ্ছে তত তার গুন্ বেড়ে যাচ্ছে। এবং আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো এই গুন্ গুলো থেকেই জ্ঞান সংগ্রহ করছে। কান দিয়ে আমরা শব্দ  শুনছি। চোখ দিয়ে আমরা রূপ দেখছি। নাক দিয়ে আমরা গন্ধ শুঁকছি। মুখ দিয়ে আমরা রসের আস্বাদন করছি। ত্বক দিয়ে আমরা স্পর্শ করছি। এ সবই  আমাদের সুখ ও দুঃখের আস্বাদন করাচ্ছে। এ থেকেই আমরা সুখ দুঃখের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছি আমাদের অজ্ঞাতসারে। দৈহিক সুখ দুঃখের কারন এই ইন্দ্রিয়গুলো। তাই মহাপুরুষগন  বলছেন, ইন্দ্রিয়গুলোকে সংযমী করো, যদি সুখী  হতে চাও। যাক অন্য্ কথায়  চলে যাচ্ছি। আমাদের মূল আলোচনা ভক্তিবাদ, এবং সে প্রসঙ্গে সাকার, নিরাকার ঈশ্বর। 

আপনি আগুন চান। আগুন পেতে গেলে আপনাকে একটা মাধ্যম করতে হবে। আগুন সবত্র আছে। কিনতু  কাঠি/কাঠ  চাই। আর চাই বারুদ।  এই বারুদ দেন গুরুদেব।  মাধ্যম ছাড়া আগুনের প্রকাশ হয় না। তেমনি  ঈশ্বরের  প্রকাশ যদি দেখতে চান তবে মাধ্যমকে আশ্রয় করুন। আর নিজেকে তৈরি করুন। অপেক্ষা করুন আকুলতা নিয়ে।


আজও  নাকি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শোনা যায়, বৃন্দাবনে। আপনি কি বলবেন সত্যিই শোনা যায় ? আপনি বলবেন - পাগল ? আজও রাশলীলা দেখা যায়।  আপনি কি বলবেন - পাগল ? আপনার এক্সপোজারে যদি ব্যাটারি বা ইলেকট্রিসিটি থাকে, অর্থাৎ আপনার মধ্যে যদি ভক্তি থাকে, অনুরাগের সুইচ দিয়ে দিন।  ঠিক দেখতে পাবেন রাসলীলা , শুনতে পাবেন বাঁশি । আপনার আগে পিছনে সর্বত্র, গান ভেসে বেড়াচ্ছে। নাচের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। কিনতু আপনার যদি এক্সপোজার অর্থাৎ টিভি থাকে তাতে যদি ইলেকট্রিসিটি থাকে, সুইচটা অন করে দিন আপনি সব দেখতে পাবেন। এক্সপোজারের মধ্যে কিনতু  কিছু নেই। ওটা ভেঙে ফেললেও ভিতরে ছবি পাবেন না. গান পাবেন না। গান আছে সর্বত্র,ছবি আছে সর্বত্র। আপনার এন্টেনা ঠিক করুন, নিজেকে যোগ্য করুন, ব্যাকুল হন, নিরন্তর তৎগতপ্রাণ হন , তবেই তাকে দেখতে পারবেন তার বাঁশি  শুনতে পাবেন। 

আপনি  ফল খেতে চান ?  ফলের স্বাদ আপনি কান্ডে  পাবেন না। বীজ তো বিস্বাদ। ভক্তিবাদীরা ফল খায়। নিরাকারবাদীরা মাটির মধ্যে উৎস খোঁজে,মাটির মধ্যে  স্বাদ খোঁজে। আপনি কোনটা  চান ?

একটা ঘটনা বলি।  শিরডির সাঁইবাবা - নাম শুনেছেন নিশ্চই।  তো  তাকে এক ভদ্রলোক দুপুরে খাবার জন্য নিমন্ত্রণ করেছেন।  খাবারের সমস্ত  আয়োজন সম্পূর্ণ।  ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন। এই বুঝি বাবা আসে। বাবা আর আসছেন না।   দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। বাবা আর আসেন না। সন্ধ্যে হয়ে গেল।  বাবা আর আসেন না। একটা কুকুর ঘুর ঘুর করছে। ভদ্রলোক  খাবার রেখে উঠতে পারছেন না। কুকুরটাকে যতই তাড়ানো হচ্ছে,  কুকুরটা একটু দূরে গিয়ে অপেক্ষা করছে।    ভদ্রলোক, লোক পাঠালেন, বাবার কাছে। বাবা বললেন - আমিতো গেছিলাম রে। কিন্তু তোর  মনিব তো লাঠি দিয়ে তারা করলো। লোকটি বললো - সে কি বাবা কখন গেছিলেন ? আমার বাবু তো সারাক্ষন আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন।  বাবা বললেন - তোর  বাবুতো  লাঠি নিয়ে বসে আছে।  আমি যাই কি করে ? খাই-ই  বা কি করে ? 


ভগবানকে না চিনলে এই হয় দশা। ভগবান এসে বসে থাকে।  আর আমি লাঠি নিয়ে বসে থাকি। ভগবান আসতে  চায়, আমরা তাকে তাড়াতে চাই।


অতএব  শ্রীকৃষ্ণ বলছেন : আমার মতে  তারাই শ্রেষ্ট যারা ভক্তি সহকারে আমার উপাসনা করে। ভক্তিবাদেই আনন্দ, জ্ঞানী নিরস।



দুধের মধ্যে মাখন আছে, দই আছে। আপনি যদি ফেলে রাখেন , দুধ দই হয়ে যাবে। আর যদি ঝাঁকান তবে মাখন পেতে পারেন। তখন জলে ভাসতে পারবেন। না হলে জলে মিশে যাবেন। নিজেকে ঝাঁকান-ঝাঁকান, আরো জোরে, আরো জোরে নিজেকে ঝাঁকান, তবে আপনি নিজেকে মাখন করতে পারবেন।  নতুবা একদিন জলে মিশে যাবেন। তাই ভগবান বলছেন ভক্তিবাদ-ই শ্রেষ্ট।
এবার একটু অন্য্ কথা বলি। ধ্যানে সাধকেরা তার ইষ্ট  বা গুরুদেবের প্রতিচ্ছবি কল্পনা করে ধ্যান করেন। তখন গুরুদেবকে বা তার ইষ্টকে জ্যান্ত বলে  মনে হয়। তখন সেই ইষ্টদেবতার সঙ্গে বা গুরুদেবের সঙ্গে কথা বলা যায়। এবং কথা বলেন সাধক।  সেই প্রতিচ্ছবিও কথা বলে। আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন আমাদের আজ্ঞা চক্র বা তৃতীয় নয়ন বলে একটা কথা আছে। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ কেন্ত্র। বিশ্বাস করতে হবে না, এই বার্তা প্রেরণ কেন্দ্রে নিজের মনকে স্থির করে  আপনি যদি কাউকে আদেশ বা নির্দেশ দেন, তবে সে তা পালন করতে বাধ্য হবে। এটা আপনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এটি একটি অসাধারন গতিশীল শক্তি। কোনো ব্যক্তির ছবি, বা প্রতিমাকে মনের মধ্যে রেখে, তার ক্ষুদ্র প্রতিমাকে ধ্যানে নিয়ে আজ্ঞা চক্র থেকে যদি ভিজা মাটির মূর্তির উপরে, বা ছবির  উপরে নিবিষ্ট করা যায় তবে সেই মাটির মূর্তি আর সাধারণ থাকে না। সেটা আপনার আজ্ঞা দ্বারা সঞ্চারিত চলমান শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। তখন আপনি যা স্নরন করবেন, সেটা গতিশীল হয়ে যাবে। মূর্তিপূজা এই প্রক্রিয়ার গভীর প্রয়োগ ।  আমি মনে করি, ঈশ্বর তো বিরাট। আর এই সর্বত্র বিরাজমান  বিরাটের কাছে  পৌঁছেতে আমরা মূর্তির মাধ্যমে যেতে পারি। একটা কথা আছে, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাই আছে এই ভান্ডে অর্থাৎ মানব শরীরে।  এবং শুধু তাই আছে না, সেই  প্রপোরশনে অর্থাৎ সেই  ভাগে আছে। অর্থাৎ জল ৭৫%, আকাশ ____, বায়ু _____ অগ্নি _____ মৃত্তিকা  _____ । আপনার মস্তিস্ক আর পরমাত্মার মস্তিষ্কের সঙ্গে একটা সম্পর্ক আছে। এই দুই সন্মন্ধকে যুক্ত করার জন্য একটা সেতু চাই। এই সেতু নির্মিত হতে পারে মূর্তি দিয়ে। কেননা আপনি নিরাকার কিছুর সঙ্গে সোজা সুজি সম্পর্ক স্থাপিত করতে পারবেন না। আপনি আকারে বর্তমান।  নিরাকার সম্পর্কে তো আপনার কিছু জানা  নেই। তাই যে যাই বলুক না কেন পরমাত্মা নিরাকার, অপ্রকাশিত।  সেটা শুধু শুধু কথার কথা হয়ে যাবে আপনার কাছে। আপনার অনুভবের মধ্যে কিন্তু আসবে না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের মস্তিষ্কের  মধ্যে যত  অনুভব আছে, সেগুলোর সবই  আকৃতির অনুভব। রূপের অনুভব। আমাদের কারুর মধ্যে নিরাকারের একটাও অনুভব নেই। কারুর কথা ভাবা মানে তার রূপের কথা। অবয়বের কথা। তার সূক্ষ্ম গুনের কথাতেও আমরা রূপ কল্পনা করি। আর যার সন্মন্ধে কোনো ধারণা নেই তার সম্পর্কে কোনো শব্দ আপনাকে তার স্মরণ করাতে পারবে না। তাই আপনি নিরাকারের কথা বলতে থাকবেন আর সাকারের মধ্যে বাস করবেন। যদি সত্যি সত্যি আপনি নিরাকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান তবে আপনাকে এমন একটি মূর্তি নির্মাণ করতে হবে যার একদিকে সাকার আর এক দিকে নিরাকার। এটা একটা অসম্ভব রহস্যময় মূর্তি হবে। একটু ভাবুন, আমরা যেখানে রয়েছি, সেখানে তার সীমা  প্রকাশিত। আর অন্যদিকে পরমাত্মা যেখানে আছেন সেটা সীমাহীন অপ্রকাশিত। তাই মূর্তিকে দুটো কাজ করতে হবে আমরা যেখানে সেখানে সে প্রকাশিত হবে, আর পরমাত্মা যেখানে আছেন সেখানে নিরাকারের মধ্যে হারিয়ে যাবে। এই ধরনের  কথা হয়তো কখনো শোনেননি।

একটা কথা শুনুন যে ব্যক্তি পূজা করে, সে ওই মাটির মূর্তিকে পূজা  করে না। সে ওই ছবিকে পূজা করে না। সে পূজা করে ওই ছবির  মধ্যে তার পিতাকে, মাতাকে, গুরুকে  ।  দেবতাকে।  ইষ্টকে। পরমাত্মাকে।  মূর্তির কখনো পূজা হয় না। মূর্তির মধ্যে আমি যাকে  দেখতে চাই তার পূজা করা হয়। আর যার কাছে মূর্তি দৃশ্যমান, সে কখনো পূজা শেখেনি, সে পূজা করে না। তার পূজা সম্পর্কে  কোনো ধারণাই  নেই। পূজা আর মূর্তি দুটো আলাদা কথা। পূজা মূর্তির হয় না, পূজা হয় ভাবনার। যে পূজা করে, সে কখনো মূর্তি দেখতে পায়  না। যে মূর্তি দেখতে পায়, সে কখনো পূজা  করে না। পূজা মূর্তিকে মুছে ফেলার কৌশল। আমরা তো আকৃতি সম্পন্ন, সেই আকৃতিকে মুছে ফেলার কৌশলই পূজা।দেহাতীত হয়ে যাওয়াই পূজা।  পূজায় দৃশ্যমান আকৃতি, আকৃতিবিহীন হয়ে যায়। তবেই পূজা সম্পন্ন হয়। প্রকাশিত অংশে পূজা আরম্ভ হয়, অপ্রকাশিতে পূজা সম্পন্ন হয়। পূজা সাধককে গ্রাস করে নেয়। যারা পূজা করেনি তারা ভাবে পাথর রেখে কি হবে ? আর যারা পূজা করেছে তাদের পাথর হারিয়ে যায়, সীমা হারিয়ে যায়, অসীমে প্রবেশ করে আর তখন পরমাত্মা  প্রকট হয়ে যায়।
ভগবান শ্রীচৈতন্য যখন দুহাত তুলে কৃষ্ণনাম করে, মিরা যখন পূজার ছলে  নাচ করে, মতুয়ারা যখন হরিবোল হরিবোল করে তখন তারা নিজেরা পূজার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।  এদের জন্য সেখানে কোনো মূর্তির অস্তিত্ব থাকে না। পূজা শুরু হলে মূর্তি বিলীন হয়ে যায়।  মূর্তি তো প্রারম্ভ মাত্র।  আমরা যারা পূজার কিছু বুঝি না, তারা মূর্তি দেখতে পাই। তাই আমার মনে হয় - সত্যিকারের পূজা যত কমতে থাকবে, মূর্তি তত  বাড়তে থাকে, পূজা শুরু হলে মূর্তি অন্তর্হিত হবে।

মূর্তি তো পরমাত্মাকে দেখবার জানলা মাত্র। আমি দেহের মধ্যে থেকে পরমাত্মাকে দেখতে চাই।  আমার তো দেহ আছে।  অর্থাৎ আমি আকৃতি সম্পন্ন। তো জালনা ও তো আকৃতি সম্পন্ন হবে , কিন্তু জানলা খুলে যখন আকাশের দিকে তাকাবো তখন নিরাকারের মধ্যে প্রবেশ করবো। এই দেহের মধ্যে জানলা আছে, সেটাকে খুলতে হবে। আকাশকে দেখতে হবে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে জানলা ছোট্ট।  কিন্তু আকাশ তো বড়ো। কিন্তু ছোট্ট জানলা দিয়েইতো বড়ো আকাশকে দেখা যায়। এটা বোঝানো কঠিন কিন্তু সত্যি। যে জানলা কখনো খোলেনি, যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝানো কঠিন হবে যে বৃহৎ আকাশকে, আয়তনে ছোট্ট জানলা দিয়েও দেখা যায়। মূর্তি পূজা এই জানলা খোলার প্রক্রিয়া। আপনি মন্দিরের কাছে যেতে পারেন। মূর্তির কাছে যেতে পারেন।  কিন্তু পূজার কাছে যেতে পারেন না।  কতকগুলো বিষয় আছে যার অভিব্যক্তি সম্ভব নয়। এগুলো অন্তরের ব্যাপার। আন্তরিক বস্তু প্রদর্শন সম্ভব নয়।

সাকার নিরাকার দুটি পৃথক নয়। একটি অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। যাকে  আমরা সাকার বলি সেটা নিরাকারের অংশ।  আবার যাকে  আমরা নিরাকার বলি সেটিও সাকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমরা সাকারে আছি। আমার দেহ সাকার। আমরা সম্পর্ক গড়ি সাকারের সঙ্গে। এই সত্য তো অস্বীকার করলে চলবে না যে আমরা সাকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের সেখান থেকেই যাত্রা  শুরু করতে হবে। যেখানে আমাদের যাওয়া  উচিত, সেখান থেকে যাত্রা শুরু করা যায় না। যেখানে আছি সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়। যেখানে আমরা নেই সেখান থেকে যাত্রা শুরু করা যায় না। আমরা যা কিছু জেনেছি আকারের মধ্যেই জেনেছি। আমরা প্রেম করেছি - আকারে। আমরা রাগ করেছি আকারে।  আমরা ঘৃণা করেছি আকারে। আসক্ত হয়েছি তাও আকারে। বন্ধুত্ব করেছি আকারে।  শত্রূতা করেছি তাও আকারে। ঈশ্বরের নিরাকারত্ব যেমন সত্য। আমাদের আকারত্ব তেমনি সত্য। আমাদের মন যখন কিছু ধরে রাখে সেটা আকারেই ধরে রাখে।

