Friday, 16 November 2018

সত্যধর্ম ও অবতার শ্রীকৃষ্ণ

সত্যধর্ম ও অবতার শ্রীকৃষ্ণ



আজকের আলোচনার বিষয় একটু স্পর্শকাতর। অবতার শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে। কোটি কোটি ভক্ত তাঁর পূজা করেন। যারা শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে  মেনে চলেন, তাদের পক্ষে এই আলোচনা নিরর্থক না হলেও যারা শ্রীকৃষ্ণের অন্ধ ভক্ত, অর্থাৎ যারা গীতাকে লালরঙের কাপড়ে মুড়ে দুবেলা শুধু প্রণাম করেন, তাদের জন্য এই আলোচনা অস্বস্তিকর হতে পারে। তাদের বিশ্বাসকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য ব্রহ্ম-জ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণকে খোঁজা। প্রথমে আমি মহাত্মা গুরুনাথের বই থেকে এই আলোচনা শুরু করবো।  পরে আমার উপল্বদ্ধির কথা বলবো।
মহাত্মা গুরুনাথ প্রবর্তিত সত্যধর্ম আসলে পরমেশ্বরের সাধনার পথ নির্দেশক । আর পরমেশ্বর তো  নিরাকার। তাই পরমেশ্বরের পূজা হয় না।  পরমেশ্বরের উপাসনা হয়।পরমেশ্বরের গুনকীর্তন হয়। সাকারের পূজা হয়। আমি যখন এই সত্যধর্মের বই পড়তে আরম্ভ করি, তখন আমি প্রথমেই ধাক্কা খাই মহাত্মা গুরুনাথের একটা কথায়, আর সেটা হচ্ছে "শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর নয়" এই কথাটা শুনে। আমরা পারিবারিক সূত্রে শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত।  বাড়িতে শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহের পূজা হয়। ছোটবেলা থেকেই শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান বলে শুনে আসছি। কিন্তু ভগবান আর পরমেশ্বর এর মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে, সেটা আমার বোধের বাইরে ছিল।  তাই শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর  নয় এটা শুনে বা পড়ে, আমার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ভাবতাম মহাত্মা গুরুনাথকে কয়জন চেনে, জানে। শ্রীকৃষ্ণকে আমরা সবাই পূজা করি ভগবান জ্ঞানে, আর মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, তিনি ভগবান নয়। এই সব অবান্তর কথা না শোনাই ভালো। এই সব কথা  অজ্ঞানীর অভিমান মাত্র। সেইথেকে  আমি  মহাত্মা গুরুনাথের বই পড়া  ছেড়ে দিয়েছিলাম। 
কিন্তু পরবর্তীতে, বলতে পারেন, বাধ্যতামূলক ভাবে সত্যধর্মের উপাসনায় উপস্থিত থেকে, বিশেষ করে আমার স্ত্রী ও শ্বশ্রুমাতার অগাধ ভক্তি ও নির্ভরতা দেখে , এই বিষয়ে আমার কৌতূহল বাড়ে। এবং আমি আবার তার বইগুলো পড়তে শুরু করি । এখন আমার মনে হয়, মহাত্মা গুরুনাথ ঠিকই বলেছেন। কিন্তু কি বলেছেন তিনি। 
প্রাসঙ্গিকক্রমে আর একটা কথা বলি, সত্যধর্মের যখন প্রকাশ হয় অর্থাৎ প্রায় একশ বছর আগে, প্রথম প্রথম এই ধৰ্ম প্রচার করা হতো গোপনে। এমনকি মহাত্মা গুরুনাথের নাম প্রকাশও নিষেধ ছিল। আমার মনে হয়, তখন সমাজ আরো গোড়ামিতে ভরা  ছিলো। এবং গুরুদেবের কথায় তখনকার আমলে, হিংস্র প্রতিবাদের সম্ভবনা ছিল, তাই এই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল। আজ সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।  তাই সত্য বলার রাস্তা সহজ হয়েছে। কিন্তু অন্ধত্ত্ব  আজও যায় নি। ঈশ্বর আজও আমাদের কাছে বিশ্বাসের বিষয়।  অনুভবের বিষয় নয়।  এখন আমরা আলোচ্য বিষয়ে আসি। শ্রীকৃষ্ণ কেন পরমেশ্বর নয়। বা শ্রীকৃষ্ণ আসলে কে ?

মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন :
কারুর কারুর মতে  ঈশ্বর যে জন্ম গ্রহণ করেন, বা ঈশ্বর মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেন, এটা একটা অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া কিছু নয়। ঈশ্বর নিরাকার, তিনি কোনো নির্দিষ্ট রূপের মধ্যে আবদ্ধ নন। আর নিজেকে তিনি আবদ্ধ করেনও না। কোনো মনুষ্য দেহধারীকে ঈশ্বর বলা মানে, ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ করা। ঈশ্বর সীমাহীন, অনন্ত। সবার মধ্যেই ঈশ্বর প্রতিফলিত। তাই শ্রীকৃষ্ণের মতো দেহধারীকে ঈশ্বর বলা অজ্ঞানীর লক্ষণ। 
আর এক দলের মত্ হচ্ছে, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তিনি মানুষ বা যেকোনো  জীব হিসেবে জন্ম গ্রহণ করতে পারবেন না কেন ? এই অবতারবাদীদের বিশ্বাস তিনি শুধু মানুষ নয়, তিনি মৎস্, কুর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ  হয়ে জন্মেছেন আর কলিকালের সবশেষে কল্কি হয়ে জন্মাবেন। আমরা নয় জনকে জন্মাতে দেখেছি, আর একজনকে জন্মাতে দেখবো।  এই সত্যের কোনো অন্যথা হয় না। 
মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন : এই বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ত্ব দেওয়ার কিছু নেই। এগুলো আসলে শাস্ত্রকারদের সংস্কার ছাড়া কিছু নয়। আর এই শাস্ত্র দিয়েই প্রমান করা যায় এগুলো শাস্ত্র বিরোধী। 

কঠোপনিষদ বলছে :
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা 
বিপশ্চিন্যায়ং কুতশ্চি
ন্ন বভূব কশ্চিৎ। " 

জগদীশ্বর জ্ঞানময়, তিনি জন্ম গ্রহণ করেন না, সুতরং মৃত্যুগ্রাসে পতিত হন না। আর তিনি কেহ হতে হন না, আর  কোনো জীবও হন না। অর্থাৎ তিনি কোনো কিছু থেকে আসেন নি।  আর কিছু হন না।  অর্থাৎ জীব হয়ে জন্মানও  না।   

স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আত্মা  সম্পর্কে বলছেন : 
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ। 
অজ নিত্যঃ শাশ্বত অয়ং  পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শশীরে।"   গীতা-২/২০)

আত্মা কখনো জন্ম গ্রহণ করেন না, মরেন না। তিনি না জন্মেছেন, না জন্মাবেন। তিনি অজ, নিত্য শাশ্বত ও পুরান ; শরীর  বিনষ্ট হলেও এর বিনাশ নেই। 
শ্রীকৃষ্ণকে যারা ঈশ্বর বলে মনে করেন, তাদের  একটা জোরালো যুক্তি হচ্ছে, ঈশ্বর যখন সর্বশক্তিমান তখন তিনি জন্ম গ্রহণ করতে পারবেন না কেন ? গুরুদেব বলছেন, শক্তি থাকলেই সেই শক্তি তিনি প্রয়োজন অতিরিক্ত কাজে ব্যবহার করবেন তার কোনো মানে নেই। শক্তিশালী রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে যে কোনো গ্রাম,বা বিশেষ নগর মানবশূন্য করতে পারেন।  কিন্তু তা কি করা হয় ? এমনকি আমাদের নিজেদের  শক্তি থাকলেই কি আমরা তার ব্যবহার সব জায়গায়  করি ? করি না। কারণ আমাদের ইচ্ছা শক্তি বাধা দেয়।  আর সত্যি কথা বলতে গেলে, ঈশ্বর অলক্ষে থেকেই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তার মায়া বা প্রকৃতির আশ্রয় নিয়ে কিছু করতে হয় না। বরং প্রকৃতির আশ্রয় নিলে, বা দেহধারী হলে তিনি তার সর্বশক্তিমান সত্ত্বা হারিয়ে ফেলেন। তাই তিনি এইরূপ ইচ্ছা কস্মিন কালেও করেন না। 
যদি বলা হয়, সাধুদের পরিত্রানের জন্য, বা দুস্টুদের দমনের জন্য তার আসার প্রয়োজন, সেটাও সত্য নয়। কারন এই প্রক্রিয়া মানুষই করে থাকে।  রাষ্ট্র করে থাকে। সাধুজনেরাই করে থাকে। এর জন্য ভগবানের দেহ ধারনের প্রয়োজন নেই। তার ইচ্ছা শক্তিই এইরূপ দন্দ্ব সৃষ্টি করছে, আবার তার এই  শক্তিই এই দ্বন্দ্বের নিরসন করছেন।  এর জন্য সেই পরম আত্মার বা পরমেশ্বরের দেহ ধারণ করার প্রয়োজন নেই। এই সব কথা কিছু গুরুত্ত্বহীন সাধুদের দ্বারা, নিজেদের গুরুত্ত্ব বাড়াবার জন্য প্রচার করেছেন । এর মধ্যে কোনো  সত্য নিহিত নেই। গুরুদেব বলছেন, যিনি পূর্ণব্রহ্ম, তিনি কখনো একজন দুষ্টাত্মার নিগ্রহে প্রবৃত্ত হয়ে পদে পদে বিপদগ্রস্থ ও কখনো কখনো পরাভূত এমনকি শাপগ্রস্থ (সত্যবতীর দ্বারা) হতেন না। শ্রীকৃষ্ণতো একজন শোকগ্রস্থ সত্যদ্রষ্টা  জ্ঞানীব্যক্তি ছিলেন ।  
একটা কথা মনে রাখতে হবে,  যার অব্যক্ত অংশ হতে এই জগৎ উৎপন্ন হয়েছে, এবং যার অংশই সমস্ত জীবাত্মা, সমস্ত ব্রহ্মান্ডের যিনি উপাদান ও নিমিত্ত-কারণ, তিনি যদি একস্থানে স্থিত হন, তবে ব্রহ্মান্ডের অন্য্ সব স্থান কিভাবে থাকবে ? 
অতএব এটা নিশ্চিত করে বলা যায় পরম-ঈশ্বর কখনো কোনো কিছু হয়েই  জন্মান না, তা সে মৎস্, কুর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, রাম , কৃষ্ণ যাই বলুন না কেন । জন্মানোর দরকার হয় না। এই অবতার তত্ত্ব আসলে প্রাণীর ক্রমবিকাশ বোঝাবার জন্য,  একটি রূপক গল্প মাত্র। 
এখন তাহলে কৃষ্ণ কে ? 
পরম-ঈশ্বর জন্মান না।  কিন্তু যারা জন্মান তাদের মধ্যে পরম-ঈশ্বরের অনেকগুন্ বা শক্তি  আয়ত্ত্ব করবার পুরুষাকার  থাকে। মানুষ জন্ম জন্মান্তরের প্রচেষ্টায় এই শক্তি সকল বা গুন্ সকল আয়ত্ত্ব  করতে পারে। প্রথম জন্মে বা শরীরে যে শক্তি সে লাভ বা আয়ত্ত্ব  করে, ক্রমাগত চেষ্টায়, ও জন্মান্তরের সাধনায়   তার সেই শক্তি বাড়তে থাকে।  এবং ধীরে ধীরে, সে সাধারণ মানুষ বা জীবের থেকে সে উন্নত হতে পারে।  তখন তার সঙ্গে সাধারণের প্রভূত পার্থক্য দেখা যায়। কেউই প্রথম জন্মেই অবতার হয় না।  জন্ম জন্মান্তরের সাধনাই  তাকে অবতার হিসেবে প্রতিপন্ন করে। তাই যাদের আমরা অবতার বলি, তাঁরা জন্ম-জন্মান্তরের সাধক। যোগবশিষ্ট। তারা সকলেই বহু জন্ম ব্যাপিনী সাধনার ফলে এই অবস্থা লাভ করেছেন । 
দেখুন শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলছেন, হে অর্জুন, তুমি-আমি বহুবার জন্ম গ্রহণ করেছি, আমি সে সকল জানি, তুমি জানো না। ভগবান বুদ্ধও তার পূর্বাপূর্ব জন্মের কাহিনী বলেছেন। অতএব মহাত্মা গুরুনাথ যে বলছেন বহু জন্মের সাধনার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে অবতার হয়ে যান, সেটা সত্য। 
অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ যে এককালে নর ও নারায়ণ ছিলেন, তার প্রমান পাই আমরা মহাভারতের প্রতিজ্ঞা পর্বে। সেখানে দেখছি, জয়দ্রথকে অর্থাৎ অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর বধকারীকে শায়েস্তা কোরবার জন্য, শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন স্বয়ং মহাদেবের কাছে গিয়েছিলেন দিব্য অস্ত্র লাভের  আশায়। সেখানে স্বয়ং ত্রিকালেশ্বর মহাদেব তাদের সম্মোধন করছেন, নর ও নারায়ণ বলে। অর্থাৎ এখনকার অর্জুন হচ্ছেন পূর্বাপূর্ব জনমের নর আর শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন নারায়ণ। এঁরা দুই জনই মহান সাধক ছিলেন। সত্যযুগে বদ্রীনাথ ধামের কাছে (এখন যেখানে নর-নারায়ণ পর্বত ) হাজার হাজার বছর  ধরে তাঁরা দুই ভাই তপস্যা করেছিল।
মহাভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেমন ভীষ্মপর্বে (৬৮ অধ্যায় ), উদ্দ্যোগপর্বে, এই শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের পূর্ব জন্মের কথা লেখা আছে।  অর্থাৎ মহাভারতের বিভিন্ন জায়গায় বহু মহাপুরুষের পূর্বজন্মের কথা লেখা আছে। সত্যিমিথ্যা যাই হোক না কেন, মানুষ তার সাধনার দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতা জন্ম-জন্মান্তর বয়ে নিয়ে চলে এটা সত্য। 
অতএব যাঁকে  লোকে অবতার বলে. তিনি প্রথমে সামান্য অবস্থাতেই ছিলেন।  ক্রমে ক্রমে সাধন বলে, হাজার জন্মের সাধনায় নিজের উন্নতি সাধন করেছেন। পরম-ঈশ্বরের গুণাবলী, তার পরমাশক্তি লাভ করেছেন। এই জন্যই এইসব ঐশী শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিকেই অবতার বলা হয়। তার মানে এই নয় যে তিনি পরমপিতা -পরম-ঈশ্বর। সমস্ত ব্রহ্মান্ড যেমন পরম-ঈশ্বরের অংশ।  তেমনি সাধারণ মানুষ বলুন, কীট পতঙ্গ বলুন আর অবতারই  বলুন সবই পরমপিতার অংশ মাত্র। কেউই পরম-ঈশ্বর নন। 

আর একটা কথা মনে রাখা রাখা দরকার সেটা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার বলা হয়। বিষ্ণু, শিব, ব্রহ্মা সবাই অনন্ত  ব্রহ্মের অংশ মাত্র। এই তিন জনকে আলাদা ভাবে তিনটি কাজের দায়িত্ত্ব দেওয়া হয়েছে বলে কল্পনা করা হয়েছে, হিন্দুদের মতে ।  ব্রহ্মা - সৃষ্টিকর্তা ; বিষ্ণু -পালনকর্তা ; শিব বা রুদ্র : সংহারকর্তা। অতএব শুধুমাত্র পালনকর্তাকে আমরা পরম-ঈশ্বর বলতে পারি না। এই তিন জনই স্ব-স্ব  ক্ষেত্রে প্রধান। আবার আমরা বিভিন্ন সময়ে এঁকে  অন্যের সহযোগিতা নিতে দেখি।  অতএব শ্রীকৃষ্ণকে আমরা সর্বশক্তিমান ভাবা মানে তাকে তাঁর উপযুক্ত সন্মান থেকে বঞ্চিত করা। আমি কোনো কনস্টেবলকে যদি বার বার ওসি স্যার বলে সম্বোধন করি, সে তাতে সম্মানিত বোধ না করে তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে বলে মনে করতে পারেন। অতএব শ্রীকৃষ্ণ যোগেশ্বর, পরম জ্ঞানী, ভগবান, ঈশ্বর, সব কিছু, কিন্তু পরম-ঈশ্বর নন,  পরম পিতা নন এটা আমাদের বুঝতে হবে।  
আসলে মানুষ অর্থাৎ এই শরীর প্রকৃতির অধীন। সুখ দুঃখ মানুষের স্বেচ্ছাসাধ্য নয়। মানুষ না চাইতেই বিপদের সম্মুখীন হয়।  আমরা কেউ দুঃখ চাই না।  কিন্তু  দুঃখ আসে। আমরা কেউ কর্তা  নোই।  স্বয়ং বিষ্ণু, ব্রহ্মা, রুদ্র কেউই কর্তা  নহে। সূর্য/পৃথিবী/চন্দ্র  যেমন ইচ্ছা করলে ঘোরা বন্ধ করতে পারে না । পৃথিবী আমাদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে পারে না। সূর্য কিরণ দেওয়া বন্ধ করতে পারে না। বাতাস রুদ্ধ হতে পারে না ।  তারা সবাই যে যার কার্য্যে রত থাকতে বাধ্য, সেই পরম-ঈশ্বরের অমোঘ নির্দেশে। 

