Wednesday, 3 July 2019

ইচ্ছাশক্তির রহস্যঃ

ইচ্ছাশক্তির  রহস্যঃ

ইচ্ছে শক্তি, WILL POWER . কার ইচ্ছায় চলি আমরা ? ইচ্ছে ব্যাপারটা কি ? আমি ইচ্ছে করলেই কি সব কিছু বদলে যাবে ? ইচ্ছে ব্যাপারটা অদ্ভুত।  আপনি যা ইচ্ছে করেন, তা কিভাবে পাবেন ? আপনি যা হতে চান, তা কি ভাবে হবেন ? কিভাবেই বা ইচ্ছেটা করবেন ? 

ইচ্ছে আর কিছুই নয়, ইচ্ছে হচ্ছে আমাদের ভাবনা বা চিন্তার অব্যক্ত অবস্থা । আমরা যা ভাবছি, তা আমাদের ইচ্ছেশক্তি দ্বারা সম্ভব হচ্ছে। । ইচ্ছে অব্যক্ত, এই ইচ্ছে যখন ক্রিয়াশীল হয় তখন তাকে আমরা বলি  চিন্তা বা ভাবনা ।   বলা যেতে পারে, আমাদের সবার ভাবনা বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভাবনাই ভগবানের ইচ্ছে। আর ইচ্ছেই রূপ পরিগ্রহ করে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমরা যা কিছু দেখছি, সবই আমাদের ভাবনা প্রসূত। আমি আপনি যা কিছু ভাবছি,  সেটাই রূপ পরিগ্রহ করছে। সৃষ্টির আদি থেকে এই নিয়ম চলে আসছে, এবং ভবিষ্যতেও চলবে। তাই আমাদের ভাবনার নিয়ম জানতে হবে, যাতে প্রত্যেকটি ভাবনা মঙ্গল প্রসব করে।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স (quantam physics ) বলছে, আমাদের এই যে বিশ্বব্রহ্মান্ড তার উৎপত্তি হয়েছে, ভাবনা থেকে। ভাবনা হচ্ছে একটা ক্রিয়া, যার ফলে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কার ক্রিয়া। ইচ্ছাশক্তির ক্রিয়া।  অব্যক্ত ইচ্ছাশক্তি যখন ক্রিয়াশীল হয় তখন তাকে আমরা বলি ভাবনা। আর ভাবনা থেকেই সৃষ্টি।

আমরা সবাই আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছাশক্তির ভাবনার ফল। ঈশ্বরের ইচ্ছাশক্তির একটা ক্ষুদ্রতম অংশ আছে, আমাদের সবার মধ্যে। যার ফলে আমরা প্রতিনিয়ত ভাবি। খুব কম সময় আছে, যখন আমরা ভাবনা রোহিত হতে পারি। তা সেটা বুঝি আর না বুঝি। এমনকি আমরা যখন কোনো কাজে নিযুক্ত আছি, তখনও আমরা কিছু না কিছু ভেবে চলেছি।

আমাদের তিনটি অবস্থা।  জাগ্রত, স্বপ্ন, ও সুষুপ্তি। আমরা জাগ্রত অবস্থায়  চিন্তা তো  করিই, এমনকি স্বপ্নেও আমারদের ভাবনা চলতে পারে।  কেবলমাত্র সুসুপ্তিতে আমরা ভবনাবিহীন থাকতে পারি।

আমরা জানি, আমাদের চিন্তার একটা রূপ আছে। আর এই রূপ,  সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনু দিয়ে তৈরি, এমনকি তার কিঞ্চিৎ চৈতন্যশক্তিও আছে। আমাদের চিন্তার লক্ষবস্তূ যদি কাছাকাছি থাকে, তবে এই সূক্ষ্ম চিন্তাদেহ তক্ষুনি লক্ষবস্তুর দিকে ধাবিত হয়। এমনকি লক্ষবস্তু যদি, বহু দূরেও থাকে সেখানে সে দ্রুত পৌঁছে যায়। এবং সেখানে লক্ষবস্তুর ভিতরে আমার ভাবনা প্রভাবিত করে।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। আমি যখন চাকরি করি। আমার অফিসে তখন কাজের খুব চাপ। আর আমার যিনি সুপার বস,মিস্টার সুদান,  তিনি কিছু কাজ বোঝেন না, কারন তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীতে। এবং সরাসরি, দেশোয়ালি ভাইয়ের সহযোগীতায় উচ্চপদে বহাল হয়েছেন, তাই কাজ না বোঝার জন্য, ওপরওয়ালার কাছ থেকে গালাগালি খেতেন, আর আমাদের দিয়ে,  কাজ করানোর জন্য, তার একমাত্র  সম্বল ছিল মেজাজ । মাঝে মধ্যে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতেন। এমনকি একদিন, সে আমাকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন করার চেষ্টাও  করেছিলেন ।  আমি ছিলাম অসহায়। আমি ভেঙে পড়লাম। আকুল ভাবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলাম, ভগবান ওকে শুভবুদ্ধি দাও।  আমার কাছে একটা বই ছিল, মিস্টার  আর.কে.  গোয়েঙ্কার লেখা,  THE ART OF  LIVING, - আমি   সেই বইটা নিয়ে, আর এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে, ভয়ে ভয়ে তার চেম্বারে গিয়ে, তাকে দিলাম। বললাম বইটা পড়বেন।  ঈশ্বরের অপার  করুনা, তার পর দিন, রবিবার, সুদানের টেলিফোন পেলাম,  আমাদের বাড়িতে আসতে চায়, - এবং বললো, আমি তোমার বড়ভাই, আমি তোমার কাছে, ক্ষমা চাইছি। আমি স্তম্ভিত, আশ্বস্ত হলাম।  এর পরে, আর কোনোদিন, সুদান, কাউকে গালাগালি করতো না। মানুষটা কেমন যেন পাল্টে গেলো।

যেকোনো পরিস্থিতিতে, আপনার চিন্তাকে মঙ্গলের পথে পরিচালিত করুন। দেখবেন, আপনার শুভচিন্তা অন্যকে প্রভাবিত করবেই করবে।

মানুষের সঙ্গে অন্যান্য জীবের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, মানুষ শুভ চিন্তা করতে পারে, অন্যান্য জীব শুভ চিন্তা করতে পারে না। তারা শারীরবোধের উপরে উঠতে পারে না।

অনেকে বলেন, আমরা আমাদের ভাবনার মাধ্যমে, আমাদের আর্থিক উন্নতি পড়তে পারি। কথাটা সর্ব্বত সত্য। আসলে যে যা চায়, সে তাই  পায়। আজ যাদের আপনি, অর্থবান দেখছেন, তারা সবাই সর্ব্বক্ষন অর্থের কথাই চিন্তা করছেন,- তাই তারা অর্থবান হচ্ছেন। তবে একটা কথা খেয়াল করবেন, অর্থ মানুষের তিন পুরুষের বেশি থাকে না। কারন, প্রচুর অর্থ এসে গেলে , মানুষের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে, হারানোর ভয়, তখন শুধু তারা হারানোর ভয়ে আক্রান্ত হন। এবং এই হারানোর ভয় থেকেই তাদের সত্যি সত্যি অর্থলোপ পেতে থাকে।    কিন্তু মানুষের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, আনন্দ। পার্থিব জিনিস আমাদের সুখ দিতে পারে। কিন্তু পার্থিব জিনিসের সুখ সাময়িক, শুধু সাময়িক নয়, এটা  দুঃখের বাহকও বটে ।

আপনার ইচ্ছেকে আপনার ভাবনাকে প্রভাবিত করতে চাইলে, আপনার মনকে শান্ত করতে হবে। আর মনকে শান্ত করার একমাত্র ও অব্যর্থ উপায় হচ্ছে প্রাণায়াম - ধ্যান - ধারণা - । এই তিনটি জিনিস যদি আপনি, নিমিয়ত করতে পারেন, তা সে যত  অল্প সময় হোক, আপনি দেখবেন, আপনার ইচ্ছাশক্তি প্রবল থেকে প্রবল হচ্ছে। আপনার নিজের প্রতি বিশ্বাস, এবং সব বিষয়ে একটা সদর্থক ভাব আপনাকে শক্তি যোগাবে। একটা জিনিস জানবেন, আমরা একটা শব্দ ও আলোর তরঙ্গে ভাসমান। এই তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি আপনাকে স্থির বা অস্থির করছে । ধ্যান, প্রাণায়াম, এই তরঙ্গের ফ্রেকুয়েন্সিকে এডজাস্ট করবে। আপনি এক অনাবিল আনন্দে থাকবেন।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ - হরি ওম।

আমরা আলোচনা করছিলাম ইচ্ছেশক্তি নিয়ে। ইচ্ছে করলেই নাকি আমরা ভালো থাকতে পারি।  আমাদের ভাবনাই নাকি, আমাদের ভালো রাখে, বা মন্দ রাখে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কেউ আমাদের খারাপ চাই না। কেউ ইচ্ছে করে, অবাঞ্চিত বস্তু বা অবাঞ্চিত ব্যবহার আশা করেন  না। তবুও এগুলো হয়।  তাহলে এগুলো কি করে হচ্ছে ? এমন চিন্তাও তো  কেউ করে না যাতে  তার নিজের অমঙ্গল হয়। কিন্তু আমাদের অমঙ্গল তো হচ্ছে।

প্রথমে বলি, প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করে কেউ পার পাবে না। আপনি আগুনে হাত দেবেন আর আপনার হাত পুড়বে  না, এটা হবে না। আপনি ছাদ থেকে ঝাঁপ মারবেন, আর আপনার হাত পা ভাঙবে না, এটা হবে না। আপনি বৃষ্টিতে ভিজবেন, আর আপনার জ্বর হবে না, সেটা চিন্তা করবেন না। তবে এগুলো করার আগে আপনার ভাবনা, আপনাকে ভোগাচ্ছে, এটা সত্য। আগুনে হাত পড়ার আগে বা পরে  আপনি ভয় পেয়েছিলেন কি না ভাবুন, যদি ভয়-ভাবনা আপনার এসে থাকে তবেই আপনার হাত পুড়বে।  ছাদ  থেকে পড়ার আগে আপনার ভয়-ভাবনা আপনাকে ভোগাবে। একই ঘটনায় কেউ কেউ বেঁচে যায়, তার কারন তার মধ্যে ভয়-ভাবনা একদমই  আসেনি। এরকম কদাচিৎ হয়, কিন্তু হয়। শ্রী  শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল, নর্মদা পরিক্রমাকালে  পাহাড় থেকে পড়ে  গিয়েছিলেন। তন্দ্রাছন্ন অবস্থায় তার মনে হয়েছিল, কেউ যেন তাকে কোলে করে পাহাড় থেকে নিচে নেবে এসেছেন । এগুলো গল্পকথা নয়।  ভাবনাবিহীন মানুষের ক্ষতি করা শুধু শক্ত নয়, অসম্ভব।

দেখুন বিজ্ঞান বলছে, আমরা প্রতিনিয়ত হাজার হাজার চিন্তা করছি। আমাদের চিন্তার প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা যা কিছু দেখছি, শুনছি  তা থেকে আমাদের  যেমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তেমনি চিন্তার রশদ যোগাচ্ছে এগুলো। একই ঘটনা বা একই দৃশ্য আমাদের বিভিন্ন লোকের মনে, বিভিন্ন রকমের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবাচ্ছে। কারুর মৃত্যু,  তার পরিবারে একরকম চিন্তার উদ্রেক করে, আবার প্রতিবেশীর মনে অন্যরকম। কাছের কেউ মারা গেলে একরকম, দূরের কেউ মারা গেলে আর এক রকম। আপনি যখন কোনো সংবাদ শুনছেন, আপনার পাকস্থলীতে আপনার অন্ত্রের স্নায়ু মণ্ডলীতে ঠিক তক্ষুনি একটা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। আপনার  একটা বিশেষ অনুভূতি শুরু হয়, এবং আপনার ভাবনাকে প্রভাবিত করে এই অনুভূতি। আপনি কাল্পনিক অনেক কিছু ভাবা শুরু করেন। অর্থাৎ এই শ্রুতি বা দর্শন হচ্ছে একটা সংকেত, যা আপনাকে চিন্তান্বিত হতে বাধ্য করে। আপনার এই অনুভূতি সম্পর্কে আপনি সজাগ থাকুন। অর্থাৎ চিন্তার উৎস সম্পর্কে সজাগ থাকুন। এবং এ সম্পর্কে আপনি কি ভাবছেন, যেটা বোঝার চেষ্টা করুন।

আমাদের দুরকমের অনুভূতি, একটা ভালো আর একটা মন্দ। কোন অনুভূতি  আপনাকে রাগিয়ে দেবে, অর্থাৎ আপনার ভিতরে ক্ষোভের সৃষ্টি করবে, কোনটা আপনাকে হতাশ করবে, অসহায় করে দেবে। এগুলো সবই খারাপ অনুভূতি। আবার কিছু অনুভূতি আপনাকে উৎসাহ যোগাবে,  উদ্দীপিত করবে।  এগুলো আপনার ভালো অনুভূতি। যখন আপনার খারাপ অনুভূতি হবে, তখন আপনি ভালো ভাববেন, এটা কখনোই হবে না। তাই আপনার অনুভূতির উপরে নির্ভর করবে আপনার ভাবনা। আপনার ভাবনার একটা ফ্রীকোয়েন্সি বা তরঙ্গের মাত্রা আছে। আপনি যে তরঙ্গে যখন থাকবেন, আপনার ভাবনা সেই তরঙ্গে প্রবাহিত হবে। আপনার তরঙ্গ যত  দ্রুততালে প্রবাহিত হবে, আপনার ভাবনায় তত খারাপ জিনিস প্রবাহিত হবে , বা উত্তেজক চিন্তা প্রবাহিত হবে।  এবং যত আপনি উত্তেজক চিন্তা করবেন, তত আপনি আরো দ্রুত তরঙ্গের উচ্চ স্কেলে পৌঁছে যাবেন। এবং আপনার ভাবনার মধ্যে আরো খারাপ অনুভূতি বৃদ্ধি পাবে। খারাপ পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়, খারাপ ভাবনা আরো খারাপ ভাবনার দিকে নিয়ে যায়।

কিন্তু উল্টোটা করে দেখুন, অর্থাৎ আপনার তরঙ্গের গতি স্থির করুন,  আপনার শরীরের স্পন্দন ধীর করার চেষ্টা করুন, আপনার পালসবিট্ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করুন, আপনার মধ্যে স্থিরতা আসবে, আপনার ভাবনার মধ্যে ভালো অনুভূতি আসবে। আপনি যত   খারাপ ভাববেন তত খারাপ  হবে, আপনি যত  ভালো ভাববেন, তত ভালো হবে। অর্থাৎ যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের দিকে খেয়াল করুন, পরিস্থিতির বিশ্লেষণ শুরু করুন, নিজেকে নিজের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিন, পরিস্থিতির স্বীকার হতে দেবেন না। ঘটে যাওয়া কোনোকিছুকে আপনি বদলাতে পারবেন না। কিন্তু ভবিষ্যতের ঘটনার উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ আছে।  সেটা ভেবে, নিজের ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

আমাদের ভাবনার মধ্যে একটা বিশাল জায়গা জুড়ে আছে ভয়। আর ভয় ব্যাপারটা পুরোপুরি কাল্পনিক। আশঙ্কা থেকে ভয়ের উৎপত্তি। আশঙ্কা অমূলক নাও হতে পারে, কিন্তু ভয় কাল্পনিক। একটা ঘটনা বলি, আমার একবার হঠাৎ বদলি হয়ে গেল কলকাতা থেকে দুর্গাপুরে। আমি ঘরকুনো মানুষ । আমার মন যেতে চাইছে না। সারাজীবন কলকাতায় থেকে এসেছি। এমনকি প্রমোশন পর্যন্ত নেইনি, এই বদলির ভয়ে। এখন সেই বদলি হতে হলো , এই ব্যাটা নাটগুন্ডের জন্য । নাটগুন্ডে মানে আমাদের জি.এম। ভাবতে লাগলাম - ছেলেটা সবে ১২ ক্লাস পরীক্ষা দিয়েছে, কদিন পরে ওকে কলেজে ভর্তি করতে হবে। স্ত্রী কি করে এসব ঝামেলা সামলাবে ? এই বয়েসে বাচ্চাদের বাবার অবিভাবকত্ত্ব, খুব দরকার, এখনতো মায়ের কথায় ছেলেটা পাত্তাই দে না। নিশ্চই ছেলেটা  বকে যাবে।
দুর্গাপুর একটা ছোট্ট শহর, আধুনিক জীবনযাত্রার পক্ষে এটি সুবিধার নয়। কলকাতার বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে যেতে হবে। ওখানে নাকি মাওবাদীদের ঝামেলা।  শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া পাওয়া ঝামেলা, তাছাড়া বাড়িভাড়াও বেশী।   ঠান্ডা-গরম দুটোই  ওখানে খুব বেশী।ওখানে নাকি, বাতাসে কয়লার কনা ঘুরে বেড়ায়। ভবিষ্যতে টি.বি. নির্ঘাৎ।  এখন আমার বয়স ৫৫, এই বয়সে নতুন জায়গায় এডজাস্ট করতে আমার খুব অসুবিধা হবে।  ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কিছু ভাবতে লাগলাম। কিন্তু উপায় না থাকায়, নিমরস চিবোতে চিবোতে, ঈশ্বরের উপরে ভরসা করে, দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।  রাত নটায় ট্রেন পৌঁছনোর কথা পৌঁছলো রাত  বারোটায়। দুর্গাপুর চিনি না। ওই রাতে হোটেল খোঁজা অসম্ভব। ভগবানের কি অসীম কৃপা দেখুন, তাপস নামে  এক সহকর্মী বন্ধুকে খবর দিয়েছিলাম, ও ওখানকার ছেলে, সে হোটেল বুক করে, ওই রাতে স্টেশানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমাকে একটা রিক্সা করে দিয়ে, ও বাড়িতে চলে গেলো। এর পরে, খুব ভালো জায়গায়, খুব কম পয়সায় থাকার জায়গা পেয়েছি। অফিসের সবার সহযোগিতা পেয়েছি। অসংখ পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছে, নতুন বন্ধু পেয়েছি। ছেলেকে বর্ধমান ইউনিভার্সিটির - একটা কলেজে ভর্তি করাতে পেরেছি। চার বছর ছিলাম, কষ্ট হয়েছে, কিন্তু ভালো ছিলাম। সবাই সহযোগিতা করেছে , এখন মনে হয়, বাইরে আথিতিয়তা, আন্তরিকতা  অনেক বেশী। তাই কাল্পনিক ভায়ের ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন।

আমরা অনেকে ভাবি, ভাবনার উপরে আবার নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় নাকি ? ভাবনাতো এমনি এমনি আসে। আমাদের ভাবনা, আমাদের অনুভূতি এরা তো নিজেরাই নিজেদের চালক। তাদেরকে একটা কথা বলি, আমি ভালো আছি, এটা ভাবার চেষ্টা করে দেখুন, আর এটা ভাবলে, আপনি ভালো অনুভব করবেন, আর এ থেকেই আপনার ভবিষ্যৎ ভালোর দিকে যাবে। একটা শক্তিশালী ফ্রীকোয়েন্সি আপনার মধ্যে কাজ শুরু করবে। আর এটা প্রতিনিয়ত  অভ্যাস করলে, আপনার মধ্যে একটা আদত  তৈরি হয়ে যাবে, ভালো থাকার। এবং আপনি নিজেকে একটা নতুন ফ্রেকুয়েন্সিতে নিয়ে গেছেন বলে মনে হবে। সর্বদা একটা সুখের অনুভূতি সারাদিন ধরে রাখতে পারবেন। হোক না খারাপ ঘটনা, আপনি নিজেকে ভালো বাসুন, নিজের যেটা খারাপ লাগে, সেটাকে অবহেলা করে, উদ্দেশ্যমূলকভাবেই  আপনি ভালো থাকার কাজ চালিয়ে যান। যেকোনো ঘটনায়, কয়েক মুহূর্ত নিয়ে, নিজের ভেতরের দিকে ফোকাস করুন, আলো  ফেলুন, দেখুন-ভাবুন, আপনার অনুভূতিটা ভালো না খারাপ, যদি ভালো অনুভব না করেন,  তবে অন্তরের অনুভূতির উপরে, উদ্দেশ্যমূলক ভাবে, ভালো থাকার আলো ফেলুন।  ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত চোখ বুজে, অন্তরের অনুভূতির উপরে, সুখানুভূতির আলো ফেলুন। এটা প্রথমদিকে একটু কঠিন মনে হবে, কিন্তু পরে দেখবেন, অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এতে শুধু আপনি ভালো থাকবেন তাই নয়, আপনার বাঞ্ছিত  বস্তূ, আপনার কাছে আসতে  শুরু করবে। তাহলে আজ থেকেই শুরু করুন, ইচ্ছেশক্তির সাহায্যে ভালো থাকার খেলা ।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ - হরি ওম।