তাই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ বা কথা  যখন আমরা স্মরণ করি, তার গুনের কথা যখন আমরা স্মরণ করি, তখন তার আকারের কথাই আমাদের চোখে ভাসে। আর এই জন্য নিরাকারের দিকে যদি যাত্রার জন্য  আমাদের বেরোতে হয়, তবে আমাদের নিরাকারের জন্য আকার সৃষ্টি করতে হবে।এই আকারটা যদি শ্রীকৃষ্ণের হয়, বা অন্য্ কারুর হয় তবে আমাদের সাধনপথ সহজ হবে।                      

Thursday, 13 December 2018

মানুষের আসা যাওয়া-জন্মান্তর (এক)

মানুষের আসা  যাওয়া (এক)



মানুষের আসা  যাওয়া, এ এক অদ্ভুত রহস্য। কে আসে ? কে যায় ?কোথা থেকে আসে আর কোথায়-ই বা যায় ? কেউ বলে মনুষ্য জন্ম বিরল। এর পরে আর কবে হবে, তার কথা কেউ বলতে পারে না। তাই ঈশ্বরকে পেতে হলে এই মনুষ্য জন্মেই সচেষ্ট হও।  
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, অর্জুন তোমার আমার বহু জন্ম ব্যতীত হয়েছে। আমি জানি, কিন্তু তুমি  তা জান  না। এই জন্মে যারা তোমার মাতা পিতা কে বলতে পারে তাদের সঙ্গে আগের জীবনে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না ? 
একদিন  সময় বুঝে এক জিজ্ঞাসু গুরুদেবকে  জিজ্ঞেস করে বসলো:
হে গুরুদেব জীবের আসা যাওয়া সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। দয়া করে পুনর্জন্ম সম্পর্কে আপনি যদি কৃপা করে কিছু বলেন। 
গুরুদেব  : হে পুত্র  ! এই সৃষ্টির পেছনের কাহিনী অতি সরল আবার জটিল। সহজ করে যদি বলতে হয় তবে বলি প্রাণীদের নিজ নিজ কর্ম অনুসারে, প্রথমে পরলোকে গিয়ে, কিছু সময় কাটাতে হয়। সেখানে সে আগের জন্মের করা পাপকর্ম অথবা পুণ্যকর্মের ফল ভোগ করে। এর পরে যখন ওর পাপ পুণ্যের ফল ভোগ  সম্পূর্ণ হয়ে যায়, তখন আবার সে এই মৃত্যুলোকে জন্ম গ্রহণ করে, তার বাসনা পূরণের জন্য । এই মৃত্যুলোককে আবার কর্মলোকও বলে। কারন এই লোকে প্রাণীদের কর্ম করবার অধিকার প্রদান করা হয়। 
জিজ্ঞাসু : আমাদের পৃথিবীকে মৃত্যুলোক কেন বলা হয় ?
গুরুদেব : কারন এখানেই জীবের জন্ম মৃত্যু হয়।
জিজ্ঞাসু : তাহলে কি অন্যকোনো লোকে জন্ম বা মৃত্যু হয় না ?
গুরুদেব : না পুত্র, ওই সব লোকের বাসিন্দার না হয় জন্ম, না হয় মৃত্যু। তুমি তো জানো মৃত্যু কেবল এই শরীরের হয়। আত্মা কখনো জন্মায় না, মরেও না। আত্মা জন্ম মৃত্যু রোহিত।
জিজ্ঞাসু : আপনি তো আগে বলেছিলেন, যে আত্মার কোনো সুখ-দুঃখ হয় না। এখন বলছেন, পান-পুন্য ভোগ করার জন্য, অর্থাৎ শাস্তি - বা পুরস্কার ভোগের জন্য অন্য লোকে যেতে হয়। সেখানে তো শরীর  যায় না নিশ্চই । আত্মাই যায়। তবে সেখানে নিশ্চই আত্মাই সুখ দুঃখ ভোগ করে। তাহলে আপনি বলছেন, শরীর  শুধু  সুখ-দুঃখ ভোগ করে না।  আত্মাও সুখ দুঃখ ভোগ করে ?
গুরুদেব : না পুত্র। আত্মাকে কোথাও কোনো স্থানেই সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করতে হয় না। সুখ দুঃখ আত্মাকে ছুঁতেও পারে না। আত্মাতো পরম-ঈশ্বরের রূপের প্রকাশ। পরম-ঈশ্বর কারুর অধীন নয়। সুখ দুঃখ তো মায়ার খেলা। আর মায়ায় আবদ্ধ হয়ে জীব সুখ দুঃখ ভোগ করে। সুখ দুঃখ কেবল শরীরের ভোগ। আত্মার নয়। 
জিজ্ঞাসু : হে গুরুদেব, আমাকে আপনি দ্বিধায় ফেলে দিলেন। একবার বলছেন,শরীর  ত্যাগের পর মানুষ অন্য লোকে গিয়ে সুখ-দুঃখ ভোগ করে। সেখানে তো শরীর থাকে না। থাকে আত্মা। আত্মার যদি সুখ-দুঃখ ভোগ না থাকে বা না হয়,তাহলে সেখানে  কে সুখ-দুঃখ ভোগ করে ? 
গুরুদেব : জীবাত্মা। বা সূক্ষ্ম শরীর।  
জিজ্ঞাসু : এই জীব-আত্মা বা সূক্ষ্ম শরীর আবার কি ?
গুরুদেব : দেখো, জীবের শরীর একটি নয়, তিনটি। তুমি যে শরীরটাকে দেখতে পারছো, সেটা হচ্ছে স্থুল শরীর, তোমার আরো দুটো শরীর আছে। অর্থাৎ শরীর তিনটি।  স্থুল, সূক্ষ্ম ও কারন  শরীর।
কারন শরীরে আত্মা অপ্রকাশিত, অর্থাৎ আছে কিন্তু বোঝা যায় না ।   যেমন দুধের মধ্যে মাখন। বিশেষ প্রক্রিয়ার সাহায্যেই পাওয়া যায় মাত্র।  নতুবা নেই বলে মনে হয়।  মুখে নিলেও বোঝা যায় না।
কিন্তু   সূক্ষ্ম শরীরে আত্মা সূক্ষ্মরূপে আছেন। যেমন লবনাক্ত জল।দেখা যায় না। মুখে দিলে বোঝা যায়। সূক্ষ্ম শরীর আর কিছু নয় আমাদের ভাবনার জগৎ। আমাদের চিন্তার জগৎ।
আর হচ্ছে স্থূল শরীর যা পঞ্চভূতের তৈরী।  অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পাঁচ ভূতের সংমিশ্রণ মাত্র। 
যখন কারুর মৃত্যু হয় তখন এই যে বাইরের স্থুল  শরীর, তারই মৃত্যু হয়। অর্থাৎ পঞ্চভূতে অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম -এ  মিশে যায়।
স্থুল শরীর-এর ভিতরে যে সূক্ষ্ম শরীর আছে তার মৃত্যু হয় না। ওই সূক্ষ্ম শরীর আত্মার প্রকাশকে নিজের সাথে নিয়ে, মৃত্যু লোক থেকে বেরিয়ে অন্য লোকে চলে যায়। ওই সূক্ষ্ম শরীরকে জীবাত্মা বলে। আর এটি আমাদের চিন্তার জগৎ, ভাবনার জগৎ মাত্র। তাই সূক্ষ্ম শরীরেই আমাদের কর্মফল, বা সংস্কার সঞ্চিত থাকে।
স্থুল  শরীরে আমরা বাহ্যিক সুখ-দুঃখ ভোগ করি। আমাদের শরীর খারাপ এই স্থূল শরীরের হয়।  এটা বুঝতে নিশ্চয়ই অসুবিধা হয় না। জন্ম মৃত্যু বলতে আমরা যা বুঝি তা এই স্থুল শরীরের ক্রিয়া।
শরীর যেমন আমাদের তিন রকম, ভোগ আমাদের তিন রকম। একটা শারীরিক, যা এই স্থূল শরীরে ভোগ করতে হয়। একটা মানসিক - যা আমাদের সুক্ষ শরীরে ভোগ করতে হয়।  আর একটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক যা আমাদের কারন শরীরে হয়।
এইবার আমরা  জন্ম-মৃত্যু, বা আসা যাওয়ার খেলাটা একটু দেখে নেই। আমাদের দেহ অর্থাৎ স্থুল দেহ  পঞ্চভূতের সংমিশ্রণ। পুরুষ-প্রকৃতির খেলাতেই এই সংমিশ্রণ ঘটে।  প্রথমে মাংসপিন্ড, পরে ধীরে ধীরে জন্মদাতার-জন্মদাত্রীর আকার গ্রহণ।  এটি তখন দেহ মাত্র। এই দেহে ৪৪ থেকে ৪৮ দিনের মধ্যেই প্রাণের গমন নির্গমন গুরু হয়। তবে সেটা মায়ের প্রাণের অংশ মাত্র। সব থেকে বেশি হলে ৮৪ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হওয়া চাই।  এই সময় থেকেই আমরা মায়ের দেহের মধ্যে সন্তানের নাড়াচাড়া টের পাই। যদি না হয় জানবে কিছু গোলমাল আছে।  অর্থাৎ যে দেহটি তৈরি হচ্ছে সে মায়ের প্রাণের গতি গ্রহণ করছে পারছে না। এমনটি হলে জানবেন কিছু গড়বার আছে।    যখন সে মায়ের দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় তখন মায়ের প্রাণের সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা ঘটে।  । তখন তার নিজস্ব প্রাণক্রিয়া,  অর্থাৎ  প্রাণের গমন-নির্গমন শুরু হয়। এবং সেটা যদি তাৎক্ষণিক ভাবে শুরু না হয় তখন সন্তানকে এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে ধাঁই। সে তখন ফুসফুসকে উল্টে-পাল্টে ক্রিয়াশীল করে তোলে। বাচ্চা কেঁদে ওঠে। শুরু হলো জীবনের খেলা। 
এইবার চলে যাবো মৃত্যু প্রক্রিয়ায়। জীবন হচ্ছে শ্বাসের খেলা। এই শ্বাসের মাধ্যমেই আমাদের সমস্ত প্রক্রিয়া চলে। পঞ্চভূতের মধ্যে  মরুৎ অর্থাৎ বায়ু সবথেকে শক্তিশালী ও সংযোগকারী। উপনিষদে একে ব্রহ্ম বলে আখ্যা  দেওয়া হয়েছে। প্রাণ শরীরের কোনে কোনে পরিব্যাপ্ত হয়।
 শরীরের কৰ্মইন্দ্রিয় (বাক,পানি,পাদ, পায়ু,উপস্থ ) জ্ঞান ইন্দ্রিয় (কর্ন, চর্ম, চক্ষু, জিহবা, ও নাসিকা) অর্থাৎ কান, ত্বক, চোখ, জিভ, নাক, মুখ, হাত,পা, মলদ্বার, ও লিঙ্গ, তখন ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।   আমাদের  স্বাস প্রক্রিয়ার জন্য দুটো ইন্দ্রিয় কাজ করে, এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে নাক।  যদি কোনো কারণে নাক বন্ধ  হয়ে যায় মুখ দিয়ে আমরা এই স্বাস প্রক্রিয়া চালাই । একমাত্র স্বাস প্রক্রিয়ার জন্য দুটো অঙ্গ বা দুটো ইন্দ্রিয় ব্যবহার করতে পারি।  শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো বিশ্রাম নিলেও, নিদ্রা গেলেও এই প্রাণশক্তির ক্রিয়া চলতে থাকে।  কখনই বিশ্রাম নিতে পারে না। দিন-রাত অনবড়ত  কাজ করতে থাকে। যতক্ষন এই প্রাণশক্তি প্রবাহমান থাকে ততক্ষনই আমাদের আয়ু থাকে। প্রাণ যতক্ষন কর্মক্ষম থাকে ততক্ষনই আমাদের জীবিত বলা হয়।  এই প্রাণশক্তির কাজ শেষ হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এই প্রাণের শক্তিতেই দৃষ্টি-শক্তি, এই প্রাণের শক্তিতেই শ্রবণ শক্তি, এই প্রাণের শক্তিতেই ঘ্রান শক্তি, বাক শক্তি, জ্ঞানশক্তি, পাচন  শক্তি। প্রাণের ক্রিয়া শুরুতে জীবন শুরু হয় - আবার প্রাণের ক্রিয়া শেষে জীবনের শেষ হয়। ত্রিলোকে যা কিছু বর্তমান সবই প্রাণের অন্তর্গত। 
এবার আমরা যাবো আর একটু গভীরে। প্রাণ তো দেহটা কে বাঁচিয়ে রাখে। সবার মধ্যেই প্রাণ।  তাহলে "অমি"  কে ? এই দেহ যখন অকেজো হয়ে যায়, তখন তাকে আমরা পুড়িয়ে ফেলি, কবর দেই।  এর সঙ্গেই "আমি"  শেষ হয়ে গেলাম ? "আমি" যদি শেষ হয়ে গেলাম, তবে আর পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে কি ? "আমি" বলে কিছু আছে কি ? তাহলে কি, জগৎ সত্য, আমি মিথ্যা। 
এখান থেকেই ধোঁয়াশার শুরু। এই জায়গাটা উপল্বদ্ধির জায়গা। এই জায়গাটা বুদ্ধি দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, বেশিদূর এগোনো যায় না।  মৃত্যুর পরে কেউ ফিরে আসেনা। এসে কেউ পরপারের কথা, পরপারের বর্ণনা দিতে পারে না।  এখানেই চতুর পন্ডিতরা গল্প ফাঁদে। স্বর্গ, নরকের গল্প ফাঁদে। যে যত রসালো গল্প বলতে পারে তাকে আমরা ততো বড় সাধক ভাবি। আসলে কল্পনা শক্তি, আমাদের ভাবের জগতে নিয়ে যায়। আমরাও আমাদের একটা কাল্পনিক ভাবের জগৎ তৈরি করি। কিন্তু বাস্তব  অন্য কথা বলে। সব ভাষায় বলা যায় না। কাউকে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায় না।
এই খান থেকেই শুরু হয় আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের খেলা। 
তাই বলছিলাম : 
আমাদের স্থুল শরীরের মতো  আর একটা শরীর  আছে, তাকে বলে সূক্ষ্ম শরীর।  এই শরীরেরও সুখ দুঃখ ভোগ আছে। খেয়াল করো - তুমি ঘুমিয়ে আছো।  স্বপ্ন দেখছো। তোমাকে স্বপ্নে ষাঁড়ে তারা করেছে, তুমি ভয় পাচ্ছো।  তুমি সমুদ্রে সাঁতার কাটছো।  বা পাখির মতো আকাশে উড়ছো। বা বহু সোনাদানা পাচ্ছো। এসবই কিন্তু ওই মুহূর্তের জন্য তোমার কাছে সত্যি। এবং এর জন্য তোমার স্থুল  শরীরেও ভয়, আনন্দ, উদ্বেগ অনুভূত হচ্ছে। অথচ তোমার স্থূল শরীর  কিন্তু বিছানায় পরে আছে। এই সূক্ষ্ম শরীরেই   আমাদের সংস্কার বাসা বাঁধে। স্থুল শরীরের মৃত্যুর পরে এই সূক্ষ্ম  শরীর তার স্থূল শরীরের কর্ম অনুসারে, ভাবনা অনুসারে, চিন্তা অনুসারে যে সংস্কার তৈরী সেই  সংস্কারকে নিয়ে ঘুরতে থাকে। একেই আমরা জীবাত্মা বলি।
এর পরে আছে কারন শরীর। এই শরীরেই ব্রহ্মানন্দ উপলব্ধি হয়। এই শরীর  আমাদের সুসুপ্তির সময় কাজ করে। সুসুপ্তিতে আমাদের সুখ দুঃখ উপলব্ধি থাকে না। শুধু সাম্যাবস্থা বজায় থাকে। গভীর ঘুমে আমরা বাহ্যিক সমস্ত কিছু ভুলে যাই।  কোথায় থাকি তা আমরা বুঝতে পারি না।  আমরা অজ্ঞান তাই এই অবস্থা সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা নেই । যারা জ্ঞানী তারা এই সুসুপ্তির অবস্থায় চেতন থাকতে পারেন। ধ্যানে এই সুষুপ্তি লাভ করা যায়।  আর সুসুপ্তির পরে আমাদের শরীর  মন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। প্রত্যেকটি মানুষেরই এই তিন অবস্থাই হয় বা আছে।
জিজ্ঞাসু : তার মানে, যখন আত্মা এক স্থুল শরীরকে ছেড়ে যায়, তখন সূক্ষ্ম শরীর জীবাত্মাকে বা সুক্ষ শরীরকে  সঙ্গে নিয়ে যায় ?
গুরুদেব : না পুত্র ! ব্যাপারটা এত সরল নয়। দেখো, সমুদ্রের মধ্যে জলের এক বুঁদ।  সমুদ্র থেকে ওই বুঁদ আলাদা নয়।  ওই মহাসাগরের এক অংশ মাত্র। ওই বিন্দু সাগরের বাইরে যায় না। হ্যাঁ কেউ যদি সমুদ্র থেকে একটা পাত্রে করে জল নিয়ে যায়, তবে ওই জল সমুদ্র থেকে আলাদা দেখা যায় মাত্র। ওই জল কিন্তু সমুদ্রের অংশ।  আবার এও ঠিক ওই জল এক দিন না একদিন সমুদ্রে মিশে যাবে , এটা নিশ্চিত। ওই রকম সূক্ষ্ম শরীর রুপী জীবাত্মা, ওই আত্মজ্যোতি-খন্ড নিজের মধ্যে রেখে, সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এটাই জীব-আত্মার যাত্রা। যা এক শরীর  থেকে অন্য শরীরের মধ্যে, যা এক যোনি থেকে অন্য যোনিতে বিচরণ করে বেড়ায়। 
হে পুত্র ! জীবাত্মা যখন এক শরীর ত্যাগ করে অন্য শরীরে প্রবেশ যাত্রায় বেরিয়ে পরে, তখন ওর সাথে ও ওর পুরোনো শরীরের বৃত্তি, ওর সংস্কার, অর্থাৎ প্রারব্ধ সূক্ষ্ম রূপে সাথে করে  নিয়ে যায়। 
জিজ্ঞাসু : হে পিতা : মানুষ শরীর ত্যাগ করার পরে, জীবআত্মা কোথায় যায় ?  
গুরুদেব : মানুষ স্থুল  শরীর ত্যাগের পরে, মানুষ তার প্রারব্ধ অনুসারে, নিজের পাপ ও পুন্য ভোগ করতে হয়। এর জন্য ভোগযোনি  তৈরী হয়েছে।  যা দুই প্রকার। উচ্চযোনি ও নীচযোনি।  মানুষ অর্থাৎ জীবাত্মা  তার পাপ পুন্য অনুসারে উচ্চযোনিতে  অর্থাৎ স্বর্গে থেকে নিজের পুন্য ভোগ করে। বা নীচযোনিতে অর্থাৎ নরকে থেকে নিজের পাপ ভোগ করে। এই স্বর্গ নরক আর কিছুই নয় আমাদের সংস্কার। আমাদের ভাবনা। সুক্ষ শরীর তার পূর্বকর্মের পাপপুণ্য উপলব্ধি করে।  এবং পাপের জন্য নিজেকে দগ্ধ করে।  এটাই নরক যন্ত্রনা। আর  ভালো কর্মের স্মৃতি তাকে উৎফুল্ল করে।  এটাই স্বর্গভোগ।  
তাহলে বুঝতে পারছো - স্থুল শরীর পঞ্চভূতের তৈরী। সূক্ষ্ম শরীর আমাদের ভাবনা বা সংস্কার দ্বারা তৈরী। আর কারন শরীর হচ্ছে শরীর তৈরির অব্যক্ত উৎস। 
জিজ্ঞাসু : এই স্বর্গ নরক কোথায় ? উচ্চযোনি বা নীচযোনিই বা কি ?
গুরুদেব :এই স্বর্গ নরক আর কোথায়ও নয়। এই পৃথিবী। এখানেই আমাদের শারীরিক, মানসিক, ও আধ্যাত্মিক ভোগ করতে পারি। যদি আমরা স্থূল দেহ থাকা কালীন ভোগ সম্পূর্ণ না করতে পারি, তখন আমাদের সুক্ষ দেহে এই ভোগ করতে হয়। এই সূক্ষ্ম দেহের ভোগকেই আমরা স্বর্গ সুখ, বা নরক যন্ত্রনা বলে  থাকি।  
জিজ্ঞাসু : এখানেই স্বর্গ নরক  ? এটা কেমন ? 
গুরুদেব : একটা উদাহরণ দিয়ে বলি তোমায়। আসলে পাপ-পুণ্যময় এই জীবন। অর্থাৎ সুকর্ম, দুস্কর্ম, আর নিস্কর্ম নিয়েই আমাদের জীবন। সুকর্মের জন্য সুখ, দুস্কর্মের জন্য দুঃখ, আর নিস্কর্মের জন্যও একটা ফল আছে সেটা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দুঃখ, আবার সুখও আছে। 
ধরো এক সম্পন্ন গৃহস্থ। বিশাল বাড়ী, গাড়ী, দাস দাসী।  কোনো কিছুর অভাব নেই। তার একটি সুসন্তান। পিতা মাতার বাধ্য সন্তান। জোয়ান ছেলে। যাকে ঘিরে, গৃহস্থ ভবিষ্যতের সুখের কল্পনায় হাবুডুবু খাচ্ছে। নিজেকে সবচেয়ে ভাগ্যশালী মানুষ মনে করে। কিন্তু একদিন  ওঁর ওই জোয়ান ছেলে আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা গেলো। দুঃখের পাহাড় ওর উপরে ভেঙে পরে। সংসারের সমস্ত বস্তু ওর কাছে থাকা সত্ত্বেও ও দুঃখীই থাকে। এবং যতদিন বেঁচে থাকে নিজের পুত্রের মৃত্যুশোক, তাকে ঘিরে থাকে। ওই গৃহস্থ পুত্রের জোয়ান হাওয়া পর্যন্ত যে সুখ ভোগ করেছিল সেটা ওর স্বর্গ সুখ।  আর পুত্রের মৃত্যুর পরে যে দুঃখ ভোগ করেছিল সেটা ওর নরক যন্ত্রনা। এই ভাবে মানুষকে এই জীবনেই তার প্রারব্ধ অনুসারে সুখ দুঃখ ভোগ করতে হয়। 
এবার তোমাকে বলি উচ্চ যোনি ও নিচ যোনির কথা। উচ্চযোনি আর কিছুই নয় শ্রেষ্ট মনুষ্য ঘরে জন্ম গ্রহণই উচ্চ যোনি জাত।  অর্থাৎ সেখানে সে  সর্ব সুবিধা পাবে। এবং মোক্ষের পথে এগিয়ে যাবে। আর নিচ যোনী মানে হিনতর প্রাণিকূলে জন্ম গ্রহণ।  যেখানে সে সাধনমার্গে যাবার চিন্তা রোহিত হবে। 
আবার কেউ কেউ বলেন, পুণ্যবান মনুষ্য নিজের পুণ্যে কিন্নর, গান্ধর্ব, অথবা দেবতাদের যোনি ধারণ করে স্বর্গলোকে অবস্থান করবে, যতক্ষন না তার অর্জিত পুন্য ক্ষয় হচ্ছে। পুন্য ক্ষয় হয়ে গেলে আবার তাকে পৃথিবী লোকে তাকে  জন্ম গ্রহণ করতে হবে ।
জিজ্ঞাসু : স্বর্গলোকে মানুষের পুন্য কেন শেষ হয়ে যায় ? স্বর্গ থেকে যদি ফিরেই আসতে  হবে, তবে স্বর্গে গিয়ে কি লাভ ? শুনেছি স্বর্গে তারাই যায়. যারা ভালো কাজ করেছিল।  আর স্বর্গে গিয়েও তো তার পুন্য অর্জন হবে। তবে সে আবার পৃথিবীলোকে ফিরে আসবে কেন ?
গুরুদেব : উচ্চ যোনিতে বা দেবতা হয়ে অর্থাৎ অশরীরী হয়ে  কেউ  কোনো কাজ করতে পারে না। তাই তার কোনো ফলও  হয় না।  তেমনি নিচ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে সে যে কাজ করে তার কোনো ফল হয় না।  এই জন্য এগুলোকে ভোগ-যোনি  বলা হয়। এই ভোগযোনিতে কেবল ভালো কর্ম বা খারাপ কর্মের জন্য সুখ বা দুঃখ ভোগ করতে পারে।  এই সময় তার কোনো কর্মফল সঞ্চয় হয় না।
অর্থাৎ কোনো পশু যদি কাউকে হত্যা করে, তবে তার পাপ হবে না।  আবার নিরীহ প্রাণী, যারা ঘাসপাতা খায় কাউকে  হিংসা করে না তাদেরও কোনো পুন্য হবে না। তাই বাঘ কাউকে মারলে যেমন কোনো পাপ হবে না, তেমনি ছাগল বা হরিণ ঘাসপাতা খায়, হিংসা করে না বলে তাদের কোনো পুন্য হবে না।  
হে পুত্র।  কেবল মনুষ্য জন্মেই  কর্মফল সঞ্চয় হয়। নিকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট যোনিতে কর্মফল  সঞ্চয় হয় না। অর্থাৎ দেবতা বা পশু, কোনো জন্মেই কর্মফল সঞ্চয় করা যায় না। আর এই কর্মই মানুষকে মোক্ষ বা জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে বের করে আন্তে পারে।  পরম-পিতার ধামে পৌঁছে দিতে পারে। তাই দেবতা বলো, আর গান্ধর্ব, কিন্নর বলো সবাই মানুষ হয়ে জন্মাতে চায়।  তাইতো বলা হয় দুর্লভ এই মানুষ্য জীবন।
হে পুত্র ! সমস্ত লোকের মধ্যে এই পৃথিবী লোকে, আর সমস্ত জীবের মধ্যে কেবলমাত্র মানুষেরই বিবেক আছে। যে খারাপ ভালো বোঝে।  অন্য কোনো প্রাণী ভালো মন্দ বিচার করতে পারে না। সে কেবল নিজের রক্ষা করতে ব্যস্ত। তা সে দেবতা বলো আর পশু  বলো, সবাই খালি নিজেরটা বোঝে। ভালো মন্দো বোঝে না। তাই জানোয়ার যখন জানোয়ারকে মারে, বা অদিতির পুত্র যখন দিতির পুত্রদের মারে, বা উল্টোটা যখন হয় তখন তাদের কোনো পাপ লাগে না। পাপ-পুণ্যের লেখাজোকা কেবল মানুষের জন্য। তাই মানুষই পশু হয়ে জন্মায় দুর্ভোগ পোহাবার জন্য, আবার মানুষই দেবতা হয়ে জন্মায় পুন্য ভোগ করার জন্য। ভোগ শেষে  আবার মনুষ্য।  এই চক্রে আবর্তিত হচ্ছে  জীব জগৎ। 
জিজ্ঞাসু : এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে গেলে আর মৃত্যু পুরীতে ফিরে আসতে  হয় না ? আর জন্ম-মরন চক্র শেষ হয়ে যায় ? 
গুরুদেব : হ্যাঁ সেই স্থানই  পরমধাম। পরমাত্মার ধাম। যেখানে গেলে কাউকে ফিরে আসতে   হয় না। একেই বলে মোক্ষ। 
হে পুত্র ! মনুষ্য জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য মোক্ষপ্রাপ্তি করা। আর এই মোক্ষ কেবল মনুষ্যযোনি দ্বারাই প্রাপ্ত হতে পারে। এই জন্য মানুষের শরীরকে মোক্ষপ্রাপ্তির দ্বার বলা হয়ে থাকে। হে পুত্র মানবশরীর বড়ো  দুর্লভ। কত জন্মের সাধনার ফলে, কত কঠিন সাধনার ফলে এই মানব শরীর প্রাপ্ত হয়েছো।  এঁকে অবহেলায় কাটানো উচিত নয়। দেবতারাও মানব শরীরের আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু মানুষের বিড়ম্বনা এই যে মানুষ তার মূল্যবান শরীরকে অর্থাৎ মোক্ষপ্রাপ্তির সুযোগকে অবহেলা করে।জাগতিক ভোগ বিলাসে, অনিত্য বস্তুতে মগ্ন থাকে।   এমনকি শরীর  ছাড়ার যখন সময় আসে, তখনও বাসনা তার পিছন ছাড়ে  না। হে পুত্র মৃত্যুর সময় যে বাসনা মানুষের মনে দৃঢ় থাকে, মানুষ সেইমত পরবর্তী জীবন প্রাপ্ত হয়। 
হে পুত্র ! প্রাণী সারা জীবন যেমন-ই  কাটাক, অন্তত অন্তঃকালে যদি একাগ্র মনে কেবল পরম-পিতার  ধ্যান করে, এবং তৎক্ষণাৎ শরীর  ত্যাগ করে তবে সে সোজা পরমধামে পৌঁছে যায়।  সেখান থেকে ওর আর ফিরে আসতে  হয় না। আর এই অন্তঃকালে পরম-পিতার ধ্যান তখনই সম্ভব, তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা সারা জীবন তাঁরই ধ্যানের অভ্যাস করে। তাই তোমাকে বলি, সব ছেড়ে, তার ধ্যান করো, আর মোক্ষলাভ করো।
আজ বাক্যকে বিরাম  দিলাম।  
ওম শান্তিঃ ওম শান্তিঃ ওম শান্তিঃ    
         