অতএব মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন :
জগতে ঈশ্বর অনেক আছেন, কিন্তু পরমেশ্বর একজনই। অবতারগন অবশ্যই  প্রভূত গুনের অধিকারী। কিন্তু পরমেশ্বর অনন্ত গুনের অধিকারী। তাই শ্রীকৃষ্ণকে আমরা মহাপুরুষ বলতে পারি, ভগবান বলতে পারি, এমনকি ঈশ্বরও  বলতে পারি, কিন্তু পরম-ঈশ্বর বলা অতিশয় উক্তি বা মূর্খামি  ছাড়া কিছু নয়। 
______________
______________
এবার একটু অন্য কথা বলি।
শুনেছি, সত্যধর্মের নির্দেশিত পথে সাধনা করে, কবিবর রাজেন সরকার, শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। এবং সেই আনন্দে, বাংলাদেশে তার বসতবাটি সত্যধর্মের জন্য দান করেছিলেন। তো শ্রীকৃষ্ণ দর্শন করা যায়, এটা সত্য। অর্থাৎ আজও  শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের দর্শন দেন। আমার কাছে কিন্তু আধ্যাত্মিক শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্ত্ব থাকলেও, দেহধারী শ্রীকৃষ্ণের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। আমার কাছে, শ্রীকৃষ্ণ কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। তিনি সর্বকালের, অথবা কালেরও উর্দ্ধে। তিনি পুরান পুরুষ। তিনি এক কাহিনীর নায়ক। তিনি অভিনেতা। তিনি জন্মে ছিলেন কি না, বা পাঁচ হাজার বছর  আগে জন্মে ছিলেন কি না, সেটা বড়  কথা নয়। এমনকি তিনি ভগবান ছিলেন কি না সেটাও বড়  কথা নয়। আপনি যদি কৌরবদের জিজ্ঞেস করেন, দুর্যোধনকে জিজ্ঞেস করেন, যারা তাকে দেখেছিলো, সে কি বলবে - শ্রীকৃষ্ণ ভগবান ছিলো ? নিশ্চয়ই বলবে, অবশ্যই   না।  বলবে, শ্রীকৃষ্ণ গোয়ালার পুত্র ছিল। ছলনাকারী ছিল।  বড়োজোর বলতে পারে, বড়ো যোদ্ধা ছিলো।  যদি আপনি অর্জুনকে জিজ্ঞেস করেন, সে বলবে আমার হিতকারী সখা ছিলো। ভালো একজন  বন্ধু ছিলো। যদিও তাকেই ভগবান তার স্বরূপ দেখিয়েছিলো। তবু অর্জুন তাকে জানতে পারেনি, চিনতে পারেনি।   কিন্তু ভীষ্মকে যদি জিজ্ঞেস করেন, সে বলবে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান ছিলো। আবার আপনি যদি সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করেন, তো সে বলবে, তিনি যে কে ছিলেন, তা ভাষায় ব্যাক্ত করা যায় না।  আপনি যদি দ্রৌপদীকে জিজ্ঞেস করেন তো সে বলবে, যে আমাকে ভাত কাপড় জুগিয়েছে, সেই আমার ভগবান। শ্রীকৃষ্ণ আমাকে অসময় ভাত কাপড় দিয়েছে, তিনি অবশ্যই  ভগবান। তো দৃষ্টিশক্তির ফারাক। শ্রীকৃষ্ণ একটা আয়না। তার সামনে দাঁড়ালে, তোমার স্বরূপেই তিনি প্রকাশ হবেন। তুমি যা চাও, তুমি যা দেখতে চাও, তুমি তাই দেখবে। অর্থাৎ তুমি যা তুমি তাই দেখবে, তুমি সরে  গেলে,  আয়না আবার স্বচ্ছ হয়ে যাবে।
এই প্রসঙ্গে শ্রী রামকৃষ্ণের বলা একটা গল্পের কথা বলি। নদীর পারে, একটা উইয়ের ঢিপি।  তো অন্ধকারে, সন্ধ্যার সময় এক মাতাল এলো। উইয়ের ঢিপিটাকে দেখে ভাবলো, ব্যাটা কেমন সন্ধে থেকে মাল খেয়ে ভুর হয়ে আছে দেখো। গভীর রাতে এক চোর এলো, সে উইয়ের ঢিপি দেখে ভাবলো ব্যাটা সব কাজ সেরে এখানে বসে আছো ? আমার এখনো কিছুই হলো না। এবার শেষ রাতে এলো সাধু, সাধু উইয়ের ঢিপি দেখে ভাবলো, ব্যাটা কেমন সমাধিতে বিভোর হয়ে গেছে, আমি এখনো ধ্যানে বসতেই পারলাম না। আসলে আমরা যা তাই দেখি।   
শ্রীকৃষ্ণের নিজের কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। তিনি কোনো ব্যক্তিও নন।  তিনি এক পূর্ণ পুরুষ। নামেই বোঝা যায়, তিনি আকর্ষক। নামেই বোঝা যায়, তিনি কালো, অন্ধকার। অর্থাৎ সৃষ্টির আঁতুরঘর। আবার শূন্য।  শুন্য, অর্থাৎ তার কাছে সব আছে আবার কিছুই নেই। শুন্য সদাই পূর্ন। শূন্য কখনো অপূর্ন হয় না। শুন্য কখনো  ভগ্নাংশ হয় না। আর সব সংখ্যার ভগ্নাংশ হয়।  শুন্যের হয় না। শুন্য থেকেই শুরু। ০,১, ২,৩,৪,৫,৬,৭,৮, ৯ আবার শুন্য।  শুন্য থেকে শুরু আবার শূন্যতেই শেষ। শ্রীকৃষ্ণ কিছুই নয়। শ্রীকৃষ্ণের কোনো মূল্য নেই। শুন্যের কোনো মূল্য নেই, সংখ্যার ডান দিকে বসলে, সংখ্যার গুরুত্ত্ব বাড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার। যাঁকে সদ্ভাবে নিলে, যে নেয় তার গুরুত্ত্ব বাড়ে। আর যে অসৎ ভাবে নেয়, অর্থাৎ বা দিকে নিলে তার কোনো গুরুত্ত্বের হেরফের হয় না।
ভগবান কথিত গীতার কোনো ব্যাখ্যা,  শ্রীকৃষ্ণের নয়। এমনকি গীতার কথাও শ্রীকৃষ্ণ নিজে লিখে যান নি। শ্রীকৃষ্ণ কোনো আলাদা পথও  বাতলে দেননি । বেদ পুরাণের কথা তাঁর মুখে বসানো হয়েছে মাত্র।  কিন্তু যেকেউ গীতার মধ্যে পথ পেয়ে যেতে পারে। অথবা বলা যেতে পারে, গীতাতেই সব পথ আছে, যার যেটা দরকার, সে সেটাই পেতে পারে।  
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, শ্রীকৃষ্ণ কি  আস্তিক ছিল ? আস্তিকরা সাধারণতঃ অহংকারী হয়। ঈশ্বর বিশ্বাসীরা বলেন, হে ঈশ্বর তুমিই সব। এই জগৎ মিথ্যা। তুমিই সত্য। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ঈশ্বর সত্য, জগৎ সত্য, আমিও  সত্য। শ্রীকৃষ্ণ এই জগতের সব কিছুকে স্বীকার করেন, আমরা যাকে ধৰ্ম-অধর্ম  বলে মনে করি, তা তিনি করেন না। তিনি সব কিছুকেই স্বীকার করেন। সুখ-দুঃখ কাউকেই তিনি বাদ  দিতে চান না। তিনি কাউকেই ত্যাগ করেন না। যতক্ষন না সে তাকে ত্যাগ করছে। এইখানেই শ্রীকৃষ্ণ ব্যক্তিত্বহীন হয়ে যান।  আমরা কিছু ছাড়ি , কিছু ধরি, শ্রীকৃষ্ণের ধরা-ছাড়া  বলে কিছু নেই। তাই শ্রীকৃষ্ণের আমিত্ত্ব বলে কিছু নেই। আমরা যখন কিছু ধরি বা ছাড়ি তখন আমি হয়ে যাই। ব্যক্তি হয়ে যাই। আমার স্ব-যে বস্তুতে প্রতিষ্ঠিত হয়, আমার তখন সেই বস্তুতে আমিত্ব ভাব হতে থাকে। যেমন নিজেকে ধনের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলে, আমি ধনী হয়ে যাই।  নিজেকে বিদ্যার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলে আমি বিদ্বান হয়ে যাই। বুদ্ধির মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলে আমি বুদ্ধিমান হয়ে যাই। জ্ঞানের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলে আমি জ্ঞানী হয়ে যাই। শরীরের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলে আমি শরীর হয়ে যাই। শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে এই ধরা ছাড়া বলে কিছু নেই। তিনি সবেতেই আছেন, আবার কোনো কিছুর মধ্যেই  তিনি নেই। ধরা-ছাড়াই আমার ব্যক্তিত্ব। কিন্তু  শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে ব্যক্তি বলে কিছু নেই। তিনি কিছু ধরেন না ছাড়েন না। তাইতো সহজেই তিনি বলতে পারেন, সব ছেড়ে আমাকে ধরো। আমার শরণাপন্ন হও।  আপাততঃ কথাটায় মনে হতে পারে,  বোকারাই এ কথা বলতে পারে। বা বুদ্ধুরা   এ কথা বলতে পারে। অথবা একমাত্র বুদ্ধই  এই কথা বলতে পারেন।  অথবা এই কথা অহংকারীরা  বলতে পারে। একটা কথা বলুন তো, আমাদের মতো সাধারণের লোকের যেটা মনে হতে পারে, যে তিনি অহংকারী বা বোকার মতো কথা বলছেন, এই  কথা কি শ্রীকৃষ্ণের মনে হয়নি ? না মনে হয় নি, কারন তিনি অহঙ্কারীও নন আবার বোকাও নন। এ কথা সেই বলতে পারে, যিনি অহংকারী নন। "আমার শরণে এস" এ কথা সেই বলতে পারে যার "আমার" এই জ্ঞান একেবারেই  নেই। আসলে উনি বলতে চেয়েছেন, তোমার "তুমি"-কে ছেড়ে দাও। তোমার এই ভেদ বুদ্ধিকে ছেড়ে দাও। তোমার অহংকারকে ছেড়ে দাও। তোমার তথাকথিত জ্ঞান, যা তোমাকে ভালো মন্দ বিচার করতে শেখায় - সেই জ্ঞান ছেড়ে দাও। তুমি ভাবছো, আত্মীয়দের মারলে, তুমি দুঃখী হবে। এদের না মারলে তুমি সুখী হবে ? তুমি চাইছো এদের না মেরে তুমি মহান-মানবতার পরিচয় দিতে। তুমি ভিক্ষাবৃত্তি করে, ত্যাগের প্রতীক হতে চাইছো ? এদের না মেরে তুমি আত্মহত্যা করে চির বিজয়ী হতে চাইছো ? আসলে তোমাকে  ভয় গ্রাস করেছে। তুমি নিজেকে কর্তা  ভাবছো। আর সমস্ত কাজের পরিণামের কথা ভেবে আতঙ্কগ্রস্থ হচ্ছো।  
তোমার প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি নেই বলেই এমনটি ভাবছো। আমাদের মতো সাধারণের মানুষের  মনে হয়, অর্জুন ধার্মিক। সে এই বিনাশকার্য থেকে দূরে থাকতে চাইছে। শ্রীকৃষ্ণ অধার্মিক, সে এই বিনাশকার্যে প্রেরণা দিচ্ছে। কিন্তু যা সত্য তা হচ্ছে, তুমি নিমিত্ত মাত্র।  করেন তো তিনি, করানও তিনি। তুমি যেটা নিজের কাজ ভাবছো - অর্থাৎ নিজেকে কর্তা ভাবছো, এই ভাবনাই  তোমার কর্মফলের হেতু। এটাই তোমাকে "তুমিতে" পরিণত করেছে। এখান থেকে বেরিয়ে এস।  তুমি তার কাছে, পরম-আত্মার কাছে সমর্পিত হয়ে যাও।  কর্তব্য কর্মে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করো। সমর্পনই উদ্ধারের রাস্তা, শান্তির রাস্তা।      
এই জগৎ কর্মক্ষেত্র। কর্মহীন জীবন হয় না। আবার কর্ম করলে তার ফল অবশ্যম্ভাবী। মনুষ্য জন্ম কর্ম নিমিত্ত। এই কর্মই  মানুষকে সুফল, কুফল ভোগ করায়। অতএব কর্ম  ও ভোগ এখানেই করতে হয়। ভোগ সম্পূর্ণ না হলে, অর্থাৎ ফল ভোগের আগেই আমাদের দেহত্যাগ হলে, আমরা ভোগযোনিতে জন্ম গ্রহণ করি। সেখানে সুখ দুঃখ ভোগের পরে আবার মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করি। এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র চলছে। এখান থেকে বেরোতে গেলে আমাদের পরম-পিতা পরম-ঈশ্বরে নিবেদিত হতে হবে।  আর এখানেই মনুষ্য জীবনের সার্থকতা।
অদ্ভুত চরিত্র এই শ্রীকৃষ্ণ। কখনো চোর, কখনো সাধু, কখনো প্রেমিক, কখনো কঠোর। যখন যার কাছে থেকেছেন, পূর্ণরূপে থেকেছেন। যাকে ছেড়েছেন পূর্ণরূপে ছেড়েছেন। যখন যে কাজ করেছেন,  সে কাজে তিনি পূর্ণরূপে নিবিষ্ট হয়েছেন। তার মধ্যে অসম্পূর্ণতা বলে কিছু নেই।         

কৃষ্ণনাম : কৃষ্ণ কথাটার মানে কালো।  তার গায়ের রঙ-ও  ছিল কালো। কালো মানে অন্ধকার। অন্ধকার সব সময় রহস্যময়। অন্ধকারই শূন্য, অর্থাৎ তাতে আমরা কিছুই দেখতে পাই না। আর শূন্যই  পূর্ণ।
কৃষ্ণ কথাটার মানে আকর্ষণ। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অর্থাৎ যার টানে সব কিছু কাছে চলে আসে। এ যেন চুম্বক। পাঁচ হাজারেরও বেশি সময় ধরে আমাদেরকে টানছে।

শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভাব বা জন্ম :
এবার আমরা শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বা  আবির্ভাবটা  একটু দেখে নেই। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকার রাতে।  নিজের হাত নিজে দেখা যায় না। বাইরে ঝড় বৃষ্টির প্রচণ্ড প্রতাপ। এরই মধ্যে ভগবান এলেন। দুর্যোগের রাতেই-তো আমরা ভগবানকে ডাকি। আর তিনি তখনি হাজির হন। কি অদ্ভুত না ? আসলে জন্ম তো অন্ধকারেই হয়। আমার ভিতরে যা জন্ম নেয় তাতো সব গভীরে, অন্ধকারে। ধ্যান, সমাধি জন্ম নেয় অন্ধকারে। বীজ থেকে অঙ্কুর জন্ম নেয় অন্ধকারে। জন্মতো অন্ধকারেই হয়, মায়ের পেটে। বাবাওতো অন্ধকারেই  বীজ  রোপন করেন। অন্ধকারেই সব কিছুর জন্ম। আর দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারেই ভগবান আসেন। শ্রীকৃষ্ণও এসেছেন। আমরা সবাই অন্ধকারেই জন্মাই।  এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
ভগবান এলেন কারাগারে শৃঙ্খলাবদ্ধ মায়ের কাছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তো  ভগবান বুদ্ধের মতো রাজার পরিবারে আসতে  পারতেন। তা তিনি এলেন না। তিনি এলেন কারাগারে শৃঙ্খলাবদ্ধ মা-বাবার কাছে। এখানেই পার্থক্য। ভগবান বুদ্ধ দুঃখের মুক্তি চেয়ে ছিলেন। জন্ম মৃত্যুর চক্রের বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য নয়। ভগবান বুদ্ধ ভগবানের কাছে কাউকে যেতে বলেন নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু বন্ধন  মুক্তির জন্য এসেছিলেন। কাছে টেনে নিয়ে ছিলেন। তা সে তার তথাকথিত শত্রুই হোক আর তথাকথিত মিত্রই  হোক। কংশ মুক্তি পেয়েছিল। শিশুপাল মুক্তি পেয়েছিলো।    আর তা ছাড়া, আমরা তো কারাগারেই জন্মাই, কারাগারেই মারা যাই। কেউ কেউ অবশ্য মুক্তি পায়। তবে কোটিতে কটি ? আর জন্ম মানেই  তো  একটি সাময়িক বন্ধন।  দেহের মধ্যে আসাই তো বড়ো বন্ধন । দেহই  তো একটা কারাগার। দেহ ত্যাগ মানে বন্ধন থেকে মুক্তি।
আর একটা জিনিস আমরা কৃষ্ণের জন্মের পরে দেখি ।  তা হলো মৃত্যু ভয়। তাকে মেরে ফেলার জন্য কংসের  সাথীরা সক্রিয় ছিল।  জন্মের পরে মৃত্যু ভয় কার নেই ? জন্ম মানেই মৃত্যু অবসম্ভাবী। মৃত্যুর জন্য শুধু জন্মটাই দরকার। আর কোনো গুনের দরকার নেই। ঘর বাড়ি, বিছানা চাদর, জামা কাপড় নোংরা করার জন্য প্রয়াস করার দরকার নেই।  ওটা এমনি এমনি হয়। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই দরকার, মরার জন্য কোনো লড়াই দরকার নেই, কোনো প্রয়াস নেই। অদ্ভুত ব্যাপার, না চাইলেও পাওয়া যায়। যাকে  আমরা জীবন বলি, সেটা তো শোভা  যাত্রা। স্মশান যাত্রা। আমরা স্মশানের দিকে এগিয়ে চলেছি। কেউ কেউ তো প্রতিক্ষণ মরছি। দেহে তো প্রতিনিয়ত মৃত্যু যাত্রা চলছে। প্রতিক্ষণেই আমাদের দেহকোষের, জন্ম মৃত্যু চলছে।  মৃত্যুমিছিল চলছে, একেই আমরা জীবন বলছি। বেঁচে থাকা বলছি।  আশ্চর্য।
ভগবান গীতাতে বলছেন : যখনই ধর্মের হানি হয় তখন আমি আসি। ধর্মের রক্ষার জন্য অধর্মের নাসের জন্য আমাকে আসতে  হয়। এ সম্পর্কে মহাত্মা গুরুনাথের যুক্তিকে আমি সমর্থন করি।  

সাধুদের রক্ষা করার জন্য ভগবানের কি সত্যিই দরকার ? কার রক্ষা করার দরকার - যে অনিশ্চয়তায় ভোগে। যে বিপন্ন, তার সুরক্ষা দরকার। নিজের অনিশ্চয়তায় যে সুরক্ষিত সেইই সাধু। যিনি স্ব-স্বরূপে স্থিত, তিনিই সাধু। যিনি স্ব-অধীন তিনিই সাধু।  বিপদেও যে শান্ত, সেইই সাধু। সাধুর অর্থই হলো, যার কাছে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। অথবা যে অনিশ্চয়তাকেই মেনে নিয়েছেন। ইনি ভবিষ্যতের অনিশ্চিয়তায় ভুগেন না। ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করেন না। যার সঞ্চয় নেই, তার রক্ষার চিন্তাও নেই। যিনি দেহাতীত, তার দেহ রক্ষার কোনো তাগিদ নেই। তাকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণের কি দরকার ? এই কথাটা আমার কাছে বিস্ময়ের। যার কাছে এখনো অনিশ্চিয়তা, সে তো সাধুই হয় নি। যেদিন সাধু আর সাধু থাকবে না, সেদিন তাকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণের দরকার পড়বে। অতএব সাধুকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণকে আসার দরকার নেই। 
আর একটা কথা বলছেন দুষ্টের দমনের জন্য অর্থাৎ মারার জন্য কৃষ্ণের প্রয়োজন। তাই তিনি এসেছিলেন। ভগবান নিজে জানেন, কাউকে মারা যায় না।  দেহান্তরিত হয় মাত্র।  অতএব দুষ্টকে মেরে দুষ্টমিকে খতম করা যায় না। দুষ্টকে  মারার কাজ যে কেউ করতে পারে। সারা বিশ্বে দুষ্টকে শাস্তি দেবার জন্য আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তাতে কৃষ্ণের আসার দরকার নেই। আসলে দরকার দুষ্টদের  রূপান্তর করা। আর এই কাজ সাধুদেরই করা উচিত।
আসলে সাধুরা মনে করে, আমাদের বাঁচানোর জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এসেছিলেন। তার মানে কি আমরা ধরে নেবো, এখন আর সাধু নেই, বা শ্রীকৃষ্ণের আগে সাধু ছিল না তাই শ্রীকৃষ্ণ আসেন না। দুষ্টরা মনে করতে পারে, আমাদের মারার জন্য ভগবান আসবেন।  তাদের এই বোঝাটা ঠিক হতে পারে। কিন্তু সাধুদের রক্ষার জন্য ভগবান আসবেন, এটা  ঠিক নয়। মনে রাখা দরকার, যে সাধু মনে করে, তার সুরক্ষার  দরকার, সে সাধুই নয়। আর কেউ তো মারাই যায় না, মারা যেতেই  পারে না, পুনর্জন্মে সে আবার আসবে, আর দুষ্টমি করবে। তাই দুষ্টদের বিনাশের জন্য শ্রীকৃষ্ণ এসেছিলেন, একথাটাও  ঠিক নয়। 
আসলে তথাকথিত সাধুরা এই ভেবে তৃপ্তি পায় মাত্র। বাস্তিবক পক্ষে, অন্তর যদি পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে, তবে দুষ্টকেও বন্ধু মনে হবে। আমরা লোকনাথবাবাকে জানি, তার আশ্রমে একটা হিংস্র সাপ এসে দুধ খেয়ে যেত। আমরা ভগবান শঙ্করকে দেখেছি, তার কাছে হিংস্র বাঘ এসে শুয়েছিল। দেওঘরে, এক সাধুর (ভোলা গিরি ) আশ্রম আছে, তাকে নাকি দুটো বাঘ পাহারা দিতো। যে কষ্ট দেয়, তাকে শত্রূ মনে করা সাধুর কাজ নয়। সাধুর অর্থই হলো, কাউকে শত্রূ মনে না করা। তাকে কষ্ট দিলেও শত্রূ মনে হবে না। আসলে তথাকথিত সাধুরা  বসে বসে এই সব  ভাবে। আমি বলবো, যারা সাধুর বেশ ধরে আছে, তারা ভাবে, যে আমাদের রক্ষার জন্য ভগবান আসবেন। তারা জানেনা, এই শ্লোক দ্বারা তথাকথিত সাধুদের উপহাস করা হয়েছে। অথবা এটা কবি কল্পনা মাত্র। আর সত্যি সত্যি ভগবান যদি এটা  বলে থাকেন, তবে জানবেন এর কোনো গভীর অর্থ আছে। যা আমি জানিনা। 

আর একটা কথা বলছেন,  যুগে যুগে আমি আসি। যুগে যুগে আমি আসি - এমন কথা কে বলতে 
পারে ? যিনি স্বাধীন। এই প্রকৃতির জগতে কেউ স্বাধীন নয়। সবই  প্রকৃতির অধীন। কারণের অধীন।  এমনকি ভগবান, যখন প্রকৃতির আশ্রয় নেন, স্থূল দেহ ধারণ  করেন, তখন তিনিও প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলেন, চলতে বাধ্য হন। তাহলে ভগবান কখন আসেন ? আর কেনোই বা আসেন ? আমরা সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজবো। 

আসলে ভগবান আপনার আমার সবার মধ্যেই আছেন । এই আমি-আপনি যখন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন হই, তখন আমাদের মধ্যে আসুরিক বৃত্তি ম্রিয়মান হয়ে, সুরবৃত্তির উন্মেষ ঘটে। আমাদের মধ্যেই তখন অসীম  ক্ষমতাসম্পন্ন শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। আমরা তখন অন্যের মঙ্গল কামনায় মঙ্গলকর্ম্মে লিপ্ত হই।  তখন আমাদের মধ্যে অসীম শক্তির আশ্রয় হয়, আর লোকহিতে আমরা প্রবৃত্ত হই। 

ভগবানের, অর্থাৎ  কৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্বের জন্ম যে কোনো সময় হতে পারে। সব পরিস্থিতিই তার পক্ষে অনুকূল। এমন কোনো পরিস্থিতি নেই, যখন তিনি আসতে  পারেন না। আবার, কোনো বিশেষ কাল বা পরিস্থিতি, কৃষ্ণের মতো মানুষের জন্মের অপেক্ষায় থাকে না। কোনো কারন ছাড়াই কৃষ্ণের মতো মহামানবের জন্ম হতে পারে। চেতন পুরুষের জন্য সর্ব কাল-ই সমান। অচেতন ব্যক্তির জন্মের জন্য কালের অপেক্ষা প্রয়োজন। চেতন পুরুষ সর্বকালে, সর্ব পরিস্থিতিতে আসতে  পারেন। অচেতন  পুরুষ পরিস্থিতির  দাস।  চেতন পুরুষ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে করে নেন। সময় তাকে অনুসরণ করে, তিনি সময়কে অনুসরণ করেন না। তিনি সময়ের পিছনে থাকেন না।  সময় তার পিছনে থাকে। এমন ভাবার কোনো কারন নেই যে খারাপ সময় না হলে তিনি আসবেন না। এই ধরনের ভাবনাটাই ভুল। খারাপ সময় মানে কি ? তথাকথিত সাধুদের  পক্ষে,  যারা নিজেদেরকে সাধু বলে জাহির করেন , এমন লোকের পক্ষে   খারাপ, সেই সময় শ্রীকৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্বের আগমন হয়। ব্যাপারতা আদৌ তা নয়। আমাদের প্রয়োজনে আদৌ শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন না। আমরা মনে করি, আমাদের রক্ষার জন্য, আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভগবান আসেন।  তার জন্মকে আমরা অন্য ভাবে দেখি না, দেখতে চাই না। অর্থাৎ ভাবখানা এমন যেন, দেখ আমি কত গুরুত্বপূর্ণ, আমাকে রক্ষা করার জন্য ভগবান স্বয়ং এসেছেন। 

