Friday, 9 August 2019

"অমি"-কে ধরবেন কি করে ?

"অমি"-কে ধরবেন কি করে ?

আমরা এর মধ্যে জেনে গেছি, আমি এই দেহ নোই।  আমি এই মন নোই।  আমি বুদ্ধি নোই। তাহলে আমি কে ? আমি নাকি আত্মা।  এই আত্মা ব্যাপারটা কি ? আত্মা বা আমি হচ্ছে চেতন শক্তি যা স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ চেতন শক্তি প্রথমে আমাদের স্থূল শরীরে থাকে।  তার পরে আমাদের স্থূল দেহের মৃত্যুর পরে মানসদেহে অবস্থান করে। তার পরে মানস দেহের অবলুপ্তিতে চেতনশক্তি আমাদের বিজ্ঞানময় দেহে অবস্থান করে। আমাদের তিনটি পার্থিব  দেহের অর্থাৎ অন্নময়, প্রাণময়, ও মনময়, এই তিনটি দেহের যখন অবলুপ্তি হয় তখন এই চেতন শক্তি বিজ্ঞানময় দেহে ক্ষনিকের জন্য অবস্থান করে। তার পর বিজ্ঞানময় দেহ চেতনশক্তি সহ  আনন্দময় দেহে অবস্থান করে, এবং সবশেষে আনন্দময় দেহ চেতনশক্তিকে নিয়ে তার উৎস অর্থাৎ বিশ্বশক্তি বা  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু এগুলো হচ্ছে তাত্ত্বিক কথা। সত্যি সত্যি আমাদের অমিকে কি আমরা ধরতে পারি ? যদি ধরতে পারি কিভাবে ধরবো ? সেই গোপন গূঢ়রহস্যঃ আজ আমরা শুনবো। 

আমরা এও জেনে গেছি, যে আমাদের স্নায়ুকেন্দ্রে যখন ঢেউ ওঠে তাকে বলে আমাদের মনের চিন্তা- বা আমাদের কামনা-বাসনা। অর্থাৎ আমাদের মানসিক বৃত্তি। আমাদের চেতনা অর্থাৎ সত্যিকারের আমি যখন এই মানসিক বৃত্তির সঙ্গে মিশে থাকে, তখন আমরা তাকে ধরতে পারি না। তো আমাদের কাজ হচ্ছে আমাদের চেতনাকে এই বৃত্তি থেকে আলাদা করা। এটা কি ভাবে করবো ? এই প্রক্রিয়াকে বলতে পারেন, অমিকে ধরবার খেলা। 

চুপচাপ মেরুদন্ড সোজা রেখে বসুন। মনের গভীরে ঢোকার চেষ্টা করুন। মনে কি কোনো চিন্তা উঠছে ? যদি ওঠে তবে তাকে পর্যবেক্ষন করুন। যতক্ষন না মনের চিন্তা দূরীভূত হচ্ছে, ততক্ষন এই অবস্থায় বসে থাকুন। মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন, যতক্ষন না মন চিন্তাশূন্য হচ্ছে ততক্ষন আমি মনকে ছাড়ছি না। 

এই ভাবে অবস্থানের ফলে, মন চিন্তা ছেড়ে, জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করবে। এবং আপনি একটা আলোর বিন্দু দেখতে পাবেন। এই আলো আসলে জ্ঞানের আলো। এই আলো  আপনাকে পথ দেখাবে। এই আলোয় আপনি প্রথমে আপনার স্থূল দেহকে দেখতে পাবেন। অর্থাৎ প্রথম প্রথম মনে হবে, এই দেহই আমি। এর পরে,  শুধু আপনি আপনার মুখটা দেখতে পাবেন। অর্থাৎ মনে হবে, আপনার মাথাটাই আপনি। এর পরে আরো অপেক্ষা করুন, মাথার আকৃতি একটি কালো চক্রে পরিণত হবে  যার ভিতরে একটা আলোর বিন্দু দেখতে পাবেন। তখন মনে হবে, এই আলোর বিন্দু  বা মাথার একটা নির্দিষ্ট অংশই  আমি। এবার আপনি এই আলোর বিন্দুটাকে খেয়াল করুন, এটি মাথার কোথায় অবস্থান করছে ? 

এই সময় আপনার মধ্যে আবার চিন্তা উঠতে থাকবে। না একে  এড়িয়ে যাবেন না। চিন্তাগুলোকেই লক্ষ্য কোরতে  থাকেন।  এবার খুজুন কে চিন্তাগুলোকে দেখছে ? এবং মনের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে থাকুন, আমি কে ? আমি কে ? প্রশ্ন করুন, আর মনকে গভীর ভাবে লক্ষ করুন। এখন চিন্তা সরে যাবে। আর ভিতরে অর্থাৎ চেতন কেন্দ্র উদ্ভাসিত হবে। এই সময় আপনি একটা অখণ্ডতা নিস্তব্ধতা অনুভব করবেন। এই নিস্তব্ধতার অনুভবই আমি বোধ।  বা অহং বোধ। এবার এটাকে ভালো করে লক্ষ করতে থাকুন। একটা জ্যোতি আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন।আপনার মনে একটা আনন্দ-অনুভব হচ্ছে। এই সময়, আপনার প্রশ্ন অর্থাৎ আমি কে, এটাকে দৃঢ় রেখে অপেক্ষা করুন। 

এর পরের  কাজগুলো আপনাকেই করতে হবে।  গুরুদেব বলছেন, সাধককে এবার একলা যাত্রা করতে হবে। সব শেষে একটা কথা বলি, আমি যতটা  সহজে কথাগুলো বলে গেলাম, এটাকে কার্যকরী করা এতটা সহজ নয়।  এটি প্রথমত সময় সাপেক্ষ, দ্বিতীয়ত একমাত্র গুরুর সান্নিধ্যে, গুরুর নির্দেশে এসব করতে হয়। আমার কথায় একাজ করতে যাবেন  না।   

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম।

"অমি"-কে ধরবেন কি করে ? (২)

আলোচনা করছিলাম, আমার "অমি"কে ধরবো কি করে। গুরুদেব আগের দিন কিছুটা নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, এবার একলা যাত্রা করতে হবে। এই পথে কি একলা যাওয়া যায় ? যাকে চিনি না, জানিনা, তাকে ধরতে গেলে, তাকে পেলেও আমি সনাক্ত করতে পারবো না। গুরুদেবকে এ কথা বলতেই তিনি যা বলেছিলেন, আমরা আজ সেই কথা শুনবো।
আমরা যখন যার মধ্যে অবস্থান করি, তখন আমরা তাই হয়ে যাই। আমরা যখন দেহের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আমরা দেহী হয়ে যাই।  আমরা যখন জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আমরা জ্ঞানী হয়ে যাই। আমরা যখন পাপের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আমরা পাপী হয়ে যাই।  আসলে আমি ও আমার এই কথাটা ভালো করে বুঝতে হবে। আমি মানুষ, আমি জ্ঞানী, আমি গায়ক, আমি সাধক, আমি লেখক, এগুলো হচ্ছে আমাদের অহং জ্ঞান। আবার আমার দেহ, আমার ছেলে, আমার মেয়ে ইত্যাদি হচ্ছে  সম্মন্ধ-জাত জ্ঞান বা মমতা । অর্থাৎ যার সাথে আমার সম্মন্ধ হয়েছে। এগুলো সবই সাময়িক। কেননা আমি চিরকাল মানুষ, বা গায়ক, বা সাধক, বা লেখক থাকবো না, অর্থাৎ এগুলো সবই কালের অধীন। আবার আমার যাদের সাথে সন্মন্ধ হয়েছে, এগুলোও একসময় থাকবে না। কিন্তু আমি থাকবো। তো আমি এখন কিসের মধ্যে প্রবেশ করেছি সেটা একটু ধ্যান দিয়ে দেখি।
ধ্যান যখন গভীর হবে, আমি বোধকে আলাদা করে নিয়ে মনের উপরে নিবিষ্ট করলে, এই কালের বা সাময়িক  সম্পর্ক গুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন করতে পারবো। আমি কে - এই প্রশ্নটাকে আমাদের মধ্যে দৃঢ় রাখতে হবে। অর্থাৎ আমাদের মূল উদ্দেশ্য আমিকে জানা বা ধরা।  এই ভাব যেন ক্ষনিকের জন্যও ত্যাগ না করি।
আমরা জানি আমাদের পাঁচটা শরীর। বা পাঁচকোষের এই শরীর ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আমি বোধকে ধরবার যে প্রক্রিয়া সেটা আমরা আগের দিন আলোচনা করেছিলাম। সেই প্রক্রিয়ার দ্বারা আমরা মনের স্তরে প্রবেশ করেছিলাম। অর্থাৎ অন্নময় - প্রাণময় কোষ পেরিয়ে মনময়  কোষে প্রবেশ করেছিলাম। এবং গভীর ধ্যানে লিপ্ত থেকে মনকে চিন্তা মুক্ত করেছিলাম। এই অবস্থায় মন কিন্তু বিলীন হয়ে যায় না। এই সময় মনের বৃত্তিগুলো সংস্কার রূপে সুপ্তভাবে থাকে। এই অবস্থায় মনের সংস্কারগুলো মাঝে মধ্যেই জেগে ওঠে। এই অবস্থায় ধ্যানের  গভীরতা যত  বাড়াতে পারবো, তখন
আমিকে আরো ভালো করে ধরতে পারবো। এবং এই আমি-বোধে স্থির হয়ে থাকার  শক্তি ও সময় অর্থাৎ স্থিতিকাল  বৃদ্ধি পাবে। এই অবস্থায় আমরা, আমাদের  দৈনন্দিন কাজের সময়ও , এই আমি বোধকে অন্যান্য মানসিক বৃত্তি থেকে আলাদা করতে পারবো। এই রকম হলে, আপনি জানবেন, আপনার সাধন জীবনের  উন্নতি হয়েছে। মনে রাখবেন, ধ্যান একটা নিরবিচ্ছিন্ন অবস্থা। এমন নয় যে যতক্ষন আমরা  ধ্যানাসনে আছি, শুধু সেই সময়টুকু আমাদের উচ্চ অবস্থা থাকবে, আর তার পরেই আমরা আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবো। ব্যাপারটা এমন নয়। আমার আমিবোধকে মানসিক বৃত্তি থেকে আলাদা করে আমার দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ চালিয়ে যাবো। এটাই প্রকৃত ধ্যানের প্রাপ্তি।

এই ভাবে আমার আমি-বোধকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ধরে রাখতে পারলে, এবং নিয়মিত ধ্যান সাধনা চালিয়ে গেলে আমরা মনময় কোষ ত্যাগ করে বিজ্ঞানময় কোষে উত্তীর্ন হতে পারবো। এই অবস্থা একটু ভালো করে খেয়াল করুন। এই অবস্থায় আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস-এর গতি কমে যাবে। সাধারণত আমরা যখন শ্বাস নেই সেটা আমাদের নাক থেকে বুকে, বুক থেকে পেটে চলে যায়। কিন্তু আমাদের আমিবোধ যখন মনময় কোষ ছেড়ে বিজ্ঞানময় কোষে ওঠে, তখন আমাদের শ্বাস নাকের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। এবং আরো পরে একসময়  কেবলমাত্র নাসিকাগ্রে অবস্থান করে। এই অবস্থায় আমাদের অস্বস্তি বোধ হওয়া স্বাভাবিক।  কিন্তু গুরুর নির্দেশ নিয়ে, এই সময় ধ্যানে অবস্থানের সময় বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।  এবং তাতে এই অসুবিধা বা অস্বস্তি কেটে যাবে। এই সময় আরো কতগুলো অস্বাভাবিকতা আপনার মধ্যে দেখা দিতে পারে। যেমন শরীরে একটা কম্পন - যার উৎস হচ্ছে মেরুদন্ড। মেরুদণ্ডের মধ্যে একটা শিরশিরানি ভাব।  এমনকি এও মনে হতে পারে, যে একটা ছুঁচ আপনার মেরুদণ্ডের  ভেতর দিয়ে কেউ যেন উপরের দিকে  ঠেলে দিচ্ছে। এই শারীরিক অস্বস্তির সময় ধ্যানে নিরত থাকুন। আপাতত ধ্যান বন্ধ রাখুন। অথবা  কাউকে বলুন, মেরুদণ্ডে ম্যাসেজ করে দিতে। ম্যাসেজ করার সময় খেয়াল করবেন, হাত দিয়ে আলতো  করে পাশাপাশি ম্যাসেজ করতে।  ভুলেও উপর নিচ করবেন না। যদি এতেও  অস্বস্তি না যায়, তবে কয়েকদিন ধ্যান বন্ধ রাখুন। দেখবেন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। কিন্তু স্বাভাবিক হয়ে গেলেই আবার ধ্যানের অভ্যাস শুরু করুন। দরকার হয় এই অস্বস্তি অল্পবিস্তর সহ্য করুন।

এই সময় থেকে আপনার নানান-রকম দর্শন হতে পারে। জ্যোতি দর্শন হতে পারে। নানানরকম দেবদেবী যা আপনার চেনা বা অচেনা  মূর্তি, বিভিন্ন জায়গা, বিভিন্ন দৃশ্য, তা সে ভালোমন্দ সবই হতে পারে। সুন্দর, কুৎসিত, এমনকি ভয়ঙ্কর হতে পারে। এগুলো একটা সময় চলে যাবে, আর আপনার মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটবে। এগুলো দেখায় আপনার মধ্যে আনন্দ বা ভয় বা উদ্বেগ  দেখা দিতে পারে। আপনি নিস্পৃহ থাকুন। আর আপনি আপনার মধ্যে চিন্তা ওঠান যে এগুলো কে দেখছে ? অর্থাৎ আপনার সেই মূল ও প্রাথমিক প্রশ্ন আমি কে ? এই প্রশ্নকে আঁকড়ে ধরুন।  আমি কে ?
এই অবস্থায় অনেকের চিন্তা শক্তি হারিয়ে যায়। ক্ষনিকের জন্য চেতন শক্তিও  হারিয়ে যায়। যদিও এটা কয়েক  মুহূর্তের জন্য হয়ে থাকে।  তথাপি এই অবস্থা থেকে ফিরে এলে মনে হয়,  আমি কি সমাধিতে ছিলাম। আসলে এটি সমাধি নয়, বলা যেতে পারে আপনার মূর্ছা হয়েছিল।বা আপনি খানিকটা সুসুপ্তির অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন।  মন তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য  লয় হয়ে গিয়ে ছিলো।

