Tuesday, 17 December 2019

প্রশ্ন উপনিষদ


 প্রশ্ন উপনিষদ - ১
প্রাণী কোথা থেকে  আসে, আবার কোথায় চলে যায় ?
ভালোকথা শুনতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু ভালো কথা বলার লোক কোথায়  ? আর ভালো বলতেই বা আমরা কি বুঝি ?  আসলে ভালো বলতে আমরা  সেই কথাই বুঝি, যা আমার পছন্দের কথা। কিন্তু সত্য হচ্ছে, যা আমাদের পক্ষে কল্যাণকর, সেটাই ভালো কথা । আমাদের দর্শন শাস্ত্রগুলো একটা একটা কঠিন হীরের খন্ড । এর থেকে রস বার করা ভীষণ শক্ত। আর এই সব শাস্ত্র বুঝতে গেলে, আমাদের ভাষার উপরে দখল চাই, পান্ডিত্য চাই, আর চাই গভীর মনোযোগ। বিষয় বা ভাষা যদি খটোমটো   হয়, তবে মনোযোগ দেওয়া খুব কঠিন। তাই আমরা একটু সহজ করে বুঝবার চেষ্টা করবো, কঠিন বিষয়গুলোকে। 

প্রশ্ন হচ্ছে কোথা থেকে আমরা এসেছি ? আবার কোথায় চলে যাবো  ? অর্থাৎ প্রাণীসকল কোথা থেকেই বা  আসে আর কোথায় যায়  ?  আমাদের এই জীবনের উৎসই বা কি ? ঠিক এরকম একটা প্রশ্ন করেছিলেন, কবন্ধী নামক  এক জিজ্ঞাসু  ঋষিগুরু  পিপ্পলাদকে। ঋষি পিপ্পলাদ এর উত্তরে যা বলেছিলেন, তা "প্রশ্ন" উপনিষদ নাম খ্যাত। আমরা সেই প্রশ্ন উপনিষদ থেকে পিপ্পলাদের মুখে শুনবো, এই প্রশ্নের উত্তর। প্রাণী কোথা থেকে আসে, আবার কোথায় চলে যায়  ?

ঋষি পিপ্পলাদ বলছেন - প্রজাপতির সন্তান সৃষ্টির ইচ্ছে হলো। সেই উদ্দেশ্যে তিনি তপস্যা শুরু করলেন। এবং তিনি এই জ্ঞান লাভ করলেন যে, যদি অন্ন থাকে আর সেই অন্নের একজন ভোক্তা থাকেন, তবে তারা সম্মিলিত ভাবে বহু সন্তান সৃষ্টি করতে পারবে। 

এখন কথা হচ্ছে এই প্রজাপতি কে ? তাকেই বা কে সৃষ্টি করলো ? দেখুন প্রজাপতি কোনো ব্যক্তি নন। 
প্রজা কথাটার মানে যা সৃষ্টি হয়েছে। পতি  কথাটার মানে স্বামী বা প্রভু। ইনি  কোনো ব্যক্তি নন। যেখানে বা যার কাছে, সৃষ্টির বীজ সংগ্রহীত থাকে তাকে  বলে প্রজাপতি। এই সংগ্রহশালায় কোটি কোটি তাক, কোটি কোটি খোপ। সীমাহীন মৌচাক।   অর্থাৎ এটি একটি সীমাহীন  সংগ্রহশালা। অর্থাৎ এটি একটি বৃহত্তর শক্তিমাত্র যা সৃষ্টির বীজকে যুগ  যুগান্তর ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে।  আসলে প্রাণের কোনো সৃষ্টি নেই, প্রাণের কোনো বিনাশ নেই। কখনো এটি কারণরূপে বা বীজ আকারে আছে, আবার কখনো কার্যরূপে প্রতীয়মান হচ্ছে। পিতা থেকে সন্তান আবার সন্তান থেকে পিতা। বীজ থেকে গাছ আবার গাছ থেকে বীজ। ডিম্ থেকে মুরগী আবার মুরগী থেকে ডিম্। এটি একটি প্রবহমান ধারা। কালের অতীত এই ধারা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বয়ে চলেছে। এর না আছে শুরু, না আছে শেষ। কখনো কারণে লয় হয়ে আছে, কখনো প্রকাশিত হচ্ছে । জগৎ কারুর সৃষ্টি নয়, জগৎ একটা অভিব্যক্তি মাত্র। এটি কখনো প্রকাশিত, কখনো অপ্রকাশিত। চন্দ্র তার আদ্রতা দিয়ে, অন্ন সৃষ্টি করেন। সূর্য্য তাকে অর্থাৎ অন্নকে  টেনে তোলেন। তাই চন্দ্রকে বলে অন্ন আর সূর্যকে বলা হয় অন্যের ভোক্তা। প্রাণ এবং অন্ন দুটি পৃথক বস্তু নয়, রূপের পার্থক্য মাত্র। প্রতিযুগে কত কিছু  আসে যায়, আবার কল্পান্তে সেসব বীজ আকারে উৎসে ফিরে যায়। এযেন সেই অন্ধ পাগলি বুড়ির মতো, যা কিছু পায়, যা কিছু সে অবহেলায় থাকতে দেখে, সব সে তার ঝুড়িতে ভরে রাখে। এক এক সময় সে সব আবার সে মাটিতে ছড়িয়ে ফেলে। তখন সেই বীজ থেকে অংকুর হয়ে গাছ জন্মায়। গাছ বড় হয়, ফল দেয়, বীজ হয়, আবার সে মরে যায়।  বুড়ি আবার গাছের নিচে আসে অবহেলায়  ছড়িয়ে থাকা ফল-বীজ ঢুকিয়ে রাখে ঝোলার মধ্যে। 

জীবন এই ভাবেই চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে। জন্ম থেকে মৃত্যু আবার মৃত্যু থেকে জন্ম। কার্য্য থেকে কারন, আবার কারন থেকে কার্য্য। প্রাণের না আছে সৃষ্টি না আছে লয়।  না আছে জন্ম না আছে মৃত্যু। একবার প্রকাশিত একবার অপ্রকাশিত। একবার বীজ একবার গাছ। একবার কার্য্য, একবার কারন। কারণে অপ্রকাশিত, কার্য্যে প্রকাশিত। 

বেদান্ত বলছে, এই প্রজাপতি এসেছেন ব্রহ্ম থেকে।  মৌচাকের খোপগুলো প্রজাপতি। এখানেই বীজ। এখানেই মধু। খোপ যেমন একাধিক, প্রজাপতিও একাধিক। আমরা সবাই একএকটা প্রজাপতি। আমরাই বীজের আকার ধারণ করি। আবার আমরাই গাছে পরিণত হই। ব্রহ্মার কোনো ইচ্ছে বা আকাঙ্খা নেই। তাই তিনি নির্গুণ।   কিন্তু আমার বা প্রজাপতির আছে। প্রজাপতি থেকে সৃষ্টি হয়, আবার প্রজাপতিতেই ফিরে যায়। প্রজাপতি কোনো চেষ্টা করেন না। তিনি কেবল সংকল্প করেন, তিনি কেবল চিন্তা করেন। তাঁর এই সৃষ্টির সংকল্প-চিন্তা থেকেই চন্দ্র-সূর্য্যের যুগলবস্তু প্রকাশিত। চন্দ্র অর্থাৎ রয়ি বা অন্ন বা খাদ্য। আদ্রতা চন্দ্রের বিশেষত্ব। যা সবকিছুকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। আবার অন্ন থাকলে তার একজন ভোক্তা থাকবে।  সেই ভোক্তা হচ্ছেন সূর্য। এই সূর্যই প্রাণ। আর এই প্রাণের প্রকাশ ত্রিবিধ। সূর্য, ভূতাগ্নি, জঠরাগ্নি। এই জঠরাগ্নি আমাদের খাদ্য হজম করায়। ভূতাগ্নি ভূতকে দাহ  করে। সূর্য গ্যাসীয় পদার্থকে দাহ করে, যাকে  আমরা হিলিয়াম  গ্যাস বলি। প্রাণ আসে সূর্য থেকে, খাদ্য যা আমাদের বেঁচে থাকতে  সাহায্য করে, তা আসে চন্দ্র থেকে। আবার এই চন্দ্র সূর্য পৃথক নয়, শুধু নাম আর রূপেই পার্থক্য মাত্র । 

উপনিষদ বলছেন, জগতে দুটো বস্তূ প্রাণ ও অন্ন।  আর দুটোই প্রাণীর  খাদ্য। আবার প্রাণ খাদ্যকে অর্থাৎ অন্নকে গ্রহণ করে। প্রাণ হচ্ছে সূক্ষ্ম খাদ্য, অন্ন হচ্ছে স্থূল খাদ্য।  আপাত দৃষ্টিতে এই দুটো আলাদা মনে হলেও, তারা এক, আলাদা নয়। প্রাণ ও খাদ্যের মিলিত সত্ত্বাই প্রাণী। 

সূর্যই সমস্ত কিছুকে প্রকাশ করেন ।  সূর্যই জীবের অন্তরাত্মা। জগতের সব রূপই সূর্য্যের রূপ। সূর্যের তেজ প্রকাশকে  যে বস্তু প্রতিফলিত করতে  অক্ষম সেই বস্তু ভূতে পরিণত হয়।  তাই মানুষ মারা গেলে ঠান্ডা হয়ে যায়। দেহের উত্তাপ জীবনের লক্ষ্মণ। প্রাণের লক্ষণ। এই প্রাণ যখন অগ্নি রূপে থাকেন, তখন তিনি আধিভৌতিক, অর্থাৎ পদার্থগত। আবার এই প্রাণ যখন জীবন তখন আধ্যাত্মিক। তাই প্রাণ আমাদের আয়ু প্রদান করে, আর এটি প্রাণের  প্রকাশক্ষন, অর্থাৎ কতদিন প্রাণী বেঁচে থাকবে  তা  স্থির করে, আবার গ্রহণ করে বা অপ্রকাশের ক্ষণ ঠিক করে, বা মৃত্যুক্ষণ ঠিক করে। 

এই সূর্যই আমাদের প্রাণের উৎস।  এই সূর্যই আমাদের জ্ঞানের উৎস। আপনারা যারা বেদ  পড়েছেন তারা জানেন, বেদে কেবলই সূর্য্যের উপাসনা, তা সে প্রতক্ষ্য হোক বা অপ্রত্যক্ষ হোক। সূর্যকে সর্ব্ব দেবতার উর্দ্ধে স্থান দেওয়া হয়েছে। যারা সেই বিখ্যাত মন্ত্র গায়ত্রী, শুনেছেন তারা জানেন। এই  মন্ত্রে জ্ঞানের প্রতীক সেই সূর্য বা সাবিতদেবকে আহ্বান করা হচ্ছে। সূর্যদেবের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে। উপনিষদে সূর্যকে বলা হচ্ছে, বিশ্বরূপং (সমস্ত রূপ), হরিণং, (উজ্জ্বল)  জাতবেদসম (সর্বজ্ঞ) পরায়নম (সকলের আশ্রয়) একং জ্যোতিঃ (একমাত্র আলো ) ।

আবার আমরা প্রজাপতির কথায় ফিরে যাই। এই প্রজাপতি সংবৎসর, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ।  দুই পথে তার যাতায়াত।  উত্তর ও দক্ষিণ। জগতে দুই শ্রেণীর মানুষ আছেন, একদল জ্ঞান লাভের  জন্য, কর্ম্ম
করেন, অর্থাৎ ঈশ্বর চিন্তন করেন।  আর এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, যারা সন্তান লাভের   জন্য কর্ম্ম করেন। অর্থাৎ বিষয় চিন্তায় মগ্ন থাকেন।   আর এদের জন্য পথও দুটো। একটা উত্তরায়ণ আর একটা দক্ষিণায়ন। সূর্য যখন দক্ষিণ গোলার্ধে থাকে তখন দক্ষিণায়ন। একেই বলে চন্দ্রের পথ। আবার সূর্য যখন উত্তর গোলার্ধে থাকে তখন তাকে বলে উত্তরায়ণ। এই পথ হচ্ছে সূর্য্যের পথ।

জ্ঞান লাভের পথই সূর্য্যের পথ। অর্থাৎ আলোর পথ। আর ভোগ বিলাসীর জন্য চন্দ্রের পথ। অর্থাৎ অন্ধকারের পথ। উত্তরমার্গীগন অর্থাৎ আলোর পথের যাত্রী, ধীরে ধীরে আদিত্যপদ লাভ করেন। আদিত্য সমস্ত প্রাণীর আশ্রয়। এটাই প্রাণীর সর্ব্বোত্তম অবস্থা। একবার এই পদ লাভ হলে মানুষ আর ফিরে আসে না। আত্মানম্ অন্বিষ্য। আত্মাকে অনুসন্ধান করো। কিন্তু এই আত্মাকে অনুসন্ধান করবো কি করে ? উপনিষদ বলছেন,  তপস্যা ও কৃচ্ছ্র সাধনার দ্বারা।

অন্যদিকে ভোগ বিলাসীরা চন্দ্র পথের যাত্রী। অর্থাৎ অন্ধকারের যাত্রী। এরা বার বার ফিরে ফিরে আসেন। আর সুখ-দুঃখ ভোগ করেন।  চন্দ্রের পথ অন্ধকার আচ্ছন্ন। চাঁদ সব সময় বদলাচ্ছে।  কখনো পূর্ণচন্দ্র। কখনো অর্দ্ধচন্দ্র আবার  কখনো অমাবস্যা।  সূর্য্যের কোনো পরিবর্তন নেই। চন্দ্রের ক্ষয়-বৃদ্ধি আছে সূর্য্যের ক্ষয়-বৃদ্ধি  নেই। আমরা যদি নিজেকে মৃত্যুর অধীন মনে করি, তবে সব সময় ভয় আমাদের তারা করে বেড়াবে। আর যদি আমরা যদি নিদেরকে শ্বাশত আত্মা মনে করি, তবে আমরা নির্ভয় থাকতে পারবো। 

অন্নই প্রজাপতি। অন্ন থেকে আসে প্রাণের বীজ। এই বীজ থেকে সমস্ত প্রাণীর জন্ম। আবার প্রাণী থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেলে অন্নে পরিণত হয়ে যায়। অন্ন থেকে আবার প্রাণের বীজ। এই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রাণী জগৎ। একেই বলে জন্ম মৃত্যুর চক্র। আত্মজ্ঞান এই চক্র  থেকে বেরিয়ে যাবার উপায়। উপনিষদ এই শিক্ষাই  দেয় আমাদের। 

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি  ওম।

 প্রশ্ন উপনিষদ -২

কথায় বলে কান টানলে মাথা আসে। ঠিক তেমনি প্রাণ টানলে আত্মা আসে। আসলে সরাসরি আমরা ঈশ্বরের কাছে যেতে পারি না। তাই ঈশ্বরের সঙ্গে যিনি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত, আমরা তার সঙ্গে ভাব জমাতে চাই। যাতে একসময় আমরা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যেতে পারি ।  আমি অনেক গো-পালককে দেখেছি, গরুর বাচ্চাটাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন, আর পিছন পিছন মা-গরু আপনা আপনি আসছে। তাই আমরা যদি প্রাণ সম্পর্কে ভালো ভাবে জানতে পারি, তবে আমাদের ঈশ্বর জ্ঞান স্বভাবিক ভাবেই এসে যাবে।   তাই আধ্যাত্মিক সাধকদের কাছে প্রাণের খুব কদর। বাহ্যিক দিক থেকে দেখতে গেলে, সমস্ত সাধক এই প্রাণের সাধনাই করে থাকেন। আজ আমরা এই প্রাণের কথা শুনবো। প্রাণ কোথা থেকে আসে?  তিনি কি ভাবে শরীরে প্রবেশ  করেন ? কি ভাবে তিনি সারা শরীরে ছড়িয়ে যান ?  কি ভাবে তিনি শরীরকে কর্মক্ষম করেন। কি ভাবেই বা তিনি আবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যান ? কি ভাবে তিনি প্রাণী ও পদার্থসমূহকে ধারণ করেন ? আমাদের যে ইন্দ্রিয়শক্তি আছে, তা কিভাবে এই প্রাণকে আশ্রয় করে থাকে ? ঠিক এই প্রশ্নগুলো করেছিলেন, অশ্বলপুত্র  ঋষি পিপ্পলাদকে। আমরা সেই সব কথা শুনবো। কিন্তু তার আগে শুনে নেবো, আমাদের শরীরের মধ্যে যে ইন্দ্রিয়গুলো আছে, যাদের সাহায্যে আমরা বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি তার  সঙ্গে আমাদের প্রাণের সম্পর্ক কি ? আর এসব কথাই শুনবো  আমরা ঋষি পিপ্পলাদের কাছ থেকে। 


ইন্দ্রিয় ও প্রাণের কথা  আমরা শুনছি প্রশ্ন উপনিষদের কথা। প্রশ্ন কথাটার অর্থ হচ্ছে জিজ্ঞাসা। আমাদের মতো সাধারণের মানুষের মধ্যে মাঝে মধ্যে নানান রকম প্রশ্ন জেগে ওঠে । প্রশ্ন উপনিষদে এই সাধারণ মানুষের প্রশ্নগুলোকে নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভৃগুবংশীয় ভার্গব। প্রশ্নটা খুবই সাধারণ। ভার্গব বলছেন, হে গুরুদেব, কয়টি ইন্দ্রিয় প্রাণীর দেহকে ধারণ করে থাকে ? তার মধ্যে কোন ইন্দ্রিয় দেহকে প্রকাশ করে থাকে ? আবার ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে কোনটি প্রধানতম ? 
ঋষি পিপ্পলাদ বলছেন।  এই আকাশের মধ্যে আছেন বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী, বাক, মন, চক্ষু ও কান। এঁরা সবাই দেবতা অর্থাৎ বিশেষ গুনের অধিকারী। এরাই বানম বা দেহকে বলিষ্ঠ করে। বানম  অর্থাৎ অস্থায়ী।  দেহের কর্ম্ম শেষ হলে  যেহেতু দেহের নাশ হয়। তাই দেহকে বলছেন বানম।

আমরা জানি আমাদের এই দেহ পাঁচটি উপাদানে গঠিত। অর্থাৎ আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী এই পাঁচটি উপাদানে এই প্রাণীদেহ গঠিত। আবার এই পাঁচটি উপাদান দিয়েই তৈরি হয়েছে, আমাদের কর্ম্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞান ইন্দ্রিয়। কর্ম-ইন্দ্রিয় অর্থাৎ বাক(মুখ), পাণি(হাত), পাদ(পা), পায়ু (মল-মূত্র), উপস্থ (জনন-ইন্দ্রিয়) । আর জ্ঞান ইন্দ্রিয়গুলো হচ্ছে, চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক। এছাড়া আর একটা ইন্দ্রিয় আছে, তা হচ্ছে আমাদের মন। আর এই সব কিছুর পিছনে আছেন আমাদের প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তি। এর মধ্যে প্রাণ-ই সবথেকে শ্রেষ্ট। এই প্রাণের ক্রিয়াতেই জীবন শুরু হয়।  আবার প্রাণের ক্রিয়াশেষে জীবনের শেষ। 

ঋষি পিপ্পলাদ একটা গল্পের মাধ্যমে, প্রাণের শ্রেষ্ঠত্ব বুঝিয়েছেন। বলছেন, একবার ইন্দ্রিয়সকল দাবি করলো, যে তারাই দেহকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সক্রিয় রেখেছে। তারা বলছে, আমরাই দেহকে ধারণ করে আছি। তো প্রাণ বললো, এইভাবে তোমরা মোহগ্রস্থ হয়ো না, অহংকার কোরো না। আমার শক্তিতেই তোমাদের শক্তি। আমিই নিজেকে পাঁচ ভাগ করে এই দেহকে  ধারণ করে আছি।  আর আমার এই পাঁচ ভাগ হচ্ছে, প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান, সমান।  প্রাণের কাজ হচ্ছে শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস  ত্যাগ করা । অপানের কাজ হচ্ছে, খাদ্য বস্তু থেকে অসার পদার্থ বর্জন করা।  ব্যান দেহের স্নায়ুকে ক্রিয়াশীল করে। উদ্যান দেহের তাপ রক্ষা করে, সমান খাদ্যকে হজম করতে সাহায্য করে। এই পাঁচটি শক্তি দ্বারা আমি অর্থাৎ প্রাণ দেহকে সচল রাখি, ও কারক্ষাম রাখি। 