      

              
      

















Sunday, 9 December 2018

সত্যধর্মের আলোতে গুরুতত্ত্ব - ৬

সত্যধর্মের আলোতে গুরুতত্ত্ব - ৬ 
(মহাত্মা গুরুনাথের (সেনগুপ্ত) গুরু কে ছিলেন ? )


আসলে আমার মধ্যে প্রশ্ন অনেক। জবাবের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছি। কিন্তু কে বলে দেবে ? মহাত্মা গুরুনাথ গুরু করণের ব্যাপারে সদর্থক বক্তব্য লিখেছেন। অর্থাৎ গুরুকরন আবশ্যিক বলেছেন। যদিও উপযুক্ত গুরু না পেলে, সারা জীবন গুরুহীন থাকা ভালো এ কথাও বলেছেন।  কিন্তু আমি জানতে চাই, তাঁর কি কোনো দেহধারী গুরু ছিলো ? যদি থেকে থাকে তিনি কে ? যদি না থেকে থাকে, তবে তো ধরে নিতে পারি, দেহধারী গুরু না থাকলেও সাধন সিদ্ধ হওয়া যায়। যার জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি নিজে।

মহাত্মা গুরুনাথের সাধন জীবন সম্পর্কে জানতে গিয়ে, শ্রী ভুবন মোহন গঙ্গোপাধ্যায় লেখা "সত্যধর্ম্ম প্রচারক দেব-মানব মহাত্মা গুরুনাথ" বই থেকে জানতে পারি, পারলৌকিক মহা-মহোন্নত কোন মহাত্মাকে গুরুরূপে প্রাপ্ত হয়ে, প্রেম সাধনা করতে করতে, তিনি ঈশ্বর প্রেমের অঙ্কুর "প্রকৃত প্রেম" লাভ করেন  এবং "অভেদ জ্ঞান" সাধনা সহযোগে, সিদ্ধ মনোরথ হয়ে, নিজেকে জগদীশ্বরের সাক্ষাৎ অংশে পরিণত করেছিলেন। 