আমাদের একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে, আমি আমাকে খুঁজছি। তাই আমি কে, অর্থাৎ আমি একটা চেতন সত্ত্বা।  অর্থাৎ যে সব কিছু উপলব্ধি করছে তা একটা চেতন সত্ত্বা এই কথাটা আমাদের সব সময় স্মরণে রাখতে হবে। এই অবস্থায় আমাদের অনেকের  ঘুম পায়। আর ঘুম পেলে জানবেন, আপনার যাত্রা পথে এটি একটি বড়ো বাঁধা। আপনাকে সজাগ থাকতে হবে। চেতন থাকতে হবে। এই বিজ্ঞানময় কোষে যখন  আপনি  অবস্থান করেন, তখন আরেকটা অদ্ভুত উপলব্ধি হয়, আর তা হচ্ছে আমি যেন শরীর নোই। শরীরের মধ্যেও আমি নেই। এই সময় আমাদের চেতন সত্ত্বাটি শরীরের চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়। শরীরের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। তখন যেন মনে হয়, আমি মারা  গেছি। শরীরের সঙ্গে মনের যোগসূত্রটি কেটে গেছে। শরীর স্থির হয়ে বসে আছে, আর আমি শরীরের বাইরে।এমনটি হলে, প্রথম প্রথম আমাদের ভীষণ ভয়ের উদ্রেগ হয়। কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। এইসময় দেহের সম্পর্কে কোনো চিন্তা ওঠালে অর্থাৎ কোনো স্মৃতি বার বার ওঠালে, এই অবস্থা কেটে যায়। সাধক তখন সাধারণ অবস্থায় স্থিতিশীল হয়।
বিজ্ঞানময় কোষে যাতায়াত ও স্থিতি  যখন আমাদের সহজ মনে হয়, অর্থাৎ বার বার যাতায়াত করতে করতে এই ব্যাপারটা যখন  সহজ মনে হয়,  তখন এই বিজ্ঞানময় কোষকে অতিক্রম করবার চেষ্টা করতে হয়। শান্ত মনে চেতনাকে আমিবোধে নিবিষ্ট করতে হয়। এইখানে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এক হয়ে যায়। তখন আমাদের মধ্যে আমি আমাকে জানছি এইরকমটা  মনে হয়। দ্রষ্টা ও দৃশ্য এক হয়ে যায়। এই অবস্থায় আমরা চেতন সত্ত্বার উপরে আমি বোধ বা আমিত্ব আরোপ করে ধ্যানের প্রক্রিয়া চালাতে থাকুন।  প্রক্রিয়াটা এই রকম। প্রথমে বিষয় সম্পর্কে যে চৈতন্য বা বিষয়ের সঙ্গে যে চৈতন্য মিশে আছে, অর্থাৎ বুদ্ধির সঙ্গে বিষয় মিশে যে চৈতন্য আমি বোধের সৃষ্টি করেছে, তাকে আলাদা করতে হয়। অর্থাৎ প্রথমে ভাবুন, আমি আমাকে জানছি, এর পরে কেবলমাত্র আমাকে জানছি, তারও  পরে শুধু জানছি এই ভাবে "আমি"কে আলাদা করুন। আমি আমার মধ্যে আছি,  তারপরে আমার মধ্যে আছি, তারপরে শুধুই  আছি। এইভাবে আমিকে আলাদা করুন। অর্থাৎ জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় বলে কিছু থাকবে না, দ্রষ্টা-দৃশ্য বলে কিছু থাকবে না। জ্ঞাতা-জ্ঞেয়  মিশে যাবে, দ্রষ্টা দৃশ্য মিশে যাবে। বিজ্ঞানময় কোষে নিজেকে উত্তীর্ন হতে পারলে এই আছি বোধ স্থির হতে থাকবে। আপনি এক অপূর্ব শান্তি, অহেতুক আনন্দ আপনার মধ্যে স্ফূরিত হতে থাকবে। আমি ও আনন্দ তখন এক হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমি যে আনন্দময় সত্ত্বা সেটা আমাদের উপল্বদ্ধিতে স্থায়িত্ত্ব লাভ করবে। যাকে আমরা এতদিন,শরীর-মন-বুদ্ধি-চিত্ত্ব-অহংকার বলে অনুভব করতাম, সেই আমি এখন একমাত্র আনন্দময় সত্ত্বা বলে অনুভব হবে। আমাদের মনে হবে আমরা আনন্দের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছি। আর এটাকেই বলে আনন্দময় শরীরে প্রবেশ।
এই আনন্দময় শরীরকেও আমাদের ছাড়তে হবে। তা না হলে আমরা শরীর বিহীন হতে পারবো না। অর্থাৎ এক-এক করে পাঁচটা শরীরকে ছেড়ে যাবো।  এইজন্য ধ্যানের এই অবস্থায়, আমাদের খেয়াল করতে হবে, এই আনন্দ আসছে কোথা থেকে ? এই আনন্দের উৎস খুঁজতে হবে। এই সময় আমাদের চেতনা শরীর  শূন্য হয়ে পড়ে।  অহংহীন  হয়ে পড়ে। আর আমাদের মনে হয় মহাশূন্য আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আমি যেন মহাশূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছি। মহাশুন্য আর আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না। মহাশূন্য আর আমি একই সত্ত্বা। এবার মনে হয়, আমি আর আমিতে  থাকছি না। আমার যেন নিজস্ব সত্ত্বা বলে কিছু নেই।  এই সময় এক গভীর অন্ধকার, এক মহাশুন্য, আমাকে অপ্রকাশ করে ফেলছে। আমি যেন বিশ্বসত্ত্বার সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বসত্ত্বা আর আমি এক হয়ে গেছি। আমার অহং  বলে আর কিছু থাকছে না। এক অব্যক্ত সাম্যাবস্থা। সমস্ত গুনের বন্ধন, সমস্ত সত্ত্বার বন্ধন, সমস্ত শরীরের বন্ধন   আমার কেটে গেছে। আমি বিশ্বগ্রাসে পতিত। সমস্ত রহস্যভেদ হয়ে গেছে।  এই সময়, অস্তিত্ত্বের দাবি অস্বীকার হয়ে গছে। আমি বলে কিছু নেই। আমি মহাশূন্যের, মহাশূন্যই আমি। এটাই আমার প্রকৃত সত্ত্বা। শিবোহম  শিবোহম, তুহি তুহি। 

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম।

Thursday, 1 August 2019

আত্মার খোঁজে

আত্মার খোঁজে 

ওম সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্যং করবাবহৈ। 
তেজস্বি নাবধিতম অস্তূ মা বিদ্বিষাবহৈ।। 
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।।
আত্মার খোঁজে (১)
মানুষের আসা যাওয়া আত্মা ভিন্ন সম্ভব নয়।  তাই আমরা আজ আত্মার সন্ধানে যাবো।
কঠোপনিষদ -এর যমরাজ ও নচিকেতার কাহিনী আমাদের সবার জানা। তো কাহিনীতে নচিকেতা নামে  এক কিশোর মৃত্যুরাজ্যে গিয়ে যমরাজকে তিনটি প্রশ্ন করেছিলো। তার মধ্যে শেষ প্রশ্নটি ছিল আত্মার অস্তিত্ত্ব-অনস্তিত্ত্ব সম্পর্কে। হাজার বছরের পুরাতন এই প্রশ্ন আমাদের সবার মনে আজও  জাগে । আমরা মারা গেলে এই দেহটি পুড়িয়ে বা কবর দিয়ে দেওয়া হবে। পঞ্চভূতের তৈরি এই রক্ত-মাংসের এই দেহ পঞ্চভূতে মিশে যাবে। তা হলে আমি বলে কিছু থাকে কি ? আমি বলে যদি কিছু না থাকে তবে শ্রাদ্ধশান্তি - কার্য্যের কি দরকার ? আর  পরজন্ম বা স্বর্গ-নরক বলে কিছু থাকে কি ?

আসলে আমরা কেউ মরতে চাই না। এবং সেই কারণেই আমরা বিশ্বাস করি, মৃত্যুর পরেও আমরা বেঁচে থাকবো। তাই মৃত্যুর পরেও আমার অস্তিত্ত্ব আছে, এটা প্রমান করবার জন্য, আমরা উঠে পরে লেগে আছি। কিন্তু সত্য কি ? সেটা আমাদের জানতে হবে।

মহাভারতের যুদ্ধের পরে, ব্যাসদেবের কাছে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী তার মৃত পুত্রদের দেখতে চেয়েছিলো। ব্যাসদেব তাদের দেখিয়েছিলেন। এবং মৃত্যুকালীন চেহারায় তারা দেখা দিয়েছিলো। সত্যিই কি এটা সম্ভব ? সাহিত্যে অনেক কাল্পনিক গল্প থাকে, এটা সত্য। আর আমার কাছে এটাও সত্য যে মানুষ যা কিছু কল্পনা করে, বা চিন্তা-ভাবনা করে, তার সবকিছুর প্রতিচ্ছবি  এই জগতে বর্তমান। তাই এই ঘটনা আমার কাছে কল্পনা নয়, সত্য।

আবার একটা প্রশ্ন আমার মধ্যে জাগে, সেটা হচ্ছে মানুষ বা জীবজন্তু যদি মারাই যাবে, তবে আর জন্ম নেওয়া কেন ? আর এত দুঃখ-কষ্ট কেন ? ঈশ্বর যদি আনন্দময় হন , তবে আমাদেরকে চিরজীবী করে আনন্দের মধ্যেই তো রাখতে পারতেন। কেন তিনি তা করেন না।

মারা যাবার পরে আমরা কি চেতন থাকি ? অর্থাৎ মৃত্যু পরবর্তী জগৎ সম্পর্কে কি মৃত্যুর পরে আমরা সবাই জানতে পারবো ? জাগতিক সুখ ক্ষণস্থায়ী। জাগতিক সুখ খুবই স্বল্প-স্থায়ী।  এমনকি আমাদের যে জীবন-পরিসর, অর্থাৎ ৮০-১০০ বছর, তার মধ্যেও  স্বল্পক্ষনই মাত্র মানুষ সুখে থাকে।এর থেকে আরো বড় সত্য হচ্ছে, আমাদের সুখ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আমরা আইঢাই করি।  যাকে সোজা বাংলায় বলে, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। তাই সুখ আমাদের সয় না।

মৃত্যু কেন নির্ধারিত সত্য।  এর অন্যথা হয় না কেন ? ইত্যাদি ইত্যাদি নানান প্রশ্ন আমাদের সবার মনে উঁকি দেয়। আমরা এই সব প্রশ্নের জবাব খুঁজবো।

প্রথমে বলি, মৃত্যুর পরে আমরা সবাই বা আমাদের সবার আত্মা মৃত্যু পরবর্তী জগৎ সম্পর্কে সচেতন থাকে এমন নয়। স্বল্প সংখ্যাক আত্মার এই উপলব্ধি থাকে। বাকিরা ঘোর তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় কাল অতিবাহিত করে। তাই যদি হয় তবে আমরা যারা এই দেহে অবস্থান করছি, তারা কি করে আমাদের মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবো ?

নচিকেতার গল্পের একটা দিক খেয়াল করুন, নচিকেতা যমরাজের কাছে গেছে, অর্থাৎ এখন তার মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা। দ্বিতীয়তঃ দেখুন, তার জিজ্ঞাসায় সে অটল। হাজার বছর বাঁচার আয়ু, অঢেল ধনসম্পত্তির লোভ সে ত্যাগ করেছে। অর্থাৎ যারা উচ্চ শুদ্ধজ্ঞানে পৌঁছুতে পেরেছেন, যারা পরা-চৈতন্যের স্তরে উপনীত হয়েছেন, একমাত্র তারাই এই জ্ঞানের অধিকারী। তাই মৃত্যুর পর আমাদের কি হবে, বা আমরা মৃত্যুর পরে কি হবো অর্থাৎ আমরা সত্যি সত্যি থাকবো কি না, বা সত্যি সত্যি আমাদের আত্মা বলে কিছু আছে কি না, বা আমরা সত্যি আত্মা কি না, নাকি অন্য কোনো মিশ্র বস্তু, , নাকি কিছুই নয়, তা জানতে গেলে আমাদের পরাচৈতন্য-স্তরে পৌঁছতে হবে। নতুবা আমি যা বলবো, তা আপনার কাছে স্পষ্ট হবে না। এমনিতে যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তাকে ভাষার মধ্যে আবদ্ধ করা মানে অসীমকে সীমাবদ্ধ করা। এইজন্য একাজে দরকার সৎগুরু। যিনি আপনাকে একমাত্র উপলব্ধি দিতে পারেন, বা বলা যেতে পারে, ব্যাসদেবের মতো দিব্যদৃষ্টি দিতে পারেন।

এখন আমরা যমরাজ কি বলেছিলেন, সেটা আমরা একটু দেখে নেই।

যমরাজ বলছেন,  পথ দুটি একটা প্রেয় আর একটা শ্রেয়। প্রেয় অর্থাৎ যে পথে গেলে আমরা প্রিয় বস্তুকে পেতে পারি। আর একটা পথ হচ্ছে শ্রেয় অর্থাৎ যে পথে গেলে আমরা শ্রেষ্ট বস্তুকে পেতে পারি। যদিও এদুটোই বন্ধনের  কারন। অর্থাৎ আপনি ভালো কাজ করলে অর্থাৎ ভালো পথে গেলে আপনার ভালো ফল হবে, আর আপনি খারাপ কাজ করলে খারাপ ফল হবে। ফল দুটোতেই হবে। আর ফল হলে তা ভোগ করবার জন্য আপনাকে আবার পুনরায় জন্ম গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ কর্তা জ্ঞান যতক্ষন আছে, ততক্ষন আমাদের কর্মফল ভোগ করতেই হবে।

বিদ্যা দুই রকম জাগতিক ও আধ্যাত্মিক। একটি জাগতিক বিষয়ের উপরে জ্ঞান আর অপরটি আত্ম বিষয়ে জ্ঞান। জাগতিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে মানুষ বৈষয়িক  উন্নতি করতে পারে। আর আধ্যাত্মিক বিষয়ের জ্ঞানের দ্বারা মানুষ নিজের উন্নতি করতে পারে। এখন জাগতিক বিষয়ের জ্ঞান, বা তার প্রয়োগগত ফল, আপনার মৃত্যুর পরেও  এই ইহ জগতের কাজে লাগতে পারে, কিন্তু আপনার নয়। কিন্তু আধ্যাত্মিক জ্ঞান আপনার মৃত্যুর পরেও কাজে লাগতে পারে। এখন কথা হচ্ছে,  পরলোক বলে কিছু আছে কি না, সেই জ্ঞান আমাদের মতো যাদের  নেই, তাদের কাছে এই জ্ঞান অর্থহীন। আর সেই আমরাই এই পৃথিবীটাকে ভরাট  করে রাখি।  অর্থাৎ আমরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে বার বার ফিরে ফিরে আসি। আর মৃত্যু যন্ত্রনা ভোগ করি।