আজ আমরা ইচ্ছা শক্তির তৃতীয় পর্ব্বে প্রবেশ করবো। আমাদের পুরান কাহিনীতে , অনেক গভীর তত্ত্বকথা গল্পের আকারে বলা আছে । যাতে সাধারণ লোক বুঝতে পারে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষরা সেটাকে গল্প বলেই ভাবি। ভিতরের তত্ত্বকে বুঝতে পারি না। আপনারা পরশ পাথরের গল্প গুনেছেন, আলাদীনের  প্রদীপ-এর গল্প শুনেছেন। গল্পগুলো শুনে আমাদের ভালো লাগে, কিন্তু এগুলো যে সত্যি হতে পারে, সেটা আমরা জানি না। আলাদিনের প্রদীপের গল্পই ধরুন। আলাদিন, প্রদীপটা হাতে নিয়ে ঘষতো অমনি একটা জীন বেরিয়ে আসতো। বলতো, "প্রভু, বান্দা হাজির, আদেশ করুন, কি করতে হবে, আপনার ইচ্ছেই আমার কাছে আদেশ।"  এই যে ইচ্ছের কথা বলা হচ্ছে, এর কোনো সীমারেখা নেই।  যা ইচ্ছে তাই  চাইতে পারে আলাদীন ।  আর তা  পূরণ করে দেবে, এই জিনটি। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগে, আমরা ভাবি, হলেতো ভালোই হয়, কিন্তু এসব তো গল্প।  আর গল্পের গরু গাছে চড়ে । এমনটা যে সত্যিই হতে পারে, আজ সেই গল্প বলবো ।   শুধু বলবো না, প্রয়োগ করে দেখে নেবেন আপনারা ।

দেখুন, এই বিরাট মহাবিশ্ব , তার যে শক্তি, সেটার রূপ হলো ওই  জীন। অসংখ্যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তি কনায় তৈরি এই জিনের শরীর। একে আপনি অবতার বলতে পারেন, ঈশ্বরের দূত  বলতে পারেন, জীন বলতে পারেন । যে নামেই আপনি ডাকুন না কেন,  এটি আসলে আপনারই বৃহত্তর সত্ত্বা।  যে আপনার ভিতরেই আছেন, কিন্তু সুপ্ত ভাবে। তাই আমরা তাকে চিনতে বা জানতে পারি না। ইনি আমাদের সবকিছুই নজরে রাখছেন। ইনি আমাদের ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগকর্তা। ইনি কোনো প্রশ্ন করেন না, শুধু আপনার ভাবনার দিকে নজর রাখছেন। এই শক্তি ধরে নেয়, আপনি যা ভাবছেন, আপনি তাই চাইছেন। এই শক্তি কোনো প্রশ্ন করে না। আপনি যা ভাবেন, এই শক্তি, সঙ্গে সঙ্গে আপনার সেই  ইচ্ছে অনুযায়ী মহাবিশ্বে পরিবেশ ও ঘটনার মধ্যে দিয়ে, যন্ত্রচালিতের মতো ইচ্ছে পূরণ করে দেয়।

তাই আমাদের যেটা উচিত, সেটা হচ্ছে,  প্রথমত চাইতে শেখা। অর্থাৎ সঠিক ভাবনা। আপনি কি চান সেটা সম্পর্কে আপনি স্বচ্ছ, দৃঢ়, ও নিশ্চিত হন। তার পর অর্ডার দিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করুন, সন্দেহ প্রকাশ করবেন না, যে আপনার কথা ইচ্ছেশক্তি শুনেছেন  কি না। আপনি ধরুন, কোনো ক্যান্টিনে গেছেন, ক্যাটালগ দেখে খাবারের অর্ডার করেছেন, এখন খাবার গরম করতে, বা তৈরী করতে সময় লাগে, সেটুকু সময় অপেক্ষা করুন, বার বার জিজ্ঞেস করবেন না যে আমার অর্ডার নেওয়া হয়েছে কি না। আপনার কাজ শুধু অর্ডার করা আর অপেক্ষা করা। ইচ্ছেশক্তি আপনার কথা শুনলো কি না, সেই সন্দেহ যেন আপনার মনের মধ্যে না আসে। আপনি  শুধু নিজে  নিশ্চিত হোন, যে আপনার যা দরকার সেটা আপনি চেয়েছেন। এবং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন।

এর পরের  পদক্ষেপ হচ্ছে, বিশ্বাস করা। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, যে আপনি যা চেয়েছেন, তা আপনার জন্য এসে গেছে, আপনি এবার সেটা খাচ্ছেন, বা ব্যবহার করছেন। আপনি সেই খাবারের সুগন্ধ পাচ্ছেন।  বা আপনি যে জিনিষের অর্ডার করেছিলেন, সেটা আপনি পেয়ে গেছেন। এবং আপনি সেটা ব্যবহার করছেন। আমাদের আধ্যাত্মিক জগতেও এইরকম প্রথম দিকে একটা কল্পনা করার ব্যাপার আছে। সেটা হচ্ছে, আমরা যখন প্রথম প্রথম বিভিন্ন চক্রের উপরে ধ্যান শুরু করি, তখন চক্রের অবস্থান আমাদের কল্পনা করে নিতে হয়। পরবর্তীকালে, এইসব চক্রের সঠিক অবস্থান নিজে থেকেই  উপলব্ধি করা যায়।

একটা কথা বলি, এই বিশ্বের কোনোকিছুই আপনার বা আমার নয়।  সবই পরমপিতার, পরম-ঈশ্বরের। আমরা তার সন্তান।  তো আপনার পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আপনি। আপনি যেমন এগুলো ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি এ-সব কিছুতে, আপনারই একমাত্র অধিকার। এক্ষেত্রে আপনার কোনো যোগ্যতার দরকার নেই , কেবলমাত্র আপনি যে, পরম-পিতার সন্তান, আর  এই সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, সেটা আপনাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস  করতে হবে।

কিন্তু  কথা হচ্ছে, যা আপনি  সত্যি সত্যি পান নি, তা পেয়ে গেছেন সেটা কেন ভাবতে যাবেন ? দেখুন, আপনার মনে আপনি যে প্রতিচ্ছবি তৈরি করছেন, সেটা মহাবিশ্বের ইচ্ছাশক্তিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।  অর্থাৎ বিশ্ব-ইচ্ছাশক্তি হচ্ছে  আয়না।  আপনি যা ভাবছেন, তার প্রতিচ্ছবি সেই  আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে। আর আয়নায় যদি কিছুর প্রতিচ্ছবি পড়ে তাহলে জানবেন, বহির্বিশ্বে সেই ছবির অনুরূপ বস্তু অবশ্যই  অবস্থান করে থাকবে। আর আপনার কাম্য বস্তু তখন আপনার হাতের নাগালে।

আর একটা কথা বলি, আপনার ব্যাকুলতা বাড়াতে হবে।   ভগবান ব্যাকুলতা দেখেন , যোগ্যতা নয়। মানুষ কেন গরিব হয় জানেন, তারা চাইতে জানে না।  সে জানে, বা  সে ধরে নিয়েছে যে  তার বাবা গরিব, বাবা দিতে পারবে না। তাই সব সময় ভাবে, আমরা গরিব। আমাদের চাওয়া সাজে না। তাই  তারা গরিব  হয়েই  থাকে।

একটা ঘটনা বলি, আমার ছেলে তখন ছোট। পাড়ার কারুর সাইকেল দেখে, তার সাইকেল পাবার বাসনা হয়েছিল। আর  আমার কাছে, এইসব বায়না ছিল অহেতুক, বড়োলোকের খেয়াল। কেননা সাইকেল দিয়ে কি হবে ? বরং মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করুক, ভবিষ্যতে অনেক সাইকেল হবে। ছেলে চুপ হয়ে গিয়েছিলো। একদিন হঠাৎ দেখি, গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে ঘরের মধ্যে কি যেন  খুঁজছে। আমি বললাম কি হয়েছে বাবা ? বললো আমার সাইকেল কোথায়।  এইখানেই তো ছিল। আমি অবাক হয়ে গেলাম, আমি তো সাইকেল কিনে দেই  নি। পরদিন কি মনে হল, ও.ডি থেকে টাকা তুলে, অর্থাৎ ধার করে,  বেন্টিক স্ট্রিট থেকে ছেলের জন্য সাইকেল কিনে  নিয়ে এলাম। এখন মনে হয়, মানুষ যখন ব্যাকুল হয়, পরমপিতা তার সমস্ত ইচ্ছে পূরণ করেন।

আপনি যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে সেই পরিবারের সম্পত্তির উপরে আপনার অধিকার আছে। এখন আপনি  এই মুহূর্তে সেই সম্পত্তি পেয়েছেন কি না সেটা বড় কথা নয়, আপনি পাবেন, এই বিশ্বাস আপনার থাকা উচিত। এবং এই মুহূর্তেই আপনি অবশ্য়ই তার মালিক, এবং আপনি সে সব  ব্যবহারও করছেন। এই যে পিতার সম্পত্তিতে পুত্রের অধিকার আছে, এটা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে। দেখুন, এই আলো, এই বাতাস, এই জল, এই জমি এগুলো কোনো মানুষের নয়, এগুলো সব পরম-পিতার সম্পত্তি। আমরা ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছি মাত্র।

 এর পরেও যদি আপনার অবিশ্বাস থাকে তবে, অন্ততঃ বিশ্বাস করার ভান করুন। অভিনয় করুন, যেন আপনি সব পেয়ে গেছেন। আর এই ভান, বা অভিনয় করতে করতে আপনি একসময় গভীর ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন যে আপনি এগুলোর মালিক, আপনি সবকিছু পেয়ে গেছেন। আপনি পেয়েছেন, এই বিশ্বাস যখন আপনার দৃঢ় হয়ে গেছে, তখন দেখুন কি মিরাকেল ঘটতে চলেছে আপনার জীবনে। মহাবিশ্বের ইচ্ছাশক্তি, আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দেবার জন্য প্রস্তূতি শুরু করে দেবে। কি ভাবে আপনাকে দেবে, তা  আপনার জানার দরকার নেই। শুধু বলবো, সন্দেহ করবেন না। নিরাশ হবেন না।  হতাশ হবেন না। শুধু অনুভব করুন, আপনার কাঙ্খিত বস্তুর সাথে, আপনি মিলিত হয়েছেন। ঠিক সেই সময় একটা জিনিস ঘটবে, তা হচ্ছে আপনার ফ্রীকোয়েন্সিতে পরিবর্তন আসবে। এখানে বুদ্ধি কাজ করে না। এই খেলাটা আপনার ফ্রীকোয়েন্সির পারিবর্তনের খেলা।  নিজেকে ভালো অনুভূতির ফ্রেকুয়েন্সিতে রাখতে পারলেই, আপনি সফল।  আর কাঙ্খিত বস্তু আপনার হাতের মুঠোয় এসে যাবে ।

ওম শান্তি, শান্তি, শান্তিঃ - হরি ওম

আমরা এবার ইচ্ছাশক্তির চতুর্থ পর্ব্বে প্রবেশ করবো। কল্যাণীর এক ভদ্রলোক রামকৃষ্ণ মিশনের এক স্বামীজীর কাছে চিঠি লিখেছেন, "আমার ক্যানছার হয়েছে, ডাক্তারবাবু বলেছেন আমার আয়ু আর একবছর। আমি ভীষণ ভেঙে পড়েছি। কি করবো বুঝতে পারছি না। আমাকে কিছু উপদেশ দেবেন।" তো স্বামীজী, তক্ষুনি তাকে লিখলেন, আপনি তো তবু এক বছর বাঁচবেন, বলেছেন ডাক্তারবাবু। আমাকে কিন্তু কোনো ডাক্তার এক বছর  কেন একদিনও বাঁচার প্রতিশ্রূতি দেয়নি। আপনি ভাগ্যবান আরো এক বছর আপনি মানুষের সেবায় কাজ করতে পারবেন। ঈশ্বর মঙ্গলময়। আপনার মঙ্গল করুন। - ইতি ভবদীয়। ....

ভদ্রলোক এখন নেই, কিন্তু এই ঘটনার পরেও  ভদ্রলোক বারো বছর  বেঁচে ছিলেন। এবং মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

আমার এক সহকর্মী বন্ধু আছে, মোহনলাল তিওয়ারি,  তার কোমরের হাড়ে দু দুবার অপারেশন করতে হয়েছে। একবার পেটে জল জমে গিয়েছিলো।   ডাক্তার বাবু , মোটা সিরিঞ্জ দিয়ে জল বার করতেন। তো একবার হলো কি, জায়গা  মতো নিডল না ঢোকার জন্য, বার বার ফুটো করতে হচ্ছিলো। ডাক্তারবাবু অনুতাপের স্বরে বলেছিলেন, আপনার খুব কষ্ট  হচ্ছে তাই না , তার জবাবে মোহন বলেছিলো, না না - " you proceed, I am enjoying,আপনি করুন,  আমি উপভোগ  করছি, , এই ব্যাথা  আর কোনো দিন হবে কি না  জানিনা। আমাকে উপলব্ধি করতে দিন।  মোহনলাল এখন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। ভালো আছে।

আমার এক বন্ধু আছে, পবিত্র সরকার। আমি তখন কলেজে পড়ি, পবিত্র অসুস্থ হয়েছে। সাতদিন ধরে, পেটে ভীষণ ব্যাথা  । ঠাকুরনগর হাসপাতালের তৎকালীন ডাক্তারবাবু ডক্টর রমেন দাস, বললেন ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে দাও।  আমরা ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলাম। এক  দিন পরেই, ওর পেটব্যথা সেরে গেল। আমরা ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছিল ? ডাক্তারবাবু একটা আশ্চর্য্য কথা বললেন, কিছুই হয় নি। ওকে কোনো ওষুধও  দেই  নি।

আমার বাবা ডাক্তার ছিলেন। বাবাকে দেখেছি, যেকোনো রুগীকে উনি সব সময় আশ্বাসের বাণী শোনাতেন। বলতেন, কিছুই হয় নি। ভালো হয়ে যাবে। আমি তো আছি না - কি ? বহু লোককে বলতে শুনেছি ব্রজেন ডাক্তারবাবুর কাছে গেলে আমার অর্ধেক রোগ সেরে যায়।  কেন এমন হয় ?

এই রহস্যকে ধরবার চেষ্টা করবো আমরা।  আমাদের মধ্যে কিছু অন্তর্নিহিত সত্য আছে। আমরা যা ভাবি যা বিশ্বাস করি তাই হয়। রুগী যদি সত্যিই ভাবে ও বিশ্বাস করে, ট্যাবলেটে কাজ হবে তাহলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। ওষুধের সাথে মনের ভাবনা যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তবে তা আশ্চর্য্য ফল দেয়। আপনি এই মহাবিশ্বের অসীম শক্তিকে অনুভব করবার জন্য যদি নিজেকে উম্মুক্ত  করেন, তবে মহাশক্তি আপনাকে সব ভালো কিছু দেবার জন্য উন্মূখ হবে। আর নেতিবাচক ভাবনার আশ্রয় নিয়ে যদি নিজের দরজা বন্ধ করে রাখেন, তবে আপনি  অস্বাছন্দ  অবস্থাতেই থাকবেন। জীবন হবে যন্ত্রণাদায়ক, তা সে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই বলুন, আর আর্থিক দিক থেকেই বলুন। আমাদের অধিকাংশ  শারীরিক রোগ আমাদের নেতিবাচক ভাবনার ফল, আমাদের দুশ্চিন্তার  ফল। শরীরকে ভালো বাসুন, শরীরের সঙ্গে কথা বলুন। তাকে খানিকটা সময় দিন। শরীর  ও মনের পুষ্টির জন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখুন।

আমাদের দেহে যখন কোনো রোগের প্রকাশ ঘটে, আমরা যখন  অস্বাছন্দ অনুভব করি, তখন তাকে সঠিক ভাবনার ঔষধ দিয়ে, বদলে দিতে পারি। মজার সিনেমা দেখুন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচুন, মন খুলে হাসুন, এবং সঠিক ভাবনা, ভাবতে শিখুন সব ঠিক হয়ে যাবে।

ভগবান আমাদের শরীর তৈরি করবার সময়,  আমাদের শরীরের মধ্যেই শরীর সারাইয়ের প্রক্রিয়া করে রেখেছেন। আমাদের ছোটবেলায়, ছোটোখাটো আঘাত, বা ছড়ে গেলে কোনো ওষুধের সাহায্য নিতাম না। আমি অবশ্য এখনো নেই না। এমনি এমনি সেরে যেত। এখনো যায়।  সমস্ত রোগের  প্রতিরোধ করবার ক্ষমতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই আছে। আমাদের শরীর প্রতিমুহূর্তে লক্ষ লক্ষ কোষকে শরীর  থেকে বের করে দেয়, আবার লক্ষ লক্ষ নতুন কোষকে সৃষ্টি করে। আমাদের দেহ প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। আমরা প্রতিদিনই নতুন দেহ পাচ্ছি। তাহলে, যে সব কোষকে আমরা অসুস্থ ভাবছি, বা আমাদেরকে অসুস্থ করছে, তারা কি করে বছরের পর বছর  থাকতে পারে ? আসলে আমাদের ভাবনাই তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। আপনি সব সময় নিজেকে পূর্ন ভাবুন, অসম্পূর্ন ভাববেন না। ভগবান আপনাকে সামঞ্জস্য পূর্ন শরীর দিয়েছে, কিন্তু আপনি নিজেকে অপূর্ন ভাবছেন, তাই আপনি অসামঞ্জস্য হয়ে পড়ছেন।

বার্ধক্যও আমাদের ভাবনার ফল। আপনি আদর্শ স্বাস্থ্যের কথা ভাবুন, অনন্ত যৌবনের কথা ভাবুন।  ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে  দেখুন,  ১২৫ বছর  বয়সেও তাকে যুবক মনে হয়। বাবাজিকে ২৫০ বছরেও কিশোর মনে হতো ।

যারা সারাক্ষন রোগের  কথা বলে, তারা রুগী হয়েই থাকে। আপনার  রোগ সব ডাক্তারকে দিয়ে দিন, আর আপনি ভালো থাকুন। নিজে বলুন, আমি খুব ভালো আছি।  আপনি অনুভব করুন, আপনি মহাসুখী।  আপনি সেই সব ভাবুন, যাতে আপনি ভালো থাকেন। আমি পারবো না যারা বলে, তারা পারে না। আর যারা পারবে বলে, তারা পারে।  আজ নয়তো কাল, তারা পারবেই।

