২৩.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/২৮-৩/২৯
তত্ত্ববিত্তু মহাবাহো গুনকর্ম্ম-বিভাগয়োঃ
গুনা গুনেষু বর্ত্তন্ত ইতি মত্বা না সজ্জতে। (২/২৮)
হে মহাবাহো, গুন্ ও কর্ম্মের যথার্থ তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি মনে করেন, গুন্ গুনের মধ্যেই আছে, তাই তিনি তাতে আসক্ত হন না।
আমি যখন যার মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমি তাই হয়ে যাই। আমি যখন দেহের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমি দেহি হয়ে যাই, আমি যখন জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমি জ্ঞানী হয়ে যাই। আমি যখন পাপের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আমি পাপী হয়ে যাই। আমি যখন গুনের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমি গুণী হয়ে যাই। আমি যখন কর্ম্মের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমি কৰ্ম্মী হয়ে যাই। কিন্তু আমি আসলে এক শুদ্ধ আত্মা। আমার কোনো পরিবর্তন নেই। আমি অসঙ্গ। গুনের প্রকাশ আছে, দেহের প্রকাশ আছে, জ্ঞানের প্রকাশ আছে, পাপের প্রকাশ আছে, আবার এসবের নাশও আছে। যার প্রকাশ আছে, তার অপ্রকাশ আছে, যার জন্ম আছে, তার মৃত্যু আছে। আমি অজন্মা, আমি জন্ম মৃত্যুর উর্দ্ধে। আমি গুন্ ও কর্ম্মের উর্দ্ধে।
সাধনের উচ্চ অবস্থায়, এই জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে, তখন সে বুঝতে পারে, দেহ আছে দেহের মধ্যে, জ্ঞান আছে জ্ঞানের মধ্যে, গুন্ আছে গুনের মধ্যে, পাপ আছে পাপের মধ্যে। আর আমি আমাতেই স্থিত। কূটস্থে স্থিত হবার অভ্যাস যাঁর আয়ত্ত্ব হয়েছে, তিনি গুন্ ও কর্ম্মের পার্থক্য বেশ বুঝতে পারেন। আমি যখন স্থির থাকি তখন কে কি করছে, তা আমি বেশ বুঝতে পারি। আর আমি যদি অস্থির হই, তবে কে কোথায় কি করছে, তা আমার নজরে আসে না। আমি সাক্ষী স্বরূপ - কূটস্থে স্থিত আত্মা। তিন গুনের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) পরিনাম হচ্ছে দেহাদির ( ইন্দ্রিয়সকল) পৃথক পৃথক কার্য্য। যার সাক্ষী হচ্ছেন আত্মা যা আমার স্বরূপ। সাক্ষী ঘটনার নিরপেক্ষ দর্শক মাত্র। কর্ম্ম, গুন্, ইত্যাদি তাকে প্রভাবিত করে না। যাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের সুখ-দুঃখ-হর্ষ-বিষাদ আমাকে স্পর্শ করে না। তাদের হ্রাস-বৃদ্ধি-ক্ষয়ে আমার কিছু যায়-আসে না। কূটস্থে স্থির হয়ে থাকতে থাকতে এই সত্যে আমি প্রতিষ্টিত। দেহের ইন্দ্রিয়াদি সকল তাদের প্রথক পৃথক কার্য্যে লিপ্ত আছে। কখনো গুণবান হচ্ছে, কখনো জ্ঞানবান হচ্ছে, কখনো সে অজ্ঞান। কিন্তু আমি যা তাই আছি। আমার কোনো পরিবর্তন নেই। কূটস্থে কোনো তরঙ্গ নেই, তাই সেখানে না আছে ঢেউ, না আছে বুঁদবুঁদ। না আছে ক্রিয়া না আছে কর্ম্মফল। এখানে কোনো চিন্তার তরঙ্গ ওঠে না। তাই সদা সাম্যভাব বজায় থাকে। এখানে কোনো বিচারের প্রয়োজন নেই তাই বুদ্ধির এখানে কোনো প্রয়োজন নেই।
সাধকের এই অবস্থায় "আমি" জ্ঞান রুদ্ধ হয়। যখন আমি থাকে না তখন আমার বলেও কিছু থাকে। তুমি বলেও কিছু থাকে না। এখানে কোনো ইচ্ছা থাকে না তাই এখানে কোনো বিষয় থাকে না। এখানে কোনো মন থাকে না, তাই মমত্ত্ব বলে কিছু থাকে না। মন এখানে নিরোধের অবস্থায়। সমভাবে স্থিতি তাই সমাধি।
প্রকৃতেঃ-গুনসংমূঢাঃ সজ্জন্তে গুনকর্ম্মসু
তান-অকৃৎস্নবিদো মন্দান কৃৎস্নবিন্ন বিচালয়েৎ। (২/২৯)
প্রকৃতির গুনে মোহগ্রস্থ ব্যক্তি গুন ও কর্ম্মে আসক্ত হয়। এই অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন সেই সব অজ্ঞ অসমদর্শী মন্দমতিগণকে সর্বজ্ঞব্যক্তিগন কর্ম্ম থেকে বিচলিত করবে না।
গুরুকৃপায়, বোকা-মুর্খ সবার উদ্ধার হতে পারে। কিন্তু অলস ব্যক্তির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই। আচার্য্য শংকরের আনন্দগিরি নামে একজন শিষ্য ছিলেন, যার বুদ্ধি অন্য শিষ্যদের তুলনায় প্রখর ছিল না। কিন্তু তার ছিল গুরুর প্রতি নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা, গুরুবাক্যে ছিল অগাধ বিশ্বাস, এবং কর্ম্মঠ। তো একে আশ্রমের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হতো, কিন্তু বিদ্যা অর্জনের সময় তার অনুপস্থিতি অন্য শিষ্যদের কাছে ছিল গুরুত্ত্বহীন। আর যদি উপস্থিত থাকতোও সে শুধু গুরুমুখী হয়ে বসে থাকতো - বুঝুক আর না বুঝুক - গুরুদেবের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো। কখনো তার ব্যতিক্রম হতো না। এই কর্ম্মঠ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন, তোটকাচার্য্য - যাঁর খ্যাতি যার পান্ডিত্য বিশ্বব্যাপি।
অলস ব্যক্তি ভালো পথ, ভালই গুরু পেয়েও সে পরিশ্রম বিমুখ বলে, নিজের উন্নতি করতে পারে না। যে নিজেকে উদ্ধার করবার মানসে উদয়-অস্ত পারিশশ্রম করে, তার ভার স্বয়ং ভগবান নিয়ে নেন। আর যারা অলস-বিলাসপ্রিয় তাদের গুরু কেন স্বয়ং ভগবানও উদ্ধার করতে পারেন না। তো মহাত্মাগণ বলছেন, অলস-অজ্ঞানীর কাছে জ্ঞানের কথা আলোচনা না করা শ্রেয়। সাধনক্রিয়াহীন ব্যক্তির চিত্ত অশুদ্ধ থাকে , আর ক্রিয়া না করলে, চিত্ত শুদ্ধ হবার সম্ভাবনাও থাকে না। অশুদ্ধ চিত্তের জ্ঞানের প্রকৃত ভাবের প্রকাশ ঘটে না, বরং বিকৃতভাবের প্রকাশ দেখা যায়।তাই অজ্ঞানীর সঙ্গে জ্ঞানের আলোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
--------------------------
২৪.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩০-৩/৩১
ময়ি সর্ব্বাণি কর্ম্মাণি সংনস্য-অধ্যাত্মচেতসা
নিরাশীঃ-নির্ম্মমো ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ। (২/৩০)
বিবেক বুদ্ধিসহকারে সমস্ত কর্ম্ম তুমি আমাতে সমর্পন করে বাসনা ও মমতাশূন্য হয়ে শোক ত্যাগ করে তুমি যুদ্ধরূপ কর্তব্য কর্ম্ম করো।
"আমি নিজের জন্য কাজ করছি", এই কথা না ভেবে, যদি আমি ভাবি "আমার কাজের জন্য অন্যের উপকার হচ্ছে," অর্থাৎ অন্যের উপকারের উদ্দেশ্য নিয়ে যদি কাজ করি, তবে দেখা যাবে, কাজের পরিশ্রম লাঘব হয়ে যাবে। এমনকি কাজে উৎসাহ বাড়বে। আরো একটু উচ্চভাব, অর্থাৎ "আমার কাজ হচ্ছে আত্মার সন্তুষ্টির জন্য," তবে দেখবেন, আপনার কাজের মান উন্নত হবে, নিজের কাজের মধ্যে একটা প্রফুল্লতা অনুভব করবেন।
চিত্ত যখন আত্মাতে সংস্থাপিত হবে, তখন সেই অবস্থাকে বলে অধ্যাত্মচিত্ত। আমাদের মনের মধ্যে অসংখ্য বাসনা, ব্যাথা বেদনা, সুখের স্মৃতি, দুঃখের স্মৃতি জমে আছে। মনের দরজা খুললেই এইসব দৃশ্য ভেসে আসবে। এই সব দৃশ্য যখন চোখের সামনে ভাসে, তখন তার একটা আকার আমাদের চোখের সামনে ভাসে। এই ভাবের বা চিন্তার দৃশ্য বেশিক্ষন থাকে না। চিত্তের স্পন্দনের সঙ্গে চিত্রের আকারের পরিবর্তন হয়। কিন্তু মন যখন বিষয়বিমুখ হয়ে আত্মাতে স্থিত হয়, তখন এই চিত্তের চঞ্চলতা থাকে না। আর চিত্ত যখন অচঞ্চল তখন এইসব চিত্রের আগমন-নির্গমন বন্ধ হয়ে যায়। একেই বলে চিত্তের একাগ্রতা। এই একাগ্রতা সাধনার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হতে হতে বিষয়-স্মৃতি লোপ পায়। একেই চিত্তের নিরুদ্ধ অবস্থা বলা হয়ে থাকে। এই নিরুদ্ধ ভাব যখন স্থায়ী হয়, তখন তাকে সমাধি বলে। সমাধি অবস্থায় চিত্ত কেবলমাত্র আত্মস্থিত হয়ে থাকে। এই অবস্থা পাবার জন্য, যার চিত্ত সচেষ্ট, তিনিই আধ্যাত্মিক পুরুষ। এই অবস্থায় সমস্ত কর্ম্ম ব্রহ্মে সমর্পিত হয়। সাধন ক্রিয়া করতে করতে সাধনার উচ্চ থেকে উচ্চতর অবস্থায় সাধন উন্নীত হন। সেই উন্নততর অবস্থায় আর আসক্তযুক্ত কর্ম্ম করতে পারেন না। যেটুকু কর্ম্ম তার দ্বারা সম্পাদিত হয়, তা যেন স্বতঃস্ফূর্ত এবং ফল লোককল্যান। কর্ম্মে যতক্ষন কর্ত্তা ভাব থাকে ততক্ষন কর্ম্মের উত্তাপ তাকেই সহ্য করতে হয়, কিন্তু একটা সময় আসে, যখন কর্ম্মের ফলে যে উত্তাপের উদ্ভব হয়, তা লাগে সন্নিহিত লোকজনের গায়ে। আর সেই কর্ম্ম কেবলমাত্র শুভ ফল প্রদান করে থাকে।
এখন কথা হচ্ছে, এই অবস্থা কিভাবে প্রাপ্ত হওয়া যায় ? দুধ স্থির হয়ে থাকলে যেমন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দই হয়ে যায়, দুধ জাল দিলে যেমন ক্ষীর হয়ে ওঠে, আবার দই মন্থন করতে করতে যেমন মাখন উঠে আসে, তেমনি এই সাধন ক্রিয়া। প্রথম কথা হচ্ছে, নিজেকে অর্থাৎ শরীরকে প্রথমে স্থির করতে হবে।অর্থাৎ আসনে অভ্যস্থ হতে হবে। এই অভ্যাস গড়ে উঠলে, ধীরে ধীরে শরীরের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে। একটা স্থিরতা আসবে। মনের মধ্যে পূর্ব-পূর্ব সংস্কার স্মৃতির আকারে উঠে আসবে। অথাৎ দুধ দইয়ে পরিণত হবে। এর পরে শুরু করতে হবে মন্থন। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রাণায়ামের ক্রিয়া করতে হবে। অনুলোম বিলোপ ক্রিয়া করতে হবে। অর্থাৎ সংস্কারের শোধন করতে হবে। নতুন সংস্কার ওঠাতে হবে। তৃতীয় প্রক্রিয়া হচ্ছে, শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি করতে হবে আর তা হবে কুম্ভকের সাহায্যে। বাহ্য কুম্ভক - অন্তর কুম্ভক। অর্থাৎ দুধ জাল দিয়ে ক্ষীরে পরিণত করতে হবে।
দেহ-মন-বুদ্ধিকে যিনি সর্বদা জাগ্রত রেখে সাধন-ক্রিয়া করছেন, তার মধ্যে ভর্গ অর্থাৎ জ্যোতির আবির্ভাব হবে। এই জ্যোতি বা প্রকাশশক্তিই আসলে শরীর মন এর নির্মাতা। তাহলে এই যে কৃত-কর্ম্ম তা আসলে শরীর বা মনের নয়, এই শক্তি আসলে প্রাণের শক্তি। তো প্রাণের কর্ম্মকে নিজের বলে মনে হলেই কর্ত্তাভাবের উৎপত্তি হয়। কিন্তু কার দ্বারা কর্ম্ম প্রেরিত হচ্ছে তা বুঝতে পারলেই, কর্ত্তাভাবের নিস্পত্তি হয়ে যাবে। এই অবস্থাই অহঙ্কারশূন্য অবস্থা।তখন অধ্যাত্মচিত্ত হওয়া অর্থাৎ নিরাশী ও নির্ম্মম হওয়া সম্ভব হবে। ইন্দ্রিয়-সকল তখন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে তা নয়, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের যে স্বাভাবিক গতিমুখ, অর্থাৎ বিষমুখী গতি তখন অন্তর্মুখী হয়ে যাবে। প্রাণ আত্মস্থ ও স্থির হলে মন শরীরকে পরিচালনা করবে না। তখন আত্মার অনুগত হয়ে শরীর-মন আত্মহারা হয়ে যাবে। তো শরীর -মন-বুদ্ধি সবই যখন আত্মস্থ তখন সব কর্ম্মও সেই আত্মা দ্বারা পরিচালিত হওয়ায়, অহংবোধের লোপ পাবে। অহংবোধ একসময় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। এই অবস্থায় সাধককে যেতে গেলে, সাধককে অবশ্য়ই সমস্ত আলস্য ত্যাগ পরে, সাধনক্রিয়া অর্থাৎ যুদ্ধে নেমে পড়তে হবে। একেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ" ।