এখন কথা হচ্ছে, এখানে কোনো দেহধারী গুরুদেবের কথা লেখা নেই। পরলোকগত মহাত্মার কথা লেখা আছে। জানিনা এইসব কথা গুরুদেব নিজে বলেছিলেন কি না।  অথবা এসব কথা লেখকের কষ্ট  কল্পনা কি না। কষ্ট-কল্পনা কথাটা বলার কারন হচ্ছে, এই বই পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, লেখক গুরুদেবকে যথাযথ পরিবেশনের চেয়ে, নিজের আবেগের কথা পরিবেশন করেছেন
বেশীকরে । গুরুদেবকে  উঁচুতে তুলে ধরার একটা প্রবণতা, সবসময়  সবশিষ্যের মধ্যে থাকে। ভুবনবাবুর  এই লেখার মধ্যেও  আছে, এটা  আমার মনে হয়েছে। কিন্তু আমাদের সত্য খুঁজতে হবে। 

এবার তার সাধনজীবন  সম্পর্কে অর্থাৎ তিনি কবে,  কিভাবে, কার সাধনা করেছেন তা আমরা একটু দেখে নেবো। 

বালক গুরুনাথ, তার বাবাকে দেখতেন, ধ্যান ধারণা, জপ্ তপঃ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে । এই সময়, বালক গুরুনাথ পূজা-উপার্জন-এর দিকে, আকৃষ্ট হন ।সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে পিতা রামনাথ তার প্রথম গুরু।  যখন তাঁর ১১/১২ বছর বয়স। সেই সময় তিনি কারুর কাছ থেকে শুনেছিলেন, যে অগ্নি প্রজ্বলিত করে, মা কালির মূর্তির সামনে, কালী মন্ত্র  জপ্ করতে হয়। তো অগ্নি কুন্ডের  অভাবে, আগুনের তাওয়া কোলে বসিয়ে, একমনে মা কালীর নাম জপ্ করতেন।

মাত্র ষোলো বছর বয়সেই সূক্ষ্ম জগৎ দর্শন, দেবদেবীদের সাথে কথোপথন ইত্যাদি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। আমার মনে হয়, এই ক্ষমতা নিশ্চই ধ্যানের মাধ্যমেই অর্জন করেছিলেন। গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকলে, এই দর্শন সম্ভব।

এর পরে তিনি আকৃষ্ট হন রাজা রামমোহনের রায়-এর ব্রাহ্মসমাজ, অর্থাৎ যারা নিরাকার পরম-ঈশ্বরের উপাসনা করতো, কিন্তু গুরুবাদে বিশ্বাস করতো না। এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতো  । সেখানেও তিনি অনেক দিন যাতায়াত করেছেন। এইভাবে মহাত্মা গুরুনাথ নিরাকার পরব্রহ্মের  উপাসনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এইসময় থেকেই মহাত্মা মহিম চন্দ্র দাসগুপ্ত  ইত্যাদি চার-পাঁচজনকে  নিয়ে গভীর রাতে, পরব্রহ্মের উপাসনা করতে লাগলেন।

অধ্যাত্ম পিপাসু মন এবং অলৌকিক ক্ষমতার  অন্বেষনে মহাত্মা গুরুনাথ সাধনায় লিপ্ত থাকেন। এই সময় তিনি স্পিরিচুয়ালিস্ট অর্থাৎ যারা পরলোকগত আত্মাদের আকৃষ্ট করে তাদের সাথে কথোপথন চালাতো, তাদের ক্রিয়াকলাপ আয়ত্ব করেন। এবং স্পিরিচুয়ালিস্টদের মতো তিনিও বন্ধুদের নিয়ে আত্মা আকর্ষণ কার্যে নিজেদের নিয়োজিত করেন।

এই আত্মা আকর্ষণের দ্বারাই, নাকি তিনি এই সত্যধর্মের  সন্ধান পেয়েছিলেন। এই আত্মারা আসতো  মহাত্মা মহিম চন্দ্রের  (দাসগুপ্ত) দেহে। ওই সময় মহিমচন্দ্র যা বলতো, সেটা লিখে রাখা হতো। এই সময় মহিমচন্দ্রের বয়স মাত্র বারো, আর মহাত্মা গুরুনাথের বয়স আঠারো। এটা ১৮৬৫/৬৬ সালের কথা।
এর প্রায় কুড়ি বছর  বাদে অর্থাৎ ১৮৮৫ সালের ২০শে অক্টোবর পারলৌকিক মহাত্মারা এই সত্যধর্মের প্রচারের অনুমতি দেন। অর্থাৎ মহাত্মা গুরুনাথের বয়স যখন ৩৮ বছর, ও মহাত্মা মহিমচন্দ্রের বয়স যখন ৩২,  সেই সময় তিনি বা তারা,  এই ধর্ম প্রচার করার জন্য আদেশ প্রাপ্ত হন।

এরও তিন বছর বাদে, ১৮৮৮ সালে, বাংলা ১২৯৫ বঙ্গাব্দে দীর্ঘ ১৭দিন  অনাহারে, স্বল্পাহারে থেকে উপাসনায় লিপ্ত থেকে  তিনি ব্রহ্ম দর্শন পান। অর্থাৎ মহাত্মা গুরুনাথ প্রায় ৪১ বছর  বয়সে তিনি সাধনার চূড়ান্ত ফল প্রাপ্তিহন। অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ বছরের সাধনায় তিনি সাফল্য লাভ করেন। এই সময়েও তার কোনো গুরু ছিলেন কি না তার কথা পাই নি।

আমি যদিও  এই স্পিরিচুয়ালিস্টদের এই আত্মা আকর্ষণের বিষয়ে আকৃষ্ট নোই। সেই আলোচনায় আমি যাবো না। আমাদের মূল আলোচনার বিষয় মহাত্মা গুরুদেবের দেহধারী গুরু কে ছিলেন। মহাত্মার দীর্ঘ জীবনের আলোচনায় কোথাও তার গুরুদেবের সন্ধান পাই না। দীর্ঘ সাধনায় তিনি নাকি  ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহাপুরুষ মহম্মদকে দেখতে পেয়েছিলেন। এগুলো বিতর্কিত বিষয়। জানিনা এসব কথা গুরুদেব বলেছিলেন কি না। যাইহোক : আমরা সাধারণ মানুষ স্রষ্টাকে চিনিনা জানিও না, কিন্তু তার সৃষ্টিকে আমরা দেখতে পাই। তার সৃষ্টি  দেখেই তার মহত্ত্ব অনুমান করি। আমরা মহাত্মা গুরুনাথের বই পড়ে, তিনি যে হাজার হাজার লোককে সাধন পথের  সন্ধান দিয়েছেন, শান্তি লাভের উপায় দান করেছেন, সেটা যারা তাঁর নির্দেশিত পথে উপাসনায় লিপ্ত আছেন বা ছিলেন , বা উপাসনার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন, তারাই উপলব্ধি করেছেন ।
 
 মহাত্মা গুরুনাথ, ২৭/০৩/...১২ তারিখে, জনৈক বিধূ ভূষণ-কে লিখছেন, মহাদেব বললেন যে, ধর্ম্ম এক এবং তার নাম সত্যধর্ম্ম ; বিশেষতঃ কলিকালে সত্যধর্ম্ম ভিন্ন অন্য কোনো ধর্ম্মই  বলবান (ফলপ্রসূ) থাকবে না। যারা সত্যব্রত, সত্যনিষ্ঠ ও সত্যধর্ম্ম পরায়ন এবং যারা কুল সাধনাকেও সত্যধর্ম্ম বলে বোধ করেন, কলি তাদেরকে, পীড়া দিতে পারবে না।

গুরুদেব লিখছেন, মহাদেব ভগবতীকে বলছেন, হে দেবী ! কলি প্রকট হলে, সকল ধর্ম্মই দুর্ব্বল হবে, কেবল সত্যধর্ম্ম থাকবে। অতএব, সত্যময়, অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে সত্যধর্ম্ম-আশ্রিত হওয়া সকলেরই কর্তব্য। 

মহাদেব আবার বলছেন হে দেবী (সুব্রতে) ! মনুষ্য সত্যধর্ম্ম অবলম্বন করে যে কার্য্য করবে, সেই কার্য্যই সফল হবে, ইহা সত্য বলে জানবে। 

এর পরে, মহাদেব  বলেছেন  "না হয় সত্যাৎ পরো ধর্ম্মঃ" অর্থাৎ সত্যধর্ম্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম আর নাই। ইত্যাদি ইত্যাদি। .......

উপরুক্ত কথাগুলি, "মহানির্ব্বান" তন্ত্রে শিবের উক্তি। সেটাকেই মহাত্মা গুরুনাথ প্রবর্তিত, সত্যধর্ম্ম-এর গুরুত্ত্ব বোঝাতে ব্যবহার করছেন।

উপরুক্ত চিঠি বা লেখা থেকে আমার মনে হয়, দেবাদিদেব মহাদেব যে সত্যধর্মের কথা বলেছেন, মহাত্মা গুরুনাথ সেই একই সত্যধর্ম  কথা বলতে বলেছেন । আমার শ্বশ্রূমাতা বলতেন, মহাদেবই গুরুদেবের গুরু। জানিনা সত্য কি, সত্য কোথায়। 

সমাপ্ত


    




      
   

Saturday, 8 December 2018

সত্যধর্মের আলোতে ও পরোপকার


সত্যধর্মের আলোতে  ও পরোপকার


পরোপকার আমাদের সবার কাছে পরিচিত শব্দ। আমরা জানি পরোপকার মানে পরের উপকার করা। এবং এটা যে একটা ভালো কাজ, সেটাও আমরা সবাই জানি। এই ব্যাপারে বক্তৃতা দেবার কোনো জায়গা নেই, প্রয়োজনও নেই। তথাপি যখন এই "পরোপকার" নিয়ে আমাকে বলতে বলা হলো, তখন আমি বাধ্য হয়ে মহাত্মা গুরুনাথের বই পড়তে লাগলাম। আর গুরুদেবের বই পড়লেই আমি নতুন কিছু পাই।  কি বলেছেন তিনি এই ব্যাপারে ?

পরোপকার বলতে জানতাম, পরের উপকার। গুরুদেব বললেন - পর কথাটার মানে শ্রেষ্ঠ  অর্থাৎ পরোপকার মানে শ্রেষ্ঠ উপকার। এখন পরোপকার করে, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ উপকার করে  আমার কি লাভ হবে।  আগে নিজের উপকার করি ! তার পরে পরেরটা দেখা যাবে। গুরুদেব বলছেন, যদি তুমি পরের উপকার করো,  তবে আখেরে তোমারই লাভ হবে। এই ব্যাপারটা অবশ্য আমাদের মতো সাধারণের মাথায় ঢোকে না। কেননা উপকার যদি পরেরই  হবে, তবে আমি তাতে কি ভাবে লাভবান হবো ? আমার-তো আরো কম পড়ে  যাবে। আমার প্কেট খালি হয়ে যাবে। এই জায়গা একটু ভালো করে বুঝতে হবে।

তার আগে বুঝে নেই ,পরোপকার ব্যাপারটা কি ?

গুরুদেব মহাত্মা বলছেন : পরোপকার একটা মহাযজ্ঞ।  দয়া, ন্যায়পরতা এই যজ্ঞের ইন্ধন। জ্ঞান এর প্রকৃষ্ট সাধন। স্বার্থপরতা এর আহুতি। আত্মপ্রেম এর দক্ষিনা।  আর ফল হচ্ছে আত্মপ্রসাদ। অতএব অন্যের খুশির জন্য নয়, নিজের খুশির জন্য পরের উপকার করার থেকে উৎকৃষ্ট উপায় আর কি আছে ?
এখন কথা হচ্ছে, মহাযজ্ঞ কি ? ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কোনোকিছু সমর্পন-ই যজ্ঞ। আপনারা যজ্ঞ দেখেছেন। তাতে আগুন জ্বেলে ঘৃত ইত্যাদি পুরোহিত  আহুতি দেয়। গুরুদেব বলছেন, দয়া ও ন্যায়পরতা দিয়ে আগুন জ্বালুন। স্বার্থপরতা আহুতি দিন, আত্মপ্রেম দক্ষিণা হিসেবে দিন, আর অতুল আত্মপ্রসাদ লাভ করুন।  তাহলে পরোপকার মানেই হচ্ছে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কোনো কিছু সমর্পন। যার দ্বারা আমি নিজে খুশি হতে পারি। অন্যকে খুশি করার কথা ভাবেন না। এবং এর দ্বারাই ঈশ্বরকে খুশি করা যায়। অতএব আপনি যদি অধ্যাত্বিক হতে চান, তবে পরোপকার একটা উৎকৃষ্ট উপায়। 

পরোপকার মানে এই নয় যে সবসময় টাকা-পয়সা দিয়ে উপকার করতে হবে। উপকার অনেক ভাবে করা যায়। 
কথা দিয়ে অর্থাৎ উপদেশ দিয়ে আপনি কারো উপকার করতে পারেন।

শ্রম দিয়ে আপনি কারো উপকার করতে পারেন।

নিজের সাময়িক স্বাছন্দ ত্যাগ করে, নিজের অসুবিধা না করে, আপনি কারুর উপকার করতে পারেন।

আপনি যদি ডাক্তার হন, নিজের সুবিধা মতো ঘন্টাখানেক সময় আপনি বিনা পয়সায় দুস্থ রুগী দেখতে পারেন।

 আপনি যদি মাস্টার হন, তবে বিনা পারিশ্রমিকে আপনার পছন্দ মতো দু একটা ছাত্রকে পড়াতে পারেন।

আপনার ক্ষমতা অনুযায়ী আপনি যেকোনো ভাবে আপনি মানুষের উপকার করতে পারেন।

আপনার অব্যবহৃত জামা-প্যান্ট দুস্থদের দান করতে পারেন।  আপনার অব্যবহৃত ঔষধ আপনি দোকানে দিয়ে আসতে  পারেন।

আপনি সকালে, পাখিদের কিছু খাবার দিতে পারেন। আপনি রাস্তার কুকুরকে দুটো বিস্কুট দিতে পারেন।

 রাস্তায় কোনো অন্ধ লোককে আপনি রাস্তা পার করে দিতে পারেন।

আপনি কোনো বৃদ্ধ/বৃদ্ধাকে একটু সময় দিন। তারা কথা বলতে চায়।  কিন্তু লোক পায়  না।

বাড়ির পাশের কারুর বাজার করে দিতে পারেন। না এতে সন্মান যায় না।

উপায়গুলো আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। 

আপনি কি একটু ভেবে দেখেছেন, আপনি মরলে কটা লোক আপনার কথা মনে রাখবে ? তের  দিন পরে কেউ আপনার কথা মনে রাখবে না। কারন কি ? আপনি কারুর জন্য কিছু করেন নি। আপনি শুধু নিজের কথা ভেবেছেন। যে কারণে আপনি একা হয়ে গেছেন। শেষ জীবনে এসেও আপনি আপনার সম্পত্তির বৃদ্ধি না হোক, অন্তত রক্ষার কথা ভাবছেনই । আপনি নিজের ছেলেমেয়ের কথা ভাবছেন। স্ত্রীর কথা ভাবছেন।  এটাই আপনার আতঙ্কের কারন, ভয়ের কারন। আপনি সব সময় ভীত হয়ে আছেন। আপনার একশোটি ছেলেমেয়ে থাকলেও আপনি একা হয়ে গেছেন। আপনি কর্তব্য করেছেন। দায়িত্ত্ব পালন করেছেন। আপনি নিজের ইচ্ছেয় কাজ করেছেন, আর ফল হয়েছে ভগবানের ইচ্ছেমতো। আপনি একটু ভগবানের ইচ্ছায় কাজ করে দেখুন, ফল হবে আপনার ইচ্ছে মতো।
গুরুদেব বলছেন : দাতা দান করে যে আনন্দ পায়, গ্রহীতা সে আনন্দ পায় না। কৃতজ্ঞতা গ্রহীতাকে সংকুচিত করে দেয়। বিশ্বামিত্র মুনি দীর্ঘদিন অনাহারে থেকে তপস্যা করে, ভগবানের কাছ থেকে এক বাটি প্রসাদ পেয়েছিলেন। ক্ষুদার্থ ব্রাহ্মণ-বেশি ইন্দ্রকে সেই প্রসাদ দান করেছিলেন। ইন্দ্রের খাওয়া শেষ  হয়ে গেলে, বিশ্বামিত্র নিজেকে গর্বিত মনে করেছিলেন, কিন্তু ইন্দ্র কাচুমাচু হয়ে গেছিলো।

ব্যাসদেব আমাদের জন্য বেদকে সংযোজন করেছিলেন, আমাদের উপকার করেছিলেন, তাই ব্যাসদেব মহান।

ভগবান গৌতম  বুদ্ধদেব  নিজে রাজার ছেলে, তার কোনো দুঃখ ছিল না।  কিন্তু আমাদের দুঃখ নিবারণের জন্য তপস্যায় রত হয়েছিলেন। নিদারুন শারীরিক কষ্ট  ভোগ করেছিলেন, শুধু আমাদের দুঃখের নিবৃত্তির জন্য।

আপনি একটা কথা শুনুন, জগতের সমস্ত জীব, ভগবানের সন্তান। পরম-পিতা পরম-মাতার সন্তান। তো ভগবানের সন্তানদের উপকার করলে ভগবান কি খুশী হবেন, না অখুশী হবেন  ?