আত্মা সম্পর্কে কথা বলার লোকের অভাব। তাই আমাদের আত্মা সম্পর্কে শোনার সুযোগ নেই। আবার যে সব ভাগ্যবান শোনার সুযোগ পান, তারা শুনেও এর তাৎপর্য বুঝতে পারেন না। একমাত্র ব্রহ্মজ্ঞানী এই আত্মা সম্পর্কে জানেন। যুক্তি তর্কের দ্বারা আত্মাকে জানা যায় না। যাদের সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি আছে, তারাই আত্মাকে আচার্য্যের কাছ থেকে জানার অধিকারী হন। প্রতক্ষ্য উপলব্ধি ছাড়া আত্মাকে জানা যায় না। আত্মাকে জানতে গেলে বিষয়তৃষ্ণাকে ত্যাগ করতে হবে। যজ্ঞ-ফলের আশা ত্যাগ করতে হবে। আত্মা রয়েছেন হৃদয়ের গভীরে,ইনি ইন্দ্রিয়-গোচর নন। কঠোর আধ্যাত্মিক অনুশীলনের দ্বারা আত্মাকে উপলব্ধি করা যায়।

যেমন ভাবে আমরা বাইরের বস্তুকে দেখি তেমনভাবে আত্মাকে দেখা যায় না। দেখতে গেলে দুটো জিনিস লাগে এক : দৃশ্য ও দুই : দ্রষ্টা। এক্ষেত্রে দ্রষ্টা ও দৃশ্যবস্তু আলাদা নয়। যতক্ষন আত্মা নিজেকে সাধকের নিজের স্বরূপ প্রকাশ না করেন,  ততক্ষন আত্মাকে কেউ দেখতে পান না। এযেন  আয়নাতে নিজেকে দেখা। পরিষ্কার আয়না না হলে, নিজেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। ইন্দ্রিয়সুখ থেকে নিজেকে পুরুপুরি  গুটিয়ে নিতে পারলে আমাদের চিত্তশুদ্ধি হয়। তখন সেই স্বচ্ছ মনে আত্মা নিজেকে ধরা দেন। আমাদের মন কামনা বাসনায় পরিপূর্ন।  বিষয় থেকে মনকে নিয়ে গিয়ে যদি আত্মাতে সমাহিত করা যায়, তবে মন শান্ত হয়, একেই বলে চিত্তশুদ্ধি।  চিত্তশুদ্ধি হলে জ্ঞান আপনা আপনি ফুটে ওঠে।

আমরা মনের আলোচনার সময় শুনেছিলাম, মন আর কিছু নয় আমাদের বিভিন্ন স্নায়ুকেন্দ্রের ক্রিয়া। এক একটা স্নায়ু কেন্দ্রে এক এক রকম ক্রিয়া সংগঠিত হয়। নিচের তিনটি কেন্দ্রে অর্থাৎ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মনিপুরে যে ক্রিয়া সম্পাদিত হয় তা আমাদের সাধারণ জীবনের ক্রিয়া। অনাহত চক্র  থেকে এই  আত্ম-উপলব্ধি শুরু হয়। অর্থাৎ অনাহত -বিশুদ্ধি,-আজ্ঞা, ও সহস্রার এই সব স্নায়ু কেন্দ্রে  যখন আমাদের মন নিবিষ্ট হয়, তখন আমরা আত্মার প্রতিফলন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাই, এটাই উপলব্ধি। এই আত্মাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আমার এক অকালপক্ক বন্ধু, ছোটবেলায় ভারত সেবাশ্রমের এক শিক্ষক  স্বামীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, স্বামীজী  ঈশ্বর কেমন ? তিনি বলেছিলেন, দেখো বাবা তোমরা আমার সন্তানের মতো,  এইসব প্রশ্নের কোনো জবাব হয় না।  তবু বলি, যে কোনোদিন ঝাল খায় নি তাকে ঝাল কেমন তা কি ভাষায় দিয়ে বোঝাতে পারা  যায় ?  যায় না, তবে কি করতে হয় ? তার জিভে লঙ্কা ঘষে দিতে হয়। তবে সে হাড়ে  হাড়ে   বুঝতে পারে ঝাল কেমন। ঈশ্বর কেমন তোমরা যখন ঈশ্বর দেখার উপযুক্ত হবে, তখন বুঝবে ঈশ্বর কেমন।

আত্মা উপল্বদ্ধির বস্তূ, এঁকে  ভাষা দিয়ে বোঝানো যায় না।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি  ওম।

আত্মার খোঁজে (২)

আমরা কিছু বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন সন্ধ্যে বেলা মিলিত হই। সেখানে একদিন  মৃত্যুর পরে মানুষের কি হয়, সেই আলোচনা হচ্ছিল, আমাদের এক  মিত্র বললো : মৃত্যুর পরে, মানুষের আর কিছু থাকে না। হাওয়ায়  মিলিয়ে যায়। আমি এসব আত্মা-ফাত্মায়  বিশ্বাসও করি না। আর এসব জেনে কোনো লাভ নেই। মিত্র, ব্যাঙ্কে অফিসার ছিল। অবসরকালীন টাকা আছে, আছে পেনশন, একমাত্র ছেলে, ভালো চাকরি করে।   বৈষয়িক মানুষ, বাড়িতে পূজাঅর্চনা করে। তারকেশ্বরে প্রায়ই পুজো দিতে যায়। বাড়িতে শ্রীকৃষ্ণ-শিবঠাকুর-লক্ষ্মী ইত্যাদি ঠাকুরের পুজোও করে, ভক্তি সহকারে। বিশেষ করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো বেশ ঘটা  ক'রে করে। এই কয়দিন আগে বাড়িতে বাবার মৃত্যুদিন উপলক্ষে গীতাপাঠের আয়োজন করেছিল। ওর বাবা নাকি প্রতিদিন গীতাপাঠ করতো।

কিছু মানুষের ভোগে আনন্দ, ব্যতিক্রমী কিছু মানুষ আছেন, যারা ত্যাগে আনন্দ পান । আমরা সাধারণ মানুষেরা মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে, মনোযোগ না দিয়ে খেয়েপরে সুখে কাটিয়ে দিতে চাই। তাইবাঞ্চিত  বস্তূ পাবার জন্য, আমরা দেবদেবতার পুজো করি। ঠাকুর কাছে মানত করি, । মৃত্যুর পরে  কি হবে সেই চিন্তা করে সময় নষ্ট করতে চাই না। মৃত্যুর পরে মৃত্যুই আমাদের ভার নেবে। তাই তার জন্য মাথা ঘামাই না। খাই-দাই সুখে থাকি, এই হলো আমাদের মনোবৃত্তি।

কিন্তু স্বল্প সংখ্যক মানুষ আছেন, যারা ভয়ে হোক বা সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে হোক,অথবা অন্তরের ডাকে হোক, তাদের  স্বাভাবিক জীবনের শান্তি ভঙ্গ করে, এই জানার স্পৃহা । মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগায়, মৃত্যুর পরে আমাদের কি পরিণতি হবে ?

বর্তমানে  আমরা যার উপরে নির্ভর করছি, তা সে বিষয়-সম্পত্তি বলুন, আর আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব বলুন, তা  একসময় আমাদের হাত থেকে চলে যাবে। মা-বাবা- চলে গেছেন, ভাই-বোন-বন্ধুবান্ধবও এক এক করে চলে যাওয়া শুরু করেছে। দিনে দিনে আমরা সবাই একা হতে চলেছি । এমনকি  এই সাধের শরীরও আর সাধ দিতে চাইছে না। কানে কম শোনা, চোখে কম দেখা, শুরু হয়েছে। যারা ছিল না, তারা আসা শুরু করেছে।  রোগ-শোক এখন  নিত্য সাথী। সুগার এসেছে, প্রেসার বেড়েছে। জীবনে আমোদ উপভোগ করবার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। এবং শাশ্বত সত্য হচ্ছে, জাগতিক সব কিছুই আমাদের ছেড়ে যেতে হবে।  তা সে ধনী-দারিদ্র, সুখী-অসুখী, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, যে অবস্থায়ই আপনি থাকুন না কেন।
এখন কথা হচ্ছে, মৃত্যুর পরে কি হবে সে কথা আমাদের জানলেই বা কি হবে, আর না জানলেই বা কি হবে ? আর যে জানে মৃত্যুর পরে কি তার কাছে সেই জ্ঞান থাকবে ? অর্থাৎ আমরা তো এই শরীর  দিয়েই জ্ঞান সংগ্রহ করি, আবার এই শরীরেই জ্ঞান সঞ্চিত হয়। তো আমরা যখন শরীর  বিহীন হয়ে যাবো, তখন কি করে এই জ্ঞান কাজ লাগবে ? যদি ধরেও নেই যে আত্মা বলে কিছু আছে, সেটা তো  ক্রিয়াহীন, তো তার জ্ঞানকর্ম কি ভাবে  কোন কাজে লাগবে ?

একটা বিদ্যালয়ে গেলে দেখবেন, দুটো জিনিস একসাথে আছে। একটা হচ্ছে বিদ্যাগৃহ আর একটা খোলা মাঠ।  বিদ্যাগৃহে যেমন ছাত্ররা শিক্ষা গ্রহণ করে, তেমনি মাঠে খেলাধুলা করে। এই জীবনটাও একটা বিদ্যালয়, সেখানে আমরা যেমন আনন্দ লাভের  জন্য  খেলাধুলা করি, তেমনি শিক্ষা গ্রহণ করি। এখন কেউ যদি শিক্ষা গ্রহণ না করে, শুধু খেলাধুলা করে, তো তার ভবিষ্যৎ নিশ্চয় উজ্জ্বল হয় না। এই জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। শিক্ষার উদ্দেশ্যেই আমরা এখানে আসি।

যমরাজ যখন, খেলনা দিয়ে নচিকেতাকে ভোলাতে চাইলো, নচিকেতা কিন্তু আত্মজ্ঞান লাভের ইচ্ছা ত্যাগ করলো না। অজ্ঞানী লোকেরা পরলোকে বিশ্বাস করে না, সে সম্পর্কে জানতেও চায় না। এই বিশ্বাস -অবিশ্বাসের পিছনে তাদের  কোনো অনুসন্ধান নেই, কেবল অন্ধবিশ্বাস এদেরকে আঁকড়ে ধরে আছে। এরা  বাসনা নিয়ে জন্মায়, বাসনা নিয়ে মরে। কেননা বাসনার তৃপ্তি এদের কখনো হয় না। বাসনা পূরণের জন্য দেহ ধারণ করে, তাই মৃত্যুর ফাঁদ এরা  এড়াতে  পারে না। এরা  মনে করে, মৃত্যু মানে শেষ, ধংশ। মৃত্যু চরম অবলুপ্তি নয়, শরীরের পরিবর্তন মাত্র। এই জগৎ একটা মৃত্যুপুরী।  এখানে কেন আমরা এসেছি, আমরা জানি না। মৃত্যুর পরে আমরা কোথায় যাবো তা  আমরা জানি না। কিন্তু এটা জানার অধিকার আমাদের সবার আছে। যদি তুমি বলতে পারো, জন্মের আগে তুমি কোথায় ছিলে, আর জন্মের পরে তুমি কোথায় যাবে, তবে তুমি সার্থক, তোমার জীবন সার্থক। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, হে অর্জুন, তুমি আমি বহুবার জন্ম গ্রহণ করেছি, আমি তা জানি তুমি সেটা জান  না।

আমাদের এই জড় দেহ যেমন প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে, আমাদের চিন্তার ধারাও প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা আমাদের কল্পনার সাহায্যে একটা চিন্তা দেহ ধারণ করতে পারি।  স্বপ্নের মধ্যে এই চিন্তাদেহে আমরা বিচরণ করে থাকি। এই চিন্তাদেহ আমাদের মতো কথা বলে। এই চিন্তদেহও পরিবর্তনশীল। আমরা যেমন স্থুল দেহের পরিবর্তন  রোধ করতে পারিনা। শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক, যুবক থেকে প্রৌঢ়, প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ বৃদ্ধ থেকে সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করি ।ঠিক তেমনি আমরা আমাদের চিন্তা দেহের পরিবর্তন রোধ করতে পারি না।  মৃত্যুর পরে আমরা যে  সুক্ষ দেহ ধারণ করি , এটি কিন্তু নতুন দেহ নয়। আমরা স্থুল দেহে থাকালীন এই দেহেরও পালন পোষণ করেছি। সুস্বাস্থের জন্য আমরা যেমন খাদ্য, পানীয় গ্রহণ করি, শরীর চর্চ্চা করি। তেমনি আমাদের এই মানসিক দেহের্  সু-গঠনের জন্য বা উন্নত করবার জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করা অবশ্যিক। অর্থাৎ  আমাদের চিন্তা, আমাদের বুদ্ধি, এই সূক্ষ্ম দেহেই সংস্কার আকারে সূক্ষ্ম রূপে সঞ্চিত থাকে। স্থূল দেহের মৃত্যুর পরে  এই মানস  লোকে মানসদেহে আমরা আত্মজ্যোতিখন্ড সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে থাকি। কিন্তু এই সময়ে আমাদের যেহেতু স্থুল দেহ বলে কিছু থাকে না, আমাদের দৈহিক কর্ম বলে কিছু থাকে না। আর তাই যে জাগতিক জ্ঞান আমরা স্থূল দেহে থাকা কালীন  সংগ্রহ করেছিলাম, তা আর কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু যদি কেউ পরাবিদ্যা বা আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকে তবে এখানে সেটা কাজে লাগে। এইখানেই সাধারণ মানুষ আর সন্যাসীর মধ্যে পার্থক্য। অর্থাৎ অজ্ঞানী  ও জ্ঞানীর মধ্যে পার্থক্য। এই মানস লোকেও এই পৃথিবীর মতোই অনুরূপ একজগৎ আছে। তাই মৃত্যুর পরে প্রথমে আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু দৈহিক কর্ম না থাকায় নিজেকে অসহায় লাগে। এইখানে জ্ঞানী ও অজ্ঞানীর পার্থক্য। তো আমার মিত্র যে প্রশ্ন  করছিলো, ওসব না জানলে, বা না মানলে কি হয় ? তার জবাব এখানেই নিহিত আছে।