বিঃদ্রঃ ক্রিয়া ও কর্ম্মের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। কর্তাভাবের সঙ্গে কোনো কিছু করাকে বলে কর্ম্ম। অর্থাৎ এখানে দুইয়ের অবস্থান কর্তা ও কার্য্য। আর যখন কার্য্যের সঙ্গে কর্তৃত্ত্বভাব থাকে না তখন তা হয় ক্রিয়া। এখানে কার্য্য স্বয়ংসিদ্ধ। এখানে কর্তার আবির্ভাব নেই। এখন কথা হচ্ছে, কোনো কর্ম্ম সাধিত হলে স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে, এর পিছনে একজন কর্তা আছেন। আসলে সমস্ত কর্ম্মের পিছনেই এক ও অদ্বিতীয় শক্তি কাজ করে থাকে। কিন্তু যখন এর মধ্যে একজন মধ্যসত্ত্বা এসে যায়, তখন তাকে কর্তা বলা হয়ে থাকে।
যে মে মতমিদং নিত্যম-অনুতিষ্ঠন্তি মানবাঃ
শ্রদ্ধাবন্তঃ-অনসুয়ন্তঃমুচ্যন্তে তে-অপি কর্ম্মভিঃ। (৩/৩১)
যারা শ্রদ্ধাবান ও অসুয়াবর্জিত (দোষ-দর্শন-বর্জিত) হয়ে আমার এই মতের নিত্য অনুষ্ঠান করে তারা কর্ম্মফল হতে মুক্তি লাভ করে থাকে।
এখানে দুটো শব্দ "শ্রদ্ধাবন্ত" ও "অনুসূয়ন্ত" কথাদুটোর উপরে গুরুত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। আর একটা হচ্ছে "মতমিদং" অর্থাৎ আমার মত মতো।
এখন কথা হচ্ছে আমার মত অর্থাৎ যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মত কি ? শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, পদার্থ, এমনকি কর্ম্মশক্তি এগুলো কারুর নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এগুলো ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে, আবার এগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে, বা এগুলোর কাজ শেষ হয়ে গেলে, এরা সবাই তার নিজস্ব জায়গায় ফিরে যাবে। বা ব্যবহারের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে একে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই হচ্ছে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের অভিমত।
এবার শ্রদ্ধাবন্ত - প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন না হয়েও, প্রতক্ষ্যের মতো নিঃসন্দেহ হয়ে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, এবং একটা পূজার্হ ভাব যার মধ্যে আছে, তাকেই বলা হচ্ছে শ্রদ্ধাবন্ত।
অনুসূয়ন্ত - অর্থাৎ এখানে ভগবান যে মতের কথা বলেছেন, তার মধ্যে দোষ না দেখবার কথা বলছেন। অসূয়া কথাটার অর্থ হচ্ছে দোষদৃষ্টি। অর্থাৎ ভালো মন্দ সবকিছুর মধ্যে যে দোষ খুঁজে বেড়ায়।
এখন কথা হচ্ছে আলস্য ত্যাগ করে অনাসক্ত হয়ে কর্ম্ম করাই যোগেশ্বরের অভিমত। এর ফলে কি হয় ? এরফলে সাধক ব্রহ্মতে স্থিত হন। সাধক যখন ব্রহ্মতে স্থিত হয়ে সমস্ত কর্ম্মফল আত্মাকে অর্পণ করেন তখন ভগবানের ইচ্ছে মতো কাজ হতে পারে। এখন এই কাজ করতে গেলে তার শারীরিক কষ্ট হতে পরে। এই কষ্টকে যে স্বীকার করতে চায় না, সে আলস্যে সময় কাটাতে চায়। অর্থাৎ ভগবানের ইচ্ছেকে সে উপেক্ষা করে। সে এটা বোঝে না যে এই কষ্টের মাধ্যমেই সে কেষ্টকে পেতে পারে। মঙ্গল ও অমঙ্গল সবই প্রকৃতির বসে হয়ে থাকে। আমরা আমাদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে, সুখ-দুঃখের পরিমাপ করে থাকি। কিন্তু এই প্রকৃতির যিনি অধীশ্বর তার প্রেয় ও শ্রেয় ভেদে কর্ম্মের বিভাগ করে থাকেন। যিনি দেহ-মনের সঙ্গে থেকে কর্ম্ম করতে থাকেন, তার কাজ প্রেয়। আর যিনি ঈশ্বরের শরণাগত হতে ক্রিয়া করেন, প্রকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, সেই জ্ঞানী পুরুষ এ ভারেই মুক্তির পথের সন্ধান পান।
এখন কথা হচ্ছে, ঈশ্বরের ইচ্ছে বা অভিমত বোঝা আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই আমাদের উচিত গুরুর নির্দেশে, ভালো-মন্দ বিচার না করে, গুরুবাক্যে শ্রদ্ধাশীল হয়ে যোগাদি ক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করা। তো শ্রদ্ধালু সাধক গুরুর উপদেশ মতো সাধনায় যথাসাধ্য পরিশ্রম করে থাকে। আবার এমনকিছু সাধক আছেন, তারাও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু পারিশ্রমবিমুখ তারা সহজে সবকিছু পেতে চায়। তারা ভাবে গুরুকৃপায় সব কিছু হয়ে যাবে। অবশ্য যারা গুরুবাক্যেও শ্রদ্ধাশীল নয়, আবার বিধিমত সাধনাও করতে চায় না, আবার কুতর্কে নিযুক্ত হন এদের জ্ঞানলাভ দূরের কথা, ধীরে ধীরে নিজেকে অধঃগতি সম্পন্ন করে থাকেন। গুরুবাক্যে শ্রদ্ধাশীল, ও পরিশ্রমী সাধকের সত্তর উন্নতি হয়ে থাকে।
-----------------------------
২৫.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩২-৩/৩৩
যে ত্বেতদ-অভ্য়সুয়ন্তো ন-অনুতিষ্ঠন্তি মে মতম
সর্বজ্ঞান-বিমূঢ়াংস্তান্ বিদ্ধি নষ্টান-চেতসঃ। (৩/৩২)
যারা অসূয়া-পরবশ হয়ে (অন্যের দোষ দেখার প্রবৃত্তি-বশতঃ ) আমার এই মতের অনুসরণ করে না - তারা দুর্বুদ্ধিযুক্ত, সর্বজ্ঞান-বর্জিত ও বিনাশপ্রাপ্ত জানবে।
পরের দোষ অর্থাৎ বিষয়ে মনোযোগ আর ব্রহ্মে অমনোযোগ । আমাদের মন চঞ্চল। পঞ্চভূতের এই শরীরে অবস্থিত ইন্দ্রিয়সকল এই চঞ্চল মনের নির্দেশেই কাজ করে থাকে। জন্মের পর থেকে আমাদেরকে বহির্মুখী হতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই স্বভাবতই আমরা সবাই বহির্মুখী। এই স্বভাব আমাদের আদতে পরিণত হয়ে গেছে। মন যার অস্থির, সে ব্রহ্মে স্থিত হতেই পারলো না। ফুলের শুধু সুগন্ধ নয়, ফুলে আছে মধু। ফুলে যে স্থির হয়ে বসতে পারেনি, সে মধুর সন্ধান পাবে কি করে ? তাই জোর করে ইন্দ্রিয়নিগ্রহ কোনো সুফল দিতে পারে না। যারা ভগবানের কথায় অশ্রদ্ধায়যুক্ত হয়ে সাধনক্রিয়া থেকে দূরে থাকে, তারা আত্মার স্থিরতা ব্যাপারটাই বুঝতেই পারে না। আর শান্তিও পায় না। মনুষ্য জীবন ধারনের যে উদ্দেশ্য তা ব্যর্থ হয়। সাধনক্রিয়া ব্যাতিত চিত্ত শুদ্ধ হতে পরে না। আর চিত্ত শুদ্ধ না হলে, সেই অশুদ্ধ চিত্তে কখনো শাস্ত্রের গূঢ় রহস্যঃ তার বোধগম্য হয় না। শাস্ত্রপাঠের পরে তা তার স্মৃতিতেও ধরে রাখতে পারে না। তো যে পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে সে সারা জীবন কাটিয়ে গেলো, সেই পঞ্চতত্ত্ব-এর গুনাগুনের রহস্য ভেদও সে করতে পারলো না। অর্থাৎ শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধের মধ্যে যে রহস্যঃ লুকিয়ে আছে, সে সম্পর্কে অনভিজ্ঞ রয়ে গেলো। মনুষ্য দেহ ধারনের ফলে যে বিরল সম্ভাবনার দেখা মিলেছিল, তার সদব্যবহার হলো না। জন্মের কারন সে জানতেই পারলো না। ধিক এই মনুষ্য জীবনের।
বিঃদ্রঃ : চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক এই পাঁচ জ্ঞানসাধন শরীরের বাহির-ইন্দ্রিয়। এর দ্বারা আমরা যথাক্রমে, রূপ, শব্দ,গন্ধ, রস, স্পর্শ অনুভব করতে পারি । এগুলো শরীর মাত্রেই বর্তমান। কিন্তু আমি যা শুনছি, আপনি হয়তো তা শুনছেন না, অথবা আপনি যা শুনছেন, আমি তা শুনছি না - অথবা অন্যরকম শুনছি। সুতরাং আপনার শোনা আর আমার শোনার মধ্যে একটা পার্থক্য হতে পারে। আপনি যা দেখছেন, আমি হয়তো তা দেখছি না - বা আমি হয়তো অন্যরকম দেখছি, অথবা কিছুই দেখতে পাচ্ছি না । এই অবস্থায় আমাদের মধ্যে দেখার বা শোনার পার্থক্য ও বিভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু আপনার আমার মধ্যে একজন দ্রষ্টা বা শ্রোতা অবশ্য়ই আছেন । তো ইন্দ্রিয়ের বিষয়-জ্ঞানের একজন গ্রাহক অবশ্য়ই আছে। কে তিনি ?
বলা হয়ে থাকে, শরীর ও মস্তিষ্কের সমস্ত উপাদান ৭ বছরের মধ্যে, কেউ বলেন ১৪ বছরের মধ্যে পরিবর্ত্তন হয়। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, স্মৃতি, যা আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে সংরক্ষিত আছে বলে ভাবি, তার কোনো পরিবর্তন হয় না। জীবনের শেষভাগে এসেও এই স্মৃতি বজায় থাকে। তো মস্তিষ্কের সমস্ত কোষের পরিবর্তন হয়ে গেলো, কিন্তু স্মৃতি থেকে গেলো, এটা কিভাবে সম্ভব ? তার মানে একটা শক্তি আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে, যে আমাদের এই স্মৃতিকে ধরে রাখছে। আসলে শরীর বা ইন্দ্রিয়গণ হচ্ছে করন, আর সেই মূল শক্তি হচ্ছে কর্তা।
আবার প্রাণশক্তি না থাকলে, শরীর অকেজো হয় যায়। কিন্তু প্রাণশক্তি থাকলেও কি আমরা সব সময় চৈতন্যবান থাকতে পারি। আমরা অনেক সময় আকস্মিক আঘাতে মূর্ছা যাই, তখন আমাদের জ্ঞান থাকে না। কিন্তু আমাদের শরীর বেঁচে থাকে । তো জ্ঞানহীন অবস্থায় বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু শুধুই শ্বাসের প্রবাহ আমাদের শরীরকে জ্ঞানবান রাখতে পারে না। অর্থাৎ শরীরে প্রাণের প্রবাহ থাকলেও, আমি আছি কি নেই, সেই বোধ আমাদের লোপ পেয়ে যায়।
অতএব এটা আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে , আমাদের সতেজ জ্ঞান-ইন্দ্রিয়, আমাদের প্রাণশক্তি ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও, আমি যে আছি এই বোধ আমাদের নাও থাকতে পারে। তার মানে আমাদের এই দেহে এমন কোনো পদার্থ আছে, তার দ্বারা আমরা জ্ঞান, সূখ, দুঃখ, রাগ, দ্বেষ, ইচ্ছে, অনিচ্ছা ইত্যাদির অনুভব হয়। এই অনুভবশক্তি যার মধ্যে আছে, তাঁকেই বলে জীবাত্মা।
এই জীবাত্মাই সমস্ত জ্ঞানের কর্তা, সমস্ত কর্ম্মের কর্তা, এমনকি সমস্ত ভোগের কর্তা। অর্থাৎ জ্ঞাতা, ভোক্তা ও কর্তা হচ্ছে জীবাত্মা। শরীর জড়, কিন্তু শরীর চৈতন্যবান হয় আত্মার সংস্পর্শে এসে। উভয়ের কিভাবে যোগ সম্পন্ন হতে পারে, সে সম্পর্কে ধীরে ধীরে শুনবো।
সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতেঃ জ্ঞানবান-অপি
প্রকৃতিং যান্তি ভুতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি। (৩/৩৩)
জ্ঞানবান ব্যক্তিও নিজের প্রকৃতির অনুরূপ চেষ্টা অর্থাৎ কার্য্য করেন। সমস্ত প্রাণীগণ প্রকৃতির অনুসরণ করে ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ করে আর কি করবে ?