তাই গুরুদেব বলছেন পরের উপকার করা মানে নিজের উপকার করা। আমাদের মতো সাধারণ লোক, অজ্ঞানীরা ভাবি পরোপকার মানে অন্যের উপকার। আর জ্ঞানীরা ভাবেন পরোপকার মানে শ্রেষ্ঠ উপকার, আর শ্রেষ্ঠ উপকার তো নিজের জন্যই করা উচিত। আর সেটাই করে থাকেন, মহৎ পুরুষেরা।

একটা কথা শুনুন, আপনি  যা দেবেন, তার হাজার গুন্ ভগবান আপনাকে দেবেন। আসলে সবই তো ভগবানের।  আপনি তো ওছি। দেখভালের দায়িত্ত্ব পেয়েছেন মাত্র। সবই  তাঁর।  এক সময় এগুলো অন্যের ছিলো, আজ আপনার হয়েছে, কাল অন্য কারুর হয়ে যাবে। এটাই জগতের নিয়ম। ধৃতরাষ্ট্রের ১০১ সন্তান থাকা সত্ত্বেও তিনি এক সময় একা হয়ে গেছিলেন। এমনকি আজ যাকে আপনি আপনার ছেলে/মেয়ে/নাতি/নাতনি  ভাবছেন, তারা সবাই   মাত্র কদিন আগে কার ছেলে, বা কার বাবা ছিল, তা কি আপনি জানেন ? আপনি মৃত্যুর পরে, কার ছেলে হবেন তা কি আপনি জানেন ? জানেন না। তাই এই সাময়িক সম্পর্কের মায়া ত্যাগ করুন। সবই তাঁর, তার জিনিষ তাকে দিয়ে আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। 

কে উপকার করতে পারে ?

আমরা সাধারণত বুঝি, যার আছে, সেই উপকার করতে পারে। গুরুদেব বলছেন, না উপকার করতে গেলেও জ্ঞান থাকা দরকার। কিসে কার উপকার হবে, আর তাতে তোমার কোনো অপকার হবে কি না সেটাও বোঝা দরকার। গুরুদেব বলছেন, যদি বিশিষ্ট জ্ঞান না থাকে, তবে হয়তো যা উপকার বলে বোধ হচ্ছে , অনেক স্থলে তা অপকার ভিন্ন আর কিছু নয়। গুরুদেব এই ব্যাপারে একটা উদাহরন দিয়ে বুঝিয়েছেন। আমি আমার জীবনের দুটো ঘটনার কথা বলি।

এক :  আমি তখন, সবে চাকরি পেয়েছি। ডেকার্স লেনে আমাদের অফিস। তখন, ঠাকুরনগর থেকে অফিসে যেতাম। আর যেহেতু একটু দূর থেকেই অফিসে যেতাম, একটু আগে আগেই অফিসে পৌঁছে  যেতাম। তো সেদিন দেখি, কার্জন পার্কের পাশের রাস্তায় একটু জটলা। জটলা দেখে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি,  ৪০/৪২ বৎসরের এক ভদ্রলোক স্কুটার এক্সিডেন্ট করেছে, একটা পা স্কুটারে চাপা পড়েছে। টানাটানি করছে, কিন্তু বের করতে পারছে না। সবাই পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসছে না। আমি তাড়াতাড়ি, ভিড় ঠেলে গিয়ে স্কুটারটা তুলে ধরলাম। ভদ্রলোক পা বার করলেন, কিন্তু দাঁড়াতে পারছেন না। আমি  ভদ্রালোককে ধরে ধরে, রাস্তার পাশে বসিয়ে দিলাম। পা-টা ছড়ে গেছে।  হসপিটালে নিয়ে গেলে ভালো হয়। কিন্তু ভদ্রলোক তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বললো। তার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে, অফিসে কোনো রকমে এটেন্ডেন্স দিয়ে, একটা ট্যাক্সি করে, তাকে বাড়ির দিকে নিয়ে চললাম। রাস্তায় তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন। ভয় পেয়ে গেলাম।  মরে যাবে না তো ? যাই হোক ভগবানের কৃপায় সে মরলো  না। ঠিকানা দেখে, বাড়ির কাছে গিয়ে, বাড়ির কড়া নাড়লাম। এক ভদ্র মহিলা বেরিয়ে এলো। তাকে ব্যাপারটা বলতেই, কেমন যেন একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো। এবং দরজা খোলা রেখে ভিতরে চলে গেল। আমি খানিক্ষন দাঁড়িয়ে, কারুর সহযোগীতা না পেয়ে, ভদ্রলোককে, কোনো রকমে টেনে হিচঁড়ে উপরে তুললাম। নিজের প্কেট থেকে ট্যাক্সির টাকা দিয়ে বাসে করে অফিসে ফিরলাম। অফিসে ফিরে আসতেই, সহকর্মীরা, আমাকে এই মারে কি সেই মারে। ব্যাটা পুলিশ-কেস  খেতে গেছো ? তোমার নতুন চাকরি, পুলিশ কেস হলে, চাকরিটা যাবে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পরোপকারের চেয়ে, চাকরিটা আমার দরকার বেশী।

আর একটা কাহিনী বলি :
দুই : চৈত্র মাসের এক পড়ন্ত দুপুরে, তখন প্রায় তিনটে/সাড়ে তিনটে বাজে। এক ভদ্রলোক কয়েকটা ধুপ কাঠির প্যাকেট নিয়ে আমাদের বাড়িতে এলো, এই বিশারপাড়াতেই। বললো, আমি ডানলপে কাজ করতাম। ডানলপ বন্ধ হয়ে গেছে, ছেলেমেয়ে নিয়ে বিপদে পড়েছি। যদি একটা ধুপ কাঠি কেনেন। বলতে বলতে সিঁড়িতে বসে পড়লেন। আমি একটু বিরক্ত হলাম।  এরা  সব ধান্ধাবাজ, মিথ্যে কথা বলে ব্যবসা করে।  কথা শুনে, আমার স্ত্রী বেরিয়ে এলো। ক্লান্ত-শ্রান্ত এক ভদ্রলোককে দেখে, স্ত্রীর কি মনে হলো, বললো, আপনি কিছু খাবেন ? আসলে মায়ের মন তো - এঁরা  আবার একটু নরম নরম হয়। ভদ্রলোক আমার স্ত্রীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। বললো, দুদিন কিছু খাইনি। শুনে আমারও খারাপ লাগলো। কি আছে, দেও  যদি খায়। আসলে আমরা মাত্র দুইজন - আর একটা বাচ্চা। বড় পরিবারে, খাবার পরেও কিছু থাকে, অন্তত ভাত-টা  থাকে। কিন্তু আমাদের তো তাও নেই। বাড়িতে দুধ, মুড়ি ছিল। আমার স্ত্রী সেই দুধ-মুড়ি আর একটু চিনি এনে দিলেন। ভদ্রলোক তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। আমার খুব ভালো লাগছিলো। কিন্তু একী ? ভদ্রলোক হড়হড় করে বমি করে দিলেন। আর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলাম। ভদ্রলোক মরে যাবে না তো ? একটা ভয়, আশঙ্কা আমাকে ঘিরে ধরলো। যাই হোক মাথায় জল-টল দিয়ে সুস্থ করলাম। কিন্তু একটা শিক্ষা হলো - কি দিয়ে কি হয় - বোঝা বড় দায়।

তাই গুরুদেব বলছেন, আপনি যাকে  উপকার ভাবছেন, সেটা অন্যের জন্য এমনকি আপনার জন্যও ভালো নাও হতে পারে। তাই গুরুদেব বলছেন, উপকার করতে চাওয়া ব্যক্তির পক্ষে যেমন দয়া, ন্যায়পরতা,দরকার,তেমনি স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রেম বিসর্জন আবশ্যক আর সবশেষে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে  জ্ঞানবত্তা  ।

পরোপকার করার সময় কয়েকটা নিয়ম মেনে চলুন :

১. নিজের যা  নেই, তা অন্য কাউকে দিতে যাবেন না। আমরা অনেক সময় নিজে  কোনো বিষয়ে সম্যকরূপে না  জেনে, অন্যকে জ্ঞান দেওয়া শুরু করি। আমরা ডাক্তার না হয়েও অনেক ডাক্তারি উপদেশ দেই। আমরা ফুটবল না খেলেও, পেলের খেলার ভুল ধরি, উপদেশ দেই , আমরা ক্রিকেট না খেলেও সৌরভকে উপদেশ দেয়। নিজে পড়াশুনা না করে, অন্যকে পড়াশুনার উপদেশ দেই। এমনি অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। নিজের আধ্যাত্মিক জ্ঞান না থাকলেও অন্যকে উপদেশ দেই। এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গাছে। এতে তার আরো খারাপ হতে পারে। সেটা আমরা বুঝি না।
তাই গুরুদেব বলছেন : অজ্ঞানীর মতো অন্যের উপকার করতে যেও না।


২.যার যেটা লাগবে তাকে তাই দিন। অর্থাৎস্থান, কাল,.পাত্র বুঝে দান করুন, কার কিসে উপকার হবে, সেটা বুঝে উপকার করার চেষ্টা করুন। আমি একটা বন্ধুকে দেখতাম মাঝে মধ্যে ও নিজের পয়সায় বই কিনে দান করতো। শুনলে মনে হবে কাজটা ভালো। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, ও আম্বেদকর বই, পেরিয়ার-এর বই, জহরলাল নেহরুর বই, ইত্যাদি বই ক্লাস ফাইভ থেকে এইটের ছেলেমেয়েদের দেন করতো। আমার মনে হয় না কেউ ওগুলো পড়তো।

পরোপকার করলে কি হয় অর্থাৎ পরোপকারের ফল কী  ? 

আপনি যেমন দেবেন, আপনি তেমন পাবেন। আপনি যেমন কর্ম করবেন, তেমনি ফল পাবেন। বাংলার দুটো সংগঠন সারা পৃথিবীতে খুব নাম করেছে। আর সে দুটো হচ্ছে ভারত সেবাশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশন।  এরা  আধ্যাত্মিক উন্নতির সাথে মানব সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছে।  অর্থাৎ পরোপকার কার্যে নিজেদের নিয়োগ করেছে। আর তাই এদের সদস্যদের আধ্যাত্মিক উন্নতিও সহজ সরল হয়েছে। এদের দেখলেও আপনার ভালো লাগবে। আসলে, পরোপকারের কাজে নিযুক্ত থাকলে, নিজের মন উৎফুল্ল থাকে। নিজের ভিতরে ভয়, ভীতি থাকে না। সদা প্রসন্ন মন, নির্মল আনন্দ উপভোগ করে।

গুরুদেব বলছেন, পরের উপকার করলে আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়। যিনি ন্য়ায়নিষ্ঠা, জীব-অনুকম্পা ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের দ্বারা ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাহচর্য্য অবলম্বন এবং স্বার্থপরতা সমূলে উৎপাটন করে, পরোপকার সাধনে প্রবৃত্ত হন তিনি যে শুধু ভৌতিক জগতে গন্যমান্য হন তাই নন তিনি অধ্যাত্মজগতেও ধর্মানুষ্ঠান পরায়ণ  বলে পরিগণিত হন। মহাত্মা  আর একটা মূল্যবান কথা বলছেন, তিনি অর্থাৎ পরোপকারী ব্যক্তি, সাধনার জগতে, সাধন দ্বারা কষ্টসাধ্য বিষয় অনায়াসে আয়ত্ত্ব করতে পারেন। গুরুদেব বলছেন, স্বার্থপর হয়ে বহু পরিশ্রম করে, যে ব্যক্তি ধন উপার্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই  তিনিই  স্বার্থ ত্যাগ করে, পরার্থে যখন নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন তার পদতলে কোটি কোটি ধন-রত্ন এসে জড়ো  হতে থাকে।  স্বার্থ ত্যাগ-ই  মানুষের একটার মধুময় বন্ধনের আস্বাদন দিতে পারে। পরার্থে নিয়োজিত প্রাণ-ই অমর হয়। শুনতে বেশ ভালো লাগে। জানিনা করা যায় কি না।

এবার পরোপকারের প্রতিদানের একটা ঘটনার কথা বলে শেষ করবো। আমি তখন দুর্গাপুরে থাকি।দুর্গাপুরে কলকাতা থেকে একটু বেশি শীত পড়ে। এক শীতের সন্ধ্যায়, প্রায় আটটা বাজে।  অফিস থেকে ফেরার পথে দুর্গাপুর স্টেশনের ফুলব্রিজ পার হচ্ছি। তো ব্রিজের উপরে দেখি একদম খালি গায় এক ভিখারী জড়সড় হয়ে বসে কাঁপছে। এ দৃশ্য আমার প্রায়ই চোখে পড়ে।  আমি দেখেও দেখি না। কিন্তু সেদিন কি হলো, আমার মায়া হলো, ভিখারীকে বললাম, চলো ওপারে কম্বলের দোকান আছে।  তোমার পছন্দ মতো একটা কম্বল কিনে দেব। ও আমার দিকে একবার তাকালো, তাকিয়ে মাথানেড়ে  জানালো সে যাবে না। আমার খারাপ লাগলো। একটু রাগও হলো। যাবে না দেখে আমি হাঁটা দিলাম। কিছুদূর গিয়ে আবার কি মনে হলো, ওর কাছে ফিরে  গিয়ে জিগ্যাসা করলাম, কম্বল কিনে দিলে গায়  দেবে তো ? তো আবার মাথা নাড়লো। অর্থাৎ হ্যাঁ গায়  দেবে। তো আমি গিয়ে একটা কম্বল কিনে দিলাম।  কম্বলটা পেয়ে খুব খুশী। নেড়েচেড়ে দেখার পরে , অতি কষ্টে কম্বলটা খুলে গায় দিলো, আর আমি তখনই বুঝলাম, ওর নাড়াচড়ার  শক্তি নেই।  ও আসলে পঙ্গু। আমার নিজেকে অপরাধী লাগলো, আবার একটা ভালো লাগা ভিতরে ভিতরে কাজ করছে। কম্বলটা দিয়ে আমি আবার ফিরছি ঘরের দিকে। ঠিক সেই সময় আমার মোবাইল বেজে উঠলো - আমার স্ত্রী টেলিফোন করেছেন ।  বলছেন
"জান মা আজকে তোমার জন্য একটা সুন্দর কম্বল কিনে দিয়েছে " । ঘটনাটা কাকতালীয়। কিন্তু আমার ভিতরে তখন এক সত্যানুভূতি হলো। ঈশ্বর তুমি দেখছো ?