 কিন্তু এই চিন্তা-দেহের পরেও আছে একটা শাশ্বত সত্য আছে । যাক বলে চেতন সত্ত্বা।  এটি জীবাত্মা বা  সূক্ষ্ম শরীর থেকে ভিন্ন। এর সন্ধান অতি দুঃসাধ্য।  তাই যমরাজ  বলছেন, মানুষের এই অন্তর্নিহিত এই সত্ত্বা সম্পর্কে বা চেতন সত্ত্বা সম্পর্কে অতি অল্পলোক সচেতন। আবার যারা সচেতন তার মধ্যে গুটিকয় মানুষ মাত্র একে  জানতে পারে। এই উপল্বদ্ধির জন্য, শিষ্যকে যেমন উপযুক্ত হতে হবে,  তেমনি উপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন।
এই শাশ্বত আত্মা সম্পর্কে বক্তৃতা করা সহজ। কিন্তু উপলব্ধি করা সহজ নয়। বই পড়ে, বা আমাদের এই কথা শুনে আত্মউপলব্ধি সম্ভব নয়। বই পড়ে, জাগতিক জ্ঞান হতে পারে। আত্মজ্ঞান প্রাণে প্রাণে উপলব্ধি করতে হয়। আর সেই উপলব্ধি দীর্ঘ দিনের আকুলতা ব্যাকুলতা , ধ্যান ধারণা, সমাধি ইত্যাদির একটা ধারাবাহিক অভ্যাস থেকে হতে পারে।
আর এই আত্মতত্ত্ব জানলে, আমাদের মৃত্যুভয় থেকে চির মুক্তি পেতে পারি। তখন আর নিজেকে দেহ-মন-ইন্দ্রিয় বলে মনে হয় না। তখন এই জড়-নিয়ম থেকে নিজেকে মুক্ত ও স্বতন্ত্র অনুভব করতে পারা যায় । আর এই অনুভব আমাদের দিব্যগুরু দিতে পারেন। তার শিক্ষা, তার সাহায্য ব্যতীত ভ্রান্তপথে ভ্রমন অসম্ভব নয়।
আমাকে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেছেন, এই গুরু কোথায় পাবো ? তাদেরকে বলি, গুরু খুঁজতে যাবেন  না। গুরু আপনাকে খুঁজে নেবেন। তারা তাদের দিব্যদৃষ্টিতে আপনাকে দেখছেন, আপনার উপযুক্ত হবার অপেক্ষায় আছেন। একটা জিনিস জানবেন, সবাই তার জ্ঞান-সম্পত্তি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীর কাছে রেখে যেতে চান। এর জন্য তারা উপযুক্ত শিষ্যের খোঁজে আছেন।
যোগীবর বরোদাচরণ মজুমদার-এর বাড়িতে গুরুদেব  চলে এসেছিলেন । সেই  সত্যদ্রষ্টা বরদাচরণ যিনি  নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত করেছিলেন।  শোনা যায়,  আচার্য্য শঙ্করকে দীক্ষা দেবার জন্য,মহর্ষি পতঞ্জলি গোবিন্দপাদ নাম নিয়ে নর্মদার তীরে অপেক্ষায় ছিলেন। মহাত্মা বাবাজি শ্যামাচরণ লাহিড়িকে দীক্ষা দেবার জন্য, পাহাড়ের গুহায় শ' শ' বছর  অপেক্ষায় ছিলেন। এমনি অনেক উদাহরণ আছে।  এবং এরা সবাই সদ্গুরু। যারা সত্যি সত্যি পথ যেখানে পারেন। তো আপনার জন্যও গুরুদেব অপেক্ষায় আছেন।  সময় হলে ঠিক তিনি এগিয়ে আসবেন। আপনার কাজ ব্যাকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করা, আর অন্তরের নির্দেশে কাজ করে যাওয়া।

আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা, আমরা আগেও শুনেছি, ভবিষ্যতেও শুনতে থাকবো।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি  ওম।

আত্মার খোঁজে  (৩)

আত্মা সম্পর্কে খোঁজ-খবর করছেন অনেকে। কিন্তু সেই সম্পর্কে যিনি শিক্ষা দিতে পারেন, সেই মানুষ কিন্তু বিরলতম। আমাদের মতো সাধারণ সাধক  যারা মনেপ্রাণে পবিত্রতা লাভ করতে পারেনি তাদের পক্ষে এই সব তত্ত্বকথার উপলব্ধি শুধু দুরূহ নয় অসম্ভব। আর একটা কথা হচ্ছে আত্মাকে জানতে গেলে আমাদের একটা ক্রমবিকাশের পথ ধরে এগুতে হয়। বহু গুহ্য সাধনার দ্বারা, এক এক করে স্তর উন্মোচিত হয়।  প্রাথমিক স্তরগুলোর উপলব্ধি যাদের হয় নি, অর্থাৎ আমাদের দেহ বা দেহের স্তরগুলো  সম্পর্কে যিনি সচেতন নন,  তার পক্ষে আত্মার উপলব্ধি অসম্ভব। যারা বক্তৃতা শুনতে চান শুনুন, কিন্তু এই বক্তৃতা শুনে আপনি আত্মাকে জেনে যাবেন, এটা একদমই সম্ভব নয়। তাদের কাছে এগুলো শোনা মানে সময় নষ্ট। আর এগুলো শুধু শোনা কথাই হয়ে থাকবে।  বহু জন্মের সাধনার ফলে, এই জ্ঞান পাওয়া সম্ভব হয় । তবে যদি ধৈর্য্য ধরে এই কথাগুলো শোনেন, তবে আপনার মধ্যে একটা স্পৃহা জগতে পারে এবং একটা প্রাথমিক পথের সন্ধান পেতে পারেন।  তার বেশি কিছু নয়। তাই যারা মনে প্রাণে এখনো পবিত্র হতে পারেন নি, তারা আগে সেই চেষ্টা করুন, তবেই আমাদের এই কথার অর্থ অনুভব করতে পারবেন।শুধু গ্রন্থ পাঠে, বা কারুর কাছে শুনে যে জ্ঞান লাভ হয় তা দিয়ে ব্রহ্মতত্ত্ব বা আত্মা সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি হওয়া একদমই সম্ভব নয়। এজন্য আমরা আগেই বলেছি, যথার্থ গুরুই আপনাকে এই উপলব্ধি করাতে পারেন ,  গুরুই পারেন  আপনার দিব্য চক্ষু খুলে দিতে । আমরা মহাভারতে দেখেছি, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আগে দিব্য  চক্ষু দান করেছেন, তার পরে ভগবানের স্বরূপ দেখিয়েছেন বা উপলব্ধি করিয়েছেন । শুধু তাই নয়, অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের  কাছে যখন এই সব কথা ব্যক্ত করবার জন্য শূদ্র সঞ্জয়কে দায়িত্ত্ব দিলেন, তখন তাকে ব্যাসদেব দিব্যচক্ষু দান করেছিলেন। আমরা ওই অন্ধ যুধিষ্ঠিরের মতো জ্ঞান-অন্ধ। আমাদের যতক্ষন জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত না হবে, ততক্ষন আমরা কিছুই অনুভব করতে পারবো না। সঞ্জয় কথার মানে হচ্ছে সংযমী। তো যিনি সংযমী তারই জ্ঞান চক্ষু উন্মিলিত হতে পারে। তো আমাদের সংযমী হতে হবে। দিব্যজ্ঞান লাভের জন্য আমাদের অন্তঃকরণ উন্মুক্ত করতে হবে। আপনি আগে যা সব খেছেন, তাতে আপনার পেট ভরে  আছে। শুধু ভরে আছে না বদ  হজম হবার সম্ভাবনাই  বেশি। তাই নিজের অন্তঃকরণকে উন্মুক্ত করুন। যা কিছু তথাকথিত জ্ঞান আপনি সঞ্চয় করছিলেন, সেগুলো খানিক্ষণের জন্য হলেও সরিয়ে রাখুন।
 নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন।  আপনি কোথায় জন্মেছেন, বা কি হয়েছেন,সেটা বড়কথা নয়। আপনি কি হতে চান সেটা বড়ো  কথা।

এবার আসল কথায় আসি, যা অবিনাশী তাই আত্মা, এটি সুক্ষ থেকে সুক্ষতর। এটা এতটাই সূক্ষ্ম যে আমরা কল্পনাও করতে পারি না। শুধু সূক্ষ্ম তাই নয়, এটি বেশ কিছু আবরনে  ঢাকা। এইখানে একটা কথা, আত্মাকে তাহলে কি, আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা যায় ? বা আত্মাকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে কে ? দেখুন আত্মা আচ্ছাদিত নয়। আমরা আমাদের চোখের সামনে আচ্ছাদন দিয়ে রেখেছি। আমরা ভাবি সূর্যকে মেঘ ঢেকে রেখেছে। আসলে আমাদের চোখগুলো মেঘে ঢাকা। তাই আমরা সূর্যকে দেখতে পাই না। বিশাল সূর্য্য, তাকে ঢেকে রাখে কার সাধ্য ? আমাদের চোখে অজ্ঞানের রঙ্গিন চশমা।  তাই আমরা যা কিছু দেখি সবেতেই আমার চশমার কাঁচের রঙ দেখতে পাই। সত্য সত্যতেই অবস্থান করে। মানুষ যখন  ঈশ্বর-ভাবনায় ব্যাকুল হয় তখন তাকে বিষয়-ভাবনা আকর্ষণ করতে পারে না। এইজন্য বিষয়-বাসনার পূর্তি বা শেষ হওয়া দরকার। তবেই আপনার মুমুক্ষত্ত্ব জাগার সম্ভাবনা। নতুবা গাছেরও খাবো, আবার তলারও খাবো এটা সম্ভব নয়। আপনি সংসারে আছেন কি পাহাড়ে আছেন, আপনি মন্দিরে আছেন কি মসজিদে আছেন সেটা বড়  কথা নয়, বড় কথা আপনার চেতন কেন্দ্রে কি উদ্ভাসিত হচ্ছে। আপনার মন কোথায় আছে ? বাহ্যিক ধর্মাচরণ এমনকি সৎকাজ, দান - ধ্যান যাই করুন না কেন, তা আপনাকে আত্মউপলব্ধি এনে দিতে পারবে না।

তাই যমরাজ বলছেন, হে নচিকেতা ইন্দ্রিয়নুভূতির বহির্ভূত এই পরম সত্ত্বা আমাদের চেতনসত্ত্বার মধ্যে লুক্কায়িত। অর্থাৎ আমাদের আত্মার বা জীবাত্মার মধ্যেই লুকোনো আছে। আমাদের অন্তরের গুহায় এর অবস্থান।  চির পুরাতন এই সত্ত্বা, সৃষ্টির পূর্বেও ছিল এখনো আছে আবার প্রলয়ের পরেও থাকবে। আর একে জানতে গেলে তোমাকে যোগ অভ্যাস করতে হবে। মনন. নিদিধ্যসন অভ্যাস ক'রে আপনাকে  নির্বিকল্প সমাধিতে পৌঁছতে হবে। তবেই তার সামনে পৌঁছতে পারবেন  আর তাকে উপলব্ধি করতে পারবেন ।
এই প্রসঙ্গে কঠোপনিষদের দুটো শ্লোক খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন।  প্রথমটি হচ্ছে : ১/২/১২ নং শ্লোক।  সেখানে যমরাজ বলছেন :
তং দূর-দর্শং - সহজে দেখা যায় না তাকে ।
গূঢ়ম্ অনুপ্রবিষ্ট্ং - অতি সূক্ষ্ম ভাবে অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন ।
গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম  - গুহার ভিতরে  নিহিত অর্থাৎ আমাদের বুদ্ধিরূপ গুহাতে নিহিত সেই কালাতীত আত্মা, পুরাণম   ।
অধ্যাত্ম যোগাদি গমেন - অধ্যাত্ম যোগের অনুশীলন দ্বারা।
দেবং মত্বা ধীরো হর্ষ শোকৌ জহাতি - সেই স্ব-আত্মাকে মনন করে, ধীর ব্যক্তি অর্থাৎ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সুখ দুঃখের অতীতে চলে যান।

অর্থাৎ যমরাজ বলছেন, আমাদের সবার অন্তরে, বুদ্ধিরূপ গুহায় প্রবিষ্ট অতিশয় দুর্বিজ্ঞেয় স্ব-প্রকাশ পরমাত্মাকে যোগ সমাধি দ্বারা অবগত হতে পারেন, এবং এর ফলে সেই ধীর জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ-দুঃখের এই জগৎ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেন।

এতো গেলো আত্মা কোথায় থাকেন, আত্মাকে জানলে কি হয় ? কিন্তু আত্মা কি বা কে ?
শ্লোক নং ২/৩/১৭ তে যমরাজ  বলছেন : 

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষ-অন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। 
তং স্বাৎ-শরীরাৎ প্রবৃহেৎ মুঞ্জাৎ ইব ইষীকাম  ধৈর্যেণ। 
তং-বিদ্যাৎ-শুক্ৰম-অমৃতম তং   বিদ্যাৎ-শুক্ৰম-অমৃতম  ইতি।  (২/৩/১৭)

যমরাজ বলছেন, অঙ্গুষ্ঠ পরিমান পুরুষরূপী অন্তর-আত্মা আমাদের সবার হৃদয়ে সদা বিরাজমান। মুঞ্জা ঘাসের কোমল শীষকে যেমন অতি যত্ন সহকারে কোষমুক্ত করতে হয়, সেই ভাবে মুমুক্ষ ব্যক্তিকে, আত্মাকে বিবেক জ্ঞানের সাহায্যে দেহ-মনের থেকে আলাদা করতে হয়। সেই আত্মাকে শুদ্ধ, অমৃতস্বরূপ পরমাত্মার সাথে অভিন্ন বলে জানা যায়।

অঙ্গুষ্ঠ পরিমান, অঙ্গুষ্ঠ মানে বুড়ো আঙুলের কর। অর্থাৎ বুড়ো  আঙুলের করের রেখার সম পরিমান জায়গায় এর অবস্থান। এই জায়গাটা কোথায় না হৃদয়ে। বাস্তবিক এই জায়গাটার আর একটা নাম হচ্ছে অনাহত চক্র। এইখানেই প্রথম আমাদের আত্মানুভূতি হয়। পরবর্তী কালে অনাহত, বিশুদ্ধি, আজ্ঞা, সহস্রার, এবং একদম শেষ পর্যায়ে বিন্দুতে এই চমক ও ধ্বনি মানুষকে আনন্দ অনুভূতির এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।   আর এটা কেমন দেখা যায় ? আমাদের আঙুলের করের  রেখার মতো। অর্থাৎ  বিদ্যুতের রেখার মতো, একটি উজ্জ্বল আলো। বিদ্যুতের রেখা যেমন  ক্ষনিকের জন্য দেখা দিয়ে মিলিয়ে যায়।এটিও ঠিক তেমনি।  কিন্তু একটা ধ্বনি চারিদিকে ছাড়িয়ে পড়ে । আর আমাদের শরীর  চমকে চমকে ওঠে।  আর সেই ধ্বনিটি হচ্ছে ওম। প্রথমদিকে এটি দেখা দিয়ে হারিয়ে যায়, নিরন্তর অভ্যাসে এটির স্থিতিকাল বাড়ে। কিন্তু স্থুল শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে যায়। ঠাকুর  রামকৃষ্ণদেব  বলছেন, এই অবস্থা হলে,  কিছু ব্যতিক্রমি মানুষ বাদে, সবাই একুশ দিনের মধ্যে দেহ ত্যাগ করেন ।

