Saturday, 1 August 2026

সাধন-কথা

০১।০৮।২০২৬

সাধন-কথা - ১

তুঙ্কারের সাধনা  

প্রথমেই বলি, "তুঙ্কার" বলে কোনো শব্দ আমাদের বাংলা অভিধানে নেই।  

কিন্তু আমাদের শিবপুরাণের "উমা-সংহিতায়" ঠিক এই তুঙ্কারের সাধনার কথাই বলা হয়েছে। 
বাংলা অভিধানে অবশ্য তুঙ্কারের কাছাকাছি একটা শব্দ আছে, তা হচ্ছে "টুঙ্কার"। টুঙ্কার বা টঙ্কার কথাটার অর্থ হচ্ছে ধনুকের ছিলার শব্দ বা ধাতব বস্তুর সংঘাত জনিত ধ্বনি। 

"ত" আসলে হচ্ছে আমাদের বর্নমালার চতুর্থ বর্গের প্রথম বর্ণ। আর "ট" হচ্ছে তৃতীয় বর্গের প্রথম বর্ণ। এই "ট"  এবং "ত"এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে - একটি কোমল আরেকটি কঠিন - বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ট  বর্গের বর্নসমূহ কঠিনতা জ্ঞাপক এবং ত  বর্গের বর্ণ সমূহ  কোমলতা ব্যাঞ্জক। যেমন তল-তল, তর -তর ইত্যাদি কোমলতা ব্যাঞ্জক আবার তৃতীয় বর্গের সমস্ত বর্ণ কঠিনতার প্রকাশক।  যেমন ঠক-ঠক, টক-টক  শব্দ ব্যবহৃত হয় কঠিনতা বোঝানোর জন্য।

তো টুঙ্কার  কথাটার  অর্থ হচ্ছে  ধনুকের ছিলার শব্দ বা ধাতব বস্তুর সংঘাত জনিত ধ্বনি, যা আসলে কর্কশ।  কিন্তু তুঙ্কারের ধ্বনি যা আসলে  তুঙ্কারের  সাধনায় শ্রুতিগোচর হয়, কোমল ও মধুরতায় ভরপুর।  তাই শিবপুরান-ঋষি  এই বিশেষ ধ্বনিকে বলছেন "তুঙ্কার" . 

এই তুঙ্কারের সাধনার কথা লিপিবদ্ধ আছে, আমাদের শিব পূরাণের উমাসংহিতার  ২৬-তম  অধ্যায়ে। 

এখানে বলা হচ্ছে রাতে  যখন সকলে নিদ্রামগ্ন হয়ে থাকে, তখন যোগবত্তা পুরুষকে অন্ধকার ঘরে  সুখদায়ক আসনে  বসে এই আসনের অভ্যাস করতে হবে। তর্জনী আঙলি দুটোকে  দুই কানের ছিদ্রের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে আমাদের কর্ণকুহরে সমস্ত বাহ্য  ধ্বনির প্রবেশ রুদ্ধ করতে হবে। এই অবস্থায় অগ্নিপ্রেরিত শব্দ শুনতে পাওয়া যাবে। এই ক্রিয়া প্রতিদিন রাতে ৪৮ মিনিট পর্যন্ত করতে হবে । 

এখন কথা হচ্ছে এতে করে সাধকের কি প্রাপ্তি হবে।  শিবপুরাণের শিব বলছেন, এতে করে বাহ্যত সন্ধ্যার পরে করা আহার অল্প সময়ের মধ্যে হজম হয়ে যাবে। শারীরিক সমস্ত রোগাদির উপদ্রপ বিনাশপ্রাপ্ত হবে। এ হচ্ছে সেই যোগক্রিয়া যার সাহায্যে শব্দব্রহ্ম-এর সাক্ষাৎকার হবে। 

চলবে।..