সমাপ্ত  
    
         

        

  

         

          























           

Thursday, 6 December 2018

সত্যধর্ম ও "প্রণব - মন্ত্র"




সত্যধর্ম ও "প্রণব-মন্ত্র"

প্রণব মন্ত্র জানেনা এমন কেউ আছে কিনা সন্দেহ। আমাদের অজ্ঞাতসারেই আমরা জন্ম থেকেই  প্রণব মন্ত্র উচ্চারণ করি। প্রণব কথাটার মানে প্রতিনিয়ত নতুন। কথিত আছে ব্রহ্মা সৃষ্টির প্রারম্ভে এই প্রণব মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। আর এই প্রণব থেকেই সমস্ত সৃষ্টি। অতএব ব্রহ্মা যদি আমাদের পিতা হন তবে প্রণব আমাদের আদি মাতা। এই প্রণবের গর্ভেই আমাদের সবার জন্ম।  

সত্যধর্মেও প্রণব মন্ত্রের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক। গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্তের মতে আমাদের সবার বীজ মন্ত্র  প্রণবপুত হওয়া জরুরী। নতুবা বীজ মন্ত্রের শক্তি অপ্রকাশিত থাকে। 

এখন কথা হচ্ছে এই প্রণব নিয়ে আলোচনা কেন ? আমি এতদিন জানতাম প্রণব হচ্ছে 
"ওম ". এবং এটাকে ভাঙলে দাঁড়ায় অ-উ-ম।  ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর  অর্থাৎ সৃষ্টি, স্থিতি, লয় এর কর্তা। বা সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ এই তিন গুনের প্রতীক হচ্ছে "ওম"। কিন্তু সত্যধর্মের  যে কোনো অনুষ্ঠানে যাই না কেন, সেখানে দেখতে পাই "ওম" কথাটার বানান লেখা আছে "ওঁং". এর কারন কী  ? এই জিজ্ঞাসা থেকেই  এই আলোচনা।

মহাত্মা গুরুনাথ কথিত প্রণব ব্যাখ্যায় যাবার আগে আমরা ছান্দোগ্য উপনিষদের থেকে জেনে নেবো সেখানে কি বলা হয়েছে।   

ওম-ইত্যে-তদ্-অক্ষরম-উদগীথম-উপাসিত : অর্থাৎ  উদ্গীথ  শব্দ বাচ্য "ওম" এই অক্ষরকে উপাসনা করবে। 

ওম-ইতি  হ্যূদ্-গায়তি : ওম দিয়েই উদ্গীথ গান করা হয়। (উদ্গাতার গেয় অংশই  উদ্গীথ।)

বাক্ ও প্রাণ যখন মিলিত হয় তখন উদ্গীথ জন্ম নেয়।  এই উদ্গীথ - এর বর্ণাত্মক অক্ষরই ওম বা ওঁ। 

"ওম" সম্মতিসূচক শব্দ। ওম অর্থাৎ হ্যাঁ।
আচার্য্য চানক্য বলছেন, বেদে "ওম" কে পরব্রহ্ম বলে স্বীকার করা হয়েছে। এই "ওম" শব্দের সঠিক প্রয়োগে, ও জ্ঞান অর্জনের দ্বারা, স্বর্গলোক এমনকি এই পার্থিব জগতের সমস্ত কিছুই লাভ করা যায়। 

তান্ত্রিক সন্ধ্যা পদ্ধতির এক জায়গায় পড়ছিলাম স্ত্রী ও শূদ্রদের ওঁ বা ওম  উচ্চারন করার অধিকার নেই। তারা বলবে "ঔং"অর্থাৎ দীর্ঘ প্রণব। যজুর্বেদীয় তর্পন পদ্ধতিতেও  বলা আছে, শূদ্রগন "ওঁ" না বলে "নমঃ" বলবে। 

এইবার মহাত্মা গুরুনাথের কথায় যাবো। আমরা জানি অ, উ, ম - এই তিনটি বর্ণ নিয়ে ওম বা ওঁ কিন্তু গুরুদেব বললেন, অ-আ-উ-ম্ এই চারটি বর্ণ নিয়ে প্রণব গঠিত। এবং প্রণব চার রকম -ওম , ওঁ, ওং, ওঁং। 

আমরা জানতাম, অ-উ-ম।  ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর  অর্থাৎ সৃষ্টি, স্থিতি, লয়।  অর্থাৎ "অ " হচ্ছে ব্রহ্মা বা সৃষ্টিকর্তা, "উ" হচ্ছে বিষ্ণু অর্থাৎ পালনকর্তা এবং "ম" অর্থাৎ মহেশ্বের বা মহাদেব অর্থাৎ লয় কর্তা ।
 গুরুদেব বললেন : অ-কার হচ্ছে পালন কর্তা ,  আ-কার হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা অর্থাৎ ব্রহ্ম, উ কারে লয় কর্তা অর্থাৎ তমোগুণাত্মক ব্রহ্ম এবং ম বা ং (অনুস্বার) শব্দে পরব্রহ্ম অর্থাৎ গুণাতীত ব্রহ্ম। আর চন্দ্রবিন্দু হচ্ছে স্বরের অনুনাসিকত্ব  জ্ঞাপক।
এইখানে একটা কথা আমি বলি। প্রণব অর্থাৎ ওম, বা ওং বা ওঁ। একটা জিনিষ খেয়াল করুন, ও এর সঙ্গে ম বা ং বা ঁ যোগ করা আছে -। "ম" অর্থাৎ মহেশ্বর বা গুরুদেবের কথায় পরব্রহ্ম বা গুনাতীত ব্রহ্ম . কিন্তু,এই অনুস্বার বা চন্দ্রবিন্দু এর অর্থ কি ? বীজ মন্ত্রের  অর্থ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি ঁ (চন্দ্রবিন্দু ) হচ্ছে দুঃখ হরাত্মক বাচক। আর ং ( অনুস্বর ) হচ্ছে সুখপ্রদ ও দুঃখনাশন। কথাটা মোটামুটি একই।     

গুরুদেব আবার  বলছেন   ওম , ওঁ, ওং, ওঁং - এই চারটিই প্রণব বাচক। কিন্তু ওঁং এর ব্যবহার অর্থাৎ সত্যধর্ম যে বানানে প্রণব ব্যবহার করে তা অন্য কোথাও প্রায় নেই বললেই চলে।  

প্রথম "ওম" প্রনবটি তমোগুণের প্রতিপাদক, তাই জ্ঞানীরা ব্যবহার করেন না। গুরুনাথ বলছেন বিড়াল-রা যখন পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ বশতঃ আক্রমণে উদ্দত হয় - তখন অবিকল এই শব্দ বা প্রণব উচ্চারণ করে। 

দ্বিতীয় প্রণব অর্থাৎ ওঁ নৈসর্গিক ঘটনায়  শোনা যায়।  বহু শাস্ত্রে, এই প্রণবের ব্যবহার পাওয়া যায়। 

তৃতীয় প্রণব অর্থাৎ ওং কার ত্রিদেবাত্মক অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের প্রতীক।  অনেকেই এটির ব্যবহার করেছেন। মনু এই ওং -এর উল্লেখ করেছেন।  

চতুর্থ প্রণব অর্থাৎ   ওঁং  এর কথা প্রায় শোনা যায় না। তার কারন হচ্ছে - যাদের সগুন সাধনা সমাপ্ত না হয়েছে, তাদের পক্ষে এর ব্যবহার শক্তির অধিক কাজ বলে নির্দিষ্ট হয়। যাদের ভিতর থেকে জাতিভেদ জ্ঞান দূর হয় নাই, নির্গুণ সাধনার যোগ্য হন নাই,  তাদের পক্ষে এই চতুর্থ প্রণব ব্যবহার করা উচিত  নয়। সত্যধর্মে জাতিভেদ নেই, সগুন অর্থাৎ মূর্তি পূজার ব্যবস্থা নেই।  তাই সত্যধর্মে এই ওঁং ব্যবহার অনুমিত।  এবং এখানেই সত্যধর্ম ও অন্য ধর্মের মধ্যে পার্থক্য।

সত্যধর্মের  "ওঁং" বানানের প্রতিধ্বনি পাই শিব পূরণে। সেখানে ভগবান শিব, ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে বলছেন : আমার পাঁচটা মুখ। আর তা হচ্ছে সৃষ্টি, পালন, সংহার, তিরোভাব এবং অনুগ্রহ। সৃষ্টি ভূমিতে, স্থিতি জলে,সংহার অগ্নিতে, তিরোভাব বায়ুতে,অনুগ্রহ আকাশে স্থিত। পৃথিবী থেকে সৃষ্টি, জল থেকে বৃদ্ধি, অগ্নিতে সংহার, বায়ুতে স্থানান্তর আর আকাশ সকলকে অনুগ্রহিত করে। সর্বপ্রথম আমার মুখ থেকে ওঁকার উদ্গারিত হয়। উত্তরদিকের মুখ থেকে অকার, পশ্চিম মুখ থেকে উকার, দক্ষিণ মুখ থেকে মকার, পূর্ব মুখ থেকে বিন্দু (ঁ) মধ্যের  মুখ থেকে নাদ (ং) উচ্চারিত হয়েছে।  এইভাবে পাঁচ অবয়ব দ্বারা "ওঁং"কার বিস্তারিত হয়েছে।  

পরিশেষে গুরুদেব বলছেন : প্রণব আসলে ত্রিবর্ণাত্মক। আ বর্ণটি  প্রথমটির অর্থাৎ অ এর উচ্চারণ ভেদ মাত্র।

প্রণবকে ত্রিবর্ণাত্মক, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ, তম গুনের প্রতীক বলা যেতে পারে।  আবার পঞ্চবর্নাত্বক  অর্থাৎ অ-আ-উ-ঊ-ম  অর্থাৎ পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, 
ব্যোম )-এর  প্রতীক বলা যেতে পারে।

 আবার একাক্ষর বলা যেতে পারে।  অর্থাৎ অনুস্বার, চন্দ্রবিন্দু  এগুলোকে বর্ণ থেকে বাদ  দিয়ে  এক অক্ষর বলা যেতে পারে। গুরুদেব বলছেন স্বরই পূর্ণ বর্ণ। কেবল স্বরেই পূর্ণমাত্রা আছে। ব্যঞ্জন  পূর্ণ বর্ণ নহে।  স্বর, স্বয়ং উচ্চারিত হতে পারে। কিন্তু ব্যঞ্জন, অন্যকে আশ্রয় করে উচ্চারিত হয়। সুতরং ও এবং ম্ এই দুটিতে মিলিত হয়ে যে ওম বা ওং হয়েছে, এঁকে এক বর্ণ বা এক অক্ষর বলা যেতে পারে। অতএব ব্যঞ্জন ও একটি স্বর একত্র থাকলে, এই দুটিকে একটি বর্ণ বলা হয়। 

এর পরে গুরুদেব আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন। স্রষ্টা-সৃষ্টি-সৃষ্ট  এ তিনই এক। কিন্তু এ সব কথা যতক্ষন সাধকের  ব্রহ্মজ্ঞান না জন্মায় অর্থাৎ এক ব্রহ্মর জ্ঞান না জন্মায় ততক্ষন অনুধাবন করা যায় না। এইজন্য, যেমন সাধক, সে অনুযায়ী সে  বোঝে বা  তাকে সেইভাবে বোঝানো হয়। অর্থাৎ প্রণব এক-অক্ষর, আবার দুই-তিন-চার-পাঁচ অক্ষর বলে বর্ণনা করা হয়। 

প্রণব অসীম শক্তির আধার। এই শক্তি অজ্ঞানীর কাছে সুপ্ত।  জ্ঞানীর কাছে উদ্ভাসিত। এই প্রসঙ্গে একটা প্রচলিত  গল্প বলি।

একজন গৃহী পুরুষ, সংসারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে, এক আশ্রমে গিয়ে উপস্থিত হন।  সেখানে গুরুদেবকে পেয়ে, তার কাছে আবদার করতে থাকেন, আমি সাধনা করতে চাই। আমাকে একটা গুহ্য মন্ত্র  দিন। যা জপলে আমি মুক্তি লাভ করতে পারি। 

গুরুদেব বললেন : তুমি আগে অগ্নির সেবা করো। তারপরে তোমাকে মন্ত্র  দেব। গৃহী পুরুষ এক বছর  ধরে যজ্ঞের কাঠ সংগ্রহ করা, যজ্ঞ প্রজ্জ্বলিত করা, অগ্নিকুন্ড  পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজে লিপ্ত থাকলো। এর পর অধৈর্য্য হয়ে উঠলো। 

গুরুদেবকে গিয়ে বললেন  : একবছর হয়ে গেলো আমি এই আশ্রমে আছি। আপনার কথা অনুযায়ী অগ্নির সেবা করছি। আমাকে আপনি মন্ত্র দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু আপনি এখনো আমাকে কিছু বলছেন না। আমি আর কতদিন অপেক্ষা করবো ? আমার তো সাধন ভজন কিছুই হচ্ছে না।

 গুরুদেব বললেন : তোমার এখনো সময় হয় নি।

গৃহস্থ : একি বলছেন আপনি ? আমার পরে যারা এলো তারাও মন্ত্র  পেয়ে গেলো। আমার এখনো সময় হয় নি  ? বলে বিমর্ষ হয়ে, মুখ ফিরিয়ে হাটা  দিল। গুরুদেব পিছন থেকে ডাক দিলেন।  ঠিক আছে কাল ভোরে স্নান করে আমার  কাছে এসো। কালই তোমার দীক্ষা হবে। 

তো পরদিন তার ঘটা করে দীক্ষা হয়ে গেল। গুরুদেব বলে দিলেন : প্রতিদিন পাঁচ   বার    এই মন্ত্র জপ্ করবে।  অর্থাৎ ভোরবেলা  -সকালবেলা  - দুপুরবেলা - সন্ধ্যাবেলা -এবং রাত্রি দ্বিপ্রহর কালে  এই পাঁচ প্রহরে পাঁচ ঘন্টা জপ্ করবে। গৃহস্থের তো খুব আনন্দ হল। গুহ্য মন্ত্র  পেয়ে গেছে। 

এখন হলো কি, মন্ত্র  জপার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা  ছিল।  সেখানে গিয়ে সবাই জপ্ করতো।  গৃহস্থও সেখানে গিয়ে জপ্ শুরু করলো। 

এখন, ও যেই জপ্ শুরু করলো তখন শোনে একই ধ্বনি বাইরের থেকে ভেসে আসছে। ভাবলো গুরুদেবের দেওয়া মন্ত্রতো,  নিশ্চই ওরই  বলা মন্ত্র প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে।

প্রতিদিন একই জিনিস হওয়াতে ওর সন্দেহ হলো। আসলে মন্ত্রে ওর মন ছিলো না। ও চাইছিল কিছু অলৌকিক ঘটনা।  কিন্তু মনতো  সন্দেহে ভরা। আসন থেকে উঠে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো। কোথাথেকে শব্দ আসছে ? আর দেখতে পেলো সব শিষ্য ওই একই মন্ত্র  জপ্ করছে। অর্থাৎ গুরুদেব সবাইকে ওই একই মন্ত্র দান করছেন  ?  কিন্তু সবাইকে আলাদা করে।  যাতে একেরটা অন্য কেউ জানতে না পারে। এবং সেটাও সবার পরিচিত কথা আর তা হচ্ছে "ওম" .