বিষয় বাসনাও থাকবে, আবার কূটস্থে মন থাকবে, এই দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়। বিষয়ে মন থাকলে সাধনক্রিয়া সম্ভব নয়। মন যতক্ষন পঞ্চতত্ত্বে থাকবে, ততক্ষন যতই আপনি মনকে বোঝাতে চেষ্টা করুন না কেন, ইন্দ্রিয়গুলোকে নিষ্ক্রিয় রেখেই, আপনার মনের মধ্যে বিষয়চিন্তায় মগ্ন থাকবে।অর্থাৎ আপনার চোখ দেখছে না, কান শুনছে না, মুখে কথা বলছেন না, তথাপি, মনের মধ্যে চিন্তার শেষ নেই। কিন্তু এর থেকে বেরুবার উপায় কি ? দেখুন সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই তিন গুনের সাম্যাবস্থা হচ্ছে প্রকৃতি। প্রকৃতি যখন সত্ত্ব ভাবাপন্ন হন, তখন মন থাকে ঈশ্বরমুখী। এইসময় সংসারের কাজে মন বসে না। এইসময় আমাদের সূর্য নাড়ী ও চন্দ্র নাড়ী উভয় নাড়ী দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়। তখন প্রকৃতির মধ্যে একটা হিল্লোল চলতে থাকে। সমস্ত কিছু তখন চৈতন্যময়ী বলে মনে হয়। আর এই চৈতন্যময়ীর মধ্যে তখন প্রাণবায়ু স্থির হয়ে যায়। আর শরীর, মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয় তখন প্রকৃতিকে অনুসরণ করে শুদ্ধসত্ত্ব অর্থাৎ সাম্য ভাবাপন্ন হয়। সমস্ত বহির্মুখী বৃত্তি তখন নিজে থেকে গুটিয়ে আত্মাতে স্থির হয়ে বসে।একটা শান্তির বাতাবরণ, একটা শীতল বাতাস বইতে থাকে প্রাণে-মনে-শরীরে। প্রকৃতির এই সাম্যাবস্থা থেকেই একদিন তরঙ্গ উদ্ভূত হয়েছিল - শুরু হয়েছিল এই সংসার রচনার কাজ। আবার এই সংসারের ওপারে যেতে হলে, পঞ্চতত্ত্বকে অতিক্রমন করে পরম পুরুষের কাছে যেতে হবে। তখন সমস্ত ইন্দ্রিয় নিজে থেকেই শান্ত হয়ে যাবে। তাই ইন্দ্রিয়কে জোর করে নিষ্ক্রিয় করা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। কিন্তু যখন মন ইন্দ্রিয় থেকে কূটস্থে স্থির হবে, তখন ইন্দ্রিয় শান্ত হবে। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়কে শান্ত করবার জন্য ইন্দ্রিয়-নিগ্রহের দরকার নাই। শুধু মনকে ইন্দ্রিয় থেকে উঠিয়ে আনতে পারলেই হলো।
এখন কথা প্রকৃতির স্বভাবকে বাধা দেওয়া চলবে না। তাহলে আমরা আত্মমুখী হবো কিভাবে ? মহাত্মাগণ বলছেন, এটি শুধু অভ্যাসের দ্বারাই সম্ভব হতে পারে। দেখুন আমরা কেউ দুই মিনিট চিন্তাহীন অবস্থায় বসে থাকতে পারি না। এমনকি শরীরকে স্থির অবস্থায় বেশিক্ষন রাখতে পারি না। হয় শরীরের কোথাও চুলকানি শুরু হবে, নয়, মন বিষয় চিন্তায় মগ্ন হবে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, নিরন্তর একটা অভ্যাসে মধ্যে আমাদের ঢুকতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে নির্দিষ্ট আসনে বসে থাকতে থাকতে একটা অভ্যাস তৈরী হয়ে যাবে। আবার মনের চিন্তাকে প্রথমে ঘুরে বেড়াতে দিন। কিন্তু খেয়াল রাখুন কোথায় কোথায় সে ঘুরতে বেড়াতে ভালো বাসছে। আপনি যদি চেতন থাকেন, তবে, মনকে ধরে একটা নির্দিষ্ট বস্তুর মধ্যে, তা হতে পারে, কারুর মূর্তি, বা প্রদীপের আলোকরশ্মি, নতুবা কোনো কাল্পনিক আলোকবিন্দু , নিবদ্ধ করুন। বারবার এই অভ্যাস করতে করতে একদিন দিন দেখবেন, মন আপনার ইষ্টে স্থির হয়েছে। আর আপনি নির্দিষ্ট আসনে, নির্দিষ্ট সময়ে বসলেই, আপনার মন তার নিদিষ্ট ইষ্টে স্থির হয়েছে। একমাত্র নিরন্তর অভ্যাস এই অলৌকিক কাজটি করে দিতে পারে।
আমাদের জন্ম জন্মান্তরের সংস্কার। স্বাভাবিক ভাবেই এই সংস্কারের প্রাবল্য থাকবে। কিন্তু অভ্যাস আপনার এই পুরোনো সংস্কারকে বদলে দেবে। অস্থির মন শান্ত হবে। চেষ্টার অসাধ্য কিছু নেই। চেষ্টা করলেই কিছু দিনের মধ্যেই মন স্থির হয়ে আসবে। এই কাজে সাহায্য করতে পারে, প্রাণায়াম। এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের গতির দিকে খেয়াল রেখে বসে থাকলেও, অর্থাৎ নাসিকাগ্রে মনকে বা দৃষ্টিকে স্থির রেখে বসে থাকলেও, মন শান্ত হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, পুরুষার্থের প্রয়োগে, আর ভগবৎ-শক্তির কৃপায় সমস্ত অসম্ভব সম্ভব হতে পারে।
----------------------------------------
২৬.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩৪
ইন্দ্রিয়স্য -ইন্দ্রিয়স্য-অর্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ
তয়োর্ন বশমাগচ্ছেৎ তৌ হ্যস্য পরিপন্থিনৌ। (৩/৩৪)
ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রিয়ত্ত্ব অর্থাৎ চক্ষু কর্ন নাসিকা জিহ্বা ত্বক এর যে বিষয়কার্য্য অর্থাৎ শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ ইত্যাদির প্রতি অনুরাগ নিশ্চয়ই আছে অর্থাৎ স্বাভাবিক যে গুন্ - এদের বশবর্তী হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তারা মুমুক্ষু-জীবের ঘোর বিরোধী।
পুরুষ যদি প্রকৃতির অধীন হয় তবে ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠিত হতে পরে না। সমস্ত শাস্ত্র তাহলে মিথ্যা হয়ে যায় । ইন্দ্রিয়সকল তাদের নিজ নিজ বিষয়ের প্রতি ধাবিত হবে। পছন্দের বিষয়ে অনুরাগ হবে, আবার অপছন্দের বিষয়ে বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হবে। এইভাবেই প্রকৃতি জীবকুলের প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এটাই প্রকৃতির বৈশিষ্ঠ। এখন শাস্ত্র বলছে, এদের বশবর্তী না হতে। তাহলে প্রকৃতির বন্ধনে থাকবে। মুক্তি হবে না। বিষয়ের স্মরণ, বিষয়ের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের উৎপন্ন করে থাকে। কিন্তু ভগবত স্মরণ তাকে ভগবানের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি করে।
ভগবানের স্মরণ মুমুক্ষ পথের দিশারী। আর ইন্দ্রিয়ের কাছ থেকে আমাদের দূরে সরে থাকতে হবে, তাকে কেবল উপেক্ষা করলেই হবে না, তার ক্রিয়া-পদ্ধতি সম্পর্কেও সাধককে অবহিত হতে হবে। ইন্দ্রিয়ের বশ্যতা স্বীকার করো না - এই কথা বলা যত সহজ, কার্যত একে রূপায়ণ করা তত সহজ নয়। চোখ থাকলে দেখবে, কান থাকলে সে শুনবে, নাকের মধ্যে সুগন্ধ দুর্গন্ধ আসবে, ত্বকে শীত-গ্রীষ্ম অনুভব হবে, মুখ কথা বলবে। এগুলোকে বাহ্যিক দিক থেকে বন্ধ করলেই এদের থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। আবার এদেরকে অবহেলা করেও জীবনধারন সম্ভব নয়। কেননা এগুলো জীবধারনের জন্য অপরিহার্য অঙ্গ। এমনকি এই যে মন, একেও তুমি সহজে ভালো করতে পারবে না। কেননা ইন্দ্রিয় যেমন বহির্মুখী হয়ে বিষয়ে লিপ্ত হবে, তেমনি মন এই বিষয় থেকে ভালো মন্দ আস্বাদ গ্রহণ করবে। ভালো জিনিস খেলে, ভালো কথা শুনলে, তোমার ভালো লাগবে না এটা হতে পারে না। আবার খারাপ কথা শুনলে, খারাপ জিনিস খেলে, তোমার খারাপ লাগবে না এটাও হতে পারে না।
এখন কথা হচ্ছে তাহলে আমরা কি করবো ? আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে তো যেতে পারবো না। আবার প্রকৃতি স্বভাবতই মুমুক্ষ বিরোধী। ভগবান বলছেন, প্রকৃতির কাজ প্রকৃতি করুক, তুমি তাতে অসহিষ্ণু হয়ো না। প্রকৃতির কাজ প্রকৃতি করুক আর তোমার কাজ তুমি করো। তোমার মন যতক্ষন ইন্দ্রিয়-কর্ম্মে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষন তোমার মধ্যে ইন্দ্রিয়-কর্ম্মের প্রভাব পড়বে। এর থেকে বেরুতে গেলে, মনকে আত্মক্রিয়ায় নিয়োগ করতে হবে। মন যখন আত্মমগ্ন হবে, তখন বিষয় থেকে দূরে থাকবে।
এই অভ্যাস নিরন্তর চালিয়ে যেতে হবে। চোখ সুন্দর অসুন্দর অবশ্যই দুই-ই দেখবে। আর আমাদের মতো সাধারনের মানুষ অসুন্দর থেকে মন অবশ্য়ই ফিরিয়ে নেবে, আর সুন্দরের দিকে ধাবিত হবে। রূপ মনকে আকৃষ্ট করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পুরুষার্থের কাজ হচ্ছে, সাধকের কাজ হচ্ছে, এই রূপে প্রলুব্ধ না হওয়া।
রূপের পরিণতি জ্ঞান থাকলে বা পূর্বাপর জ্ঞান থাকলে, আমরা বুঝতে পারবো, যা কিছু দেখছি সবই মায়া। এই আছে এই নাই। আজ যে রপবতী বা রূপবন্ত, কালের পরিণতিতে সে একদিন শুকিয়ে ঝরে পড়বে। সুন্দরী বৃদ্ধা হবে - সৌন্দর্য্য ম্লান হতে হতে একদিন কদর্য হয়ে যাবে। আত্মার অবর্তমানে সেখানে পচন শুরু হবে, দুর্গন্ধ বেরুবে। বারবার মনের মধ্যে এই চিন্তার পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে, অর্থাৎ বস্তুর পরিণতি জ্ঞান হলে, বস্তুর প্রতি মনের আকর্ষণ ধীরে ধীরে লোপ পাবে।