আমি তখন খুলনা মেসে থাকি, ১৮৫, বিবি গাঙ্গুলি  স্ট্রিটে। তো আমাদের সঙ্গে কালিদা থাকতো।  বড্ড খুঁতখুঁতে।আমি আর শ্যামল মিলে  ঠিক করলাম, লোকটাকে অসুস্থ করে তুলবো। অল্প বয়সের দুস্টুমি আর কি। আমাদের সঙ্গে একজন ডাক্তারবন্ধু ছিল, ও কলকাতা মেডিকেলে পড়তো।  তো তার কাছ থেকে আমরা  কতগুলো লিফলেট পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ লেখা থাকতো।আমরা  প্রতিদিন, একটা করে লিফলেট কালিদার টেবিলে রেখে দিতাম। এবং লক্ষ করতাম কালিদা সেটা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে । এবং পড়বার পর বিছানার তলায় লুকিয়ে রাখতো।  দুচার দিন পরেই লক্ষ করলাম, কালিদা ওই ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে তার অসুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা করছে। তার নাকি প্রেশার বেড়ে গেছে, সুগার দেখা দিয়েছে। বুকের মধ্যে ডীপ ডীপ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন । পাচ্ছে রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার অনুগামীরা সবাই বলছেন, আপনি মাকে  একবার বলুন না আপনাকে ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে  - আপনি যা বলেন, মা তো তাই শোনেন । ঠাকুর মাকে এই তুচ্ছ কথা বলতে পারেন নি।  ঠাকুর জানেন, মানুষ প্রারব্ধ ভোগ করার জন্য, জন্ম গ্রহণ করেন, ঠাকুর চাইতেন, মা আমাকে জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বৈরাগ্য দাও। ঠাকুর যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন।

আবার অন্যদিকে দেখুন, শাম্ব তার পিতা শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে যখন জানতে পারলেন, যে তার কুষ্ঠ হবে, তখন ভগবানের কাছে জানতে চাইলেন, আমাকে ভালো হবার উপায় বলে দিন। তো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে সরজু নদির তীরে, তপস্যা করতে বলেছিলেন, এবং তাই করে  সে ভালো হয়েছিল। তো আপনি যা চান তাই হবে, আপনি যা ভাববেন, তাই হবে।

আপনি যদি অন্যের অসুস্থতার কথা শোনেন, আপনার মধ্যে সেই ভাবনা আসবে, এবং আপনি কষ্ট  পাবেন। আর এতে, আপনার জীবনে সেই অসুস্থতাকেই ডেকে আনবেন। তার চেয়ে আপনি ওই ব্যক্তির সুস্থতার  কামনা করুন শক্তিশালী ভাবনা দিয়ে, সহাভূতি দেখান, তার পরে ভুলে যান। কোনো মানুষের কষ্টের বা অসুস্থতার প্রতি নজর দেবেন না, বরং তার সুস্থতার দিকে নজর ঘুরিয়ে দিন। ভালো থাকার এটাই নিয়ম।

আপনি যখন ভাবছেন, আপনার মধ্যে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে, আপনার স্নায়ুকেন্দ্রে বিশেষ ধরনের লালা নিঃসৃত হচ্ছে। আপনার শরীরকে নতুন করে সংগঠিত করছে, নতুন কোষের সৃষ্টি করছে। আপনার চারিদিকে কি হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, আপনার ভাবনাই আপনার ভিতরে পরিবর্তন করছে। সঠিক ভাবনা, অর্থাৎ আমি ভালো আছি, আমি সুস্থ আছি, আপনাকে  সুস্থ রাখবেই। মানুষ তাই হয়, যা সে ভাবে।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ

ওম পূর্নমদঃ পূর্নমিদং পূর্ণাৎ পূর্নম-উদচ্যতে ।
পূর্নস্য পূর্নমাদায় পূর্নমে-অবশিষ্যতে ।।
ওম শান্তি-শান্তি-শান্তিঃ।
ইন্দ্রিয়-অগোচর অপার্থিব-সূক্ষ্ম জগৎ এবং ইন্দ্রিয় গোচর  এই পার্থিব জগৎ উভয়ই বিশ্বশক্তিতে পরিপূর্ন। আর এই বিশ্বশক্তি হতেই তাবৎ সৃষ্টি পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়ে আছে। বিশ্বশক্তি থেকে এই সৃষ্টি হলেও বিশ্বশক্তি পূর্নরূপেই অবশিষ্ট আছে।

ইচ্ছে শক্তির পঞ্চম পর্ব।

আমি যখন চাকরিতে ঢুকি তখন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে দুটো কর্মচারী সংগঠন। একটি বামপন্থী।  যাদের স্লোগান ছিল - লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। আর একটি ছিল দক্ষিণপন্থী সংগঠন যাদের স্লোগান ছিল - হামকো যো টকরায়গা, চুড় চুড় হো যায়গা।
প্রত্যেক মানুষের প্রবণতা হলো, তার যা ভালো লাগে, সে তাই চায়। সে সুখ চায়, তাই সে সুখের কথা ভাবে। আবার সে অনেক কিছু চায় না। দুঃখ, লাঞ্চনা, দারিদ্র এগুলো সে চায় না।  এগুলো কি ভাবে দূর করতে হবে, তার কথা সে আরো বেশি করে ভাবে। সে যা চায়, তার থেকে বেশি মনোযোগ দেয় যেগুলো সে চায় না সেগুলোর প্রতি।
আমরা সর্ব্বক্ষন লড়াইয়ের জন্য তৈরী হয়েই আছি। আমরা রোগের বিরুদ্ধে, অভাবের বিরুদ্ধে, আতঙ্কের বিরুদ্ধে, হিংসার বিরুদ্ধে লড়াই করেই চলেছি। যা চাই না তার বিরুদ্ধে লড়াই করাটা যেন আমাদের একমাত্র কাজ। এই জন্যই যেন আমরা জন্ম গ্রহণ করেছি।
আর হচ্ছে ঠিক উল্টো। যা চাইছি না তাই বাড়ছে। হিংসা বেড়েই চলেছে, আতঙ্কবাদ বেড়েই চলেছে, হাসপাতালে রুগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।এমনকি রোগের  সংখ্যাও  বেড়েই চলেছে।  আমাদের অভাব বেড়েই চলেছে। আমাদের দারিদ্রতা বেড়েই চলেছে। তো যা  চাইছি না তাই বাড়ছে। আর যা চাইছি তার দেখা মিলছে না। অধর্মের যুদ্ধ করে কৌরব বংশ শেষ হয়ে গেছে, আর ধর্মের যুদ্ধ করে যদু বংশ শেষ হয়ে গেছে। দ্রৌপদীর মর্যাদা রক্ষায় যে অর্জুন অজেয় আখ্যা পেয়েছিলো, সেই অর্জুন  যদুবংশের নারীদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে নি। ভগবান রামচন্দ্র সীতামায়ের সতিত্ত্বে সন্দিহান হয়েছিলো, তাই রাজ্যের প্রজারাও সন্দেহ প্রকাশ করেছিল।   বিচিত্র এই জগৎ।  
আসলে ব্যাপারটা কি জানেন, আমরা যার কথা  বেশি  চিন্তা করি, আমরা তাকেই জন্ম দেই। আমরা যার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, আমরা তাকেই সৃষ্টি করি। আমরা যুদ্ধ চাই না, তাই যুদ্ধ হয়। আমরা লড়াই চাই না তাই লড়াই হয়।  আমরা দুর্ভোগ চাইনা, তাই আমাদের কাছে দুর্ভোগ আসে। আমরা যখন যার চিন্তা করি, তখন আমাদের সমস্ত শক্তি তার সঙ্গে যুক্ত করি, আর আমাদের সেই  অবাঞ্চিত বস্তুর শক্তি তখন বৃদ্ধি হয়ে যায়।
যুদ্ধ-বিরোধী কোনো আন্দোলন হওয়া উচিত নয়, গরিবী হঠাও কোনো আন্দোলন হতে পারে না। সন্ত্রাস বিরোধী কোনো আন্দোলন হতে পারে না। হিংসা-বিরোধী কোনো আন্দোলন হতে পারে না। কারন যা আমরা চাই না - এই আন্দোলন সেই জিনিসের উপরে আলোকপাত করছে। যা ছিল অজানা তাই জ্ঞানে এসে গেল। এবং শক্তিশালী হয়ে গেল।
তখন বামপন্থীদের রমরমা। তারাই সরকার চালাচ্ছে। তো SUCI একটা বন্ধ ডাকলো।  খবরের কাগজে তার কোনো প্রচার নেই। সাধারণ মানুষ কিছু জানে না।  তো সন্ধেবেলা বামপন্থীদের মিছিল বেড়োলো, বন্ধ  মানছি না মানব না। .... পরদিন দেখলাম সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। আমরা যা চাই না, তার প্রচার, তার প্রতি দৃষ্টিপাত, বা আলোকপাত করা মানে তাকে শক্তিশালী করে দেওয়া।
আমাদের মুখ্যমন্ত্রী জয় শ্রীরাম ধ্বনি শুনতে চান না। বাচ্চা ছেলেদের দিকে তেড়ে গেলেন। আর তখনই বিস্ফোরণটা ঘটলো, চারিদিকে জয় শ্রীরাম ধ্বনি শুরু হয়ে গেল।
আপনি যার বিরোধী তাকে উপেক্ষা করুন। আপনি যা চান তাই ভাবুন। বামপন্থীরা একবার যুদ্ধ-বিরোধী মিছিলে যোগ দেবার জন্য,  মাতা টেরেসাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মাতা টেরেসা বলেছিলেন, আপনারা শান্তির জন্য  মিছিল করুন, আমি থাকবো।
আসলে বিরোধিতা করা, সঠিক জীবন দর্শন নয়। আপনি যুদ্ধ বিরোধী না হয়ে শান্তিকামী হন। আপনি দারিদ্রতার বিরুদ্ধে লড়াই না করে, আপনি ধনী হবার  জন্য লড়াই করুন, নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে লড়াই নয়, স্বরাক্ষরতার সমর্থনে লড়াই হওয়া উচিত। আপনি যা হতে চান, তাই বলুন, যা হতে চান না তা ভাবতে যাবেন না। আপনি কাকে চান না, সেটা ভাববেন না, আপনি যাকে চান তার কথা ভাবুন। আমরা যদি খারাপ জিনিস থেকে মন সরিয়ে ভালো জিনিসে মনকে কেন্দ্রীভূত করতে পারি, তবে খারাপ জিনিস থাকতেই পারে না। সব খারাপ অদৃশ্য হয়ে যাবে। আপনি যেটা চান  না, সেটা কত খারাপ, সেটা কত ক্ষতিকর, ভয়ানক ইত্যাদি কথা  বললে তর্ক বেড়ে যাবে। আর সেই জিনিসই এসে যাবে। আপনার সেই খারাপ জিনিসের চিন্তা খারাপ জিনিসের শক্তিকে বাড়িয়ে দেবে। নেতিবাচক চিন্তা দিয়ে আপনি জগতের কোনো উপকার করতে পারবেন না। তাই আপনি দুনিয়ার খারাপ ঘটনার দিকে  মনযোগ  দেবেন, ততই খারাপ ঘটনার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ঘটে যাবে।
স্বামী প্রনাবন্দজী তার আশ্রমে একসময় কোনো খবরের কাগজ রাখতেন না, কারন উনি দেখেছেন, খবরের কাগজে প্রধান প্রধান খবরই নেতিবাচক। আর তা আশ্রমীদের  মধ্যে খারাপ প্রভাব বিস্তার  করবে। আশ্রমীদের মধ্যে কাউকে খবরের কাগজ পড়তে দেখলে বলতেন কাগজে কি আশ্রমের খবর আছে ? আপনার চারপাশে কি ঘটছে, সেটা কোনো কথা নয়, আপনি যা চান তার প্রতি আপনার শক্তিশালী ভাবনাকে  কেন্দ্রীভূত করুন। আর আপনার ভালো ভাবনা দিয়ে ভালো থাকার অনুভূতি দিয়ে জগৎকে বার্তা পাঠান। খবর রাখা এক জিনিষ আর খবরের দ্বারা  প্রভাবিত হওয়া অন্য জিনিষ। আপনি প্রভাবিত হবেন না, আপনি প্রভাবিত করুন। এই জগতে এক মহোৎসব চলছে, আপনি সেই মহোৎসবের সঙ্গে নিজেকে সামিল করুন।
এই পরিবর্তনশীল জগতে দুটো জিনিষ চিরকাল ছিল - আছে - থাকবে।  আর তা হলো সুতিকাগৃহ আর শ্মশান। জীবন এই দুইয়ের  মাঝখানে একটি প্রবাহমান নৌকার যাত্রী আপনি । যদি আপনার ভিতরে ভয়, লোভ, পরিপূর্ন হয়ে থাকে, আর না পাওয়ার বেদনা আপনার অভিজ্ঞতা হয়, তবে তো আপনি নিজেকে অভিশপ্ত মনে করবেন। আপনার ভিতর যে সৃজন-ভাবনা আছে ভালো বাসা আছে, প্রেম আছে তা আপনি জগৎকে বিলোতে থাকেন। আর যত আপনি বিলোবেন, তত যাবে বেড়ে। আপনি শত্রূদের  জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন, তাদের শুভবুদ্ধি দেবার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন, তাদের আশীর্বাদ করুন। তখন তারা আপনার কাছে ঘুরে আসবে আর মিত্র হয়ে যাবে। আপনার নেতিবাচক সমালোচনা ওদের অশুভ শক্তিকে শক্তি যোগাবে। আপনি ওদের যত প্রশংসা করবেন, তত ওরা  দুর্বল হবে, আর আপনিও নতুন ফ্রেকুয়েন্সিতে বাস করবেন, একটা ভালো লাগার অনুভূতিতে আপনার উত্তরণ ঘটবে।


চিত্রগুপ্তের খাতা বলে সত্যি কিছু আছে কি না আপনি-আমি জানিনা। আর সেখানে আমার-আপনার  ভাগ্যের কথা লেখা আছে কি না, তাও  জানিনা। এই মুহূর্তে আমরা  আছি।  কাল আমরা  থাকবো না। কিন্তু আমরা  কেন আছি, কিই বা করছি, সেটা ভবিষ্যতের কাউকে জানতে গেলে এই চিত্রগুপ্তের খাতার সন্ধান করতে হবে। চিত্রগুপ্তের খাতায় আমাদের  কথা কবে লেখা হয় ? আমার-আপনার  জন্মের আগে না পরে। আমরা শুনেছি, রাম  জন্মের আগে রামায়ন লেখা হয়েছিল। তার মানে জীবন শুরুর আগে জীবনী লেখা হয়।  আমার-আপনার  জীবন তেমনই হবে, যা সেই পরম-পুরুষ আগে থেকে রচনা করে রেখেছেন। তাহলে আবার বিচার কিসের ?  আর যদি ভবিষ্যতে লেখা হয় তবে আমরা  ভবিষ্যতের বিচারের কথা না ভেবে, এখন আপনার   জীবনে যা ইচ্ছে তাই আপনি করতে পারেন। আপনার জীবন খাতায়, যা কিছু লেখা আছে, অর্থাৎ চিত্রগুপ্ত যদি কিছু লিখে থাকেন, তা সব মুছে ফেলুন, আর আপনি যা ইচ্ছে তাই লিখে রাখুন। আপনি আগে কি করেছিলেন, সব ভুলে যান। আপনার জীবন এখন থেকেই শুরু হোক।  হ্যাঁ এখনই। আপনি আপনার আনন্দ খুঁজে নিন। এবং তাতেই জীবন কাটান।
আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে, বর্তমানকে কষ্টকর করে তুলি। আর সব সময় এটা হতে থাকে। বারবার ভেবেছি, এটা  করলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের সেই ভালো দিনটা আর আসে না।  মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। ছোটবেলায়, মা-বাবার শাসন - তারপরে মাস্টার-মহাশয়ের শাসন, তারপরে অফিসের বসের শাসন, বাড়িতে বৌয়ের শাসন, শেষদিকে ছেলের শাসন। বৌমার শাসন। আর প্রত্যেকেই বলেছে, এটা করলে ভালো হবে না। আর এখন শুনছি, আগে যদি  এটা করতে, তবে  ভালো হতো। এই সব করতে করতে, শুনতে শুনতে আমি হেজে গেছি। এখন ভাবি, আমার যা ভালো লাগে আমি তাই করবো। যাতে আমি আনন্দ পাই, আমি তাই করবো। যাতে আমি স্বাধীনতা পাই, আমি তাই করবো। যাতে আমি সুখে থাকি, আমি তাই করবো, আমি হাসতে  চাই। আমি যদি এক-ঘন্টা ধ্যান করে আনন্দ পাই, তবে আমি তাই করবো। যদি আমি নিরামিষ খেয়ে আনন্দ পাই তবে আমি তাই করবো। পোষা বিড়ালটাকে আমার স্ত্রী যখন আদর করে, দেখেছি সে আনন্দে থাকে। রাস্তার কুকুরটাকে যখন সে খাবার দেয়, তখন সে আনন্দ অনুভব করে। অর্থাৎ আমি যা চাই, তা যাতে আছে আমি তাই করবো। এবং তখন সেটাই হবে।
প্রত্যেকটি কাজে অন্তরের আনন্দ আমাদের  সাফল্য এনে দেয়। আনন্দহীন কাজ সাফল্য আনতে  পারে না। তাই আমি কাজ করবো, আনন্দের জন্য, আর এটাই সাফল্যের চাবিকাঠি। আপনি এখন আমার কথা শুনছেন,যদি আপনার ভালো লাগে তবেই শুনবেন, নতুবা বন্ধ করে দিন। আর যা ভালো লাগে তা খুঁজে বের  করুন। যা আপনার হৃদয়ের কথা, আপনি তাই শুনুন। আপনি নিজের জন্য যা বেছে নেবেন, সেটাই ঠিক। বেছে নেবার অধিকার আপনার, স্বাধীনতাও আপনার। আপনি শুধু আনন্দকে অনুসরণ করুন।
আপনি যদি আনন্দে থাকতে পারেন, অবিরাম একটা আনন্দময় জীবনের জগতে বাস করতে পারেন, তবে বিশ্বশক্তির আসল হৃদ্স্পন্দন আপনি অনুভব করতে পারবেন। হৃদয়ের সুর আপনি শুনতে পারবেন । এবং বিশ্বশক্তি আপনাকে প্রাচুর্য্যে ভরিয়ে দেবে। আপনি শুধু আনন্দকে অনুসরণ করুন, ভিড়ের পেছেনে দৌড়াবেন না, তবেই আপনার পেছনে ভিড় দৌড়োবে। বিশ্বশক্তি আপনার জন্য দুয়ার খুলে দেবে। একটা কথা আপনারা  শুনে থাকবেন। পরম-ঈশ্বর আনন্দময়, আপনিও সেই ফ্রীকোয়েন্সিতে থাকুন, যা আন্দময়, তাহলে পরম-ঈশ্বরের ফ্রীকোয়েন্সি আর আপনার ফ্রিকোয়েন্সি মিলে যাবে।
অনুষ্ঠান বাড়িতে গেলে দেখবেন, মেয়েরা মেয়েরা এক জায়গায় হয়ে যায়। পুরুষ-পুরুষ এক জায়গায় হয়ে যায়।  পুরুষের মধ্যে যারা রেলে  কাজ করে, তারা এক জায়গায় হয়ে যায়, আর যারা ব্যাঙ্কে কাজ করে তারা এক জায়গায় হয়ে যায়। কারন তাদের ভাবনা এক - আলোচ্য বিষয়ও এক। আপনি সেই ফ্রেকুয়েন্সিতে নিজেকে রাখুন, যা পরম-পিতা পরম-ঈশ্বরের ফ্রিকোয়েন্সি।  তাহলে আপনি সেই বিশ্বশক্তিকে অনুভব করবেন। এবং মহাবিশ্বের প্রাচুর্য্য আপনার কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আপনি যাতে উৎসাহিত বোধ করেন, আপনি যে কাজে আপনার আবেগ মেশাতে পারবেন, যে কাজ আপনাকে উদ্দীপনা দেবে,  আপনি সেই ভাবে, সেই কাজে নিযুক্ত রাখুন নিজেকে। যদি গান ভালো লাগে আপনি তাই করুন, যদি বই পড়তে ভালো লাগে আপনি তাই করুন। যদি বেড়াতে ভালো লাগে, তবে আপনি তাই করুন। আপনি আপনার নিজস্ব বাস্তবতায় বাস করবেন, কিন্তু এক ভিন্ন জগতে  নিয়ে যান মনকে।
এর পর আপনি দেখবেন, আপনার কাছে অসম্ভব বলে কিছু থাকবে না। একটা সীমাহীন মহাশূন্যে মনকে নিয়ে যান। একটা কল্পনার জগৎ তৈরী করুন, মনে করুন, যেখানে আপনার মনের অনুভূতি য আপনার ব্যবহারিক সম্ভাবনাকে ছুঁয়ে থাকে মনে মনে ভাবুন, আমি যা খুশি করতে পারি। যেখানে খুশি যেতে পারি, যা খুশি পেতে পারি।
আমরা সব সময় অসম্ভবের কথা ভেবেছি। ভালো রেজাল্ট করতে পারবো কি না।  ভালো চাকরি পাবো কি না। আমার স্ত্রী ভালো হবে কি না। আমার ছেলে ভালো হবে কি না। এইসব নেতিবাচক চিন্তা ছেড়ে দিন। আপনি সীমাহীন শক্তির অধিকারী। আপনি ভাবুন, আমি ভালো ছাত্র, আমার ভালো রেজাল্ট হবেই। আমি ভালো চাকরি পাবোই। আমি ভালো, তাই আমার স্ত্রী ভালো হবেই। আমি ভালো তাই আমার ছেলে ভালো হবেই।  সুস্বপ্নের ভালোর মধ্যে নিজেকে দেখুন।  আপনার ভিতরে অসীম শক্তি। আর এই শক্তির যত ব্যবহার করবেন, ততই আপনি নিজের ভিতরে তা অনুভব করবেন। আপনি সুখী হবার জন্য জন্ম গ্রহণ করেছেন। আপনি মানুষকে অনেককিছু দেবার জন্য জন্ম গ্রহণ করেছেন। আপনি আজ যা আছেন, তার থেকে আরো বড় কিছু, আরো ভালো কিছু হবার কথা আপনার। আপনি সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলুন। আপনি আপনার ভাগ্যের স্রষ্টা। আপনি কি করবেন, কি হবেন,তা আপনিই ঠিক করবেন। আপনি ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য।
দরকার শুধু ভাবনার পরিবর্তন করা। ব্যাস তারপর দেখবেন , আপনার জীবনে মিরাকেল এসে যাবে। ভাবতে শুরু করুন, দুনিয়ার সব থেকে বড় শক্তি আপনার ভিতরে। সেই সবাইকে পুষ্টি যোগাচ্ছে, সেই আপনাকে আচ্ছাদন দিচ্ছে, সেই আপনাকে রক্ষা করছে, সেই সমস্ত অস্তিত্ত্বকে রক্ষা করছে। সেই একই শক্তির  নির্দেশেই সূর্য্য আপন কক্ষপথে ঘুরছে। তার নির্দেশেই বাতাস বইছে। তার নির্দেশেই পৃথিবী আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। চারিদিকে যাকিছু, ভালো, যাকিছু সুন্দর, সবই আমার অপেক্ষা করছে। আপনি আগে যা ভেবেছেন, আপনি এখন তাই হয়েছেন। আপনি এখন যা ভাবছেন, ভবিষ্যতে আপনি তাই হয়ে যাবেন। বিশ্বপিতার সন্তান আপনি। এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আপনি। আপনি পূর্ন, আপনি আনন্দ, আপনার মধ্যে নিরানন্দ কৃত্তিম, আপনার মধ্যে অপূর্নতা কৃত্তিম। আপনি আনন্দময় সত্ত্বার  সন্তান। আপনি পূর্ণের  বংশধর। মানুষের সন্তান তো মানুষ হয়। ঈশ্বরের সন্তান ঈশ্বরই হয়।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ। হরি ওম।