এবার বলছেন, মুঞ্জাঘাসের কোমল শীষকে পেতে গেলে,  যেমন অতি যত্ন সহকারে কোষমুক্ত করতে হয়, সেই ভাবে মুমুক্ষ ব্যক্তিকে  আত্মাকে বিবেক জ্ঞানের সাহায্যে দেহ মনের থেকে আলাদা করতে হয়। মুঞ্জা ঘাস হচ্ছে যা গুচ্ছ আকারে তৈরি হয়। এটি খুব শক্ত।  এই ঘাস পাকিয়ে নৌকোর দড়া বা বলা যেতে পারে খুব শক্ত দড়ি তৈরি করা হয়। এটি কুশ গাছও হতে পারে।  মুঞ্জা ঘাসের মধ্যে কোষবদ্ধ অতি কোমল শীষের সঙ্গে আত্মার তুলনা করা হয়েছে। ঘাস থেকে শীষকে পেতে গেলে যেমন অতি যত্ন সহকারে ঘাস থেকে আলাদা করতে হয়। ঠিক তেমনি আমাদের দেহকোষগুলোকে ধীরে ধীরে আলাদা করে আত্মাকে পাওয়া যায়।

যমরাজ বলছেন, মানুষের দেহ-অভ্যন্তরে, যে অসংখ্য নাড়ী ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে সুষুম্না-নাড়ীই প্রধান। এই নাড়ীর পথ  মেরুমজ্জার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে উর্দ্ধগামী হয়ে রয়েছে। যোগীদের ধারণা অনুসারে এই সুষুম্না নাড়ী অবলম্বন করে মানুষ সর্ব্বোচ্চ লোকে পৌঁছাতে  পারে। এখানেই জীবাত্মার উৎক্রমন  ঘটে।  এটি পরম-আত্মার প্রতিফলিত জ্যোতি মাত্র। এবং এর কোনো পরিমান নেই। যে আঁধারে এটি প্ৰতিফলিত হচ্ছে আমরা সেই আঁধারের আকারকেই আত্মার আকার বলে মনে করতে পারি । অর্থাৎ বিভিন্ন চক্রের যে আকার সেই আকারে বা আয়তনে  আমরা আত্মাকে উপলব্ধি করি। এবং এই অনাহত চক্র থেকে যাত্রা শুরু।  এর পরে, বিশুদ্ধি, আজ্ঞা,সহস্রার  প্রতিটি কেন্দ্রেই এই প্রতিফলন আমরা অনুভব করি। এবং এক এক চক্রে আমাদের অনুভূতিও আলাদা আলাদা হয়। এর কারন হচ্ছে প্রতিটি চক্রের রঙ আলাদা আলাদা।আকার আলাদা। এবার আমরা আলোচনা শুনবো কোষগুলো সম্পর্কে যা আমাদের ছাড়াতে হবে।

আমাদের দেহ আসলে পঞ্চকোষের সমষ্টি।  এগুলো হচ্ছে, অন্নময় , প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময়, এবং আনন্দময়।

অন্নময় কোষ : অন্ন অর্থাৎ খাবার, অন্নময়-কোষ মানে খাবার দিয়ে  তৈরি যে কোষ রয়েছে আমাদের শরীরে।
প্রাণময় কোষ : অর্থাৎ উর্জা শরীর।  এই শরীর বায়ুর শক্তিতে তৈরী।

মনময়  কোষ : অর্থাৎ মানসিক শরীর, মনের চিন্তার জগৎ ।

এই তিন শরীরকে  ভৌতিক শরীর  বলে। অন্নময়  শরীর স্থূল।  প্রাণময় শরীর  সূক্ষ্ম  ও মনময়  শরীর অতি সূক্ষ্ম।  কিন্তু এই তিন শরীর-ই  ভৌতিক। এই তিন শরীরের উপরেই আমাদের কর্মের প্রভাব পড়বে। স্থূল শরীর  অর্থাৎ অন্নময় কোষ দ্বারা গঠিত শরীরের উপরে কর্মের ছাপ পড়বে।  তেমনি প্রাণময় ও মনময় শরীরের উপরেও কর্মের প্রভাব আছে। কর্ম-বন্ধন  এই তিন শরীরকে জুড়ে রেখেছে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, সিমেন্ট বা আঠার মতো কর্ম এই তিন শরীরকে জুড়ে রাখতে সাহায্য করে।  অর্থাৎ আমাদের কামনা বাসনা থেকে উদ্ভুত কর্ম এই শরীরগুলোকে সজীব রেখেছে।

এর পরে আছে :
বিজ্ঞানময় কোষ : এটি ভৌতিক নয় কিন্তু ভৌতিক শরীরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এটি আমাদের শুদ্ধ জ্ঞানের দ্বারা তৈরি।

আনন্দময় কোষ :  পুরোপুরি অভৌতিক। আমাদের মধ্যে যে আনন্দের অনুভূতি হয়, তা এই আনন্দময় কোষের স্পন্দন।

বিজ্ঞানময় শরীর যা আসলে অভৌতিক, এই আনন্দময় শরীরের অর্থাৎ অভৌতিক শরীর ও ভৌতিক শরীরের  সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। তার মানে বিজ্ঞানময় কোষ নিজে অভৌতিক, কিন্তু তিনি ভৌতিক ও অভৌতিক শরীরের মধ্যে সম্পর্ক জুড়ে রাখে। এইজন্য আমাদের স্থুল শরীর ত্যাগের পরেও আমাদের বিজ্ঞানময় শরীর অর্থাৎ আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার পরলোকে আমাদের পথ দেখাতে পারে।

ভৌতিক শরীরের রূপ বা আকার আছে। অন্নময় শরীর অতি স্থূল, তাই আমরা দেখতে পাই। প্রাণময় ও মনময় সূক্ষ্ম কিন্তু আমাদের অনুভূতির বাইরে নয়। এদুটো আসলে আউড়া বা জ্যোতি। দেখতে না পেলেও আমরা এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি।

যদি ভৌতিক শরীর নষ্ট হয়ে যায়, তবে এই বিজ্ঞানময় শরীর আনন্দময় শরীরের সঙ্গে মিশে যায় ,এবং তৎপর  আনন্দময় শরীর বিশ্বব্রমান্ডের সাথে বিলীন হয়ে যায় বা একাত্বিভূত হয়ে যায়।

ভৌতিক শরীর পঞ্চভূতের মিশ্রণ।  মৃত্যুর পরে, আমাদের ভৌতিক শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের কর্মবন্ধন, আমাদের আবার দেহধারণের জন্য উদগ্রীব হয়। ও আমরা আবার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করি। যখন আমরা কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি তখন আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে এক হয়ে যাই।  জন্মমৃত্যুর চক্রের থেকে মুক্ত হয়ে যাই। একে বলে, মুক্তি।  কেউ বলে সমাধি।

এই পঞ্চকোষের পারে বসে আছেন শুদ্ধ আত্মা। পঞ্চকোষের আভরণ উন্মুক্ত হলে আমরা আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারি। যিনি এই পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনি নিজেকে পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন মনে করেন। তিনি চাওয়া-পাওয়ার উর্দ্ধে উঠে যান। তিনি তখন নিত্য-সুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত-আত্মা। আমাদের গল্পের নচিকেতা এইভাবে মৃত্যুকে অতিক্রম করে অমৃতত্ব লাভ করেছিলেন।আপনি আমি সবাই এই নচিকেতার পথ অনুসরণ করে অমৃতত্ব লাভ করতে পারি।

ওম সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্যং করবাবহৈ। 
তেজস্বি নাবধিতম অস্তূ মা বিদ্বিষাবহৈ।। 
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ  হরি  ওম।

অনন্ত যাত্রা : স্থুল দেহ নাশের পরে আমাদের কি গতি হয় ?  

বিবেকানন্দ বলছেন, "সত্য তাদের কাছেই প্রকাশিত হয়, যারা শুধু সত্যের জন্য ভয় ত্যাগ করে, লাভালাভের চিন্তা ত্যাগ করে, সত্যের মন্দিরে উপাসনা করেন। মানুষের বুদ্ধির সচেতন প্রচেষ্টার দ্বারাই এই ব্যাপারে আলোকপ্রাপ্ত হওয়া যায়।"

আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রীর হেফাজতে একটা কৌটার মধ্যে কতকগুলো দানা  আছে।  তো আমি একদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কি ? তো আমার স্ত্রী বললেন এগুলো ফুলের বীজ।  তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা কিসের বীজ  তুমি চেনো কি করে ? আর এগুলো লাগিয়ে দিচ্ছো না কেন ? তো তিনি বললেন, প্রত্যেকটি বীজ লাগাবার একটা সময় আছে।  সময়মতো না লাগালে এর থেকে গাছ হবে না। আর তা ছাড়া, এর মধ্যে কোনো কোনো বীজ অপুষ্ট যা থেকে কোনো গাছ হবে না। সেগুলো আমাকে বেছে বার করতে হবে। আর আমি এগুলো চিনি কি করে ? এটা আমার অভিজ্ঞতার ফল। যখন এগুলো সংগ্রহ করেছি, তখন এগুলো আমি ভালো করে দেখে রেখেছি, কোন গাছে  কেমন বীজ হয়। তাই কোন বীজে কি ফুল বা ফল হবে তা আমি বুঝতে পারি।  আর কবে হবে তাও আমি জানি।

আমাদের চিন্তা হচ্ছে কর্মের বীজ। আসলে সমস্ত জিনিস আমাদের মনের মধ্যে আছে। অতীতে যা ঘটেছে, এমনকী বর্তমানে যা ঘটছে সবই আমাদের অবচেতন মনে সংস্কার আকারে সঞ্চিত হয়ে  থাকছে। আমরা যদি আমাদের অবচেতন মনের সংস্কারকে ধরতে পারি তবে সব ঘটনার আগাম খবর বলে দেওয়া যায়। আমাদের অবচেতন মনের সংস্কারকে চেতন স্তরে নিয়ে আসতে গেলে একটা কম্পন তুলতে হয়।এই কম্পন হচ্ছে মাধ্যম। চেতন ও অবচেতন মনের সংযোগের মাধ্যম।  এই কম্পনের ফলে  অবচেতন মনের সংস্কার চেতন স্তরে উদ্ভাসিত হয়। তখন আমরা ভূত ভবিষ্যৎ জানতে পারি।  এমনকি আমরা অন্যের অবচেতন মনের সংস্কারকে এই কম্পনের মাধ্যমে আমাদের চেতন স্তরে টেনে আনতে  পারি।  তখন আমরা অন্যের ভূত ভবিষ্যৎও  জানতে পারি। আর এটি তারাই পারেন, যারা মানসিক উচ্চ শক্তি সম্পন্ন, অর্থাৎ মহাত্মারা, যাদের মনের শক্তি বিশেষ ভাবে বিকাশ লাভ করেছে ।

আমরা যখন দেহ ছেড়ে অনন্তের যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি, তখন আমরা মানস দেহে অবস্থান করি। মানস দেহ অর্থাৎ আমাদের চিন্তা-ভাবনার যে মূর্তি তাকে বলে মানস দেহ। আমরা এখন জগতের তৃতীয় স্তরে আছি। অর্থাৎ স্থুল দেহে আছি। স্থুল দেহের বিনাশ হলে আমরা মানস দেহে অবস্থান করি।   অর্থাৎএই মানস দেহ আমাদের চতুর্থ স্তরের বাসিন্দা। আমরা জানি অসংখ বিন্দুর সমষ্টি দিয়ে তৈরি হয় একটা ছবি। এখন এই বিন্দুর-সমষ্টি যখন অসীমে ছাড়িয়ে পড়ে বা  কমতে থাকে তখন ছবি  অস্পষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয় স্তরে আসতে  গেলে আমাদের আবার ঘনীভূত হতে হয়। আমাদের মৃত্যুর পরে আমরা আমাদের স্পন্দন বা কম্পন  নিজের সঙ্গে নিয়ে যাই। আর এই কম্পনের গতি অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট স্তরে প্রবেশ করি। এগুলো স্বয়ংক্রিয়। তাই আমাদের চিন্তা ভাবনা জ্ঞান অনুযায়ী আমাদের মৃত্যু পরবর্তী স্থান নির্দিষ্ট  হয়।  এই সময় প্রথম দিকে  আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকি। যারা পৃথিবীতে থাকাকালীন, উকন্ঠা, না পাবার দুঃখ-যন্ত্রনা নিয়ে ছিলেন, অপূর্ন বাসনা রেখে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের তন্দ্রাঘোর  কাটতেই, চঞ্চলতা অনুভব করেন। পৃথিবীর মায়া-মোহ-আসক্তি তাকে  অস্থির করে তোলে। আর যখন সে দেখে তার কোনো নির্দেশ শরীর, বা অন্য কেউ পালন করছে না তখন  সে অসহায়, অস্থির  ও শোকাচ্ছন্ন হয়ে যায় । আর যারা জ্ঞানত দেহ ত্যাগ করে, তারা মৃত্যুকালীন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কাটিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত থাকে। এই অবস্থাটা আমাদের খানিকটা স্বপ্নের মতো। স্বপ্নে যেমন আমরা একটা জাগতিক পৃথিবীতে ঘুরে  বেড়াই। সুখ-দুঃখ ভোগ করি, এই অবস্থাতেও আমরা একই রকম অনুভব করি। বাসনা যাদের বেশি থাকে তারা ভোগ ভূমিতে নেবে আসে। আত্মীয়স্বজনদের পাশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। আমরা যেমন আমাদের ঘুমের মধ্যে ঘুরে বেড়াই, এরা তখন তাদের আত্মীয়স্বজনদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সাহায্য করতে চায়। তারা তখন বুঝতেই পারে না, যে তারা মারা গেছে। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় তাদের বেশ কিছু সময় কেটে যায়। আর একদল আছেন, যারা মৃত্যুর পরে বুঝতে পারেন। তারা দেহাতীত হয়ে গেছেন। এরা  তখন শান্তিতে নিদ্রা যান। অর্থাৎ সুসুপ্তির স্তরে অবস্থান করেন। এই সময় তাদের কোনো জ্ঞান থাকে না। এমনকি সময়জ্ঞানও থাকে না। এইজন্য বলা হয়ে থাকে মানুষের বাসনা অনুযায়ী, জ্ঞান অনুযায়ী মানুষ মৃত্যুর পরে, স্বর্গ-নরকে অবস্থান করেন, ভালো বা মন্দ থাকেন । এই জন্য বিভিন্ন আত্মার জন্য বিভিন্ন স্তর নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এবং এগুলো সবই আমাদের চিন্তা-ভাবনার ফল। তাই আমাদের চিন্তা -ভাবনা যেমন  সবার আলাদা আলাদা, আমাদের সবার চিন্তা-ভাবনার কম্পনও তেমনি আলাদা আলাদা। আর এই কম্পনের  মাত্রা অনুযায়ী আমাদের বসবাসের স্তর নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এখানে ঈশ্বরেরও কিছু করার নেই। একটা কথা আমাদের বোঝা দরকার যে, আমাদের এই যে মনময় শরীর, এটি সুক্ষ কিন্তু অপার্থিব নয়। স্থূল শরীর  যেমন পার্থিব এই সূক্ষ্ম শরীরও পার্থিব। অর্থাৎ অন্নময়, প্রাণময় শরীর যেমন পার্থিব, মনময় শরীরও পার্থিব। এবং এই মনময় শরীর চিরস্থায়ী নয়।  এটিরও পরিবর্তন আছে, নাশ আছে। অন্ন না পেলে যেমন  অন্নময় শরীরের ধংশ হয়ে যায়,  বায়ু না পেলে যেমন প্রাণময় শরীর নাশ হয়ে যায়, আমাদের কামনা বাসনা সংকল্প শেষ হয়ে গেলে এই মনময় শরীরেরও  নাশ হয়ে যায়। এইজন্য স্বাভাবিক মৃত্যুতে দেখবেন, মানুষ প্রথমে খাওয়া ছেড়ে দেয়।অর্থাৎ খাবার থেকে যে শক্তি সে সংগ্রহ করছিলো, তা বন্ধ হয়ে যায়।  এর পরে হৃদযন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দেয়, অর্থাৎ বায়ু থেকে যে উর্জাশক্তি সে  সংগ্রহ করছিলো, সেটা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মনময় শরীর থেকে যায়। অর্থাৎ কামনা বাসনা আমাদের সহজে ছেড়ে যায় না। এইজন্য, ঋষি-মহাপুরুষরা আমাদের কামনো বাসনা পরিত্যাগ বা নিয়ন্ত্রণ  করতে বলেছেন। অর্থাৎ অন্নময় এবং প্রাণময় শরীর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মে শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মনময়  শরীর, তখনি নাশ হবে, যখন আমরা কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করতে পারবো। আর এই তিনটে শরীর নাশ হয়ে গেলে বিজ্ঞানময় শরীর আনন্দময় শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। এবং আনন্দময় শরীর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়।