নিবৃত্তির আরো একটা উপায় হচ্ছে, যে বিষয়ে তোমার মন আকৃষ্ট হচ্ছে, মনকে সেই বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে নিয়ে যাওয়া। ৪/৫ বার দীর্ঘ অর্থাৎ জোরে জোরে শ্বাসে-প্রশ্বাসের ক্রিয়া অর্থাৎ প্রণায়াম করলেও নাড়ীর উত্তেজনা প্রশমিত হবে। সাধন ক্রিয়ার সাহায্যে ইন্দ্রিয়ের রাগ-দ্বেষ প্রশমিত হলে মন শুভপথের সন্ধান করবে। তখন শাস্ত্রবাক্য, গুরুবাক্য ইত্যাদিতে মন আকৃষ্ট হবে। পুরুষার্থ মানে অহংকার নয়, পুরুষের বিষয়কেই বলে পুরুষার্থ। পরম পুরুষ হচ্ছেন, নির্গুণ, নির্লিপ্ত, আপনাতেই আপনি স্থিত। এই পুরুষের প্রয়াসকে বা পুরুষের স্বভাবকে যার দ্বারা আয়ত্ত্ব করা যায়, তাকেই বলে পুরুষার্থ। প্রকৃতির বশীভূত যারা তারা পুরুষার্থের প্রয়োগে ব্যর্থ। তারা বৃথা আলস্যে, আমোদে দিন অতিবাহিত করে। আর সুখ-দুঃখের তাপে দগ্ধ হয়। ইন্দ্রিয়ের যে বিষয়ে আসক্তি, যার দ্বারা রাগ দ্বেষের উৎপত্তি তা যে শুধু নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে শেষ করা যাবেই, তা না-ও হতে পারে। সেজন্য দরকার, নিরন্তর সৎসঙ্গ, সৎগ্রন্থ পাঠ। গুরুবানী শ্রবণ। আর এর থেকে ধীরে ধীরে বিষয়ের জ্ঞান জন্মে। নিত্য ও অনিত্যের জ্ঞান আসে। সৎ-আলোচনা শুনতে শুনতে, সদগ্রন্থের বিষয়কে মনন করতে করতে একসময় নিজের মধ্যে জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে। মুমুক্ষের জন্য প্রাণ আঁকুপাঁকু করতে থাকে। ভগবত স্মরণ করতে করতে ভিতরে একটা ভগবত-আনন্দের অনুভূতি হতে শুরু করে। এই নির্মল-আনন্দ আমাদের মধ্যে নতুন সংস্কারের জন্ম দেবে। আর এই নতুন সংস্কার আমাদের প্রকৃতির উপরে জয় লাভ করতে সাহায্য করবে। তখন প্রকৃতির উপরে নির্ভরতা ছাড়িয়ে আত্মনির্ভর হবে মন। ধ্যান-জপ-আসন-প্রাণায়াম ইত্যাদিতে মন আকৃষ্ট হবে। আর এই সাধনক্রিয়ার স্বল্প বিচ্যুতিও তখন মন মেনে নিতে পারবে না। জগতের সমস্ত কিছুই অনিত্য, এখান থেকে সংগ্রহ করে রাখবার মতো কিছু নেই। এই বোধ যখন জন্মাবে, তখন জাগতিক দ্রব্যের প্রতি লোভ করবার মতো আর কিছু থাকবে না। বিষয়ের সংস্পর্শে এলেও, বিষয়কে বিষবৎ মনে হবে। নিজেকে ভুলেও আর কর্ত্তা মনে হবে না। মন-প্রাণ ভগবৎ চরণে নিবেদিত হবে। প্রতিনিয়ত ভগবৎ স্মরণ করতে করতে, মনকে ভগবানের সঙ্গে একত্মবোধ করতে শুরু করবে। প্রকৃতি মুমুক্ষুতার বিরোধী শক্তি। এই প্রকৃতির শক্তিকে তখন মন অবজ্ঞা করবে। নিরন্তর ব্রহ্মকথা শুনতে শুনতে, সাধনক্রিয়া করতে করতে, শরীরের রাসায়নিক মিশ্রনের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা দেবে। একটা সময় মনে হবে "আমি ব্রহ্মই"। অবিদ্যার বিক্ষেপ জনিত দুঃখের অবসান হবে।
-----------------------
২৭.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩৫
শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুনঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ (৩/৩৫)
ঠিকঠিক অনুষ্ঠিত পর-ধর্ম্ম থেকে, অঙ্গহীন স্বধর্ম্ম শ্রেষ্ঠ। স্বধর্ম্মে থেকে নিধনও কল্যাণকর, পর-ধর্ম্ম ভয়াবহ।
ইন্দ্রিয় তার নিজের স্বভাবজাত-কর্ম্ম করছে, তাকে বশ করা কঠিন। কেননা কারুরই স্বভাব সহজে পাল্টানো যায় না। আর ইন্দ্রিয় আত্মাতে স্থিত নয়, ইন্দ্রিয়ের পরিচালক হচ্ছে আমাদের মন। মন আবার বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই আমাদের যেটা কর্তব্য তা হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের কর্ম্মগুলোকে ভালোভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা। এই বিচার বিশ্লেষণ থেকেই আমরা ইন্দ্রিয়ের কর্ম্ম সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে আমরা জয় না করতে পারি, ইন্দ্রিয়ের বশ্যতা যেন আমরা স্বীকার না করি।
অনেকের ধারণা হচ্ছে, আমরা যদি সাধনক্রিয়া করি, আমরা যদি ভগবৎ স্মরণে থাকি তবে হয়তো আমাদের ইন্দ্রিয় মাথাচারা দেবে না, ইন্দ্রিয় তার কর্ম্ম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে। ব্যাপারটা এমন নয়। প্রকৃতিকে বশে আনা দুঃসাধ্য। যতই দৃঢ় সংকল্প করুন না কেন, চোখ সামনের দৃশ্যের প্রতি আকৃষ্ট হবেই। কান বাহ্যিক শব্দের অনুভব করবেই। আমি প্রকৃতি থেকে দূরে থাকতে চাই বললেই, আমি প্রকৃতি থেকে দূরে যেতে পারবো না। স্থুল দেহে বাস করবো, আর প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারন করবো, এটা হতে পারে না। তাহলে স্থুলদেহের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
আর এই মৃত্যুই আমাদের কাছে সবচেয়ে অনভিপ্রেত। আবার আসক্তিবশতঃ মনের মধ্যে যদি নিরন্তর চঞ্চলতা থাকে, তাহলেও আমাদের অমৃতের পথে যাওয়া হলো না, অর্থাৎ উভয় সংকট। প্রকৃতিকে প্রশ্রয় দিলে, অমৃতত্ব লাভ হবে না, আবার প্রকৃতির আশ্রয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। তাই আমাদের কাজ হচ্ছে মন-প্রাণের স্থির অবস্থা। আর এই মন ও প্রাণের স্থিরতা আনার কাজই স্বধর্ম্ম পালন। শরীর যেমন কর্ম্মক্ষেত্ৰ, তেমনি এই শরীর হচ্ছে আমাদের সাধন-ক্রিয়ার ক্ষেত্র। একদিকে যুদ্ধক্ষেত্র, অন্য দিকে ধর্ম্মক্ষেত্ৰ। এই দেহ হচ্ছে, পঞ্চতত্ত্ব, জ্ঞান ও কর্ম্মের আধার। তো এই ভূতগুলোর প্রতি দয়াও আমাদের ধর্ম্ম।
মেরুদন্ডকে আশ্রয় করে, যে সুষুম্না নাড়ী সহস্রার পর্যন্ত বিস্তারলাভ করে বিরাজ করে আছে, গুরুকৃপায়, তাকে চৈতন্যময় করতে পারলেই, জীবন সার্থক হয়। তখন জন্ম, জরা, মৃত্যুর অধীন এই দেহবন্ধন থেকে আমি অর্থাৎ আত্মার নিষ্কৃতি হয়। একেই বলে নিজের প্রতি নিজের দয়া। সাধনক্রিয়া ব্যাতিত এই দয়া-কর্ম্ম সম্পাদিত হতে পারে না। শুভ বা অশুভ উভয় কর্ম্মই একই মনুষ্য দেহে ক্রিয়াশীল হয়। শুভ-অশুভ উভয় কর্ম্মের আধার এই দেহ। দেহকে বাদ দিয়ে, কোনো কর্ম্মই হতে পারে না। যতক্ষন দেহের সংযাগে আমাদের সম্পর্ক থাকে ততক্ষন আমাদের কর্ম্মক্ষয় হয় না। আর কর্ম্মক্ষয় না হলে আমাদের এই ভববন্ধন কাটে না। সুতরাং সাধন ক্রিয়া করবার জন্য আমাদের এই দেহের অবশ্য়ই প্রয়োজন। প্রাণায়ামের কৌশল জেনে প্রাণায়ামের সাহায্যে শ্বাসকে চৈতন্য যুক্ত করে সুষুম্না রন্ধ্রে প্রবাহিত করতে হবে। এতে মনের চাঞ্চল্য চলে যায়। মন হয় স্থির। যোগীপুরুষের আদর্শে প্রাণায়ামের দ্বারা ও বিভিন্ন মুদ্রার দ্বারা তেজের প্রকাশ অনুভব হয়। এই তেজই প্রসবিতার বরণীয় শক্তি। তেজের মধ্যে কৃষ্ণবর্ণের বিন্দু বা গোলক দৃষ্ট হয়। এই গোলকস্থিত পুরুষকে জানতে পারলেই জীবের জীবন সার্থক হয়।
স্ব-ধর্ম্মে স্থিতি কথাটার অর্থ হচ্ছে, আত্মস্থে অবস্থান করা। নিজের মধ্যে স্থিত হওয়া। এই ধর্ম্ম পালন করতে গেলে, ভুল-ত্রুটি হবে। সাধন-ক্রিয়া ঠিক ঠিক মতো অনুষ্ঠিত না করতে পারলেও, এই স্ব-ধর্ম্মেই স্থিত থাকা ভালো। বিষয়-কর্ম্ম হচ্ছে, পর-ধর্ম্ম। এই বিষয়কর্ম্ম যতই নিপুন ভাবে করা হোক না কেন, আখেরে এতে কোনো লাভ নেই। কেননা এই বিষয়-কর্ম্ম যতই সঠিক ভাবে করা হোক না কেন, তা দেহাদিভাব অতিক্রম করতে পরে না। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদির যে ভোগাদি কর্ম্ম যা যতই প্রসংশার যোগ্য হোক না কেন, জীবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অর্থাৎ জীবের পরিত্রাণে এই বিষয়-ধর্ম্ম যাকে যোগেশ্বর বলছেন পরধর্ম্ম, কোনো কাজে আসে না। ইন্দ্রিয়ভোগে আসক্ত জীব একসময় ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম বলে চিৎকার শুরু করে। তাই ভগবান বলছেন, এই পর-ধর্ম্ম ভয়াবহ।
মহাত্মাগণ বলছেন, গুণাতীত অবস্থায়, জীবের পরিত্রান হতে পারে। এই গুণাতীত অবস্থায় যেতে গেলে, নিরন্তর তপস্যার ক্লেশ সহ্য করতে হবে। ইন্দ্রিয়সংযম হচ্ছে সর্ব্বপ্রধান ধর্ম্ম। ধর্ম্ম হচ্ছে জীবের পরিত্রানের পথ, স্ব-ধর্ম্ম হচ্ছে নিজের পরিত্রানের ক্রিয়া, সাধনক্রিয়া। বাহ্যিক ধর্ম্মানুষ্ঠান পুজো-পাঠ সাময়িক ভাবে, মানুষকে শান্তির সন্ধান দিতে পারে। কিন্তু এই পথ কেবল প্রাথমিক সাধকের পক্ষে ভালো। উচ্চতর সাধনায় অর্থাৎ প্রাণায়ামের ক্রিয়া দ্বারা ব্রহ্মে স্থিত হওয়া ভিন্ন স্ব-ধর্ম্ম পালন হতে পারে না। কঠ উপনিষদে (শ্লোক :২/১/৯/১১) যমরাজ বলছেন, কেবলমাত্র শুদ্ধ মনের দ্বারাই ব্রহ্মের উপলব্ধি সম্ভব। ব্রহ্ম থেকে পৃথক কিছু নেই.. ব্রহ্ম থেকে পৃথক কিছুতে যে বিশ্বাস করে সে মৃত্যু থেকে মৃত্যুতে যাত্রা করে। অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরতে থাকে। শ্লোক নং ২/১/১১/১২-১৩ তে আবার বলছেন, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমান পুরুষব্রহ্ম আমাদের দেহের অভ্যন্তরেই বাস করেন। তিনি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সাধক যখন ব্রহ্মকে জানেন, তখন তিনি নিজেকে আর গোপন করেন না। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমান পুরুষকে যোগীরা নিজ হৃদয়ে ধুম্রহীন অগ্নিশিখার মতো দেখেন।
অনু থেকেও সূক্ষ্মতর আকাশ থেকেও বৃহৎ, দেশ কালের অতীত এই ব্রহ্ম। বুদ্ধির অতীত, এই জীবাত্মা হৃদয়গুহায় বাস করেন। যোগী যখন কামনাশূন্য হয়ে, শোকাদি রোহিত হয়ে, ইন্দ্রিয়বর্গকে স্থির ক'রে, শুদ্ধ মনের অধিকারী হন, আত্মমুখী হন, তখন তিনি এঁর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হন।
------------
২৮.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩৬-৩৭
অর্জ্জুন উবাচ :
অথ কেন প্রযুক্তঃ-অয়ং পাপং চরতি পুরুষঃ
অনিচ্ছন্-অপি বার্ষ্ণেয় বলাদিব নিয়োজিতঃ। (৩/৩৬)
অর্জ্জুন বললেন, হে বার্ষ্ণেয়, মানুষ কার দ্বারা প্রযুক্ত হয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলপূর্বক পাপাচরনে নিয়োজিত হয় ?