রাগে গড়গড় করতে করতে ও গুরুদেবের কাছে গেলো।  বিস্তারিত বললো। এবং এও বললো - একেতো আমার জানা মন্ত্র আমার কানে কানে বলেছেন। মন্ত্র  সব সময় গোপন হওয়া উচিত।   তবু ভেবেছিলাম অন্যরা কেউ এটা জানে না। কিন্তু দেখছি আপনি একই মন্ত্র  সবাইকে বলছেন - আর তাও একটা জানা শব্দ।  এতে কি হবে ? গুরুদেব বললেন : তুমি কাল সকালে এসো। গৃহস্থ বিমর্ষ হয়ে ফিরে গেলো। ভাবলো আজই আশ্রম ত্যাগ করবে।    কিন্তু ভাবলো : গুরুদেবের এতো শিষ্য।  সবাই তাকে এত শ্রদ্ধা করে, নিশ্চয়ই কিছু কারন আছে।  ঠিক আছে এতো দিন তো গেল আরতো একটা দিন।  দেখা যাক।

পরদিন সকালে গুরুদেব একটা পাথরের টুকরো, যা আসলে মূল্যবান রত্ন, গৃহস্থকে দিয়ে বললো, বাজারে যাও এই পাথরটার মূল্য জেনে  আসো। কিন্তু খবরদার  পাথরটি বিক্রি করে এসো না। শুধু মূল্য যাচাই করে এসো।

গৃহস্থ পাথরটা নিয়ে প্রথমে সবজি ওয়ালার কাছে গেলো। ও তো প্রথমে কোনো মূল্যই দিতে চাইলো না। অনেক পীড়াপীড়িতে পাথরের ওজনের সবজি দিতে রাজি হলো। 

এর পরে গেলো এক কুমোরের কাছে।  কুমোর পাথরের পরিবর্তে  কিছুই দিতে চাইলো না। এটা যেহেতু জল দিয়ে গলানো যাবে না তাই এটা তার কোনো কাজে লাগবে না। 

এর পরে সে গেলো এক জহুরির কাছে। জহুরি এটা দেখে অবাক। বলে এটা আপনি কোথায় পেয়েছেন? এ জিনিস হয় চোর, বা অতি ধনী, বা সম্রাটদের কাছে থাকে। আপনি কোথায় পেলেন এটা ? গৃহস্থ, গুরুদেবের কথা বললো। তা শুনে জহুরি বললো - কোনো সম্রাট নিশ্চয়ই আপনার গুরুদেবকে এটা দান করেছেন। এটার মূল্য  দেবার ক্ষমতা আমার নেই।  আপনি কোনো বড়ো দোকানে যান। 

গৃহস্থের এবার অবাক হবার পালা। গুরুদেবের কাছে এই অমূল্য সম্পদ অথচ অবলীলায় আমাকে বিশ্বাস করে দিয়ে দিয়েছেন। গুরুদেবের কাছে আরো বড়ো সম্পদ নিশ্চই আছে। এবং এটাও বুঝলেন গুরুদেব যে মন্ত্র  তাকে দিয়েছেন তার মূল্য নিশ্চই আছে । যা আমি বুঝতে পারিনি।  

ফিরে এসে গুরুদেবের পায়ে পড়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। গুরুদেব বললেন : আজ তুমি যোগ্য হলে, আজ তোমার সত্যিকারের দীক্ষা হলো। যাও  অবিরত জপে মত্ত হও।

"ওম" বা প্রণবের মাহাত্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। অবিরত জপ্-ই এর উত্তর দিতে পারে।

পতঞ্জলি প্রণবের সন্মন্ধে বলছেন :

 ২৫ - তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞ বীজম। 

সেখানে সর্বজ্ঞ বীজ সদা সর্বদা বিরাজমান। 

২৬ - পূর্বেষামপি  গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ। 
তিনি পূর্ব  পূর্ব গুরুদেরও  গুরু, কারন কাল দিয়ে তাকে ছেদন করা যায় না। 

২৭ - তস্য বাচকঃ প্রণবঃ। 

সেই বাচক অর্থাৎ শব্দই প্রণব বা ওঁ-কার। 

২৮ - তৎ জপ তদ্ অর্থ ভাবনম্। 

তৎ অর্থাৎ প্রণব বা ওঁ জপ করো, এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ ভাবো।  তারই জপ্ তারই অর্থ ভাবনা।

২৯ - তৎ প্রত্যেক চেতন অধিগমঃ অপি অন্তরায় অভাবশ্চ।

তৎ অর্থাৎ এই ভাবে জপ্ করলে প্রত্যেক চেতনে অধিগমন হয় অর্থাৎ সমস্ত চেতনার  জ্ঞান হয়, এবং সমস্ত অন্তরায় দূর হয় বা অন্তরায়ের অভাব হয়।
প্রণব সন্মন্ধে শব্দের বিরাম দেব। শেষ করার আগে শুধু একটা কথা বলবো : 
গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত যে ভাবে প্রণবের কথা বললেন, তাতে গুরুদেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো। 

মহাত্মা গুরুনাথের চরণে প্রণাম করি। 

সমাপ্ত 

          

   
  

   
  




  


  









   

Monday, 26 November 2018

চার্বাক ও নারদের আখ্যান

                                                                                                             
                                                                                                                      