তো প্রাণের এসব কথায়, ইন্দ্রিয়গণ কর্নপাত  করলো না। তারা তাদের অহংকারে মত্ত হয়ে রইলো। প্রাণ এতে ক্ষুব্ধ হলো, এবং দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ভান করলো। যেই না প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম করলো, তখন ইন্দ্রিয়গণ শক্তিহীন হয়ে পড়লো। ত্রাহি ত্রাহি রব শুরু হয়ে গেল। উপনিষদ বলছেন, মৌচাক থেকে যখন রানী মৌমাছি বেরিয়ে যায়, তখন সব মৌমাছি তাকে অনুসরণ করে। শরীর  থেকে প্রাণ যদি বেরিয়ে যায়, তবে ইন্দ্রিয়সকলও প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়।  তারা কেউই প্রাণ বিহীন দেহে থাকতে পারে না। প্রাণ ছাড়া তাদের কোনো কর্ম্ম ক্ষমতা থাকে না। সমস্ত ইন্দ্রিয় এমনকি মনও প্রাণের শক্তিতে সক্রিয় থাকে। 

ঋষি পিপ্পলাদ বলছেন, এই প্রাণ-ই পৃথিবী, প্রাণই চন্দ্র, প্রাণই সূর্য, এমনকি মেঘ-বৃষ্টি-বায়ু, সব-ই প্রাণের অন্তর্গত। প্রাণ কার্যরূপে স্থূল, আবার কারন রূপে সূক্ষ্ম। স্থূল-সূক্ষ্ম যা কিছু পদার্থ সবই প্রাণ।  তাই প্রাণ অমর - চিরস্থায়ী। 

এই প্রাণ-ই সূর্য-রূপে বাইরে উত্তাপ বিকিরণ করছেন, আবার অগ্নি-রূপে শরীরের ভিতরে উত্তাপ রক্ষা করছেন। এই প্রাণের সাহায্যে যেমন তাপ-আলো উৎপাদন হচ্ছে, তেমনি মেঘ, বৃষ্টি, অন্নের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই প্রাণ হচ্ছে, অমৃত, সমস্ত জীবের আশ্রয় এই প্রাণ। 

জ্ঞান অর্থাৎ সমস্ত বেদাদিও এই প্রাণকে আশ্রয় করে অবস্থান করছেন। প্রাণেই সবকিছু প্রতিষ্ঠিত। "প্রাণে সর্বং প্রতিষ্ঠিতম।" আমরা যা কিছু শুনছি, দেখছি, এমনকি অনুভব করছি, সবই প্রাণের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। 

প্রাণ প্রজাপতি রূপে মাতৃগর্ভে অবস্থান করে। প্রাণ-ই পিতা-মাতার রূপ নিয়ে, সন্তান হয়ে জন্মায়। ইন্দ্রিয়গণ আসলে প্রাণের জন্য উপহার নিয়ে আসে। চোখ নিজের জন্য কিছু  দেখে না। কান নিজের জন্য কিছু শোনে না। সমস্ত ইন্দ্রিয় আসলে প্রাণের জন্য উপহার সংগ্রহ করছে মাত্র। প্রাণ-ই দেবতা, আর তাকে আহুতি দিচ্ছে ইন্দ্রিয়সকল। আসলে ইন্দ্রিয়গণ বাহক মাত্র। ইন্দ্রিয়গুলো আসলে যেন এক এক জন ঋষি। ঋষিরা যেমন আমাদের সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেন , ইন্দ্রিয়গণ তেমনি আমাদের এই জগৎকে জানতে সাহায্য করে।  প্রাণশক্তি ইন্দ্রিয়কে সঠিক ভাবে চালনা  করে, সত্যকে জ্ঞাত হচ্ছে। প্রাণ-ই সমস্ত প্রাণীগণের পিতা, প্রাণ-ই সমস্ত ইন্দ্রিয়গনের পিতা। আমাদের দেখা, শোনা, কথাবলা, চিন্তা করা, এমনকি আমাদের যত  মানসিক কর্ম্ম আছে, সবই এই প্রাণের জন্যই সম্ভব হচ্ছে। প্রাণ ছাড়া আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় অকেজো। জগতে যা কিছু আছে, সবই প্রাণ রক্ষা করছে। প্রাণের নিয়ন্ত্রনেই জীব জগতের সমস্ত কার্য্য সম্পাদিত হচ্ছে। মা যেমন সন্তানকে রক্ষা করেন, প্রাণ তেমনি আমাদের সকলকে রক্ষা করছেন। অতএব আসুন আমরা প্রানেরই উপাসনা করি। 

প্রশ্ন উপনিষদ -৩

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাণ কোথা থেকে আসে?  তিনি কি ভাবে প্রবেশ শরীরে করেন ? কি ভাবে তিনি আমাদের  সারা শরীরে ছড়িয়ে যান ?  কি ভাবে তিনি শরীরকে কর্মক্ষম করেন। কি ভাবেই বা তিনি আবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যান ? কি ভাবে তিনি জীব  ও পদার্থসমূহকে প্রাণ ধারণ করেন ? আমাদের যে ইন্দ্রিয়শক্তি আছে, তা কিভাবে এই প্রাণকে আশ্রয় করে থাকে ? ঠিক এই প্রশ্নগুলো করেছিলেন, অশ্বলপুত্র কৌসল্য ঋষিগুরু পিপ্পলাদকে। আমরা এই ঋষি পিপ্পলাদের মুখ থেকে এই সব প্রশ্নের জবাব শুনবো। 

আমাদের প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে প্রাণ কোথা থেকে আসে ? ঋষি পিপ্পলাদ বলছেন, প্রাণ আসে আত্মা থেকে। আমাদের দেহের যেমন একটা ছায়া থাকে, এবং এই ছায়াকে যেমন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, তেমনি আত্মার ছায়াই হচ্ছে প্রাণ। আত্মাতেই প্রাণ নিহিত আছে, আর এই প্রাণের ইচ্ছেতেই, অর্থাৎ এই প্রাণ যখন ইচ্ছে করেন, তখন তিনি শরীরকে ধারণ করেন। অর্থাৎ শরীরে প্রবেশ করেন। তো প্রাণ যখন শরীরে প্রবেশ করেন, তখন এটা বুঝতে হবে,  আত্মাও তখন শরীরে প্রবেশ করেন। কেননা ছায়াকে তো শরীর  থেকে আলাদা করা যায় না। তেমনি আত্মাকে ছায়া থেকে বা ছায়াকে আত্মা থেকে আলাদা করা যায় না। সমুদ্র থেকে যেমন তার ঢেউকে আলাদা করা যায় না। সমুদ্র না থাকলে ঢেউয়ের কথা ভাবা যায় না।  তেমনি আত্মা না থাকলে তার ছায়া অর্থাৎ প্রাণকে ভাবাই  যায় না। আর প্রাণকে সত্য বলে মনে হয়, তার কারন তার প্রাণ  আত্মার সঙ্গেই প্রাণ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছেন। সাপ ততক্ষনই পুজো পায়, যতক্ষন সে শিব ঠাকুরের গলায় জড়িয়ে থাকে, শিব ঠাকুরের গলা থেকে বেরিয়ে গেলে সাপ ধংসাত্মক। তেমনি আত্মা থেকে প্রাণকে আলাদা করলে কেবল বাতাস। প্রাণহীন বাতাস বলে যেমন কিছু হয় না, আত্মাহীন  মানুষ বলে যেমন কিছু হয় না, তেমনি  প্রাণহীন আত্মা বলেকিছু হয় না। আত্মাতে  প্রাণ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।  কিন্তু প্রাণ হচ্ছে ভৌতিক, আর আত্মা হচ্ছে অভৌতিক। তা হলে আমরা বুঝলাম, প্রাণ আসে আত্মা থেকে। প্রাণ ভৌতিক, আর  আত্মা হচ্ছেন অভৌতিক। কিন্তু দুজনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।  

আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে প্রাণ  কি ভাবে শরীরে প্রবেশ করেন ? জীবাত্মাতে অন্তর্নিহিত মনের ইচ্ছেতেই এই স্থূল শরীরে তিনি আসেন। অর্থাৎ শরীরে প্রাণ আলাদা করে কখনো আসেন না, আসতে  পারেন না। আসেন আত্মা, আর স্বাভাবিক ভাবেই প্রাণ এই আত্মাকে বহন করে নিয়ে আসেন। এই কথাটা আমরা আরো একটু ভালো-ভাবে বুঝবার চেষ্টা করবো।  উপনিষদ বলছেন, আমাদের মনের গতি বা আমাদের মনের যে প্রবণতা, আমাদের মনের যে সংকল্প, যে আকাঙ্খা তাকে রূপ দেবার জন্য, মন এই দেহ সৃষ্টি করে। তাই উন্নত  মন উন্নত  দেহের সৃষ্টি করে, সংকল্প অনুযায়ী যোগ্য শরীরে সে প্রবেশ করে । শরীরবিহীন কোনো সংকল্পই পূরণ হবার নয়, তা সে ভালো বলুন, বা মন্দ বলুন।  অনুসন্ধান তা সে ঈশ্বরের অনুসন্ধানই হোক, আর জাগতিক বস্তুর অনুসন্ধান হোক,   সবই  কেবলমাত্র শরীর  সাধ্য। অর্থাৎ আমাদের আকাঙ্ক্ষা বা সংকল্প পুরনের জন্য আমাদের উপযুক্ত শরীর  লাভ হয়। বেদান্ত দর্শন বলছে, শরীর যেন একটা জোঁক, এক পাতা থেকে আর এক পাতায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  তেমনি প্রাণ, এক দেহ থেকে আর এক দেহে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ জীবাত্মাই এক দেহ থেকে আর দেহে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সংকল্প সাধনের জন্য। আর প্রাণ  ইন্দ্রিয়গুলোর সাহায্যে নিদিষ্ট কর্ম্ম সম্পাদন করতে থাকেন।  বা বলা যেতে পারে, প্রাণ ইন্দ্রিয়গুলোকে যথা নির্দিষ্ট  কর্ম্মে নিযুক্ত করছেন। 

 আমাদের পরের প্রশ্ন ছিল, কি ভাবে  প্রাণ  সারা শরীরে ছড়িয়ে যান ? কি ভাবে তিনি শরীরকে কর্মক্ষম করেন ?


প্রাণ যখন আমাদের এই স্থূল শরীরে প্রবেশ করেন, তখন আমাদের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে বা বলা যেতে পারে, কর্মক্ষম  হয়ে ওঠে। প্রাণের অবর্তমানে শরীরে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও কর্ম্ম ক্ষমতাহীন হয়ে, অর্থাৎ নির্জীব অবস্থায়  অবস্থান করে মাত্র। প্রাণ স্থূল শরীরে প্রবেশ করেই যেটা করেন, সেটা হচ্ছে ক্ষমতা প্রদান।  তিনি নিজেকে ৫টি ভাগে ভাগ করে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দেন। চোখ, কান, মুখ, নাক - এখানে প্রাণ নিজে অবস্থান করেন। শরীরের মাঝামাঝি অংশে পাঠিয়ে দেন সমান বায়ুকে। শরীরের নিমাঙ্গে পাঠিয়ে দেন অপান বায়ুকে। ব্যান বায়ু সমস্ত ধমনীর মধ্যে প্রবেশ করেন। আর উদান বায়ু প্রবেশ করেন, আমাদের কেন্দ্রীয় ধমনীতে অর্থাৎ ইড়া, পিঙ্গলা,  সুষুম্না, নাড়ীর মধ্যে। এখানেই  চিত্রাণি, বজ্রাক্ষা,  নাড়ী অবস্থান করে । এইভাবে তিনি সমস্ত শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েন ও শরীরকে জীবন্ত করে তোলেন, ক্রিয়াশীল করে তোলেন।  

একদম শেষ প্রশ্ন ছিল,  কি ভাবেই বা তিনি আবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যান ? 


উপনিষদ বলছেন : প্রাণীর মৃত্যুকালে উদানবায়ুর ভূমিকা গুরুত্ত্বপূর্ন। এই উদানবায়ু জীবাত্মাকে দেহের বাইরে নিয়ে যায়। এই উদান বায়ুর ত্রিবিধ গতি, উর্দ্ধ-নিম্ন-মধ্যে। জীবাত্মার কর্ম্ম অনুসারে, উদান  বায়ু এই গতি নির্দিষ্ট করে। কেউ পুণ্যলোকে, কেউ পাপলোকে, আবার কেউ মনুষ্যলোকে গতিলাভ করে। উদ্যান বায়ু শরীরে উত্তাপ দান করে। উদ্যান বায়ুর অবর্তমানে শরীর শীতল হয়ে যায়। আর সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন মনে লীন হয়ে যায়। এবং সে তখন জন্মান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়।  এই সময় মন  সূক্ষ্ম অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলোকে  নিয়ে, প্রাণে প্রবেশ করে, আর প্রাণ তখন আত্মার অনুসরণ করে। নাক বা মুখ বা বিশেষ ক্ষেত্রে ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে আত্মা বেরিয়ে যায়।

সাধন মার্গের লোকেরা যখন একটু উচ্চ পর্যায়ে চলে যান, তখন তারা এই উদ্যান বায়ুকে  করেন। উদ্যান বায়ুর অবস্থান যেহেতু, সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে, তাই উদ্যান বায়ুকে উর্দ্ধগতি করবার জন্য চেষ্টা করেন। এবং উদ্যান বায়ুকে ব্রহ্মরন্ধ্রে চালান করেন। এসব কথা আমরা পরিবর্তিতে আলোচনা করবো।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।  

প্রশ্ন উপনিষদ -৪

 এর আমরা শুনবো আমাদের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে।  অর্থাৎ জাগ্রত - স্বপ্ন - সুষুপ্তি - তুরীয় অবস্থা সম্পর্কে। প্রত্যেক মানুষের এই চারটি অবস্থা আছে। এর মধ্যে তিনটি অবস্থা সম্পর্কে আমাদের সাময়িক ধারণা আছে। জাগ্রত অবস্থায় আমরা বাহ্যিক জগতের জ্ঞান অনুভব করি। স্বপ্নাবস্থায় আমরা আর একটা জগতে বাস করি, যেখানে বাহ্যিক জগতের অনুরূপ একটা জগতে ঘোরাফেরা করি, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। কিন্তু ওই মুহূর্তের জন্য সবই আমাদের সত্য প্রতীয়মান হয়। কিন্তু আমাদের যখন নিদ্রা ভগ্ন হয়, তখন সেই দৃশ্যমান জগৎ আমাদের কাছ থেকে অপসৃত হয়ে যায়। আর একটা অবস্থা আমাদের হয়, যাকে  বলে সুসুপ্তির অবস্থা, যাকে  আমরা গভীর নিদ্রা বলি, সেখানে আমাদের কাছে, এই বাস্তব জগৎ, বা স্বপ্ন জগৎ কোনোটার উপস্থিতি থাকে না। আমরা তখন, আমাদের আমি বোধ থাকে না। আর জগতের কোনো অস্তিত্ত্ব আমাদের কাছে ধরা পরে না। 

জাগ্রত অবস্থায় আমাদের শরীর ও মন দুইই ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু স্বপ্নাবস্থায়, আমাদের শরীর ক্রিয়াশীল থাকে না। কিন্তু মন ক্রিয়াশীল থাকে।  সুসুপ্তির অবস্থায় আমাদের শরীর ও মন দুই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তখন ইন্দ্রিয়গুলোর কোনো পৃথক অস্তিত্ত্ব থাকে না। কিন্তু এই সুষুপ্তি বা গভীর নিদ্রার পরে, আবার আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে ফিরে আসি। এই অবস্থায় জীবাত্মা পরম-আত্মায় অবস্থান করে। তাই আমাদের শরীর বোধ থাকে না। ইন্দ্রিয়গুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। মন তখন আত্মাতে নিবদ্ধ থাকে। এত আত্মা পরম-আত্মায় স্থির হয়। এর পরে আমাদের আর একটা অবস্থা আছে, যাকে  বলে তুরীয় অবস্থা। এই অবস্থায় জীবাত্মা পরম-আত্মায় লিন হয়ে যায়। এখানেই আমাদের বিশ্রাম। 

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।  

ওম্-এর ধ্যান করলে কি হয় ?
প্রশ্ন উপনিষদ - ৫
হিন্দু ধর্ম্মের সমস্ত শাস্ত্রে ওম্ এই ধ্বনির গুরুত্ত্ব স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু এই ওম ধ্বনির ধ্যান করলে কি হয়, অর্থাৎ এই ধ্যানের  পরিণতি কি তা আমরা সম্যকরূপে জানি  না। আজ আমরা সেই কথা শুনবো। আমরা সবাই প্রশ্ন উপনিষদের নাম শুনেছি। এই উপনিষদে ঋষি সত্যকাম ঋষি পিপ্পলাদকে একবার এই প্রশ্ন করেছিলেন। তো আমরা তার কাছ থেকে শুনে নেবো, ওম-এর ধ্যান করলে কি হয় ? কেউ যদি সারা জীবন ধরে, ওম-এর ধ্যান করেন, মৃত্যুর পরে তার গতি কি হয় ? তিনি কি আবার মানুষ রূপে ফিরে আসেন, না আর আসেন না? যদি না আসেন তবে তিনি কোন লোক প্রাপ্ত হন ? অর্থাৎ মৃত্যুর পরে, তার প্ৰস্থান কোথায় হয়, বা তিনি কেমন থাকেন। 

প্রথমে বলি, ধ্যান হচ্ছে একটি স্থির প্রদীপ শিখা। অগ্নিশিখা যেমন সবসময় উর্দ্ধমুখী হয়, তেমনি ধ্যান মানুষকে উর্দ্ধমুখী করে তোলে। আর এই ধ্যান তখনই সম্পন্ন হতে পারে, যখন মানুষ যম -নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-ধারণা ইত্যাদি গুলোতে সিদ্ধ হয়। এগুলো সম্পর্কে আগে শুনেছি। কিন্তু ধ্যান তো অনেক কিছুর উপরে করতে পারি। তাহলে ওম-এর ধ্যানের  বিশেষত্ত্ব কোথায় ? ধ্যানের  উদ্দেশ্য ঈশ্বর-প্রণিধান বা ঈশ্বরকে ভালোবাসা, ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি করা। ওম সেক্ষেত্রে আমাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারে। এসব কথা জানতে গেলে আমাদের আগে জানতে হবে, ঈশ্বর কি আর ওম-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায় ?