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে অর্জ্জুন এবার বার্ষ্ণেয় বলে সম্মোধন করছেন। যদুকুলে বৃষ্ণি নামক বংশে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হওয়াতে তাঁকে বার্ষ্ণেয় নাম ডাকা হয়েছে। আসলে "বৃষ্" কথাটার অর্থ হচ্ছে, বর্ষণ করা "নি" অর্থাৎ ত্ত্ব - যিনি বর্ষণ করেন। বৃষ্ণি কথার দ্বারা জ্যোতি, মেঘ, বায়ু,অগ্নি ইত্যাদিকেও বোঝানো নয়।
শরীরের তেজ দ্বারা আমাদে সমস্ত অনুভূতি হয়ে থাকে। অর্জ্জুনের প্রশ্ন হচ্ছে, পাপ আচরণে মানুষ কেন লিপ্ত হয় ? অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও মানুষ পাপাচারন করে ফেলেন। কিন্তু কেন। অর্জ্জুন এই প্রশ্নের জবাব চাইছেন - কার কাছে না বার্ষ্ণেয়র কাছে। আসলে আমাদের শরীরে সারাক্ষন বিভিন্ন ধরনের রস নিঃসৃত হচ্ছে, অর্থাৎ বর্ষিত হচ্ছে। আর এই রসের মধ্যেই উঠছে স্পন্দন। এই স্পন্দন আমাদের মনের চিন্তাশক্তির উৎস। এই রসের বিভিন্নতায় মানুষে মানুষে পার্থক্য হয়ে থাকে। একেই বলে স্নায়ুর ক্রিয়া। তো যিনি এই রসের উদ্গাতা অর্থাৎ বৃষ্ণি বংশজাতক-কে এই প্রশ্নের সম্মুখে ফেলে দিলেন, অর্জ্জুন।
শ্রীভগবান উবাচ :
কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণ-সমুদ্ভবঃ
মহাশনো মহাপাপ্না বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিনম্। (৩/৩৭)
শ্রীভগবান বললেন, কাম ও ক্রোধ রজোগুণ হতে উৎপন্ন। মহাশনঃ অর্থাৎ অঢেল ভোগের পরেও এর নিবৃত্তি হয় না। এটি অতি উগ্র। মোক্ষমার্গে একে শত্রু বলে জেনো।
আমাদের এই দেহভান্ড সাতটি স্তরে বিভক্ত। দেহের এক একটা স্থান এক এক তত্ত্বের কর্ম্ম কেন্দ্র। এই কর্ম্ম কেন্দ্রগুলোর নাম গ্রন্থিচক্র বা গ্রন্থিস্থান। স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী এই গ্রন্থিগুলোর নাম রেখেছেন, মহৎগ্রন্থি, অহংগ্রন্থি, ব্যোমগ্রন্থি, বায়ুগ্রন্থি, অগ্নিগ্রন্থি, বায়ুগ্রন্থি, বরুনগ্রন্থি ও পৃত্থিগ্রন্থি। হঠযোগের ভাষায়, মূলাধার (পৃত্থি) স্বাধিষ্ঠান (বরুন) মনিপুর (বায়ু) অনাহত (ব্যোম) বিশুদ্ধ (অহং)ও আজ্ঞা ( মহৎ) । সমস্ত সাধনার ভিত্তিভূমি হচ্ছে এই শরীর। এই দেহ শুদ্ধ হলেই, আমাদের মন শুদ্ধ হতে পারে। তো সাধনার ভিত্তি ভূমি সুদৃঢ় হলে আমরা গগনচুম্বী জীবনসৌধ নির্মাণ করতে পারবো। দেহ, মন, বুদ্ধি, অহংকার ইত্যাদি সবই সেই আত্মারই বিভূতি বা শক্তি। এই শক্তির খেলা চলছে, আমাদের দেহযন্ত্রের মধ্যে। দেহের স্নায়ু, পেশীকোষ, ও গ্রন্থিসকল যদি স্বাভাবিক থাকে, অর্থাৎ দোষমুক্ত থাকে তখন দেহযন্ত্রের মধ্যে আত্মার দেবভাব, ভাগবতভাবে স্ফূরিত হতে থাকবে। আর তা যদি না হয়, দেহ-মন যদি অশুদ্ধ হয়, তবে দেহমনে পাশবিক বৃত্তির তাণ্ডব শুরু হবে। একই শক্তির দ্বিবিধ আচরণ, খেলা।
তাই বলা হয়, আমাদের বরুণগ্রন্থি অর্থাৎ যকৃতের ক্রিয়া যদি ঠিক ঠিক মতো না হয়, তবে আমাদের মধ্যে কামপ্রবৃত্তির জাগরণ হয়, মানুষ হয়ে ওঠে খিটখিটে, ব্যবহার হয় রুক্ষ-কর্কশ। অর্থাৎ কাম ও ক্রোধ হচ্ছে, এই বরুণগ্রন্থির ক্রিয়া।
আবার ইচ্ছেশক্তিই রজগুনের ক্রিয়া করে থাকে। ক্ৰোধ রজঃগুন্ থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিতে, গ্রহণ ও বর্জনের যে ইচ্ছাশক্তি তা যখন বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন আমাদের ক্রোধের জন্ম হয়। যতক্ষন মন বিষয়ের প্রতি আসক্ত থাকবে, ততক্ষন এই মনের মধ্যে আবাহন-বিসর্জনের, গ্রহন-বর্জনের ক্রিয়া থাকবে। কাউকে সে গ্রহন করতে চাইবে, কাউকে সে বর্জন করতে চাইবে। আর এই কাজে যদি বাধা আসে, বা এই কাজ যদি অপূর্ন থাকে তখন নিজের মধ্যে রাগের উৎপত্তি হবে। আসলে এসবই বায়ুর ক্রিয়া। বায়ু যতক্ষন না স্থির হয়ে ব্রহ্মে স্থিত হচ্ছে, ততক্ষন এই কাম-ক্রোধের খেলা চলতে থাকবে। সংসারক্ষেত্রে এই কাম-ক্রোধ যেমন বর্জনীয়, তেমনি সাধন জগতেও কাম-ক্রোধ সাংঘাতিক শত্রু। প্রাণায়াম করতে করতে যখন প্রাণবায়ু ব্রহ্মনাড়ীতে স্থিত হয়, তখন প্রাণ-মন একত্রে স্থির হয়ে অবস্থান করে। তাই শ্বাসের দিকে সদা দৃষ্টি রেখে, শ্বাসের গমন-নির্গমন ক্রিয়া করতে হয়। দৃঢ়তার সাথে যোগাভ্যাসে নিজেকে নিয়োগ করতে হবে। তবেই কাম-ক্রোধের উপরে জয় লাভ সম্ভব হবে।
আত্মা ভিন্ন অন্যকিছু বোধ করাই অজ্ঞান। আর এই অজ্ঞান থেকে কাম-ক্রোধ, সংকল্প-বাসনার উৎপত্তি। আমাদের বহির্দৃষ্টি যত প্রসারিত হয়, তত আমাদের অন্তর্দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে। আর বহির্বিশ্বের আকর্ষনে অজ্ঞানের আবরণ দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। প্রাণ থেকেই সমস্ত ভূতগণের উৎপত্তি। আবার এই প্রাণের সঙ্গেই রয়েছেন স্বয়ং ব্রহ্ম, বা চেতন শক্তি। তাই প্রাণের উপাসনা দ্বারাই মায়া শক্তিকে সংকুচিত করা সম্ভব। প্রাণের উপাসনার সঙ্গে সঙ্গে ভাগবৎশক্তির বিকাশ হয় । এই ভাগবৎশক্তির বিকাশ হলে, তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয়। তত্ত্বজ্ঞান লাভ হলে মায়ার আবরণ কেটে যায়। সাধক তখন আত্মাতে স্থিত হয়। আত্মতে স্থিত হলে স্ব-রূপের জ্ঞান হয়। তখন আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বলে কিছু থাকে না। গ্রহণ-বর্জন বলে কিছু থাকে না। রাগ দ্বেষ ঘৃণা ভয় সব দূর হয়ে যায়।
----------
২৯.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩৮
ধূমেন-আব্রিয়তে বহ্নির্যথা-আদর্শো মলেন চ
যথোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেন-ইদম-আবৃতম্। (৩/৩৮)
ধূমের দ্বারা যেমন অগ্নি, ও মলের দ্বারা যেমন দর্পন আচ্ছাদিত থাকে এবং জরায়ু-চর্ম্ম দ্বারা গর্ভ আবৃত থাকে তেমনি জ্ঞান কাম দ্বারা আবৃত থাকে।
কথায় বলে বাতাস পেলেই আমরা স্ব-মূর্তি ধারণ করি। অর্থাৎ ইন্ধন পেলেই অগ্নি জেগে ওঠে, আয়না পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন আমাদের বীভৎস রূপ বেরিয়ে পড়ে। সাধাণরত যোগীর প্রাথমিক অবস্থায়, মাঝে মধ্যে মনে হয়, তার মধ্যে থেকে সমস্ত কাম-রিপু দূরীভূত হয়ে গেছে। কেননা সে সাধনক্রিয়া করছে। আসলে এই কামরিপু কিন্তু সহজে নির্মূল হয় না। অগ্নির স্ফুলিঙ্গের ন্যায় ম্রিয়মান হয়ে থাকে আবার সময় সুযোগ পেলে, অর্থাৎ বাসনার বাতাস পেলেই অগ্নি আবার জ্বলে ওঠে। তখন জীবের বিবেকজ্ঞান নষ্ট করে দেয়। মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষের মধ্যে যদি এই কাম-ক্রোধ রিপুর সমাগম না হতো, তাহলে কত সহজেই না আমাদের আত্মজ্ঞান লাভ হতে পারতো। সমস্ত জীবের মধ্যেই আছেন, সেই প্রজ্ঞানঘন রূপ। শুধু আচ্ছাদনে ঢাকা। বাসনার ধুম দ্বারা সেই জ্ঞানাগ্নি ঢাকা। আবার বাসনা হচ্ছে মনের ক্রিয়া। তাই বাসনাশূন্য মনেই একমাত্র আত্মার প্রকাশ ঘটতে পারে।
সূর্যকে মেঘ ঢেকে রাখলেও সূর্য সূর্যই থাকে। সূর্য্যের রশ্মি এতে এতটুকু নষ্ট হয় না। মেঘ কেটে গেলে, আবার সূর্য্যের প্রকাশ ঘটে। আত্মার মধ্যে আনন্দঘন ভাব, সর্বদা বিরাজ করছে। এই আনন্দময় সত্ত্বার সাথে একাত্ম হতে গেলে, মন থেকে কামনা রূপ আবরণ সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু কিভাবে এই কামনার বিনাশ হবে ?
আমরা জানি, আমাদের তিনটি শরীর। স্থুল সূক্ষ্ম ও কারন। এই কারন শরীরের সহজে নাশ হয় না। জীবকুল এই স্থুল শরীর ধারণ করবার আগে, জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার অনুযায়ী সূক্ষ্ম শরীর রচনা করে থাকে। প্রতি জন্মে জীবের সূক্ষ্ম শরীর সৃষ্টির সাথে এই কামভাব বা সংকল্প কারন হয়ে থাকে। কাম হচ্ছে অজ্ঞানের আধার। কাম নষ্ট হয়ে গেলে অজ্ঞানের নাশ হয়। কিন্তু এই কামনার জন্যই সে সূক্ষ্ম শরীর রচনায় প্রবৃত্ত হয়। এর পরে, জীব পিতৃ-মাতৃ সহযোগে সে তার পিন্ডদেহকে রচনা করে। আর কারন শরীর তো আগে থেকেই ছিল। তো স্থুলদেহের পুষ্টি সাধনের সঙ্গে সঙ্গে তার সূক্ষ্ম শরীরও পুষ্টি লাভ করে থাকে। অর্থাৎ মনোময়, বিজ্ঞানময় শরীরের পুষ্টি সাধন হয়ে থাকে। এবং এই সূক্ষ্ম শরীরের মধ্যে যে কামনার বীজ সংগ্রহীত ছিল, তার বিকাশ হতে থাকে স্থুল শরীরে ।
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের কথায় আমাদের মনে হয়েছে, তিনি উদাহরণ দিচ্ছেন আবরণ ব্যাপারটাকে বোঝাবার জন্য। কিন্তু তিনি এর মধ্যে সত্যের উদ্ঘাটন করেছেন। অর্থাৎ জীব প্রথমে ধূম্রের আকারে থাকে। তারপরে, এই ধূম্রের মধ্যে অগ্নির সন্ধান মেলে। অর্থাৎ তখন কারন শরীর ও তন্মাত্রের (পঞ্চভূতের) মিলন ঘটে। আর এর মধ্যে আত্মার স্থিতি লাভ হয়, বা আত্মার আবির্ভাব ঘটে । তখন সূক্ষ্ম শরীর ও তার মধ্যে জীবাত্মা বাসনা দ্বারা আবৃত হয় বলে, এঁকে অধিক আচ্ছাদিত করে ফেলে। একেই যোগেশ্বর বলছেন, মলদীপ্ত দর্পন অর্থাৎ গর্ভস্থ জীব। তখন আর আত্মা নিরাভরণ থাকে না। আত্মা তখন প্রথম পোশাক ধারণ করলো। বাসনা লিপ্ত সূক্ষ্ম শরীর যতটা আচ্ছাদিত ছিল, তার চেয়ে স্থূল শরীরে এসে সে আরো বেশী অন্ধকার আছন্ন হয়ে পড়লো। অজ্ঞান অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
এই দর্পন মাজা ঘষা করলে, যেমন প্রতিবিম্ব স্পষ্ট আকারে দেখা দিতে পারে, তেমনি এই শরীরনামক আবরণকে শুদ্ধ নির্মল করতে পারলে, আত্মার প্রতিচ্ছবি উপলব্ধ হতে পারে। জ্ঞান দিয়ে, বিচার বিশ্লেষণ করে, ও সাধনক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে নিয়োগ করলে, এই উপলব্ধি হতে পারে। পিন্ড শরীরে বা স্থুল শরীরেরই কামের বিষয়ভোগ হয়ে থাকে। এইসময় আত্মা লুপ্তবৎ হয়ে থাকে। একেই জরায়ু মধ্যস্থ প্রাণের অবস্থা বলা যেতে পারে। জরায়ুর মধ্যে যেমন ভ্রূণ অজ্ঞান-অন্ধকারে আছন্ন হয়ে থাকে, অর্থাৎ জ্ঞানশক্তির বিকাশ সেখানে দেখা যায় না ঠিক তেমনি কাম বাসনায় লিপ্ত মন-বুদ্ধি এতো স্থুল ও বিষয়দর্শী হয়, যে সেখানে আত্মজ্ঞানের প্রকাশ সেখানে দেখা যায় না।