যদি বাগানে  গাছে ফল হয়, আমি ভাবি আমার জন্য হয়েছে। আমি তার আস্বাদন পেতে চাই।  বাগানে যদি ফুল ফোটে, আমি ভাবি, আমার জন্য ফুটেছে। যদি গন্ধ ছড়ায়, আমি তা গ্রহণ করি, আর ভাবি, আহা  কি সুন্দর গন্ধ। কিন্তু ফলের গাছ, বা তার ফল যে কোনো জায়গায় হতে পারে। ফুল আমার জন্য গন্ধ দেয়  না। আমি ফুলের গন্ধ উপভোগ করি  মাত্র। ফল আপন খেয়ালে ফলে, বীজকে সুরক্ষিত রাখার  জন্য নিজেকে তৈরী করে।  আমরা ভাবি আমার খাবার জন্য ফল হয়েছে। এটা আমার বিচার মাত্র, বলা যায়, আমার স্বার্থে, আমি বিচারকে প্রভাবিত করি। একটা পিঁপড়েও আমার জন্য জন্মায় না।  এমনকি আমার সন্তানও আমার জন্য জন্মায় না। ফুল কারুর জন্য ফোটে না। নিজের জন্য ফোটে, অন্য কেউ তার গন্ধ পেতে পারে।  তাতে তার কিছু এসে যায় না। কৃষ্ণের মতো মানুষও কারুর জন্য জন্মায় না।  নিজের জন্য, নিজের আনন্দে জন্মায় , তাতে কারুর উপকার হতে পারে, কিন্তু তাতে তার কিছু এসে যায় না। এমন কোনো সময় আছে, এমন কোনো যুগ আছে, যখন কৃষ্ণ জন্মালে আমাদের উপকার হবে না? সব যুগেই কৃষ্ণকে দরকার। তারা সমস্ত যুগেই নিজের কাজে ব্যস্ত, আমরা ভাবি আমাদের জন্য এসেছেন, আমাদের জন্য করছেন। বিরাট শিশুরা আপন মনেই খেলে, আপন মনেই ভাঙে, গড়ে । আমরা কি ভাবে দেখছি, সেটা আমাদের ব্যাপার। দুঃখ ছিল না, এমন কোনো সময় নেই, দুঃখ থাকবে না এমন কোনো সময় হবে না। কৃষ্ণের মতো মানুষ সব যুগেই কাজে লাগবে। অসুর চিরকাল ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কৃষ্ণ এসেছিলো বলে সবাই শেষ হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। তারা আজও  আছে। মহাভারতের যুদ্ধের আগেও ছিল, পরেও ছিল। কৃষ্ণ বর্তমান থাকতেই ছিল। মহাভারতের যুদ্ধের পরে, যখন শান্তির রাজ্য স্থাপন করবার উদ্দেশ্যে, ভীম গান্ধারে  শান্তি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন শকুনির ছেলে উলুখা অর্থাৎ গান্ধারীর ভাই-এর ছেলে, বা দুর্যোধনের মামাতো ভাইতো ভীমকে শান্তি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে, যুদ্ধে আহ্বান করেছিল। এসব তো মহাভারতের যুদ্ধের পরের ঘটনা ।  আসলে সব সময়  সবই  থাকে। আমরা আসলে সবকিছু, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। আমাদের কোনটা কাজে লাগবে আর কোনটা কাজে লাগবে না। আমাদের একটা সীমারেখা আছে।  আমরা সব কিছুর মধ্যে আমাদের উপযোগিতার কথা ভাবি। আমার কোনটা কাজে লাগবে আর কোনটা কাজে লাগবে না। যেটা আমার কাছে কাজে লাগবে না, তার কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই। কিন্তু, ভগবানকে উপযোগিতার মধ্যে খুঁজতে গেলে, তাকে পাওয়া যাবে না। সূর্য উত্তাপ দেয়  আপনার উপযোগিতার ভেবে নয়। এটা তার স্বভাব। মেঘ বৃষ্টি দান করে,  আপনার কথা ভেবে নয়।  এটা তার স্বভাব। বাতাস আপন মনে বয়ে চলে। আপনি তার কাছ থেকে কি নেবেন, আর কি নেবেন না এটা আপনার বিষয়। মেঘ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির জল  মাঠের চাষের কাজে লাগাবেন, না আপনার তৃষ্ণা মেটাবেন এটা আপনার ব্যাপার। এতে  মেঘের কিছু এসে যায় না।  তাই একথা ভাবা ঠিক নয়, কৃষ্ণ আমাদের কারুর জন্য জন্মে ছিলেন।  তিনি না সাধুর না অসাধুর। তুমি তার কাছ থেকে কি পাচ্ছো, কি পাচ্ছো না সেটা তোমার ব্যাপার। মানুষ ভাবে, তার অহংকে কেন্দ্র করে। সে ভাবে, কৃষ্ণ জন্মায় আমাদের জন্য, ফুল ফোটে আমাদের জন্য, সূর্য কিরণ দেয় আমাদের জন্য। চাঁদের আলো আমাদের জন্য। মেঘের বৃষ্টি আমাদের জন্য। ব্যাপারটা উল্টো।  ওদের জন্য, অর্থাৎ সূর্যের জন্য, চাঁদের জন্য, মেঘের জন্য, নদীর জন্য, পাহাড়ের জন্য, সমুদ্রের জন্য আমরা বেঁচে আছি। ওঁরা  আমাদের জন্য আসেও না, যায়ও না। তাই কৃষ্ণ সাধুদের জন্য এসেছিলো, এর থেকে হাস্যকর কথা আর কিছু হতে পারে না। ভগবানের রসিকতা। আসলে মহাপুরুষের জন্মের বহু পরে তার সম্পর্কে লেখা হয়। তার কথা লেখা হয়। অনেক প্রচিলিত কাহিনী, কবি তার নিজের ভাষাতে লেখে।  ভগবানের মুখে সেই কথা গুলো বসায়, যা সে বিশ্বাস করে, যা সে ভগবানের কাছে পেতে চায়। তাই ভগবান কি বলেছিলো, এটা বড়ো কথা নয়, আমি ভগবানকে দিয়ে কি বলাতে চাই, ভগবানের কাছে কি শুনতে চাই, তাই ভগবানের মুখে বসাই। এতে অবশ্য ভগবানের কিছু আসে যায় না। ভগবান আপন খেয়ালে লীলা করেন। আমি যা দেখতে চাই, তাই দেখি, যা শুনতে চাই, তাই শুনি। সূর্য উঠলে আপনি বাড়ী বসে আলো পাবেন, সেই আলো, সেই উত্তাপ আপনি কি ভাবে ব্যবহার করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।গরিবের ঘরেও যাবে, বড়োলোকের  ঘরেও যাবে। আপনি নিজেকে আড়াল করবেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার। তবে এটাও বলি ওই আড়ালও  তারই লীলা।  ভগবান কোনো বিরোধিতা করবে না, আবার সংগতও  করবে না। তার খেলা সে খেলবে। ভগবান কারুর জন্য আসেন না, কারুর জন্য আসা বন্ধও করেন না। পরিস্থিতি তাকে জন্মায় না।  তিনিই পরিস্থিতির জন্ম দেন। 

পরিস্থিতির কথা যখন এলো, একটা কথা বলি, আমরা পরিস্থিতির দাস। সামাজিক পরিস্থিতি, পরিবেশ, ব্যক্তির  ব্যক্তিস্বত্বাকে বা ব্যক্তিত্বকে জন্ম দেয়। পরিবেশ মানুষকে খারাপ করে, পরিবেশ মানুষকে ভালো করে। পরিস্থিতি মানুষকে উন্নতিতে সাহায্য করে।এইসব  কথা  দুর্বলের ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য। কৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি : বাদশা আকবরের দরবারে বীরবল নাম এক পণ্ডিত ছিলেন। একদিন বাদশা বীরবল  জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা  বলতো বীরবল, হিন্দুরা যে বলে, মানুষের সংকটে, মানুষের বিপদে, ভগবান দেহ ধারণ করেন, মানুষের উদ্ধার করতে, এটা  কি সত্যি? ভগবানকে নিজে কেন আসতে  হবে ? আমরা বাদশারা তো আছি। নাকি ? তো বীরবল নিশ্চুপ রইলেন। বাদশা কিছু বললেন না, পাছে বীরবলের ধর্মে আঘাত লাগে। কিছু দিন পরে, যমুনায় নৌকা বাইচের আয়োজন হয়েছে।  আকবরের ছেলে সেলিম, সেই উৎসব দেখছিলো বজরা থেকে। চারিদিকে উৎসবের মেজাজ। হঠাৎ গেল গেল রব উঠলো। যুবরাজ সেলিম লাফালাফি করতে গিয়ে, বজরা থেকে পড়ে  গেছে। চারিদিক থেকে তাকে উদ্ধার করতে মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। একবার বাদশা   নিজেও উদ্দত হলেন, ঝাঁপ দিতে। বীরবল তাকে নিষেধ করলেন। বীরবলের আদেশে, দেহরক্ষীরা তাকে ধরে রাখলেন। কিন্তু রাজা রেগে অস্থির। বীরবলকে এই মারে কি সেই মারে। রাজা বলছেন - আমাকে ছেড়ে দাও। আমি যাবোই। আমার ছেলে ডুবে যাচ্ছে, আমি তাকে উদ্ধার করতে যাবো না ? বীরবল বললেন, আপনি নিশ্চিত থাকুন, এই দেখুন, আপনার ছেলে। গুস্তাফি মাফ করবেন। আপনি যাকে  ডুবতে দেখছেন, সে আপনার ছেলে নয় , এটা আমার সাজানো ব্যাপার। আসলে ছেলে যখন ডুবতে বসে, তখন বাবা অস্থির হয়, উদ্ধার করতে আসে।  পরমপিতাও  সন্তানের উদ্ধারে  তাই  ধরাধামে আসেন ।  এটাই হিন্দুদের বিশ্বাস। 
       
তবু আমি বলি, কোনো পরিস্থিতিই কৃষ্ণকে জন্ম দিতে পারে না। কোনো পরিস্থিতিই  কৃষ্ণের জন্মের জন্য আবশ্যক  নয়। এমন কোনো পরিস্থিতিই নেই যা কৃষ্ণের মতো ব্যক্তির জন্ম দিতে পারে। কৃষ্ণ শুধু জন্মায়।  আর পরিস্থিতি তার পিছন পিছন যায়। কৃষ্ণ যখন জন্মায় তখন সমাজ তার পিছন পিছন চলে। কৃষ্ণ সমাজের পিছে চলে না। এটাই ভগবান আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য। মহাপুরুষ পথ দেখান, পথ তৈরি করেন।  আমরা পথের দাস, ওঁরা পথের  স্রষ্টা। আমরা পরিস্থিতির দোহাই দেই। ওঁরা পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনেন। আমরা পথ খুঁজি তাই কষ্ট পাই। আর ওঁরা যেখান দিয়ে যান সেটাই পথ হয়ে যায়। ওঁরা আনন্দে ঘুরতে বেরোন, আমরা উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুরে বেড়াই।  তাই না পাবার  বেদনা হয় আমাদের, ওনাদের ঘোরাতেই আনন্দ। তাই ভগবান সদাই আনন্দে থাকেন।  আমরা উদ্দেশ্যপূরণের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশ, উনি বেড়ানোর আনন্দে মশগুল। ভগবানের জন্ম কার্য-কারণের উর্ধে। ভগবান আমাকে পথ দেখিয়েছেন, মানে এই নয় যে উনি আমাকে পথ দেখাবার জন্য জন্মে ছিলেন, আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি পথের  সন্ধান চেয়েছিলাম, উনি বলে দিয়েছিলেন। উনি আমার জন্য পথে দাঁড়িয়েছিলেন তা নয়, উনি ছিলেন তাই বলে দিলেন। গীতা এই পথের সন্ধান দাতা। 

চেতনা চিরকালই স্বাধীন।  তাকে কেউ বাঁধতে পারে না।  একটা গল্প শুনেছিলাম, এই গল্পটা বলি   : এক  জ্যোতিষী খুব নাম করেছে। সে নাকি যা বলে তাই খেটে  যায়। এক সন্দিহান  যুবকের মনে দুষ্ট বুদ্ধি এলো।  সে জ্যোতিষীকে মিথ্যা প্রমান করার জন্য শীতের রাতে, চাদরের মধ্যে একটা কুকুরের বাচ্চা  লুকিয়ে নিয়ে, গ্রামবাসীদের নিয়ে চললো জ্যোতিষীকে মিথ্যা প্রমান করবার জন্য। জ্যোতিষী বাড়ির ভিতরে ছিল। ছেলেটি বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করলো, আমি একটা বাচ্চা  নিয়ে এসেছি। বলুনতো বাচ্চাটা  মৃত না জীবিত। ছেলেটি ভেবেছিলো, জ্যোতিষী যদি বলে মৃত তাহলে, জীবিত কুকুরের বাচ্চাকে  বের করে দেখাবো।  আর যদি বলে জীবিত তাহলে, চাদরের মধ্যেই বাচ্চাটাকে  মেরে দেখাবে, যে বাচ্চাটি  মৃত। জ্যোতিষী কিন্তু মজার জবাব দিলো : বললো বাচ্চা  তোমার হাতে,তার প্রাণ ও তোমার হাতে। তোমার যা ইচ্ছা তাই করো। 

তাই জীবন আমাদের হাতে। আমি কি ভাবে বাঁচবো সেটা আমাদেরই ঠিক করে নিতে হবে। কৃষ্ণের মতো মহামানবের জীবন তো পুরোপুরি তারই হাতে। বাসনা থেকেই জন্ম। আমাদের জন্ম ভোগের জন্য। ভগবানের জন্ম ভোগাতীত। তিনি কাউকে বাঁচাবার জন্য জন্মান না।  হ্যাঁ কেউ যদি  বেঁচে যায়, সেটা আলাদা কথা। ফুল ফোটে আপন খেয়ালে।  হ্যাঁ আপনি  সুগন্ধ পান সেটা আলাদা কথা। মেঘ আপন মনে ভেসে বেড়ায়। নদী আপন মনে বয়ে যায়।  বাতাস আপন খেয়ালে চলে। সূর্য তার গতিপথে প্রতিনিয়ত চলছে। তার সকালও  নেই, সন্ধ্যাও নেই। আমরা কেবল সকাল-সন্ধ্যা দেখি। আমরা কারনের  জন্য বেঁচে আছি। আমরা ভালোবাসি, তারও  কারন আছে। আমরা কারন খুঁজি, তাই কারন দেখি। প্রকৃতি অকারনেই সব দিচ্ছে।  ভগবান অকারণেই আসছে, যাচ্ছে। আমরা আমাদের মতো কারন আরোপ করছি। যেদিন সব কারন ভুলে যাবো, সেদিনই আমার ভগবান আসবেন।

এখন শ্রীকৃষ্ণকে আরো একটু গভীরে বোঝার চেষ্টা করবো। যদিও শ্রীকৃষ্ণকে আদৌ বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যাবে না, কিন্তু আমাদের আর কিই বা আছে। ধার্মিক লোক শান্তির খোঁজে  সংসার ছেড়ে  বেরিয়ে যায়। এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সংসারের ঝামেলায় থেকে, সংসারের সংঘর্ষের মধ্যে কেউ শান্তিকে খুঁজছে, এটা বোঝা খুব মুশকিল হয়ে যায়। আসক্তি ত্যাগ করে কেউ নিজেকে পবিত্র রাখছে, এটা বোঝা সহজ। কিন্তু ভোগের মধ্যেও কেউ পবিত্র থেকেছে, এটা বোঝা খুব মুশকিল। যুদ্ধ না করে শান্তিতে থাকা যায়, এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু যুদ্ধও করবো আবার শান্তিতে থাকবো, এটা বোঝা দুরূহ। বালক কৃষ্ণ যদি কোনো মেয়েকে বিরক্ত করে সেটা আমরা মেনে নিতে পারি, কিন্তু যুবা  কৃষ্ণ  যখন মেয়েদের বিরক্ত করে, নগ্ন করে, তখন তাকে বোঝা খুব শক্ত। আসলে এই বোঝার কোনো মাপকাঠি নেই।  আমি আমার বোধ বুদ্ধি, বিচার দিয়ে ঘটনার বিচার করি। তাই আমরা যারা গীতার শ্রীকৃষ্ণকে চাই, তারা ভাগবতের শ্রীকৃষ্ণকে চাই না। কারন তাকে তখন আমার বুঝতে কষ্ট হয়। সুরদাস নিজের চোখকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন, বালক শ্রীকৃষ্ণের রূপ ধরে রাখবেন  বলে। যুবা শ্রীকৃষ্ণ তার কাছে অসহ্য ছিলো ।

শ্রীকৃষ্ণ কখনো, সম্মানের জন্য, মর্যাদার জন্য কাজ করেন নি। তাই প্রয়োজনে ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি লক্ষে স্থির। তিনি হিংসা-অহিংসাকে আলাদা করে দেখেন নি। আসলে হিংসা তার কাছে অর্থহীন, আবার অহিংসাও  নিরর্থক। তাই তিনি এ সবের উর্দ্ধে অসীম। মারা বা না-মারার মধ্যে তিনি পার্থক্য দেখেন না। তাঁর উচ্চস্তরের অধ্যাত্ম-বোধ, যুদ্ধকেও ছেলেখেলা মনে করেন । তিনি পরম-আত্মার ও জীবাত্মার বা এই শরীরের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না। প্রকৃতি ও পরমাত্মার মধ্যেও কোনো পার্থক্য দেখেন না। আসলে, দৃশ্যমান জগৎ প্রকৃতি, আর প্রকৃতির অদৃশ্য ভাগ পরমাত্মা। পরমাত্মা ও প্রকৃতিতে কোনো পার্থক্য নেই। এই সত্য শ্রীকৃষ্ণ খুব ভালো ভাবে বুঝতেন। তাই তার কাছে যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু অর্জুনের কাছে আছে।  আমাদের কাছে আছে। আসলে বড়  হতে গেলে গভীরে যেতে হবে। উঁচুতে যেতে গেলে নিচুতে যেতে হবে। ইমারত যত উঁচু হবে, ভীত্ ততো গভীরে হবে।  এই সত্য বুঝতে হবে। আমরা যদি ভালো থাকে চাই  তবে খারাপ থাকতে হবেই। স্বর্গ-নরক পরিপূরক, একটা বাদ  দিয়ে আর একটা হয় না। কামনা ও সৃষ্টি এক সঙ্গে চলে।  একটাকে বাদ  দিয়ে অন্যটা হয় না। এই সত্য আমাদের বুঝতে হবে, তবেই আমরা শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে পারবো।

একটা কথা বলি, কিছু লোক চিরকাল থাকেন, যাদের  আমরা বুঝতে পারি না, তাদেরকে  আমরা কেউ পাগল বলি, কেউ ভগবান বলি। নিজেকে যারা বুদ্ধিমান মনে করে, তারা অন্যকে পাগল বলে। আর যারা সহজ সরল তারা ওই একই ব্যক্তিকে ভগবান বলেন । শ্রীরামকৃষ্ণের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। আসলে আমার অজ্ঞানতা স্বীকার করা কঠিন। কিন্তু সত্য যেটা তা হচ্ছে, আমরা ভগবানকে বুঝতে পারি না। আবার পাগলকেও বুঝতে পারি না। আসলে ভগবানকে আমরা বুঝতে পারি না, ধরতে পারি না।  ভগবান আমাদের কাছে অধরা। তাই হয় তার পূজা করি, নয় তাচ্ছিল্য করি। দুই ধরনের লোকই থাকেন চিরকাল। যাঁরা সমকালীন, তাদের আমরা বুঝতে পারি।  যারা ভবিষ্যতের তাদের আমরা বুঝতে পারি না। তারা মৃত্যুর পরে পূজা পায় ।  আর বেঁচে থাকাকালীন, তাদের কপালে জোটে তাচ্ছিল্য, বা নির্যাতন। কৃষ্ণকেও আমরা আজও বুঝতে পারি না। কখনো তার ঠোঁটে বাঁশি, কখনো ময়ূর পালক নিয়ে নাচ। আবার এই শ্রীকৃষ্ণ শস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে। সত্যি কথা বলতে কি শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে। শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।                 
ওং নমঃ শিবায়ঃ ।
ওং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়ঃ।
ওঁং নমঃ মহাত্মা গুরুনাথায়ঃ।
ওম শান্তিঃ, শান্তিঃ, শান্তিঃ। ।
    

   




Wednesday, 31 October 2018

সত্যধর্মের আলোতে গুরুতত্ব -৫



সত্যধর্মের আলোতে গুরুতত্ব -৫



এতক্ষন আমরা কথা বলছিলাম ভক্তির বহিরঙ্গ সাধনা নিয়ে।  অর্থাৎ গুরুজনদের প্রতি ভক্তি নিয়ে। আসলে গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথ  সাধনার কথা  বলতে গিয়ে, তিনটি জিনিসের উপরে খুব জোড় দিয়েছেন।  সেটা হচ্ছে প্রেম, ভক্তি ও একাগ্রতা। ভক্তির কথা যখন উঠেছে, তখন আমরা ভক্তির বহিরঙ্গ সাধনার সঙ্গে সঙ্গে , ভক্তির অন্তরঙ্গ সাধনার কথাও একটু আলোচনা করতে চাই।