02.08.2026
সাধন কথা -২
শিব পুরাণে  স্বয়ং শিব বলছেন, তুঙ্কার সাধনায়, সাধক সংসার-বন্ধন  থেকে মুক্ত হয়ে যান। এই শব্দব্রহ্ম শ্রবনে শরীর ও মনের কলুষতা দূর হয়ে যায়। এই ক্রিয়া প্রাণবায়ুর শক্তি বর্দ্ধক হয়ে থাকে। এ এক অদ্ভুত ধ্বনি, যা না ওঙ্কার, না মন্ত্র, না বীজ না অক্ষর। এটি উচ্চারণ না করেও শ্রুতিগোচর হয়, এমনকি চিন্তা না করেও, চিত্তে  এই ধ্বনি আন্দোলিত হয়ে থাকে।  

আমরা জানি, পঞ্চভূতের তৈরী এই শরীর। এই পঞ্চভূতের শরীরের উৎপত্তি হয়েছে ভূতেদের গুণাদি যুক্ত হয়ে। আবার একসময় এই পঞ্চভূতেই এই স্থূল শরীর  মিশে যাবে।  একটা কথা জানবেন, ভূৎসকল যখন নিজ নিজ গুন্ ত্যাগ করে, তখন এই শরীর  নষ্ট হয়ে যায়।  আবার যখন গুনগুলোকে গ্রহণ করে তখন তার তার প্রাদুর্ভাব হয়েছে, বলা হয়। এই গুণগুলো হচ্ছে, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ। পৃথিবীর পাঁচ, জলের চার, তেজের তিন, ও বায়ুর দুই আর আকাশের একটি মাত্র গুন্।  এরা সবাই যখন নিজ নিজ গুন্ ত্যাগ করে, তখন এই জগৎ অব্যক্ত হয়ে যায়। এখন কথা হচ্ছে তুঙ্কারের সাধনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায় ? আসলে তুঙ্কারের সাধনা হচ্ছে অনুচ্চারিত শব্দব্রহ্ম বা অনাহত নাদ।  

এই তুঙ্কারের সাধনার  সময় প্রথম দিকে স্বাসের দিকে মন দেবেন না। আবার প্রথম দিকে না হলেও, কয়েকমাস পর থেকে শ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন। ছয়মাস বা একবৎসর অভ্যাসের পরে  শ্বাসকে রুদ্ধ করে এই অনাহত ধ্বনি উপভোগ করতে থাকুন। প্রতিদিন ৪৫ মিনিট  থেকে এক ঘন্টা এই অভ্যাস চালিয়ে যাবেন। এই শ্বাস রুদ্ধ করলে, আপনার মাথা ঘুরতে পারে, শরীরে একটা অস্থিরতা আসতে  পারে, মেরুদণ্ডে ব্যাথা হতে পারে। তাই আমার কথায় আপনি এই কাজ করতে যাবেন না। নিজের শরীরের সাধ্য বুঝে, সাধনা করবেন। অতিরিক্ত আহার, নিদ্রা,  শারীরিক পরিশ্রম, ও আলস্য এই সাধনার অন্তরায়। মেরুদণ্ডের ব্যথায় মেরুদণ্ডে পাশাপাশি হাত দিয়ে আলতো  করে ঘষুন। অন্য ক্ষেত্রে কয়েকদিন বিশ্রাম করুন।  শরীর সুস্থ  বোধ করলে তবে আবার শুরু করুন। একটা জিনিস জানবেন, শব্দ নয় প্রকারের হয়ে থাকে।  কিন্তু এই তুঙ্কার কোনো শব্দ নয়। এই ধ্বনি অর্থহীন জগৎ পালক, যা জগতে সার্বত্র, সর্বদা ধ্বনিত হচ্ছে। এই ধ্বনির কোনো উৎপাদক নেই, আবার ধ্বনিই জগৎকে ধরে রেখেছে। 

যারা যোগসাধনার উচ্চকোটিতে পৌঁছতে চান, তাঁরা এটি আসন, প্রাণায়াম, ধারণা, প্রত্যাহার, ধ্যান, সমাধির সঙ্গে নিয়মিত অভ্যাস করতে পারেন। আবার নিজের জিহ্বা ভাঁজ করে  লাগাবার চেষ্টা করতে পারেন। এতে করে নিজ-জিহ্বা একসময় দীর্ঘ হয়ে গলার গোড়া পর্যন্ত চলে যাবে।  আর যখন জিহ্বা গলার গোড়া পর্যন্ত চলে যাবে তখন সুশীতল  সুধা-স্রাব  নির্গত হবে।  সেই সুধা পান করতে থাকুন। 

চলবে। ...