তো আত্মার অজ্ঞান-আবরণ যেমন তিন প্রকার, তেমনি সাধনার ক্ষেত্রে এই তিন অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। প্রথমটি মায়ের পেটে জরায়ুর মধ্যে অবস্থানের মতো.অর্থাৎ ঘোর অজ্ঞান অন্ধকার। এদের আত্মা সম্পর্কে কোনো বোধ থাকে না। ঈশ্বর সাধনা সন্মন্ধে তারা উদাসীন। এখানেও ভগবান আছেন, কিন্তু ভগবান তখন জীব-বুদ্ধির বাইরে অবস্থান করেন। এরা জাগতিক বিষয়ভোগে মত্ত। এরা সাধন করতে চায়ও না, সাধন করবার যোগ্যতাও এদের মধ্যে জাগ্রত হয় নি। মেরে-ধরে বা প্রভাবশালী আচার্য্যের কাছে এলেও, এরা সেখান থেকে পালাতে চেষ্টা করে থাকে। এরা সবেমাত্র মনুষ্য শরীর পেয়েছে, কিন্তু এতদিন নিকৃষ্ট ভোগ-শরীরে অবস্থানের ফলে, তার পূর্ব-পূর্ব জীবনের সংস্কার ছেড়ে বেরিয়ে আসবার ক্ষমতা অর্জন হয় নি। আসলে এই স্তর অতিক্রম করতে পারলে, তবেই মানুষ সাধনা সম্পর্কে আগ্রহ দেখাতে পারে।
এর পরের স্তরের মানুষের মধ্যে সাধনা সম্পর্কে একটা আগ্রহ দেখা যায়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে, সে সাধন ক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু বিষয়বিমুখ না হবার জন্য, এরা বিষয় ছাড়তে পারে না। এরা লোক কল্যাণের জন্য, বিভিন্ন কর্ম্মে লিপ্ত হয়। এইযে মন্দির মসজিদ দেখছেন, এগুলো এইসব মানুষের সহযোগিতায় হয়ে থাকে। এদের মধ্যে কিছু শাস্ত্রজ্ঞানের উন্মেষ দেখা যায়। ফলত এরা মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু এরা নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে না।
অতঃপর মানুষ যখন মুক্তির আকাঙ্খায় সত্যকে জানবার জন্য উদগ্রীব হয়, এবং এর জন্য তারা সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিতে পারে, তখন মানুষ অসীম কষ্ট সহ্য করে সাধনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। এরাই সাধন জগতের স্তরভেদ করতে পারে। দুর্লভ ঐশ্বরিক শক্তি, অর্থাৎ যোগৈশ্বর্য্য এঁরা লাভ করতে পারে। এদের অনাহত চক্রে মধুর ধ্বনি উঠতে থাকে। আত্মজ্যোতির প্রকাশ অনুভব করে এঁরা। ওঙ্কারের সাধনার ফলে, এদের মধ্যে কারুর কারুর ভূতশুদ্ধি আরম্ভ হয়। এই ভূতশুদ্ধি হলেই, আত্মার আবরণ উন্মোচন হতে থাকে। কিন্তু অনাদি-অজ্ঞান বীজ তখনও বিনাশপ্রাপ্ত হয় না। এর জন্য আরো কঠিন সাধনার প্রয়োজন। আর এই কঠিন সাধনা, একমাত্র ভাগবৎকৃপা ধন্য সাধকের মধ্যেই দেখা যায়। মহাত্মাগণ বলছেন, এই অবস্থায় যেতে সাধকের বহু জন্ম লাগতে পারে। কেননা এই শেষ আবরণ হচ্ছে কারন শরীরের। এই কারন শরীরেই সঞ্চিত আছে, আমাদের বহু জন্মের সংস্কার, স্মৃতি। একে নির্মূল করতে পারলে, সাধক স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে যান। এঁদের সবিকল্প সমাধি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই অবস্থায় স্থুল ও সূক্ষ্ম উভয় শরীরের নাশ, হয়। তখন জ্ঞান-অজ্ঞান উভয়ের বিলোপ সাধন হয়। একেই বলে শিব-ভাব। এর পরে কারন শরীরের নাশ হয় আর সাধক ব্রহ্মে লীন হয়ে যান। একে বলে ব্রহ্মাতীত অবস্থা। ওঁং শুভম।
-------------------------
৩০.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৩৯-৪০
আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা
কাম রূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণ-অনলেন চ। (৩/৩৯)
হে কৌন্তেয়, জ্ঞানীর নিত্যশত্রু এই কামরূপ দুষ্পূরণীয় অগ্নি দ্বারা জ্ঞান আবৃত।
কৌন্তেয় অর্থাৎ কুন্তীপুত্র। কুন্তিভোজের পালিত কন্যা কুন্তী। যা শরীরকে রক্ষা করে তাকে বলা হয় কুন্ত। "ক"-অর্থাৎ শরীর "অন্ত" অর্থাৎ বন্ধনে। কন্ত অথাৎ তেজঃশক্তি। সমস্ত ক্রিয়াশীল ব্যক্তির অন্তরে আছে অনলাবৃত্ত অর্থাৎ অগ্নি দ্বারা আচ্ছাদিত ইচ্ছা। এই ইচ্ছারূপ অগ্নি প্রজ্বলিত হলেই আমাদের সাধারণ বুদ্ধি রাগান্বিত হয়ে ওঠে। প্রত্যেকের অন্তরে আছে বাসনার অনল। বিষয় সংযোগরূপ বাতাসের আঁচ পেলেই, দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সঙ্গে যদি অহংকারের যোগ হয়, তবে, তা ষোলকলা পূর্ণ হয়। এই কামরূপ অগ্নিতে যত বিষয় সংযোগ হবে, কামাগ্নি তত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। জ্ঞানী ব্যক্তি কামবাসনা মুক্ত নন. কিন্তু জ্ঞানযোগীর মধ্যে কামনার লেশ মাত্র থাকে না। তাই জ্ঞানী ব্যক্তিকে কামের পীড়ন সহ্য করতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি যে ভোগাসক্ত তা নয়, কিন্তু জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার সহজে তাদের ছেড়ে যেতে চায় না। তাই জ্ঞানীকে সদা সতর্ক থাকতে হয়। সদা সচেতন থেকে আত্মস্মৃতি জাগ্রত রেখে সাধনার সাহায্যে কামকে পরাজিত করতে হয়। ভগবত প্রাপ্তির প্রবল ইচ্ছাই কামকে দূরে সরিয়ে রাখে। আসলে বস্তুর স্বরূপবোধ, ও বস্তুর পরিণতি জ্ঞান সাধককে কামসঙ্কল্প থেকে নিবৃত্ত করতে পারে।
ইন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিঃ-অস্য-অধিষ্ঠানম উচ্চতে
এতৈঃ-বিমোহয়তি-এষ জ্ঞানমাবৃত দেহিনম্। (৩/৪০)
ইন্দ্রিয়সকল মন-বুদ্ধি এই কামের আশ্রয় বলে কথিত হয়। এই কামাদির দ্বারা বিবেকজ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে দেহাভিমানী জীবকে বিমুগ্ধ করে।
আত্মায় অবস্থিত মনে সঙ্কল্পের উদয় হয় না। কিন্তু এই অবস্থায় পৌঁছানো কঠিন থেকে কঠিনতর, আবার এই অবস্থায় স্থিতিলাভ করা আরো বেশি কঠিন । এমনকি অনেক উচ্চতর সাধকের মনও ক্ষনিকের তরে আত্মা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে । তার কারন হচ্ছে, জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার। বাসনার বীজ প্রভাবে মন আবার আত্মা থেকে স্থানচ্যূত হয়ে বিষয়-বাসনার দিকে ধাবিত হয়। একে রোধ করা সহজে যায় না। কিন্তু মন-বুদ্ধি যখন এই পঞ্চতত্ত্বের শরীর-ক্ষেত্র ছেড়ে আজ্ঞাচক্রে বা সহস্রারে স্থিতি লাভ করতে পারে, তখন কাম আর তার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।
মন যখন স্বক্ষেত্রে স্থিতি লাভ করে, তখন মনের শক্তি বিপুলভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই অবস্থায় মনকে আর টেনে আত্মা থেকে কিছুতেই আলাদা করা সম্ভব হয় না। আসলে এই অবস্থায় বিষয়-দর্শন-শ্রবণ ইত্যাদি বলে কিছু থাকে না, তাই তখন আর মনের মধ্যে কোনো সংকল্পের উদয়ও হতে পারে না। বিষয় দর্শন-শ্রবনের দ্বারা মন যখন আকৃষ্ট হয়, তখন মনের মধ্যে কামনারুপ সংকল্পের উদয় হয়। ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি এগুলোই কামনার আধার। এর দ্বারাই অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদির দ্বারাই মানুষ বিষয়তৃষ্ণা বিষয়ভোগ ইত্যাদি করে থাকে। শব্দ-স্পর্শ-রুপ-রস-গন্ধ এর আশ্রয়স্থল হচ্ছে, বাক-পানি-পাদ-পায়ু-উপস্থ এই পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয়। মনে মধ্যে যত কাম-সংকল্প জাগে তা মন বুদ্ধির সহযোগে উপভোগ করে থাকে। আর নিরন্তর এই বিষয়ভোগের ফলে অন্তরের জ্ঞানজ্যোতি আবৃত হয়ে পড়ে। তখন মোহরূপ অন্ধকার জীবকে ঘিরে ফেলে। জীব তখন ভালো-মন্দ জ্ঞান রোহিত যায়। আসলে জ্ঞানজ্যোতিঃ তো থাকে, মেঘেঢাকা সূর্য্যের মতো। মেঘ কেটে গেলেই আবার সূর্য্যের প্রকাশ হয়। আবার সূর্য্যের রশ্মি সমস্ত কিছুকে প্রকাশিত করে। তেমনি জ্ঞানজ্যোতি আমাদের বিবেকসুর্য্যকে বিষয়তৃষ্ণা দিয়ে, বা বিষয়ভোগ দিয়ে ঢেকে রাখে। তখন বিবেকজ্ঞান আবৃত হয় ঠিকই, কিন্তু বিলুপ্ত হয় না। কামের প্রবলতাই বিবেকজ্ঞানকে ঢেকে রাখে। আর এই সময় তার স্বরূপের জ্ঞান থাকে না। সে যে আত্মা, সেকথা সে ভুলে যায়।
এখন কথা হচ্ছে এর থেকে জীবকুলের নিস্তারের উপায় কি ? দেখুন, আপনি আপনার মনকে যে দিকে ধাবিত করাবেন, বা আপনার মন যে দিকে ধাবিত হবে, সেখানে সে আনন্দের খোঁজ করবে। আসলে মন যে বিষয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, সেটিও আসলে সেই আনন্দেরই খোঁজে। কেননা আনন্দই আমাদের খাদ্য, আনন্দই আমাদের মূলসত্ত্বা। এখন বিষয়-আনন্দরূপ খাদ্য খেয়ে আমরা আখেরে অসুস্থ হয়ে পড়ি। মদে আসক্ত ব্যক্তি মদ্য পান করে বিভোর হয়ে থাকে। এতে যে আখেরে তার ক্ষতি হচ্ছে, সেটি সে তখন বোঝে না। কিন্তু যখন তার নেশা কেটে যায়, তখন সে কিছুক্ষনের জন্য হলেও বোঝে, যে মদের প্রতি আসক্তি তার ক্ষতি করছে। কিন্তু অন্য কোনো বিষয়ে সে এমন নিবিড় আনন্দ অনুভব করে না। তাই সে আবার একসময় সেই একই মদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। এখন কথা হচ্ছে, আপনি যদি মদাসক্ত ব্যক্তিকে অন্য কোনো আনন্দের উপাদান এনে দিতে পারেন, তবে সে মদ ছেড়ে দিয়ে অন্য বস্তুর দিকে ধাবিত হতে পারে। অল্প বয়সী বেকার মেধাবী ছেলের মধ্যে একসময় আড্ডা মেরে বেড়ানোর একটি কু-প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়। কিন্তু সেই ছেলে যখন একটা চাকুরী পায়, মাস গেলে হাতে মাস-মাইনের টাকা পায়, তখন সে আড্ডায় সময় অতিবাহিত করে না। এর পরে যখন সে বিয়ে-থা করে তখন তার সেই আড্ডার বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক কমতে থাকে। তো মূল ব্যাপারটা হচ্ছে আনন্দ। এই আনন্দের খোঁজ করছে সবাই। মন বিষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে শুধু মাত্র আনন্দের খোঁজেই। এখন কোনো আনন্দ নির্মল শুদ্ধ আর কোনো আনন্দ অশুদ্ধ। অর্থাৎ কোনোটি আমাদের পক্ষে প্রেয় আর কোনোটি আমাদের পক্ষে শ্রেয় - এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে গেলে, দুটোকেই আমাদের চেখে দেখতে হবে। বিষয়ের আনন্দ সম্পর্কে আমাদের সবার সম্যক ধারণা আছে, বিষয় সংগ্রহের পরিণতি সম্পর্কেও জ্ঞান আছে। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থানেও যে আনন্দ আছে। আত্মাতে স্থিত হলে একটা নির্ম্মল আনন্দের অনুভব হতে পারে, যা বিষয় আনন্দ থেকে সহস্রগুণ বেশী সেই ধারণা আমাদের নেই। এই বিদ্যাই হচ্ছে যোগবিদ্যা। যা যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ আর অন্তরঙ্গ সখাকে শেখাতে চাইছেন।