দেখুন, বেদান্ত বলছে, ব্রহ্ম-এর দুটো দিক। একটা সগুন আর একটা নির্গুণ। এই দুয়ে মিলেই ঈশ্বর। ঈশ্বর যেখানে মায়া  দ্বারা বিশেষিত সেটা সগুন ব্রহ্ম। আর যেখানে তিনি মায়া দ্বারা আবিষ্ট নন, সেখানে তিনি নির্গুণ ব্রহ্ম। এই দুয়ে মিলেই ব্রহ্ম। সমুদ্র ও তার বুদ্বুদ যেমন আলাদা নয়। তেমনি ব্রহ্ম, সগুন ও নির্গুণ ভেদে  আলাদা নন। জগৎ তারই প্রকাশ কিন্তু জগতের মধ্যে নীতি নিঃশেষিত নন। সবকিছুর ভিতরে যেমন তিনি আছেন, সবকিছুর বাইরেও তিনি আছেন। 

এইবার ওম-এর কথায় আসি। কিন্তু তার আগে, আমরা একটু শুনে নেই, ধ্যানে আমরা প্রতীকের ব্যবহার কেন করি ? দেখুন, ঈশ্বর এই কথাটার দ্বারা আমরা কিছু ধারণা করতে পারি না। আর ধারণা বিহীন ধ্যান হতে পারে না। নাম-রূপ আমাদেরকে একটা ধারণা দিতে পারে। দেবাদিদেব  শিব, বা ধরুন ঠাকুর রামকৃষ্ণ বা জঙ্গলের সিংহ বললেই আমাদের মধ্যে শিব বা রামকৃষ্ণের সেই ধ্যানময় মূর্তিটি ভেসে ওঠে। এমনকি সিংহ বলতেও  সিংহের একটা প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু আমরা যখন ব্রহ্ম এই শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন আমাদের মনে নির্দিষ্ট কিছু ভেসে ওঠে না। আসলে ব্রহ্ম-কথাটার  মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট খুঁজে পাই না। কারন সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই।   কিন্তু নাম-রূপের সঙ্গে একটা বৈশিষ্ট আছে। প্রতীক আমাদের কাছে দৃশ্যমান। তাই সেখানে আমরা আমাদের মনকে একাগ্র করতে পারি। কিন্তু যাকে দেখা তো দূরের কথা কল্পনাতেও আনতে  পারি না, সেখানে আমরা নিজেকে একাগ্র করতে পারি না। আর ধ্যানে একাগ্রতা অবশ্য়ই গুরুত্ত্বপূর্ন। 

এখন কথা হচ্ছে, এই প্রতীক হিসেবে, ওম - কে কেন বেছে  নেবো ? দেখুন ওম যখন আমরা উচ্চারণ করি তখন আমরা আমাদের গলার পিছন দিক থেকে বদ্ধ ওষ্ঠ পর্যন্ত প্রতিটি অংশকে স্পর্শ করে থাকি। অ-উ-ম এই তিনে মিলে  ওম। সৃষ্টি শুরু হয়, শব্দ বা ধ্বনি দিয়ে। তাই আমরা যদি ব্রহ্ম-কে শব্দ হিসেবে কল্পনা করতে পারি, তাহলে ওম হচ্ছে সেই শব্দ যার দ্বারা আমরা ব্রহ্মকে চিহ্নিত করতে পারি।  
অ - উপনিষদ বলছে, অ-উ-ম এর মধ্যে অ-এর ধ্যান করলে, আমরা জাগতিক জ্ঞান লাভ করতে পারি। অ হচ্ছে ঋগ্বেদের প্রতীক। অ-এর ধ্যান করলে বা অ-এর ধ্যান করেই আমরা মনুষ্য জীবন  লাভ করতে করেছি। আবার অ-এর ধ্যান করলে আমরা আবার উন্নত মনুষ্য  জন্ম লাভ করতে পারবো। অর্থাৎ অ-এর ধ্যান করলে আমরা পরবর্তী জীবনে মুনি-ঋষি হয়ে জন্মে মনুষ্য-জীবনকে সার্থক করতে পারবো। এই দৃশ্যমান জগৎ তো ব্রহ্ম ভিন্ন কিছু নয়। এই সত্যকে তখন আমরা উপলব্ধি করতে পারবো। অ-কার হচ্ছে জগৎ। অ-কে ধ্যান করলে, প্রকাশ -স্বরূপ ব্রহ্মকে ধ্যান করা হয়। অর্থাৎ অ-কার হচ্ছে, আমাদের জাগ্রত অবস্থা। আর এই জাগ্রত অবস্থায় যে অনুভূতিগুলো আমাদের হয়, সেগুলোকে আমরা সঠিকভাবে ধরতে পারবো। এবং এই প্রতক্ষ্য জগৎকে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় আনতে  পারবো। জাগ্রত অবস্থায়, আমরা যে  জগতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি, সেই জগৎকে আমরা সঠিক উপায়ে জানতে পারবো এই অ-এর ধ্যান করে। কিন্তু আমাদের আবার ফিরে ফিরে আসতে  হবে। এবং পুনঃ পুনঃ মানুষই জীবন ধারণ করতে হবে। 

উ - এবার জানবো  আমরা উ এর ধ্যান করলে কি হয়।  উ  হচ্ছে যজুর্বেদের প্রতীক। এর দ্বারা আমরা আমাদের মনকে উন্নত করতে পারি। মৃত্যুর পরেও আমরা আমাদের মানসিক শরীরে, মানস লোকে বাস করি। বেদ বলছে যে,,  তিনটি লোক আছে অর্থাৎ, ভূঃ - ভুবঃ - স্বঃ অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও স্বর্গলোক। এই তিনি লোকে আমাদের সাধারণত যাতায়ত করতে হয়, জন্ম জন্মান্তর ধরে। তো আমরা যখন ভূলোক ছেড়ে ভুবর্লোকে যাবো, তখন যে শরীর অর্থাৎ মানস শরীরে বা যে লোক অর্থাৎ মানসলোকে আমরা বাস করবো, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান হবে। এবং আমরা উন্নতমানস লোকের বাসিন্দা হতে পারবো। উ-এর ধ্যান করলে আমরা তখন পার্থিব ভোগ সুখের প্রতি আকৃষ্ট বা আসক্ত হবো  না। বরং আমরা পরহিতকর কর্ম্মে আকৃষ্ট হবো। উপনিষদ বলছে, স্বর্গ ও মর্তের  মধ্যবর্তী আকাশ স্থান হচ্ছে অন্তরীক্ষ। এই লোকে আমরা আমাদের পূর্ব-পুরুষদের সঙ্গ  লাভ করে থাকি।  এমনকি দেব-দেবতাদের সান্নিধ্যও  লাভ করে থাকি। কিন্তু এই লোক থেকেও আমাদের আবার ফিরে আসতে  হবে, মনুষ্য  রূপে আবার জন্ম গ্রহণ করতে হবে। 

ম -  ম-এর ধ্যান করলে সাধক  সূর্যলোক প্রাপ্ত হন। সূর্য্য হচ্ছে আমাদের জ্ঞান, জ্যোতিঃ ও পবিত্রতার প্রতীক। সাধক তখন এই সব গুনের অধিকারী হন। এই অবস্থায় চিত্ত শুদ্ধির ফলে তাঁর আত্মজ্ঞান লাভ হয়। তখন তিনি আর পৃথিবীতে ফিরে আসেন না।কিন্তু ব্রহ্মেও লিন হন না।  সাধক তখন সবকিছুর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন। কিন্তু এই অবস্থা শেষ অবস্থা নয়। 

ওম - অ-উ-ম এই তিনটি অক্ষরকে যিনি আলাদা ভাবে ধ্যান করেন, তিনি মৃত্যুর অধীন। আলাদা ভাবে ধ্যান করলে, আমরা প্রথমে জাগতিক, পরে স্বপ্নাবস্থা, শেষে সুষুপ্তিতে চলে যেতে পারি। কিন্তু এই তিনকে একত্রে ধ্যান করলে তিনি তুরীয় অবস্থায় চলে যেতে পারেন। আমরা সকলে এই প্রথম তিন অবস্থার অধীন। কিন্তু ওম-এর ধ্যান করলে, সাধক যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তিনি ব্রহ্মের সাথে একাত্মতা অনুভব করেন। তিনি জ্বরা-ব্যাধি-মৃত্যু-ভয় থেকে মুক্তি লাভ করেন। তিনি সত্যিকারের মুক্ত পুরুষ হয়ে যান। 

পিপ্পলাদ বলছেন, সাধক যদি ওম-এর ধ্যান করেন, তবে তিনি ঋক মন্ত্রের সাহায্যে মনুষ্যলোক, যজুর্মন্ত্রের দ্বারা চন্দ্রলোক, এবং সাম মন্ত্রের সহায়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন। পরম শান্তি লাভ করেন। নিখিল বিশ্বের সাথে তিনি তখন এক হয়ে যান। তিনি তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হন। সমস্ত লোক, সমস্ত বন্ধনের  উর্দ্ধে চলে যান তিনি। তিনি তখন শান্তম -অজরম -অমৃতম-অভয়ম-পরং চ।

 শান্তম - সাধক তখন শান্ত স্থির। একটা অবিচল প্রশান্তি অনুভব করেন। 
অজরম - জ্বরা -ব্যাধি -বার্ধক্য তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি পরিবর্তন রোহিত হয়ে যান। 
অমৃতম- তিনি অমৃতত্ব প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ মৃত্যুহীন বা জন্ম-মৃত্যু রহিত হয়ে যান। 
অভয়ম- তিনি অভয়ম হয়ে যান।  তাঁর ভয়-ভীতি বলে কিছু থাকে না। তিনি স্থির শান্ত সমাহিত। 
পরং চ - তিনি সর্বোচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হন। 

অতএব আমরা শেষ করতে পারি এই কথা দিয়ে যে, ওম-এর ধ্যানে সর্বোচ্চ পরম-সত্যকে লাভ করা সম্ভব।আসুন আমরা সবাই ওম-এর ধ্যানে লিপ্ত হয়।  

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।


  









   

  









      













   















    

Saturday, 7 December 2019

মহর্ষি পতঞ্জলির যোগদর্শন "বিভূতিপাদ " PATANJALI - BIBHUTIPAD




 মহর্ষি পতঞ্জলির যোগদর্শন
"বিভূতিপাদ "  PATANJALI - BIBHUTIPAD
২৬.১১.২০১৯ - পতঞ্জলির যোগদর্শন, যোগের উপরে একমাত্র প্রামাণ্য বই।  যোগের উপরে এর থেকে ভালো বই আছে  আর আছে  কিনা আমার জানা নেই। আর এই বইয়ের মধ্যে একটা অধ্যায় আছে, যার নাম "বিভূতিপাদ"।  এই বিভূতিপাদ সম্পর্কে আছে আমাদের অসীম কৌতূহল। তার কারন, এখানে আছে, সব অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের উপায়।  যদিও আমি কিন্তু  এই সব ক্ষমতার অধিকারী নোই। তথাপি আমরা এই অধ্যায়  পড়ে দেখবো, এতে কি আছে। কিভাবেই বা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করেন, সব সাধু মহাত্মারা। আমরা অনেক সময় অলৌকিক ক্ষমতার বা ঘটনার কথা শুনি, কেউ কেউ দেখেছি হয়তো, কিন্তু কিভাবে  যে এটা হয়, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। এর বৈজ্ঞনিক ব্যাখ্যাই বা কি ? শুধু এইটাই জানি, সাধনা করলে নাকি এই সব ক্ষমতা অর্জন করা যায়। আজ আমরা এই বইয়ের পাঠক মাত্র। আমরা শুধু শুনবো, এখানে মহর্ষি পতঞ্জলি কি বলছেন। তবে একটা কথা বলি, এসব কথা আমাদের কাছে নিছক সাধারণ  জ্ঞানের বিষয় মাত্র । এই জ্ঞান অনুধাবন করা জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার ফলেই একমাত্র লভ্য হতে পারে। তবে এইসব কথা শুনলে আমাদের মধ্যে একটা ঔৎসুক্য জাগ্রত হতে পারে, এবং এই পথে এগুনোর  একটা সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।  

মহর্ষি পতঞ্জলি, বিভূতিপাদ -এর কথা বলার আগে, সাধন পদের কথা বলেছেন। এমনকি সমাধিপাদের কথাও বিস্তারিত ভাবে  বলেছেন। সাধনপাদে, তিনি অষ্টাঙ্গ  যোগের কথা বলেছেন।  অর্থাৎ যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার এই পাঁচটি সাধনপথের কথা বলেছেন। এই বিভূতিপাদে আসলে ধারণা, ধ্যান, ও সমাধির বর্ননা করেছেন। এই তিনটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে  ধ্যেয় বস্তুতে মানুষ সম্পূর্ণতা লাভ করে। আর এই অবস্থাকে বলে "সংযম" । আর এই "সংযম"  যিনি লাভ করতে পেরেছেন, তিনিই যোগবিভূতি লাভ করতে পেরেছেন। আমরা এক এক করে শুনবো তিনি কি বলছেন। বিভূতিপাদে খুবই সংক্ষিপ্ত ৫৫টি শ্লোক আছে। এর মধ্যে আজ আমরা কেবল মাত্র ১৬টি শ্লোকের কথা  শুনবো। 

১.ধারণা :  কোনো এক দেশে, অর্থাৎ শরীরের বাইরে হোকে বা ভিতরে হোক, চিত্তকে স্থির করার নাম ধারণা। অর্থাৎ শরীরের যে কোনো অঙ্গে যদিও মহাত্মারা বলছেন, শরীরের ভিতরে বলতে তিনি বলছেন, নাভিচক্র, হৃদয়চক্র, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা, সহস্রার  ইত্যাদি যে সব চক্র  আছে, তা যে কোনো একটিতে চিত্তকে স্থির করাকে ধারণা বলে। আবার শরীরের বাইরে, তা সে সূর্য্য, চন্দ্র, আকাশ, বা যে কোনো মূর্তি, বা পদার্থে যখন চিত্ত স্থির হয় তখন তাকে বলে ধারণা। 

২.ধ্যান : এইবার যেখানে চিত্তকে নিবিষ্ট করা হচ্ছে, সেখানে আমাদের বৃত্তিকে স্থির করার নাম ধ্যান। ধ্যানে আমাদের বৃত্তিকে ধ্যেয়বস্তুর প্রতি প্রবাহিত করে দিতে হবে। 

৩.সমাধি : ধ্যানে যখন শুধু ধ্যেয় বস্তুই মাত্র প্রতিত হয়, অন্য কোনো কিছুর দিকে বৃত্তি ধাবিত  হতে না পারে, তখন যে অবস্থা হয়, তাকে বলে ধ্যান। এই সময় দ্রষ্টা ও দৃশ্য একাকার  হয়ে যায়। ধ্যানীর নিজের আলাদা কোনো অস্তিত্ত্ব বোধ থাকে না। তখন একমাত্র ধ্যেয় বস্তুই পরিলক্ষিত হয়। এই অবস্থাকেই বলে সমাধি। 

৪.সংযম :  আর এই তিনটি, অর্থাৎ ধারণা, ধ্যান, সমাধি যার যথাযথ সম্পন্ন হয়েছে, তখন তাকে বলা হয় সংযম। এই সংযমী অবস্থায়, সাধক এমনকি স্ব-রূপের কথাও  বিস্মৃত হন। তার কাছে একমাত্র ধ্যেয় বস্তুই  প্রতীয়মান হয়।

৫.প্রজ্ঞালোক : এই সংযম যখন সাধকের আয়ত্বে আসে, তার মধ্যে তখন বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে। একটা জ্ঞানের আলোক তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়, আর  একেই  বলে প্রজ্ঞালোক। সংযমে যখন মানুষ বিজয়লাভ করে, অর্থাৎ সাধক যখন বিষয় বিষয়ে সংযমী হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে ধীশক্তির বিকাশ ঘটে অর্থাৎ তার মধ্যে তখন বুদ্ধির এক অলৌকিক জ্ঞান  উদ্ভাসিত হয়।  একেই বলে আত্মপ্রসাদ বা ঋতম্ভরা প্রজ্ঞা। ঋ কথাটার মানে হচ্ছে জ্ঞান অর্থাৎ সত্যিকারের জ্ঞান। যে জ্ঞান আমাদের শুধু শোনা, বই থেকে পড়া বা  অনুমান করা জ্ঞান নয়। যার জন্য এই জ্ঞানকে বলা হয়, প্রকৃত জ্ঞান বা সর্ব্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান। তো সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেই জ্ঞানের আলোক রশ্মি সাধকের ভেতরে তখন উদ্ভাসিত হয়।

৬.ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই সংযম প্রয়োগ বিধি  ধীরে ধীরে স্থূল থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ে আয়ত্ত্ব করতে হয়। অর্থাৎ প্রথমে স্থূল বিষয়ে নিজেকে স্থির করতে হয়, এবং ক্রমান্বয়ে সূক্ষ্ম বিষয়ে সংযম সাধনা করতে হয়।
৭. ধারণা, ধ্যান ও সমাধি এই যে তিনটি যোগাঙ্গ তাকে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এগুলো হচ্ছে অন্তরঙ্গ সাধনা। সাধনার প্রথম দিকে যে সাধনা গুলো করতে হয়, অর্থাৎ যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার  এগুলো হচ্ছে বহিরঙ্গ সাধনা। আর ধারণা-ধ্যান-সমাধি হচ্ছে অন্তরঙ্গ সাধনা।

৮. এইযে অন্তরঙ্গ সাধনা, এগুলো আবার নির্বীজ সমাধির বহিরঙ্গ সাধন।  নির্বীজ সমাধি বলতে বোঝায় যে সমাধির কোনো বীজ অর্থাৎ সংস্কার নেই। এইসময় অর্থাৎ নির্বীজ সমাধিতে আমাদের সংস্কার লুপ্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ এইসময় আমাদের অভ্যাস বলতে যা বোঝায় তা আর থাকে না।

৯. এর পরে পতঞ্জলি বলছেন - নিরোধ সমাধি আর নির্বীজ সমাধি এক নয়। নিরোধ সমাধি হচ্ছে চিত্তবৃত্তির নাশ কিন্তু সংস্কারকে রুখে দেওয়া বা দমিয়ে দেওয়া, নাশ করা নয়।  কিন্তু নির্বীজ সমাধিতে এই চিত্তবৃত্তি তো নাশ হবেই,অর্থাৎ নতুন করে আর সংস্কারের উৎপাদন হবে না। অন্যদিকে   আবার পুরোনো সংস্কারের নাশ হয়ে যাবে।  একই বলে নির্বীজ সমাধি।  অর্থাৎ কোনো বীজ রেখে যাবে না।  অর্থাৎ ভবিষ্যতেও কোনো সংস্কারের জন্ম হতে পারবে না।

১০. সমস্ত সংস্কারের যখন দমন হয়,তখন সেই দমিত সংস্কারের আধিক্যতা বশতঃ চিত্তের একটা স্থিতি জন্ম নেয়।

১১. এই সময় অন্য কোনো বিষয়ে চিন্তা করার প্রবৃত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কেবলমাত্র ধ্য়েয় বস্তুর বিষয়ে চিন্তা করার একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।  একেই বলে সমাধি-পরিনাম  বা সাধনার পরিনাম।

১২. এর পর আবার শান্তির স্থিতি ও উদয়ের স্থিতি - এই দুটো বৃত্তিই যেন একাকার হয়ে যায়।  এই অবস্থাকে বলে চিত্তের একাগ্রতা পরিনাম। অর্থাৎ চিত্তের যে বিক্ষিপ্ত অবস্থা, সেখান থেকে চিত্ত যখন একাগ্র অবস্থায় প্রবেশ করে, তাকে বলা হয় সমাধি-পরিনাম। আবার যখন চিত্ত সম্পূর্ণভাবে সমাহিত হয়ে যায়, এই অবস্থাকে বলে চিত্তের একাগ্রতা-পরিনাম। এটাকে আরো একবার বুঝে নেই - সমাধি-পরিণামে চিত্তের বৃত্তি দুই ধরনের থাকে এক হচ্ছে শান্ত বৃত্তি ও উদয়কারী বৃত্তি। এবং এই দুটোর মধ্যে একটা ভেদ থাকে।  কিন্তু একাগ্রতা পরিণামের মধ্যে এই প্রভেদ বা ভাগ থাকে না।

১৩. পতঞ্জলি এবার উদাহরণের সাহায্যে এইসব পরিণামের ব্যাখ্যা করছেন।  বলছেন - এই যে চিত্তের পরিনাম এর দ্বারা পঞ্চভূত এবং সমস্ত ইন্দ্রিয়ের মধ্যে একটা প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়। আর এগুলোকে বলে ধর্ম্ম-পরিনাম, লক্ষণ-পরিনাম এবং অবস্থা পরিনাম।

ধর্ম্ম-পরিনাম - যখন কোনো ধর্মীর মধ্যে এক ধর্ম্মের লয় হয়ে, অন্য ধর্ম্মের উদয় হয় তখন তাকে বলে ধর্ম্ম-পরিনাম। লক্ষ্মণ পরিনাম - তিন  রকম অর্থাৎ বর্তমান  ধর্ম্মের লুপ্তির পরে যে অবস্থা হয় তাকে বলে অতীত লক্ষণ-পরিনাম।  অর্থাৎ অতীতে যে লক্ষণ ছিল তার লোপ পেয়ে নতুন অবস্থায় এলো। এইযে নতুন অবস্থায় এলো, এর থেকে আবার ভবিষ্যৎ ধর্ম্মের লক্ষণ প্রকাশ হবে। এই অবস্থাকে বলে বর্তমান লক্ষণ পরিনাম। অর্থাৎধর্মীয়  অবস্থার তিনটি পরিনাম। আগে যা ছিলাম, বর্তমানে যা হয়েছি, ভবিষ্যতে  যা হবো। এই পরিবর্তন আমাদের প্রতিনিয়ত চলছে। আমরা সেটা ধরতে পারি না। জন্মের পূর্বাবস্থা, অর্থাৎ অতীত, জন্মের পরবর্তী অবস্থা অর্থাৎ বর্তমান জীবন, আবার মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা। আবার দেখুন, শৈশব - যৌবন - বৃদ্ধ। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবজগৎ এগুচ্ছে। এই যে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে এটাকে বলে অবস্থা পরিনাম। তো ধর্মীর এই অবস্থা পরিবর্তনে আসলে নিয়তি। এটির রোধ করা যায় না।