আপনারা যারা গীতা পড়েছেন, তারা জানেন, এই ভক্তির উপরে গীতায় একটা পুরো অধ্যায়  আছে। গীতার  দ্বাদশ অধ্যায়, এর নাম-ই হচ্ছে "ভক্তিযোগঃ" । এখানে কুড়িটা শ্লোক আছে।

 ১৪ নং শ্লোকে যোগেশ্বের বলছেন, : 

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ় নিশ্চয়ঃ 
ময়ি অর্পিত মনোবুদ্ধিঃ যঃ মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।

যে  যোগী  সদা সন্তুষ্ট, যিনি আমাতে দৃঢ় নিশ্চয়, যার মন ও বুদ্ধি আমাতে অর্পিত এইরূপ আমার ভক্ত, আমার প্রিয়। 

১৬ নং শ্লোকে বলছেন :

অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ 
সর্বারম্ভ পরিত্যাগী যে মদ্ভক্ত স মে প্রিয়ঃ। 

যিনি সব বিষয়ে অনপেক্ষ অর্থাৎ নিস্পৃহ বা সব বিষয়কেই যিনি উপেক্ষা করতে পারেন, যিনি শুচি, অর্থাৎ শুদ্ধ, সর্ব কর্মে যিনি দক্ষ, যিনি সব সময় অর্থাৎ সুখে দুঃখে উদাসীন, যিনি কোনো কিছুতে ব্যথিত হন না,  যিনি কোনো কাজের সৃষ্টি করেন না, এইরূপ আমার ভক্ত, আমার প্রিয়।

এমনিতর আরো কতকগুলো শ্লোক আছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি আমাপরায়ন সেই ভক্ত আমার প্রিয়। কেমন ভক্ত তিনি চান, অর্থাৎ ভক্তের গুন্ বা স্পষ্টীকরন করেছেন।  কিন্তু ভক্তি কাকে বলে।  সেব্যাপারে গীতায় কিছু নেই। 

এইবার আমরা মহাত্মা গুরুদেবের "সত্যধর্ম" বইটা একটু দেখি। গুরুদেব বলছেন " ভয়ে ভয়ে ভালোবাসাকে ভক্তি বলে। " অর্থাৎ ভয় থেকে ভক্তি। কিন্তু সঙ্গে  থাকবে ভালোবাসা। এখন ভয় আমরা কাকে করি। যিনি আমাদের থেকে শক্তিশালী। যিনি আমাদের থেকে উন্নত। তাকেই আমরা ভয় করি। গুরুদেব আবার বলছেন  "প্রেমের সীমাবদ্ধ ভাবকে ভক্তি বলে।" অর্থাৎ একটু প্রেম একটু ভয় - এর থেকেই ভক্তির উৎপত্তি। আমরা এর আগে আলোচনা করেছি গুরুজনদের প্রতি ভক্তি। গুরুজন সব সময় ভালোবাসার পাত্র নাও হতে পারে, কিন্তু সত্য কথা বলতে কি গুরুজনদের প্রতি আমাদের  একটু একটু ভয় থাকে। পিতা মাতাকে আমরা  ভয়ও করি আবার ভালোও বাসি। এইখানেই ভক্তির উদ্রেক। এই ভয় ও ভালোবাসাই মিশ্রিত অবস্থাই  ভক্তি। গুরুদেবদের ক্ষেত্রেও তাই,  একটু দূরে দূরে থাকি, আবার ভালোও লাগে।  এটাকেই ভক্তি বলে। 

এখন ভক্তির কি ভাবে উৎপত্তি হয় ? 
গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথ  বলছেন,  যেখানে নিজের স্বার্থের জন্য নির্ভরতা আছে, আবার একটু অনুরাগ বা আসক্তিও আছে, সেখানেই ভক্তির সৃষ্টি।
গুরুদেব বলছেন ছোট বেলায় আমাদের ভক্তি শ্রদ্ধা বলে কিছু থাকে না। ভালো মন্দ জ্ঞান থাকে না। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে ভেদ জ্ঞানের সঞ্চার হয়। আমার খিদে পেলে যে আমাকে খেতে দেয়, আমি ব্যথা পেলে যে আমাকে  আদর করে,
আমার অস্বস্তি হলে যে আমাকে স্বস্তি এনে দেয়, তারসঙ্গে  তখনআমার, আমি-আমার বলে একটা মমতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আমি তোমার, তুমি আমার। এখান থেকেই ভক্তির উৎপত্তি হতে আরম্ভ করে। এখন এটা কেন হয় ? গুরুদেব বলছেন : ১. করুন রস অর্থাৎ  আমি যার কাছ থেকে করুনা চাই,  মমতা চাই, তার প্রতি আমাদের ভক্তির ভাব জন্মায়।  
২.এছাড়া, স্বভাবজাত ভাবে উৎপাদকের প্রতি অর্থাৎ আমাদের জন্মদাতার প্রতি, পালনকর্তার প্রতি, আমাদের একটা স্বাভাবিক কৃতজ্ঞতা আপনা থেকেই জন্মায় । 
৩. আমার নির্ভরতা - অর্থাৎ আমার বেঁচে থাকাটা যার উপরে নির্ভর করে, তার প্রতিও আমাদের স্বাভাবিক ভক্তি জন্মায়। 
৪. যিনি আমাকে স্নেহ করেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই আমার ভিতরে ভক্তির উৎপন্ন হয়। 
গুরুদেব বলছেন, ভক্তি দুই প্রকার : পার্থিব ভক্তি ও ঈশ্বর ভক্তি। পার্থিব ভক্তি অর্থাৎ মাতাপিতা, গুরুজন, গুরুদেব প্রভৃতিদের প্রতি ভক্তিই পার্থিব ভক্তি।  যা নিয়ে আমরা আগে আলোচনা করেছি। এবার আমরা ঈশ্বর ভক্তি নিয়ে  কিছু আলোচনা করবো। 
বহিরঙ্গ ভক্তি থেকেই অন্তরঙ্গ ভক্তির উদ্রেক হয়। অর্থাৎ আধ্যাত্বিক জগতে যিনি আমাদের হাত ধরে নিয়ে যান, অর্থাৎ গুরুদেব আমাদের ভক্তিভাজন। এই গুরু ভক্তি স্বাভাবিক ভাবেই হওয়ার কথা।  অর্থাৎ যার গুন্ তোমাকে আকর্ষণ করে, তার উপর স্বাভাবিক ভাবেই ভক্তি জন্মায়। আসলে গুরুদেবরা ভীষণ স্নেহপ্রবণ হন, নিঃস্বার্থ হন, এবং তারা ঈশ্বর ভক্তিতে আপ্লুত থাকেন, তাই   স্বাভাবিক ভাবেই তাদের প্রতি একটা শ্রদ্ধা ভক্তি আমাদের ভিতরে জেগে ওঠে। আমাদের ভিতরে একটা ব্যাকুলতা জন্ম নেয়। এটা আপনা আপনি হয়। এই ব্যাকুলতা যখন বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ এক এক সময় মনে হয়, গুরুদেব কেন এত ভালো, কেন এতো আকর্ষণীয়, গুরুদেব কেন এত স্নেহশীল, অর্থাৎ তার এই গুন্ আমাদেরকে ভাবায়, আমাকে ব্যাকুল করে তোলে, আর যখন আমরা বুঝতে পারি যে ঈশ্বর জ্ঞান, ঈশ্বর অনুভূতি, গুরুদেবকে আমার মনের  মতো করে তুলেছে,  তখন আমরা তার সন্ধানে বের হই।  গুরুদেবের স্বরণাপন্ন হই, এবং সেই অসীম-অনন্ত-করুনাময়-পরমপিতার আশ্রয়ে যেতে ইচ্ছে করে। তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।  এই ভালোবাসা প্রেমে পরিণত হয়।  আমরা ঈশ্বরময় হয়ে যাই। গুরুদেব বলছেন, এই ঈশ্বরপ্রেম পূর্ণ ভাবে কখনো হয় না, এবং ঈশ্বর ভক্তির কখনো লয়  হয় না। পার্থিব ভক্তি এক সময় চলে যায়, কিন্তু ঈশ্বর ভক্তি বাড়তেই থাকে। গুন্ সাধনা যত বৃদ্ধি পায়, আমাদের মধ্যে অনন্ত  বিষ্ময়  মুহুর্মুহু বাড়তে থাকে আর ভক্তি বাড়তে থাকে। জন্ম জন্মান্তর ধরে আমাদের এই ভুবুক্ষা ঈশ্বর-প্রেম সাধনায় লিপ্ত করে। মানুষ্য জীবন এই প্রেম সাধনার জন্য। 

সবশেষে বলি, পার্থিব ভক্তিকে ধীরে ধীরে, মোড় ঘুরিয়ে, ঈশ্বরের দিকে দেবার উপরে জোড় দিতে হবে।  জগতের প্রতি ভালোবাসাকে, ভক্তিকে ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে পরিণত করতে হবে।  ত্যাগের দ্বারা ঘৃনাকে জয়  করতে হবে।  ঈশ্বরে আত্মসমর্পন দ্বারা ভয়কে জয়  করতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের স্মরণ-মনন চাই।  এর জন্যই গুরুদেব যেমন বীজ মন্ত্রের সাহায্য নিতে বলেছেন, তেমনি ভক্তিমূলক সঙ্গীত ও প্রার্থনাকে সহায় করতে বলেছেন। আধ্যাত্মিক জীবনে সকল বাধা দূর হয়ে যাবে, যদি গুরুদেবের অর্থাৎ মহাত্মা গুরুনাথের কথা মতো কাজ করা যায়। এর ফলে আধ্যাত্মিক জীবনে সব বাধা দূর হয়ে ঈশ্বর দর্শন সম্ভব হবে।    
  
মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্তের পরবর্তী নির্দেশ :

৩) সর্বদা সত্য কথা বলবে। 
আমরা অনেক সময় শুনি, সাধন ভজন তো করছি কিন্তু আমাদের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে একটা সুন্দর গল্প আছে। গল্পটা রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন। এক চাঁদনী রাতে কয়েকজন মাতাল নৌকা-বিহারে যাবে বলে ঠিক করলো। সেই মতো নৌকায় উঠে দাঁড় বাইতে লাগলো। সারারাত ধরে দাঁড় বাইতে লাগলো। কিন্তু আশ্চার্য্য ব্যাপার হচ্ছে, নদীর পাড়ের তালগাছটা নাকি ওদের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। ওরা খুব মজা পেল, আরো জোরে,বৈঠা চালাতে লাগলো,  তালগাছটাকে  ছাড়িয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু তালগাছ ওদের সঙ্গ ছাড়লো না। এই করতে করতে সকাল হয়ে গেলো। নেশাও কেটে গেলো। আর দেখলো নৌকাটা বাঁধা  আছে তালগাছের সঙ্গে। আসলে আমরা সাধন ভাজন করি, সাধুসঙ্গ করি, কিন্তু আমাদের জীবনের নৈতিকতার গুরুত্ব দেই  না। উপাসনার আসর থেকে বেরিয়েই আমরা বিষয় চিন্তায় মগ্ন  হই। সাধনপথে  নৈতিক শৃঙ্খলা জরুরী। সত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে নিজেকে। সত্য বচন , সত্য চিন্তন, সত্য কার্যে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যোগঋষি পতঞ্জলি বলছেন - সত্যবাদিতার প্রতিষ্ঠার দ্বারা যোগী ক্রিয়া ছাড়াই ক্রিয়াফল লাভের শক্তি সঞ্চয় করে। কেবল নিজের জন্য নয়, সকলের জন্যেই। স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন, তোমার মধ্যে যখন সত্যের শক্তি অধিষ্ঠিত হবে, এমনকি স্বপ্নেও কখনো অসত্য উচ্চারণ করবে না, যখন তুমি চিন্তায়, কথায়, কর্মে সত্যবাদী হবে তখন তুমি যা বলবে তাই সত্য হবে. তখন যদি তুমি কাউকে বলো, "তুমি সুস্থ  হও" তৎক্ষনাৎ  সে সুস্থ  হয়ে উঠবে। অর্থাৎ সত্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির কথা  কখনো অন্যথা হবে না। মহাত্মা গুরুনাথ ও  সে কথাই বলেছেন। সত্য বলে বলতে এমন অবস্থা হয়, তিনি যা কিছু বলেন সব সত্য হয়ে ওঠে।  এইজন্য সত্যে প্রতিষ্ঠ ব্যক্তিকে সব সময় সজাগ থাকতে হয়, যাতে অমঙ্গলসূচক কোনো কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে না পরে। এঁরা সর্বদা স্বল্পভাষী হন। তো আধ্যাত্মিক জীবনে পবিত্রতা দরকার। আর এই পবিত্রতা অর্জন করতে গেলে, আমাদের সত্যবাদী হতে হবে। সত্য চিন্তন করতে হবে। চিত্ত শুদ্ধির জন্য, মনের পবিত্রতার জন্য, নিজেকে সত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।  নতুবা ধ্যান জ্ঞান যাই করো সবই বৃথা।       
     
৪) পরের দ্রব্য হরণ করবে না।

মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন পরের  দ্রব্য হরণ করবে না বা হরণ করার চিন্তাও করবে না।   


৫) জিতেন্দ্রিয় হবে।


রামকৃষ্ণদেব যুবকদের বলতেন, কামিনী কাঞ্চন থেকে দূরে থেকো। মেয়েদের বলতেন, পুরুষ মানুষের ফাঁস থেকে সর্বদা সাবধান থাকবে - তা সে নিকট আত্মীয় হলেও। চিন্তায় কথায় কাজে যদি নিজেকে পবিত্র না করা যায় তবে কেউ আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতি করতে পারে না। নিজের পূর্ন সত্ত্বার রূপান্তরের আগে, কামিনী-কাঞ্চনে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা অনেক সময় কর্তব্যের দোহাই দিয়ে, দয়ার দোহাই দিয়ে, সেবা করার নামে, আমাদের সুপ্ত বাসনাকে তৃপ্তি দিয়ে থাকি। এখান থেকে আমাদের বেরোতে হবে। আমাদের এমন স্তরে যেতে হবে যেখানে কোনো লিঙ্গভেদ নেই। জীবনের প্রথম স্তরে আমাদের এই লিঙ্গভাব থাকে। এখান থেকে আমাদের বেরোতে হবে। আমাদের ইন্দ্রিয় সংযম আনতে হবে। ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে, আমাদের অহং পবিত্র ব্যাক্তিত্ত্বের উদার গুণগুলি গ্রহণ করতে থাকবে।  আমরা রূপান্তরিত হবো। আমরা নিজেরদেকে পুরুষ বা নারী ভাবতে অভ্যস্ত। সেখানথেকে বেরিয়ে আমাদের মানুষ হতে হবে। ভেদাভেদ মুছে যাক। কামনা বাসনা, আধ্যাত্মিক যজ্ঞে বিসর্জন দাও। 


যদিও আমরা জানি, এগুলো পরিত্যাগ করা অত সহজ নয়। তাই মহাত্মা গুরুনাথ  বাস্তব কথা বলছেন।  তিনি বলছেন এগুলো সীমিত রাখো। সংযমে রাখো। ইন্দ্রিয় সুখে ইন্দ্রিয় সংযম হারিয়ো না।   


৬) আত্মহত্যা বা নরহত্যা করবে না।

কখনো আত্মহত্যার  কথা চিন্তা করবে না।  অকারণে কোনো জীবহত্যা করবে না। 


৭) যাতে বুদ্ধি বাড়ে, তার জন্য চেষ্টা করবে।

গুরুপ্রবচন শ্রবণ , ও অধ্যয়ন মানুষকে সৎবুদ্ধি প্রদান করে। প্রতিনিয়ত নিয়ম করে গুরুপ্রবচন শোনা উচিত।  অথবা গুরুগ্রন্থ পাঠ  করা উচিত। শুধু শ্রবণ বা অধ্যয়ন  নয়, মনন করা উচিত। অর্থাৎ কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। গূঢ়ার্থ বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এবং নিজের জীবনে সেগুলোর প্রয়োগ করা উচিত। 

  
৮)  ধৈর্য্য ও ক্ষমা গুনের সাধনা করবে।

তুমি যদি ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে চাও, তবে ধৈর্য সহকারে, নিরন্তর অনুশীলনী চালাতে হবে। অধৈর্য হলে হবে না। ধৈর্য্য -চ্যুতি হলে চলবে না। ঠিক সময়ে অবশ্যই তোমার ঈশ্বর-উপলব্ধি হবে। 


৯) শরীর ও মন পবিত্র রাখবে। 

অধ্যাত্ম জীবনে শরীর  ও মন দুটোকেই পবিত্র রাখতে হবে। দেখো, শরীর ছাড়া কোনো সাধনা সম্ভব নয়। তাই,  শরীর যাতে সুস্থ থাকে, তার জন্য নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। খাবারের বিষয়ে যেমন নিয়ম মেনে চলতে হবে, অর্থাৎ অতিরিক্ত খাওয়া বা অতি অল্প আহার, দুটোকেই বর্জন করতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। তোমার শরীরে যেটা সহ্য হয় সেই অনুযায়ী আহার নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে লোভ বর্জন করতে হবে। সব অঙ্গের কিছু কিছু ব্যায়াম নিয়ম করে, করতে হবে। কোনো কোনো সাধক আছেন, তারা শরীরকে  গুরুত্ত্ব দেন না। তারা অচিরেই শরীর পাত করেন।  এবং আবার তাদের শরীর ধারণ করতে হয় - সাধনার ক্রমোন্নতির জন্য। শরীরকে ভুলতে চাইলেও শরীর সুস্থ রাখতে হবে। তোমার কোনো অঙ্গে বেদনা হলে, তোমার মন সেদিকে চলে যাবে, সাধনার ব্যাঘাত হবে। তাই শরীরকে সুস্থ রাখা অবশ্য কর্তব্য। 


শুধু শরীরকে সুস্থ রাখা নয়।  তোমার মনকেও সুস্থ রাখতে হবে। শরীর ও মনের সমন্বয় সাধন হলে তবেই আধ্যাত্মিক পথে এগোনো যাবে। কেউ কেউ বলেন, পরমাত্মা তো শরীর,  মন বুদ্ধির ওপারে। তো শরীর, মন -এর ওপারে যেতে গেলে তো মনটাকেও ডিঙোতে হবে।আসলে শরীরকে যদি ভুলে থাকতে চাও, তবে শরীরকে সুস্থ অবস্থায় রাখতে হবে। তুমিতো, একচোটে ছাদে যেতে পারবে না। তোমাকে সিড়ি পেরোতে হবে। সিড়ি যদি শক্ত না হয়, তবে ভর দিলেই তা ভেঙে পড়বে।  অতএব শরীর, মন সবাইকে শক্ত করতে হবে। কঠোপনিষদ বলছে - শরীর হচ্ছে রথ। ইন্দ্রিয় হচ্ছে ঘোড়া।  মন হচ্ছে লাগাম।  বুদ্ধি হচ্ছে সারথি। আত্মা হচ্ছে রথস্বামী।  এগোতে গেলে এদের সবার ভালো থাকা দরকার। সতর্ক থাকার দরকার। যাতে বিপদ না ঘটে।  রথস্বামী(আত্মা) যেন জাগ্রত থাকে, সারথী (বুদ্ধি) যেন সতর্ক থাকে, মন (লাগাম) যেন ইন্দ্রিয়গুলোকে (ঘোড়া) বশে রাখে। তবেই রথ  ঠিক মতো চলবে। 


মনকে সুস্থ রাখতে গেলে আমাদের প্রাণায়াম অভ্যাস করতে হবে।  কিছু আসনের অভ্যাস করতে হবে। এগুলো প্রতিনিয়ত করলে, ব্যষ্টিমন ও সমষ্টিমন -এর মধ্যে একটা যোগাযোগ সংগঠিত হয়। এবং সাম্যাবস্থা বজায় থাকে। শরীর ও মন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। শরীরে ব্যাধি  হলে,  মন বিক্ষুব্ধ হবে। মন চঞ্চল হলে,মন অস্থির হলে, জগদীশ্বরের উপাসনাও হবে না।  মন সংযত না হলে ধ্যানও  হবে না। আবার ধ্যান না করলে মনও  সংযত হবে না। তাই মন ঠিক রাখতে, একদিকে যেমন প্রাণায়াম করবে, তেমনি প্রাণায়ামের পরে ধ্যান করবে।   

১০) প্রতিদিন গুরুমূর্তি ধ্যান করবে।

ধ্যান হলো নিজের মনে নিরবিচ্ছিন ভাবে ঈশ্বর সন্মন্ধে একনিবিষ্ট চিন্তা চালাতে থাকা। এটি তিন ভাবে করা যেতে পারে : ১) নিরাকারের ধ্যান ২) প্রতীকের ধ্যান  ৩) সাকারের ধ্যান। প্রথম দিকে সাধকের পক্ষে নিরাকারের ধ্যান এমনকি প্রতীকের ধ্যানও সম্ভব হয় না। সাকারের ধ্যান করা  সহজ।  অর্থাৎ কোনো দেবতার মূর্তির ধ্যান। কিন্তু এই দেবতা সন্মন্ধে তোমার কোনো ধারণা নেই। তার যে মূর্তির পূজা তুমি দেখেছো, বা তার যে গুন্ তুমি শুনেছ সেটুকুই তোমার সঞ্চয়। কিন্তু দেহধারী গুরুকে তুমি চাক্ষুস দেখেছো, তার গুন্ সম্পর্কে তোমার সম্যক  ধারণা আছে। তাই  মহাত্মা গুরুনাথ, প্রথমে গুরুমূর্তি ধ্যান করতে বলছেন। আসলে প্রথমে, গুরুমূর্তির ধ্যান  - তারপরে গুরুদেবের গুনের ধ্যান করতে হয়। ধীরে ধীরে অনন্তের গুনের ধ্যানের যোগ্য হয়ে উঠতে পারি আমরা।   


প্রাথমিক এই উপদেশগুলি যে কোনো আধ্যাত্মিক সাধকের অবশ্য পালনীয়। মহাত্মা গুরুনাথ, ধর্মার্থীদের কর্তব্য সম্পর্কে  আরো অনেক কথা বলেছেন।  সেই সব বিস্তারিত আলোচনা না করে, আসুন আজ থেকে আমরা এই দশটা কর্তব্য কর্ম পালন করি।


Friday, 21 September 2018

সত্যধর্ম - গুরুতত্ত্ব (চতুর্থ ভাগ )

সত্যধর্ম - গুরুতত্ত্ব
গুরুবিনা কি সাধন হবে না ? (চতুর্থ  ভাগ )


অধ্যাত্ম জীবনে সাহায্য নেওয়া বা দেওয়া :


গুরুতত্ব সম্পর্কে  লিখতে লিখতে এক সময় মনে হয়, আমার নিজেরই তো জ্ঞান হয় নি।  আমার নিজেরই তো মুক্তি হয় নি। তো আমি আবার জ্ঞান দেওয়া শুরু করেছি। গুরুদেবতো বলেছেন উপযুক্ত গুরু না পেলে চিরজীবন গুরুহীন থাকা ভালো। আমি যা বলছি তা তো এক রকম গুরুগীরি। এটা কি একটা প্রবঞ্চনা নয় ? 