Tuesday, 25 June 2019

সংস্কার রহস্যঃ


সংস্কার রহস্যঃ

আমরা সবাই সংস্কার বদ্ধ জীব। পূর্ব্ব জীবনের সংস্কার নিয়ে আমাদের এই জীবন শুরু করেছি। হাঁস জন্ম থেকেই সাঁতার কাটতে শুরু করে দেয়। গাভীবৎস জন্মের কিছক্ষন পরেই, হাটতে শুরু করে দেয়। এগুলো নাকি সবই তাদের  পূর্ব্ব জীবনের সংস্কার। মনুষ্য শিশু জন্ম থেকেই নাকি  মায়ের দুধ খোঁজে। কি অদ্ভুত। কিন্তু সংস্কার ব্যাপারটা কি ? কিভাবে এই সংস্কারের জন্ম হয় ? সংস্কার কিভাবে আমাদের প্রতি প্রভাব খাটায় ? সংস্কার কোথায় থাকে ? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন নিয়ে আজ আমরা শুনবো। 
প্রথমে শুনবো সংস্কার কাকে বলে ? 
সংস্কার আর কিছুই নয়, সংস্কার হচ্ছে আমাদের স্মৃতি, বা আমাদের কর্ম্ম থেকে উদ্ভুত  অভিজ্ঞতার ছাপ, যা আমাদের মনে গেথে রয়েছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরুন, আপনার জন্ম দিনে আপনাকে আপনার মা পায়েস খেতে দিলেন । আপনি খেলেন, মাকে প্রণাম করলেন, তার পরে কাজে বেরিয়ে গেলেন। অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সাময়িক ভাবে, এই  ঘটনার কথা ভুলেও  গেলেন। কিন্তু সত্যিই কি ভুলে গেলেন ? 

পরের বছর, জন্ম দিনে আপনি বদলি হয়ে বোম্বে চলে গেছেন। জন্ম দিন এলো, অফিসের সবাই আপনাকে মিষ্টি বা কেক খাওয়ালো। যখন এই ঘটনাটা  ঘটেছিলো, তখন আপনার মনে, মায়ের কথা মনে পড়ছিলো, পায়েসের কথা মনে পড়ছিলো। মায়ের মুখখানা মনে পড়ছিলো। আপনার মনে তখন এক বিশেষ ধরনের অনুভূতি বা তরঙ্গ বা বৃত্তি  উঠছিলো। কেন এমন হয় ?

আসলে, মায়ের পায়েস খাওয়ানো, আশীর্বাদ, ইত্যাদি যখন ঘটেছিলো তখন আপনার মনে এক ভালোলাগার অনুভূতি বা আপনার গ্রন্থি চক্রে এক তরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল। এই তরঙ্গ উঠেছিল আপনার  চেতন স্তরে বা উর্দ্ধতন মস্তিষ্কে। এর পরে আপনি অন্য কাজে চলে যান। তখন অন্য চিন্তা আপনার আগের তরঙ্গকে চেতন স্তর  থেকে অবচেতন স্তরে বা নিম্নতর মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দিয়েছে। এবং তখন  সেটা স্মৃতিতে পরিণত হয়ে গেল। পরে কোনো কারণে  পরবর্তী জন্মদিনে অর্থাৎ অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে স্মৃতির স্তর থেকে অর্থাৎ অবচেতন মনের স্তর থেকে চেতন মনের স্তরে উঠে এলো।

এই ধরনের অসংখ্য স্মৃতি বা সংস্কারে ভরা  আমাদের মন। এই সংস্কারের দুটো দিক একটা ভাবগত, আর একটি বস্তুগত। পায়েসের স্মৃতি বস্তুগত।  আর মায়ের সান্নিধ্য স্নেহ-আচরণ ভাবগত। 

সংস্কার কি ভাবে কাজ করে ? 
সংস্কার নিজে থেকে কোনো কাজ করতে পারে না। এর জন্য দরকার আমাদের ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি আবার কাজ করে, আমাদের ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। এই ভাবনার মধ্যে  একটা বিশেষ রূপ হচ্ছে বাসনা। দেশের বাড়ি যাচ্ছি। স্টেশনে নেবে হাটছি, হঠাৎ দেখি মাধবমামার মিষ্টির দোকান। এক সময় এখানে মিষ্টি দই আর রসোগোল্লা মিশিয়ে খেতাম। সেই স্মৃতি ভেসে উঠলো মনে, মাধবমামার দোকান দেখে, এই মুহূর্তে আমার চেতন স্তরে মাধবমামার দোকান, সেখানে তরঙ্গ উঠতেই, আমার অবচেতন স্তর থেকে, পুরোনো দিনের সেই স্মৃতি ভেসে উঠলো। এই হলো সংস্কারের ক্রিয়া। এখন আমি কি করবো ? যদি আমার ইচ্ছা প্রবল ইচ্ছা হয়, তবে আমি মাধব মামার দোকানে ঢুকতে পারি। দই-মিষ্টি খেতে পারি। এই যে তীব্র ইচ্ছা একেই বলে বাসনা। এখন আমার ইচ্ছাশক্তি যে দিকে ঝুঁকবে, অর্থাৎ যদি বাসনার দিকে ঝোকে, তবে আমি মামার দোকানে ঢুকবো। এইসময় কোনো কোনো সময় ঢুকে পড়ে বিবেক, বিবেক বলতে থাকে, এখন  মিষ্টি খাবার সময় নয়। এই বয়সে মিষ্টির প্রতি লোভ ভালো নয়। ...ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আর আমি মিষ্টির দোকানে ঢুকবো না।  তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, সংস্কার হচ্ছে পূর্ব্ব স্মৃতি।  আর বাসনা হচ্ছে, একটা শক্তি, যা আমাদের কর্মে, বা লক্ষ্যপূরণে  উদ্দীপ্ত করে। স্মৃতি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত।  আর বাসনা বর্তমান উদ্যোগের জননী, যা আমার ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। অর্থাৎ আমাকে সুখ বা দুঃখ ভোগ করাবে। 

অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা আমাদের সংস্কারকে বদলাতে পারি। যেমন খাওয়ার পরে, আমার একটু দুধ খাওয়া আমার অভ্যাস। এখন খাওয়ার পারে, যদি দুধ না পাই পেট ভরে গেলেও আমার মন  খুঁত খুঁত করে।  বা খাওয়ার পরে, একটা সিগারেট খাওয়া আমার অভ্যাস বা সংস্কার।  সিগারেট না খেতে পারলে, কেমন যেন একটা নাই নাই ভাব। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে, অর্থাৎ , যেখানে আমি দুধ পাই না। বা  আমি যখন পাহাড়ে যাই, সেখানে আমি দুধ পাই না, আবার আশ্রমে সিগারেট নিষিদ্ধ ।  সেখানে আমি মাসের পর মাস দুধ না পাবার জন্য, দুধ না খেয়েই থাকি। সিগারেটটাও বন্ধ থাকে।   তাতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু আবার যখন বাড়িতে আসি, আমি আবার দুধের ভক্ত হয়ে যাই। সিগারেট খেতে শুরু করি।  তাই অভ্যাস ও ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে, সংস্কার থেকে উদ্ভূত বাসনাকে যেমন বাড়ানো যায়, তেমন কমানো যায়। আশ্রমে বেশিরভাগ সময় শাস্ত্র আলোচনা, ধ্যানধারণা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। খাবার ব্যাপারটা তখন গৌণ। তা সে দুধ বলুন বা সিগারেট। তখন মনেই হয় না, যে এগুলো দরকার।  আসলে তখন আমার স্নায়ু তরঙ্গে অধ্যাত্ম্যিকতার ঢেউ, বা বলা যেতে পারে, ভালো সংস্কার, খারাপ সংস্কারকে চেপে রেখেছে। আর যদি ক্রমাগত এই অভ্যাস রপ্ত করা যায়, তবে ভালো সংস্কারগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর খারাপ সংস্কারগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। 

ঠিক একই ভাবে আমরা বাসনাকেও দুর্বল করে দিতে পারি। বাসনার সঙ্গে সংস্কারের একটা সম্পর্ক আছে। বাসনা না জাগলে যেমন সংস্কার কোনো কাজ করতে পারে না, তেমনি আমাদের সংস্কার যতই ভালো বা খারাপ হোক না কেন, বাসনার গুনগত পরিবর্তনের  মাধ্যমে আমরা আমাদের  শুভ সংস্কার গড়ে তুলতে পারি।

সংস্কার কি ভাবে গড়ে ওঠে ?
আমাদের প্রত্যেকটি কাজ, তা সে আমি নিজে থেকেই করি, বা অন্যের নির্দেশে করি, সবই আমাদের মনে একটা ছাপ ফেলে। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই আমাদের সংস্কার তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। একটি শিশুর মা-বাবা যখন  তাকে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে বড়  করে তোলেন,  তখন তাকে ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পারিবারিক রীতি নীতি, পারিবারিক ধর্মীয় বিশ্বাস, দেশাচার, দেশের নীতি বা আইন ইত্যাদি সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে দেন। এর পরে, যখন সে স্কুল কলেজে পড়াশুনা করতে গেল, সেখানেও সে কিছু জ্ঞান ও আদবকায়দা শিখলো। এগুলো তার মনে গভীর ছাপ তৈরী করে দিলো। এছাড়াও, তার নিজের বিচারবুদ্ধি, রুচি-অরুচি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আশা-আকাঙ্খা এসবই তার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। এই ভাবেই একটা মানুষের ব্যক্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে। একজন ব্যক্তি মানুষের দুটি সত্ত্বা।  একটা তার বিশ্বাস আর একটা তার অভ্যাস। আর এ দুটো জিনিসই তার কর্ম্মকে প্রভাবিত করে। তার খাদ্যাভ্যাস, তার ধর্মীয় বিশ্বাস, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা মত, দেশাত্ত্ববোধ ইত্যাদির অধিকারী হয়ে,  সে পরিণত হয়  এক স্বতন্ত্র মানুষে।   আবার বিশেষ পেশায় যখন সে আসে, সেই পেশাও তাকে তার ব্যক্তিত্ত্ব গড়ে তুলতে প্রভাবিত করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে যেমন সংস্কার-আবদ্ধ মানুষে পরিণত হয়ে যায় তেমনি, সে একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ হয়ে দাঁড়ায় । তখন, যা কিছু তার গোচরে আসে, তাকে সে তার পূর্ব্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিচার করতে চায়। একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সে সব কিছুর বিচার করে। এইটাই বদ্ধ জীবের লক্ষণ। সব ঘটনাকে, সব মানুষকে সে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করতে আরম্ভ করে। এখন সে আর শিশুদের মতো প্রশ্ন করে না, জানতে চায় না, ঘটনার বিচার করতে শুরু করে দেয়। আসলে সে এখন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়।  জীবন সম্পর্কে সে তখন একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নিয়েছে। কোনটা প্রয়োজনীয়, আর কোনটা অপ্রোজনীয়, সেটা সে তার নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছে। এইভাবে সে তার অভ্যাস ও বিশ্বাসের আবর্তে বাধা পরে যায়। মন  তখন তার অভ্যাস আর বিশ্বাসে ভরে গেছে।  নতুন কিছু আর তাকে আকর্ষণ করে না। নতুন চিন্তা বা উদার চিন্তা উদার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে আর আকর্ষণ করে না। এখন সে নিজেকে আমি বলে ভাবতে শুরু করেছে। এইযে আমি বা অহং, এগুলো সংস্কারের প্রভাব। আমি এবং আমার সংস্কার তখন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাই আমরা যাকে  "আমি" বলি সেগুলো হচ্ছে আমাদের সংস্কার, আমাদের অভ্যাস, আমাদের বিশ্বাস, ইত্যাদির একটা মিশ্রণ মাত্র। আমরা যে চেতন সত্ত্বা তা আমরা একদম ভুলেই গেছি। 

এখন  আমরা আলোচনা করবো, সংস্কার কি ভাবে আমাদের এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে প্রবাহিত হয়। সেখানে তো আমাদের নতুন দেহ তৈরি হয়।  নতুন মা-বাবা পাই। নতুন পরিবেশ পাই। তাহলে গত জন্মের সংস্কার আমাদের কি ভাবে প্রভাবিত করে ? 

এটা বুঝতে গেলে আমাদের এই পঞ্চভূতের দেহের বিনাশের পরে, কি হয় সেটা একটু সংক্ষেপে বুঝে নিতে হবে । আমাদের তিনটি দেহ।  স্থুল, সূক্ষ্ম, ও কারন।  স্থূল দেহ পঞ্চভূতের তৈরি। আমাদের দেহের মৃত্যুর পরে, এই দেহ, পঞ্চভূতে বিলীন  হয়ে যায়। বাকি থাকে সূক্ষ্ম দেহ ও কারন দেহ। সুক্ষ দেহ অর্থাৎ মানস দেহও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলোপ প্রাপ্ত হয়। বাকি থাকে কারন দেহ। এই কারন দেহের বিলোপ হয় না।   এই কারন দেহই সংস্কারের মূল আধার। অর্থাৎ আমাদের কর্ম্ম অভিজ্ঞতা স্থূল দেহ থেকে  সূক্ষ্ম দেহে এবং সূক্ষ্ম  দেহ থেকে কারন দেহে স্থানান্তরিত হয়। বার বার জীবের জন্ম গ্রহণের ফলে, জীবের যত অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল, পুনর্জন্মের সময় এই কারন দেহ তা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। মানসলোকে এসে জীব নতুন মানসদেহ ধারণ করে। সুতরাং আগের মানসদেহে  যেসব  অভিজ্ঞতা বা সংস্কার সঞ্চিত ছিল নতুন মানসদেহে সে সব কিছুই থাকে না। অর্থাৎ নতুন  মানস দেহে পূর্ব্ব স্মৃতি কিছুই থাকে না। এই মানসদেহ সম্পূর্ণ নতুন উপকরণে তৈরি। কিন্তু কারন দেহ চিরস্থায়ী। সেখানে সকল স্মৃতি সঞ্চিত থাকে। জীব যখন নতুন দেহ ধারণ করে,তখন সেই একই কারন দেহ বর্তমান থাকলেও মানস দেহ ও স্থূলদেহ নতুন হওয়ায়  এবং জীবের জ্ঞান স্থুলে নিবদ্ধ হওয়ায়, অতি সূক্ষ্ম কারনদেহের স্পন্দন তার মস্তিষ্কে কোনো ক্রিয়া উৎপন্ন করতে পারে না। সেজন্য তার মনে কোনো পুরোনো স্মৃতি উদয় হতে পারে না। 

কিন্তু যে সব সংস্কার আমরা আমাদের কারন দেহের  সঙ্গে করে এই জগতে নিয়ে এসেছি, সেগুলো আমাদের অজ্ঞাতসারে অনুভব করে থাকি। অনেক সময়, আমাদের পূর্বজন্মের বাঞ্ছিত  বস্তুর কথা আমাদের  স্মরণে আসে। আবার বিশেষ গুনের স্বল্প স্বাধ্যায়ে সংস্কারের সাহায্যে সেই গুনের উন্মোচন ঘটে অত্যধিক মাত্রায়। এগুলো সবই আগের জীবনের কর্ম-অভিজ্ঞতার  জন্যই হয়ে থাকে।  ধ্যান সাধনার সাহায্যে যে সব মহাত্মা, এই সুক্ষ ও কারন দেহের উপস্থিতি অনুভব করেন, তারা তাদের পূর্ব জীবনের কথা জানতে ও বলতে পারেন। যেমন জানতেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান বুদ্ধ ইত্যাদি মহাপুরুষেরা।  

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ - হরি ওম  















   




















       

  
























  





























       

Sunday, 23 June 2019

সাধন - আমরা কেন পুতুল পুজো করি ?

সাধন - পথ সাকার না নিরাকার ? আমরা কেন পুতুল পুজো করি ?