দেখুন, আমরা সবাই, চারিদিক দেখে শুনে, একটা সিদ্ধান্তে এসেছি, যে লেখাপড়া করে একটা ভালো চাকরি জোগাড় করতে পারলে, আমরা বাকি জীবনটা সুখে স্বাচ্ছন্দে কাটাতে পারবো। আর এই উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সবাই আমাদের ছেলেমেয়েদের তার জীবনের অন্তত ১৫/২০ বছর এই তথাকথিত শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে উৎসাহিত করে থাকি। কিন্তু এই বিষয়জ্ঞানের সঙ্গে যদি আমরা আমাদের সন্তানকে একটু আত্মমুখী হবার শিক্ষা দিতে পারতাম, তবে কিন্তু তারা বিষয় ছেড়ে দিয়েও একটা নির্ম্মল আনন্দের অধিকারী হতে পারতো। কিন্তু আমরা মাতা-পিতাগন যেহেতু সেই আনন্দের সন্ধান নিজেরাই পাই নি, সেই বিষয়-বহির্ভূত আনন্দের সন্ধান জানি না, তাই আমরা সেই পথের সন্ধান কাউকে দিতেও পারি না। রস গ্রহণের ইচ্ছে মনের স্বভাব। ভগবৎ রসে যে বঞ্চিত সে সহজলভ্য বিষয় রসেই ডুবে থাকতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক। আত্মরস একমাত্র আত্মাতেই বর্তমান। আর এই রসের ভান্ডার সে নিজেই। এর রসকে বের করে উপভোগ করাই যথার্থ সাধনক্রিয়া। আর প্রাথমিকভাবে এই রসের আস্বাদন করবার জন্য, জীবনের ১৫/২০ বছরও লাগে না। যদিও আধার অনুযায়ী এই সময়ের তারতম্য হতে পারে। কিন্তু উপযুক্ত গুরুর সান্নিধ্যে এসে, নিরন্তর মাত্র কয়েক-বছরের সাধনাতেই এই উপলব্ধি হতে পারে। আর এর জন্য দরকার দৃঢ় সংকল্প। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রাণায়াম ও মুদ্রাদির অভ্যাস। এই সাধনা ক্লেশসাধ্য সন্দেহ নেই, কিন্তু যার মধ্যে একটা দৃঢ়চেতা মন আছে, যার মন লক্ষে স্থির হয়েছে, তার কাছে এই সাধনা মোটেই দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়।
নিরন্তর প্রাণায়ামে যখন শরীরের বায়ু স্থির হয়, তখন বিষয়-সংকল্প থাকে না। প্রাণ-অপান-এর গতি সমভাবাপন্ন হলে, শরীরের মধ্যে বায়ুর সাম্যাবস্থা অবস্থান করে। তখন সুস্থ শরীরে, ব্যাধিমুক্ত শরীরে একটা অহেতুক আনন্দের হিল্লোল বইতে থাকে। বিষয় স্পৃহা বিলুপ্ত হয়ে যায়, আর ব্রহ্মানন্দ রসে মন বিগলিত হয়ে পরমান্দ ভোগ হয়ে থাকে। আসুন আমরাও যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশিত পথে আনন্দের সন্ধান করি।
-----------------------------------
৩১.০১.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৪১
তস্মাৎ ত্মম-ইন্দ্রিয়াণি-আদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ
পাপ্নানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞান-বিজ্ঞান-নাশনম্। (৩/৪১)
মানুষের মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়গণই কামের অধিষ্ঠান ক্ষেত্র। এদের আশ্রয় করেই কাম জ্ঞানকে আবৃত করে মানুষকে মুগ্ধ করে। হে ভারতশ্রেষ্ঠ, এই কারনে তুমি ইন্দ্রিয়গণ বশীভূত করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-নাশক পাপরূপ কামকে বিনষ্ট করো।
এই শ্লোকেও যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই ইন্দ্রিয়-দমনের কথা বলছেন। ইন্দ্রিসকল কামের আশ্রয়। আর কামবশিভূত ইন্দ্রিয় চিত্তের বিক্ষেপের কারন। ইন্দ্রিয়গুলো বিষয়ের দিকে যতক্ষন আকৃষ্ট না হচ্ছে, ততক্ষন কামের উদ্ভব হতে পারে না। কিন্তু দৃঢ়চেতা যোগীপুরুষ ব্রহ্মভাবাপন্ন হওয়ায়, তার মধ্যে বিষয়বোধ থাকে না। আর ইন্দ্রিয় যখন বিষয়ের সংস্পর্শে আসতে অপারগ হয়, তখন ভোগের কথাও মনে আসে না। ইন্দ্রিয় সদা সক্রিয়। ইন্দ্রিয়ের সামনে বিষয় এলেই, সে তাকে প্রাপ্তির কামনা করে থাকে।
এখন কথা হচ্ছে, আমি এই স্থুল দেহ যা প্রকৃতির উপাদানে তৈরী, যা প্রকৃতির থেকে খাদ্য সংগ্রহ করছে, সেখানে বাস করবো, আর বাহ্যিক জগৎকেই উপেক্ষা করবো - তা কিভাবে সম্ভব ? তাহলে তো জীবনের সব আনন্দই নষ্ট হয়ে যাবে। শরীর রক্ষার উপাদান সংগ্রহে যদি মনোযোগ নিবদ্ধ না হয়, তবে প্রকৃতির নিয়মেই শরীরের নাশ ঘটবে। আবার ইন্দ্রিয় বশীভূত মন আমাদের বুদ্ধিকে মলিন করে দেবে। আর বুদ্ধি মলিন হলে, আমাদের বিচারশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। আর বুদ্ধিনাশ হলে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। একথা আমরা আগে ভগবানের মুখে আগেই শুনেছি।
তো এই দ্বিবিধ ব্যবস্থার মধ্যে সামজ্ঞস্য কিভাবে রক্ষা করা যাবে। দুটো জিনিস, একটা হচ্ছে মনকে দৃঢ় রাখতে হবে, অপরটি হচ্ছে লক্ষে স্থির থাকতে হবে। লক্ষ হবে ব্রহ্মে স্থিতি। আর এই লক্ষে আমাদের মনকে দৃঢ় করতে হবে। ইন্দ্রিয়ের সামনে বিষয় এলে, ইন্দ্রিয় বিষয়ে আসক্ত হবে, মনের মধ্যে কামনার উদয় হবে। কিন্তু বিচারশক্তি দিয়ে মনকে ব্রহ্মভাবাপন্ন করতে হবে। আর তখন মন ব্রহ্মভাব অনুসরণ করায়, বিচারশক্তি বিষয়কে অবশ্য়ই হেয় প্রতিপন্ন করবে।
প্রথমে দেখুন, বিষয়ের প্রয়োজন কতটুকু। যেটুকু বিষয়ের প্রয়োজন সেটুকু অবশ্য়ই গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু মানুষ একমাত্র জীব, যে সংগ্রহ করতে ভালোবাসে, তার কারন হচ্ছে অনিশ্চয়তা। তার জীবনে সে এতবেশি আশঙ্কায় ভোগে, যে কতটুকু তার প্রয়োজন তার বিচার করতে সে চায় না। বরং উল্টোটা করে থাকে। অর্থাৎ প্রয়োজন অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলে, খেতে না পারলে ব্যাগের মধ্যে পুরে রাখে। আবার অন্যের প্রাচুর্য্য দেখে, তার মনের মধ্যেও অনাবশ্যক অথচ মনোহর, বা বিলাসবহুল বস্তুর প্রতি ধাবিত হয়। অর্থাৎ কামকে আমরা প্রজ্বলিত করে ফেলি। এইভাবে কেউ কামকে জয় করতে পারে না। মন ভালো-মন্দ চিন্তা করবেই । আবার প্রয়োজনীয়-অপ্রোজনীয় উভয় চিন্তাই সে করবে। এটি মনের স্বভাব। প্রথমে আমাদের আবশ্যক ও অনাবশ্যক বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ, যাকে পরিবর্তন করবার ক্ষমতা আমাদের নেই, অর্থাৎ যে ঘটনা অনিবার্য, সেই বিষয়ে চিন্তা পরিহার করতে হবে। তৃতীয়তঃ, আমাদের প্রয়োজন কতটুকু অর্থাৎ সর্ব্বনিম্ন প্রয়োজনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। আসলে আমাদের বেঁচে থাকবার জন্য, শরীর রক্ষার জন্য, জীবনের মূল লক্ষকে পূরণ করবার জন্য, আমাদের উদ্যোগী হতে হবে।
সত্য হচ্ছে, আমাদে বেঁচে থাকবার জন্য, প্রয়োজন খুবই অল্প। এই অল্প-অল্প বিষয়-চিন্তা আমাদের ক্ষতি করতে পারে না, আমাদের লক্ষ থেকেও বিচ্যুত করতে পারে না। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমরা দুঃখকে ডেকে আনি। আর আমাদের এই যে অমূল্য মনুষ্য জীবন অকারনে ব্যয় করে ফেলি। এমনকি সারাজীবন এই অপ্রোজনীয় চিন্তাতেই কাটিয়ে দেই।
এখন কথা হচ্ছে এই অপ্রয়োজনীয় চিন্তা কি ? যা আমাদের ইহলোকে বা পরলোকে কোনো কাজে লাগবে না - তার জন্য চিন্তা করাই হচ্ছে অপ্রোজনীয় চিন্তা। দেখুন, আমরা যে অতিরিক্ত বিষয়-সম্পত্তির জন্য চিন্তা করি, এমনকি হয়তো সেগুলো সংগ্রহও করি, তা আসলে আখেরে আমার কোনো কাজেই লাগে না। আপনি হয়তো বলবেন, আমার কাজে না লাগুক, আমার ছেলে-মেয়েদের জন্য, এমনকি আমার দেশের-দশের কাজে লাগতে পারে। রবীন্দ্রনাথের একটা কথা আছে, অতি-প্রাচুর্য্য শিশুর খেলা মাটি করে দেয়। যাদের জন্য এই বিষয়সম্পত্তি রেখে যাচ্ছেন, আপনি কি জানেন, তাতে তার অভাব পূরণ হবে ? এমনকি আপনি কি জানেন, এই অতিরিক্ত বিষয় সম্পত্তি আপনার সন্তানের বিড়ম্বনার কারন হবে কি না, বা আপনার সন্তানের কাছে, এগুলো বোঝা হয়ে যাবে কি না ? কেননা বিষয় রক্ষা করতে গেলেও রেকারিং ইনকাম দরকার। যা আপনার সন্তানকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে বাধ্য করবে। ফলে সে তার জীবনে শান্তিতে থাকতে পারবে না। জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হবে। অর্থাৎ বিষয়কে রক্ষা করতে গেলে, আরো বিষয়ের প্রয়োজন, যা আরো বিড়ম্বনার কারন। যার জন্য এগুলোকে বলা হয় অনর্থক চিন্তা। অর্থাৎ আমাদের শক্তির বাইরে প্রাপ্তির জন্য চিন্তা করা, এমনকি ত্যাগের জন্য চিন্তা করাও অনর্থক চিন্তা। কেননা কি আছে আপনার যে আপনি ত্যাগ করবেন ? আপনার যা কিছু আছে, তাতো আসলে ভগবানের সম্পত্তি। এইসব চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। মনে রাখবেন, এই অনর্থ চিন্তার নাশ হতে পারে, একমাত্র ভগবৎ চিন্তায় নিজেকে নিয়োগ করতে পারলে।
মনকে দৃঢ় করে প্রাণায়ামের মধ্যে প্রিতিষ্ঠিত করতে পারলে, কূটস্থের দিকে লক্ষ রেখে বসে থাকতে পারলে, এমনকি প্রাণের ক্রিয়াকে লক্ষ করে বসে থাকলেও, আমাদের কামের জয় হতে পারে। জপ-ধ্যান করাও উৎকৃষ্ট উপায়। আমরা যাকে প্রয়োজনীয় ভাবছি, অথাৎ বিষয়কে যদি আমরা প্রয়োজনীয় ভাবি, তবে জানবেন, তা আপনি ভুল ভাবছেন। আসলে আমাদের প্রয়োজনীয় হচ্ছে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ। আর সবই অপ্রয়োজনীয়। এই যে দেহ থেকে দেহান্তরে ঘুরে ঘুরে সুখ-দুঃখের মধ্যে নিজেকে নিয়ে চলেছি, এই যাত্রার কোনোদিন শেষ হবে না, যতদিন না আমরা সেই ভগবানকে লাভ করতে পারি। যে আনন্দের জন্য আমরা হন্যে হয়ে ঘুরছি জন্ম-জন্মান্তরের ধরে, তার অবসান হবে না , যতক্ষন না আমরা তাঁর শরণ নিচ্ছি। যতক্ষন না তার কথা আমাদের স্মরণে আসছে, ততক্ষন আমরা চরকির মতো ঘুরপাক খাবো। চোখে ঠুসি পড়া কলুর বলদের মতো, একই জায়গায় ঘুরতে থাকবো। ফিরে ফিরে একই জায়গায় আসবো।
একবার ভেবে দেখুন তো, কতো কতো জন্মে আপনি-আমি কতকিছু সংগ্রহ করেছি। কিন্তু যাবার বেলায়, একগাছি সুতোও নিয়ে যেতে পারিনি। ন্যাংটা হয়ে অগ্নিতে পুড়ে মরেছি, আবার এসেছি ন্যাংটা হয়ে। আবার এসেছি - জামা-কাপড় দিয়ে শরীরকে ঢেকেছি, আবার ন্যাংটা হয়ে পৃথিবী ছেড়েছি। এতেও কি সাধ মেটে নি ? এখনো বাসনার শেষ হলো না ? এখনো আশা মিটলো না ? এখনো সেই পতঙ্গের মতো অগ্নির দিকে ধাবিত হচ্ছি, নিজেকে আহুতি দেবার জন্য ?