আসলে আমার নিজের মনে হয়, অধ্যাত্ম জীবনে প্রথম প্রথম সংগঠিত ভাবে এগোতে পারলে ভালো হয়। অর্থাৎ সৎসঙ্গ খুব জরুরি।  আর তা ছাড়া একটু ভাবুন,  আমরা তো সবাই শৃঙ্খলে আবদ্ধ। বন্ধনে আবদ্ধ।  এক জনের হাত আর একজনের হাতে  বাঁধা। আমরা কারারুদ্ধ। আমাদের সামনে খাবার আছে জল আছে। দেখছি কিন্তু খেতে পারছি না।  আমরা এই শৃঙ্খলবদ্ধ হাত দিয়েই  কিন্তু অন্যদের খাইয়ে দিতে পারি।  তো  একজন  আর এক জনকে যদি খাইয়ে দেই, তবে আমাদের সবার ক্ষিদে মিটতে পারে। দর্শনটা এখানেই।  আমি নিজের ভালোর জন্য, অপরের ভালো করতে চাইছি। নিজের ক্ষিদে মেটানোর জন্য অপরকে খাইয়ে দিচ্ছি।  আখেরে আমার পেট ভরবে। এটাই উদ্দেশ্য। 
আমি একবার এক স্বামীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আপনি কি সত্যি কিছু পেয়েছেন ? যা অন্যকে দিতে চাইছেন ? তো তিনি আমাকে একটা সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলছেন : আমি তো এইভাবেই বড়ো হয়েছি।  ছোটবেলায় অর্থাৎ স্কুল জীবনে আমি পরের  বাড়ি থেকে পড়াশুনা করতাম। আমরা বলতাম লজিং থাকা।  তো সেখানে আমাকে ওই বাড়ির ছোটছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতে হতো । আমি নিজেও পড়তাম, আবার অন্যদের পড়াতাম। তাতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয় নি। বরং তাদেরও  লাভ হয়েছে।  আমারও লাভ হয়েছে। 
অধ্যাত্মজীবনেও কিছুটা উন্নীত হলে অন্যকে সাহায্য করা উচিত। তবে হ্যাঁ নিজ শক্তির সীমানা অতিক্রম করো না। আর যদি সাহায্য করতে চাও, তবে অন্যের জন্য জগদীশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো। এটা তো পারো। আমি মনে করি, নিজে সাধনা না করলে, আমি নিজে  শুদ্ধ না হলে, অন্যকে সেই ব্যাপারে উপদেশ দেওয়া অপরাধ। আর তাতে কোনো কাজও  হয় না।

আসলে প্রকৃত গুরু তো সবার ভাগ্যে জোটে না। হ্যাঁ ভন্ড  গুরুর অভাব নেই। সত্যিকারের গুরুর কিন্তু সত্যিই অভাব। তাই গুরু না পেলে কি ভাবে নিজেকে উন্নত করা যায়, সেই উদ্দেশ্যে নিজের কাছে প্রশ্ন অনেক। নিজেই নিজের আচার্য্য হয়ে উত্তর দেওয়া। তাই কাউকে ভুল বোঝানো, বা কাউকে জ্ঞান দান করা আমার উদ্দেশ্য নয়। নিজের প্রস্তুতির জন্য এ সব লেখা বা বলা। আমি নিজের কথা নিজে শুনি। আমার মনন করতে সুবিধা হয়।

যাই  হোক যে কথা বলছিলাম।  আগের  দিন আমরা গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথের দেওয়া ১০টি নির্দেশ-এর মধ্যে প্রথম নির্দেশ  নিয়ে আলোচনা করছিলাম। অর্থাৎ উপাসনার কথা আলোচনা করছিলাম, আজ আমরা দ্বিতীয় নির্দেশ নিয়ে আলোচনা করবো আর তা হচ্ছে  -
 
        
২) গুরুজনের প্রতি ভক্তি করো।

সাংসারিক জীবন থেকে আধ্যাত্মিক জীবন অনেক অনেক বেশী কঠিন।  সাংসারিক জীবন, পাপ পুণ্যের জীবন, ভালো মন্দ নিয়ে আমাদের সংসার। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনে পাপ বলে কিছু  নেই।  মুহূর্তের জন্যও যদি তোমার মধ্যে পাপ ঢুকে  যায় বা অসৎ প্রবৃত্তি জেগে ওঠে তোমার আধ্যাত্মিক জীবন আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। সেই জন্য তোমাকে প্রতি মুহূর্তে সজাগ থাকতে হবে। সাংসারিক জীবনে বিশ্রাম আছে, সংশোধন বলে একটা কথা আছে।  কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনে না আছে বিশ্রাম, না আছে সংশোধনের কোনো সুযোগ। তোমাকে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। জন্ম জন্মান্তর ধরে এই ভাঙা গড়ার খেলা চলছে। একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা বলি। তোমাকে হয়তো কেউ বললো, তুমি যদি দম বন্ধ্ করে থাকতে পারো তবে তুমি আকাশে বিচরণ করতে পারবে। এখন তুমি খানিকক্ষন দম বন্ধ করে দেখলে, তুমি ধীরে ধীরে পৃথিবী ছেড়ে আকাশের দিকে  যাচ্ছো। এখন আকাশে ওঠার পরে যদি ভাব, একটু দম নিয়ে দেখি কি হয়।  তাহলে কি 

হবে ? তুমি  ধরাশায়ী হবে।  এবং আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। তাই মহাত্মাগণ আধ্যাত্মিক জীবন শুরুর প্রথমে কিছু কঠোর নিয়ম পালন করতে বলেন।  ছেলেবেলায় মাকে দেখতাম, রুটি শেঁকার আগে তাওয়া গরম করে নিতো। ঠিক ঠিক মতো তাওয়া গরম না হলে রুটি ঠিক মতো হবে না। এও  তেমনি, আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশের শুরুতে নিজেকে তৈরী করে নেওয়া। আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য, প্রাথমিক দিকে  সাংসারিক জীবনে আগে আমাদের  নৈতিক হতে হবে। তাই গুরুদেব বলছেন, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি করো। এখন গুরুজন কারা ? আর ভক্তিই বা কী ? 

গুরুদেব বলছেন, মাতা-পিতা আমাদের জন্মের কারন। তারাই আমাকে প্রতিপালন করে বড়ো করেছেন। এঁরাই আমার সবথেকে কাছের মানুষ। এরাই আমাকে প্রথম ভালোবাসার স্পর্শ দিয়েছেন। প্রকৃতির জগতে বেঁচে থাকার জন্য  সহযোগিতা করেছেন, বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। গুরুদেব বলছেন, যে পরম আরাধ্যা জননী ৯ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে অশেষ কষ্ট ভোগ করেছেন। আমাকে স্তন সুধা পান করিয়ে, সমস্ত বিপত্তি থেকে রক্ষা করেছেন।  আমাদের মল-মূত্র পরিষ্কার করেছেন। আমার রোগভোগে সেবা-যত্ন করেছেন। আমার সুখে সুখিনী, আমার দুঃখে দুঃখিনী হয়েছেন। আসলে মায়ের কথা বলে বোঝানোর দরকার নেই।  আমরা সবাই উপলব্ধি করি।  কিন্তু মায়ের প্রতি আমাদের কর্তব্য সবাই সমান মতো পালন করি না। মায়ের প্রতি কর্তব্য পালনে যদি আমাদের এতটুকু অনীহা বা ঘাটতি থাকে, তবে আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনে আসা বৃথা।  পণ্ডশ্রম মাত্র। এইজন্য আমরা দেখি, সন্যাস জীবনে প্রবেশের জন্য মায়ের অনুমতি নিতে হয়।  মায়ের অনুমতি ছাড়া সন্যাস জীবন সফল হয় না।  আদি শঙ্করাচার্যকে  আমরা দেখেছি,  তাঁর  নিজের প্রবল ইচ্ছা সত্ত্বেও, যতক্ষন মা অনুমতি দেন নি, ততক্ষন তিনি সংসারেই ছিলেন। সচল শিব  ত্রৈলঙ্গস্বামীকে আমরা দেখেছি, ঘর ছাড়ার আগে মায়ের দেহত্যাগ অবধি অপেক্ষা করেছেন। তো মাকে কষ্ট দিয়ে যারা আধ্যাত্মিক জীবনের সুখ খুঁজছেন, তারা বৃথা মরীচিকার পিছনে ছুটছেন। তো আধ্যাত্মিক জীবনের প্রথম কর্তব্য মায়ের সেবা করা।  মাকে সুখে রাখা। এর কোনো বিকল্প নেই। 


গুরুদেব মহাত্মা গুরুনাথ  বলছেন পিতা আমাদের ভরণপোষণের জন্য অবিরাম পরিশ্রম করেও ক্লান্তি বোধ করেন নি। আমাদের সুখের জন্য, আমাদের ভালো থাকার জন্য, আমাদের লেখাপড়া শেখাবার জন্য, আমাকে রক্ষা করার জন্য, পিতা অক্লান্ত পরিশ্রম করে, জীবনের সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে, আমাকে রক্ষা করেছেন। আমরা যতটুকু জ্ঞান লাভ করেছি, তার বীজ মাতা-পিতাই রোপন করেছেন। তো এই  আমাদের জীবনে   সর্বোত্তম ও ভক্তিভাজন এই পিতা মাতা। 


এর পরে যারা আমাদের শিক্ষাগুরু  আছেন, অর্থাৎ পরিবারের বয়স্কজন, আমার শিক্ষাক্ষেত্রের শিক্ষকজন, এবং সবশেষে আমার আধ্যাত্মিক জগতে  প্রবেশের জন্য যিনি উৎসাহিত করেছেন,  সম্যক  জ্ঞান  দান করেছেন, তারা সবাই আমাদের ভক্তিভাজন। এদের প্রতি যথাযোগ্য সন্মান, ভক্তি বিনা আমার অধ্যাত্ম জীবনের কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন - তুমি যদি এদের প্রতি ভক্তি না করতে পারো তবে সেই জগৎপিতার, জগৎগুরুর প্রতি ভক্তি করা দুঃসাধ্য।


গুরুভক্তি আমাদের কি আশ্চর্য্য ফল দান করতে পারে, তারই একটা কাহিনী বলবো।  আচার্য্য আদি শঙ্করের নাম নিশ্চয় শুনেছ। তার এক শিষ্য ছিল যার নাম আনন্দগিরি। ডাকনাম শুধু গিরি। সে লেখাপড়া বিশেষ জানতো না। কিন্তু দেখতে শুনতে খুব ভালো ছিল। সে ছিল শুদ্ধচেতা, সরলমতি।আর প্রচণ্ড গুরুভক্ত।  সে সারাক্ষন গুরুসেবায় নিযুক্ত থাকতো। সব সময় তার মনে হতো এই  বুঝি  গুরুদেব তাকে ডাকছে। সে জন্য, সে মাঝে মধ্যে গুরুদেবের ঘরের সামনে, শীতের রাতে, উন্মুক্ত জায়গায় মাটির উপরে শুয়ে থাকতো। যাতে গুরুদেবের ডাক সে শুনতে পারে।  আচার্য্যের অন্য সমস্ত শিষ্যই বেশ পণ্ডিত ছিল। যার জন্য আচার্য্য শঙ্কর তার শিষ্যদের বিষয় নির্বাচন করে, তার উপরে লিখতে বলতেন। এখন গিরি তো কিছু লিখতে পারতো না। গুরুদেব তাকে কিছু লিখতেও দেয়  না। এর জন্য গিরির মনে খুব দুঃখ।গিরি মনে মনে গুরুদেবের কাছে প্রার্থনা করতো, হে গুরুদেব, আমাকে জ্ঞান দাও। আমি যেন অন্যদের মতো শাস্ত্র বুঝতে পারি, ভাষ্য লিখতে  পারি।  হে গুরুদেব আমাকে দয়া করো, করুনা করো। আর, গিরি কিছু বুঝুক না বুঝুক, গুরুদেব যখন কিছু বলতেন, বা উপদেশ দিতেন, তখন গিরি,আচার্যের পাশে গিয়ে তাকে বাতাস করতো, বা গামছা নাড়িয়ে গুরুদেবকে মশা মাছি  থেকে রক্ষা করতো। এবং নিষ্ঠা সহকারে গুরুদেবের বাণী  শুনতো। পান্ডিত্যের  দিক থেকে, গিরি যেমন অন্য্ শিষ্যদের পাশে আসতে পারতো  না,  তেমনি গুরুভক্তির দিক থেকে গিরি ছিল সবচেয়ে উঁচুতে। 

তো একদিন হো'লকি, গুরুদেব সবাইকে নিয়ে বসেছেন উপদেশ দান করার জন্য, শাস্ত্র ব্যাখ্যা শোনাবার জন্য। কিন্তু গিরি নেই।  গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন, গিরিকে তো দেখছি না ! সবাই বললো, গিরি নদীতে গেছে, স্নান করার জন্য, আর ও তো স্নান করার সময় একটু বেশিই নেয় তার কারন ওই সময় গিরি আপনার বস্ত্র ধৌত করে। তো গুরুদেব বসে আছেন। সবাই বলছে, উপদেশ শুরু করতে। কিন্তু গুরুদেব গিরির অপেক্ষায় বসে আছেন।  আচার্য্য বললেন, একটু অপেক্ষা কর। গিরি এখুনি আসবে। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরও গিরি এলো না দেখে, পদ্মপাদ নামে  তার প্রধান জ্ঞানী শিষ্য বললো :  গিরি কি আপনার শাস্ত্র ব্যাখ্যা বুঝতে পারে ? আচার্য্য বললেন, গিরি বুঝতে পারেনা ঠিক, কিন্তু সে অতি নিষ্ঠা ভরে, অতি শ্রদ্ধা সহকারে সবকিছু শোনে। 

এদিকে গিরি কাপড়চোপড় পরিষ্কার করছে আর মনে মনে বলছে, হে গুরুদেব, তুমি আমাকে জ্ঞান দাও। আমি যেন ওদের মতো শাস্ত্র বুঝতে পারি, আর ভাষ্য লিখতে পারি। এমন সময়, সেই নদীর পারে, অর্থাৎ তুঙ্গা ও ভদ্রা নদীর সঙ্গম স্থলে  তার যেন মনে  হল, গুরুদেব তার দিকে প্রসন্ন চিত্তে তাকিয়ে আশীর্বাদ করছেন। আর তার অন্তর লোক এক দিব্য  আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। গিরির মনে হলো, সে যেন সর্ব বিদ্যার অধিকারী হয়ে গেছে। তার সমগ্র মন, প্রাণ, এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভরপুর হয়ে গেল। গিরি, গুরুদেবের উদ্দেশে দৌড় শুরু করলো। এবং গুরুদেবের কাছে এসে, তার চরণ বন্দনা শুরু করলো, এক ছন্দবদ্ধ শ্লোকে। 
দ্বাদশাক্ষরী তোটক  ছন্দে পরম পবিত্র সেই আকুতি : বলছেন : সমুদ্রের জল আমার জন্ম-মরন, সমুদ্রের মাছ আমার সুখ দুঃখ।  হে ভগবান, হে গুরুদেব সেই ভবসমুদ্রে পতিত হয়ে আমি অশেষ দুঃখ ভোগ করছি। আমি অন্য কোনো গতি না পেয়ে, হে গুরুদেব তোমার শরণ নিলাম। দয়াকরে, কৃপা করে, শরণাগতকে উদ্ধার করো। 

তখন গুরুদেব বলছেন : তোমার বিষয়ে আসক্তিই সব দুঃখের কারন।  বিষয়ে আসক্তি ত্যাগ করে, দেহাত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, পরম-আত্মার চরণে নিবেদিত হও।  হে তত্ত্ব-পিপাসু সমস্ত মোহপাশ ছিন্ন করো।  

 গিরির মুখে এই বিশুদ্ধ শ্লোক শুনে, যার মধ্যে সেই চিরকালীন আবেদনের সুর, উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেল।  গুরুদেব তাকে সস্নেহ কাছে টেনে নিলেন। সকলে বুঝলো গুরুদেবের কৃপা হলে সব সম্ভব। 

জানিনা গল্প কথা কিনা।  তবে আমি মনে করি তার কৃপা হলে সব সম্ভব। তার কৃপা যখন বর্ষিত হয়, তখন আমাদের দ্বারা এমন সব কাজ সম্ভব, যা আমার যোগ্যতার বাইরে। আর তার কৃপা থেকে যখন আমরা বঞ্চিত হই, তখন আর সেই মতো কাজ করতে পারি না। আমাদের দিয়ে তিনিই সব কাজ করিয়ে নেন। আমরা তার হাতের ক্রীড়নক মাত্র। 

অর্জুন একবার শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিল : তুমি তখন যুদ্ধে ক্ষেত্রে বসে কি সব আত্মতত্ব ইত্যাদি গুড় রহস্যঃ বলেছিলে, তো যুদ্ধক্ষেত্রে আমিতো সব বুঝিনি, তুমি কি দয়াকরে, আবার আমাকে সেই সব কথা একবার বলবে ?যোগেশ্বের 
শ্রীকৃষ্ণ তখন বলেছিলো, তখন কি বলেছিলাম তাতো আমার মনে নেই, তা আর আমি জীবনে কোনোদিন বলতেও পারবো না। তবে  আত্মতত্ব সম্পর্কে এখন যা বলতে পারি, তা তুমি শোনো। আগের কথা গুলো গীতা হয়েছিল, একই শ্রীকৃষ্ণের  একই বিষয়ের কথা আর কিন্তু  গীতা হয় নি।  একই  শিল্পীর, এক একটি স্টেজে এক একদিনের গান  বা নাচ খুব ভালো হয়।  কেন হয়, সেই ব্যাখ্যা সে নিজেও জানতে পারে না। তবে হয়। তাই পরমাত্মা-পরম-ঈশ্বর আসলে আমাদের গুরুরূপে, পিতা-মাতা রূপে আসেন, শিক্ষক  রূপে আসেন, তাদের আমাদের ভক্তি করা উচিত।  তাদের  কথা আমাদের পালন করা উচিত।  তাদের সেবা করা উচিত। এর কোনো বিকল্প নেই। 

এইবার মা-বাবার ভক্তি প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি। তারপরেই এই প্রসঙ্গ শেষ করবো। পুরাকালে পুণ্ডরীক নামে এক ব্রাহ্মণ  ছেলে বিয়ের পরে বউ ভক্ত হয়ে গেল। এখন বাবা যা বলে তা আর তার ভালো লাগে না।  মা যা বলে তা তার ভালো লাগে না। বৌ বাপের বাড়ি গেলে, সেও শ্বশুর   বাড়ি চলে যায়। এখন মায়ের কাজে সাহায্য করতে বললে,  ছেলে বলে,বৌ কি তোমাদের বাড়ির কাজের লোক ? বাবা ছেলেকে পৌরিহিত্য করার কথা  বলতেই, ছেলে বলে উঠলো, আমি চালকলার ব্যবসা করবো না।  বাবা জিজ্ঞেস করলো, তা তুই কি করবি ? ছেলে বললো, শ্বশুরমশায়  আমাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন। আমি তাই করবো। 