 গীতায় দেবকীনন্দন শ্রীকৃষ্ণ তিন/চারটি ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।   গীতার প্রারম্ভে তিনি অর্জুনের সখা। তারপরে গুরু, তারপরে স্বয়ং ভগবান। প্রথম ও শেষ অবধি  তিনি ছিলেন, সারথি। মহামুনি ব্যাসদেব অর্জুনের মুখ দিয়ে নানান সন্দেহ, প্রশ্ন, ছুড়ে দিয়েছেন, শ্রীকৃষ্ণের কাছে। যে সব প্রশ্ন আমাদের সবার, এবং সর্বকালের। এইরকম একটি অসাধারন প্রশ্ন করছেন অর্জুন । বলছেন :   

যে ভক্ত তোমাতে সততযুক্ত হয়ে তোমার (রূপের) উপাসনা করে, আর যারা তোমার অব্যক্ত অক্ষর রূপের সাধনা করে, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ট যোগবিদ কে ? অর্থাৎ সাকারের উপাসনা ভালো না নিরাকারের উপাসনা ভালো ? আর এই প্রশ্নটি করেছেন তখন, যখন অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখানো হয়ে গেছে।  

ভগবান তার উত্তরে বলছেন :
যারা আমাতে মন নিবিষ্ট করে, আমাতে নীতিযুক্ত হয়ে আমার উপাসনা করে, আমার মতে  তারাই শ্রেষ্ট। অর্থাৎ সাকারের উপাসনা ভালো। এবং সেটা একমাত্র আমার, অর্থাৎ পরম-পিতার পরম-ঈশ্বরের।  

শ্রীকৃষ্ণ গীতার প্রারম্ভে বলেছেন ঈশ্বর  অব্যক্ত। এই অব্যক্ত ঈশ্বরের কথা পুরাতন ব্রহ্মবিদগণও,  বলে গেছেন।  বেশিরভাগ বিশ্ববাসী বলেন, ঈশ্বর নিরাকার, নিরালম্ব, নির্বিকার, অব্যক্ত ।   তো যারা অব্যক্ত পরম-ঈশ্বরের সাধনা করছে, তাদের থেকে মনুষ্যরূপী শ্রীকৃষ্ণের সাধনা করা, কি করে শ্রেষ্ট হয়। এবং আমরা এও দেখতে পাই, সারা ভারতবর্ষে, এমনকি ভারতবর্ষের বাইরেও মূর্তিপূজার প্রচলন আছে। 

আমরা আজ এই প্রশ্ন-উত্তরের আলোচনায় যাবো।  
ভগবান যে জবাব দিয়েছেন -  অর্থাৎ যারা আমাতে মন নিবিষ্ট করে, আমাতে নীতিযুক্ত হয়ে আমার উপাসনা করে, আমার মতে  তারাই শ্রেষ্ট।
এই কথাটার দুটো অর্থ হতে পারে। প্রথমতঃ - পরম-ঈশ্বর নিরাকার। মানুষ ভগবানেরই অংশ বিশেষ। মানুষই ভগবানের শ্রেষ্ট সৃষ্টি। তো মানুষ যদি মানুষের প্রতি মনোনিবেশ করে, তার সেবা যত্ন করে , মানুষের উন্নতির জন্য চেষ্টা করে তবে সত্যিকারের ঈশ্বরের আরাধনা করাই হবে। আর একটা কথা হচ্ছে, আমাতে মন নিবিষ্ট করো।  অর্থাৎ যে কেউ যদি নিজের মধ্যে অর্থাৎ স্বয়ং-দিকে আত্ম জ্ঞান লাভের চেষ্টা করে, তবে সে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবে।

অন্য একটা দিক হচ্ছে   
আমরা জানি  সাধন পদ্ধতি দুই প্রকার - দ্বৈতবাদ আর অদ্বৈতবাদ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দ্বৈতবাদের আবিস্কারক। শ্রীকৃষ্ণ একদিকে বলছেন ঈশ্বর অব্যক্ত, আবার বলছেন : যারা আমাতে মন নিবিষ্ট করে,আমাতে নিত্যযুক্ত হয়ে ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে আমার উপাসনা করে, তারাই শ্রেষ্ট। এখন কেন  শ্রেষ্ট ? প্রশ্ন এখানেই। একজন জ্ঞানী, যিনি নিরাকার ব্রহ্মের  সাধনা করেন, আর এক জন  ভক্ত যিনি আকারের সাধনা করেন, এর মধ্যে শ্রেষ্ট কে ?  

অষ্টাবক্র তার সংহিতায় ব্রহ্মজ্ঞানী সম্পর্কে এক জায়গায় বলছেন :

নির্বাসন নিরালম্বঃ স্বচ্ছন্দো মুক্তবন্ধনঃ। 
ক্ষিপ্তঃ সংস্কারবাতেন চেষ্টতে শুস্কপর্নবৎ।।

অর্থাৎ বাসনারহীত, কর্তব্যবুদ্ধিবিহীন, রাগদ্বেষের অনধীন বন্ধনহেতু অজ্ঞানশূন্য জ্ঞানী প্রারবদ্ধকর্মরুপ বায়ুদ্বারা প্রেরিত হয়ে পবন-সঞ্চালিত শুস্কপত্রের ন্যায় কর্ম প্রচেষ্টা করে থাকেন। 

তাহলে ভাবুন তো এই ব্রহ্মজ্ঞানী কেমন আছেন। ব্রহ্মবিদ তো জড়বৎ। তার না আছে দুঃখ না আছে আনন্দ।  না আছে কর্তব্যকর্ম। না আছে দ্বেষ, না আছে রাগ, না আছে মমতা, না আছে স্নেহ।  উনি কাঁদেন না, হাসেন না।  অথবা ওনার হাঁসা-কাঁদার সাধারণ মানুষ কি বোঝে ? ওনার থাকা না থাকা সমান। উনি স্ব -স্বরূপে স্থিত। 

তাহলে ব্রহ্মজ্ঞানী হতে সময় লাগে, আর তার পরে যা হয় তা আর  কোনো কম্মে লাগে না। তাহলে অদ্বৈতপথে এই ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে কি লাভ ? যার দেহ জ্ঞান থাকে না। 

এবার  আমরা সাকার সাধনা আর নিরাকার সাধনার পার্থক্যটা একবার আমরা বুঝে নেই। 

ঈশ্বর নিরাকার, নির্গুণ, অব্যক্ত, অব্যয়, সর্বত্র। 

ঈশ্বরকে কি দেখা যায় ? কিভাবে দেখা যায় ? ঈশ্বর কি আকার নেয় ?

ঈশ্বরকে অবশ্যিই দেখা যায়। কিভাবে ঈশ্বরকে দেখা যায় না,  সেটা আগে ভাবুন।  তবেই ঈশ্বরকে দেখতে পারবেন। ঈশ্বরকে না দেখার কোনো উপায় নেই। বরং ঈশ্বরকে দেখতে না পারাটাই আশ্চর্য্য। ঈশ্বর অবশ্যই  আকার নেন।  আপনি যেমন তাকে দেখতে চান, তেমন ভাবেই তিনি আপনাকে দেখা দেবেন। আপনি দেখছেন কিনতু সনাক্ত করতে পারছেন না।  তাই ভাবছেন আমি দেখতে পারছি না। আসলে ঈশ্বর আপনি, আপনার ভিতর, বাহির, সর্বত্র যা কিছু দেখছেন সবই ঈশ্বর। তবে আমি দেখছি না, এটা কত বড়ো ভুল, বুঝতে পারছেন ? ঈশ্বর-সমুদ্রের মধ্যে বুদ্-বুদ্ আমরা ।  এখানেই জন্ম, এখানেই লয়। মানুষের শরীরের  মধ্যে যেমন অসংখ্য কোষ, আমরাও  তেমনি ঈশ্বরের বিরাট শরীরের কোষ মাত্র।  ঈশ্বরের শরীরেই জন্ম, ঈশ্বরের শরীরেই মৃত্যু। যতদিন বাঁচি, ঈশ্বর থেকেই খাদ্য সংগ্রহ করি, বা ঈশ্বরই  খাদ্য যোগায়। এক সময় ঈশ্বরেই লয়  প্রাপ্ত হই, আমরা সবাই । আমি বা অহং বলে কিছু নেই।  এগুলো  আসলে মন-বুদ্ধির খেলা। মন বুদ্ধির ওপারে আমি বলে কিছু থাকে না।

নিরাকারই সাকার হয়।  আবার সাকার থেকে নিরাকার। জলের তিন রকম অবস্থা। বায়বীয়, তরল, কঠিন। তাপমাত্রার তারতম্যে এই প্রকারভেদ।  বায়বীয় জল সর্বত্র। তরল জল নদী, নালা, পুকুরে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পৃথিবীর মধ্যেও পাওয়া যায়। কঠিন জল আমরা বরফের আকারে দেখতে পাই। বায়বীয় জল আমাদের ভোগ্য বস্তু নয়। কঠিন জলের আইচক্রীম খাই, তরল জলে তৃষ্ণা মেটাই। বায়বীয়  জলে আমাদের তৃষ্ণা মেটায় না।  বাহ্যিক কোনো কাজ বায়বীয় জলে আমাদের হয় না। অর্থাৎ নিরাকারে আমরা আনন্দ পাই না। কোনো কাজে লাগে না। তৃষ্ণা পেলে, হা করে থাকলে বায়বীয় জল, আপনার তৃষ্ণা মেটাবে না  ? তাহলে বায়বীয় জল সত্য কিনতু আনন্দ দেয় না। তাই ঈশ্বর সাধনায় যদি আনন্দ পেতে চান তবে সাকারের সাধনা করুন। 

নিরাকারের শক্তি সাকারের মধ্যেই প্রকাশ পায়। আকাশের একটা গুন্ - শব্দ, বাতাসের দুটো গুন্  - শব্দ, স্পর্শ। আগুনের তিনটি গুন্ শব্দ, স্পর্শ, রূপ। জলের চারটি  গুন্ -শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস।  মাটির পাঁচটা  গুন্ - শব্দ, স্পর্শ, রূপ,রস, গন্ধ।  তাহলে দেখতে পাচ্ছেন, নিরাকার থেকে সাকারের দিকে যত  যাচ্ছে তত তার গুন্ বেড়ে যাচ্ছে। এবং আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো এই গুন্ গুলো থেকেই জ্ঞান সংগ্রহ করছে। কান দিয়ে আমরা শব্দ  শুনছি। চোখ দিয়ে আমরা রূপ দেখছি। নাক দিয়ে আমরা গন্ধ শুঁকছি। মুখ দিয়ে আমরা রসের আস্বাদন করছি। ত্বক দিয়ে আমরা স্পর্শ করছি। এ সবই  আমাদের সুখ ও দুঃখের আস্বাদন করাচ্ছে। এ থেকেই আমরা সুখ দুঃখের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছি আমাদের অজ্ঞাতসারে। দৈহিক সুখ দুঃখের কারন এই ইন্দ্রিয়গুলো। 

আপনি আগুন চান। আগুন পেতে গেলে আপনাকে একটা মাধ্যম করতে হবে। আগুন সবত্র আছে। কিনতু  কাঠি/কাঠ  চাই। আর চাই বারুদ।  এই বারুদ দেন সৎ-গুরুদেব।  মাধ্যম ছাড়া আগুনের প্রকাশ হয় না। তেমনি  ঈশ্বরের  প্রকাশ যদি দেখতে চান তবে মাধ্যমকে আশ্রয় করুন। আর নিজেকে তৈরি করুন। অপেক্ষা করুন আকুলতা নিয়ে।

আপনার আগে পিছনে সর্বত্র, গান ভেসে বেড়াচ্ছে। নাচের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। কিনতু আপনার যদি এক্সপোজার অর্থাৎ টিভি থাকে তাতে যদি ইলেকট্রিসিটি থাকে, সুইচটা অন করে দিন আপনি সব দেখতে পাবেন। এক্সপোজারের, অর্থাৎ টি.ভি.র  মধ্যে কিনতু  কিছু নেই। ওটা ভেঙে ফেললেও ভিতরে ছবি পাবেন না. গান পাবেন না। গান আছে সর্বত্র,ছবি আছে সর্বত্র। আপনার এন্টেনা ঠিক করুন, নিজেকে যোগ্য করুন, ব্যাকুল হন, নিরন্তর তৎগতপ্রাণ হন , তবেই তাকে দেখতে পারবেন এই টি.ভি.র মধ্যে । 

আপনি  ফল খেতে চান ?  ফলের স্বাদ আপনি কান্ডে  পাবেন না। বীজ তো বিস্বাদ। ভক্তিবাদীরা ফল খায়। নিরাকারবাদীরা মাটির মধ্যে উৎস খোঁজে, মাটির মধ্যে  স্বাদ খোঁজে। আপনি কোনটা  চান ?


একটা ঘটনা বলি।  শিরডির সাঁইবাবা - নাম শুনেছেন নিশ্চই।  তো  তাকে এক ভদ্রলোক দুপুরে খাবার জন্য নিমন্ত্রণ করেছেন।  খাবারের সমস্ত  আয়োজন সম্পূর্ণ।  ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন। এই বুঝি বাবা আসে। বাবা আর আসছেন না।   দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। বাবা আর আসেন না। সন্ধ্যে হয়ে গেল।  বাবা আর আসেন না। একটা কুকুর ঘুর ঘুর করছে। ভদ্রলোক  খাবার রেখে উঠতে পারছেন না। কুকুরটাকে যতই তাড়ানো হচ্ছে,  কুকুরটা একটু দূরে গিয়ে অপেক্ষা করছে।    ভদ্রলোক, লোক পাঠালেন, বাবার কাছে। বাবা বললেন - আমিতো গেছিলাম রে। কিন্তু তোর  মনিব তো লাঠি দিয়ে তারা করলো। লোকটি বললো - সে কি বাবা কখন গেছিলেন ? আমার বাবু তো সারাক্ষন আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন।  বাবা বললেন - তোর  বাবুতো  লাঠি নিয়ে বসে আছে।  আমি যাই কি করে ? খাই-ই  বা কি করে ? 

ভগবানকে না চিনলে এই হয় দশা। ভগবান এসে বসে থাকেন ।  আর আমরা  লাঠি নিয়ে বসে থাকি। ভগবান আসতে  চান , আমরা তাকে তাড়াতে চাই। যারা জীবের মধ্যে ঈশ্বর দেখতে পান না, তারা ঈশ্বরকে চেনেন না।

অতএব  শ্রীকৃষ্ণ বলছেন : আমার মতে  তারাই শ্রেষ্ট যারা ভক্তি সহকারে আমার রূপের অর্থাৎ সমগ্র জীব জগতের  উপাসনা করে। ভক্তিবাদেই আনন্দ, জ্ঞানী নিরস।

ধ্যানে সাধকেরা তার ইষ্ট  বা গুরুদেবের প্রতিচ্ছবি কল্পনা করে ধ্যান করেন। তখন গুরুদেবকে বা তার ইষ্টকে জ্যান্ত বলে  মনে হয়। তখন সেই ইষ্টদেবতার সঙ্গে বা গুরুদেবের সঙ্গে কথা বলা যায়। এবং সাধকরা  কথা বলেন ।  সেই প্রতিচ্ছবিও কথা বলে। আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন আমাদের আজ্ঞা চক্র বা তৃতীয় নয়ন বলে একটা কথা আছে। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ কেন্ত্র।এই বার্তা প্রেরণ কেন্দ্রে নিজের মনকে স্থির করে  আপনি যদি কাউকে আদেশ বা নির্দেশ দেন, তবে সে তা পালন করতে বাধ্য হবে।  এটি একটি অসাধারন গতিশীল শক্তি। কোনো ব্যক্তির ছবি, বা প্রতিমাকে মনের মধ্যে রেখে, তার ক্ষুদ্র প্রতিমাকে ধ্যানে নিয়ে আজ্ঞা চক্র থেকে যদি  মাটির মূর্তির উপরে, বা ছবির  উপরে নিবিষ্ট করা যায় তবে সেই মাটির মূর্তি আর সাধারণ থাকে না। সেটা আপনার আজ্ঞা দ্বারা সঞ্চারিত চলমান শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। তখন আপনি যা স্নরন করবেন, সেটা গতিশীল হয়ে যাবে। মূর্তিপূজা এই প্রক্রিয়ার গভীর প্রয়োগ ।   ঈশ্বর তো বিরাট। আর এই সর্বত্র বিরাজমান  বিরাটের কাছে  পৌঁছেতে আমরা মূর্তির মাধ্যমে যেতে পারি। একটা কথা আছে, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাই আছে এই ভান্ডে অর্থাৎ মানব শরীরে।  । আপনার মস্তিস্ক আর পরমাত্মার মস্তিষ্কের সঙ্গে একটা সম্পর্ক আছে। এই দুই সন্মন্ধকে যুক্ত করার জন্য একটা সেতু চাই। এই সেতু নির্মিত হতে পারে মূর্তি দিয়ে। কেননা আপনি নিরাকার কিছুর সঙ্গে সোজাসুজি সম্পর্ক স্থাপিত করতে পারবেন না। আপনি আকারে বর্তমান।  নিরাকার সম্পর্কে তো আপনার কিছু জানা  নেই। তাই যে যাই বলুক না কেন পরমাত্মা নিরাকার, অপ্রকাশিত।  সেটা শুধু শুধু কথার কথা হয়ে যাবে আপনার কাছে। আপনার অনুভবের মধ্যে কিন্তু আসবে না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের মস্তিষ্কের  মধ্যে যত  অনুভব আছে, সেগুলোর সবই  আকৃতির অনুভব। রূপের অনুভব। আমাদের কারুর মধ্যে নিরাকারের একটাও অনুভব নেই। কারুর কথা ভাবা মানে তার রূপের কথা ভাবা । অবয়বের কথা ভাবা । তার সূক্ষ্ম গুনের কথাতেও আমরা তার রূপ কল্পনা করি। আর যার সন্মন্ধে কোনো ধারণা নেই তার সম্পর্কে কোনো শব্দ আপনাকে তার স্মরণ করাতে পারবে না। তাই আপনি নিরাকারের কথা বলতে থাকবেন আর সাকারের মধ্যে বাস করবেন। যদি সত্যি সত্যি আপনি নিরাকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান তবে আপনাকে এমন একটি মূর্তি নির্মাণ করতে হবে যার একদিকে সাকার আর এক দিকে নিরাকার। একটু ভাবুন, আমরা যেখানে রয়েছি, সেখানে তার সীমা  প্রকাশিত। আর অন্যদিকে পরমাত্মা যেখানে আছেন সেটা সীমাহীন অপ্রকাশিত। তাই মূর্তিকে দুটো কাজ করতে হবে আমরা যেখানে সেখানে সে প্রকাশিত হবে, আর পরমাত্মা যেখানে আছেন সেখানে নিরাকারের মধ্যে হারিয়ে যাবেন। 

একটা কথা শুনুন যে ব্যক্তি পূজা করে, সে ওই মাটির মূর্তিকে পূজা  করে না। সে ওই ছবিকে পূজা করে না। সে পূজা করে ওই ছবির  মধ্যে তার পিতাকে, মাতাকে, গুরুকে, দেবতাকে,  ইষ্টকে,  পরমাত্মাকে।  মূর্তির কখনো পূজা হয় না। মূর্তির মধ্যে আমি যাকে  দেখতে চাই তার পূজা করা হয়। আর যার কাছে মূর্তি দৃশ্যমান, সে কখনো পূজা শেখেনি, সে পূজা করে না। তার পূজা সম্পর্কে  কোনো ধারণাই  নেই। পূজা আর মূর্তি দুটো আলাদা কথা।মূর্তি মাধ্যম মাত্র।  পূজা মূর্তির হয় না, পূজা হয় ভাবনার। যে পূজা করে, সে কখনো মূর্তি দেখতে পায়  না।আর  যে মূর্তি দেখতে পায়, সে কখনো পূজা  করে না। পূজা মূর্তিকে মুছে ফেলার কৌশল। আমরা তো আকৃতি সম্পন্ন, সেই আকৃতিকে মুছে ফেলার কৌশলই পূজা। দেহাতীত হয়ে যাওয়াই পূজা।  পূজায় দৃশ্যমান আকৃতি, আকৃতিবিহীন হয়ে যায়। তবেই পূজা সম্পন্ন হয়। প্রকাশিত অংশে পূজা আরম্ভ হয়, অপ্রকাশিতে পূজা সম্পন্ন হয়। পূজা সাধককে গ্রাস করে নেয়। যারা পূজা করেনি তারা ভাবেন  পাথর রেখে কি হবে ? আর যারা পূজা করেছেন  তাদের পাথর হারিয়ে যায়, সীমা হারিয়ে যায়, অসীমে প্রবেশ করেন  আর তখন পরমাত্মা  প্রকট হয়ে যান ।
ভগবান শ্রীচৈতন্য যখন দুহাত তুলে কৃষ্ণনাম করেন , মিরাদেবী  যখন পূজার ছলে  নাচ করেন , মতুয়ারা যখন হরিবোল হরিবোল করেন, বাউলরা যখন নেচে নেচে গানের মধ্যে ডুবে যান,   তখন তারা নিজেরা পূজার মধ্যে বিলীন হয়ে যান ।  এদের জন্য সেখানে কোনো মূর্তির অস্তিত্ব থাকে না। পূজা শুরু হলে মূর্তি বিলীন হয়ে যায়।  মূর্তি তো প্রারম্ভ মাত্র।  আমরা যারা পূজার কিছু বুঝি না, তারা মূর্তি দেখতে পাই। তাই আমার মনে হয় - সত্যিকারের  পূজা শুরু হলে মূর্তি অন্তর্হিত হবে।