সাধন কথা - নতুন জীবন -০৩
আপনি যদি কিছু পেয়ে থাকেন, তবে জানবেন তবে তা হারাতেই হবে। আপনি যদি কিছু নিয়ে থাকেন, তবে জানবেন তা আপনাকে ফেরত দিতেই হবে। আপনি যদি শৈশব পেয়ে থাকেন, তবে তা আপনাকে হারাতে হবে, আপনি যদি যৌবন পেয়ে থাকেন, তবে জানবেন তা আপনাকে হারাতে হবে, আপনি যদি বার্ধক্য পেয়ে থাকেন তবে জানবেন, তা আপনাকে হারাতেই হবে।  এমনকি আপনি যদি জীবন পেয়ে থাকেন, তবে জানবেন তা আপনাকে হারাতে হবে। সব কিছুই কালের গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে।  শুধু একটা জিনিস থাকছে, আর সেটি হচ্ছে আপনি। আপনি আছেন, ছিলেন, থাকবেন।  শুধু আপনি যা পেয়েছেন, তা থাকবে না - তা সে এই দেহ হতে পারে, ধন-মান  হতে পারে।  সবই কালের স্রোতে ভেসে যাবে।  শুধু আপনি, হ্যাঁ শুধুই আপনি অবশ্যই থাকবেন। 

আসলে আমি নিরালম্ব।  না আমার কিছু ছিল, না আমার কিছু থাকবে। শুধু আমিই - আমার আমিত্ত্ব থাকবে। 

এখন কথা হচ্ছে এই যে আমার-আমার অর্থাৎ ধন -মান ,যৌবন, শৈশব, এসব কি ফিরে পাওয়া যায় ? যদি পাওয়া যায়, তবে তা কিভাবে ? যাকিছু আমার হয়েছিলো, স্ত্রী-পুত্র, পরিবার, ধন -দৌলত, শৈশব, যৌবন, গাড়ী বাড়ী - এসব কি আবার ফিরে পাওয়া যায় ? 

দেখুন, জগতে কোনো কিছুই হারায় না, কেবল হস্তান্তর হয়, কেবল রূপান্তর হয়। পৃথিবীর ওজন আজ থেকে হাজার বছর আগেও যা ছিল, আজও তাই আছে। (যদিও পৃথিবীর ওজন বলে কিছু হয় না, হয় ভর - ৫৯৭২২০ কোটি কোটি কোটি কিলোগ্রাম)  এমনকি এই ব্রহ্মাণ্ডে আজ থেকে হাজার হাজার বছর  আগেও যাকিছু ছিলো, আজও তা-ই আছে। কখনও  আপনার কাছে, কখনো আমার কাছে। কখনো সোনার তাল, কখনো সোনার গহনা।  কখনো শিশু, কখনো বৃদ্ধ। কখনও  জীবন, কখনো মৃত্যু।  কখনও জীবাত্মা, কখনও  পরমাত্মা। কখনও জড়, কখনও অজড়, কখনও  প্রাণবন্ত, কখনও প্রাণহীন। যা ছিল, তাই আছে, কখনও  ব্যক্ত কখনও  অব্যক্ত।

জগতের সমস্ত কিছুই যেখান থেকে আসে, সেখানেই লয় হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে কোথা  থেকে আসে - আর কোথায়ই বা চলে যায় ? উপনিষদ বলছে, ব্রহ্ম  থেকে আসে জীব ব্রহ্ম-এ ফিরে যায়।  কিন্তু কথা হচ্ছে কি সেই শক্তি যা ব্রহ্মকে জগৎ করেছে, আবার জগৎকে ব্রহ্ম  করছে ? এটি হচ্ছে ইচ্ছে শক্তি। ব্রহ্ম  একসময় ইচ্ছে করেছিলেন, তাই এই জগৎ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর  ইচ্ছেতেই জগৎ পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। এ যেন এক চক্র। এযেন এক পাগলের খেলা, ভাঙছেন আবার গড়ছেন। 

আমরা সেই আলোচনা শুনবো ধীরে ধীরে। আমি এই দেহ ছেড়ে কোথায় যাবো ?  আমি কে ? এই জগৎ কি ? এই জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি ? এখানে আমার কর্তব্য কি ? এইসব কথা আমরা ঋষি মানবদের কাছ থেকে শুনবো। কিন্তু এই সত্য অনুধাবন করতে গেলে, আমাদের শব্দব্রহ্ম-এর আশ্রয় করতে হবে। পর-ব্রহ্ম-এর স্বরূপ সন্মন্ধে ধারণা  করতে গেলে, বা আমাদের বোধশক্তিতে যে উপলব্ধি হয়, সেই  উপল্বদ্ধির শক্তিকে বৃদ্ধি করতে হবে। আর ঠিক এই কারণেই আমরা আগেই  তুঙ্কার সাধন-পথের একটা আভাস শুনেছি ।  আমরা সেই পাথেয় এগিয়ে যাবো।  ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ - হরি ওম। 
চলবে।...