ব্রাহ্মণ বাবা-মা  ছেলের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে, ঠিক করলো - তারা সংসার ছেলের উপরে ছেড়ে দিয়ে, তীর্থ যাত্রায় বেরিয়ে পরবে।  যেমন কথা তেমনি কাজ।  তারা দুই জন্য তীর্থ যাত্রায় বেরিয়ে পড়লো। এদিকে ছেলে তার বৌকে ঘোড়ায় চাপিয়ে বাবা-মায়ের পিছন পিছন চলতে লাগলো।  এক আশ্রমে এসে বাবা-মা রাত্রি যাপন করতে লাগলো। ছেলে-বৌমাও  সেই আশ্রমে রাতের জন্য আশ্রয় নিলো। গভীর রাতে ছেলেটি দেখলো, তিনজন নোংরা শাড়ী পরিহিত সুন্দরী নারী বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলো এবং কিছুক্ষন পরে, পরিচ্ছন্ন পোশাক পড়ে বেরিয়ে গেল।  পরদিন রাতেও সেই একই দৃশ্য দেখলো।  তারপরদিনও  অর্থাৎ তৃতীয় দিনে যখন আবার সুন্দরীদের সেই গৃহে প্রবেশ করতে দেখলো, সে তখন বিছানা থেকে উঠে, সুন্দরীদের পরিচয় জানতে চাইলো, তখন সুন্দরীরা তাকে বললো - আমরা গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী। সারাদিন সবাই আমাদের সলিলে অবগাহন করে, সমস্ত পাপ দিয়ে যায়।  আমরা এখানে আসি সারাদিনের সেই পাপ পরিষ্কার করার জন্য। তোমার মতো যারা পাপী, মাতা-পিতাকে কষ্ট  দেয়, পাপ কর্মে লিপ্ত থাকে, আর পাপ মোচনের জন্য আমাদের সলিলে অবগাহন করে। তাদের জন্যই আমাদের এই দুর্দশা।এ কথা শুনে, ছেলেটির চৈতন্য হলো।  এবং প্রতিজ্ঞা করলো আজ থেকে সে মাতা-পিতার সেবা করবে, তাদের কোনো কষ্ট দেব না। 

সেইমতো বাবা-মাকে নিয়ে বাড়ী  ফিরলো। এবং বাবা মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে গেল। রাতে শোবার আগে, ছেলে-বৌ দুজনে মিলে  বাবা-মায়ের পা টিপে  দেয়, যতক্ষন না তারা ঘুমায়। তো একদিন হলো কি, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  এলো ছেলেটাকে ডাকতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  বললো তোমার সাথে আমার কিছু কাজ আছে।  ছেলেটি বললো, এখন আমি ব্যস্ত আছি। শ্রীকৃষ্ণ বললো আমাকে বসতে দেবে না ? ছেলেটি একটা ইটের টুকরা ছুড়ে দিয়ে বললো, হয় বসো  নয় দাঁড়িয়ে থাক, আমার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার সাথে কথা বলতে পারবো না। অর্থাৎ বাবার ঘুম না আসা পর্যন্ত আমি বাবার সেবা করবো। আর এই সময় যত বড় কাজই থাকুক, আর যেই আসুক, পিতা সেবায় সে বিরত হতে পারবে না। শ্রীকৃষ্ণ সারারাত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো। প্রচলিত কাহিনী যে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ইট-এর উপরে  দাঁড়িয়ে ছিল, কালান্তরে সেখানে বিটঠলা, অর্থাৎ ইটের উপরে দাঁড়ানো বিষ্ণু মন্দির  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  
এটাই বহিরঙ্গ সাধনা। এই বহিরঙ্গ সাধনায় পারঙ্গম হলে, তবেই অন্তরঙ্গ সাধনার যোগ্য  উঠতে পারি আমরা। গুরুজনদের প্রতি  যদি আমরা ভক্তি, শ্রদ্ধা না করতে পারি,  তবে ঈশ্বরের  ভক্তি শ্রদ্ধা  কি করে  করবো ?                                   

পরম-ঈশ্বরই  আমাদের কাছে, পিতামাতা রূপে আসেন। গুরু রূপে আসেন। ইষ্ট  রূপে আসেন। তাই আমাদের  মাতা-পিতার মাধ্যমে, গুরুজনের মাধ্যমে, গুরুদেবের মাধ্যমে, ইষ্টের মাধ্যমে, দেবতার মাধ্যমে, এগুতে হবে। এইজন্য মহাত্মা গুরুনাথ  "ধর্ম্মার্থীর কর্তব্য" সন্মন্ধে বলছেন  মাতা, পিতা, শিক্ষক, রাজা, ও অন্যান্য গুরুজনদিগকে যথোচিত ভক্তি করবে।  দেবদেবীগনের প্রতি ভক্তি ।   এটাই মহাত্মা গুরুনাথের শিক্ষা।  গুরুদেব  আসলে সাধন পথে আসতে গেলে তিনটি জিনিসের প্রতি গুরুত্ত্ব দিতে বলেছেন, আর তা হচ্ছে - প্রেম, ভক্তি, ও একাগ্রতা। এই ভক্তির বহিরঙ্গ সাধনাই  গুরুভক্তি, বা গুরুজনের প্রতি বা মাতা-পিতার প্রতি ভক্তি।  আমরা এই বহিরঙ্গ সাধনা না করে অন্তরঙ্গ সাধনায় সিদ্ধ হতে  পারবো না। আমরা এই গুরুজনদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধার মাধ্যমেই ঈশ্বর ভক্তি লাভ করতে পারবো। 

সমাপ্ত।   

        

Sunday, 16 September 2018

সত্যধর্ম - গুরুতত্ত্ব - গুরুবিনা কি সাধন হবে না ? (৩)

সত্যধর্ম - গুরুতত্ত্ব
গুরুবিনা কি সাধন হবে না ? (তৃতীয় ভাগ )




আগেরদিন আমরা সত্যকামের  কথা শুনছিলাম।  এবং শুনেছিলাম  যে , আমাদের   যদি ব্যাকুলতা  থাকে, তবে গুরু ছাড়াও আমাদের ব্রহ্মজ্ঞান হতে পারে। আমরা  যদি যোগ্য হতে পারি, তবে প্রকৃতি আমাদের আচার্য্য বোনে যান। আমরা যে কোনো জায়গা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু  আমাদের  যদি চেষ্টা না থাকে, হাজার গুরু করলেও আমাদের   কোনো উন্নতি হবে না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন : যদি তেত্রিশ কোটি দেবতায় তোমার বিশ্বাস থাকে অথচ তোমার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস না থাকে, তবে কখনোই তোমার মুক্তি হবে না।

আমরা একলব্যের কথা শুনেছি। মহাভারতের আদিপর্ব্বে এই কাহিনীর উল্লেখ আছে। জাত-ব্যবস্থা আমাদেরকে কি ভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছিল, গুরু থেকে বঞ্চিত করেছিল তারই এক নির্মম কাহিনী, এই একলব্যের কাহিনী। ভ্রষ্ট  গুরুর কাহিনী। মহাভারতের যুগে, নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র এই একলব্য। একলব্য ছিল ভীল সম্প্রদায় ভুক্ত।  এই সময়ে দ্রোণাচার্য নামে এক ব্রাহ্মণ শস্ত্র বিশারদ ছিলেন। তিনি কৌরব বংশীয় রাজার সন্তানদের অস্ত্র শিক্ষা দিতেন।  গুরু দ্রোণাচার্য্যের সংগ্রামনৈপুণ্য শুনে, বহু জায়গা থেকে তার কাছে  অস্ত্র শিক্ষা লাভ করবার জন্য শিক্ষার্থী  আসতো।  এমনি ভাবে একদিন একলব্য এলো শিক্ষাগুরু, অস্ত্র শিক্ষক দ্রোণাচার্য্যের কাছে। কিন্তু সে ছিল মূলনিবাসী, আর্যদের দৃষ্টিতে ম্লেচ্ছ , অস্পৃশ্য, সতীর্থদের অর্থাৎ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের  সমতুল্য নয়। অর্থাৎ আর্য্যদের সমতুল্য নয়। তাই একলব্য যখন গুরু দ্রোণাচার্যকে অস্ত্র শিক্ষা দেবার জন্য অনুরোধ করলো দ্রোণাচার্য একলব্যকে  শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে রাজী হলেন  না। তখন নিষাদরাজ-তনয় একলব্য দ্রোণাচার্য্য কে প্রণাম করে, বিষাদমগ্ন হয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলো। যা তার নিজের বিচরণ ভূমি। সেখানে সে গুরু দ্রোণাচার্যের মাটির মূর্তি তৈরি করে, অস্ত্র শিক্ষার অভ্যাস করতে লাগলো। যার নিষ্ঠা গভীর, তাকে ভগবান সহযোগিতা করেন। একলব্যও ধীরে ধীরে, কিছুদিনের মধ্যেই সমস্ত অস্ত্রের প্রয়োগ, সংহার, সন্ধানবিষয়ে পারঙ্গম হয়ে উঠলো। আসলে গুরু তোমার  মনে, তোমার  অন্তরে, তোমার  ভিতরে,  তোমার বাহিরে।  তোমার  ভাবনাই  তোমার  গুরুর কাছে পৌঁছে দেবে। তোমার  বিবেক সর্বোত্তম গুরু।  তার কাছে আশ্রয় নাও ।  তিনিই তোমাকে  পথ দেখাবেন। তোমার  কাজ বিবেকের নির্দেশে কাজ করা। বিবেকবর্জিত কাজ করা মানে, অধঃপতন।  আর বিবেক নির্দেশিত কাজ করা মানে  ঈশ্বরের কাজ করা। আর সেটাই উন্নতির গোপন কথা। আর সেটাই সাম্যাবস্থায় থাকা। আনন্দে থাকা।

এর পরের কাহিনী অতি নির্মম। তোমরা  সবাই জান,  গুরু দ্রোণাচার্য , গুরুদক্ষিণার নামে, একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, কেটে নিয়ে   তার প্রিয় শিষ্য  অর্জুনের ধনুর্বিদ্যায় একাধিপত্য নিশ্চিত করেছিলো।  অর্জুনকে খুশি করেছিল। আমরাও এইসব  গুরুদেবের সন্তুষ্টির জন্য সব করি।  কিন্তু তাদের কাছে আমাদেরকে  দেবার জন্য কিছুই থাকে না। আমি এইসব গুরু যারা গুরুমাহাত্য জানে না , গুরুর কর্তব্য জানে না, তাদের থেকে দূরে থাকতে বলছি। মহাত্মা গুরুনাথ বলেছেন, উপযুক্ত গুরু যদি না মেলে তবে সারাজীবন গুরুহীন থাকা ভালো।

কিন্তু শুনলে অবাক হবে, পাপ ছাড়েনা বাপকে। পাপ মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সাথী। এই একলব্য-ই মৃত্যুর পরে ধৃষ্টদ্যুম্ন হয়ে জন্মে ছিল, আর আচার্য্য দ্রোণের মস্তক, ধর থেকে আলাদা করে দিয়েছিলো। একলব্য কত বড়  বীর ছিলেন, তা শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পরে তার পিতা বসুদেবের বিলাপ থেকে পাওয়া যায়।  বসুদেব বলছেন : হে ভাগ্নে  অর্জুন, যে কৃষ্ণ আগে মহাবল পরাক্রান্ত কেশী কংস, শিশুপাল, নিষাদরাজ একলব্য প্রভৃতি ভূপালগনকে নিহত করেছিলেন, এখন তিনিই যদুকুল ক্ষয় হতে দেখেও উপেক্ষা করেছেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস।

আর একটা গল্প বলি :

রাস্তায়, এক বৃদ্ধা, তন্ন তন্ন করে কি যেন খুঁজছেন । জিজ্ঞেস করলাম কি খুঁজছেন ? বললো আমার গোপালকে খুঁজছি। আমি ভাবলাম, গোপাল, তাও আবার রাস্তায় ? কে গোপাল ? আপনার ছেলে ? বললো না আমার সোনার গোপাল। আমার ঠাকুর। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় হারিয়েছে ? বললো ঠাকুর ঘরে ছিল। তো সেখানে না খুঁজে এখানে খুঁজছেন কেন ? তখন বৃদ্ধা আমাকে একটা আশ্চর্য সত্য বললো, তা হচ্ছে - গুরুদেব যে বললো : আলোতে খুঁজতে।  ঠাকুর-ঘরে তো আলো নেই, তাই এখানে খুঁজছি। এখানে আলো  আছে।
আমরাও ঈশ্বরকে খুঁজি গুরুদেবের কাছে, অন্তরের বাইরে। ঈশ্বর তো গুরুদেবের কাছে নয়।  ঈশ্বর আমাদের অন্তরে। আমরা, গুরুদেব যা বলছেন তা বুঝি না। বুঝলেও সে অনুযায়ী কাজ করি না।   করলেও উল্টোটা করি। গুরুদেব তো রাস্তা বলে দেন। চলতে হবে আমাদের।

ছেলেবেলায় একটা কথা শুনতাম , শিক্ষক ছাত্রকে   বলেছেন,  বলো : My Head মানে আমার মাথা, ছাত্র বলছে , My Head মানে মাস্টার মহাশয়ের মাথা।

ভগবান বলছেন:
"সর্ব ধর্ম্নান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।"

তথাকথিত  সমস্ত ধর্ম্ম, অর্থাৎ তোমার পূর্ব সংস্কার অনুযায়ী যাকে তুমি ধর্ম্ম ভাবছো, সেই ভাবনা ত্যাগ করে মামেকং অর্থাৎ সেই এক এবং  অদ্বিতীয় আমিকে শরণ করো , অর্থাৎ পরম পিতাকে আশ্রয় করো।  আমরা তা না করে, মানুষ শ্রীকৃষ্ণের ছবি  নিয়ে বসে গেছি পূজা করতে। এতে কি হবে ?

তবু বলি আধ্যাত্মিক গুরু, আধ্যাত্মিক জগতে হাত ধরে নিয়ে যান । তাই গুরুকরন অতি আবশ্যক। আমরা বাড়ি বসে পড়াশুনা করতে পারি।  তবু আমরা ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাই।  কেবল গুরুকরনেই আমাদের সন্দেহ জাগা উচিত নয়। কেবল বয়স বাড়লেই, আমাদের জ্ঞান বাড়ে না। হ্যাঁ এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা জন্ম থেকেই ভগবানকে অনুভব করেন , এরা ঈশ্বরীয় চেতনা  নিয়েই জন্মান । তাদের ক্ষেত্রে হয়তো গুরুদেবের দরকার পারে না। কিন্তু তবু আমরা দেখি, রামকৃষ্ণদেবেরও   গুরু ছিলো। যোগেশ্বর  শ্রীকৃষ্ণেরও  গুরু ছিল।  আচার্য্য প্রণবানন্দের গুরু ছিলো।   আদি শঙ্করাচার্যেরও  গুরু ছিল।     

কিন্তু সবার গুরু ছিল বলেই আমারো গুরু থাকবে, তার কোনো মানে নেই। আমার যোগ্যতা অনুসারে, আমার গুরুলাভ হবে। তাই বলছিলাম নিজেকে যোগ্য করে তোলো। কিন্তু কি করলে আমরা যোগ্য হয়ে উঠবো ? মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত কি বলছেন এই প্রসঙ্গে ? আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করবো। 

মহাত্মা গুরুনাথ দশটি নির্দেশ দিয়েছেন।  বলছেন  :

১) প্রতিদিন অন্তত তিন ঘন্টা জগদীশ্বরের উপাসনা করো।
২) গুরুজনের প্রতি ভক্তি করো।
৩) সর্বদা সত্য কথা বলবে। 
৪) পরের দ্রব্য হরণ করবে না।
৫) জিতেন্দ্রিয় হবে।
৬) আত্মহত্যা বা নরহত্যা করবে না
৭) যাতে বুদ্ধি বাড়ে, তার জন্য চেষ্টা করবে।
৮)  ধৈর্য্য ও ক্ষমা গুনের সাধনা করবে।
৯) শরীর ও মন পবিত্র রাখবে। 
১০) প্রতিদিন গুরুমূর্তি ধ্যান করবে।

আমরা এগুলো এক এক করে আলোচনা করবো : কিন্তু আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, যাদের উপযুক্ত গুরুদীক্ষা হয় নি, তাদের জন্যই এই আলোচনা। 

১) প্রতিদিন অন্তত তিন ঘন্টা জগদীশ্বরের উপাসনা করো।

জগদীশ্বরের উপাসনা বলতে আমরা কি বুঝি ? জগদীশ্বর সম্পর্কে আমাদের কি ধারণা ?
সাধারণতঃ ঈশ্বর বা জগদীশ্বর বলতে আমরা বুঝি সৃষ্টি, স্থিতি, লয়-এর কর্তা। তার থেকেই সব সৃষ্টি, আবার তাতেই লয়। যদিও তিনি আসলে আরো বড় কিছু। তার কাজ শুধু, সৃষ্টি, স্থিতি বা লয় নয়। এই সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এর কর্তা তার একটি অংশ মাত্র।  তিনি এসবেরও উর্দ্ধে বৃহৎ  কিছু। এই সত্য উপলব্ধি করতে গেলে আমরা জীবাত্মা, আর তিনি পরমাত্মা- এটা দৃঢ় ভাবে বুঝতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে  । আমরা যাকে আমি বলি, অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়-বর্গ বা এই দেহ, এর থেকে সত্যিকারের আমি সম্পূর্ণ  আলাদা। আমরা এক একটি আত্মা, সেই পরম-আত্মা বা অনন্ত চৈতন্যের অংশ। নিজেকে যতক্ষন অবধি মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়-বর্গ বা এই দেহ থেকে স্বতন্ত্র না ভাবতে পারছি ততক্ষন সেই পরম-আত্মা বা পরম চৈতন্য সম্পর্কে কিছুই জানতে সক্ষম হবো না। উপাসনার শুরুতে আমাদের জানতে হবে বা উপলব্ধি করতে হবে, পরম-আত্মার  সঙ্গে জীবাত্মার সম্পর্ক চিরন্তন। এই মিলন শাশ্বত।  তবু মনের মালিন্য হেতু আমরা ঈশ্বরকে ছেড়ে তারই  সৃষ্টিতে আসক্ত হয়ে পড়েছি । 

আমরা তো ঈশ্বরকে চাই না। আমরা তাকে আমাদের ইচ্ছা পূরণের জন্য,  কাজে লাগাতে চাই। আমাদের বাসনাগুলো পূরণের জন্য তাকে কাজে লাগাতে চাই। আর যখন,সেই বাসনা পূরণ না হয়, তখন আমরা অবিশ্বাসী হয়ে পড়ি। এইজন্য ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের একটি সঠিক ধারণা চাই। একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, ঈশ্বর আমাদের বাসনাপূরণের যন্ত্র নয়। তিনি এসব থেকে বহুগুন বেশী কিছু।

আমরা ভাবি, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান একজন পুরুষ মাত্র। তারও আমাদের মতো দেহ আছে। সেই দেহ কখনো স্থুল আবার কখনো সূক্ষ্ম। আমরা তাঁর  সেই স্থুল  দেহ দেখতে চাই। এই ভ্রমে যাঁরা পতিত তাঁরা সেইমতো আবদ্ধ হয়ে পড়েন। 

কেউ ভাবেন "অহং ব্রহ্মাস্মিন্" । আমিই ব্রহ্ম। "সোঽহং" - তিনিই আমি। "তত্ত্বমসি" -  আমিই সেই। এটি একটি ভয়ানয়ক অসত্য কথন।  মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন,  হে ক্ষুদ্র মানব, তুমি যখন অপর একজন মানুষকেই আত্মতুল্য জ্ঞান করতে পারো না, তখন অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডেশ্বরকে কিভাবে আত্মতুল্য বোধ করবে ? ক্ষুদ্রতম প্রস্তরকণা কিভাবে নিজেকে হিমাচলকে আত্মসদৃশ্য বিবেচনা করবে ? আমি ভাবি, শরীরের অসংখ্য কৃমিকীট, অসংখ্য কোষ তারা কি নিজেদেরকে মানুষ ভাবে  ? জীবাত্মা কখনো পরম-আত্মার তুল্য হতে পারে না। এ সবই  আমাদের অহং-এর ভ্রম। 

ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ, - তিনি অনন্ত অস্তিত্ব, অনন্ত চেতনা, অনন্ত আনন্দ। তিনি জীবাত্মায় স্ফূরিত হন মাত্র। আবার আমরাও তাতেই থাকি। 

আমাদের এই অনুভূতি আনতে  হবে যে,  আমরা জীবাত্মা, আমরা পরম-আত্মার মধ্যে, আমরা তাঁরই পরম সান্নিধ্যে আছি।  তিনিই  আমাদের প্রিয় থেকে প্রিয়তর, নিকট থেকে নিকটতর। এই চেতনা আমাদের ভিতর জাগিয়ে তুলতে হবে। এটাই উপাসনা। অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে আসন পেতে বসা।  সমুদ্রের মধ্যে বুদ্বুদ আমি। মহাসাগর আমাদের ধারণার বাইরে। তাই আমরা যে ঢেউয়ের উপরে খেলছি, তার সাথে একাত্ম হতে হবে।  এবং সময় হলে, এই ঢেউয়ের মাধ্যমে মহাসাগরের সঙ্গে আমাদের একাত্মতা হবে। 

তাই আমাদের  মাতা-পিতার মাধ্যমে, গুরুদেবের মাধ্যমে, ইষ্টের মাধ্যমে, দেবতার মাধ্যমে, এগুতে হবে। এইজন্য মহাত্মা গুরুনাথ  "ধর্ম্মার্থীর কর্তব্য" সন্মন্ধে বলছেন  মাতা পিতা শিক্ষক, রাজা, ও অন্যান্য গুরুজনদিগকে যথোচিত ভক্তি করবে।  দেবদেবীগনের প্রতি ভক্তি করবে। পূজা করবে, কিন্তু মনে রাখতে হবে - তাঁরা কেউ জগদীশ্বর নয়। সব থেকে  বড় কথা হচ্ছে, যার কৃপায় তুমি জগদীশ্বর লাভের পথ প্রাপ্ত হয়েছো, সেই গুরুদেবের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি করবে। এই সমর্পন-ই উপাসনা। 