মূর্তি তো পরমাত্মাকে দেখবার জানলা মাত্র। আমি দেহের মধ্যে থেকে পরমাত্মাকে দেখতে চাই।  আমার তো দেহ আছে।  অর্থাৎ আমি আকৃতি সম্পন্ন। তো জালনাও তো আকৃতি সম্পন্ন হবে , কিন্তু জানলা খুলে যখন আকাশের দিকে তাকাবো তখন নিরাকারের মধ্যে প্রবেশ করবো। এই দেহের মধ্যে জানলা আছে, সেটাকে খুলতে হবে। আকাশকে দেখতে হবে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে জানলা ছোট্ট।  কিন্তু আকাশ তো বড়ো। কিন্তু ছোট্ট জানলা দিয়েইতো বড়ো আকাশকে দেখা যায়। এটা বোঝানো কঠিন কিন্তু সত্যি। যে জানলা কখনো খোলেনি, যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝানো কঠিন হবে যে বৃহৎ আকাশকে, আয়তনে ছোট্ট জানলা দিয়েও দেখা যায়। মূর্তি পূজা এই জানলা খোলার প্রক্রিয়া। আপনি মন্দিরের কাছে যেতে পারেন। মূর্তির কাছে যেতে পারেন।  কিন্তু পূজার কাছে যেতে পারেন না।  কতকগুলো বিষয় আছে যার অভিব্যক্তি সম্ভব নয়। এগুলো অন্তরের ব্যাপার। আন্তরিক বস্তু প্রদর্শন সম্ভব নয়।

সাকার নিরাকার দুটি পৃথক নয়। একটি অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। যাকে  আমরা সাকার বলি সেটা নিরাকারের অংশ।  আবার যাকে  আমরা নিরাকার বলি সেটিও সাকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমরা সাকারে আছি। আমার দেহ সাকার। আমরা সম্পর্ক গড়ি সাকারের সঙ্গে। এই সত্য তো অস্বীকার করলে চলবে না যে আমরা সাকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের সেখান থেকেই যাত্রা  শুরু করতে হবে। যেখানে আমাদের যাওয়া  উচিত, সেখান থেকে যাত্রা শুরু করা যায় না। যেখানে আছি সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়। যেখানে আমরা নেই সেখান থেকে যাত্রা শুরু করা যায় না। আমরা যা কিছু জেনেছি আকারের মধ্যেই জেনেছি। আমরা প্রেম করেছি - আকারে। আমরা রাগ করেছি আকারে।  আমরা ঘৃণা করেছি আকারে। আসক্ত হয়েছি তাও আকারে। বন্ধুত্ব করেছি আকারে।  শত্রূতা করেছি তাও আকারে। ঈশ্বরের নিরাকারত্ব যেমন সত্য। আমাদের আকারত্ব তেমনি সত্য। আমাদের মন যখন কিছু ধরে রাখে সেটা আকারেই ধরে রাখে।

তাই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ বা কথা  যখন আমরা স্মরণ করি, তার গুনের কথা যখন আমরা স্মরণ করি, তখন তার আকারের কথাই আমাদের চোখে ভাসে। আর এই জন্য নিরাকারের দিকে যদি যাত্রার জন্য  আমাদের বেরোতে হয়, তবে আমাদের নিরাকারের জন্য আকার সৃষ্টি করতে হবে।এই আকারটা যদি শ্রীকৃষ্ণের হয়, গুরুদেবের হয় বা অন্য্ কারুর হয়,  যা আমাদের কাছে দৃষ্টিনন্দন, তবে আমাদের সাধনপথ সহজ হবে।

তাই সাধারণের জন্য, নিরাকারের চেয়ে আকারের সাধনা সহজ ও সঠিক।                      




Saturday, 15 June 2019

প্রান-রহস্যঃ


প্রান-রহস্যঃ

ওঁ আপ্য়ায়ন্তু মম অঙ্গানি বাক প্রাণঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রম অথোবলম ইন্দ্রিয়ানি চ সর্বানি। 

হে পরম-ঈশ্বর আমার সর্ব্ব অঙ্গ যেন পুষ্ট হয়। আমার প্রাণবায়ু, বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো যেন শক্তিশালী হয়। 
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তিঃ ।।
  
জীবন হচ্ছে  শ্বাসের খেলা। শ্বাসের শুরুতে প্রাণের শুরু, শ্বাসের  শেষে প্রাণের শেষ। চৈতন্য-হীন মানুষ বা জীব বেঁচে থাকতে পারে,  কিন্তু প্রাণহীন  জীব হয় না।   আমাদের সবাইকে বেঁচে থাকতে গেলে,  এই  প্রাণের সাধনা  করতে হয়।   আবার আত্মজ্ঞান লাভ করতে গেলেও প্রাণের সাধনা করতে হয়।  শারীরবিনা সাধন হয় না। আর আমাদের শরীরের প্রধান হচ্ছে  প্রাণ অর্থাৎ বায়ু। আমরা আজ এই প্রাণ বা বায়ু নিয়ে আলোচনা করবো। 
কোনো বাড়িতে ঢুকতে গেলে, কর্তার  সাথে দেখা করতে গেলে, যার সেই বাড়িতে যাতায়ত আছে, তেমন কারুর  সাহায্যে প্রবেশ করতে হয়।  আমাদের শরীরে এই বায়ু প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে, অর্থাৎ একবার ঢুকছে, একবার বেরোচ্ছে। আমাদেরও, ভগবানের তৈরি এই  দেহ-মন্দিরে ঢুকতে গেলে, এই প্রাণবায়ুর সাহায্য নিতে হবে। তাই আধ্যাত্মিক জগতে এই বায়ুর বা স্বাসপ্রস্বাস-এর  গুরুত্ত্ব অপরিসীম। বায়ু আমাদের আত্মা বা পরমাত্মার কাছে নিয়ে যাবার জন্য বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।
আজ আমরা  বায়ুর অর্থাৎ প্রাণের  গোড়ার কথায় যাবো। আমাদের সমস্ত সৃষ্টি প্রকৃতি প্রসূত। প্রকৃতি ত্রিগুণাত্বক - সত্ত্বঃ -রজঃ -তমঃ। এই ত্রিগুণের সাম্য়-অবস্থায় অব্যক্ত। আর বৈষম্য অবস্থায় হচ্ছে সৃষ্টি। সমস্ত সৃষ্টি তা চেতন বা অচেতন, যাই হোক না কেন, তা  এই প্রকৃতির সাহায্যেই  হয়েছে। সত্ত্বগুণ হচ্ছে আত্মশক্তির মুলস্পন্দন।  রজঃগুন হচ্ছে ক্রিয়া শক্তির মূল স্পন্দন। এই ক্রিয়া শক্তিই সৃষ্টিকে ভাঙে গড়ে। ক্রিয়াশক্তির এই যে কার্যরূপ তাকে বলে তমোগুণ।
শক্তির এই তমোগুণ থেকেই পঞ্চতত্ত্ব সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে কারন-রুপী  মহাকাশ। এই আকাশ থেকে বায়ু, অর্থাৎ মহাপ্রাণশক্তি উৎপন্ন হয়েছে। মহাত্মারা বলেন, আমাদের এই দেহটি একটি ক্ষুদ্র ব্রহ্মান্ড। পঞ্চতত্ত্বের সমস্ত তত্ত্ব আমাদেরই এই দেহে বর্তমান।
এখন, আকাশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে, বায়ু। আকাশের গুন হচ্ছে  শব্দ। বাতাসের,   নিজস্ব,গুন হচ্ছে স্পর্শ।   আর বায়ু আকাশের উত্তরাধিকারী হিসেবে যে গুন্ পেয়েছে তা হচ্ছে শব্দ । এই বায়ুই আমাদের স্পর্শ ইন্দ্রিয় অর্থাৎ ত্বকে অনুভব জাগায়। এই বায়ুই আমাদের দেহের প্রাণশক্তি, প্রাণবীজ ও প্রাণকোষ নির্মাতা। এই বায়ু আমাদের দেহের সমস্ত যন্ত্রগুলোকে, দেহের রস-রক্তকে দেহের সর্বাঙ্গে পরিচালিত করে।
আকাশভূতের ক্রিয়া আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।  বায়ুকেও  আমরা চোখে দেখি না বটে, কিন্তু তার স্পর্শ অনুভব করি। আমরা যেমন আকাশ জুড়ে, বায়ু অগ্নি ও বরুনের খেলা প্রত্যক্ষ করি, অর্থাৎ ঝড়, বিদ্যুৎ ও মেঘ বা বৃষ্টির খেলা দেখতে পাই, তেমনি আমাদের দেহের মধ্যেও এই ত্রিদেবতার খেলা চলছে, এবং আমাদের দেহ যদিও পঞ্চভূতের তৈরি, তথাপি এই তিন ভূতের অধিক প্রাধান্য, আমাদের শরীরে। এর মধ্যে আবার বায়ু ভূতের প্রাধান্যই সর্বাধিক।
বক্ষ প্রদেশ বায়ুশক্তির প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র।  যদিও সমস্ত দেহেই সমস্ত ভূতের কাজ চলতে থাকে, তথাপি প্রত্যেক তত্ত্বের একটি প্রধান কেন্দ্র আছে। বায়ুর প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে আমাদের বুক।  এখানে, ফুসফুসহৃদযন্ত্র, মঙ্গলগ্রন্থি এবং প্রাণকোষ নির্মাণকারী গ্রন্থি ইত্যাদি পাঁচটি গ্রন্থি ও অনেকগুলি উপগ্রন্থি আছে এখানে।  হৃদয়কেকে সাধকরা  অনাহত চক্রে কর্ম্মস্থল  বলে থাকেন । এই চক্রে অবিরত কাজ চলছে, একমুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নেই। এই চক্রের বিশ্রাম মানে, আমাদের চিরবিশ্রাম বা মৃত্যু। বিজ্ঞান বলছে,  আমাদের বুকের পিছনের স্পাইনাল কর্ড লেভেল, বা সুষুম্না নাড়িতে অবস্থিত  অনাহত চক্র থেকে, অর্থাৎ আমাদের বুকের পিছনের সুষুম্না নাড়ি থেকে  বারোজোড়া স্নায়ু যার প্রত্যেক জোড়ায়  একটি  গ্রাহক, অন্যটি প্রেরক  স্নায়ু ( রিসেপ্টর আর একটি কন্ডাকটর ) আমাদের বুকের মধ্যে বিস্তার করে আছে।
বায়ুকে উপনিষদ পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন।  প্রাণ-ব্যান-অপান -সমান-উদান। এঁরা আমাদের দেহমন্দিরের রক্ষক। এইপাঁচজন দ্বাররক্ষক আমাদের হৃদযন্ত্রের পাঁচদিকে অবস্থান করছে।
ছান্দোগ্য উপনিষদ বলছে : আমাদের হৃদয়ের পুব দিকে প্রাণ, পশ্চিমে অপান ,দক্ষিণে ব্যান, উত্তরে সম বা সমান আর উর্দ্ধ দিকে উদান।
পূর্ব দিকে আছেন - প্রাণ। হৃদয়ের যে পূর্বদ্বার সেখানে তিনি অবস্থান করছেন। প্রাণকে বলা হচ্ছে আদিত্য বা সূর্য্য । ইনি আমাদের চক্ষুস্বরূপ। আদিত্য অর্থাৎ তেজ। এই প্রাণ বায়ুর কাজ হচ্ছে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ, হৃদযন্ত্র পরিচালন, খাদ্য বস্তুকে পেটের  মধ্যে পাঠানো। ধমনীর সাহায্যে আমাদের সর্ব্ব অঙ্গে রক্ত পরিচালনা - অর্থাৎ পাঠানো ও গ্রহণ করা। অর্থাৎ শিরা এবং স্নায়ুগুলোকে তাদের কাজে প্রবৃত্ত করা। 
দক্ষিণ দিকে আছেন - ব্যান।  হৃদয়ের দক্ষিণ দ্বারে ব্যানবায়ু অবস্থান করেন। ব্যান-কে  বলা হচ্ছে চন্দ্র। ইনি আমাদের কর্ন  স্বরূপ। মানুষ কানের সাহায্যে জ্ঞান লাভ করে। চন্দ্র আমাদের খাদ্যের উৎস - খাদ্য আমাদের শক্তি যোগায়। শরীরের রস-রক্তকে প্রয়োজনমতো সমস্ত শরীরে দ্রুত পরিবেশন করা, আমাদের শরীরের সংকোচন-সম্প্রসারণ, মস্তিষ্কে রক্ত পাঠানো, শরীর থেকে ঘাম বের করে দেওয়া  এই ব্যান বায়ুর কাজ। এই ব্যানবায়ু কুপিত হলে, আমাদের সমস্ত দেহে রোগের  প্রকপ হয়, এবং আমরা মারা যাই।  
পশ্চিমদ্বার, অর্থাৎ হৃদয়ের যে পশ্চিম দ্বার সেখানে অবস্থান করছেন  অপান। এটা আমাদের বাকশক্তি, আবার এই অপান-ই হচ্ছে অগ্নি। অপান বায়ুর প্রধান কাজ, প্রাণ বায়ুকে আকর্ষণ করে, প্রাণবায়ুর স্বাস প্রশ্বাস কাজকে সহায়তা করা। মল,মূত্র, শুক্র, প্রভৃতিকে নিচের দিকে চালিত করা। নারী দেহের সন্তান পোষণ, সন্তান ভূমিষ্ট করার ব্যবস্থা করা, রজঃ নিঃস্বরণ  ইত্যাদি ক্রিয়াও অপান বায়ুর অন্তর্গত।
এর পরে,হৃদয়ের উত্তর দ্বারে আছেন সমান বা সম।  আমরা যা কিছু খাই বা পান করি, সেই সকল বস্তুকে জীর্ন করে, রূপান্তরিত করে এই সমান বায়ু। অর্থাৎ সমান বায়ু আমাদের হজমশক্তি। জীর্ন খাদ্যের সার, ও অসার ভাগ অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়জনীয় অংশকে পৃথক করে অসার ভাগ বৃহৎ-অন্ত্রের ভিতর দিয়ে মলনারীতে প্রেরণ করে, এই সমান বায়ু। অপান  ও প্রাণ  বায়ুর কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করার দায়িত্ব এই সমান বায়ুর।
হৃদয়ের উর্দ্ধদিকের দিকে যে দ্বার সেখানে আছেন, উদান । পা থেকে উর্দ্ধগমনকারী বায়ু, এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে উপরের দিকে যায়। এই উদান বায়ুর সাহায্যেই মানুষ শব্দ করে, কথা বলে, গান ইত্যাদি করে। এই উদান বায়ুর সাহায্যেই আমাদের মন বুদ্ধি স্মৃতিশক্তি পরিপুষ্ট হয়। সাধকের কাছে, এই উদান বায়ুর খুব গুরুত্ত্ব , কারন  এই উদান বায়ুর সাহায্যেই কুন্ডলিনী শক্তিকে সাহস্রারের দিকে নিয়ে যায়। এর উদান বায়ুর সাহায্যেই  আমাদের মন অতীন্দ্রিয় জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
অতএব সচেতন ভাবে, আমাদের প্রাণকে রক্ষা করতে হবে, শক্তিশালী করতে হবে। আর এটা  করবার জন্য, আমাদের প্রতিনিয়ত খানিকটা সময়, প্রাণের অর্থাৎ স্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়াকে একাগ্রভাবে পর্যবেক্ষন করতে হবে। তার কাছে উপবেশন করতে হবে, তাতেই তিনি খুশি হবেন, এবং আমরাও ভালো থাকবো।
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ - হরি  ওঁং









  

  


Wednesday, 5 June 2019

কর্মরহস্য


কর্মরহস্য (১)

কেউ বলেন "যেমন কর্ম্ম তেমন ফল" । কেউ  বলেন, "ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে ?" কোনটা যে ঠিক কে বলে দেবে ? কর্ম ফল নাকি কপাল - কোনটা কার্যকরী বেশী ? আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় কর্মরহস্য।

গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্মে তোমার অধিকার, ফলে কখনোই নয়। এই কথার গূঢ় অর্থ কী ?

কর্ম্ম কাকে বলে ?

পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে আমরা যা কিছু করি সবই কর্ম্ম। সৃষ্টি এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, যা কিছু করা হয় তাকেই কর্ম বা ক্রিয়া বলে।

কর্ম্ম কয় প্রকার  ? 