এই যে অবস্থার পরিবর্তন এটিকে বিচারের সাহায্যে ধরা যায়। এবং আমাদের যখন ক্রমবিকাশের জ্ঞান হবে, তখন আমাদের পরিণামের অবসান হবে। 

১৪. ধর্ম্ম ও ধর্ম্মী কাকে বলে ?
দ্রব্যের মধ্যে বা আমাদের মধ্যে সদা বিদ্যমান শক্তির নাম ধর্ম্ম। অর্থাৎ যে কোনো দ্রব্যের স্বাভাবিক গুনের নামই ধর্ম্ম। ধর্ম্ম একটা স্বভাবগত শক্তি মাত্র। এই ধর্ম্ম যে আঁধারে থাকে, তাকে বলে ধর্ম্মী। অর্থাৎ যে কারণরূপ পদার্থের দ্বারা কোনোকিছু তৈরি হয়েছিল, বা বর্তমানে তৈরি হয়েছে, অথবা ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে, সেই কারণরূপই হচ্ছে ধর্ম্ম।
এক ধর্ম্মীর মধ্যে বহু ধর্ম্ম বা শক্তি বিদ্যমান। এর মধ্যে কোনো গুন্ বা শক্তি হয়তো এখনো প্রকাশিত হয় নি। এই অবস্থাটাকে বলে অতীত। যেমন মাটির মধ্যে কলসি হবার শক্তি আছে, সোনার মধ্যে গয়না হবার শক্তি আছে। বীজের মধ্যে গাছ হবার শক্তি আছে। জলের মধ্যে বরফ হবার শক্তি আছে। শুধু সময় ও পরিবেশ পেলে এগুলো প্রকাশিত হতে পারে।
ধর্ম্ম যখন আপন কাজ সমাপ্ত ক'রে, আবার ধৰ্ম্মীর মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, একে বলে শান্ত অবস্থা। এটাই পরিণতি বা ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। ঘট্ আবার মাটির সঙ্গে মিশে যায়, গয়না আবার সোনা হয়ে যায়।
ধর্ম্ম আসলে একটা শক্তি যা আগে থেকেই ধর্ম্মীর মধ্যে লুক্কায়িত। নিজ কার্য্য উপলক্ষে যখন তা প্রকাশিত হয় তাকেই আমরা বর্তমান বলি। অর্থাৎ মাটি যখন ঘট্ হয়, জল যখন বরফ হয়, সোনা যখন কানের দুল হয়, বীজ যখন গাছে রূপান্তরিত হয়, তখন আমরা তাকে বর্তমান বলি।
আমরা যদি সমাধি লাভ করতে চাই, এই ধর্ম্মের গতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে।

১৫. ধর্ম্মীর মধ্যে ধর্ম্ম প্রথম অবস্থায় সুপ্ত বা অব্যক্ত, তারপরে প্রকাশ, তারপরে আবার অব্যক্ত বা শান্ত। আর এই ধর্ম্মের বিকাশ বা প্রকাশ হয় ক্রোম অনুসারে।যেমন তুলো থেকে সুতো, এই সুতো থেকে সলতে হতে পারে, দড়ি হতে পারে, আবার কাপড় হতে পারে। অর্থাৎ নির্মাতার ইচ্ছে বা ক্ষমতা অনুযায়ী ধর্ম্মের প্রকাশ হয়। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, ক্রোমের পরিবর্তন ঘটলে, একই ধর্ম্মী বিভিন্ন নাম বা রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। এই যে ক্রোমের বা পরিণতির বিভিন্নতা, এটি সহকারী কারণের জন্য ঘটে থাকে। অর্থাৎ জল অতিরিক্ত ঠান্ডার জন্য বরফ হয়, আবার গরমের জন্য জল হয়। আরো উত্তাপ পেলে জল বাস্পে পরিণত হয়ে যায়। অর্থাৎ কাল-
১৬. এই যে তিনটি পরিনাম অর্থাৎ অতীতের আমি, বর্তমানের আমি ও ভবিষ্যতের আমি এই তিন পরিণামের উপরে আমরা যদি সংযম অভ্যাস করতে পারি তাহলে আমাদের অতীতে কি ঘটেছিলো,বা ভবিষ্যতে কি ঘটবে সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান লাভ হবে। যদি আমরা সংযম করতে পারি, এই সংযম কথাটা আগে আমরা শুনেছি, সংযম হচ্ছে ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে যিনি সিদ্ধি লাভ করেছেন। অর্থাৎ ধর্ম্ম-পরিনাম, লক্ষণ-পরিনাম, ও অবস্থা-পরিনাম এই তিন রকম পরিণামের উপর ধারণা-ধ্যান-সমাধি দ্বারা যদি আমরা সিদ্ধি লাভ করতে পারি, তবে আমরা সংযমী হবো। আর এই সংযমী হলে আমরা আমাদের পূর্ব-বৃত্তান্ত ও ভবিষ্যৎ-বৃত্তান্ত জানতে পারবো।

একজন যোগী যখন বর্তমান কোনো বস্তুর বা জীবের বিষয়ে জানতে চান, তবে সেই বস্তুর মূল কারন, তার পরিবর্তন প্রক্রিয়া অর্থাৎ কতদিন ধরে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সে এই অবস্থায় এসেছে, এবং ভবিষ্যতে তার কি পরিনাম হবে, এবং সেটা হতে তার কত কাল লাগবে, এইসব পরিণামের উপরে যোগী যখন সংযম প্রয়োগ করবেন, তখন তার সামনে সমস্ত কিছু প্রতক্ষ্যবৎ প্রতিভাত হবে। তখন তিনি বস্তুর ভূতকাল, বর্তমানকাল, ও ভবিষ্যৎকালের স্থিতি-কাল, তার নাম-রূপ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞাত হন।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ। হরি ওম।

আমি একবার একটা সাপের চিড়িয়াখানায় (স্নেক পার্কে) গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে একটা আশ্চার্য্য ঘটনা পর্যবেক্ষেপন করলাম। ভদ্রলোক সাপেদের সাথে কথা বলছেন। একটা ব্যাঙ সামনে ফেলে দিয়ে বলছেন, খা - খা। না খেলে অন্য কাউকে দিয়ে দেবো। যেই বলছে, অন্য কাউকে দিয়ে দেবো, অমনি লক্ষ করলাম, সাপটি এগিয়ে গিয়ে ব্যাঙটাকে খপ করলে ধরলো।

আমার ছেলের তখন বছর তিনেক বয়স। সেই সময়, আমাদের বাড়িতে আজাদ নামে আমার এক সহকর্মী বন্ধু এসেছিলো দিল্লী থেকে। ও আসলে চন্ডিগড়ের ছেলে । ও বাংলা কিছু বুঝতে পারতো না। হিন্দি ও ইংরেজি ছাড়া কিছু জানতো না। তো একসময় দেখি, বারান্দায় পুটপুট করে আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলছে। আমার ছেলের সাথে ওর বন্ধুত্ত্ব হয়ে গেছে। কেউ কারুর ভাষা বোঝে না। কিন্তু ভাবের বিনিময়ে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আর আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, আমার স্ত্রীর কথা সে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। তো অন্যের ভাষা আমরা কি করে বুঝবো ?

১৭, "শব্দার্থ প্রত্যয়ানাম ইতরেতর অধ্যাসাৎ সংকরঃ তৎ প্রবিভাগ সংযমাৎ সর্বভূতরুৎ জ্ঞানম্।"  

সমস্ত প্রাণীর ভাষা সন্মন্ধে জ্ঞান লাভের উপায় : মহর্ষি পতঞ্জলি বলছেন, শব্দ অর্থ ও জ্ঞান এই তিনের একের মধ্যে অন্যের অধ্যাস অর্থাৎ আরোপ বশতঃ, এই তিনের মধ্যে যে মিশ্রণ হয়ে চলেছে তার বিভাগ অর্থাৎ তাকে পৃথক বোধের বিষয়ে সংযম পালন করলে সমস্ত প্রাণীর ভাষা সন্মন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়। আর একটু পরিষ্কার করে বলি, শব্দ ও তার অর্থের জ্ঞানগুলোর পরপস্পরের আরোপ বা অধ্যাস থেকে একটা মিশ্র বা শংকর জাতীয় অভিন্ন জ্ঞান হয়, তাদের প্রত্যেকটিকে পৃথক ভাবে সংযমের সাহায্যে যোগীর সমস্ত জীবের উচ্চারিত শব্দের জ্ঞান হতে পারে।

একটা শব্দ বাতাসের সাহায্যে আমাদের কানের পর্দায় আন্দোলন তুললো। আমাদের কানের সঙ্গে মাথার পিছন অবধি যে গ্রাহক তন্ত্রী আছে, এই তন্ত্রীর সাহায্যে শব্দ-তরঙ্গকে সে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে পাঠিয়ে দিলো । সেখানে অর্থাৎ মস্তিষ্কে আমাদের যে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল, তার সাহায্যে সে এই শব্দের অর্থ নির্ধারণ করলো। এবং নির্দিষ্ট অঙ্গে বিশেষ নির্দেশ পাঠিয়ে দিলো। যদি পূর্ব অভিজ্ঞতায়, তার এই অর্থ জ্ঞান নাও থাকে, তথাপি সে সতর্ক হলো, এবং এর অর্থ ও পরিনাম পর্যবেক্ষন করতে থাকলো। এর মাধ্যমে সে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলো। অর্থাৎ প্রথমে শব্দ বাহিত হয়ে অর্থ, নিরুপন হলো, এবং শেষে তা জ্ঞানে পরিণত হলো। আসলে শব্দের মধ্যে কোনো অর্থ নেই। অর্থ আছে আমাদের মস্তিষ্কে বা মনে। সেখান থেকেই সে শব্দাদির অর্থ সংগ্রহ করে। এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি শব্দ-অর্থ-জ্ঞান এই তিনটি জিনিসের প্রতি ধ্যান দিতে বলছেন। আমরা আর একটু বিস্তারিত ভাবে বুঝে নেবো।

পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে ভাষার সৃষ্টি হয় নি।  তখন শুধু ধ্বনির  মাধ্যমেই ভাবের বিনিময় হতো। জীবের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, এবং ধীরে ধীরে ভাষার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ভাষার বিভিন্নতাও বেড়েছে। কিন্তু অনুন্নত জীবের ক্ষেত্রে আজো সেই প্রাচীন শব্দ বা ধ্বনি দিয়েই তারা তাদের ভাব প্রকাশ করে থাকে। আর এই শব্দ বা জীবজন্তুর ভাষা আপনি যদি একটু খেয়াল করেন, তবে আপনিও বুঝতে পারবেন। যারা জীবজন্তুকে ভালো বাসেন, তারা এটা ভালোভাবে বোঝেন। এদের যখন খিদে পায়, এরা  যখন ভালোবাসা পায়, বা এরা যখন ভালোবাসা জানায়,  এদের যখন যৌনক্ষুধা পায়, এরা  যখন ঝগড়া করে, এরা  যখন ভয় পায়, যখন খুশি হয়,  এদের স্বরের মধ্যে একটা তারতম্য লক্ষ করা যায়। আর এসব আপনি একটু মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারবেন।  এর জন্য আপনাকে বেশি বেগ পেতে হবে না। আপনি বাড়ির পোষ্য বিড়াল, কুকুর, পাখি - এমনকি গরু, ছাগল - এদের কথা আপনার বুঝতে বেশি বেগ পেতে হয় না। আমার স্ত্রীকে দেখেছি, সে তার পোষ্য বিড়ালের সাথে, কুকুরের সাথে কথা বলে। যখন সে তাদের আদর করে, তখন তারা এক ধরনের আওয়াজ তোলে। আসলে শুধু আপনার আন্তরিকতা ও মনোযোগ বা একাগ্রতা দরকার। তখন  এদের কথা আপনি আপনার মতো করে বুঝতে পারেন। ছোটবেলায়, আমি দেখেছি, গাভী গর্ভবতী হবার আগে ডাক ছাড়ে, আর গৃহস্থ ঠিক বুঝে যান, গরুর গর্ভবতী হবার সময় এসেছে। বিড়াল, কুকুর, বা বাড়ির যেকোনো  পোষ্য,  খাবার সময় ডাকে।  আপনি তখন তাকে খাবার দেন। পছন্দমত খাবার হয়ে গেলে, তার স্বরের পরিবর্তন হয়। এবং আপনি সেটা বুঝতে পারেন। এমনকি আপনার বাড়ির পাম্প  মেশিনেরও একটা আওয়াজ আছে,  যা শুনে  আমরা বুঝতে পারি, মেশিন ঠিক আছে কি নেই।

ধ্বনির গতি ভেদে ধ্বনির চারটি পর্যায়।   পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা ও বৈখরী।
শব্দের বা স্বরের উৎপত্তি হচ্ছে পরা - আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে এটি মূলাধার। এই মূলাধারে আছে বায়ুশক্তি বা উর্জা শক্তি। সৃষ্টিতত্ত্বের এখানেই অবস্থান।  এইখানেই ধ্বনির উৎপত্তি। পরা  কথাটার অর্থ হচ্ছে উচ্চ। অর্থাৎ ধ্বনির সর্বোচ্চ পর্যায়, যা আমাদের গোচরীভূত নয়।
এর পরে আছে পশ্যন্তি : ধ্বনি মূলাধার থেকে উঠে আসে  আমাদের নাভিমূলে। যার জন্য কেউ কেউ বলে থাকেন, প্রণব নাভি থেকে উৎপন্ন শব্দ। নাভিতে থাকাকালীন ধ্বনি থাকে  অতি সূক্ষ্ম।  আমাদের নাভিচক্রের বায়ু সঙ্গে মিশে থাকে, এই ধ্বনি । আপনি যদি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন,তবে এই ধ্বনি শুনতে পাবেন ।  একে বলে নাদব্রহ্ম।
ধ্বনি এর পরে, নাভি থেকে চলে আসে হৃদয়ে। এখানকার অবস্থানে ধ্বনিকে বলা হয়, মধ্যমা। হৃদয়ের বায়ুচক্রে  যখন ধ্বনি অবস্থান করে, তখন তাকে বলে মধ্যমা।  এটিও সূক্ষ্ম।  তাই হৃদয়ের ডাক আমরা সবাই শুনতে পাই   না।
এরপরে, কন্ঠে - যেখান থেকে ধ্বনির  উৎপত্তি বলে সাধারণের ধারণা। আসলে এই পর্যায়ে এসে ধ্বনি শব্দে পরিণত হয়ে যায়। এই ধ্বনি বা শব্দ আমরা শুনতে পাই।  একে বলে বৈখরী

এবার  বিশ্বব্রহ্মান্ডকে যদি আমরা বিরাট পুরুষের দেহ বলে কল্পনা  করি, তবে দেখতে পাবো, সেই বিরাট পুরুষের মূল ঊর্যাশক্তি থেকে এই ধ্বনির উৎপত্তি। এটি সৃষ্টির সূচক মাত্র। আসলে ধ্বনির  কোনো অর্থ হয় না। কেবল গুন্ বর্তমান। আর এই গুনের বিচার করে, আমরা এর অর্থ বের করেছি মাত্র।
শব্দ আবার দুই রকম : ধ্বনি ও বর্ণ। ধ্বনি অর্থবহ নয়। যেমন বিভিন্ন বাদ্যের বাজনা।কাঁসর ঘন্টা,বাঁশির সুর, বজ্রের ধ্বনি। মেঘের ডাক। ইত্যাদি। এমনকি  প্রণব কোনো  অর্থবহ ধ্বনি নয়।

ধ্বনি রূপান্তরিত হয় বর্ণে। আর বর্ণ  কিন্তু অর্থবহ। মানুষ এই বর্ণের সাহায্যেই কথা বলে।  তাই অর্থবহ। বর্ণ আবার দুই প্রকার ব্যঞ্জন  বর্ণ ও স্বরবর্ণ। স্বরবর্ণ নিজে থেকে উচ্চারিত হতে পারে। কিন্তু ব্যঞ্জন বর্ণ স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত হয়।

অগ্নি ও বায়ুর মিশ্রনেই  বর্ণের সৃষ্টি।  বর্ন আর কিছুই নয় আলোর বিন্দুর সমষ্টি।  পরাবিদ্যাবিদ-গন  বলছেন, দেবতারা যখন কথা বলেন, তখন এক আলোর আভা দেখতে পাওয়া যায়। আসলে আমরাও যখন কথা বলি, তখন বাতাসের মধ্যে একটা অগ্নির তরঙ্গ  প্রবাহিত হতে শুরু  করে, সেটাই আমরা আমাদের কান নামক রিসেপ্টর বা গ্রাহক যন্ত্রের সাহায্যে অনুধাবন করি। আর এর পারে প্রক্রিয়া আমরা আলোচনার প্রথমে শুনেছি।

এইবার আমরা শব্দের অর্থ সম্পর্কে শুনবো। শব্দ সবসময় অর্থবহ। আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য এই শব্দের ব্যবহার করি। শব্দের মধ্যে  ধ্বনি অনুরণিত হয়।   এই শব্দের মাধ্যমেই আমাদের জ্ঞানের বিতরণ সম্ভব হয়। আমাদের মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়, সেই ভাব প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে এই শব্দ। আবার আমাদের মধ্যে যে জ্ঞানের উদয় হয়, সেই জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে এই শব্দ। কতকগুলো শব্দের মিশ্রনে তৈরি হয় বাক্য। কতকগুলো বাক্যের মিশ্রণকে আমরা বলি ভাষা। এই ভাষা যেমন সময় ও স্থান ভেদে, জাতিভেদে, অর্থাৎ মানুষই জাতির ক্ষেত্রে এক রকম, জীব জন্তু  ক্ষেত্রে এক রকম, পাখিদের ক্ষেত্রে একরকম। প্রত্যেক জাতির ভাষা আলাদা। তেমনি এই ভাষার আবার ক্রমবিকাশ আছে।

যাই হোক। সৃষ্টির আদি ভাষার নাম বৈজিক বা বৈচিক  ভাষা। অর্থাৎ সমস্ত ভাষার বীজ আছে এই ভাষার মধ্যে। এই বৈজিক ভাষা থেকেই এসেছে আমাদের বৈদিক ভাষা।  বৈদিক ভাষা থেকে এসেছে সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন, আরবি, হিব্রু, ইত্যাদি ভাষা।  আর সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে প্রাকৃত তারপর  সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা অর্থাৎ বাংলা - ওড়িয়া - আসামি - মারাঠি -হিন্দি- গুজরাটি-তামিল-তেলেগু ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন আমরা যদি বৈজিক ভাষা জানি তবে আমরা সমস্ত জীবের ভাষা, বা নিখিল বিশ্বের ভাষা  জানতে পারবো, তা সে মানুষের হোক, আর পশু-পাখির ভাষাই হোক।

এখন এটা আমরা জানতে পারবো কি করে ? এর জন্য তো কোনো বিদ্যালয় নেই। এটাই বলছেন, আমাদের মহর্ষি পতঞ্জলি, বলছেন শব্দ-অর্থ-জ্ঞান, এই তিনের মিশ্রিত অবস্থাকে আমাদের ধারনার বিষয় করতে হবে। এই তিনকে একবার আলাদা করে, আবার এই তিনকে একত্রিত করে বোধের বিষয়ে সংযম পালন করতে হবে।  এই সংযম পালন মানে আমরা শুনেছি, ধারণা-ধ্যান-সমাধি করে সংযম আয়ত্ত্ব করা যায়। বাকশক্তির  ধর্ম্ম হচ্ছে শব্দ। আর শব্দই  ভাষার জন্ম দেয়। তাই জগতের প্রথম ভাষা, এই বৈজিক ভাষার উপরে সংযমের সাহায্যেই আমরা এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারবো।  অর্থাৎ ধ্বনির তারতম্য অনুসারে এর অর্থ জানতে পারলে যে জ্ঞান আমাদের হবে, তাতেই আমরা সমস্ত প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারবো। আসলে সংযম-ই মূল, যা আমাদের সাধনার সাহায্যে আয়ত্ত্ব করতে হবে। ঔষধ একটাই, মাপকাঠি একটাই আর তা হচ্ছে সংযম, যা আমাদের ধারণা-ধ্যান ও সমাধির মাধ্যমে অর্জন করতে হবে, তবেই আমরা সমস্ত বিভূতি বা তথাকথিত অলৌকিক শক্তি অর্জন করতে পারবো। আর এই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন, ঋষি পতঞ্জলি। সংযম হচ্ছে আমাদের একটা গুন্ বা শক্তি যা আমাদের চিত্তবৃত্তিকে ধ্যেয় বস্তুতে প্রবাহিত করতে সাহায্য করে, আর ঠিক তখন-ই  আমাদের সেই বস্তু সম্পর্কে সত্যিকারের  জ্ঞান  লাভ হয় ।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।

পূর্ব জন্মের জ্ঞান কি ভাবে লাভ করা যায় ?

মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগদর্শন বইতে বিভূতিপাদ অধ্যায়ের ১৮ নং শ্লোকে পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভের উপায় বলেছেন। তিনি বলছেন :
সংস্কার সাক্ষাৎ করনাৎ পূর্বজাতি  জ্ঞানম।
অর্থাৎ সংস্কারের সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষীকরন থেকে পূর্ব জন্মের জ্ঞান লাভ করা যায়।

মহর্ষি পতঞ্জলি বলছেন, সংস্কারের  সাক্ষাৎ করতে পারলে আমরা  আমাদের পূর্ব জন্মের সম্পর্কে জানতে পারবো। অর্থাৎআমার  সংস্কারকে  যদি আমরা ধরতে পারি, তবে আমরা আমাদের আগের  জন্মগুলো সন্মন্ধে জানতে পারবো। তাহলে আমাদের আগে আমাদের জানতে হবে সংস্কার কি ? এবং তাকে আমরা জানবো  কি করে ? সংস্কার হচ্ছে, আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সংগৃহিত জ্ঞান, যা আমরা আগেই সংগ্রহ করেছিলাম।  অর্থাৎ যে জ্ঞান আমরা আগেই সংগ্রহ করেছি। আর এই জ্ঞান কোথায় থাকে - না এটি আমাদের অবচেতন মনের স্তরে থাকে। আজকের এই যে আমি আর ৬০ বছর আগের যে আমি, তা-যে একই তা আমি বুঝি কি করে, কারন আমার স্মৃতিতে সেই পুরোনো ছবি ধরা আছে। আর সেই স্মৃতি যখন তখন  আমি ইচ্ছে করলেই জাগ্রত করতে পারি। ছোটবেলায় আমি কেমন ছিলাম, কাদের সঙ্গে আমি মেলামেশা করতাম, কিভাবে আমি জীবন-যাপন করতাম তা সব আমার মনে আছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, স্মৃতির সাহায্যেই আমরা আমাদের পূর্ব জীবনের কথা জানতে পারি। এখন কথা হচ্ছে, আমার এই জীবনের কথা আমি বলতে  পারি, কিন্তু আমি আমার পূর্ব জীবনের কথা অর্থাৎ ১০০ বা ১০০০ বছর  আগে আমি কোথায় ছিলাম, কাদের সাথে ছিলাম, কেমন দেখতে ছিলাম সে সব আমি জানি না কারন আমার মধ্যে সেই স্মৃতি জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা নেই। আর পূর্বজীবনের যে দেহ ছিলো, তাও আমার কিছুই মনে নেই।  তাই আমি বলতে পারি না যে আমি আগের  জীবনে কে বা কি ছিলাম। তার মানে এই দেহ ধারণের পর থেকে যা কিছুর আমি সাক্ষী, তার কিছু কিছু আমার মনে আছে মাত্র, সব কিছু নয় ।

এইবার আমরা দেখে নেই স্মৃতি কোথায় সংরক্ষিত হয়, কি ভাবে সংরক্ষিত হয়। আমরা সবাই জানি, স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হয়। আর মস্তিস্ক যেহেতু আমাদের স্থূল দেহের অঙ্গ, তাই এই স্থূল দেহের বিনাশে আমাদের কোনো স্মৃতি থাকবার কথা নয়, থাকেও না। এইজন্য আমরা কেউই পূর্ব জীবনের কথা স্মরণে আনতে  পারি না।

এখন দেখে নেই, আমাদের স্মৃতি লোপ পায়  কেন ?  আমরা যেটা ভাবি যে,মস্তিস্ক আমাদের স্মৃতির আধার, সেকথা সত্য। তবে এই স্মৃতি কেবলমাত্র স্থূলদেহের মস্তিষ্কেই থাকে সেটা সত্য নয়। স্থূল দেহের বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতি স্থানান্তরিত হয়, এক দেহ থেকে আর এক দেহে। অর্থাৎ আমাদের যে পাঁচটি দেহ আছে, তার মধ্যেও এই স্মৃতি সূক্ষ্ম আকারে থাকে। এবং এক-একটি দেহের নাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সংস্কার স্থানান্তিরত হতে হতে একদম শেষে আমাদের অভৌতিক দেহ অর্থাৎ কারন দেহে এই স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ  স্মৃতি থাকে আমাদের আত্মা-বুদ্ধি-মন যুক্ত আমাদের কারন দেহে। বার বার জন্ম গ্রহণের ফলে, আমাদের যত  অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, স্বর্লোক  থেকে বিদায়কালে প্রত্যেকবারই সেগুলো আমাদের কারন দেহকে উপহার হওয়া হয়েছে। সুতরাং  কারন দেহে আমাদের সমস্ত স্মৃতি সংগৃহিত বা সঞ্চিত আছে। স্বর্লোক থেকে যখন আমরা মানসলোকে নেবে এসেছি, তখন আমরা নতুন মানসদেহ ধারণ করেছি। সুতরাং আমাদের পূর্ব জীবনের মানস  দেহে যে  স্মৃতি সঞ্চিত ছিল, সেই মানস  দেহ ত্যাগের ফলে, সেই স্মৃতি আমাদের কারন দেহে স্থানান্তরিত হয়েছে। এবং নতুন উপকরণে আবার নতুন মানসদেহ উৎপন্ন হয়েছে। এই নতুন দেহে পূর্বস্মৃতি কিছুই থাকে না। তবে যে হেতু, আমাদের কারন দেহ চিরস্থায়ী, সেখানে সকল স্মৃতি সঞ্চিত থাকে। কিন্তু জীব যখন নতুন দেহ ধারণ করে, তখন সেই পুরোনো কারন দেহ নতুন শরীরের মধ্যে বর্তমান থাকলেও, মানসদেহ ও মস্তিস্ক নতুন হওয়ায় এবং জীবের জ্ঞান স্থূলে নিবদ্ধ হওয়ায়, অতি সূক্ষ্ম কারন দেহের স্পন্দন তার মস্তিষ্কে কোনো ক্রিয়া উৎপন্ন করতে পারে না। আর এই কারণেই আমাদের মনে কোনো পুরোনো স্মৃতির উদয় হয় না। কোনো কারণে এই স্থূল জগতের জ্ঞান আছন্ন হলে, বা স্থূল জগতের জ্ঞান বদ্ধমূল হলে, কখনো কখনো আমাদের পূর্ব স্মৃতি জেগে উঠতে পারে। অনেক সময় শৈশবে, বা বিকারের ঘোরে, এই ধরনের জ্ঞানের বিকাশ দেখা দেয়।

মানুষ যদি সাধন বলে বর্তমানকে অতিক্রম করে, চিত্তকে প্রশান্ত ও নির্মল করতে পারে তবে কারন দেহের স্পন্দন গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। সাধক যখন সাধনার সাহায্যে এই কোষগুলোর উন্মোচন করেন, অর্থাৎ অনন্ময় কোষ, প্রাণময় কোষ, মনময় কোষ, বিজ্ঞানময় কোষ, এবং সব শেষে আনন্দময় কোষে অবস্থান করেন, তখন, তার  এই অবস্থায়, তাঁদের  পূর্ব-পূর্ব জীবনের স্মৃতি মনে জেগে ওঠে। সত্য কথা বলতে গেলে, আমাদের এই কারন দেহই সমস্ত সংস্কারের আঁধার। আর কারন দেহ হচ্ছে, চিরস্থায়ী, লিঙ্গহীন, কিন্তু মানব আকৃতি বিশিষ্ট। ধ্যানের গভীরে যারা প্রবেশ করেছেন, তাদের কাছে এগুলো উপলব্ধির বিষয়। কোনো কল্পনা বা কেবলমাত্র ধারণা নয়। যদিও সাধারণ লোকের পক্ষে এগুলো বোধগম্য না হওয়াই স্বাভাবিক।এই সব অবস্থা, কেবলমাত্র জন্ম জন্মান্তরের সাধনার ফলেই সম্ভব হতে পরে। আর এটাই বলেছেন মহর্ষি পতঞ্জলি, আমাদের সংস্কারকে প্রতক্ষ্য করতে হবে।

যে সব সংস্কার নিয়ে আমরা এই জগতে জন্ম গ্রহণ করেছি, সেগুলো আর কিছুই নয়, পূর্ব জন্মের অভিজ্ঞতা মাত্র। অনেকসময় আমরা আমাদের নিজেদের অজ্ঞাতসারে এটা আমরা অনুভব করে পারি। আমাদের বাড়ির পাশের সাহাবাবুকে দেখেছি, ঝড় হতে পারে, এই কথা শুনলে, তিনি উতালা হয়ে ওঠেন। পেপারে যদি ঝড়ের খবর নজরে পড়ে, তবে সামনে যাকে পাবেন, তাকেই জিজ্ঞেস করবেন, আবহাওয়া দপ্তর ঠিক বলছে কি?  যদি বলে ঠিক বলছে, তবে সাহাবাবু দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে, উর্দ্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটবেন। এগুলো সবই পূর্ব জীবনের ভয়ানক অভিজ্ঞতার অস্পষ্ট স্মৃতি। অনেকের, অনেক ছোট বয়সে, বিভিন্ন প্রতিভা দেখতে পাই। অনেক সময় দেখবেন, দুদিনের পরিচয়ে কাউকে মনে হয় যেন কত কালের আপন জন। আবার অনেকের সাথে বহুদিনের আলাপ সত্ত্বেও ঘনিষ্টতা জন্মায় না। অনেক সময় আমাদের যদি বাহ্যজ্ঞান লোপ পায়, তখন আমাদের অন্তরের চৈতন্য দ্বারা সঞ্চিত সংস্কারপুঞ্জ অবস্থা বিশেষে সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে।

মানুষে মানুষে এত বৈষ্যমের কারণও এই সংস্কার। আসলে আমরা কে কত জীবন ধরে এই মনুষ্যদেহ ধারণ করছি তা আমরা জানি না। আগের জন্মে কি ছিলাম, কি করতাম তা আমরা জানি না। কিন্তু একথা সত্য, আপনি এই জন্ম যেখানে শেষ করছেন, সামনের জীবনে সেখান থেকে শুরু করবেন। আগের জীবনে আমি যদি পশু থেকে থাকি, তবে, এই জনমে আমার মধ্যে সেই পাশবিক প্রবৃত্তি দেখা দিতেই পারে। কারন সেই পূর্বজন্মের সংস্কার তো এত তাড়াতাড়ি চাপা পড়বার নয়। নতুন সংস্কার এসে পুরোনো সংস্কার চাপা দিতে পারে। অতএব যে যত  তাড়াতাড়ি নতুন ও শুভ সংস্কারের জন্ম দিতে পারবেন, সে তত তাড়াতাড়ি পুরুনো সংস্কারকে চাপা দিতে পারবেন।অথবা পুরোনো সংস্কারকে পরিশীলিত করে নিতে পারবেন। আগের জীবনে যিনি পশুরাজ ছিলেন, এই জীবনেও তার রাজা হবার ইচ্ছে বা সংস্কার কাজ শুরু করে দেবে।  সংস্কার কখনো লোপ পায় না, অনুরূপ পরিস্থিতির ছোঁয়া পেলেই পুরুনো সংস্কার  ক্রিয়াশীল হতে শুরু করে, সংস্কারকে জাগিয়ে তুলতে দরকার শুধু অনুকুল  পরিস্থিতি।  অর্থাৎ সংস্কারগুলোকে  অবচেতন স্তর থেকে চেতন স্তরে নিয়ে আসতে কেবলমাত্র পরিবেশ-পরিস্থিতি ।  তা সে শুভ হোক আর অশুভ হোক। অশুভ সংস্কার জাগ্রত হতে পারে না, যদি  নতুন ভাবনা চিন্তা দ্বারা মানুষ শুভ সংস্কার তৈরি করতে পারেন । আধ্যাত্মিক জগৎ-এর মানুষেরা এই কাজটাই করে থাকেন।  অর্থাৎ তাদের চিন্তার জগতে শুভ সংস্কার বা শুভ চিন্তার জন্ম দিতে থাকেন, অনবরত । নতুবা মানুষ তার পুরোনো সংস্কার অনুযায়ী, অনুন্নত জীবনের পথে বা বর্বর জীবনের প্রতি ধাবিত হবে, স্বভাব বশতঃ । এটাই সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক পরিণতি। তাই আমরা যদি মানব থেকে মহামানব হতে চাই, তবে আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন শুভ সংস্কারের জন্ম দিতে হবে। একটু খেয়াল করলে দেখতে পারবেন, পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে হিংস্র জীব লোপ পাচ্ছে, কিন্তু হিংস্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তার কারন, জীবের ক্রমবিকাশের নিয়মেই জীবের উন্নতি হচ্ছে। ক্রমবিকাশে দেহের পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু বৃত্তির পরিবর্তন হতে আরো সময় লাগবে।  যাইহোক, আমাদের আলোচ্য বিষয় আজ এটা নয়, তাই এব্যাপারে আমরা আর কথা বাড়াবো না।

সবশেষে আমি বলবো, আমাদের পূর্ব জীবনের কথা আমরা নাই বা জানতে চাইলাম, নাই বা নিজেকে লজ্জ্বা দিলাম। বরং আসুন আমরা ধ্যানের  মাধ্যমে  চিত্তকে শান্ত করি আর প্রতিনিয়ত শুভ চিন্তার আকর্ষণ করি। নিজেকে সমৃদ্ধ করি।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।  

আলোচনা শুনছিলাম , ঋষি পতঞ্জলি উক্ত বিভূতিপাদ থেকে। আর এখানে, এই বিভূতিপাদে  আছে, সব অলৌকিক শক্তি লাভের  উপায়। আর এ সব কথা শুনে, কিছু বিজ্ঞান-মনস্ক, আর কিছু উর্বর মস্তিষ্কের মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, আপনার কি এসব সিদ্ধিলাভ হয়েছে ? তাদেরকে আমরা  বলি, দয়াকরে, আজকের কথাগুলো একটু ধৈর্য্য ধরে শুনবেন। সংযমে সিদ্ধিলাভ আর তার বিভিন্ন প্রয়োগ-ফল উপলব্ধি করা এক জিনিস নয়।  না আমাদের  সে উপল্বদ্ধিও হয় নি। উপলব্ধি করবার ইচ্ছেও আমাদের  জাগ্রত হয় নি। আমরা  এইসব শ্লোকের ব্যাখ্যাকার মাত্র। আমরা  এর অর্থ বর্ণনা করেছি মাত্র। তর্ক দ্বারা এসব বোধগম্য হতে পারে না। যাঁরা  এই বিষয়টি অনুভব  করেছেন, আপনি তাদের নিকট বিষয়ের গভীরে গিয়ে অনুধাবন করতে পারলে, আপনার কাছে বিষয়ের সত্যতা অনুভব অবশ্য়ই হতে পারে । অন্ধ বিশ্বাস যেমন আমাদের  বিষয়ের গভীরে নিয়ে যেতে পারবে না, তেমনি অন্ধ অবিশ্বাস, বা  অন্যকে প্রশ্ন করে, এসব বিশেষ জ্ঞান আমাদের  উপল্বদ্ধিতে আসবে না। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, এবং বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে । ধ্যান ধারণা করলে   এই সত্যে উপনীত হওয়া যাবে যে, এগুলো প্রতিষ্ঠিত সত্য। তা কেউ  বিশ্বাস করুন, আর নাই করুন। সত্য সত্যই থাকবে, আপনার আমার  বিশ্বাস বা অবিশ্বাস এই সত্যের  পরিবর্তন করতে পারে না।
যাঁরা মহর্ষি পতঞ্জলির যোগদর্শন বইটি ভালোভাবে বুঝেছেন, তারা দেখেছেন, মহর্ষি প্রথমে সমাধিপাদের কথা, অর্থাৎ কোথায় যেতে হবে, অর্থাৎ আমাদের লক্ষ্য কি হবে। তারপরে সাধন পাদের কথা, অর্থাৎ আমাদের কি করতে হবে। এর পর বিভূতিপাদের কথা, অর্থাৎ এই সাধনপথে যাবার বাঁধা কি হতে পারে,অর্থাৎ  এসব করতে গেলে, যে শক্তি সাধকের মধ্যে জাগ্রত হবে তা অলৌকিক। আর  এইসব অলৌকিক শক্তির প্রয়োগ করতে গেলে, আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের পথ থেকে ভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা, সেই কথাই  স্বয়ং ঋষি পতঞ্জলি  উল্লেখ করেছেন, এই বিভূতিপাদে । একদম শেষে বলেছেন, কৈবল্যপাদের কথা।  অর্থাৎ সাধনার সমাপ্তি। আসলে আমরা অষ্টাঙ্গ সাধনার পথের কথা শুনতে বা সেই পথে চলতে অক্ষম, অথবা বলা যেতে পারে এই পথে চলতে আমরা আগ্রহী নোই। কিন্তু অলৌকিক শক্তি আয়ত্ত্ব হতে পারেএটা  শুনলে আমাদের আগ্রহ হতে পারে। এই সব অলৌকিক শক্তি আসলে সাধনার পার্শ্ব-প্রিতিক্রিয়া মাত্র , এগুলোর দিকে খেয়াল দিলে, সাধক পথভ্রষ্ট হন। জমি-তো সবারই সাড়ে-তিন হাত, তাতে আপনি লাউ-কুমড়োর চাষ করবেন, না ফুলের চাষ করবেন, সেটা আপনার উপরে নির্ভর করবে। কোনো মহাপুরুষেরই চারটে  কান, চারটে চোখ, ১০টা হাত হয় না। এসব আমাদের কল্পনা। আপনার মধ্যে সমস্ত শক্তি সুপ্ত অবস্থায় আছে, তাকে জাগিয়ে তোলা বা না তোলা, আপনার ইচ্ছাশক্তির বিভিন্নতার উপরে নির্ভর করবে। বিশ্বাস -অবিশ্বাসের দোলায় দোল না খেয়ে, কর্ম্মে নিজেকে নিয়োজিত করুন, আর তার ফল প্রতক্ষ্য করুন। আবারো বলি, এগুলো আসলে সাধনপথের বাঁধা স্বরূপ। তাই মহর্ষি আমাদের এই সব বিষয়ে সতর্ক করেছেন মাত্র। আমরা সেই সতর্ক বাণীগুলোই শুনছি।
এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি, গল্প তো অনেক আছে, আসলে যোগীদের অলৌকিক প্রকাশ পায়  মাত্র। প্রকাশ করেন না। একবার মহাযোগী গোক্ষনাথ পথ চলতে চলতে পাঞ্জাবের পালামপুরে এসেছেন, পাহাড়ের কোলে জনবিরল গ্রাম। ভাবলেন, এখানে থেকে কিছুদিন সাধন ভজন করবেন। দেহমনে ক্লান্তি, ক্ষুধাও পেয়েছে। একটা বট  গাছের নিচে  আসন পেতে ঘুমিয়ে পড়লেন। সরলসোজা এক চাষীর ছেলে, হঠাৎ সেখানে এসে দেখে, এক প্রসন্ন-বদন সাধু।  সাধুকে দেখে ছেলেটি আকৃষ্ট হলো। নিদ্রা ভঙ্গ হলে, ছেলেটি সাধুকে বললো, আপনি যতদিন ইচ্ছে এখানে  থাকুন,  আমি আপনার খাবারদাবার সমস্ত ব্যবস্থা করে দেব। গোরক্ষনাথ বললেন, বেটা, আমি কিছুদিন উপবাসী থাকবো, আমার খাবার দাবার দরকার নেই, বরং তুমি কিছু শুকনো কাঠ এনে দাও আমাকে। আমি এখানে ধুনি জ্বেলে ধ্যান-জপ করবো। আর একটা কথা শোনো, আমার কথা তুমি কাউকে বোলো না। তাহলে আমার কাজের ব্যাঘাত হবে। তো কিছুদিন এইভাবে চললো, ছেলেটি গোরক্ষনাথকে ধুনীর শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে এনে দেয়।  আর গোরক্ষনাথ ধ্যান-জপে নিমগ্ন থাকে। একদিন হলো কি, ছেলেটির কি মনে হলো, গোরক্ষনাথকে দিনের পর দিন, অভুক্ত থাকতে  দেখে, বাড়িতে মা-বাবাকে বলে, সে গোরক্ষনাথের জন্য, কিছু আটা, ঘি, চিনি, সবজি নিয়ে এলো। তো গোরক্ষনাথ ছেলেটিকে বকাবকি করলো। বললো, তোকে না বলেছি, কাউকে কিছু না বলতে। এতে, ছেলেটি কাঁদতে লাগলো। ছেলেটির কান্না দেখে, গোরক্ষনাথের মন কোমল হয়ে পড়লো। বললো, ঠিক আছে, সব রেখে দে, শিবজীর ভোগ হবে। এখন ছেলেটি সবই এনেছে, আগুনও ধুনিতে আছে, কিন্তু জল নেই। কাছে কোথাও জল  নেই। যোগী তার দন্ডটি দিয়ে, কাছেই ভূমিতে বিদ্ধ করতেই সেখানে স্বচ্ছ জলের ঝর্ণাধারা বইতে লাগলো। ছেলেটির তো চোখ ছানাবড়া। যাই হোক, শিবজীর ভোগ রান্না হলো। শিবজীকে, নিবেদন করা হলো। তারপর সেই ভোগসামগ্রী ছেলেটির হাতে দিয়ে বললো, বাড়ি নিয়ে যা, সবাইমিলে প্রসাদ খাবি। তো ঠিক তক্ষুনি ঘটে গেলো, এক অলৌকিক ঘটনা, গোরক্ষনাথের হাতের ছোঁয়ায় ছেলেটি অজ্ঞান হয়ে গেলো। আর গোরক্ষনাথ সেখান থেকে ভেগে পড়লো, অন্য সাধনক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে।