কখন উপাসনা করবো, বা কতক্ষন উপাসনা করবো। মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন অন্ততঃ তিন ঘন্টা উপাসনা করবে।  উপাসনার পক্ষে ব্রাহ্ম-মুহূর্ত  ও  নিশীথ অর্থাৎ গভীর রাত অতি প্রশস্ত সময়।  এছাড়া সকাল, দুপুর, ও সন্ধ্যা এই পাঁচ সময় উপাসনার উপযুক্ত সময়।যাদের পক্ষে পাঁচবার উপাসনায় বসা সম্ভব নয়, তারা অন্তত  দুই বার, বিশেষ করে ভোরবেলা অর্থাৎ ব্রাহ্মমুহূর্ত ও সন্ধ্যাবেলা উপাসনায় বসা উচিত। মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, যারা আত্মউন্নতির জন্য বিশেষভাবে লালায়িত, তারা প্রতিমুহূর্তে জগদ্বিশ্বরের মঙ্গলময় নাম উচ্চারণ স্মরণ করবে। 

আমি অনেককে বলতে শুনেছি, আমরা গৃহী মানুষ, আমাদের এতো সময় কোথায় ? আমার মনে হয় এটা একটা অজুহাত মাত্র। আমরা প্রতিদিন খাবার সময় পাই।  শোবার  সময় পাই। প্রকৃতির ডাকে সারা দেবার সময় পাই। এমনকি আড্ডা দেবার সময় পাই। কিন্তু উপাসনার সময় পাই না। শরীরের ক্ষিদে  মেটানোর জন্য, মনের ক্ষিদে মেটানোর জন্য, সময় পাই কিন্তু আত্মার ক্ষিদে মেটানোর সময় পাই না। অতয়েব সময়-অভাবের ওজর ত্যাগ করতে হবে আমাদের। 

উপাসনার জন্য, ব্রাহ্মহ্মমুহূর্ত বা ভোরবেলা সবথেকে ভালো। রাতের ঘুম আমাদের স্মৃতিকে বিলুপ্ত করে দেয়। বাহ্যিক পরিবেশ শান্ত থাকে।  আমাদের মন শান্ত থাকে।  তখন মনকে একাগ্র করা সহজ হয়। যখন আমরা ঘুম থেকে উঠি, তখন আমাদের চেতন মন ক্রিয়াশীল থাকে না। অবচেতন মন তখন সহজে সব কিছু ধরতে পারে। তাই সে সময় মনকে যা কিছু নির্দেশ করা হয়, তখন তা অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করে। এই সময় ধ্যানের গভীরে সহজে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। মনের গভীর স্তরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। এবং এই সময় জগদীশ্বরের নাম-গুনগান আমাদের এক উচ্চতর আনন্দ অনুভূতি প্রদান করে। এটা আসে মনের গভীরতম স্তর থেকে। এই আনন্দ-অনুভূতিকে ধরে রাখবার জন্য, আমাদের উপাসনার পরে, খানিক্ষন নীরব থেকে এই আনন্দানুভূতি উপভোগ করা উচিত।  এতে যেমন নিজের অন্তরে শান্তি বজায় থাকবে, তেমনি সংসারে শান্তি বৃদ্ধি পাবে। এবং আমার সারাদিনের আচরণে এই শান্ত ভাব অন্যকে প্রভাবিত করবে। নিরবিচ্ছিন্ন উপাসনার  অভ্যাস তোমার মনকে উচ্চস্তরে তুলে রাখতে সহায়তা করবে। 

গুরুদেব, মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন এই সময় দীক্ষাবীজ উচ্চারণ করবে।  যা আসলে পরম-ঈশ্বরের গুনবাচক শব্দ মাত্র। আমাদের আলোচ্য বিষয় যেহেতু, অদীক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য। তাই আমি বলবো আপনি যেকোনো  ইষ্ট-দেবতার নামের সঙ্গে প্রণব (ওঁং)আদি-অন্তে  যোগ করে, অথবা গায়েত্রী মন্ত্র , মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র ইত্যাদি যে কোন মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেন। তবে মন্ত্রের সঠিক অর্থ ও উচ্চারণ জেনে নেবেন। মন্ত্রের অর্থ না জানলে সেই  শব্দ আপনার ভিতরে আলোড়ন তুলতে পারবে না। 

এই প্রসঙ্গে একটা সত্য ঘটনা বলি।  আমি তখন দুর্গাপুরে কাজ করি। আমাদের অফিসে একজন সহজ-সরল ইংরেজি না জানা কর্মচারী ছিল। তাকে কেউ একজন "thank  you" বলেছিলো।  ও আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো "থ্যাংক্যু" কাকে বলে ? আমি বললাম - thank you মানে ধন্যবাদ। ও আবার জিজ্ঞেস করলো সেটা কি ভালো না খারাপ। বললাম ভালো-খারাপ কিছু নয়। ও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গেলো লোকটার কাছে। গিয়ে বললো : থ্যাংক্যু যদি ভালো হয় তো ভালো।  আর যদি খারাপ হয় তবে তোর  বাবা থ্যাংক্যু তোর মা থ্যাংক্যু তো চোদ্দগুষ্ঠী থ্যাংক্যু। বলে গর্বের  সঙ্গে আমার দিকে তাকালো। তো বুঝুন শব্দের মানে যদি আপনি না বোঝেন, অর্থাৎ মন্ত্রের মানে যদি আপনি না বোঝেন, তবে আপনার মধ্যে কোনো আলোড়ন হবে না। আর যদি বোঝেন আপনি সেইমতো আন্দোলিত হবেন।   

তবে আমি একটা কথা বলি, আপনি সব কিছু ছেড়ে, শুধু "ওঁং" এই শব্দটিকে আশ্রয় করুন। ইনিই সব মন্ত্রের মূল। এটি এমন একটি শব্দ - যা অদৃশ্য নিরাকার, নিরপক্ষের প্রতীক। আবার সাকারের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার করা চলে। এটি একাধারে শব্দ আবার ধ্বনি। শব্দ অর্থাৎ যার অর্থ আছে। আর ধ্বনি অর্থাৎ মূর্ছনা আছে কিন্তু মানে নেই। আবার ধ্বনিরও উর্দ্ধে।  অর্থাৎ ধ্বনি সৃষ্টি হয় আঘাতে, অর্থাৎ দুটো জিনিসের আঘাতে ধ্বনির সৃষ্টি। ওঁং এমন জাদুকাঠি যা এমনি এমনি হয়। একটু ব্যাখা  করে বলি।  যখন আমরা কথা বলি, তখন আমরা শব্দব্রহ্মের   স্থুল রূপটি শুনতে পাই।  একে বলে বৈখরী। এই বৈখরী সাধারণত কন্ঠনালী ও জিহ্বা প্রভৃতির আলোড়নে সৃষ্টি হয়। এর পেছনে আছে শব্দ যা চিন্তাপ্রণালীর কাজ। একে বলে মধ্যমা ধ্বনি। চিন্তা আরো সূক্ষ্মতর আবেগের ফল। চিন্তাও শব্দ সমষ্টি মাত্র।  একে বলে পশ্যন্তি ধ্বনি।  এই পশ্যন্তি ধ্বনির  উৎপত্তি শব্দব্রহ্ম থেকে। এই স্তরের ধ্বনিকে বলে পরা। সুতরং বলা যেতে পারে শব্দের শুরু প্রথমে পরা, তারপর পশ্যন্তি, তারপরে মধ্যমা, তারপরে বৈখরী যা আমরা শুনে থাকি। 
চিন্তা এক গতিশীল কার্যপদ্ধতি। আর তার জন্ম  হলো এক অপ্রকাশিত উৎস থেকে। যা আমাদের দেহ-মনকে প্রভাবিত করে। সাধারণত  অশুভ চিন্তায় আমরা মনের গভীরে প্রবেশ করি না। শুভ চিন্তায় আমরা  গভীরে প্রবেশ করি। আর আধ্যাত্মিক চিন্তা আমাদের আরো বেশী গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। মন্ত্র আমাদের উৎসে পৌঁছিবার পথ দেখিয়ে দেয়। মন্ত্র আমাদের উৎসের অনুভূতি অর্থাৎ আনন্দ উপলব্ধি করায়।  এটাই আধ্যাত্মিক অনুভূতি। ঠিক ঠিক জপ্ করতে পারলে আপাত-স্তব্ধ ধ্বনি, জীবন্ত হয়ে ওঠে, শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটা ঠিক ভাষায় বোঝানো যায় না। যে ভাগ্যবান সাধক এই অকৃত্তিম-অনাবিল আনন্দ  উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তিনিই একমাত্র জানেন।

আমি বেশি কথায়  যাবো না। যদিও ওম, বা ওং  বা ওঁং এর কোনো মানে হয় না।  এটি নাদব্রহ্ম। আমাদের উৎসের সঙ্গে ওঁনার সন্মন্ধ। তাই এঁকে ব্যাখ্যা করা মানে ওঁনাকে সীমিত করা। তবু ঋষিরা যা বলেছেন তাই বলি।  সত্ত্ব রজঃ তম - অর্থাৎ সমস্ত গুনের প্রতীক উঁনি। সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এর প্রতীক উঁনি। সমস্ত দুঃখ হরণকারী, সুখদায়ক এই "ওঁং"।

এবারে বলি, এই প্রণব কি ভাবে জপ্ করতে হবে।  আসলে জপ্ যখন জোরে উচ্চারিত হয় তখন তাকে বলে বাচিক জপ্। যখন মন্ত্র মনে মনে উচ্চারিত হয় কিন্তু ঠোঁট নড়ে, তখন বলে উপাংশু জপ্। আর যখন ঠোঁটও নড়বে না অথচ মনে মনে জপ্ করাকে বলে মানসিক জপ্। এই জপ্ প্রথম দিকে বাচিক, তারপরে উপাংশু, এবং সবথেকে শেষে মানসিক জপ্ করতে বলা হয়। আমি বলি - আপনি প্রথমে শব্দ বা মন্ত্র উচ্চারণ করুন, যতক্ষন পারেন করতে থাকুন , একসময় দেখবেন, আপনার আর উচ্চারণ করতে ইচ্ছা করছে না। তখন আপনি যদি লেগে থাকেন  তখন আপনার জপ্ উপাংশুতে পরিণত হবে। ধীরে ধীরে মানসিক জপে পরিণত হয়ে যাবে ।  আপনি শুধু জপে  লেগে থাকুন।সময়ের দিকে নয়। মনটা ভিতরে নিবিষ্ট করুন।  অল্প দিনেই আপনার নেশা ধরে যাবে। ভালো থাকার অদ্ভুত উপায়। ঘড়ি ধরে কখনো উপাসনা হয় না। যতক্ষন পারবেন, উপাসনায় থাকুন। যখন আপনার জিহ্বা আপনা আপনি থেমে যাবে, তখন মনে হবে মন্ত্র আপনার ভেতর থেকে বেরুচ্ছে। আর আপনি মন্ত্রের অক্ষর বা আকার দেখতে পাচ্ছেন। এর পরে আকার মুছে যাবে শুধু অহং আর চৈতন্য থাকবে।

রামকৃষ্ণ বলতেন জপ্ করো মনে, বোনে আর কোনে। একটা নির্জন জায়গায় বেছে  
নাও । সচেতন ভাবে জপ্ শুরু করো। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা সূক্ষ্ম থেকে বৌদ্ধিক বা চিন্তার স্তরে  যাবো। তারপর আধ্যাত্বিক বা চেতন স্তরে  যাবো। এই সময় নিম্ন স্তরের স্পন্দন বা চিন্তা আমাদের পরিহার করতে হবে। অন্তরীক্ষে শব্দ, ছবি  ভেসে বেড়াচ্ছে। রেডিও/টিভি যেমন এগুলোকে ধরবার জন্য রিসেপ্টর হিসেবে কাজ করে আবার প্রজেক্টর হিসেবে কাজ করে,  তেমনি তুমি যখন অন্তরে লিন হবে তখন তোমার তিনটি সত্ত্বা সক্রিয় থাকবে। রিসেপ্টর(গ্রাহক), প্রজেক্টর (অভিক্ষেপক) এবং ভিউয়ার বা দর্শক। এই সময় তোমার মধ্যে পবিত্রতার তারতম্য অনুযায়ী মনের ইচ্ছে অনুযায়ী বা মনের শক্তি অনুযায়ী অর্থাৎ তোমার অবচেতন মন যা দেখতে চায় তাই দেখতে, শুনতে থাকবে। এই অবস্থা, যে কোনো সাধক উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু মন যত পবিত্র থাকবে তুমি ততো তাড়াতাড়ি এই স্তর পেরোতে পারবে। এইজন্য আধ্যাত্মিক জীবনে পবিত্রতা দরকার। সেই কারণেই, আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কঠোর নিয়ম পালন করতে বলেন গুরুদেবরা। আমার কথা শুনে বা এই লেখা পড়ে তোমার কোনো উপলব্ধি হবে  না।
সতর্কতা :
ধ্যান বা জপের সময় ঘুম বা তন্দ্রা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। ঘুম ঘুম ভাব এলে কিছুক্ষন পায়চারি করে নিলে ভালো হয়।  আর মন যখন চঞ্চল থাকে, তখন জোরে জোরে জপ্ করা উচিত। তাহলে মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে যাবে। জপ্ শুরু করার আগে, বিশ্বাস একান্ত প্রয়োজন। কেননা জপের পরিণতি তুমি জানো  না। আর এ এমন একটা রাস্তা যা সময় দিয়ে বা দৈর্ঘ দিয়ে মাপা যায় না। তোমার গভীর বিশ্বাস না থাকলে, তুমি সন্দেহজনক মন নিয়ে এগুতে গেলে তুমি হয় পথভ্ৰষ্ট হবে বা গতি হারিয়ে ফেলবে। ফলতঃ অবিস্বাসী মন নিয়ে এ পথে একদম পা বাড়াবে না। তার চাইতে যেমন আছো তেমন থাকো।  অহেতুক সময় নষ্ট না করা ভালো। 

সমাপ্ত    তৃতীয় ভাগ ।    
        
          


  

 

Friday, 7 September 2018

সত্যধর্মের আলোতে গুরুতত্ব (দ্বিতীয় ভাগ )


গুরুবিনা কি সাধন হবে না ? (দ্বিতীয় ভাগ )





আগেরদিন আলোচনা করছিলাম - গুরুতত্ব সত্যধর্মের   আলোতে। এবং বলছিলাম যে ,
আমার  যদি ব্যাকুলতা না থাকে, আমার যদি চেষ্টা না থাকে, হাজার গুরু করলেও আমার  কোনো
উন্নতি হবে না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন : যদি তেত্রিশ কোটি দেবতায় বিশ্বাস থাকে অথচ তোমার আত্মবিশ্বাস না থাকে, তবে কখনোই তোমার মুক্তি হবে না।

আমি যদি আন্তরিক না হই   স্বয়ং ভগবানও আমার ভালো করতে পারবে না। আর আমার যদি ব্যাকুলতা থাকে,  আমার যদি আন্তরিকতা থাকে, আমার যদি প্রবল আগ্রহ থাকে, তবে ভালো গুরুও পাওয়া যাবে, ভগবানকেও পাওয়া যাবে। মাটিতে চিনি ফেলে রাখুন, কোত্থেকে পিঁপড়ে এসে যাবে, আপনি জানেন না। গাছে ফল পাঁকলে, কোত্থেকে কাঠবিড়াল এসে যাবে, পাখি এসে যাবে তা আপনি জানেন না।  কিন্তু আসে। এটাই সত্য। আমরা যদি খাঁটি শিষ্য হতে পারি, তবে সত্যিকারের গুরু কোত্থেকে আসবেন, কবে আসবেন, তা আপনি-আমি জানি না। তবে আসবে এটা  নিশ্চিত।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি।  গল্প তো অনেক আছে।  গুরু ছাড়াও যে বিদ্যালাভ হয় এমনকি ব্রহ্ম-বিদ্যা লাভ হয়, সে প্রসঙ্গে  ছান্দোগ্য-উপনিষদ থেকে একটা কাহিনী বলি।

সত্যকামের নাম শুনেছেন নিশ্চই।  মহান ঋষি। যিনি জাবাল সত্যকাম নামে পরিচিত। জাবাল হচ্ছে তাঁর মায়ের নাম।  গোত্র পরিচয়হীন সত্যকাম। অর্থাৎ পিতৃ পরিচয় যার জ্ঞাত নেই। সেই গোত্র পরিচয় হীন সত্যকাম,  তার সরলতার জন্য, মহাঋষি গৌতমের আশ্রমে জায়গায় পেয়েছিলেন । সত্যকাম গুরুকরনের  আশায় যেদিন ঋষি গৌতমের সামনে উপস্থিত হলেন, প্রথম দর্শনেই সত্যকামকে ঋষি গৌতমের ভালো লেগে গেল। কিন্তু এই গোত্র পরিচয় হীন বালককে দীক্ষা দিলেন না। তাকে আগে উপনয়ন করালেন।  অর্থাৎ পৈতে পড়ালেন। সোজা কথায়  ব্রাহ্মণ সন্তান বানালেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কোনো এক অজ্ঞাত কারনে, এমনও হতে পারে, আশ্রমবাসী ব্রাহ্মণ সন্তানরা গুঞ্জন তোলায়, তাকে তিনি আশ্রমে রাখলেন না, কোনো উপদেশ দিলেন না। কেবল শ-চারেক দুর্বল ও কৃশ অর্থাৎ হাড্ডি মাস সার গরু দিয়ে বললেন, যাও এদের সেবা করো। সত্যকাম অভিমানের সুরে বললেন - ঠিক আছে, এরা যতদিননা সংখ্যায় হাজার হচ্ছে ততদিন আমি ফিরবো না। এই বলে  গুরুগুলোকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

সত্যকাম গরুগুলোকে নিয়ে চললেন গভীর জঙ্গলে। যেখানে লোকালয়ের কোনো খবর না পৌঁছয়। যেখানে আশ্রমের কোনো খবর না পৌঁছয়। যেখানে শুধু প্রকৃতির অঢেল আশীর্বাদ। মানুষের কোলাহল বর্জিত নির্জনস্থান। শুধু নদীর শীতল জলের কলকল ধ্বনি।  পাখির কুজন। কোমল কচি ঘাস। আর আছে গাছ ভরা  ফল। শান্ত, নীরব, ধ্যানময় জীবনের জন্য অপূর্ব দেব-ভূমি। বালক সত্যকাম গরুগুলোর দেখা শুনা করেন, সকাল সন্ধ্যা ধ্যানে মগ্ন  থাকেন। নির্জনে গরুদের সঙ্গে কথা বলেন। গাছের সঙ্গে কথা বলেন। নদির জলের সঙ্গে কথা বলেন। অদ্ভুত ভাবে প্রকৃতির একজন হয়ে গেলেন। এখন গরুরাও  ওর কথা বোঝে, সত্যকামও  গরুদের কথা বোঝে, গাছেরা ওর  কথা বোঝে, গাছের কথা সত্যকাম বোঝে, নদীর  ভাষায়  সত্যকাম কথা বলে। সমস্ত কিছুর মধ্যে ও অর্থাৎ সত্যকাম  চেতনার সাক্ষাৎ করে। মাঝে মাঝে  আশ্রমের কথা মনে পড়ে। মায়ের মুখ খানি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আবার সব ভুলে যায়।  প্রকৃতির একজন হয়ে যায়।

 এই ভাবে কত দিন, কত মাস, কত বছর কেটে গেছে, তা সে জানে না। একদিন শুনলো, একটা বৃষ বলছে  এসো সত্যবান আমি তোমাকে ব্রহ্ম-কথা বলি। আমরা তো এখন হাজার হয়ে গেছি।  এখন তো তোমার আশ্রমে ফিরে যাবার সময় হলো।  তার আগে ব্রহ্ম কথা শোনো।  যে কথা শোনার জন্য, যাঁকে  জানার জন্য তুমি প্রানপ্রিয় মাকে  ছেড়ে আশ্রমে এসেছিলে সেই ব্রহ্ম-কথা বলি শোনো। এই বলে বৃষরুপী বায়ুদেবতা, অগ্নিদেবতা, হংসরূপী সূর্যদেব, এবং মদগু নাম্নী এক জলচর পাখী যা বলেছিলো তা হলো :

ব্রহ্মের চারি পাদ : প্রতি পাদের চারটি কলা :
প্রথম পাদের  : পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এই চারটি কলা।
দ্বিতীয় পাদ  : জীবজন্তু, তরুলতা পূর্ন সুন্দর পৃথিবী এক কলা ;  অন্তরিক্ষ আর একটি কলা  ;  দীপ্ত দ্যুলোক একটি কলা ; বিশাল সমুদ্র আর একটি কলা।
তৃতীয় পাদ  : অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য ও বিদ্যুৎ -  এক একটি কলা।
চতুর্থ পাদ :  প্রাণ শক্তি, দৃষ্টিশক্তি,  শ্রবণ শক্তি, এবং মন - এক একটি কলা।