প্রাথমিক ভাবে, কর্ম্ম দুই প্রকার, দৈহিক কর্ম্ম ও মানসিক কর্ম্ম।

দৈহিক কর্ম্ম  বা অবচেতন মনের কর্ম্ম  :
দেহকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য, আমরা যে কর্ম্ম করি, বা যে কর্ম্ম সম্পাদিত হয়, তাকে দৈহিক কর্ম্ম বলে। যেমন - চোখের পাতা ফেলা, স্বাস প্রশ্বাস, পাচন  ক্রিয়া, বাতাস থেকে উর্জ্বা শক্তি সংগ্রহ করা।  এগুলো আমাদের দৈহিক কর্ম্ম। এগুলো অবচেতন মনের নির্দেশে হয়।  এই কর্ম্মের ফল তাৎক্ষণিক। সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ নেই।

মানসিক কর্ম্ম  বা সচেতন মনের কর্ম্ম :
ইন্দ্রিয়গনের সাহায্যে বিষয় সংযোগে যে কর্ম্ম করা হয়, তাকে মানসিক কর্ম্ম বলা হয়। মানসিক কর্ম্ম আবার দুই প্রকার। প্রতক্ষ্য ও অপ্রতক্ষ্য ।

আসলে আমরা কর্ম্ম বলতে যা বুঝি তা এই এই মানসিক কর্ম্মের বহিরঙ্গ মাত্র। অর্থাৎ যে কর্ম্মের দ্বারা আমরা এক্ষুনি বা অদূর ভবিষ্যতে ফল পেতে পারি। অর্থাৎ প্রতক্ষ্য কর্ম্ম

ইন্দ্রিয়গনের দ্বারা আমাদের কর্ম্ম করতে হয়। আর মন হচ্ছে ইন্দ্রিয়গনের রাজা। মন যখন কোনো কিছু চিন্তা করে, সেটা হচ্ছে অপ্রতক্ষ্য কর্ম্ম।  এই অপ্রতক্ষ্য কর্ম্ম যখন ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাহ্যিক রূপ নেয় তখন তাকে প্রতক্ষ্য কর্ম্ম বলা হয়। সাধারণ ভাবে একেই আমরা কর্ম্ম বলে থাকি।

তাহলে আমরা বুঝলাম, মন হচ্ছে কর্ম্মের রাজা। এই মনের আবার দুটো প্রবৃত্তি আছে। একটাকে বলি কামনা, আর একটা হচ্ছে বাসনা। এই দুটো প্রবৃত্তি আমাদের কর্ম্মে উদ্বুদ্ধ করে।

কামনা :  ইন্দ্রিয়গনের সঙ্গে বিষয়-সংযোগের যে ইচ্ছে আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয় তাকে বলে কামনা। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ - প্রভৃতি উপভোগ করবার যে প্রবৃত্তি আমাদের মনে বর্তমান থাকে, তার দ্বারা ভোগ্য বিষয়ে আমাদের আসক্তি জন্মে। এই আসক্তিই কামনা-প্রসূত। মানুষের যাতে ন্যায্য অধিকার নেই,অথচ সেগুলো পাবার জন্য, আমরা সদাই চঞ্চল।  তাই কামনা প্রসূত কর্ম্ম আমাদের সুখ-দুঃখের কারন।

বাসনা : মনের আর একটা প্রবৃত্তির নাম বাসনা বা সংকল্প। আমি সংযম পালন করবো। চরিত্রের উন্নতি সাধন করবো। পরহিতার্থে কাজ করবো। জ্ঞান অর্জন করবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা হচ্ছে নিজের সুখ-দুঃখের জন্য কাজ যাকে  বলে কামনা আর একটা অন্যের হিত বা নিজের উন্নতি সাধনের কাজ, একে বলে সংকল্প বা বাসনা।

এই কামনা ও বাসনা দুটোরই উৎপত্তি স্থানই মন। এদুটোই মনের কাজ।  এটাকে সম্পাদন করা  বা না করা দুটোই কর্ম্ম। কর্ম্ম হিসেবে এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।  পার্থক্য হচ্ছে ফলে।

কর্ম্ম বলতে আমরা স্থুল দেহের কর্ম্ম বুঝে থাকি।  কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের আরো দুটো লিঙ্গদেহ বা সূক্ষ্ম দেহ আছে, একটা হচ্ছে কামদেহ আর একটা হচ্ছে মানসদেহ। এই দুটো দেহেরও  কর্ম্ম করবার শক্তি আছে। এবং এই দুটো দেহই সর্ব্বদা কর্ম্ম করছে। আর পৃথিবীই আমাদের কর্ম্মভূমি। আর এই পৃথিবীতে বসে আমরা যে  কর্ম্ম করবো, তার ফলও আমরা এই পৃথিবীতে বসেই ভোগ করবো। এই সব কর্ম্মের ফল আমরা পরলোকে গিয়ে ভোগ করবো না। যদি এই জীবনে আমাদের কর্ম্মফল ভোগ সম্পূর্ণ না হয় তবে আমাদের আবার পৃথিবীতে এসে ভোগ করতে হবে। আর একেই বলে প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ। ফলদানে প্রবৃত্ত এই সব কর্ম্মফলের গতি রোধ করা যায় না। আর পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে যে সব কর্ম্ম আমরা করি, সেগুলো হচ্ছে ক্রিয়মান কর্ম্ম। ভবিষ্যৎ জন্মে আমাদের আজকের  ক্রিয়মান কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। এছাড়া বহু জন্মের যে কর্ম্মফল আমাদের ভোগ করা হয় নি তাকে বলে সঞ্চিত কর্ম্ম। সেই সব সঞ্চিত কর্ম্মের ফলও  আমাদের ভোগ করতে হবে। ক্রিয়মান কর্ম্মের প্রতি আমাদের আমাদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি, কিন্তু প্রারব্ধ বা সঞ্চিত কর্ম্মফলের প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই ক্রিয়মান কর্ম্মকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য আমাদের কর্ম্ম বা কর্ম্মফল সম্পর্কে জ্ঞান সঞ্চয় করতে হবে, এবং সেই অনুযায়ী কর্ম্মে লিপ্ত হতে হবে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনে, এই জীবনের কোনো কর্ম্ম  প্রারব্ধ বা সঞ্চিত হিসেবে টেনে নিয়ে যেতে হবে না। এখন কি করে সম্ভব ?

চিন্তাদ্বারা কর্ম্ম :  আমরা কৰ্ম্ম-ইন্দ্রিয় দ্বারা যে সব কাজ করি, তাদের সন্মন্ধে ভালো-মন্দ জ্ঞান আমাদের নেই। অনেক সময় আমরা না বুঝে, বা বিচার বিবেচনা না করে, খারাপ কাজ করে বসি। পরে সেটা নিয়ে আমাদের অনুতাপ হয়। আবার অনেক সময়, আমরা বুঝে শুনে, বিবেকের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে, খারাপ কাজে লিপ্ত হই। অনেক সময়, রাগের বশে, বা হিংসার বশে  অনুচিত কাজ করে বসি। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, চিন্তা দ্বারা যে কোনো কাজ করা যায়, তা আমরা মন করি না। আমরা মনে করি, শারীরিক উদ্দম ছাড়া কোনো কাজ করা যায় না। স্বামী বিবেকানন্দ একবার এক সাধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনারা সব উন্নত মহাত্মা, এই নির্জনে, পাহাড়ের কোলে বসে সাধনা কোরছেন।  এতে সাধারণ মানুষের কি কাজে লাগবে ? মহাত্মা বলেছিলেন, মনের দ্বারাও যে মানুষের উপকার করা যায়, এবং উপকার করতে চাইলে যে যে কোনো জায়গায় বসে সেটা করা যায়, তা কি তুমি জানো ? অর্থাৎ মানুষ তার শুভ চিন্তার দ্বারা কাজ করে থাকেন। আমরা মনে করি, চিন্তা মনের একটা অবস্থা-বিশেষ মাত্র। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। চিন্তা একটা বস্তূ।  বস্তূর সমস্ত ধর্ম্মই এতে বর্তমান। এই চিন্তা দ্বারা, যেমন নিজের উপকার করা যায়, তেমনি অপরের উপকারও করা যায়। জড়-বিজ্ঞান এখনো এর আবিষ্কার করতে পারে নি বলে এটা অসত্য হয়ে যায় না। চিন্তার কার্য্যকরী শক্তি সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। আমরা তপস্যার কথা শুনে থাকি, ঐকান্তিকভাবে চিন্তা করাই তপস্যা। আর এই তপস্যার ফলই আমাদের "বেদ"। তপঃ-প্রভাব-সম্পন্ন ঋষির কাছে কিছুই দুর্লভ নয়। তা সে জাগতিক বস্তূই হোক আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানই হোক। গভীর চিন্তা দূরে থাকুক, সাধারণ চিন্তাও কখনো নিষ্ফল হয় না।

আমাদের এই ভূলোকের সঙ্গে যেমন আরো অনেক লোক   (  ভূঃ , ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ, সত্যম ) ওতপ্রোত ভাবে অবস্থান করছে, তেমনি আমাদের এই স্থুল দেহের সঙ্গে সূক্ষ্ম দেহ ওতপ্রোত ভাবে অবস্থান করছে। আমাদের এই স্থুল দেহের চতুর্দিকে, এক-দেড় ফুট পর্যন্ত একটা জ্যোতির্বিম্ব আচ্ছাদন করে রেখেছে আমাদেরকে। এরও আকৃতি আমাদের দেহের মতোই। তবে এটি আলোর রশ্মি মাত্র। আমাদের মনের ভাবের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই আলোর রঙের পরিবর্তন হয়।  আমাদের চিন্তা ধারার গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে এই আলোর ঘনত্ত্ব বাড়ে-কমে। আমাদের মনে যখন যে প্রবৃত্তি জেগে ওঠে, সেই অনুযায়ী আমাদের এই আউড়া দেহ বা জ্যোতির্বিম্ব সূক্ষ্ম জগৎ থেকে সূক্ষ্ম পরমাণু আকর্ষণ করে থাকে। এবং তা থেকে শত শত - এমনকি হাজার হাজার আজ্ঞাবহ  চিন্তামূর্তি সৃষ্ট হয়। এই সব চিন্তামূর্তি গুলো সূক্ষ্ম উপকরণে নির্মিত। এই সকল মূর্তিতে কিঞ্চিৎ চৈতন্যেরও সঞ্চার হয়। মনের প্রবৃত্তির লক্ষ্য বস্তূ কাছে থাকলে, তারা সেই বস্তূর নিকটে গিয়ে তার সূক্ষ্ম দেহে সেই রকম প্রবৃত্তির উন্মেষ করতে চেষ্টা করে। আমাদের চিন্তা যত গভীর হবে, এই চিন্তামূর্তিগুলোর স্থায়িত্ত্ব ও কর্মক্ষমতা তত বেশি হবে এবং ফলপ্রদ হবে। সুতরাং আমি যদি কারুর সন্মন্ধে, ভালো চিন্তা করি, তবে তার ভালো হবে আর আমি যদি কারুর সন্মন্ধে খারাপ চিন্তা করি তবে তার খারাপ হবে।  আমার চিন্তার গভীরতা অনুযায়ী এই ফল গভীরতা ও স্থায়িত্ত্ব পাবে।  এই জন্য বলা হয়ে থাকে খারাপ কাজের চাইতে খারাপ চিন্তা ভয়ঙ্কর। আমাদের শারীরিক শক্তির একটা সীমা আছে, কিন্তু মানসিক শক্তি সীমাহীন। শরীর দ্বারা কৃত, পাপকর্মের মাত্রা শারীরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু মনের গতি  অপ্রতিরোধ্য, তাই চিন্তাশক্তিও অসীম। অতএব  মনের সাহায্যে যত পাপ করা যায়, তা  সীমাহীন। আবার মনের সাহায্যে যে ভালো কাজ করা যায় তা-ও সীমাহীন। এই জন্য সমস্ত ধর্মশাস্ত্রে মনের উপরে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। আমাদের শুভ-ইচ্ছা যত  গভীর হবে, সূক্ষ্ম জগতে আজ্ঞাবহ সচেতন মূর্ত্তি তত মঙ্গল কর্মে লিপ্ত থাকবে। আর আমাদের অশুভ চিন্তা যত গভীর হবে, সূক্ষ্ম জগতের আজ্ঞাবহ মূর্তিগুলো তত অমঙ্গল কর্মে লিপ্ত থাকবে। বেদে  যে সব মন্ত্র আমরা পাই, তা আসলে দেবতাদের   স্তূতি ও প্রার্থনা। দেবতাদের অর্থাৎ এক বা একাধিক গুনের অধিকারী যারা, তাদের আমরা দেবতা বলি। দেবতাদের স্তূতি মানে গুনের   স্তূতি ও গুণীর কাছে প্রার্থনা। এই সব মন্ত্র আমাদের মনকে শুভ চিন্তায় নিমগ্ন রাখে, বার বার উচ্চারণ বা জপ্ আমাদেরকে মঙ্গলের পথে নিয়ে যায়। মন্ত্রের এখানে সার্থকতা।

ক্রিয়মান কর্ম্ম :  বর্তমানে আমরা যা করছি, সেটাই ক্রিয়মান কর্ম্ম। এই ক্রিয়ামান কর্ম্ম খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন, কারণ, এই ক্রিয়মান কর্ম্মই আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন করবে। আমি এই জীবনে যাকিছু করবো, তা আমার ভবিষ্যৎ জীবন গড়ে দেবে। ভবিষ্যৎ জীবনের শুভ-অশুভ ব্যাপার সংগঠিত করে দেবে, এই জীবনের কর্ম্ম। অর্থাৎ আজ আমি কর্তা, কাল কিন্তু আমি হয়ে যাবো ভোক্তা বা দাস। আমাদের পুরুষাকার বা স্বাধীন ইচ্ছে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা এই জীবনে বিচারশীল হয়ে প্রয়োগ করতে হবে।  তবেই আমরা আগামী জীবনের সৌভাগ্য গঠন করতে পারবো।

আমরা কুকর্ম করি কেন ?  আমরা একটু স্থির হয়ে চিন্তা করলে  বুঝতে পারবো, আমাদের সমস্ত কর্মই আমাদের অবিচ্ছিন্ন চিন্তার ফল। তা সে ভালো বা মন্দ, পাপ বা পুন্য যে ধরনের কাজই হোক না কেন, এর মুলে আছে আমাদের কামনা। প্রবৃত্তির তাড়নায়, আমাদের মনে ক্ষনে ক্ষনে কুচিন্তা ফুটে উঠছে। অন্যদিকে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি  এই কুচিন্তাকে কার্য্যে পরিণত করতে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু যেসব কুচিন্তা বারবার স্ফূরণ ঘটাচ্ছে, তা আমাদের মনে চাপ ফেলছে। সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এইসব দীর্ঘদিনের কুচিন্তা, একদিন উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে, বিবেকের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে, আমাদেরকে কুকর্মে প্রবৃত্ত করবে। এইভাবে আমরা গর্হিত কাজ করে, পরে অনুতাপে দগ্ধ হই।

পুরুষাকার : একটা জিনিস মনে রাখবেন, বহু জন্মের কর্মফলে, আমাদের আজ এই মনুষ্য দেহ, আমাদের স্বভাব, মস্তিস্ক, চিন্তাশক্তি, বিবেক, এবং এই পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছি। আমাদের মধ্যে এই যে দৈন্যতা, এও  আমাদের পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মফল। আমাদের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক ভাবের দৈন্যতা, আমাদের ইন্দ্রিয়াসক্তি, আমাদের নিষ্ঠূরতা, এগুলো সবই আমাদের পূর্ব পূর্ব জন্মের মজ্জাগত স্বভাব। এর মধ্যেও আছে আমাদের ক্ষীণ বিবেকশক্তি। আমরা যদি আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী চালিত করতে পারি, তবে ক্রমশঃ উন্নতির দিকে যেতে পারবো। ভাগ্য ইচ্ছার অধীন নয়, ভাগ্য কর্মের অধীন।   স্বাধীন ইচ্ছেই  পুরুষকার। তাই বিবেকের দ্বারা পরিচালিত স্বাধীন ইচ্ছা আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। স্বাধীন ইচ্ছেকে শক্তিশালী করতে হবে। ইচ্ছেকে বিবেক দ্বারা পরিশীলিত করতে হবে।  এই ভাব যখন আমাদের দৃঢ় হবে, তখন আমাদের জীবনের গতি  উর্দ্ধমুখী হবে। দেখুন জীবন একটা যাত্রা।  এই পথে চড়াই উৎরাই আছে, আপনাকে লক্ষ্য স্থির রেখে, দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে আপনি সঠিক সময় লক্ষে পৌঁছতে পারবেন, তা না হলে পথে পথে ঘুরতে হবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সময়। ঈশ্বরের ইচ্ছেয় লক্ষে আপনাকে যেতেই হবে, যেখান থেকে ঈশ্বর আপনাকে কোলে তুলে নেবেন। কিন্তু আপনি যত  বিপথে যাবেন, তত আপনার বার বার জন্ম নিতে হবে, এবং আপনি জন্ম-মৃত্যুর চক্রে সুখ-দুঃখের আবর্তে ঘুরপাক খাবেন।

ভাগ্য :  আমরা আগেই শুনেছি, কর্ম্ম তিন রকম, সঞ্চিত, প্রারব্ধ, এবং ক্রিয়মান। এর মধ্যে ক্রিয়মান কর্ম্ম হচ্ছে - এখন করছি। সঞ্চিত কর্ম্ম হচ্ছে, আমরা যে কর্ম্ম করেছিলাম, আর প্রারব্ধ কর্ম্ম হচ্ছে - যে সব কর্ম্ম ফল দানে উম্মুখ বলে আমাকে জন্ম গ্রহণ করতে হয়েছে।  অর্থাৎ প্রারব্ধ কর্ম্মফল আমাকে ভোগ করতেই হবে। এই প্রারব্ধ কর্মফলের সমষ্টি হচ্ছে আমার ভাগ্য। তাই ভাগ্য আমাদের ঈশ্বরের নিদান। এই জীবনে আমাকে সেই সব সুখ-দুঃখ ভোগ করতেই হবে। সঞ্চিত কর্ম্মের যেগুলো এই জীবনে ভোগ করা সম্ভব নয়, সেগুলো থেকে যাবে ভবিষ্যৎ জন্মের জন্য। অর্থাৎ আমাদের এমন কিছু কর্ম্ম আছে যার ফল এই জীবনে ভোগ করা যাবে না। অর্থাৎ আমি এখন যেখানে জন্ম গ্রহণ করেছি,  সেখানে, আর আমার সঞ্চিত কর্ম্ম যাদের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত তার হয়তো সেখানে জন্ম গ্রহণ করেন নি। অন্য কোনো দেশে আছেন, বা আদৌ জন্ম গ্রহণ করেন নি, তবে তার কাছে আমার যা ঋণ তা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। তাই সঞ্চিত কর্মের অবলুপ্তি এক জীবনে সম্ভব নয়। আমরাশুধু প্রারব্ধ কর্মের দাস,  এই জীবনে। আমাদের জন্ম, মৃত্যু, সুখ দুঃখ  এই প্রারব্ধ কর্মের ফল, জেক আমরা ভাগ্য বলি। এবং এটি এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। প্রারব্ধ কর্ম্ম ক্ষয়ের  একমাত্র উপায়, ভোগ। এর কোনো অন্যথা নেই।
----------
কামনা অনুসারে আমাদের দেহলাভ :  কামনা মনের একটা ক্রিয়া।  আবার এই কামনা থেকেই আমাদের কামদেহ পুষ্টি লাভ করে। কামনার শুচিতার উপরে আমাদের পরের -জন্মের  কাম দেহের উৎকর্ষ নির্ভর করছে। এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জন্মের স্থান, আমাদের মাতৃস্থান নির্দিষ্ট হয়। কামনা চরিতার্থ করবার জন্য আমাদের শরীর, এবং শরীর অনুযায়ী আমাদের কর্ম্ম। আবার কর্ম্ম অনুযায়ী ফল লাভ করে থাকি আমরা। কামনা দ্বারাই আমরা ঐহিক সম্পর্ক স্থাপন করি। আমাদের ভাব-বন্ধনের আকর্ষণ পরজন্মে তাদের সাথে সন্মন্ধে আবদ্ধ করে। এই ভাবেই তৈরি হয় আমাদের শত্রূ - মিত্র। আমরা কর্ম্মের দোষ গুন্ সন্মন্ধে ধারণা করতে পারি।  কিন্তু মনের মধ্যে যে কামনা উঠে তা আমাদের মনের মধ্যেই নিহিত থাকে, বাইরে প্রকাশ পায়  না। কিন্তু এর দ্বারা যে কর্ম্ম উৎপন্ন হয় - তার ফল আমরা ভোগ করি। চিন্তা ও কামনা যদি সুপথে প্রবাহিত হয়, তবে আমাদের যে শক্তি ও ক্ষমতা অর্জিত হবে, তা আমাদের সুখের কারন হতে পারে।          

আমরা অনেকে মনে করি, আমাদের মনের গভীরে যে চিন্তা স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, সেতো মনের মধ্যেই আছে, তাতো কারুর কোনো ক্ষতি করে নি, তবে তার জন্য আবার ফল ভোগ করতে হবে কেন ? আমার মনে ভাব তো মনের মধ্যেই লয় প্রাপ্ত হয়ে গেছে - তবে তার আবার ফল কি ? লৌকিক জগতে সুপ্ত চিন্তার কোনো বিচার নেই। কিন্তু  আপনার সুপ্ত চিন্তাই আপনার ভবিষ্যৎ কর্ম্মের নির্ধারক হিসেবে কাজ করবে। আপনার চিন্তাই আপনাকে সুকর্ম-দূরকর্মে লিপ্ত করবে। এটাই কর্ম্ম পদ্ধতি।  তাই লৌকিক জগতে চিন্তার প্রতিফলন যতক্ষন না হচ্ছে ততক্ষন সেই চিন্তার বিষয় বিচার্য্য হয় না। কিন্তু সূক্ষ্ম জগতে, এই চিন্তার অপরিসীম গুরুত্ত্ব। কারন এগুলো হচ্ছে কর্ম্মের বীজ। তাই কুচিন্তা কুকর্মের বীজ। তাই আমাদের উচিত এই কুকর্মের বীজকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা।আর আমরা আগেই শুনেছি, চিন্তাও সূক্ষ্ম বস্তূ দ্বারা নির্মিত, এবং তার অসীম শক্তি এবং এদের সামান্য চৈতন্যশক্তিও আছে। এবং এই চিন্তা শক্তি লক্ষ্য বস্তুর উপরে প্রভাব বিস্তার করে।  অতএব চিন্তা কিছু করছে না, তা নয়, এর প্রভাব সাধারণ কর্ম্মের থেকেও অনেক বেশী।  এমনকি, এই চিন্তা সময় সুযোগ পেলে আপনাকে অবশ্য়ই কর্ম্মে অনুপ্রাণিত করবে।

কর্ম্মের বিচিত্র গতি।  বিষয়টি অতিশয়  দুর্জ্ঞেয়। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, যে যেমন কর্ম্ম করবে, সে তেমনি ফল ভোগ করবে। ব্যাপারটা কিছু এতটা সহজ নয়। কর্ম্মের আরো একটা দিক আছে। আর তা হলো, আমরা অনেক সময় দেখি, আমরা ভালো কাজ করতে গিয়েও অনেক দুর্নামের ভাগিদার হই। বা অন্যের দোষে আমাদের ক্ষতি হয়ে যায় । এর কারন কী ?