এই ছেলেটির নাম গুগা।  আজ সেখানে অর্থাৎ পাঞ্জাবের পালামপুরে, গুগার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবছর সেখানে বিশাল মেলা বসে।

তো যে কথা বলছিলাম,  যোগীর সংযম আয়ত্ত্ব হলে, সংযমের মাধ্যমে তিনি অসীম ধীশক্তির অধিকারী হন। আর তিনি যে বিষয়ে মনোনিবেশ করেন, সে বিষয়ে তার সজ্ঞা উপস্থিত হয়। এই সজ্ঞাই আমাদের উপল্বদ্ধিজাত জ্ঞান। এগুলো বিশ্বাসের বস্তু নয়, আবার অবিশ্বাসের বস্তুও নয়, সাধনায় উৎকর্ষতা অর্জন করতে পারলে, এগুলো অনুভূতিতে আসে। আর একটা কথা বলি, আপনি যখন কষ্ট  করে অর্থ উপার্জন করেছেন, তার অপব্যায় নিশ্চই আপনি চাইবেন না। যোগীরাও তাদের অর্জিত শক্তির অপচয় চান না।

এবার আমরা আসবো, মহা-ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শনের বিভূতিপাদের ১৯ নং শ্লোক থেকে কি কি বলেছেন ।

১৯ নং শ্লোকে বলছেন : সংযমের অপরের চিত্তের সাক্ষাৎকার করলে, অপরের চিত্তের জ্ঞান হয়।
২০ নং শ্লোকে বলছেন : কিন্তু সেই জ্ঞান, যোগীর অবলম্বন হয় না।  কেননা অপরের চিত্ত যোগীর চিত্তের বিষয় নয়।
২১ নং শ্লোকে বলছেন : এই স্থূল শরীরের রূপের উপরে সংযম করলে,  শরীরের যে গ্রাহ্য শক্তি তাকে অবরোধ করা সম্ভব হয়। তখন চোখের প্রকাশের সঙ্গে যোগী অন্তর্ধান করেন। এখানে মহর্ষি পতঞ্জলি এক অদ্ভুত বিদ্যার কথা বলছেন। যোগী অর্থাৎ যিনি সংযম আয়ত্ত্ব করতে পেরেছেন, তিনি ইচ্ছে করলে, নিজের এই স্থূল দেহকে বা অবয়বকে অন্যের দৃষ্টিশক্তির বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। এগুলো আমাদের কাছে, ম্যাজিকের মতো। একটা জলজ্যান্ত  মনুষ্য দেহ আপনার আমার চোখের সামনে থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে, এটা আমরা ভাবতেই পারি না।

এইব্যাপারটা বুঝতে গেলে আমাদের তত্ত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা থাকতে হবে। সৃষ্টির চেতন-অচেতন যাবতীয় পদার্থ পঞ্চ-তত্ত্বে গড়া। যিনি এই তত্ত্বের অতীত তিনিই পরম -ঈশ্বর। এই পঞ্চতত্ত্বের অধিদৈব রুপই বিশ্বসৃষ্টির মূল উপাদান  অর্থাৎ পঞ্চমহাভূত। এই পঞ্চতত্ত্বের আধ্যাত্মিক রূপই প্রাণময় জগৎ এবং পঞ্চপ্রাণ যুক্ত আমাদের এই ব্যষ্টি  দেহ।

আমাদের দেহের হাড়, মাংস, চামড়া, নাড়ী এবং লোম, এই পাঁচটি জিনিস ক্ষিতিতত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়েছে। শুক্র, লালা অর্থাৎ রস, রক্ত, মজ্জা, মূত্র এই পাঁচটা জিনিস অপ তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তেজ তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়েছে, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, শ্রান্তি ও আলস্য।  ধারণ, চালান, ক্ষেপন, সংকোচন ও প্রসারণ, এই পাঁচটি বায়ুতত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়েছে।  আর ব্যোম তত্ত্ব থেকে এসেছে, রাগ দ্বেষ, লজ্জ্বা, ভয় ও মোহ।

যোগঋষিরা কখন কোন তত্ত্ব আমাদের দেহের উপরে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে, এবং কোন দেহে কতক্ষন স্থায়ী হয়, এগুলো নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষেপন করেছেন। আমাদের দেহ স্থুল, এখানে পৃথ্বী তত্ত্বের আধিপত্য। এই পৃথ্বী বা ক্ষিতিতত্ত্বই আমাদের দেহে দীর্ঘ সময় কার্যকরী থাকে। তাই এই দেহ দৃশ্যমান। আমাদের এই দেহ থেকে যদি আমরা পৃথ্বী তত্ত্বের প্রভাবকে স্তিমিত করে, অপি তত্ত্বের প্রাধান্য বাড়াতে পারি, তবে আমাদের দেহ গ্যাসীয় পদার্থে পরিণত হয়ে যাবে। লবন যখন  জলে মিশ্রিত হয়, তখন লবন দৃশ্যমান থাকে না।   আবার আমরা যদি আমাদের তেজতত্ত্ব বা বায়ুতত্ত্বের প্রাধান্য বাড়াতে পারি, তবে বায়বীয় বা তেজময় দেহ হয়ে হবে আমাদের।কর্পূর যথন যখন বায়ুর মধ্যে উবে রায়, তখন তা দৃশ্যমান থাকে না।  তখন আমরা বায়ুর মতো বা বিদ্যুতের মতো সবত্র অবাধ গতি লাভ করতে পারবো। এইসময় আমরা শুদ্ধমনের দীপ্তিমান অন্তরে বাস করবো। এরও পরে, আমরা যদি ব্যোমতত্ত্বের সীমানা অতিক্রম করতে পারি তবে আমরা সেই তত্ত্বাতীত পরমাত্মাকে লাভ করতে পারবো।

এইসব কথা আমি যত  সাধারণ ভাবে বলে গেলাম, এগুলো বোঝা, উপলব্ধি করা ও কার্যকরী করা, আমাদের মতো সাধারণের পক্ষে অসম্ভব। জন্ম জন্মান্তরের সাধনাই এই জ্ঞান দান  করতে  সক্ষম।আর   এই জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম একমাত্র মৌনতা।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।

আলোচনা চলবে। .........

12/02/2020.

বিভূতিপাদ - শ্লোক নং -  ২২-২৫
১২৯৪ সালের অগ্রহায়ন মাস। মহাত্মা ত্রৈলঙ্গ স্বামী তার ভক্ত ও শিষ্যদের ডেকে বললেন, ঠিক একমাস বাদে, আগামী জন্ম তিথিতে আমি দেহত্যাগ করবো। মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে আবার, তিনি সবাইকে ডেকে বললেন,  আগামীকাল আমি আর বিশেষ কথা বলবো না, তোমাদের যার যা ইচ্ছে তা আজ রাতেই তোমরা জেনে নাও।  এর পরে, ১২৯৪ সালের, পৌষ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে তিনি তাঁর ইচ্ছে মতো, দেহ রেখেছিলেন। এগুলো কোনো গল্প কথা নয়, বাস্তব সত্য। কি ভাবে, এটা সম্ভব ? আগাম মৃত্যু সংবাদ সংবাদ জানা, না ইচ্ছে মৃত্যু ?

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, (শ্লোক -২২ - বিভূতিপাদ) মানুষের কর্ম্ম যখন ফল-প্রসবে উন্মুখ হয়,অথবা ফল প্রদানে বিমুখ হয়, অর্থাৎ এক্ষুনি ফল দেবে, অথবা ভবিষ্যতে ফল দেবে এমনসব কর্ম্ম, এই দুই ধরনের কর্ম্মে প্রতি সংযম পালন করলে, অরিষ্ট নামক কতকগুলো লক্ষণ দ্বারা যোগী মৃত্যুকালের জ্ঞান লাভ করতে পারেন।
অর্থাৎ আমাদের কর্ম্ম দুই প্রকার প্রথমত যে কর্ম্ম এক্ষুনি ফল প্রদান করবে। আর যেসব কর্ম্ম ভবিষ্যতে ফল প্রদান করবে। একটাকে বলছেন, সোপক্রম অন্যটি নিরুপক্রম। এই ব্যাপারটা আচার্য্য শঙ্করাচার্য্য এক সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন।  বলছেন, একটা শাড়ী ভেজানো হলো।    মনে করুন জল হচ্ছে, কর্ম্ম। তো একটা শাড়িতে  জল দিয়ে ভেজানো হলো। এইবার স্বাভাবিক প্রকৃতির নিয়মে শাড়ী কিন্তু শুকোবে। এখন যদি আপনি শাড়িটাকে বিছিয়ে দেন, তবে শাড়ি তাড়াতাড়ি শুকোবে আর আপনি যদি  শাড়িটাকে স্তুপ করে রাখেন, তবে শাড়ি শুকোতে দেরি হবে। এখন আমাদের  দেহ যখন  কর্ম্মে  লিপ্ত হলো। তখন সে ভেজা শাড়ির অবস্থায় গেল। এইবার একে  শুকোতে গেলে, তো শরীর যদি উন্মুক্ত থাকে তবে তাড়াতাড়ি শুকোবে আর যদি শরীর যদি স্তূপীকৃত থাকে তবে শুকোতে দেরি হবে।
আমরা জন্ম গ্রহণ করি আমারদের প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য। কিন্তু আমাদের বিড়ম্বনা হচ্ছে, কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য যে যে শরীর আমরা পেয়েছি বা ধারণ করেছি, সেই শরীরের দ্বারা  আমরা আবার কর্ম্মে প্রবৃত্ত হচ্ছি। ফলতঃ ভালো বা খারাপ যে কর্ম্মই আমরা করি না কেন, তার ফল ভোগ করবার জন্য আমাদের আবার শরীর ধারণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আমরা আবার নিজেদেরকে  আবদ্ধ করছি।

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, আমাদের এক জীবনে যে কর্ম্ম আমরা করে থাকি, তা দুই রকম, একটা এক্ষুনি ফল প্রদান করবে অর্থাৎ সোপক্রম আর অন্যটি নিরুপক্রম অর্থাৎ ভবিষ্যতে ফল প্রদান করবে। এই দুটো কর্ম্মের উপরে আমরা যদি ধ্যান লাগাতে পারি, তাহলে আমাদের মরন কালের জ্ঞান হয়ে যায়। তিনটি মরন চিহ্ন - বা অরিষ্ট - আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক।

আধ্যাত্মিক - কান বন্ধ  করলে আমরা একটা  শব্দ শুনতেপাই, মৃত্যু আসন্ন হলে আমরা সেই শব্দ শুনতে পাই না। অথবা চোখ বন্ধ করলে আমরা জ্যোতি না দেখতে পাওয়া।
আধিভৌতিক : যম-পুরুষের দর্শন। পিতৃপুরুষদের দর্শন।
আধিদৈবিক : হঠাৎ সিদ্ধ পুরুষদের দর্শন, বা স্বর্গ-দর্শন।

ঋষি পাতাঞ্জন বলছেন, এইভাবে বিভিন্ন লক্ষণ দেখলে বুঝতে হবে, তার মৃত্যুকাল উপস্থিত হয়েছে।

শ্রী বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী, একবার তার গুরুদেবকে (ব্রহ্মানন্দ পরমহংস) জিজ্ঞেস করলেন, অনিমাদি সিদ্ধির কথা যে শাস্ত্রে আছে, তা কি সত্য ?" তো গুরুদেব তাকে একটা নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে, অষ্টসিদ্ধির অবস্থাগুলো একেএকে দেখাতে লাগলেন।  অর্থাৎ শুন্যে ভাসা, সূক্ষ্ম হয়ে এক পর্বত থেকে আর এক পর্বতে চলে যাওয়া, নিজ দেহ থেকে আত্মাকে বের করে, অন্য মৃত দেহে প্রবেশ করানো, এবং সেই মৃত দেহের সাহায্যে কথা বলা ইত্যাদি ইত্যাদি।  এর পর জিজ্ঞেস করলেন, এবার বিশ্বাস হয়েছে ?  সাধন করতে থাকো, এই সব ক্ষমতা তোমারও  জন্মাবে।  কিন্তু জেনে  রেখো এগুলো কিছুই নয়, সাধন জগতের বিভূতি মাত্র। এর পর গোস্বামিজী, বিন্ধ্যাচলে গিয়ে কঠোর সাধনা করতে থাকেন। এতে করে তার মধ্যে একটা অদ্ভুত ভাব প্রকাশ পেতে থাকে। এতে তিনি ভয় পেয়ে যান এবং ভাবতে থাকেন, এটা আমার মানষিক নয় তো ? পরে গুরু সাক্ষাৎকালে গুরুদেবকে এই কথা বললে, গুরুদেব তাকে হঠযোগ প্রদীপিকা, ও বিচার সাগর নাম দুটো বই পড়তে  বলেন। বই-দুটো পড়ার পরে, তিনি বুঝতে পারেন,  এগুলো যোগেরই অবস্থা মাত্র।  কোনো রোগ নয়।

এর পরের শ্লোকে বলছেন - (২৩) মৈত্রী, করুনা ও মুদ্রিতাকে সংযম করলে আমরা চিত্ত প্রসাদরূপ বল লাভ হয়।
নির্দিষ্ট কোনো কিছুর প্রতি চিত্তকে নিবিষ্ট করলে আমাদের মধ্যে ভাবনার উদয় হয়। এই ভাবনা তিন প্রকার।  ১. মৈত্রী বা মিত্রতা ; ২. করুনা ও ৩. মুদিতা।যিনি ভালো আছেন বা সুখে আছেন, অর্থাৎ  প্রাণীতে ভাবনা চিন্তন করলে আমাদের মৈত্রী-বল উৎপন্ন হয়। আবার দুঃখিত প্রাণীদের উপরে করুন প্রদান করলে আমাদের করুনা-বল উৎপন্ন হয়। আবার পুণ্যশীল মানুষের মধ্যে আমরা ভাবনাকে প্রবাহিত করতে পারলে আমাদের মুদিতা বা হর্ষ বল লাভ হতে পারে। আসলে সংযম-ই বল উৎপাদনের উৎস।

(২৪) যোগী যদি হাতির বলের উপরে সংযম করেন, তবে তিনি হাতির মতো বলশালী হতে পারেন।

অর্থাৎ যা কিছুর উপরে আপনার ভাবনাকে নিবদ্ধ করছেন, বা সংযম করছেন, তিনি সেই মত বল লাভ করতে পারেন।  আপনি যদি বায়ুর উপরে সংযম করেন, তবে আপনি বায়ুর শক্তি অর্জন করতে পারবেন। দেবতাদের উপরে সংযম করেন, তবে আপনি দেবতাদের মতো বলশালী হতে পারেন। অর্থাৎ আপনার মন কিসের উপরে ভাবনা চিন্তা করছে, কিসের উপরে আপনার মনকে নিবিষ্ট করছেন, সেই শক্তি আপনার আয়ত্ত্বে আসতে  থাকবে।

(২৫) প্রবৃত্তি আলোক চিত্তে পড়লে, যোগীর সূক্ষ্ম, ব্যবহিত ও বিপ্রকৃস্ট বস্তুর জ্ঞান লাভ হয়।

প্রবৃত্তির আলোক চিত্তে পড়লে অর্থাৎ মনের জ্যোতিস্মতি প্রবৃত্তি তার যে আলো, তাতে সংযম করলে যোগী সূক্ষ্ম বস্তু, আড়ালে থাকা বস্তু ও দূরে থাকা বস্তু সম্পর্কে জানতে পারেন। এখন কথা হচ্ছে, এই জ্যোতিষ্মতী আলোক ব্যাপারটা কি ? আমরা যখন হৃদয়পদ্মে ধ্যান ধারণা করি তখন এক বুদ্ধিসত্ত্বের সাক্ষাৎ হয়।  সেই বুদ্ধিসত্ত্ব জ্যোতির্ময় আকাশ হিসেবে কল্পনা করা হয়। এই আলোর স্থিতির গভিরতা অনুযায়ী একে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, মনি, ইত্যাদির প্রভার সঙ্গে এর সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।  এইসময় আমিত্বে অর্থাৎ আমার হৃদয়পদ্মে স্থিত শুভ্র জ্যোতিষ্ময় ব্রহ্মে স্থিত চিত্ত একটা শান্ত, তরঙ্গবিহীন  আলোর সমুদ্রের মতো নিজেকে বা আমিত্বকে অন্তহীন বলে ধারণা হয়।  এই অবস্থায় যোগী বিষয়বতী কিন্তু একমাত্র আমি - এইরূপ উপলব্ধি করতে থাকে। একেই বলাহয় জ্যোতিষ্মতী।

আরো একটু খোলসা ভাবে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করা যাক। আমাদের হৃদয়দেশে যে খালি জায়গা আছে তাকে মহাকাশের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। নাভিদেশ থেকে বারো আঙ্গুল উপরে, কণ্ঠদেশ থেকে নিচে, শুনি স্থান।  এখানে পদ্মের মাঝখানের অংশের মতো কিন্তু অধোমুখ হয়ে অবস্থান করছেন, হৃদয় পুন্ডরীক। ধ্যান ধারণায় এই পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়। তখন হৃদাকাশ হয় জ্যোতিস্মান। আমাদের আনন্দের আতিশয্যে বা গভীর দুঃখের অনুভূতিতে এই হৃদেশে একটা অনুভূতি হয়। ঠিক তেমনি ধ্যান-ধারণায় ধীরে ধীরে আমাদের সমাধি লাভ হয়। এই সমাধি অবস্থায় এই জ্যোতির্ময় আলোকের মধ্যে বুদ্ হয়ে বসে থাকে আমরা। আর এই অবস্থা আমাদের ভাবনার বোধিসত্ত্বে পৌঁছে দেয়।  ধারণা ধ্যান ও সমাধি যখন পরিপক্ক হয়, তখন তাকে বলে সংযম।