মনময় সূক্ষ্ম দেহকে সহজে নাশ করা যায় না। এটি তার কামনা বাসনা পূরণের জন্য আবার দেহ ধারনের জন্য উদগ্রীব হয়। কারন সে জানে দেহ ভিন্ন কামনা বাসনা পূরণের কোনো উপায় নেই।  এই জন্য বলা হয়ে থাকে, মানুষ তার কামনা বাসনা অনুযায়ী দেহ প্রাপ্ত হয়।  এবং এই চক্রের মধ্যেই আমরা অর্থাৎ  বেশির ভাগ প্রাণী ঘুরপাক খাচ্ছি।
মানুষ মৃত্যুর পরে অজ্ঞানের ঘুমে সে আচ্ছন্ন হয়ে পরে, এবং ধীরে ধীরে ঘন্টা চারেকের মধ্যেই  তার আচ্ছন্নতা কেটে যায়। তখন থেকে  বায়বীয় দেহ নিয়ে  সে জীবনের চতুর্থ স্তরে ধাতস্ত হবার চেষ্টা করে।  এই চতুর্থ স্তরের মধ্যেই স্বর্গ-নরক বলতে আমরা যা বুঝি, তা এইখানেই।  এই চতুর্থ জগতের সঙ্গে আমাদের বুঝবার জন্য আমাদের স্বপ্নাবস্থার সাথে তুলনা করতে পারি। আমাদের স্বপ্নের জগতে যেমন এই পৃথিবীর জগতের মতো একটা জগৎ উপলব্ধি করি, এখানেও  আমাদের দৃশ্যমান জগতের অনুরূপ একটা জগৎ বিদ্যমান। পার্থক্য হচ্ছে আমাদের স্বপ্ন ৬ বা ৮ ঘন্টার পরে ভেঙে যায়। আমরা বুঝতে পারি যে আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম।  আর এই জগতের স্থিতিকাল দীর্ঘ। এবং এক একজনের ক্ষেত্রে এক এক রকম। তবে অনন্তকাল নয়। এখানেও আমরা ইহজগতে থাকা কালীন যেমন কাজ কর্ম করতাম।  এখানেও সেইরূপই করে থাকি। কেউ যদি ইহজগতে পুজো-অর্চনা করতে ভালো বাসতেন, তবে এখানেও তিনি সেটাই করেন। এখানে চিন্তামাত্র তার কাছে সবকিছু উপস্থিত হয়ে যায়। এমনকি তারা ইহজগতের সবাইকে যাদের তিনি স্মরণ করেন, তাদেরই সাথে মিলিত হতে পারেন। এগুলো তাদের কল্পনা প্রসূত। এমনকি এখানে তারা আহার-পানীয় গ্রহণ করেন। অর্থাৎ এটাকে বলা যেতে পারে চিন্তা বা কল্পনার রাজ্য। আসলে আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, সেই মূহুর্তের জন্য স্বপ্নকে আমাদের সত্য বলে মনে হয়। আমরা জানি স্বপ্ন আমাদের চিন্তার আকার বা পরিণতি বিশেষ। স্বপ্নে আমরা যেমন স্পর্শসুখ পাই,  শ্রবণসুখ এবং দৃশ্যসুখ পাই বা বিপরীত ভাবে বলা যেতে পারে, স্বপ্নে আমরা যেমন দুঃখ বা  ভয় পাই,  আতঙ্কগ্রস্থ হই, তেমনি  এখানেও  আমরা মানসিক  দেহ নিয়ে আমরা সমস্ত সুখ-দুঃখ ভোগ করি। এই ভোগেচ্ছা একটা সময় সমাপ্ত হয়। তখন আবার আমরা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।    
এই অবস্থায় এক একজনের ক্ষেত্রে এক একরকম সময়-কাল ধরে চলে। কেউ কেউ বলেন, ২৫/৩০ বছর থাকার পরে, তার আবার ধরণীতে দেহ ধারণের ইচ্ছা প্রবল হয়। কেউ বলেন, হাজার বছর। আসলে বাসনার প্রবলতা অনুসারে এই স্তরে স্থায়ীকাল নির্দিষ্ট হয়।  এই সময় আবার সে অজ্ঞান-আচ্ছন্ন হয়ে পরে। এবং এই অবস্থাতেই সে তার ইচ্ছে পূরণের জন্য বা বাসনা পূরণের জন্য উপযুক্ত শরীরের  ভ্রূণের  মধ্যে প্রবেশ করে। এটাকেই বলি আমরা গর্ভধারণ। পার্থিব শরীর  ভিন্ন আমাদের আমাদের ইচ্ছে পূরণের কোনো সুযোগ নেই।  তা সে ভালো ইচ্ছেই বলুন আর ভোগের ইচ্ছেই বলুন। শরীর যন্ত্র ছাড়া আমাদের কোনো আদর্শ বা লক্ষ্য পূরণের কোনো উপায় নেই। তাই অনন্ত কাল কেউ স্বর্গে অর্থাৎ আনন্দে থাকে না বা অনন্ত কাল কেউ নরকে বা নিরানন্দে  থাকে না। এখানেই ফিরে ফিরে আসে। ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর  বড় ছিল, ভীষ্ম কথাটা এসেছে ভ্রম থেকে, এই ভ্রম মানুষের সহজে যায় না।ভীষ্মেরও সহজে মৃত্যু ঘটে না। তীরের ঊপরে বিদ্ধ হয়ে, শ্বর-শয্যায়  তাকে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদের ভোগেই সুখ, এই ভ্রম যতদিন না যাবে ততদিন আমাদের বার বার ফিরে আসতে  হবে।

এখান থেকে আদর্শবান পুরুষ, বা  প্রাজ্ঞপুরুষ যাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলে থাকি, তারা আর এই জগতে সাধারণত ফিরে আসেন না। তারা আরো উর্দ্ধে অর্থাৎ পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম  অর্থাৎ মহঃ, জনঃ তপঃ এবং সব শেষে সত্যম বা ব্রহ্মলোকে  যাত্রা করেন।  

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম।                      



























Wednesday, 31 July 2019

মনের গভীরে

মনের গভীরে  


 আমরা অনেকেই জানি মন ত্রিস্তরীয় : চেতন - অবচেতন - অতিচেতন। হঠযোগীরা বলেন : দেহ শুদ্ধ হলেই মন শুদ্ধ হবে। এবং একমাত্র শুদ্ধ মনই আত্মউপলব্ধি করতে পারে। তো যার দ্বারা আত্মউপলব্ধি হবে তাকে একটু বুঝে নেই।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি : ছেলে বলছে আমি কাঁঠাল খাবো। বাবা বাজার থেকে কাঁঠাল কিনে এনেছে। বাবা ছেলেকে কাঁঠালের পরিচয় দিচ্ছে। এই যে উপরের কাঁটা কাঁটা আস্তরণ দেখছিস  এঁকে বলে ছোবড়া। আস্তরণ ছাড়ালে কোয়া, কোয়ার ভিতরে আঁটি, আর এইযে কোয়ার বাইরে যে দেখছিস এটাকে বলা হয় ভুচরো।  আর ভেতরে মুগুরের মতো দেখছিস এটাকে বলে মোথা। ছেলে বলছে তো বাবা কাঁঠাল কোথা ?

তো মনকে খুঁজলে, দেহের মধ্যে কোথাও পাওয়া যাবে না। তবু আমাদের মনকে জানতে হবে।

যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা জানে -  মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কাজ কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। একটা হচ্ছে সুষুম্না কান্ডীয় (Spinal Cord  Level ) , দ্বিতীয়টা হচ্ছে নিম্নতর মস্তিস্ক স্তর (Lower Brain Level) উচ্চতর মস্তিস্ক স্তর  (Upper Brain Level )

এই উচ্চতর মস্তিস্ক আমাদের মাথার সবচেয়ে বা আমাদের দেহের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ন অংশ। আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার সংগ্রহশালা হিসাবে কাজ করে। অতীতের অভিজ্ঞতার অধিকাংশ স্মৃতিই এখানে সঞ্চিত থাকে। এছাড়া আমাদের শরীরের যে প্রতিক্রিয়া হয় অর্থাৎ যাকে  আমরা চেতন মনের কাজ বলি, তার খবর এখানে সঞ্চিত থাকে। এবং নিজের ইচ্ছায় সে খাবরাখবরকে কাজে লাগিয়ে দেহের চেষ্টীয় প্রতিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

নিম্নতর মস্তিস্ক দ্বারা দেহের অধিকাংশ অবচেতন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রক্তচাপ,শ্বাসক্রিয়া, ক্রোধ, উত্তেজনা, যৌনক্রিয়াকলাপ, যন্ত্রনা, আত্মতুষ্টি, এগুলো সবই নিম্নতর মস্তিষ্কের কাজ।  অতএব আমরা যাক অবচেতন মনের কাজ বলি তা এই নিম্নতর মস্তিস্ক করে থাকে।

দেহের ইন্দ্রিয়সকল দ্বারা গৃহীত সমস্ত সংবাদ বা উদ্দীপনা সুষুম্নাকাণ্ডে প্রেরণ করা হয়।  এবং সুষুম্নাকাণ্ড এই সংবাদের ভিত্তিতে সুষুম্না কাণ্ডের উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হয়। এটা স্বয়ংক্রিয় এবং সংজ্ঞাবহ সংকেত সুষুম্নাকাণ্ডে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায়। এটাই অতিচেতন মনের কাজ বলতে আমরা যা বুঝি তাই।

মন কোনো আলাদা বস্তূ  বা স্নায়ু নয়। বিভিন্ন স্নায়ুর ক্রিয়াকে আমরা মনের ক্রিয়া বলি। মন বলে কিছু নেই সবই স্নায়ুর খেলা।  আমাদের এই স্নায়ুর কেন্দ্রে যেতে হবে।  স্নায়ু যেখান থেকে  শুরু হয়েছে সেটা মস্তিস্ক। আর স্নায়ুর অবতরণ ক্ষেত্রে হচ্ছে সুষুম্না কাণ্ড। তাই সুষুম্না নাড়িকেই আমাদের আশ্রয় করতে হবে যদি আমরা আত্মউপলব্দ্ধি করতে চাই। এই স্নায়ুকেন্দ্রে প্রতিফলিত হবে আমাদের অধরা ঈশ্বর।আমাদের চেতন স্বরূপ।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ             

আধ্যাত্মিক জগতের প্রবেশদ্বার হচ্ছে "মন" .মনকে না জানলে সাধন জগতের কিছুই জানা যায় না।তাই সাধনা করতে চাইলে মনকে বুঝতে হবে, ধরতে হবে। শুধু সাধন জগতে নয়, আমাদের এই পার্থিব জীবনে অর্থাৎ  ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে সবশেষে বিশ্বস্তরীয় জীবনে মনের গুরুত্ত্ব অপরিসীম। যে মনকে জেনেছে, তার জীবনে সুখ এসেছে, আর যে জীবনে কখনো মনকে বুঝতে পারেনি, তার জীবনে দুঃখই দুঃখ। মনিষীরা বলছেন, মানুষের জীবনে বন্ধনের কারণও এই মন। যে মনকে জেনেছে, সে স্বাধীন, সুখী। আর যে মনকে জানতে পারেনি, সে বন্ধনে আবদ্ধ, পরাধীন।