তাই মহাত্মা যোগীপুরুষগন বলছেন, ভগবান যোগেশ্বর বলছেন, তুমি ইন্দ্রিয়গণ বশীভূত করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-নাশক পাপরূপ কামকে বিনষ্ট করো। বিচারশক্তি প্রয়োগ করো। ভগবানের বাক্যে বিশ্বাসী হও। গুরুবাক্যে আস্থা রাখো। গুরুর উপদেশ অনুযায়ী সাধনক্রিয়া শুরু করো। বৃথা সময় নষ্ট করো না। ভগবানের শরণাগত হও। আর মনকে দৃঢ় করে লক্ষে স্থির হয়ে, কোমরবেঁধে লেগে পড়। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হতে পরে। অন্য কোনো জীবদেহে এই সাধন ক্রিয়া করবার ক্ষমতা নেই। তাই যদি ভাগ্যক্রমে, এই মনুষ্য দেহ পেয়েছো, তার উপযুক্ত ব্যবহার করে জীবন ধন্য করো। হৃদয় গুহার অভ্যন্তরে সেই শ্যামসুন্দর অপূর্ব উজ্জ্বল সেই নক্ষত্রের দিকে একবার ফিরে তাকাও, তখন তোমার সব কাম অকাম হয়ে যাবে। সব ইন্দ্রিয় তখন বিষয় ছেড়ে আত্মস্থ হবে। আর তুমি নীলকমলের মধু পান করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। ওঁং শুভম।
-----------
০১.০২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - তৃতীয় অধ্যায় - কর্ম্মযোগঃ
শ্লোক নং ৩/৪২-৪৩
ইন্দ্রিয়াণি পরাণি-আহু-ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ (৩/৪২)
ইন্দ্রিসকল দেহ থেকে শ্রেষ্ঠ বা ভিন্ন বলা হয়। ইন্দ্রিয়গণ থেকে মন শ্রেষ্ঠ। মন হতে কিন্তু বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধি হতে শ্রেষ্ঠ আত্মা।
দেহ থেকে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ, কারন এই দেহের সমস্ত বিষয়বোধ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যই হয়ে থাকে, একথা আমরা বুঝি । কিন্তু দেহ থেকে ইন্দ্রিয় ভিন্ন একথা আমাদের বোধগম্য নয়। কেননা আমরা জানি দেহ ও ইন্দ্রিয় অভিন্ন। যার দেহ নেই, তার কি ইন্দ্রিয়শক্তি থাকে ?
দেখুন আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখন আমাদের দেহ নিষ্ক্রিয় থাকে। এই অবস্থায়, আমরা স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে আমরা সমস্ত রকম শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ ইত্যাদির উপলব্ধি করি। আবার আমরা যখন ধ্যানস্থ হই , তখন ধ্যানের মধ্যে আমরা অনেকে বিভিন্ন দৃশ্য দেখতে পাই। বিভিন্ন ধ্বনির আওয়াজ শুনতে পাই। এইসময় দেহস্থিত ইন্দ্রিয় তখন নিষ্ক্রিয় থাকে। অর্থাৎ আমাদের চোখ বন্ধ থাকলেও আমরা দেখতে পাই। আবার আমাদের যখন মৃত্যু হয়, তখন কোথায় কি অবস্থায় থাকি ? স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন, এই অবস্থায় আমরা গভীর স্বপ্নের মধ্যে অবস্থান করি। উপনিষদ বলছে, স্থূল দেহের মৃত্যুর পরে, আমরা আমাদের মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহংকার এমনকি ইন্দ্রিয়সকলকে সংস্কার আকারে সঙ্গে নিয়ে বাতাসের মধ্যে ঘুরতে থাকি।
কঠোপনিষদ (২/১) বলছে, এই দেহ একাদশ দ্বার বিশিষ্ট একটা নগর। এই ১১টি দ্বার হচ্ছে, চোখ-২, কান-২, নাকের ছিদ্র-২, মুখ, নাভি, জননেন্দ্রিয়, গুহ্যদ্বার এবং মস্তকের ব্রহ্মদ্বার। আত্মা এখানে বাস করেন মাত্র। এখন কথা হচ্ছে, আত্মা আমাদের অন্তরেই বাস করছেন, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না কেন ? কঠোপনিষদ বলছে, (১/১) - যে বাইরে, সে ভিতরে দেখবে কি করে, আমাদের সকল ইন্দ্রিয় বহির্মুখী, তাই মানুষ বহির্জগৎকে দেখতে পায়, অন্তর্জগতের সন্ধান সে পায় না। তাই ইন্দ্রিয়গুলোকে গুটিয়ে আমাদের অন্তর্মুখী করতে হবে। আর এই ইন্দ্রিয়গুলোকে পরিচালনা করে থাকে মন। মন হচ্ছে ইন্দ্রিয়-সকলের রাজা। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ইন্দ্রিয় থেকে মন শ্রেষ্ঠ।
আবার মন থেকে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ। অপরিণত বুদ্ধির মানুষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর দিকে ধাবিত হন। ফলে তারা মৃত্যুর জালে ধরা পড়েন। কিন্তু বুদ্ধিমান সাধক নিত্যবস্তুর খোঁজ পেয়েছেন, তাই তিনি অনিত্য পার্থিব বস্তুকে পরিত্যাগ করে থাকেন। তো মন বুদ্ধির সাহায্যে নিত্য বস্তুর সন্ধান পেতে পারেন। এই নিত্য বস্তু হচ্ছে আত্মা। আত্মাই একমাত্র সত্য। আত্মাই সমস্ত সাধকের সাধনার ধন। আত্মাকে জেনে, আত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে, অভিন্ন বোধ করে জীবনে পরম শান্তি লাভ করা যায়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বুদ্ধি থেকে আত্মা শ্রেষ্ট।
আমরা জানি, মনের দ্বারাই ইন্দ্রিয়গণ পরিচালিত হয়ে থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় , ব্যাপারটা হচ্ছে উল্টো অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দ্বারা মন পরিচালিত হচ্ছে। দেখুন ঘোড়ায় গাড়ি টানবে, একথা সত্য, কিন্তু ঘোড়া কোন্ দিকে যাবে তা ঠিক করে দেবে সারথি। সারথির (মনের) হাতে থাকবে লাগাম অর্থাৎ বুদ্ধি। এই বুদ্ধির সাহায্যে মনরূপ সারথি তার তার রথকে আরোহীসহ নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবে। এখানে আরোহী হচ্ছে স্বয়ং আত্মা। রথ হচ্ছে দেহ, সারথি হচ্ছে মন, লাগাম হচ্ছে বুদ্ধি আর ঘোড়া হচ্ছে ইন্দ্রিয়সকল।
এখন মন যদি ইন্দ্রিয়-সকলের বশে থাকে, আর ইন্দ্রিয়েরা যেসব বিষয়ের দিকে মনকে টেনে নিয়ে যায়, মন যদি নির্বিচারে তাই গ্রহণ করতে উদ্দত হয়, তবে মনকে ইন্দ্রিয়গুলো অবশ্য়ই বিষয় ভোগ করাবে। এইজন্যই আমাদের সাধনক্রিয়া করবার দরকার। অর্থাৎ কর্ম্মের কৌশলকে আয়ত্ব করতে হবে। সাধন ক্রিয়া করতে করতে মন স্থির হয়ে আসবে। মনের স্থিরতার কালে, অর্থাৎ মনের একাগ্র অবস্থায় বুদ্ধি তার সঠিক ক্রিয়া শুরু করবে। এই বুদ্ধিকে সাধনার দ্বারা বিচারশীল করে, বিষয়কে হেয় করে, আত্মার শ্রেষ্ঠত্ব নিরুপন করতে হবে। আর তখন শ্রেষ্ট বস্তু অর্থাৎ আত্মাতে নিরুদ্ধ হবে মন। এই সাধন আয়ত্ত্ব করবার জন্য দরকার শ্রদ্ধা-ভক্তি। মনের চঞ্চলতা দূর করবার জন্য, দরকার বায়ুকে স্থির করা। এই বায়ুর ক্রিয়াকে স্থির করবার প্রক্রিয়া হচ্ছে, আসন-প্রাণায়াম-ধ্যান,ধারণা ইত্যাদি।
এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা সংস্তভ্য-আত্মনাং-আত্মনা
জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্ (৩/৪৩)
হে মহাবাহো এইভাবে বুদ্ধি থেকে শ্রেষ্ঠ আত্মাকে জেনে বুদ্ধির দ্বারা মনকে স্থির করে কামরূপ দুর্ধর্ষ শত্রুকে বিনাশ করো।
কামরূপং দূরাসদম শত্রুং - কামরূপ দুর্ধর্ষ শত্রু। ভগবান এখানে কামকে দুর্ধর্ষ শত্রু, অর্থাৎ সাংঘাতিক বলবান শত্রু বলছেন । দেহ থেকে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ, এটা না হয় বোঝা গেলো। কিন্তু কাম যার সঙ্গে একমাত্র বিষয়ের সম্পর্ক সেই কামনার বিষয় কিভাবে আমাদের ক্ষতি করতে পারে ? আর বিষয় কিভাবেই অধিক বলবান হতে পারে ?
আমরা জানি বিষয় মনকে আকৃষ্ট করে। বিষয় দুই প্রকার। এক - বাহিরিন্দ্রিয় দ্বারা যাকে আমরা অনুভব করে থাকি। আরও একটা বিষয় আছে, যা আমাদের অন্তর্মুখী ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হয়। এই যে অন্তরের বিষয়, এঁকে বিষয় ছাড়া কি বলা যেতে পারে ? এই দুই বিষয়কে অনুভব করবার জন্য দরকার আমাদের মন। তাই মনকে শ্রেষ্ট বলা হচ্ছে। অর্থাৎ মনের সাহায্যেই এই দুই বিষয়কেই আমরা অনুভব করতে পারি। যার মন দুর্বল সে এই অনুভবের অধিকারী নয়। তা সে বাইরের বিষয় বলুন, আর অন্তরের বিষয় বলুন। ফুলের সৌন্দর্য্য অনুভব করতে গেলে একটা শুদ্ধ মনের দরকার। আবার অন্তরের মানুষটিকে অনুভব করতে গেলে আরো অধিক শুদ্ধ মনের অধিকারী হতে হয়। তা না হলে সেই অন্তর্নিহিত অন্তর্যামিকে অনুভব করা যায় না। চঞ্চল মন বহিঃর্বিশ্বে ঘুরে বেড়ায়, আর স্থির মন, অর্থাৎ চাঞ্চল্যরহিত মন একাগ্র হয়ে নিরুদ্ধ হয়, অন্তরের গভীরে। আর মন যখন একাগ্র হয়ে অন্তর জগতে স্থিতবান হয়, তখন মন থেকে সেই বুদ্ধি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে মনের সঙ্গে অবস্থান করে। আর এই বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মন, তখন অন্তর ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেই বিচিত্র বর্ণের জ্যোতির দর্শন করে থাকেন । এই জ্যোতির্মন্ডলের মধ্যভাগে দেখা দেয় একটি কৃষ্ণবর্ণের গুহা। এই কৃষ্ণবর্ণের গুহার মধ্যে দেখা দেয় অমাবস্যার চাঁদ।
হিন্দুশাস্ত্রে চন্দ্রলোক থেকে জীবের আগমন হয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে। এই সেই মূলীভূত কারণস্বরূপা দেবী ভগবতী। যার থেকে জগৎ সৃষ্ট হয়েছে। যার জন্য জগৎ ক্রিয়াশীল হয়ে আছে। সগুন ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ। এই প্রকাশ সর্ব্বভূতের মধ্যেই গূঢ়ভাবে অবস্থিত। কিন্তু দুঃখের কথা, এই আত্মা সকলের নিকট প্রকাশিত নয়। কেবলমাত্র সাধনার দ্বারা যে ভাগ্যবান পুরুষ এই সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন হতে পেরেছেন, যাঁর মধ্যে ধ্যানাবস্থা নিশ্চল হয়েছে, তাঁর কাছে এই আত্মস্বরূপ দৃষ্ট হন। অর্থাৎ আত্মা সর্বত্র প্রকাশিত হলেও নিগূঢ় আত্মাকে চঞ্চল মনের সাথী বাইরে বিচরণশীল ইন্দ্রিয় দ্বারা সাক্ষাৎ করা যাবে না। সাধনক্রিয়ার দ্বারা মনের নিশ্চল অবস্থা লাভ করতে পারলে, এনার স্বরূপ উপলব্ধ হতে পারে। আর এই অবস্থা লাভ হলে তবেই কাম ইত্যাদি রিপু গুলোকে বশীভূত করা সম্ভব।
সুতরাং কামকে পরাভূত করতে হলে প্রাণকে মহাশূন্যে প্রবেশ করাতে হবে। প্রাণকে মহাশূন্যে প্রবেশ করতে গেলে ওঙ্কারের ধ্বনির সাহায্য নিতে হবে। অথবা বলা যেতে পারে, ওঙ্কারের ধ্বনি শুনতে শুনতে, ওঙ্কারের লয়ের সাথে প্রান পরব্রহ্ম-এ লয় হবে। নিখিল রসের কেন্দ্র হচ্ছে স্বয়ং ভগবান। নিরন্তর তাকে স্মরণ দ্বারাই তাকে স্পর্শ বা অনুভব করা সম্ভব। আর তাকে যিনি স্পর্শ করতে পেরেছেন, তিনিই কামকে জয় করতে পেরেছেন। মনের চঞ্চলতা হচ্ছে কামভাব, আর মনের স্থিরতা হচ্ছে কাম জয়। তাই মনের স্থিরতাই সাধকের সাধনা। মন স্থির হলে মনের সঙ্কল্পভাব চলে যায়। আর সংকল্প শূন্য মন অনাত্মভাবে থাকতেই পারে না, আত্মস্বরূপ হয়ে যায়। এই আত্মস্বরূপে স্থিতিই সাধকের কামরোহিত অবস্থা । যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই বলছেন, বুদ্ধির (যোগ-কৌশল) দ্বারা মনকে স্থির করতে পারলে, কামের ধংশ হবে, আর কামের ধংশ হলেই সেই শ্রেষ্ট আত্মাতে স্থির হতে পারবে।
শেষ হলো শ্রীগীতায় ভগবান শ্রীমুখনিঃসৃত কর্ম্মযোগ নামে তৃতীয় অধ্যায়।।
------------------