মহর্ষি পতঞ্জলি বলছেন,  যোগী যখন জ্যোতিস্মতী প্রভার সঙ্গে ধ্যানস্থ থাকেন, তখন তার মধ্যে দূরের বস্তু, বা সূক্ষ্ম বস্তু, বা লুক্কায়িত বস্তু, অর্থাৎ সব বস্তু সম্পর্কে সম্যক  জ্ঞান হয়।

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।   হরি ওম।

সমস্ত ভুবন জ্ঞান :

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগ দর্শনের বিভূতিপাদ অধ্যায়ে (২৬)নম্বর শ্লোকে বলছেন :
ভুবনজ্ঞানং সূর্যে সংযমাৎ। অর্থাৎ সূর্যদ্বারে সংযম করলে ভুবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।

এখানে দুটো জিনিস বুঝবার আছে।  এক ) আমাদের সংযম করতে হবে সূর্যদ্বারে। দুই) তাহলে নাকি আমাদের ভুবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হবে।
এখন কথা হচ্ছে সূর্যদ্বার কি ?  আমাদের শরীরের ব্রহ্মদ্বার হচ্ছে সূর্যদ্বার। আমাদের সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে আছে, বজ্রাক্ষা নাড়ী, বজ্রাক্ষা নাড়ীর মধ্যে আছে চিত্রাণি নাড়ী। এই সুষুম্না নাড়ী তার মধ্যে অন্তর্লীন দুটো নাড়ী নিয়ে কুণ্ডলিনী থেকে আমাদের মস্তিষ্কের উর্ধভাগে ব্রহ্মান্ড বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। এই ব্রহ্মান্ড বিন্দুতে যখন যোগী ধ্যান করেন, তখন তার সমস্ত ব্রহ্মান্ড সম্পর্কে জ্ঞানের  উদয় হয়। এই ব্রহ্মান্ড বিন্দুই আসলে সূর্যদ্বার। এখানেই সূর্য্যশক্তি বা বিশ্বশক্তির সঙ্গে জীবশক্তির মিলন হয়।

এবার আমরা আরো গভীরে যাবো, এই ব্রহ্মান্ড বলতে আমরা কি বুঝি ? আসলে ব্রহ্মান্ড সন্মন্ধে আমাদের পক্ষে ধারণা করা শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব। মানুষ এই পৃথিবীর মধ্যে একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিট  মাত্র। আর এই পৃথিবী ব্রহ্মান্ডের মধ্যে একটা টিটিকির ডিম্ মাত্র। আসলে বীজ তার সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। একটা শিশু যেমন জানে না, সে ভবিষ্যতে কি হতে পারে। একটা বটবৃক্ষের বীজ জানে না তার মধ্যে এক বিশাল মহীরুহ অপ্রকাশিত হয়ে রয়েছে। আমরা জানি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে, আমরা দেহাতীত হয়ে যেতে বাধ্য হবো। কিন্তু এমন যোগী আছেন, যিনি তার এই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে  নিজের আয়ত্ত্বে রাখতে পারেন।  এমনকি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ  করে রাখতে পারেন, আবার তারা শরীর  ছেড়েও যান না। এইরকমই এক মহাত্মা ছিলেন, আমাদের আচার্য্য শঙ্করাচার্য। আমরা তার মুখ থেকে শুনবো, ব্রহ্মান্ড বা ভুবন বলতে কি বোঝায় ?

ভুবনের বিন্যাস করা হয়েছে প্রথমত সপ্তলোকে। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ ও সত্যম।

প্রথম পর্য্যায়ে অবীচি  অর্থাৎ নরক বা পাতাল  থেকে শুরু করে, মেরুপৃষ্ঠ পর্য্যন্ত - ভূ-লোক। বীচি কথাটার অর্থ হচ্ছে তরঙ্গ, তো অবীচি কথাটার  অর্থ হচ্ছে তরঙ্গবিহীন, তো  যে স্তরে কোনো তরঙ্গ থাকে না তাকে বলে ভূ-লোক বা ভুর্লোক।    
দ্বিতীয় পর্য্যায় হচ্ছে মেরুপৃষ্ঠ থেকে ধ্রুবলোক পর্যন্ত অর্থাৎ গ্রহ নক্ষত্র তারায় শোভিত যে লোক তাকে বলে - অন্তরীক্ষ লোক বা ভুবর্লোক। 
এর পরে আছে স্বর্গ লোক। এই স্বর্গলোক পাঁচ রকমের। 
তৃতীয় পর্য্যায়ে আছে - মাহেন্দ্র লোক।
চতুর্থ পর্য্যায়ে আছে - মহর্লোক - যা প্রজাপতি সম্মন্ধীয়।
পঞ্চম - জনলোক
ষষ্ঠ - তপোলক
সপ্তম - সত্যলোক।
 এই শেষ তিনটি লোককে অর্থাৎ জনঃ তপঃ সত্যঃ - এই তিনটি লোককে একত্রে বলা হয়ে থাকে ব্রাহ্মলোক।

অর্থাৎ একদম উপরে, ব্রাহ্মলোক, যার তিনটি ভাগ, সত্যঃ, তপঃ, জনঃ,। এর পরে দ্বিতীয় স্তরে  স্বর্গলোক যা পাঁচ রকমের। তৃতীয় স্তরে মাহেন্দ্র লোক। চতুর্থে আছে, মহর্লোক। পঞ্চম স্তরে আছে ভুর্লোক।  

আচার্য্য শংকর বলছেন, অবীচির অর্থাৎ তরঙ্গ বিহীন স্তরের  সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে, ছটি মহা নরকভূমি বা নরকলোক।  সেগুলো ঘন, সলিল, অনল, অনিল, আকাশ ও তমঃতে আশ্রিত। অর্থাৎ ঘনীভূত, জল, আগুন, বাতাস,আকাশ, এবং অন্ধকার আচ্ছন্ন স্থান। এদের নাম হচ্ছে, মহাকাল, অম্বরীষ, রৌরব, মহারৌরব, কালসূত্র, ও অন্ধতামিশ্র। এখানকার বাসিন্দারা হয়, নিজ কর্মার্জিত দুঃখ-কষ্টের-বেদনায়  আশ্রিত  দীর্ঘায়ু জীব।

এর নিচে  রয়েছে, সাত রকম পাতাল - সেগুলো হলো,  পাতাল, তলাতল, বিতল, সুতল, অতল, রসাতল, মহাতল । আচার্য্য শংকর বলছেন, এই সপ্তদ্বীপা বসুমতী হলো অষ্টম স্থানে।  যার ভিতরে অবস্থান করছে কাঞ্চনময় পর্বতরাজ সুমেরু। এই পর্বতরাজের চূড়ায় বৈদুর্য, স্ফটিক, সুবর্ন ও মনি কাঞ্চনে সুশোভিত। এই বৈদুর্য্মনির উজ্জ্বলতায় রঞ্জিত হয়ে আছে আকাশের দক্ষিণভাগ। যা কিনা নীল-পদ্মের পাপড়ির মতো শ্যামবর্ণ ধারণ করেছে। এর পূর্বভাগ স্বেতবর্ণের।  পশ্চিমভাগ উজ্জ্বল স্বচ্ছ প্রভায় দীপ্তিমান। আর উত্তরভাগ কুরন্ডক অর্থাৎ যে শক্তি দ্বারা বীর্যশক্তি নষ্ট হয়, সেই শক্তির  প্রভাবে  পশ্চিমভাগ সোনালী আভাযুক্ত হয়ে আছে।  

এই পার্বতরাজের দক্ষিণ দিকে আছে জম্বু, যা থেকে জম্বুদ্বীপের নাম হয়েছে। সুমেরু পর্বতে সূর্য্যকিরণ প্রসারে রাত্রি,দিন ও লগ্ন পরিভ্রমণের ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এই সুমেরু পর্বতের উত্তরে দুই হাজার যোজন  (একক্রোশ = ৮০০০ হাত বা দুই মাইলের থেকে একটু বেশি, আবার ৪ মতান্তরে ৫  ক্রোশে এক যোজন)  বিস্তার করে আছে তিনটি পর্বত।  যাদের নাম হচ্ছে নীল, শ্বেত ও শৃঙ্গবন্ত। এদের ভিতর আছে, রমনক, হিরন্ময়, ও উত্তর কুরু নাম তিনটি বর্ষ আছে। বর্ষ কথাটার মানে হচ্ছে কাল, বা যিনি বর্ষণ করেন। এখানে জলাধার বা বারিধারা। এই বর্ষগুলোর  বিস্তার এক-একটি নয়-নয় হাজার যোজন। দক্ষিণে দুই হাজার যোজন বিস্তার করে আছে, নিষধ, হেমকুট ও  হিমশৈল। তাদের মধ্যে নয়,নয় হাজার বিস্তার করে আছে হরিবর্ষ, কিম্পুরুষ বর্ষ ও ভারত নামক  তিন বর্ষ দেশ। 

সুমেরুর পূর্বে মাল্যবৎ বা মাল্যবান পর্যন্ত ভদ্রাশ্ব ও পশ্চিমে গন্ধমাদন পর্যন্ত কেতুমালা মাঝে রয়েছে ইলাবর্ত বর্ষ দেশ। তারা এই সুমেরুর চারিদিকে শত সহস্র যোজন বিস্তারে রক্ষিত। এই সেই জন্মুদ্বীপ যা শত-সহস্র যোজন বিস্তার লাভ করে আছে। সে তার দ্বিগুন বলয় আকারে লবন সমুদ্রের দ্বারা বেষ্টিত।

যাই হোক আমাদের আলোচনা সংক্ষেপ করবো। শংকরাচার্য বিভিন্ন লোকের যে বিস্তারিত বর্ননা করেছেন, তা আমাদের মতো সাধারণের পক্ষে বোধগম্য হওয়া সম্ভব নয়। এইসব তত্ত্বকথার গূঢ়ার্থ আছে। সেসব কথা আমরা ধীরে ধীরে শুনবো। আজ আমাদের আলোচনাকে যাই। আচার্য্য শঙ্কর বলছেন, মহর্লোক দেবভূমি। এখানে কুমুদ, (কেউ কথাটার অর্থ পৃথিবী, আর মুদ মানে হৃষ্ট অর্থাৎ যাক দেখে পৃথিবীর সবাই হৃষ্ট বা আনন্দিত হয় ) ঋভুকুল, (বৈবস্বত মন্বন্তর-এর দেবতাগণ, এরাই অগ্নির উপাসক ছিলেন, এবং বেদমন্ত্র বা সূর্যদেবের স্তুতি  এঁরাই রচনা করেন। )  প্রতর্দন, অঞ্জনাভ, ( অর্থাৎ দোষহীন ব্রহ্মজ্ঞানী  ও প্রচিতাভ (অর্থাৎ হৃষ্টমনা) এইসব  সমগোত্রীয় পুরুষ বাস করেন। এরা পঞ্চভূতকে নিজের বশে এনেছেন। এঁরা সহস্র-কল্পের আয়ু সম্পন্ন। 

এর পরে আছে, ব্রহ্মার প্রথম লোক, জম্মু। এই জনলোকে আছেন, চার রকম দেবতাদের সম গোত্রীয় দেবযোনি।  এঁরা ব্রহ্মপুরোহিত এঁরা ব্রহ্ম-কায়িক, ব্রহ্ম-মহাকায়িক ও অমর।  এঁরা সূক্ষ্ম ভূতকে বশ করেছেন। এঁরা আগের চাইতে দুইগুণ আয়ুযুক্ত।  

 তপোলোক : ব্রহ্মার দ্বিতীয় লোক হচ্ছে, তপলোক। এখানে আছেন, আভাস্বর, মহাভাস্বর, ও সত্য-মহাভাস্বর। এঁরাও ভুতেন্দ্রিয় ও প্রকৃতিবশী এবং পূর্বের পূর্বের তুলনায় দ্বিগুন আয়ু বিশিষ্ঠ। এঁরা  সবাই ধ্যানাহারী, উর্দ্ধরেতা, ও এঁরা উপরের লোকগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত এমনকি নিচ নিচ লোকগুলো সম্পর্কেও জ্ঞানসম্পন্ন। 

সত্যলোক : ব্রহ্মার তৃতীয়লোক হচ্ছে সত্যলোক দেবতাগণ বাস করেন। তাদের জ্যোতিঃ ভেদে চার প্রকার। তাঁরা হলেন, অচ্যুত, শুদ্ধনিবাস, সত্যাভ ও সংজ্ঞা ও সজ্ঞী। 

           























Tuesday, 3 December 2019

শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পরিবর্তন ও রোগমুক্ত শরীর


শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পরিবর্তন  ও রোগমুক্ত  শরীর 

জীবন তো শ্বাসের খেলা। আর এই শ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছেন চৈতন্য। প্রতিনিয়ত তাঁর আসা যাওয়ার খেলা চলছে।  আমরা এই শ্বাসের  দিকে কখনো খেয়াল করে দেখি না। শ্বাস তো এমনি এমনি প্রবাহিত হয়, এটাই আমাদের ধারণা ।  কিন্তু আমাদের মন যদি এই শ্বাসক্রিয়া দিকে খেয়াল রেখে চলতে পারে, তবে, আমাদের এই স্থুল দেহকে আমরা সুস্থ-সবল রাখতে পারি  । এমনকি আমরা আধ্যাত্মিক উন্নতিও করতে পারি এবং আমাদের  জীবন সার্থক করতে পারি ।

শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী মহারাজ বলছেন, আমরা যদি শ্বাসপ্রশ্বাসের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারি, শ্বাস-প্রশ্বাসের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি, তাহলে আমাদের শরীর সব সময় রোগমুক্ত থাকবে। বলা হয়ে থাকে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস হচ্ছে স্বয়ং অশ্বিনী কুমারদ্বয়। অর্থাৎ দেবরাজ ইন্দ্রের চিকিৎসক । কুমারদ্বয়ের নাম হচ্ছে, আশ্বিন ও রেবন্তঃ। এঁরা  জমজপুত্র।  এদের দেখতে একই রকম। থাকেও  একই সাথে। এরা চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী অর্থাৎ দুজন চিকিৎসক আমাদের দেহে প্রতিনিয়ত আসছেন-যাচ্ছেন। তো আমরা যদি এই চিকিৎসকদের গতাগতিতে  একটু মনোযোগ দেই, তবে আমরা সারা জীবন রোগমুক্ত থাকতে পারি।

যোগীরা বলছেন, আমরা যে শ্বাস গ্রহণ করি, এবং প্রশ্বাস ত্যাগ করি, এর একটা ছন্দ আছে,  একটা নিয়ম  আছে। আমাদের শরীরের মধ্যে যখন ব্যাধিরাজ প্রবেশ করেন, তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস  উতলা হয়ে ওঠে। শ্বাস প্রশ্বাসের যে স্বাভাবিক নিয়ম, যে ছন্দ, যে তাল, তা তখন কেটে যায়। আমরা যদি তখন সতর্ক হয়ে, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে স্বাভাবিক নিয়মে প্রবাহিত করতে পারি, তবে ব্যাধিরাজ আমাদের শরীরে থাকতে পারবেন না। আমাদের শরীর  ছেড়ে ভেগে পড়বেন। আর আমরা নীরোগ থাকতে  পারবো ।
এই বাম  নাসিকাকে যোগের ভাষায় বলে ইড়া  আর ডান  নাসিকাকে বলে পিঙ্গলা।  আসলে আমাদের মেরুদণ্ডের ভিতরে এই নাড়ি দুটির অবস্থান। অর্থাৎ বাম  নাসিকায় শ্বাস প্রবাহ হচ্ছে মানে শ্বাস ইড়ানাড়িতে প্রবেশ করছে। আবার ডান নাসিকা দিয়ে যখন শ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে, তখন তা আমাদের পিঙ্গলা নারীতে  প্রবাহিত হচ্ছে। আবার আমাদের দুটো নাসারন্ধ্র  দিয়ে যখন  শ্বাস প্রবাহিত হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সুষুম্না নাড়ীতে শ্বাসবায়ু  প্রবাহিত হচ্ছে।

যোগীরা বলছেন, শুক্লপক্ষের প্রতিপদ, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া তিথিতে সূর্যোদয়ের সময় আমাদের বাম  নাসিকায় বা ইড়া নাড়ীতে  শ্বাস-প্রশ্বাস আরম্ভ হয়। এই শ্বাস-প্রশ্বাস এক ঘন্টা পর পর  পরিবর্তন হতে থাকে । অর্থাৎ একঘন্টা  আরম্ভ হয় ডান নাসিকার ক্রিয়া, বা পিঙ্গলা নাড়ীতে শ্বাস প্রবাহিত হয় । এর পরে, আবার যখন কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়, তখন ঠিক এর বিপরীত হয়।  অর্থাৎ কৃষ্ণের পক্ষের প্রতিপদে, দ্বিতীয়া, তৃতীয়ায়  সূর্য উদয়ের সময় আমাদের ডান  নাসিকায় শ্বাস-প্রশ্বাস আরম্ভ হয়।  এবং এক ঘন্টা  অন্তর অন্তর পরিবর্তিত হতে থাকে। এটা হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম।

 যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তবে বুঝতে হবে, আমাদের শরীরের মধ্যে রোগের  বীজ উৎপন্ন হয়েছে, বা বাইরে থেকে রোগবীজ প্রবেশ করেছে। স্বামীজী বলছেন, আমাদের শরীর তখন এক  পক্ষকালের মধ্যেই অর্থাৎ ১৪ দিনের মধ্যেই  অসুস্থ হয়ে পড়বে । এই সময় যদি উভয় নাসিকা দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত হয়, তবে রোগের  প্রকোপ খুব জোরালো হতে পারে না। কিন্তু যদি এক নাসিকা দিয়েই ঘন্টার পর ঘন্টা শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে তবে, রোগের প্রকোপ বাড়বে। যদি এই অনিয়ম ৭-১৫-৩০ দিন বা তার  বেশি থাকে, তাহলে রোগ অত্যন্ত কঠিন বুঝতে হবে। এমনকি এই অবস্থায় প্রাণসংশয় দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় যদি, আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস গতি এক নাসিকা থেকে অন্য নাসিকায় পরিবর্তন করতে পারি, তবে আমাদের জীবন সংশয় কেটে হবে। কিন্তু যদি সুস্থ  অবস্থায়, আমরা যদি এই শ্বাস পরিবর্তন করতে পারি, তবে আমরা চিরকাল সুস্থ থাকতে পারি। যারা নীরোগ থাকা কালীন, এই শ্বাস পরিবর্তনের কৌশল আয়ত্ত্ব করতে পারেন নি, তাদের পক্ষে  রোগে আক্রান্ত হলে এই শ্বাস পরিবর্তন সহজ সাধ্য নয় ।

শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী বলছেন, হঠাৎ পেটে অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হলে, অথবা বুকে ব্যথা বা মাথায় যন্ত্রনা আরাম্ভ হলে,ঐ সময়  যে নাসিকায়  শ্বাস প্রশ্বাস চলছে, তার পরবর্তন করে, বিপরীত নাসিকায় শ্বাস প্রবাহিত করতে পারলে, ওই যন্ত্রনা দ্রুত উপশম হতে আরম্ভ করে। অজীর্ণ, পিত্তশূল,অম্লশূল, এইসব রোগের  হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, যদি আমরা আমাদের ইচ্ছা মতো যে কোনো নাসিকায় শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবর্তনের ক্ষমতা আয়ত্ত করতে পারি।

স্বামীজী বলছেন, আমাদের খাবার সময়, বা খাবার অব্যবহিত পরে, যদি আমাদের ডান  নাক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত হয়, তবে আমাদের খাদ্য সহজে হজম হয়।  যদি কোনো কারণে, খাবার সময় আমাদের বাম নাসিকা দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত হয়, তবে আমাদের অবশ্যই  উচিত খাবার ঠিক পরেই ডান  নাসিকা দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত করা। পেটের রোগের অব্যর্থ ঔষধ হচ্ছে, খাবার সময় ও খাবার পরে ১ ঘন্টা যাবৎ ডান নাক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত করা।

আসলে আমরা কেউই এ ব্যাপারটাতে কখনো নজর দেবার চেষ্টা করি না। আর এই শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবর্তন কি ভাবে করতে হয়, তাও আমরা জানি না। এখন আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে  শুনবো, শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতীর কাছ থেকে।

আগেই আমরা শুনেছি, এক ঘন্টা অন্তর অন্তর আমাদের এক নাড়ী থেকে অন্য নাড়ীতে শ্বাসবায়ু যাতায়াত করে, এটাই  প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো কি করে ?