আমাদের ব্যক্তিগত কর্ম্ম ছাড়াও আমাদের চারিদিকে যে সব কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে তার প্রভাব থেকে আমি মুক্ত হতে পারবো না। আমি যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছি, সেই পারিবারিক কর্ম্মফল আমাকে প্রভাবিত করবে। আমি যে সমাজে জন্ম গ্রহণ করেছি, তার প্রভাব আমার উপরে পড়বে।  আমি যে দেশে জন্ম গ্রহণ করেছি - সেই দেশের শাসন কর্তার কর্ম্মের প্রভাব আমাদের উপরে পড়বে। আমি যে জাতিতে জন্ম গ্রহণ করেছি, তার প্রভাব আমাদের উপরে পড়বে। অর্থাৎ আমাদের পারিবারিক কর্ম্ম, সামাজিক কর্ম্ম, দেশজ কর্ম্ম, জাতিগত কর্ম্ম সবই আমার উপরে প্রভাব পড়বে। তাই বলা হয়েছে, একা ভালো থাকা যায় না। আমাদের সবাইকে নিয়েই ভালো থাকতে হবে। পরিবারের চিন্তা, সমাজের চিন্তা, জাতির চিন্তা, দেশের চিন্তা সবই আমার সুখভোগ বা দুঃখভোগের কারন হতে পারে। তাই সমাজে যখন মহাত্মারা আসেন, তারা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন না, শুধুমাত্র নিজের মুক্তির চেষ্টা করেন না। তারা আমাদের সবার বিচারের শুদ্ধতা আনবার জন্য সচেষ্ট হন। এই প্রসঙ্গে গীতার কথা আসে। যোগীশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যোগভ্রষ্ট ব্যাক্তিগন পবিত্র স্বভাব ও ধনী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। এবং আমাদের সবাইকে বলছেন, আসক্তি-হীন  ভাবে কর্ম্ম করতে। অর্থাৎ শুদ্ধ কর্ম্মে যেমন আমাদের লিপ্ত থাকতে হবে, তেমনি আসক্তিহীন হয়ে কর্ম্ম করতে হবে। ব্যষ্টির কল্যাণ নয়, সমষ্টির কল্যাণের জন্য আমাদের কর্ম্ম করতে হবে।    

কর্ম্ম বন্ধন থেকে মুক্তি পাবার উপায় : শুধু মানুষ নয়, যে কোনো জীব-জন্তু কর্ম্ম না করে বাঁচতে পারবে না। আর কর্ম্ম থাকলে তার ফল থাকবে। তাহলে আমরা এই জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে রেহাই পাবো কি করে ? দেখুন দৈহিক কর্ম্ম থেকে আমাদের বেরোবার কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ দেহকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য আমরা যে সব কর্ম্ম করে থাকি, তাকে বলে দৈহিক কর্ম্ম । যেমন, খাওয়া, শোয়া, নিঃস্বাস -প্রশ্বাস নেওয়া, হজম করা, বাহ্য ত্যাগ করা ইত্যাদি ইত্যাদি । আর এর জন্য কোনো পাপ বা পুন্য হয় না। সঞ্চিত কর্মের মধ্যে এর কোনো আশ্রয় নেই। সচেতন মন, যে চিন্তার অনুশীলন করে, তা  থেকেই কর্ম্মের উদ্ভব। আর এই কর্ম্ম-ই আমাদের পাপ-পুণ্যের ভাগিদার করে। পূর্ব্ব জীবনে আমরা যেমন ও যে পরিমান চিন্তার অনুশীলন আমরা করেছি, এবং সেই অনুযায়ী কর্ম্ম করেছি, মানসিক শক্তি লাভ করেছি , আজ তারই ফল আমরা এখন ভোগ করছি। 

গাঢ় চিন্তাই হচ্ছে  ধ্যান। যে অবস্থায় চিত্তবৃত্তি এক বিষয়ে নিবদ্ধ থাকে, জ্ঞানবৃত্তির সেই একতানতাকে বলে ধ্যান। প্রতিদিন এই ধ্যানের অভ্যাস করলে ক্রমশঃ একাগ্রতা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এবং আমরা বাহ্য বিষয় থেকে মনকে ইষ্ট বিষয়ে আবদ্ধ করতে পারবো। মনের উচ্চতর স্তরে, যে চিন্তার উদ্ভব হয়, তাতে কামনার লেশমাত্র থাকে না।  স্বার্থসিদ্ধির কোনো কল্পনা তখন থাকে না। তাই
কামনা-জাত  কোনো কর্ম্মও  থাকে না। আমরা জানি, মানুষ প্রয়াণকালে যেমন চিন্তা করে, বা যে ভাবে তন্ময় থাকে, পরবর্তী জন্মে সে সেই মত দেহ ধারণ করে। তাই ধ্যানের মধ্যে থাকতে পারলে, আমরা পার্থিব বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারি, এবং জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকেও  মুক্ত থাকতে পারি। আমরা আজ যাদের সঙ্গে সন্মন্ধে আবদ্ধ হয়েছি, পূর্ব্বে বা পূর্ব্ব জন্মে নিশ্চই তাদের উদ্দেশ্য আমাদের চিন্তাস্রোত প্রবাহিত হয়েছিল, তাই আমরা তাদের সঙ্গেই, বা তাদের ঘরেই জন্ম গ্রহণ করেছি। তাই বন্ধন  মুক্তির একমাত্র পথ ধ্যান যা আমাকে বিষয় থেকে মুক্ত রাখবে। কর্ম্ম বন্ধন  থেকে মুক্তি দেবে, আর জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে রেহাই দেবে।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম 

পুনশ্চ :

গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্ম্ম তিন রকম :কর্ম্ম, অকর্ম্ম, ও বিকর্ম্ম। শাস্ত্র অনুযায়ী কর্ম্ম করাকেই আসল কর্ম্ম বলে। আর শাস্ত্রনিষিদ্ধ যে কাজ তাকে বলে বিকর্ম্ম। আর কর্ম্ম থেকে বিরত থাকা অর্থাৎ কর্ম্ম সন্যাস - এর নাম হচ্ছে অকর্ম্ম।
কর্ম্ম : আমাদের সমস্ত কর্ম্ম-ই শাস্ত্র অনুযায়ী হওয়া উচিত। এখন কোন শাস্ত্র অনুযায়ী আমাদের কর্ম্ম করা উচিত। যে শাস্ত্র আমাদের যজ্ঞে পশুবলি দিতে বলছে ? যে শাস্ত্র মানুষকে অস্পৃশ্য করে রেখেছে। যে শাস্ত্র মানুষকে ঘৃণা করে শেখায়। প্রাচীন ঋষিরা, এমনকি রাজ্-রাজারা যজ্ঞ করতেন, বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞ করতেন। এবং প্রত্যেকটি যজ্ঞের এক একটা উদ্দেশ্য ছিল।  এবং এর সবই কামনা প্রসূত। মন মন ঘি ঢালা হতো। তাহলে কি আমাদের সেই যজ্ঞকর্ম করতে হবে ? না, যজ্ঞ হচ্ছে, ব্রহ্মাগ্নিতে অহংকে আহুতি দেওয়া। আমাদের অহংকে আহুতি দিতে হবে, মন মন ঘি ঢালা নয়, বা পশুবলি দেওয়া নয়। আর দিতে হবে কোথায়, না ব্রহ্মাগ্নিতে, অর্থাৎ বেল কাঠের বা ডুমুর কাঠের অগ্নিতে নয়, জ্ঞান দ্বারা প্রজ্বলিত যে ব্রহ্ম সেখানে আহুতি দিতে হবে।   শাস্ত্র বলতে বোঝায় - স্ব-অস্ত্র। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য যার সাহায্য নিতে হয়, তাই আমাদের শাস্ত্র।  এখন এই শাস্ত্র যারা রচনা করেছেন,  তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যা বলে গেছেন, তাইই কি শাস্ত্র ? না মানব জাতির স্বার্থে যা রচিত হয়েছে, তাইই শাস্ত্র। তথাকথিত ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের রচনামাত্রই শাস্ত্র নয়। পশুবলি , বা হিংসায় প্রেরণা, বা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা শাস্ত্রের উদ্দেশ্য নয়, শাস্ত্রের উদ্দেশ্য, সর্বেষাং মঙ্গলম ভব, সর্ব্বে সন্তু সুখিনঃ । সবার যাতে মঙ্গল হয়, অন্ততঃ বেশিরভাগের যাতে মঙ্গল হয়, সেই আপ্তবাক্যই শাস্ত্র। 
বিকর্ম্ম : শাস্ত্র অনুযায়ী কাজ না করাই বিকর্ম্ম। এখন শাস্ত্র বলছে, মিথ্যে কথা বলবে না। কিন্তু যদি মহৎ কাজের জন্য, বা কারুর প্রাণ রক্ষার জন্য, বা কোনো মায়ের সন্মান রক্ষার জন্য যদি মিথ্যে বলতে হয়, তবে সেটা কর্ম্ম হতে পারে। কাউকে আঘাত করবার জন্য অস্ত্র চালানো, আর ডাক্তারের অস্ত্র চালানো এক ব্যাপার নয়। ডাক্তারের অস্ত্র চালানো কর্ম্ম, কিন্তু ডাকাতের অস্ত্র চালানো বিকর্ম্ম। আসলে আমরা কি করছি সেটা বড়  কথা  নয়, কেন করছি সেটা বড়ো  কথা। তাই উদ্দেশ্য বিহীন হয়ে কর্ম্ম নয়, সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ম্ম করতে হবে আমাদের।
অকর্ম্ম : কর্ম্ম সন্যাসকে  বলে অকর্ম্ম। কিন্তু তাই বলে, কোনো কাজ না করে, চুপ চুপ বসে থাকাকে, অকর্ম্ম বলে না। দেহ কর্ম্মহীন থাকতে পারে না। কর্ম্ম সন্যাস তাকেই বলে, যিনি কর্ম্মের দ্রষ্টা হতে পারেন, কর্তা  নয়। কর্ম্ম আমাদের জ্ঞানের আলো  এনে দিতে পারে। আর জ্ঞান মানে ঈশ্বর জ্ঞান। আর ঈশ্বর সম্পর্কে যখন আমাদের জ্ঞান হবে, তখন আমাদের ঈশ্বরভক্তি হবে। অতএব অকর্ম মানে আলসেমী নয়। অকর্ম মানে অকর্তা জ্ঞানে কর্ম করা।
এখন কর্ম্ম ফলের বন্ধন  কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর কার ক্ষেত্রেই বা প্রযোজ্য নয়। আসলে কর্ম্ম কর্তাকেই বন্ধন  করে, কর্মচারীকে নয়। যার কর্তৃত্ব-অভিমান আছে, সেই কর্তা। তেমনি, ভোগে যার অভিলাষ আছে, তিনিই ভোক্তা। আসলে কর্ম্ম যেমন আমাদের চিন্তার ফল, ভোগও চিন্তার ফল। সেই জন্য, কি করছেন সেটা বড়  কথা নয়, কেন করছেন,  সেটা বড়  কথা। আপনার বিচার আপনার কর্ম্মকে প্রভাবিত করবে, এবং আপনাকে ফল ভোগ করাবে। সেই জন্য বলা হয়ে থাকে, যিনি কর্তৃত্বাভিমানহীন  তিনি নিরাশ্রয়, নিত্যতৃপ্ত। এনাদের  কর্ম্মে কোনো ফালাকাঙ্খা নেই, আমি করছি, সেই ভাবও  নেই। তাই ভোগ বা দুর্ভোগ এদের প্রভাবিত করতে পারে না।
এখন কথা হচ্ছে, জীব পুনঃ পুনঃ জন্মাচ্ছে, পুনঃ পুনঃ মরছে, জন্মালে কর্ম্ম করতে হচ্ছে, আবার কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য আবার জন্মাতে হচ্ছে। এই গোলক ধাঁধায় জীব অবিরত ঘুরছে।  এর থেকে অব্যহতি পাবার কি কোনো উপায় নেই ?
এইখানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "পরমাং গতিম" (৮/২১) . বা "মে পরমং ধাম" আমার পরমধাম, যা পেলে আর প্রত্যাবর্তন হয় না। এখন সেই পরম ধামে পৌঁছিবার উপায় কি ?  এইখানে ভগবান বলছেন, " ভক্ত্যা লভ্যস্ত্ব অনন্যয়া" - অর্থাৎ কেবল ঐকান্তিক ভক্তি দ্বারা তিনি প্রাপ্য।  এবং এই অনন্য ভক্তি দ্বারা জীবের গতাগতি শেষ হতে পারে।
দেখুন দুটো পথ, দুই ধরনের ভক্ত। একটা সরল-সোজা পথ। যে পথে গেলে আর ফিরে আসতে  হয় না। আর একটা পথ হচ্ছে, চক্রাকারে, যেটা ঘুরে ফিরে আবার একই জায়গায় মিলিত হয়। একদল বলছেন, ভগবান আমি মুক্তি চাই না।  আমি যেন তোমার দাসানুদাস হয়ে থাকতে পারি।  তোমার স্মরণাগতি  নিয়ে থাকতে পারি। এই চক্রটি বিশাল।  ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ ও সত্যম।  এই সত্যম বা ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরতে হয়।
আর সরলরেখা ধরে  যারা যান, অর্থাৎ সেই বিরাট পুরুষের লীলালোকে, তারা আর ফিরে আসেন না। এই দুটো পথই সাধকদের জন্য।  অর্থাৎ এই জীবনে আপনি যে পর্যন্ত সাধনায় অগ্রসর হলেন, পরবর্তী জীবনে আপনি সেখান থেকে শুরু করবেন, এবং সাধনার উপুযুক্ত সময় ও পরিবেশ পাবেন।
আর একটা উপায় হচ্ছে, স্থান বা ক্ষণ মহত্ত্ব। পাণ্ডবেরা, স্বর্গারোহন করবার জন্য, উত্তরদিকে যাত্রা করেছিলেন । আমাদের অনেকের ধারণা হচ্ছে কাশীতে  মৃত্যু বরন আর মরজগতে ফিরে আসতে  হয় না। বা দেবস্থানে মৃত্যু  করলে জন্ম মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।  আবার সময় ভেদ মানুষকে জন্ম মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেতে পারে।   ভীষ্মদেব, উত্তরায়ণে মৃত্যু কামনা করেছিলেন । কিন্তু কেন ?
আমরা জানি সূর্য্য পুব থেকে পশ্চিমে যায়। যে সব জীব মাত্র এক দিন বাঁচে, এই বিশ্বাস নিয়েই তারা মারা যায়।   সূর্য্যের আর একটা গতি আছে, সেটা হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ।  যারা এক বছর  বা তার বেশি বাঁচে, তারা এটা খেয়াল করলেই ধরতে  পারবে। সূর্য্য যখন, উত্তর দিকে যায়, অর্থাৎ পৌষসংক্রান্তি থেকে আষাঢ়মাসের সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত সূর্য্যের গতি উত্তর দিকে থাকে। আবার আষাঢ়মাসের সংক্রান্তির দিন  থেকে পৌষমাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত দক্ষিণ অভিমুখী থাকে। ভারতের উত্তর দিকে হিমালয়, যেখানে দেবতাদের বাস। এবং উত্তর দিক উচ্চ অবস্থান, আমাদের দক্ষিণে সমুদ্র, অর্থাৎ নিম্ন ভূমি। সাধক সব সময় উর্দ্ধগতি প্রাপ্ত হতে চান । তাই নিম্নগতির সঙ্গে দক্ষিণ, আর উর্দ্ধ গতির সঙ্গে উত্তর গমনের একটা ভাবনা আমাদের প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে।
আমরা দেহ-মন ও আত্মার সম্মিলিত সত্ত্বা। আমরা  যখন দেহভুমিতে থাকি, তখন আমরা পশুবৎ। যখন আমরা মনোভূমিতে থাকি তখন, আমরা মননশীল বা মানুষ । আর যখন আমরা আত্মভূমিতে থাকি, তখন আমরা দেবতা বা মহামানব । আত্মা যখন সাধনা আরম্ভ করলো, তখন সে উত্তরের দিকে চললো। ধ্রুব নক্ষত্র তখন আমাদের মাথার উপরে।  ধ্রুব অর্থাৎ অচল সত্য তখন আমাদের মাথার উপরে। উত্তরদিকে গেলে সনাতন সত্য শিবে আরোহন করি আমরা। এর বিপরীতে চললে, ধ্রুব নক্ষত্র নিচের দিকে নাবতে লাগলো। সূর্য্য দক্ষিণের দিকে যেতে লাগলো। আমরা ভোগাভিমুখী হতে লাগলাম। সুতরাং ঈশ্বর বিমুখ হয়ে গেলাম।
আবার বলা হয়ে থাকে, আমাদের মন চন্দ্র দ্বারা প্রভাবিত। শুক্লপক্ষে চাঁদের উদয়ে মন আত্মমুখী।  আর কৃষ্ণপক্ষে আমাদের মন দেহমুখী। রাতে চাঁদের রাজত্ব, মানসিক উন্নতির সময় ।  তাই সাধকরা রাতে জেগে থাকেন। আমরা  রাতে নিদ্রিত থাকি । বলা হয়ে থাকে রাতে যারা সাধনার জন্য  জেগে থাকেন, তারা দেবযানে যাতায়াত করেন, আর যারা নিদ্রা যান তার পিতৃযানে যাতায়াত করেন।  পিতৃযান মানুষকে চক্রাকারে ঘোরায়।  অর্থাৎ জ্জন্মমৃত্যুর চক্র তার পরিক্রমার পথ।  আর দেবযান দিব্যলোকে নিয়ে যায়।  যেখানে গেলে,  ফিরে আসতে না চাইলে, আর ফিরে আসতে  হয় না।
এই দুই পথের সন্ধান যার জানা আছে, তিনি মোহগ্রস্থ হন না। তবে বই পড়ে জানা, বা কারুর কাছ থেকে শুনে জানা, জানা নয়, বিবেকগুরুর কাছ থেকে জানাই জানা। তাই ভগবান অর্জুনকে বলছেন, যোগযুক্ত হও হে অর্জুন।  "যোগযুক্ত ভবার্জ্জুন " ।
এবার আমরা আলোচনার শেষ দিকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, একমাত্র অনন্য ভক্তির দ্বারাই আমাকে অর্থাৎ পরম পুরুষকে  জানা যায়। এখন ভক্ত কে ?
 ভক্ত হচ্ছেন তিনি যিনি : ১. সর্বদা আমার নাম কীর্ত্তন করেন ; ২. যিনি সর্ব্বদা আমাকে পাবার জন্য চেষ্টা করেন। ৩. আমাকে পাবার জন্য সাধনমার্গে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকেন ; ৪. যিনি সর্ব্বদা আমাকেই নমস্কার করেন। ৫. সব সময় আমাতে যুক্ত থেকে আমারই উপাসনা করেন। এর থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যিনি কর্ম্মে, চিন্তনে, মননে সর্ব্বদা শ্রীহরিতে যুক্ত থাকেন তিনিই ভক্ত।
শ্রী ভগবান বলছেন, প্রাপ্য বস্তু হচ্ছে ভগবান আর প্রাপ্তির উপায় হচ্ছে ভক্তি। ভাগবত তত্ত্ব জ্ঞাত যে ভক্ত তিনি সেই পরমধামে নিত্য বিরাজ করেন। তার আর এই মর জগতে ফিরে আসতে  হয় না ।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ ; হরি ওং। .....
 -