সত্যকাম সহস্রাধিক হৃষ্টপুষ্ট ধেনু সকল নিয়ে এবার গুরু গৌতমের আশ্রমে এলেন। গুরুকরণের মোহ  তার কেটে গাছে। মনে তার অনাবিল আনন্দ, অহেতুক আনন্দ।নির্মল আনন্দ। শরীরে তার জ্যোতি বেরোচ্ছে।   সারা মুখে এক জ্যোতি।  সত্যকাম এসে গুরুকে প্রণাম করলেন। গুরুত্ব সত্যকামকে  দেখে অবাক। সারা মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির জ্যোতিঃ, এক দীপ্তি, অথচ বিনম্র।

এর পরের  ব্যাপারটা শুনুন  :  গুরুদেব গৌতম ভাবলেন, কাম সারছে।  এই ব্যাটা তো গুরুগিরি ঘুচিয়ে দেবে। বললেন : হে সৌম্য ! তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানীর ন্যায় দীপ্ত দেখাচ্ছে।  তুমি কি কারুর কাছ থেকে ব্রহ্ম-জ্ঞান লাভ করেছো ? সত্যি করে বলো।

সত্যকাম বিনম্র ভাবে বললো : হ্যাঁ ভগবান, আমি ব্রহ্ম-জ্ঞান লাভ করেছি।  কিন্তু কোনো মানুষের কাছ থেকে নয়, প্রকৃতি-দেবতাদের কাছ থেকে আমি এই গুহ্য বিদ্যা লাভ করেছি।

গুরুদেবের চিন্তা হয়ে গেলো।  বললেন  : শোনো গুরু ছাড়া কোনো মানুষ বা দেবতার কাছ থেকে এই শিক্ষা লাভ করা যায় না। আমি তোমাকে সমুদয় ব্রহ্ম তত্ত্ব উপদেশ করছি।  তুমি স্থির চিত্তে এই ব্রহ্মবিদ্যা গ্রহণ করো।  এই বলে আবার একবার গুরুদেব, একই কথা অর্থাৎ যে কথা প্রকৃতির কাছ থেকে  শুনেছিলেন, সেই কথাই   বলে গেলেন।

তো যেটা বলছিলাম। নিজের মধ্যে আকুতি জাগলে,  নিজেকে তৈরী করতে পারলে, নিজেকে উপযুক্ত করে তুলতে পারলে গুরু এসে যাবে। শুধু নিজেকে জাগান, আর অপেক্ষা করুন । নিজের ভিতরেই গুরু জাগ্রত হয়ে যাবেন।

মহাত্মা গুরুনাথের দেহধারী গুরু কে ছিলেন ? শুনেছি দেবাদিদেব মহাদেব তার গুরু ছিলেন। তাহলে তো এটা মনে হয়, দেহধারী ব্যক্তি ছাড়াও গুরুকরন হয়। আসলে আপনি কাকে গুরু ভাবছেন সেটাই বড়  কথা। আপনি নিজেকে কতটা যোগ্য করে তুলতে পারছেন সেটাই বড়  কথা। আপনার গুরু কে ছিলেন, তিনি কত গুণী ছিলেন, তার কত নামডাক ছিল, তার কত শিষ্য আছে বা ছিল, সেটা বড় কথা নয়। আপনি  গুরু হতে পেরেছেন কি না সেটাই বড় কথা। প্রকৃত গুরুর কাজ শিষ্য করা নয়। প্রকৃত গুরুর কাজ গুরু তৈরি করা। শিষ্য তৈরি করা নয়। চেলা তৈরী করা নয়। প্রজ্বলিত প্রদীপ থেকে প্রদীপ জ্বলতে পারে। প্রকৃত গুরু থেকে গুরুই হতে পারে। যারা নিজেরা চেলা, তারা চেলাই তৈরী করে।  সত্যিকারের গুরু কখনো চেলা তৈরী করে না। সত্যিকারের গুরু সর্বদা গুরু তৈরী করে।




















  

Thursday, 6 September 2018

প্রশ্ন ও উত্তর

১. ধর্ম্ম বলতে কি বোঝায়  ?

ধৰ্ম বলতে আমি বুঝি, প্রকৃতির নিয়ম। ধর্ম্ম মেনে চলা মানে প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলা। আগুনের ধৰ্ম উত্তাপ প্রদান করা বা শুষ্ক করা । জলের ধৰ্ম আদ্র করা। বাতাসের ধৰ্ম  ছড়িয়ে দেওয়া। তেমনি মানুষের ধৰ্ম আত্ম-উপলব্ধি করা। 
   
২. ধর্ম্ম পথে চলতে গেল, একান্তভাবে, কি কি বিষয়ের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন ?

ধৰ্ম পথে চলতে গেলে, অজ্ঞানতাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রকৃতির ধর্মকে বুঝতে হবে। প্রকৃতি ও পুরুষের মিশ্রনেই এই জগৎ। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। পুরুষ আপন খেয়ালে চলে। প্রকৃতিতে কার্য কারন সম্পর্ক আছে। পুরুষে কোনো কার্য কারন সম্পর্ক  নেই। ইচ্ছাশক্তি পুরুষের। কর্মশক্তি প্রকৃতির।   

৩. মহাত্মা গুরুনাথ প্রবর্তিত "সত্য ধর্ম্ম" আপনার কাছে আদর্শ ধর্ম্ম বলে মনে হয় ?

ধৰ্ম একটাই।  সত্য, অসত্য বলে কিছু নেই। ধৰ্ম কখনো অসত্য হয় না। ধৰ্ম স্থিত।  একে পরিবর্তন করা যায় না।  মানুষের কল্যাণের জন্য মহাপুরুষরা কিছু পথ বা  উপায় বলে দেন।  সেটাকেই আমরা ধর্মপথ  বলে মনে  করি। মহাত্মা গুরুনাথ প্রবর্তিত সত্য-ধৰ্ম এমনি একটি পথ মাত্র। এখানে উনি বহু ধর্মপথের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ধৰ্মপথ  বলতে সাধারণতঃ আমাদের যেটা বলা হয়ে থাকে - সেটা হলো, সত্য কথা বলো, সৎ পথে চলো, সৎ সঙ্গ করো। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি কিন্তু  ধৰ্ম বলতে আমি বুঝি, প্রকৃতির নিয়ম। ধর্ম্ম মেনে চলা মানে প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলা। আগুনের ধৰ্ম উত্তাপ প্রদান করা বা শুষ্ক করা । জলের ধৰ্ম আদ্র করা। বাতাসের ধৰ্ম  ছড়িয়ে দেওয়া। তেমনি মানুষের ধৰ্ম আত্ম-উপলব্ধি করা। স্ব-স্থিত থাকা। আমরা স্ব-স্থিত থাকতে পারিনা বলে, যত দুঃখ - কষ্ট পাই। আমরা নিজেকে ভুলে গেছি বলে এতো দুঃখ। আমরা নিজেকে ভুলে যাই বলে এতো কষ্ট।

কেউ তার নিজের ধর্ম ছোট মনে করে না। আপনারাও নিশ্চই আপনাদের ধর্মকে ছোট মনে করেন না। এ প্রসঙ্গ একটা গল্প বলি। উপনিষদের গল্প : ছান্দোগ্য উপনিষদের গল্প।

একদিন প্রাণ অর্থাৎ শ্বাস, মন, বাক্য, চোখ, কান এদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বাঁধলো।  প্রত্যেকেই বলছে আমি বড়ো। কিন্তু কে বড়ো কিছুতেই মীমাংসা হয় না। শেষে কোনো উপায় না দেখে, সকলে পরামর্শ করে তাদের পিতা প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো। বললো : বাবা আমাদের মধ্যে কে বড়  তা ঠিক করে দিতে হবে।  প্রজাপতি তো সব কিছুর স্রষ্টা। দেবতা অসুর, পৃথিবী, গাছপালা, মানুষ, - এমনকি মানুষের মন, প্রাণ, হাত, পা, চোখ কান, সমস্তই  তার সৃষ্টি। সবারই পিতা তিনি। ভালো মন্দ, জ্ঞানী, অজ্ঞানী সবই  তার সৃষ্টি। সন্তানতুল্য। ব্রহ্মা পড়ে গেলেন মহা বিপদে, কাকে ছোট বলবেন, আবার কাকেই বা বড়ো বলবেন। হাজার হলেও বাবার কাছে সব ছেলেই তো সমান।  কাকেই বা ছোট বলবেন কাকেই বা বড়ো বলবেন ।  প্রজাপতি ব্রহ্মা। বুদ্ধির ডিপো।  উপায় একটা বার করে ফেললেন।  এবং বললেন - তোমাদের মধ্যে কে শরীর  ছেড়ে গেলে শরীরের অবস্থা সব থেকে খারাপ হয়, সেই শ্রেষ্ট।

বকবক যে বেশি করে অর্থাৎ বাক্য অমনি লাফিয়ে পড়লো। - আমি চললাম - দেখি এবার তোমাদের  কি দশা হয়? আমিই সব চাইতে বড়, এটা  যতক্ষন পর্যন্ত স্বীকার না করছো ততক্ষন আমি আর আসছি না।  বাক্য শরীর  ছেড়ে গেল। - কিন্তু বোবা মানুষও তো বাঁচে। এখন আর শরীর  কথা বলে না বটে। চোখে দেখে, কানে শোনে, মন দিয়ে ভাৱনা-চিন্তা করে। প্রাণে তো বেঁচে আছেই। কাজেই বিশেষ অসুবিধা হলো না। এখন এক মাস, দুই মাস, ছয় মাস, এক বছর  হয়ে গেল। কেউ আর তাকে ফিরিয়ে নেবার জন্য এলো না। বাক্য শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে  এসে দেখেদেখলো, শরীরটা তো বেশ ভালোই আছে। বরং আগের চাইতে আরো ভালো হয়েছে। দেখে একটু বিমর্ষ হলো। বললো কি হে সব কেমন আছো ? সবাই বললো - ভালোই ছিলাম। কথা বলতে পারিনি বটে, তবে,চোখে দেখেছি, কানে শুনেছি, মন দিয়ে  ভাবনা-চিন্তাও করেছি, আর প্রানে যে বেঁচে  ছিলামই, তাতো দেখতেই পারছো । বাক্যের মাথা হেট্ হয়ে গেল।  কথা না বলে, সুরসুর করে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করলো।

এবার চোখ আল্ল্হাদে নেচে উঠলো। বাক্যের সঙ্গে তার লড়াইটা সবচেয়ে বড়। তাই বাক্য যখন হেরে গেছে, তখন সে ভাবলো, আমি ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। দুনিয়াটা তো আমিই দেখি। হয় এবার আমাকে বড়ো বলে মানো, নতুবা আমি চললাম। কেউ কোনো কথা বলছে না দেখে, চক্ষু গড গড  করে শরীর থেকে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু অন্ধের ওতো জীবন চলে। চোখে দেখতে পারছে না বটে, কিন্তু কথা বলছে, কানে শুনছে, মনে চিন্তা-ভাবনা করছে আর প্রাণে তো বেঁচে আছেই। চক্ষুও এক বছর, বাইরে থেকে, কারুর কাছ থেকে ফেরার ডাক না পেয়ে, ফিরে এসে দেখে,  শরীর  তো ভালোই আছে।বরং আরো ভালো হয়েছে।  তাই কোনো কথা না বলে চুপি চুপি আবার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করলো।

এবার চোখের নিকটতম প্রতিবেশী হচ্ছে কান। তারও অহংকার কম নয়। যখন চোখের সামনেই চোখের  পরাজয় ঘটলো, কান ভাবলো এবার আমার শ্রেষ্টত্ব দেখাই না কেন।  হয় এবার আমাকে বড়ো বলে মানো, নতুবা আমি চললাম। কেউ কোনো কথা বলছে না দেখে, কান  গড গড  করে শরীর থেকে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু বধির-এর  ওতো জীবন চলে। কানে শুনতে  পারছে না বটে, কিন্তু কথা বলছে, চোখে দেখছে , মনে চিন্তা-ভাবনা করছে আর প্রাণে তো বেঁচে আছেই। কান-ও  এক বছর, বাইরে থেকে, কারুর কাছ থেকে ফেরার ডাক না পেয়ে, ফিরে এসে দেখে,  শরীর  তো ভালোই আছে বরং আরো ভালো হয়েছে ।  তাই কোনো কথা না বলে চুপি চুপি আবার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করলো।

এবার মন।  সে শুধু ভাবে।  বিচার করে, চিন্তা করে। চিন্তা হীন জীবন হয় নাকি ? তাহলে আমিই শ্রেষ্ট। মন বললো দেখো, আমি আর প্রান,  এ ছাড়া তো কেউ আর বাকি রইলো না। প্রাণ করে টা  কি ? কেবল আসে আর যায়। তোমরা তাহলে আমাকেই শ্রেষ্ট বলে মেনে নাও। আসলে প্রাণ  এই লড়াই-এ ছিলই  না। কোনো কথাই বলে নি। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না দেখে মন এবার রেগে মেগে বেরিয়ে গেল। দেখ কেমন লাগে। এখন আর শরীরে বিচার নাই, চিন্তা নাই, ভাবনা নাই। তবু শরীর বেঁচে আছে।
তবে কে বড়ো  ? মন-ও এক বছর  পরে ফিরে এলো। এসে দেখে শরীরতো দিব্যি আছে। কোনো কথা না বলে মন শরীরের মধ্যে প্রবেশ করলো।

এবার প্রাণের পালা। প্রাণ  জানে কে বড়ো। যে বড় তার অহংকার নেই। বড়ো বড়ো কথাও বলে না। নীরবে নিভৃতে নিজের কাজ করে চলে। আর তার জন্যই  সবার বাড়-বাড়ন্ত ।  সবার অহংকার। সেই সকলকে পোষন করছে। সেই সবাইকে শক্তি যোগাচ্ছে। কিন্তু সে নির্বিকার। সকলের অভিমান যখন চূর্ণ হয়ে গেল - তখন নিজেকে জানান দেবার জন্য প্রাণ শরীর  ছাড়ার উপক্রম করলো। ত্রাহি ত্রাহি রব  উঠে গেলো সবার মধ্যে। বিপদ বুঝে মন, বাক্য, চক্ষু, কান সবাই এসে প্রাণের পায়ে পড়লো।  ছেড়ে যেও না, ছেড়ে যেও না। তুমিই সব, তুমিই সব, তুমিই বড়, তুমিই শ্রেষ্ট, তুমিই বশিষ্ট, তুমিই প্ৰতিষ্ঠা, তুমিই সম্পদ, তুমিই আয়তন, তুমিই আত্মা - তুমি চলে গেলে সব শব্  হয়ে যাবে ।              

এখন সত্য-ধর্ম্ম আদর্শ ধর্ম্ম কেন ? ধরুন আপনি একটা সোনি কোম্পানির  টিভি কিনেছেন। এখন টিভি কেনার সময় সময় আপনাকে একটা লিফলেট দিয়েছে। তাতে কিছু সতর্কবাণী লেখা আছে। যেমন, এটি আগুনে পুড়ে যাবে, জলের মধ্যে টিভি রাখলে টিভি নষ্ট হয়ে যাবে। ইত্যাদি, ইত্যাদি। এখন টিভিটা যদি ভাবে, বা টিভির ক্রেতা যদি ভাবে, আমি জলেও থাকবো  , আগুনের কাছেও যাবো , দেখিনা কি হয় ? তাহলে কি হবে ? অক্কা পেয়ে যাবে।  হবে না ? হবে। তেমনি ভগবান যখন মানুষকে বা এই জীব জগৎকে, সৃষ্টি করেছেন তখন কিছু সতর্ক বাণী বলে দিয়েছেন। এটাই ভগবানের আইন, কুদরত কি কানুন। প্রকৃতির নিয়ম। বিধির বিধান। ভগবানের এই বাণী নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। এখন  আমাদের  সেই  সতর্ক বাণী মেনে চলা উচিত।  যদি না করি তাহলে আমাদের দুঃখ হবে। আমরা দুঃখী হবো। এবং আমাদের দুঃখী হবার এটাই কারন।

এখন টিভিটা খারাপ হয়ে গেলে কি করবো ? কেউ বলবে, বাড়িতে মিস্ত্রি ডাকো। কেউ বলবে দোকানে নিয়ে যাও। আমি বলবো কোম্পানিকে খবর দাও। কেননা একমাত্র কোম্পানিই জানে এর মধ্যে কি আছে, এবং কি ভাবে একে  ভালো করতে হবে। মহাত্মা গুরুনাথ এই কোম্পানিকে খবর দেবার কথাই বলেছেন। তিনি সাধুদের কাছে যেতে বলেননি। দেবতাদের কাছে যেতে বলেননি। পরম-আত্মার কাছে অর্থাৎ পরম-পিতার কাছে যেতে বলেছেন। যিনি আমাদের সৃষ্টি-কর্তা।  অন্যরা ঘরে, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গনেশ, কৃষ্ণ, শিব কে ডেকে আনতে  বলছেন। কেউ বলছেন আশ্রমে  যাও।  পাহাড়ে যাও।  মন্দিরে যাও, মাসজিতে যাও গুরুদ্বারে যাও ।  গুরুদেব বললেন পরমাত্মার কাছে বস।  তার  কাছে বস উপাসনা কারো , তাকেই ডাক, তার কাছে প্রার্থনা জানাও। ভজন কারো । এইখানেই সত্যধর্ম আর অন্য্ ধর্মের মধ্যে পার্থক্য। ওরা বলছে দেবতাদের পূজা করো, ওরা  বলছে আশ্রমবাসী হও। মহাত্মা বলছেন সব ছেড়ে এককে ধরো।

এখন এই প্রকৃতির আইন  কি ? আর পুরুষের আইন  বা কি ?

প্রকৃতির জগতে কারন ভিন্ন কর্ম হয় না। প্রকৃতির তার নিজস্ব নিয়মে চলে। এখানে কারুর হাত নেই।
তুমি বীজ লাগাও গাছ হবে।  গাছ লাগাও ফল হবে। পরিবেশ পেলে অবশ্যই  হবে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মানুবর্তিতা আছে। তোমার ইচ্ছে মতো সে হবে না। সময় ও পরিবেশ পেলে তবেই হবে। এবং নির্দিষ্ট ফলই  দেবে। এর জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। পরিচর্যা করতে হবে। বীজ লাগিয়েই গাছ দেখতে পারবে না।  সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ পেলে তবেই হবে।

কিন্তু পুরুষের জগৎ আলাদা। এখানে কোনো নিয়মের বালাই নেই। এখানে আবেগই শেষ কথা। অসীম অনন্ত পুরুষ আপন খেয়ালে ভাঙছেন গড়ছেন। ইচ্ছাই শেষ কথা। এই দুটিরই অবস্থান আছে আমাদের মধ্যে। তাই আমরা প্রকৃতি পুরুষের মিশ্রণ।

 আমরা গুন্ থেকেই দ্রব্য চিনতে পারি ।  আমরা গুন্ থেকেই সাধারণ পুরুষ ও মহাপুরুষের মধ্যে পার্থক্য নির্নয় করতে পারি। অতএব তুমি যদি সাধারণ পুরুষ থেকে উত্তম পুরুষ হতে চাও তবে যে  গুনের সাধনা কারো। 
গুরুদেবও, এই গুনের সাধনার কথা বলেছেন। প্রেমের সাধনা, অর্থাৎ সর্ব উচ্চতম গুনের সাধনা। মাস্টারের ছবি  সামনে রেখে ধ্যান করলে জ্ঞান হয় না। শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। মাস্টার মহাশয় যা বলেছেন তাই করতে হয়। মানতে হয়।

সব শেষে বলি, আপনাদের মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক আমার চোখে পরে, সেটাই আমাকে সত্য ধৰ্ম সম্পর্কে জানতে উৎসাহ জোগায়। সত্য ধর্মের এখানেই সার্থকতা।
   
        
     
৪. সাধনা, ভজনা, উপাসনা  ভিন্ন মানব জীবনে, ধর্ম্ম পথে চলা সম্ভব কি না ?

সাধক যা করেন তাই সাধনা।  ভক্ত যা করেন, তাই ভজনা।  ঈশ্বরের কাছে উপবেশন মানেই উপাসনা। এগুলো সবই মনের ধৰ্ম। মানসিক বৃত্তির উন্নতি সাধনে, এগুলো সহায়ক। আগেই বলেছি, পুরুষ আপন খেয়ালে চলে।  তাকে ধরা যায় না।  তিনি ধরা দেন।   

৫. সংগীত ধর্ম্ম পথে কতটা সহায়ক ?

ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য যত  পথ আছে, যা মানসিক বৃত্তির উন্নতি সাধনে সহায়ক, তার মধ্যে সংগীত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই সঙ্গীত ধৰ্ম পথে অবশ্যই সহায়ক।

তবে একটা কথা বলি, মহাত্মা গুরুনাথের বই পড়ে  আমার যেটা মনে হয়েছে, ধর্ম্মপথে চলতে চলতে আমাদের অনেক গলি ঘুচি দিয়ে প্রধান রাস্তায় আসতে  হয়। এই প্রধান রাস্তা হচ্ছে একাগ্রতা। এক অর্থাৎ সেই পরমপিতা পরমেশ্বরের সঙ্গে নিজেকে এক করা, এককে অগ্রাধিকার দেওয়া ।  একাগ্রতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আর একদিন হবে। এই গলি হচ্ছে গান। এটি প্রধান রাস্তায় যাবার পথ মাত্র। প্রধান রাস্তা নয়। যারা গলির মধ্যে থাকেন, তাদের তো গলি পেরোতে হবে। তাই গান ভালো। অন্তরের মলিনতা দূর করে, এই ধর্মসঙ্গীত ।   তবে এটা রাস্তার প্রারম্ভ মাত্র।  ঈশ্বরের পথ থেকে   যেটা বহু দূর। প্রধান রাস্তা হচ্ছে, একাগ্রতা। 

সমাপ্ত