একটু খেয়াল করুন, এই মুহূর্তে কোন নাক দিয়ে বায়ু চলাচল করছে। ধরুন, আপনার বা নাক দিয়ে শ্বাস বইছে। তো ডান  নাক বন্ধ করে,বা  নাক দিয়ে আপনি বুক ভরে শ্বাস নিন। এবার বা নাক বন্ধ করে, ডান নাক  দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। অর্থাৎ যে নাক খোলা  আছে, সেই নাক দিয়ে আগে শ্বাস নিন, আর যে নাক বন্ধ আছে, সেই নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। ৫/১০ মিনিট এটা করতে থাকুন। দেখবে, বন্ধ নাক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

শ্বাসের গতি পরিবর্তনের আর একটা কার্যকরী উপায়  হচ্ছে, আপনার যে নাকে শ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে, সেই দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন। অর্থাৎ যদি বাম নাসিকায়  শ্বাস প্রবাহিত হয়, এবং ডান নাসিকায় শ্বাস প্রবাহিত করতে চাই, তাহলে বাম কাতে শুয়ে বাম  বগলের নিচে একটা বালিশ রাখুন। এবার, প্রথমে বাম নাসিকা দ্বারা শ্বাস গ্রহণ করুন,  এরপর  কনিষ্ঠা বা অনামিকা আঙ্গুল দিয়ে বাম নাক বন্ধ করে , ডান নাক দিয়ে বায়ু ছাড়ুন। এইভাবে কয়েকবার করলেই, ডান পরিষ্কার হয়ে শ্বাস বইতে শুরু করবে। তবে, যদি দেখা যায়, বাম নাক দিয়ে শ্বাস টানা যাচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে, ইড়া বা বাম  নাড়ীর শ্বাস পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যদি পিঙ্গলা থেকে ইড়া নাড়ীতে শ্বাস পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তবে, ডান  কাত  হয়ে বগলের নিচে বালিশ রেখে শুতে হবে, তারপর ডান নাক দিয়ে শ্বাস নিতে হবে, আর বাম নাক দিয়ে শ্বাস ত্যাগ করতে হবে। কয়েক মিনিট এইরকম করলে, ডান নাক বন্ধ হয়ে যাবে, এবং বাম নাক দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস প্রবাহিত হতে শুরু করবে।

এইভাবে শ্বাস পরিবর্তনের ক্রিয়া কিছুদিন অভ্যাসের পর, আর শোবার দরকার পড়বে  না। তখন শরীরকে একটু হেলিয়ে বা বাঁকিয়ে অনায়াসে শ্বাস পরিবর্তন করা যেতে পারে।  নিয়মিত অভ্যাসের ফলে, আপনি কেবলমাত্র ইচ্ছেমাত্রই  শ্বাসের গতি এক নাসারন্ধ্র থেকে আর এক নাসারন্ধ্রে পরিবর্তন করে নিতে পারেন । তখন আর দেহকে হেলাতেও হবে না। আপনার ইচ্ছেই আপনাকে ইচ্ছেমতো নাসারন্ধ্র দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত করতে সাহায্য করবে। আর এইসব করেই, আপনি আপনার  দেহকে সর্ব্ব-ব্যাধি হতে মুক্ত করতে পারেন।

এখন কথা হচ্ছে, কখন আমরা কোন নাকে শ্বাস গ্রহণ করবো। স্বামী সরস্বতী মহারাজ বলছেন, বাম  নাসিকায়, অর্থাৎ ইড়া  নাড়ীতে  স্বাস প্রবাহকালে শুভ কাজে হাত দেওয়া উচিত। আবার ভোজন, শত্রূর সাথে লড়াই করবার সময়, ডান  নাক বা পিঙ্গলা দিয়ে শ্বাস প্রবাহ করা উচিত। আর দুটো নাক দিয়েই যদি শ্বাস-প্রশ্বাস প্রবাহিত হয়, জানবেন সুষুম্না নারী দিয়ে শ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে, তখন ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে লিপ্ত থাকা উচিত। এবং এই সময় খুবই ফলপ্রদ।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।

















Monday, 2 December 2019

অধ্যাত্ম জগতে চোখের ভূমিকা

অধ্যাত্ম জগতে চোখের ভূমিকা 
Order Number: 405-9596855-4290702

কিছুদিন আগে আমি এক অসুস্থ  নিকট আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলাম। শুনলাম তিনি এখন চোখে ঝাপসা দেখেন। আমাকে দেখিয়ে তার ছেলে বললো, কে এসেছে, চিনতে  পারছো ? তো ভদ্রলোক,  ঘাড়  নেড়ে জানিয়ে দিলেন, চিনতে পারছেন না। অর্থাৎ তিনি কানে শুনতে পারছেন, চোখেও ঝাপসা দেখতে পারছেন, কিন্তু চিনতে পারছেন না। অর্থাৎ তার স্মৃতি ও চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিছুদিন বাদে ভদ্রলোক, স্থূল দেহ ত্যাগ করেন। ভাবছিলাম, মৃত্যুর সাথে চোখের সম্পর্ক কোথায় ?

হিমালয়ের পাহাড়ের গুহায় বহু ধ্যানস্থ মহাত্মা আছেন। তারা সবাই, চোখ বুজে, মেরুদন্ড সোজা করে বসে আছেন। চোখের সঙ্গে  কি ধ্যানের  কি কোনো সম্পর্ক আছে।
   
আমাদের চক্ষুদুটো  একটা বিষ্ময়কর বস্তূ।  আমাদের শরীরের যে অঙ্গগুলো স্বয়ংসম্পূর্ন তার মধ্যে চোখদুটো প্রধান। তাই চোখকে আমরা অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করতে পারি।  এর ক্রিয়া কখনো বন্ধ করা যায় না। আমরা দেখতে চাই বা না চাই আমাদের চোখ কিন্তু দেখবেই। আমরা চোখের পাতা বন্ধ করতে পারি, কিন্তু চোখের ক্রিয়া অর্থাৎ দেখা বন্ধ করতে পারি না। এমনকি আমরা চোখের গতি বন্ধ করতে পারি না। আমাদের চোখ সবসময় ঘুরছে।  আমরা চোখ বন্ধ করলেও আমরা কিছু না কিছু দেখতে পাই। চোখ যেমন বাইরের জগৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান প্রদান করে, ঠিক তেমনি এই চোখের সাহায্যে আমরা আমাদের অন্তর্জগতের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। তাই চোখ আমাদের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানের কাজে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।
 চোখ সবসময় গতিশীল। আমাদের মন যেমন চঞ্চল।  আমাদের চোখ দুটোও চঞ্চল। চোখ আমাদের মনের আয়না। আমরা চোখ দেখে বুঝতে পারি, মানুষটি সুখে আছে, না দুঃখে আছে, রেগে আছে না শান্ত আছে। কারুর মনকে আমরা দেখতে পারি না।  কিন্তু মন যেহেতু চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে, তাই মনকে ভালো করে বুঝতে গেলে, আমাদের তাদের  চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। এমনকি আমাদের চৈতন্য শক্তির সঙ্গে আমাদের চোখের একটা যোগাযোগ আছে, যা আমাদের অন্য কোনো অঙ্গের সঙ্গে নেই। তাই চোখ যতক্ষন আমাদের ক্রীয়াশীল থাকে ততক্ষন আমাদের চৈতন্য থাকে।তাই আমাদের মৃত্যুর আগে, চোখে ঝাপসা দেখতে থাকি। মৃত্যুতে আমাদের চক্ষু স্থির হয়ে যায়।  কেউ সজ্ঞা  হারিয়ে ফেললে, আমরা চোখে জলের ছিটে দেই, সংজ্ঞা  ফিরিয়ে আনবার জন্য। তাই চোখ আমাদের একটা গুরুত্ত্বপূর্ন অঙ্গ। আর চোখকে আমরা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য  ব্যবহার করতে পারি। চোখের দৃষ্টিকে আমাদের বাইরের থেকে ভিতরের দিকে ফেরাতে হবে।

আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের জন্য, আমাদের চোখের ক্রিয়াকে স্থির করতে হবে। চোখের ক্রিয়াকে বন্ধ করা আর চোখের পাতাকে বন্ধ করা কিন্তু এক জিনিস নয়।  এই পার্থক্যটা আমাদের ভালো ভাবে বুঝতে হবে। যেকোনো মুহূর্তেই আমাদের চোখের পাতা বন্ধ করতে পারি। আমরা ঘুমের সময় চোখ বন্ধ রাখি। কিন্তু চোখের যে অন্তরযাত্রা তা তাতে বন্ধ হয় না। চোখের এই যাত্রা যা একবার বাইরে আর একবার ভিতরে এই যাত্রাকে আমাদের বন্ধ করতে হবে।  কিন্তু চোখ সজাগ থাকবে। অর্থাৎ দেখছে, কিন্তু দেখবে না। আর চোখের দেখা বন্ধ অর্থাৎ বাইরের দৃশ্য দেখা বা ভিতরের দৃশ্য দেখা যখন বন্ধ হয়ে যাবে তখন,  আমাদের চিন্তাগুলোও ধীরে ধীরে চলে যাবে। চোখের সমস্ত গতিকে রুদ্ধ করে দিন। অনুভব করুন যেন আপনি একটা পাথরে পরিণত হয়ে গেছেন। চোখ দুটোকেও পাথরের মতো স্থির করুন। কিছুই করতে হবে না।  শুধু স্থির অবস্থাকে উপলব্ধি করুন।
--------------
ভূতের দুটো রূপ,  স্থুল ও সূক্ষ্ম। স্থুল  বলতে বোঝায়, ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। আর সূক্ষ্ম বলতে বোঝায়, রূপ, রস,গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ।    এই ভূত গ্রহণের জন্যই আমাদের সুখ-দুঃখ অনুভূত হয়।  শরীর  ভোগায়তন। ভূতে থাকা সত্ত্বেও বৈরাগ্যের দ্বারা আমরা ভোগ থেকে নিবৃত্তি পেতে পারি। এই অবস্থায়ই  যোগীর আকাঙ্খিত অবস্থা। অর্থাৎ জলেও নামবো, স্নানও  করবো, কিন্তু গা ভেজাবো না। পদ্মপাতা জলে থাকে,  কিন্তু জলের গুনকে সে গ্রহণ করে না অর্থাৎ জল পদ্মপাতাকে ভেজাতে পারে না।  ভূত থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারলে, স্ব-রূপে স্থিতি হয়।

SASANKA SEKHAR PEACE FOUNDATION - বক্তব্য শুনে অনেকের মধ্যে একটা সত্য অনুভূত হয়েছে যে এই শশাঙ্ক শেখর ব্রহ্মজ্ঞানী ব্যক্তি নন। দেখুন SASANKA SEKHAR PEACE FOUNDATION কোনো ব্যক্তি নন। এটি একটি সংস্থা, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে, অধ্যাত্ম জগতে প্রবেশের দ্বার উন্মোচন করা। চিরকালীন সত্যকে উপলব্ধি করা। এর মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যিনি দাবি করতে পারেন, বা করেন, যে তার ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে। ভারতের মুনি-ঋষিরা যে সত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন, তার কিছু কথা সাধারণের ভাষায় ব্যক্ত করাই উদ্দেশ্য । এই সব কথা SASANKA SEKHAR PEACE FOUNDATION -এর পৈতৃক সম্পত্তি নয়, নিজস্ব বানানো নয়। এটি একটি যাত্রা যাতে আপনি অবশ্য়ই সামিল হতে পারেন, আবার নাও পারেন । এটি তথাকথিত কোনো ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ত্ব করে না, তার গুনগানও করে না।   অধ্যাত্ম শান্তির খোঁজে, একটা পদক্ষেপ মাত্র। সবাই স্বস্তিতে থাকুন, শান্তিতে থাকুন, সবার মঙ্গল হোক, এই আমাদের কামনা।

সমাধি কাকে বলে : আত্মহারা হওয়ার নামই সমাধি। ধ্যান করতে করতে মানুষের যখন কেবল মাত্র ধ্যেয় বস্তুর সত্ত্বার উপলব্ধি থাকে, আত্মসত্ত্বাকে যখন সে ভুলে যায়, ধ্যেয় বিষয় ছাড়া অন্য কিছু জ্ঞান গোচর  হয় না, সেই অবস্থাকে বলে সমাধি।
গল্পটা সবার জানা, তবু আর একবার শুনি। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শুরু হয়ে গেছে। আজ শ্রীরাধিকার অভিসারে যাবার সময় হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শুনে শ্রীরাধিকার মন আরো উতলা হয়ে উঠলো। কিন্তু প্রিয়তমার কাছে, যাবার আগে একটু সাজসজ্জ্বা করে যেতে হয়। প্রসাধন সামগ্রী নিয়ে বসলো। পায়ে কাজল পড়লো , চোখে আলতা লাগলো , গলার মালা মাথায় পরে নিলো,  হাতের আঙুলে  দুল পড়লো, কানে আংটি ঝুলিয়ে দিলো । শাড়ি অগোছালো।  সখীরা তার এই অদ্ভুত সাজ দেখে, হেসে খুন। বললো, দেখবি যায় কি সেজেছিস।  বলে, একটা আয়নার সামনে নিয়ে গেলো। বললো, তাকিয়ে দেখ, কি সেজেছিস। সখীরা  ভেবেছিলো, শ্রীরাধিকা নিশ্চয় তার ভুল ধরতে পারবে, আর লজ্জ্বা  পাবে। কিন্তু শ্রীরাধিকা আয়নায় নিজের অবয়ব  দেখতে পেলো না দর্পনে।  দেখলো শুধু গোবিন্দ। দর্পনে ভেসে  উঠছে শুধু শ্রীকৃষ্ণের  মুখ, প্রিয়তমের মুখ । যেখানে নিজের মরন সাধন হয়, বরণ হয় প্রিয়তমের, একেই বলে সমাধি। ধ্যানে ধ্যানকর্তা বলে কিছু থাকে না, অর্থাৎ ধ্যাতা থাকে না থাকে শুধু ধ্য়েয়। নিজেকে ভুলে তিনিতে  তন্ময় হয়ে যাওয়াই ধ্যান।  আর ধ্যানের  পরিনাম  সমাধি। 


এই কথাগুলো বার বার শুনতে ইচ্ছে করে, তাই পুনরাবৃত্তি করি। মহর্ষি পতঞ্জলি তার যোগদর্শনে বলছেন : "যোগঃ চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ" - একটা ছোট্ট শ্লোকে যোগের সার কথা বলে দিলেন। কিন্তু রসিক ভক্ত এই একই কথা কি ভাবে ব্যক্ত করছেন দেখুন।

একা কুম্ভ কাঁখে করি, যমুনাতে জল ভরি,
জলের ভিতরে শ্যামরায়।
ফুলের চূড়াটি মাথে, মোহন মুরলি হাতে,
পুনঃ কানু জলেতে লুকায়।
অনেক প্রবন্ধ করি, ধরিবারে যায় হরি,
ধীরে ধীরে কর বাঢ়াইনু।
কর বাঢ়াইয়া যাই, আর না দেখিতে পাই,
আকুল হইয়া জলেতে ডুবিনু।
ঢেউ মোর হলো কাল, না পাইনু নন্দলাল,
উঠিলাম যমুনার তীরে।
না হেরি বঁধুর মুখ, হইল বিষম দুখ,
কাঁদিতে কাঁদিতে এলাম ঘরে।

শ্রীরাধিকা একাকিনী কাঁখে কলসি নিয়ে যমুনাতে জল ভরতে গিয়েছেন।  "একা কুম্ভ কাঁখে করি, যমুনাতে জল ভরি"। আমাদের সবার  এই একই দশা। আমরাও জীবন ঘট ভরে নেবার জন্য, মন-যমুনার তীরে চুপি চুপি জল ভরতে যাই। আর সেই মন যমুনার জলেই আছেন, আমাদের প্রাণ-পুরুষ, শ্যামরায়। অপূর্ব মনোমোহিনী মূর্তি, যার মাথায় শোভা পাচ্ছে ফুলের চূড়া,  হাতে সেই মোহন মুরলি, যার মধুর ধ্বনিতে  আমরা পাগল হয়ে যাই। ঘর সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই। মন-যমুনার জলে, তাকে দেখামাত্র শ্রীরাধিকা পাগল হয়ে যায়। তাঁকে পাবার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।  তাকে দেখি, দেখি আবার দেখি না। আসলে আমাদের মন যমুনার জলে তো বাসনার ঢেউ উঠছে সর্বদা। অনেক আশা নিয়ে, শ্রীরাধিকা জলের মধ্যে, অঙ্গুলি সঞ্চালন করে, শ্রীহরিকে ধরবার জন্য। আর যত সে কর সঞ্চালন করে, হাত যত  নাড়াচাড়া করে, যমুনার জলে তত ঢেউ ওঠে, শ্রীহরি তত জলের  গভীরে লুকিয়ে পরেন , অস্পষ্ট হয়ে যান । আমরা তাঁকে পাবার জন্য যত  আড়ম্বর করি, ততই তিনি লুকিয়ে যান। অর্থাৎ ফল হয় উল্টো, আমরা তাকে পাবার জন্য আড়ম্বর করে পুজো-অর্চনা করি, আর তাতে তিনি আমাদের থেকে আরো দূরে সরে যান। আমরা তা বুঝি না। কোনো উপায় না পেয়ে, শ্রীরাধিকা "আকুল হইয়া জলেতে ডুবিনু"। অর্থাৎ জলে ঝাঁপ দিলেন।ভাবলেন, জলের তলায় তিনি লুকিয়ে আছেন।  আর এতে জল আরো অস্থির হয়ে উঠলো, শ্রীহরি জলের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেলেন । শ্রীহরির পূজায় যত আড়ম্বর বাড়বে, শ্রীহরি তত আমাদের থেকে দূরে সরে যাবেন । পদকার বলছেন, "ঢেউ মোর হলো কাল, না পাইনু নন্দলাল,উঠিলাম যমুনার তীরে"। মনের অস্থিরতা, চিত্তের বিক্ষিপ্ততা, আমাদের যত  বাড়বে তত আমরা শ্রীহরি থেকে দূরে সরে থাকবো। শেষে শ্রীরাধিকা বলছেন,  না হেরি বঁধুর মুখ, হইল বিষম দুখ, কাঁদিতে কাঁদিতে এলাম ঘরে। শূন্য কুম্ভটি নয়ন জলে পূর্ন করে, শ্রীরাধিকা ঘরে ফিরে এলেন। আমাদের এই শ্রীরাধিকার মতো অবস্থা, অস্থির মনে তাঁকে দেখতে চাই, কিন্তু আমাদের চিত্ত যতক্ষন শান্ত না হবে, ততক্ষন শ্রীহরি আমাদের মনে আসন পাততে পারেন না। তাই আগে মন-তরঙ্গ  শান্ত করতে হবে। তবেই আমরা ঈশ্বরের দেখা পাবো। তাই মহর্ষি পতঞ্জলি বলছেন, চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করতে হবে, যদি যোগ অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে মিলিত হতে চান।

ভূতেদের সভা বসেছে, চৈতন্য সে সভার সভাধিপতি। ভূতেরা সারাক্ষন সভামধ্যে  গোলমাল করে।  চৈতন্য খেয়াল করে। একসময় চৈতন্য সভা ভেঙে দিয়ে, বাড়িমুখী হয়।