এখন মন কথাটার অভিধানগত অর্থ  কি ? মন বলতে আমরা কি বুঝি ?  যার সাহায্যে মানুষ মনন করে, তাকেই বলে মন। এই মনকে আবার কেউ কেউ বলেন চিত্ত। চৈতন্য যেখানে প্রতিফলিত হয় সেটাই চিত্ত। মনকে আবার কেউ বলেন, অন্তঃকরণ। অর্থাৎ ভিতরে বা  অন্তরে যিনি কাজ করেন, তাকে বলে অন্তঃকরণ। এই মনের সাহায্যে আমরা জ্ঞান, বুদ্ধি আহরণ করি, তাই একে কেউ কেউ পেলেন প্রজ্ঞা। সমস্ত ইন্দ্রিয়ের ইনিই প্রবর্তক, তাই কেউ কেউ এঁকে  বলেন, প্রবৃত্তি। আবার বলা যায়, আমাদের ইচ্ছাশক্তির প্রবর্তক ইনি তাই এঁকে প্রবৃত্তি বলা যায়। আবার কেউ এঁকে হৃদয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ আমাদের দয়ার ভাব উদয় হয় এখানে তাই হৃদয়। তা আপনি মনকে  যে নামেই ডাকুন না কেন, মন মনেই থাকবে। আসলে মনের বিভিন্ন ক্রিয়ার জন্য বা তার বিভিন্ন রকমের স্বভাবের জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন নাম ডাকি। মন আমাদের অধরা। মন কোথায় থাকে আমরা জানি না। কেবল তার উপস্থিতি টের পাই, বা অনুমান করি মাত্র।

আমরা জানি, আমাদের পঞ্চভূতের শরীরের কোথাও মনকে খুঁজলে পাওয়া যাবে না।  আসলে স্নায়ুর ক্রিয়া। সাধকের ভাষায় চক্রের ক্রিয়া। তাই চক্রগুলো সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে।

আমাদের দর্শন, আমাদের শ্রবণ, ইত্যাদি  আমাদের শরীরের বিভিন্ন চক্রে  আঘাত করে, এবং সেখানে স্পন্দন তোলে, তাকে চঞ্চল করে তোলে, এবং ক্রিয়াশীল করে তোলে। আমাদের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বা গ্রন্থিতে আলোড়ন তোলার  সক্রিয় ভূমিকা নেয়, আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়। । আর ওই গ্রন্থি যখন ক্রিয়াশীল হয়ে যায়, তখনি আজব ব্যাপার সংগঠিত হয়। মানুষ তখন চিন্তাকরতে শুরু করে, ভাবনা করতে শুরু করে। এবং এই স্পন্দনধারায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে  মানুষের চিন্তা ধারার পরিবর্তন হয়। বিচারাধারার পরিবর্তন হয়। কর্মধারার পরিবর্তন হয়। মানুষ পাশবিক প্রবৃত্তি ত্যাগ করে, দেবমানব হয়ে যায়।  মানুষের চক্র সংখ্যা ১১৪।  সমস্ত চক্র (১১৪) ক্রিয়াশীল হতে পারে। ১১৪টি চক্রের মধ্যে ১০৮টি চক্র ক্রিয়াশীল করা যায়। এসব আসলে মহামানবের ব্যাপার। অবতারদের ব্যাপার। এই জন্য জপের মালায় ১০৮টি পুঁথি থাকে। মহামানবের ১০৮টি চক্র ক্রিয়াশীল থাকে।  বাকি ছয়টি ক্রিয়াশীল হয় না। কিন্তু মাত্র ৭টি চক্র বা ১১টি স্পর্শকাতর জায়গায় আমরা যারা সাধারণ মানুষ, একটু চেষ্টা করলেই সেগুলিকে ক্রিয়াশীল করতে পারি। সেজন্য এই জায়গাগুলো সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা থাকা দরকার। প্রথমে এটি কল্পনা করে নিতে হয়। সাধনার সঙ্গে সঙ্গে এই সব জায়গায় মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। তখন এর সঠিক অবস্থান জানা যায়।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ 


আমাদের শরীরে ১১টি স্পর্শকাতর জায়গা আছে, যেগুলো আমাদের মনের ক্রিয়াকে সংগঠিত করে, এই এগারোটি জায়গার  মধ্যে মেরুদণ্ডের  মধ্যে ৬ টি। এবং মস্তিষ্কে ৩ টি। এবং দুটি আছে মুখাবয়বে। এগুলোর ক্রিয়াকে আমরা আমাদের মনের ক্রিয়া বলে থাকি।  
আমাদের মেরুদণ্ডের দুইদিকে দুটো নাড়ী  আছে, তার নাম  ইড়া,  পিঙ্গলা। এই ইড়া ও পিঙ্গলার মাঝে অর্থাৎ ইড়ার ডানদিকে ও পিঙ্গলার বাম  দিকে সুষুম্না নাড়ী অবস্থান করছে। এই সুষুম্নার মধ্যে আছে   বজ্রাখ্যা নাড়ী। আর বজ্রাখ্যা নাড়ীর মধ্যে অবস্থান করছে  চিত্রাণি নাড়ী। এই নাড়ীগুলোর বিভিন্ন স্থানে কিছু সংযোগস্থল আছে, যেখান থেকে উভয়পার্শ্বে বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক স্নায়ু নির্গত হয়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলোকে বলে গ্রন্থিচক্র। স্পাইনাল কর্ড লেভেলে বা মেরুদন্ড সংলগ্ন স্নায়ুর সংযোগস্থল গুলো হচ্ছে :
মূলাধার,(মেরুদণ্ডের শেষে,পায়ুদেশের খানিকটা উপরে, ) 
স্বাধিষ্ঠান, (লিঙ্গমূলে) 
মনিপুর,(নাভির ঠিক পিছনে ) 
অনাহত, (হৃদয়ের পিছনে ) 
বিশুদ্ধি, (কন্ঠার ঠিক পিছনে) 
আজ্ঞা, (মেরুদণ্ডের শুরুতে - এটি ভ্রূযুগলের পিছনে নিম্ন মস্তিষ্কে)

এছাড়া  আছে 
সহস্রার, (মস্তিষ্কের তালুতে) 
বিন্দু, (সহস্রারের ঠিক উপরে )

এর পরেও আমাদের মুখাবয়বে  তিনটি স্পর্শকাতর জায়গা সম্পর্কে আমাদের ধারণা রাখা উচিত।  সেগুলো হল : 
 ভ্রূযুগল মধ্যে, যাকে আমরা ত্রিনয়নের স্থান বলি 
নাসিকাগ্র ; অর্থাৎ নাসিকার অগ্রভাগ 
এবং চিদাকাশ অর্থাৎ চোখ বুজলে যেখানে আমরা অন্ধকার দেখি । :

  এগুলো  ক্রিয়াশীল করলে, এখন থেকে রস নিঃসরণ হয়। আর রসের স্পন্দন আমাদের ভাবনার জগতে আলোড়ন তোলে, আমাদের ক্রিয়াশীল করে তোলে,  বা এগুলোর সাম্যাবস্থা থাকলে আমরা ভালো থাকি, আর এগুলো অস্থির হলে বা চঞ্চল হলে আমাদের মন চঞ্চল হয়।  

 আমরা জানি সমগ্র ব্রহ্মান্ড সাতটি  লোক বা স্তরে  বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে : ভূ-লোক, ভুব-লোক, স্বঃ-লোক, মহঃ-লোক, জনঃ-লোক, তপঃ-লোক, এবং সত্যম বা  সত্য-লোক। আবার আমাদের শরীরের মধ্যেও সপ্ত ধাতু আছে যেমন : শুক্র, শোনিত, মজ্জা, মেদ, মাংস, অস্তি , ত্বক। এই দেহের এক একটা স্থান এক একটা লোকের কর্ম- কেন্দ্র। এই কর্মকেন্দ্রের নামই চক্র বা গ্রন্থিচক্র । এই গ্রন্থিগুলো বা এক একটা গ্রন্থি এক এক তত্ত্বের কর্মকেন্ত্র। তত্ত্ব অর্থাৎ পঞ্চতত্ত্ব - ক্ষিতি, অপ, তেজ. মরুৎ , ব্যোম। দেহের প্রধান প্রধান গ্রন্থি গুলির অন্তর্মুখী রস  নিঃসরণের ক্ষমতা আছে। এই অন্তর্মুখী রসই রক্তের সঙ্গে মিশে দেহের গঠন ও পালনপোষন করে। এবং আমাদের  মানসিক জীবন  বা মন গঠন করে। যার দেহে যে গ্রন্থির আধিপত্য বেশি বা যার দেহে যে গ্রন্থি অধিক ক্রিয়াশীল, তাকে সেই গ্রন্থিপ্রধান মানুষ বলা হয়।
গ্রন্থি বা  চক্র থেকে  নির্গত অন্তর্মুখী রস, রসের স্পন্দন  আমাদের মনের ক্রিয়া সম্পাদন করে। তাই একে আমরা মন  গঠনের কারন বলে থাকি। 

যদিও সমস্ত গ্রন্থিই আলাদা আলাদা ভাবে সারা শরীরে ক্রিয়াশীল। তথাপি এক এক গ্রন্থির এক একটি প্রধান কার্যকেন্দ্র  আছে। এগুলোকে স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী ব্যাখ্যা করেছেন এই ভাবে। :

আজ্ঞাচক্র : কণ্ঠদেশ থেকে ললাটের মধ্যবর্তী অংশ   আকাশ তত্ত্বের কাজ করে। অর্থাৎ ব্যোম গ্রন্থি বলা যেতে পারে। এখানেই  ইন্দ্রগ্রন্থি ( THYROID) উপেন্দ্রগ্রন্থি (Para-Thyroid ), তালুগ্রন্থি (Tonsil ),  লালা গ্রন্থি (Salivary Glands ) ইত্যাদির কর্মক্ষেত্র   । এখান থেকেই যে অন্তর্মুখী রস  নিঃসৃত হয় আমাদেরকে সুস্থ থাকতে  সাহায্য করে।  এই গ্রন্থিগুলি  সুস্থ-সবল থাকলে - আমাদের স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা, উচ্চ চিন্তা বা গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা থাকে। আর গ্রন্থিগুলি  অতি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে আমাদের বিষাদ, উচ্চ চিন্তার ক্ষমতা হ্রাস, হতদ্যম, আলস্য, কর্মবিমুখতা প্রভৃতি দেখা দেয়। ব্যোম তত্ত্বে সত্ত্বগুণের আধিপত্য। 
                                                                                                                                                   অনাহত চক্র : এর পরে আসছে বক্ষ প্রদেশ।  এটি বায়ুতত্বের প্রধান কর্মকেন্দ্র। এখানে দুটো ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, মঙ্গলগ্রন্থি (thymus ) এবং প্রাণকোষ নির্মাণকারী গ্রন্থি এবং অনেকগুলো উপগ্রন্থি এই বায়ু গ্রন্থির অন্তর্গত। বায়ুই দেহের প্রধান রক্ষক ও পরিচালক।
এই বায়ু গ্রন্থি ও তার তার অন্তর্গত গ্রন্থিগুলি সুস্থ-সবল থাকলে একদিকে যেমন দেহ সুস্থ থাকে তেমনি এই গ্রন্থিই মানুষকে ধীর-স্থির, শুদ্ধ-শান্ত, শ্রদ্ধাশীল, ও মহাকর্মী করে । বায়ু ঠিকমতো কাজ না করলে মানুষ অস্থিরমতি, অকৃতজ্ঞ, কৃতঘ্ন হয়।