সাধন-পথ - ৪
কথা হচ্ছিলো ইচ্ছেশক্তি নিয়ে।  এই ইচ্ছেশক্তির ফলের নির্গুণ ব্রহ্ম  নিজেকে বহু করলেন। এই যে ইচ্ছেশক্তি এটি আমাদের সবার মধ্যেই বিদ্যমান। আসলে আমাদের মধ্যে যেমন আছে ইচ্ছেশক্তি, আমাদের আছে অনুভূতিশক্তি, আর আছে নির্ণায়ক শক্তি যা বুদ্ধিবৃত্তি নাম পরিচিত। এই ত্রিবিধ শক্তিই আমাদের মনের শক্তিবিশেষ। এসব আসলে মনের বৃত্তি।  এই বৃত্তিগুলোকে শুদ্ধ করতে পারলে, আমাদের অনুভূতিকে সূক্ষ্ম করে নিতে পারি। এর জন্য প্রথমে দরকার আমাদের দৃঢ় সংকল্প। দেখুন ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা আমাদের মনের মধ্যে একটা সংস্কারের জন্ম দেয়।  এই সংস্কারগুলো দুই রকম হয়ে থাকে।  সৎ-সংস্কার, ও অসৎ-সংস্কার। এই সংস্কারগুলোকে আমরা ওই তুঙ্কার সাধনার দ্বারা শোধন করে নিতে পারি। তুঙ্কার সাধনা আমাদের সংস্কারগুলোকে ধরতে সাহায্য করে থাকে। এবং আমাদের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তি আছে তাকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করতে সাহায্য করে থাকে। যখন আমাদের ইচ্ছেশক্তি, চিন্তাশক্তি ও অনুভূতিশক্তি পবিত্র হয়, তখন আমাদের স্বজ্ঞাশক্তি বৃদ্ধি পায়।  আর এটি বোঝা যায়, যখন আমরা ধ্যানের মধ্যে জ্যোতির্বিন্দু দর্শন করি বা নাদব্রহ্ম প্রকট হয়। এইসময় থেকে আমরা আমাদের স্থূল দেহ থেকে ভিন্ন এক আত্মসত্ত্বার সন্ধান পেয়ে থাকি। এটি আত্মা নয়, কিন্তু আত্মার জ্যোতি। 
তুঙ্কারের সাধনার অভ্যাস যখন দৃঢ় হয়, তখন নিষ্কাম কর্ম্মের প্রতি আগ্রহ আসে।  

সাধন পথ (৫)

আমরা সবাই স্বাধীনতা  চাই। আমরা সবাই স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে চাই। আমরা সবাই নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। আমরা সবাই নিজের ইচ্ছেকে পূরণ করতে চাই। কিন্তু কেউই আমরা সেই স্বাধীনতার স্বাদ পাই না। আসলে আমরা জেক স্বাধীনতা ভাবি তা আসলে জঙ্গলের স্বাধীনতা, পশুর স্বাধীনতা। আমাদের যে সহজাত প্রবৃত্তি আছে, তার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা আসলে অচেতন মনের প্রত্যাশা। আমাদের ইন্দ্রিয়সকল আসলে এই অচেতন জগৎকে প্রকাশ করছে। আমাদের প্রবৃত্তি এই অচেতন জগতের মধ্যে প্রবেশ করে সুখী হতে চাইছে। এখন থেকে আমাদের বেরিয়ে আস্তে হবে। 

দেখুন এই যে দেহ, তা কে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি নিজেই অর্থাৎ আমার প্রাণক্রিয়া, আমার খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া এই দেহকে বাঁচিয়ে রেখেছে ? না, ঈশ্বরের ঐশ্বরীয় তেজঃশক্তি আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিশ্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই তেজঃশক্তির সংযোগ রয়েছে। খাদ্য যেমন স্থূল দেহকে পুস্ট করছে, তেমনি বিশ্বশক্তি আমাদের ব্যষ্টি বা আত্মশক্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। 





  













No comments:

Post a Comment