চার্বাক ও নারদের  আখ্যান

আজ আপনাদের একটা আজগুবি গল্পো শোনাবো। আপনারা সবাই ঋষি চার্বাকের নাম নিশ্চই শুনেছেন। শুধু তাই নয় তার বিখ্যাত উক্তি : ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ, আপনারা সবাই শুনেছেন। আজ সেই ঋষি চার্বাক ও ব্রহ্মাপুত্র নারদের সাক্ষাতের কাহিনী বলবো। যা আপনি কখনো শোনেননি .......
কলিকালে দেবতাদের  খাবারের খুব আকাল পড়েছে। জাগযজ্ঞ নেই বললেই চলে। এখন আর কেউ খাবার আগে দেবতাদের উদ্দেশে একমুঠো অন্ন তুলে দেয় না। শুলেই নরকের ঘন্টাধ্বনি শুনতে পান দেবরাজ ইন্দ্র। অসুরেরা পাতালে  নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।  মর্তের  লোকেরা অর্থাৎ মৃত্যুলোকেও মানুষেরা  নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের চোখে ঘুম নেই। উর্বশীর নাচ, রম্ভার নাচ আর ভালো লাগে না তার। সোমরস কেমন যেন বিস্বাদ  লাগে। কোথায় যেন এক বিপদের ঘন্টাধনি শুনতে পাচ্ছেন দেবরাজ ইন্দ্র।  মনে মনে ভাবছেন, এর আগে তো এমনতরো হয় নি। কতো গর্হিত কাজ করেছি, কিন্তু এমনতরো কখনো হয়নি।  ঋষি গৌতমের স্ত্রী অহল্যাকে একবার   সয্যাসঙ্গিনী করেছিলাম, ঋষি গৌতম আমাকে শাপ দিয়েছিলো।  আমার সমস্ত শরীর সহস্রযোনীর ক্ষতে পূর্ন হয়ে গিয়েছিলো । সেসবও  এককালে  ভালো হয়ে গেছে, অশ্বিনী কুমারদ্বয়ের  চিকিৎসায়। কিন্তু এখন কি হলো ?
দেবরাজ ইন্দ্রের এখন এক অদ্ভুত অসুখ, এক আশঙ্কা, এক ভীতি গ্রাস করেছে। এই অসময়ে,  তিনি সবজান্তা নারদকে, সর্বত্রগামী নারদকে শরণ  করলেন। মহামুনি নারদ এলে, তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বলতো আমার কেন এমন লাগছে ? তুমি একটু মর্ত থেকে খবর নিয়ে এস তো। সেখানে সব ঠিক ঠাক আছে কি না। ব্রাহ্মণরা সব সুরক্ষিত আছে কি না।  ধর্ম পালন করছে কি না সব। জাগযজ্ঞ সব ঠিক ঠাক মতো হচ্ছে কি না।   আমার কেন এত উদ্বিগ্ন লাগছে ? তুমি একটু মর্তে গিয়ে দেখতো,  আমাদের এজেন্টরা অর্থাৎ ব্রাহ্মণরা, ঋষিরা, মুনিরা সব ঠিকঠিক মতো কাজ করছে কি না।
নারদ এলেন মর্তে। এসে এক অদ্ভুত ঋষির দর্শন পেলেন। তিনি হচ্ছেন ঋষি চার্বাক। বেশ জাঁকিয়ে আশ্রম খুলে বসেছেন। হাজার হাজার গরু তার আশ্রমে। প্রচন্ড পরিশ্রমী। বুদ্ধিমান। আত্মনির্ভর। ঈশ্বরের প্রতি তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাসও  নেই, আবার অবিশ্বাসও নেই। ঈশ্বর নিয়ে তার না আছে চিন্তা না আছে অনুষ্ঠান। মিষ্টভাষী, অতিথি পরায়ন। সত্যভাষী। ভয়ভীতি বলে কিছু নেই। নীরবে কর্মই যার ধর্ম। নারদ খবর নিয়ে জানলেন, এঁকে  কেউ বলেন, বৃহস্পতি, কেউ বলে চার্বাক।
নারদ ভাবলেন, চার্বাক শব্দের অর্থ মিষ্টভাষী।  আর একটা অর্থ হচ্ছে চারু-বাক অর্থাৎ সত্যভাষী। যার কাছে ঈশ্বর পৌঁছয়নি, তারাই চার্বাক। যার কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা  অনস্তিত্ত্ব, বলে  কিছুই   নেই সে-ই চার্বাক। এঁরা অর্থাৎ চার্বাকপন্থীরা, পুরুষাকারে বিশ্বাসী। ঈশ্বর বলে কিছু আছে, তা তারা মানেন না, আবার অস্বীকারও করেন না । এরা  না আস্তিক, না নাস্তিক। এরা  ঈশ্বর সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, নির্লিপ্ত ।
নারদ তো সর্বজ্ঞ, চোখ বুজে নারদ চার্বাকের সৃষ্টি কেমন করে হলো, সেটা  দেখতে লাগলেন। এবং দেখলেন,  বার্ধ্ক্যে প্রজাপতি ব্রহ্মা রিপুগ্রস্থ হয়ে দুঃখের দেবী শোচনাকে কামনা করেছিলেন। শোচনা ব্রহ্মাকে শুধু প্রত্যাখ্যানই  করেন নি, তিরস্কার করেছিলেন এই বলে যে, তুমি একটা বিকৃতমনা ব্যভিচারী। এই ভর্ৎসনা শুনে প্রজাপতি ব্রহ্মা দুঃখের দেবী, শোচনাকে  অভিশাপ দিয়েছিলো এই বলে যে "দূর হ স্বর্গ থেকে"। তো শোচনা শাপগ্রস্থ হয়ে পৃথিবীতে অর্থাৎ মৃত্যুপুরীতে চলে আসে। দুঃখ দিয়ে যার জীবন গড়া। দুঃখ যার জীবন সঙ্গী তাদের আমরা বলি শুদ্র। সেবাই যার ধর্ম্ম সেই শুদ্র ।  সব ধৰ্ম থেকে বিতাড়িত হয়ে যেখানে  আশ্রয় হয় সবার, সেটাই শুদ্রঘর। সেই  শূদ্র ঘরে জন্ম নেন শোচনা । তার স্বামীর নাম ছিল পুরুষাকার। এই শোচনার পুত্রের নাম চার্বাক, কেউ বলেন বৃহস্পতি, কেউ বলেন শূদ্র চার্বাক।
নারদ ধীর পায়ে, চার্বাকের আশ্রমে প্রবেশ করলো। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গাভী। অসংখ্য শিষ্য-সামন্ত, সন্তান-সন্ততি।  জমজমাট  সংসার। কিন্তু সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। কে এলো, কে গেল তার প্রতি তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। চার্বাক তখন,গরুর খাবার দিচ্ছেন। নারদ গিয়ে চার্বাককে দর্শন দিলেন। চার্বাক নারদকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আপ্যায়ন  করলেন।  নারদ তো সব দেখে অবাক।  কি নেই, ঝলমলে আশ্রম। মাঠে সবজির বাগান, ফলের বাগান, আর সব আশ্রমীরা কর্মে ব্যস্ত। রূপবতী স্ত্রী এলো। কুণ্ঠাহীন সাবলীল গর্বিতা নারী। আপ্যায়ন করলো নারদকে । নারদতো খুব  খুশী।  কিন্তু একটা জিনিস তাকে অবাক করলো, আশ্রমের কোথাও কোনো  ঠাকুরের মূর্তি নেই।  পূজা অর্চনার কোনো ব্যবস্থা নেই। তো যাই হোক, নারদ দুপুরের খাবার খেলেন, বত্রিশ ব্যঞ্জনে তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। খাবার পরে তাকে পান খেতে দেওয়া হলো। এইবার বিশ্রাম নিতে বললেন, কিন্তু নারদের খুম এলো না। যেখানে নারায়ণের মূর্তি  নেই, সেখানে তার ভালো লাগে না । যেখানে ধর্ম নেই।  সেখানে নারদের ভালো লাগে না। তো ভাবলেন, এঁকে  একটু ধর্মজ্ঞান দেওয়া দরকার। সবই ঠিক আছে, কেবল এদের ঈশ্বর বিশ্বাস নেই।  এটা  একটু জাগানো দরকার। তো আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বললেন - ঈশ্বরের কৃপায় তোমার সব মঙ্গল হোক। এই কথা শুনে, চার্বাক আহত বাঘের মতো গর্জন করে উঠলো। আমি আপনার আশীর্বাদ চাই। আপনি আমার মঙ্গল কামনা করুন। আমি ঈশ্বরের কৃপা চাই না। এই জীবন আমার, এর রক্ষার দায়িত্ত্ব আমার, আমার মেধা, আমার পরিশ্রম আমাকে স্বছন্দ করেছে। এখানে ঈশ্বর নামক কল্পিত কারুর সহযোগিতা নেই। এই যা কিছু দেখছেন সবই আশ্রমীদের পরিশ্রমের ফল। এর মধ্যে কোনো ঈশ্বরের কৃপা নেই। আমার তথাকথিত ধর্ম আমাকে রক্ষা করে না। আমাকে রক্ষা করে, আমার কর্ম আমার জ্ঞান।এটাই আমার ধর্ম।  আমি ভিক্ষারী নোই। আবার ঈশ্বর কর্তৃক প্রতারিত একজন ব্যর্থ মানুষও নোই। যারা ঈশ্বর বিশ্বাস করে কর্মহীন হয়ে বসে থাকে। তারা নিজেকেই প্রতারণা করে। ঈশ্বরের কৃপাকে আমি উপেক্ষা করি। ঈশ্বরের দয়া আমার দরকার নেই। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন। তাতেই হবে। যদি তা না করতে চান, বা না করতে পারেন,  তবে আশীর্বাদের বিষয় ছাড়ুন। যা  নিজে পারেন তাই  করুন, আর এক জনের দোহাই দেবেন না। এই ঈশ্বরটা কে আপনার ? তাকে দেখতে  পারেন ? কোথায় থাকেন ? কি কাজ  তাঁর  ?
দুপুরের ভোজনে তৃপ্ত নারদ, প্রমাদ গুনলো, তার শরীর  কাঁপতে লাগলো। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললো : দেখো চার্বাক এই পৃথিবীটা তো তাঁরই  সৃষ্টি।  ঈশ্বরের সৃষ্টি। এই সমস্ত জীব জন্তু, গাছপালা সবই তার সৃষ্টি। এমনকী তোমাকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি না থাকলে এই জীবন কি করে এলো , কোত্থেকে এলো ?
চার্বাক বললো : দেখুন কারুর কৃপাতেই এই পৃথিবী সৃষ্টি হয় নি। এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে চারটি জড় পদার্থের সমাহারে।  অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এই চারটি জড় পদার্থের সমাহারে পৃথিবীর সৃষ্টি। এখানে তোমাদের ঈশ্বরের কোনো কেরামতি নেই। এই চারটি জিনিস বাদ  দিয়ে তোমাদের ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারে ? পারে না অতএব তোমার্  ওই আজগুবি ঈশ্বরের কথা রাখো। আর শোনো তোমরা বলো পাঁচ ভূত, আমি বলি চার ভূত কর্ম করে, আর এক ভূত খায়। তোমাদের ওই আকাশ ভূত খালি খায়। তোমরা আত্মা সম্পর্কে বলে থাকো " শস্ত্র দ্বারা ছেদন করা যায় না, অগ্নি একে  দহন  করতে পারে না, জল একে ভেজাতে পারে না, বায়ু একে শুকাতে পারে না। তো তোমার কাল্পনিক ঈশ্বর আকাশ ভূতেরও  উর্দ্ধে। শোনো তোমার শরীর, তোমাদের কথা অনুযায়ী এই শরীর পাঁচ ভূতের মিশ্রণ। আর তোমার আত্মা এই পাঁচ ভূতের ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে ধরাছোঁয়ার বাইরে, অর্থাৎ যাকে  আমি ধরতে পারি না, সে আমাকে কি করে ধরবে ? আমার উপকারও করতে পারবে না, অপকারও করতে পারবে না। তো তোমার আজগুবি কল্পনা ছেড়ে, কাজে মন দাও।   
নারদ এবার ভীত হলো, শঙ্কিত হলো।  সত্য যদি প্রচার হয়ে যায় তবে আমাদের দেবতাদের কি হবে ? কিন্তু নারদ পিছু হটার পাত্র নয়।  সে বললো ঠিক আছে, মানলাম জড় পদার্থের সমাহারে এই পৃথিবী, কিন্তু এখানে প্রাণ কি করে এলো ? ঈশ্বরই তো প্রাণ সৃষ্টি করেছেন। জড় পদার্থতো জীবনের জন্ম দিতে পারে না। জড় জগতে প্রাণের জন্ম দিয়েছেন ঈশ্বর।
চার্বাক এবার  সতর্ক। এ ব্যাটা ঈশ্বরের চর।  আমাকে ঈশ্বরজ্ঞান দিতে এসেছে।  দেখুন, আপনার মুখে পান। ঠোঁট আপনার লাল। আপনি পান খেছেন, অর্থাৎ পান,, খয়ের,  চুন, সুপুরি খেছেন। এর কোনোটাই লাল নয়। কিন্তু আপনার ঠোঁট লাল। কোত্থেকে এলো এই লাল ? আসলে পদার্থের গুন্ অর্থাৎ দুটি পদার্থের গুন্ নতুন গুনের সৃষ্টি করে। পান সুপুরি চুন, খয়ের গালে ফেলে যখন চিবোনো হয় তখন এই লাল রঙের সৃষ্টি হয়। যা আপনার সারা গালে,  ওষ্ঠকে রাঙিয়ে ফেলেছে। তেমনি মাটি জল, বায়ু, অগ্নি যে জড় পৃথিবীর জন্ম দিয়েছে সেই জড় পদার্থের সমাহারে নতুন একটা গুন্ জন্ম নিয়েছে, আর তা হলো জীবন। জড় পদার্থের প্রকৃতিই হচ্ছে মানুষের অজৈব শরীর।  সুতরাং এই পৃথিবী বা জীবন সৃষ্টিতে ঈশ্বরের কোনো ভূমিকা নেই।
দেবর্ষি নারদে সারা গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। মনে মনে ভাবছে। এই সব কথাতো ঈশ্বর সব শুনছেন। এখন নিশ্চয় কোনো অঘটন ঘটবে। আকাশ থেকে বজ্র নিক্ষিপ্ত হবে প্রবল আক্রোশে। এক্ষুনি প্রবল ঝড় ঝঞ্ঝা শুরু হবে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, কিছুই হলো না। ব্রহ্মাপুত্র নারদ বাকহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন অসহায় হয়ে।  পৃথিবীবাসী  এক প্রবল পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী, পুরুষ নির্বিবাদে কথাগুলো বলে গেল। হঠাৎ কোনো দৈবশক্তি তার মুখ চেপে ধরলো না। নারদের নিজেকে মনে হলো পরগাছা।
মানুষের বিশ্বাসের গভীরে, অজ্ঞানতার  অন্ধকারে, যে বীজ ব্রাহ্মণ ঋষিদের দ্বারা রোপন করা হয়েছিল, তা যেন ম্লান হয়ে গেল। স্বর্গ তো অন্তরীক্ষে। যেখানে দেবতারা থাকে, ঈশ্বর থাকে। সেখানে তো মাটি নেই। তাই সেখানে যা জন্মায় তার শিকড় গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। শুধু অন্ধ বিশ্বাসের ভিত্তিমূল কখনো দৃঢ় হতে পারে না। তাই ঈশ্বর উপরে উপরে থাকে, মানুষ যখন অসহায় হয় তখন ঈশ্বরকে ডাকে।  ভাবে ঈশ্বর তাকে উদ্ধার করবে।  কিন্তু কোনোদিন ঈশ্বর আসেও না।  আর মানুষের কষ্টের লাঘবও  হয় না। মানুষের উদ্ধারও হয় না।
মৃত সন্তানের প্রাণ ভিক্ষায় মাতা দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়।  ভগবানের কাছে যায়।মন্দিরে মন্দিরে মাথা ঠুকে ঠুকে রক্ত বের করে ফেলে।  আর ভগবান চাতুরীর আশ্রয় নেয়। বলে, যে বাড়িতে কেউ মারা যায় নি তার বাড়ি থেকে সরষে নিয়ে এস। প্রকৃতি প্রভাবশালী। তাকে ভগবানও  এড়িয়ে যেতে  পারে না। কর্মহীন জীবন হয় না। জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারে আমরা কর্মে লিপ্ত। স্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্ন আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
নারদ বলছেন : আচ্ছা চার্বাক তোমার কথা মেনে নিলাম। জড় পদার্থের প্রকৃতিই পৃথিবীতে জীবন উৎপন্ন করেছে। কিন্তু চৈতন্য কোথা পেল এই জীবন। কে তাকে চেতনা দিল ?  চার্বাক তুমি  কিছু গুহ্য কথা শোনো। শরীরের বিনাশ আছে। তোমার ভিতরে যিনি শরীরী অর্থাৎ আত্মা তার মৃত্যু নেই। আত্মা কখনো জন্মায় না।  আত্মা কখনো মৃত্যু বরণ  করে না। আত্মা অনিশ্বর। আত্মা জন্ম-মৃত্যু রোহিত। চার্বাক তুমি সেই অমর আত্মাকে জানো। আত্মা কেবল এক শরীর ছেড়ে অন্য শরীরে প্রবেশ করে মাত্র। মানুষ যেমন তার পুরানো বস্ত্র পরিবর্তন করে ,তেমনি আত্মা মৃত শরীর ছেড়ে নতুন শরীরে প্রবেশ করে।
পরম-আত্মার অংশ এই জীবাত্মা । মানুষের শরীর তো জড় পদার্থ, এই শরীরের মধ্যে যতক্ষন পরম-আত্মার অংশ জীবাত্মা বর্তমান আছে, ততক্ষনই মানুষকে জীবিত বলা হয়। পরমাত্মা ভিন্ন সবই জড়প্রকৃতি।
চার্বাক এবার দৃঢ় ভাবে জবাব দিলো। তোমার  এইসব সৃষ্টিছাড়া কথা রাখো তো । তুমি যাকে আত্মা বলছো, আমি তাকে বলি চেতনা। শুনে রাখো চেতনা কখনো এক শরীর  ছেড়ে অন্য শরীরে প্রবেশ করে না। চেতনা সবত্র বর্তমান। শরীর প্রাণক্রিয়ার সাহায্যে এই চেতনা গ্রহণ করে। প্রাণের সাহায্যে গ্রহণ করে, আবার অপানের  সাহায্যে বের করে দেয়।  এই প্রক্রিয়া আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্তে চলছে। এই ক্রিয়ার মুহূর্তের বিরামে আমরা মৃত বলে গণ্য হই। তোমরা যাকে পঞ্চইন্দ্রিয় বলো, আমরা তাকে বলি, শরীরের দ্বার। অর্থাৎ আমাদের শরীরে পাঁচটি দরজা আছে। চোখ, কান, নাক, জিব্বা, ত্বক। এগুলো সাহায্যে আমরা প্রতিনিয়ত বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। এই পাঁচটি দরজা দিয়ে আমাদের মস্তিস্ক বাইরের খবর সংগ্রহ করে। এগুলো আমাদের গ্রন্থিচক্রে আলোড়ন তোলে। এই আলোড়নকে বলে মনের ক্রিয়া ।এই ইন্দ্রিয় দ্বারা সংগৃহিত খাবারগুলোই মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে অনুভূতি। এই অনুভূতিই চেতনা।  এর সঙ্গে ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার যদি এই পাঁচ ইন্দ্রিয়, কাজ বন্ধ কর দেয় বা  একমাত্র নাসিকা অর্থাৎ প্রানের আগমন নির্গমন বন্ধ হয়ে যায়, তবে কোনো ঈশ্বরই  আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমার কোনো চেতনা থাকে না।
আর শোনো, আমি চোখ দিয়ে কখনো ঈশ্বর দেখিনি।  কান দিয়ে কখনো ঈশ্বরের কথা শুনিনি। আমার ত্বক তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। আমার স্বাদে অর্থাৎ জিব্বায় ঈশ্বর কখনো আসেনি। ইন্দ্রিয় বাহিত হয়ে ঈশ্বর কখনো আমার অনুভূতিতে আসেনি। তাই আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসও করিনা, অবিশ্বাসও করিনা। সে আছে কি নেই তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমরা কর্মে বিশ্বাস করি। কর্মই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ফুসফুস আমাদের প্রাণের আগমন নির্গমন করাচ্ছে।  তাই আমরা বেঁচে আছি। কর্মই আমাদের অন্ন যোগাচ্ছে। বুদ্ধিযোগে কর্ম করাতেই  আমাদের বিশ্বাস। তোমার ওই কাল্পনিক ঈশ্বর আমাদের কাছে নেই। তুমি বরং সব ছেড়ে কর্মে মনযোগ দাও।
নারদ এবার পালাতে পারলে বাঁচে। আবার মনে মনে ভাবছে, আমরা তো পরগাছা। মানুষের পরিশ্রমের অন্নে আমরা প্রতিপালিত। মানুষের শ্রমে অর্জিত, মানুষের দেওয়া নৈবেদ্যর অন্নে আমরা বেঁচে আছি। এখন মানুষ যদি চার্বাকের মত সবাই ঈশ্বর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আমাদের কি হবে ? এই চার্বাকদের মতো লোকেরা আমাদের অস্তিত্বকে বিলোপ করে দেবে।
এবার নারদ তার মোক্ষম দাওয়াই ছাড়লো।  দেখো চার্বাক, তুমি বলছো তোমার পঞ্চইন্দ্রিয় কখনো ঈশ্বরের খবর পায়নি  তাই তুমি তাকে বিশ্বাস করো না। কিন্তু  তুমি তোমার ঠাকুরদাকে দেখেছো ? চার্বাক বললো হ্যাঁ  দেখেছি। তোমার ঠাকুরদার বাবাকে দেখেছো ? না দেখিনি। আমার জন্মের আগে তিনি মারা গেছেন।  তুমি তোমার চোদ্দ পুরুষের নাম জান  নিশ্চয়।  কিন্তু তাদের তুমি  দেখোনি কোনোদিন।  কিন্তু তুমি নিশ্চই বিশ্বাস করো যে তারা ছিল।  এবং তোমার রক্তে তাদের ধারা বিদ্যমান। তাই যদি হয়, তবে শোনো, ঈশ্বরের প্রথম পুত্র মনু। এবং তারই বংশজাত আমরা সবাই। সুতরাং ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে তোমার কোনো উপায় নেই। এই কথা বলে নারদ মনে মনে হাসতে  লাগলো।
চার্বাক এবার দিশেহারা। কি জবাব দেবেন তা বুঝতে পারছেন না। ......নারদ মুচকি হাসছেন।
চার্বাক  খানিকটা দম নিয়ে বললেন, তোমাদের ঈশ্বর দেখতে কেমন ? আমার মতো ? আমার বাপ্ ঠাকুরদা কিন্তু আমার মতো ছিল। তাহলে ঈশ্বর কিন্তু আমার মতো হওয়া উচিত। অবশ্য তোমাদের এজেন্ট, ওই বাওনদের ঘরেঘরে মানুষের অবয়বে বস্তু দিয়ে তৈরী নানান মূর্তি দেখছি। আমার পূর্ব পুরুষরা অতীত। কেননা তাঁরা আর দেহে নেই। আমি যদি ঈশ্বরের বংশধর হই, তবে আমার সেই প্রথম পুরুষ অবশ্যই অতীত। আর যিনি অতীত, তাকে দিয়ে কোনো কাজ হয় না। তাই তোমার ঈশ্বরকেও আমার কোনো কাজে লাগবে না।
নারদ বললো : না না তা কেন হবে ? ঈশ্বর নিরাকার। তবে তোমার মতো হতেও পারেন। তিনি অব্যয়, অক্ষয়, অবিনাশী।
চার্বাক বললো : ও তাহলে তোমাদের ঈশ্বর অবিনাশী।  দেখো অবিনাশী পরমাত্মা কখনো কোনো সৃষ্টির কারন হতে পারে না। কারন হওয়ার জন্য তাকে সক্রিয় হতেই হয়। আর যা সক্রিয় তা কখনো অক্ষয়, অব্যয় হতে পারে না। যা সক্রিয় তা স্বরূপে ও স্বভাবে নিত্য পরিবর্তনশীল। তাই তুমি যাকে অবিনাশী, অব্যয়, অক্ষয় বলছো, তেমন কোনো কিছু আর যাই হোক সৃষ্টির কারন হতে পারে না।

চার্বাকের এই অমার্জিত যুক্তিতে নারদ বিস্ময়ে বাক রোহিত  হয়ে গেলো।

চার্বাক এবার প্রশ্ন করলো, তোমাদের ঈশ্বর কি বস্তু থেকে আলাদা, না বস্তুসাপেক্ষ ?
নারদ জবাব দিলো : দেখো ঈশ্বর নিরাকার, বস্তুনিরপেক্ষ।
চার্বাক : যা বর্তমান তা আমি স্বীকার করি, কেননা তা আমার কাজে লাগে।  যা অতীত তা আমার কোনো কাজে লাগে না, তাই তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। ঈশ্বর ছিল কি না, সেটা বড়ো  কথা না।  তিনি আছেন কি না সেটাই বড়ো  কথা। যদি বলো আছে, তবে অবশ্যই  সেটা বস্তুসাপেক্ষ হবে আমার ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য হবে। বস্তুহীন, নিরাকার শুন্যতাকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।  আর তাকে আমি স্বীকারও  করি না অস্বীকারও করি না । এই ব্যাপারে আমরা নিস্পৃহ, নিরপেক্ষ।

নারদ এবার বিমর্ষ হয়ে স্বর্গের দিকে ফিরতে লাগলো। পরগাছাদের কোনো রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ থাকে না। নিরাকার, অবলম্বনহীন নারদের যাত্রাপথে কোনো ছায়া পড়লো না।  জেগে রইলো, জীবজগৎ, পৃথিবী, আর মানুষের কোলাহল। চার্বাক আবার নিজের কাজে মন দিলো। গরুকে খাবার দিতে গেল।

সমাপ্ত