মনিপুর : এর পরে আসছে মধ্যপ্রদেশ অর্থাৎ পেট। এটি অগ্নিগ্রন্থির  অন্তর্গত। এখানে কি আছে এক বার দেখে নেই। প্লীহা,(Spleen ) যকৃৎ(liver ) অগ্ন্যাশয় (Pancreas ) শুক্রগ্রন্থি (Adrenal Gland )  প্রভৃতি গ্রন্থি অগ্নিগ্রন্থির প্রধান কর্মক্ষেত্র। অগ্নিগ্রন্থিই শরীরে তাপ প্রদান করে। প্রাণকে সঞ্জীবিত রাখে। এই অগ্নিগ্রন্থি থেকে যে রস  নিঃসৃত হয় তা Nitric Acid , Hydrochloric Acid, Sulphuric Acid প্রভৃতি দাহিকাশক্তি সম্পন্ন উপাদানের সমাহার। এই অগ্নিরসই পাচকরস, পিত্তরস, অম্লরস। এই অগ্নিরস অন্নকে দগ্ধ করে, রসরক্তে পরিণত করে। দেহের মাংস মেদ অস্থি প্রভৃতি গঠনে সহায়তা করে।
এই অগ্নিপ্রধান লোকেরাই হয় মহাতেজস্বী, উদ্দমী  ।  নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা থাকে এঁদের। আর এই গ্রন্থি যদি ঠিক ঠিক মতো কাজ না করে তবে তারা হয় কামুক, ঝগড়ুটে, দাম্ভিক, অহংকারী, উগ্র, অস্থির, অসহিষ্ণু।
স্বাধিষ্ঠান চক্র মূলাধার চক্র :এর পরে আসছে নিম্নাঙ্গ। বরুণগ্রন্থি  অর্থাৎ মূত্রগ্রন্থি,(kidney ), প্রজাপতি গ্রন্থি বা পিতৃগ্রন্থি (Testis ) কন্দর্প-গ্রন্থি (Prostate gland ), মদনগ্রন্থি (cowpers Gland ), মাতৃ গ্রন্থি (Ovary ) রতি গ্রন্থি,(Bartholins gland)  মিথুন  গ্রন্থি (Skenes gland ) . এগুলো সবই  বরুন গ্রন্থির অন্তর্গত। এই বরুণগ্রন্থির নিঃসৃত অন্তর্মুখী রসে সন্তান বীজ বা শুক্রকীট উৎপন্ন হয় ও সৃষ্টিধারাকে অব্যাহত রাখে। এই শুক্র হতেই দেহের সমস্ত উপাদান অর্থাৎ স্নায়ু, তন্তু  কোষ, মাংস, মজ্জা, অস্থি সমস্তই গড়ে ওঠে। বরুণগ্রন্থি হতে নিঃসৃত রসকে বলা হয় সোমরস।
ব্রুনগ্রন্থি প্রধান লোকেরা খুব সহৃদয় হয়। এদের মিষ্টি ব্যবহার, মিষ্টি কথা মানুষকে আকর্ষণ করে। এরা বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা পায়। বরুণগ্রন্থি  ঠিক ঠিক মতো কাজ না করলে মানুষ স্বার্থপর, পরশ্রীকাতর, ক্রোধী ও কামুক হয়।
পৃথ্বি গ্রন্থি অস্থি ও মাংস উপাদানের কারন ক্ষেত্র। পৃথ্বি গ্রন্থির শক্তি ও তার প্রকাশ সুপ্ত।
পৃথ্বি গ্রন্থিপ্রধান লোকেরা স্থুলদেহী হয়।  স্বভাব হয় উদার,ও সহিষ্ণু। এরা  সাধারণত ঝামেলা এড়িয়ে চলে। এই গ্রন্থির অসামাঞ্জস্যে মানুষ হয় ভোগী স্বার্থপর।
আধুনিক বিজ্ঞান  বলছে  : স্নায়ুতন্ত্র বা nurvas system আমাদের বাহির জগৎ ও অন্তর্জগতের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে।   এই স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হয় স্নায়ু তন্তু অর্থাৎ সুতো বা fibre-এর   মতো একপ্রকার পদার্থ দিয়ে। তন্তু গুলো বিভিন্ন আকারের হয়। সরু, মাঝারি,পাতলা। কর্ম অনুসারে এরা  তিন ধরনের হয়।  প্রথম গ্রাহক বা receptor, দুই প্রেরক বা বাহক conductor (Neurone ) এবং তিন কারক বা effector . এই তিন রকম কাজের সাহায্যে স্নায়ুতন্ত্র আমাদের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি  অর্থাৎ চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিব্বা, ত্বক, এই  পাঁচটি ইন্দ্রিয় এবং দেহের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত গ্রাহক কোষগুলি বাইরের জগতের উদ্দীপনা বা ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন গ্রহণ করে। এইবার গৃহীত উদ্দীপনা সংবেদ স্নায়ু বা বাহক স্নায়ুর মাধ্যমে স্নায়ুকেন্ত্র অর্থাৎ মস্তিস্ক বা সুষুম্নাকাণ্ডে পাঠিয়ে দেয়।
এইবার মস্তিস্ক বা সুষুম্নাকাণ্ড অর্থাৎ স্নায়ু কেন্দ্র এই উদ্দীপনার বিশ্লেষণ করে এবং ক্রিয়া স্থান বা কারকে অর্থাৎ effective organ- এ বাহকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। 
এইবার স্নায়ু কেন্দ্র থেকে গৃহীত আদেশ অনুসারে ক্রিয়াস্থান বা কারকে কার্য সম্পাদিত হয়।
অতএব আমাদের কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার : মস্তিস্ক হচ্ছে স্নায়ু কেন্দ্র।  এবং এখানেই সুষুম্না অর্থাৎ স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কর্মক্ষেত্র , এবং  এখান থেকেই বাহক তন্তুর সাহায্যে  সমস্ত নির্দেশ পাঠাচ্ছে। এবং সেই মত আমরা কাজ করছি বা আমাদের কার্য সম্পাদিত হচ্ছে।
 অহং গ্রন্থি বা অহং তত্ত্বের স্থান ললাট বা আমাদের কপাল।  এই অহং গ্রন্থি আমাদের সমস্ত গ্রন্থির অর্থাৎ পঞ্চগ্রন্থির (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম)  কর্তৃত্ব করে। আমাদের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, চিন্তাশক্তি, বিচারশক্তি, স্মৃতিশক্তি, সমস্ত কিছুই অর্থাৎ পঞ্চইন্দ্রিয়শক্তির  (চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিব্বা, ত্বক) কর্ম পরিচালনা হয় এই অহং গ্রন্থি থেকে। এদের দোষ, ত্রূটি, দুর্বলতা সবই  যথাসাধ্য সংশোধন করে এই অহংগ্রন্থি।
এই অহংগ্রন্থি প্রধান লোকের ভিতর থেকেই বেরিয়ে আসে উচ্চ প্রতিভা, সাধু-মহাত্মা।  এই অহংগ্রন্থি ক্রিয়াশীল না থাকলে দেখা দেয় হৃদয়হীনতা, নিচটা, দুসটুবুদ্ধি।
মহৎগ্রন্থি আমাদের ললাটের উপরে। অর্থাৎ অহংগ্রন্থির কিঞ্চিৎ উপরে অবস্থিত। এরই মধ্যে আছে সোমগ্রন্থি, দেবক্ষগ্রন্থি (Pineal Gland ), রুদ্র গ্রন্থি, সহস্রার গ্রন্থি  প্রভৃতি। এই মহৎ গ্রন্থির অন্তর্মুখী রসের নাম সোমধারা। এই সোমধারাই মাথা থেকে নেবে দেহের সমস্ত গ্রন্থিকে, সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ-সবল ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করে।
এই মহৎ গ্রন্থি প্রধান লোকই মহাপুরুষ, অবতার রূপে পূজিত হন। পৃথিবীতে এঁরাই নরোত্তম। ভগবৎ প্রাপ্তির অপার্থিব অনাবিল আনন্দ এঁরাই আস্বাদন করেন।
মহৎগ্রন্থির ঠিক উপরে আছে ব্রহ্মরন্ধ্র, যা আমাদের দেহাকাশ ও দিব্যাকাশকে  যুক্ত রেখেছে। এই ব্রহ্ম বা সহস্রার প্রদেশেই চেতনার অনন্ত পারাবার, এই প্রদেশই  গুণাতীত ভূমি। একেই কেউ বলে কৈলাস, কেউ বলে পরমশিব ও পরমাশক্তির অধিষ্ঠান ভূমি।
এই গ্রন্থিস্রাব বা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত লালা আমাদের জীবন, আমাদের ব্যক্তিত্ব, আমাদের মন, আমাদের স্বভাব নিয়ন্ত্রিন করছে । 
অতএব আমরা বুঝলাম, মন কোনো আলাদা বস্তূ  বা স্নায়ু নয়। বিভিন্ন স্নায়ুর ক্রিয়াকে আমরা মনের ক্রিয়া বলি। মন বলে কিছু নেই সবই স্নায়ুর খেলা।  আমাদের এই স্নায়ুর কেন্দ্রে যেতে হবে।  স্নায়ু যেখান থেকে  শুরু হয়েছে সেটা মস্তিস্ক। আর স্নায়ুর অবতরণ ক্ষেত্রে হচ্ছে সুষুম্না কাণ্ড। এটি শেষ হয়েছে আমাদের মূলাধারে। তাই সুষুম্না নাড়িকেই আমাদের আশ্রয় করতে হবে যদি আমরা আত্মউপলব্দ্ধি করতে চাই। এই স্নায়ুকেন্দ্রে প্রতিফলিত হবে আমাদের অধরা ঈশ্বর। আমাদের চেতন স্বরূপ।

ওম শান্তি ওম শান্তি ও শান্তিঃ।  

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মনের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। আমাদের জীবনে যখন কোনো বিপদ আসে, বা কোনো পরিবর্তন আসে, তখন আমাদের মনে কি হয় ? প্রথমে আমাদের মনে  আশঙ্কা জাগে , তারপরে ভয় আসে , তারপরে হয় রাগ এবং সব শেষে হয়  দুঃখ। 
আমাদের মনের তিনটি স্তর  আছে। এগুলো হচ্ছে সাত্ত্বিক, রাজসিক, ও তামসিক। আমরা যখন যে স্তরে  থাকি, অর্থাৎ আমাদের মানসিক অবস্থা যে স্তরে থাকে, আমরা সেই মতো চিন্তা করি। এবং একই বিপদের অবস্থায়  তিন রকম মানসিকতার মানুষ তিন রকম  বিচার শুরু করে দেয় । 

ধরুন আপনি একজন অবসর প্রাপ্ত ব্যক্তি। সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রেখেছেন। এখন  ব্যাংকের সুদের উপরে নির্ভর করে আপনাকে চলতে হয়। এখন হঠাৎ করে বা দিনে দিনে ব্যাঙ্কের সুদের হার কমে যাচ্ছে। আপনার মনে কি প্রতিক্রিয়া হবে ? 

তামসিক মনের প্রতিক্রিয়া : এতো মহা ঝামেলা ! দিন দিন জিনিসের দাম বাড়ছে, ঔষধের দাম বাড়ছে, আর ব্যাঙ্কের সুদের হার কমিয়ে দিচ্ছে ? এই সব অযোগ্য লোকেদের ক্ষমতা দিলে এই হয়। একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না। সুদের হার কমিয়ে দিলেই কি দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ? বেশী পাকামি এই সরকারের। এই পরিস্থিতিতে কি যে করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। এরা  কবে ব্যাঙ্কটাকেই তুলে দেবে।  ছেলে বা বৌ হয়তো বললো, তুমিতো দেখছো,  সুদ কমছে দিন দিন।  অন্য কিছু করো। আমি তো আগেই বলেছিলাম, টাকাগুলো আমাকে দাও, আমি ব্যবসাতে লাগাই, আমি তোমাকে ব্যাঙ্কের  থেকে বেশি সুদ দেবো। অমনি তেড়েফুড়ে উঠবেন, আমাকে জ্ঞান দিতে এস না তো। তোমার থেকে আমার কি বয়স  কম ? অনেক দেখেছি, টাকা গুলো নিয়ে ধংশ করার তাল। 

রাজসিক মনের প্রতিক্রিয়া : নাঃ এ পথে হচ্ছে না। অন্য পথ দেখতে হবে। ডিম্ কখনো এক ঝুড়িতে রাখতে নেই। শুনেছি, ...... ব্যাঙ্কে বেশী সুদ দেয়।  কিছু টাকা ওখানে সরিয়ে রাখতে হবে। কিছু একটা করতে হবে, সময়মতো ডাক্তারের কাছে যাওয়া ভালো। সমস্যা থাকলে তার সমাধান আছে। একটা রিস্ক নিয়ে দেখি, শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে কিছু টাকা সরিয়ে দিলে কেমন হয় ? একটা ফ্লাট কিনে ভাড়া দিলে কেমন হয় ? ফিনান্সিয়াল কন্সাল্ট্যান্ট-এর সাথে কথা বলে দেখি, কি করা যায়। ছোটোখাটো একটা কিছু করলেও হয়। বসেই তো থাকি সারাদিন বাড়িতে।  

সাত্ত্বিক  মনের প্ৰতিক্ৰিয়া : দেখো জীবনে উত্থান পতন আছে। সুদ একসময় ১৩.৫% ছিল।  ধীরে ধীরে কমছে। তবুতো আমার কিছু টাকা ব্যাঙ্কে আছে, সেখান থেকে সুদ পাই, সারা ভারতবর্ষে কত লোক আছে, যাদের না আছে সঞ্চয়, না আছে পেনশন। তারাও তো বেঁচে আছে। কি আর হবে, এখন তো না আছে পোশাকের জন্য খরচ, না আছে মাছ মাংস খাবার লোভ। ঠিক চলে যাবে। প্রাণায়ামটা নিয়মকরে করতে হবে।  যাতে ওষুধের জন্য খরচ বাঁচানো যায়। হতাশ হয়ে লাভ নেই, দেখি বাড়ির সবার সাথে আলোচনা করে, একটা পথ নিশ্চয়ই বের হবে। সব সমস্যার সমাধান আছে।  এরও সমাধান আছে। 

তামসিক মানসিকতার মানুষ স্থিতাবস্থা পছন্দ করে। নতুন ভাবে চিন্তা করা বা নতুন পদক্ষেপ তার আসে না। উদ্দমহীন মানুষ এরা। 
অন্যদিকে রাজসিক মানসিকতার লোকেরা, নতুন চিন্তা  ও নতুন কর্মে আগ্রহ দেখায়। যদিও সে নতুনের মধ্যে যেতে চায়, কিন্তু সে আগের মতোই  ভালো থাকতে চায়। এবং সম্ভব হলে পূরনো  দিনে ফিরতে চায়।  
আর সাত্বিক মানুষ নতুন চিন্তা, নতুন কর্ম নতুন পরিস্থিতি সব কিছুকে সে মানিয়ে নিতে চায়। পুরুনো অবস্থাকে আঁকড়ে ধরে হতাশ হতে চায় না। সমস্যার সমাধান খোঁজে। নতুন ভালো কিছুর জন্য আশায় থাকে।

তামসিক মনের মানুষেরা সাধারণত স্থিতাবস্থায় থাকতে চায়। বিপদের লক্ষণ দেখলেও সতর্ক হয় না।  ভাবে, আমার ক্ষেত্রে এসব হবে না। নিজের বিপদ বা দুঃখের জন্য সে অন্যকে দায়ী করে।  অন্যকে দোষী ভাবে। নিজের ভুল বুঝতে চায় না। নিজেকে পাল্টাতেও চায় না।

রাজসিক মনের মানুষেরা পুরোনো পরিস্থিতি খারাপ বা পরিবর্তন হবার সম্ভাবনা হতে দেখলে, আগে থাকতেই নতুন পথের সন্ধান করে। সে আগের মতোই ভালো থাকতে চায়। পরিবর্তিত অবস্থায় খারাপ থাকার কথা সে ভাবতেই চায় না। চেষ্টা করে যাতে সমস্যার সমাধান হতে পারে। 

সাত্ত্বিক মনের মানুষরা পরিস্থিতির উপরে নজর রাখে। এবং সামান্য অভাসে সে ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারে। এবং সেই মত ব্যবস্থা নেয়। নিজের বিপদের জন্য, অন্যকে দায়ী করে না। বরং সমাধানের রাস্তা খোঁজে। পরিস্থিতি যখন তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সে নতুন পরিস্থিতিকে মেনে নেয়।

নিজের ভাবনাকে ধরার চেষ্টা করুন। বিপদের সময়, নতুন পরিস্থিতিতে আপনার মনের অবস্থা কি হয়। তাহলে আপনি নিজের মনকে বুঝতে পারবেন। আর নিজের মনকে যদি আপনি ধরতে পারেন,  অর্থাৎ ভাবনা আপনাকে দুঃখ দিচ্ছে, না আনন্দ দিচ্ছে এটা যদি আপনি ধরতে পারেন, তবে আপনি আপনার ভাবনাকে প্রভাবিত করবার চেষ্টা করতে পারবেন । ভাবনাকে বলুন, ভেবে কিছু লাভ হবে না। কি করতে হবে তাই বলো। তখন আপনার ভিতর থেকে জবাব এসে যাবে।  আর সেই মতো কর্মে লিপ্ত হয়ে যান। অতীত আপনার হাতে নয়। বর্তমান আপনার হাতে।  আর বর্তমান আপনাকে ভবিষ্যতের রাস্তা তৈরি করে দেবে।

কতকগুলো মানুষ আছে যারা চিরকালই দুঃখে থাকে। আসলে তারা তামসিক মনের অধিকারী। কিছু মানুষ আছে, তারা চেষ্টা দ্বারা নিজের পরিবর্তনের চেষ্টা করে। এঁরা রাজসিক মনের অধিকারী। আর এক শ্রেনীর মানুষ আছেন তার সব পরিস্থিতিতে ভালো থাকে - অর্থাৎ সব পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়। আবার বিচারশীল পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করে না। এরাই সাত্ত্বিক মনের মানুষ। 

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ       














      
























       


বীজমন্ত্র বা ঈশ্বরের নামের মাহাত্ম্য

রাম - কৃষ্ণ - শিব - কালী  কোথায় থাকেন ?
বীজমন্ত্র বা ঈশ্বরের নামের মাহাত্ম্য

ওঁ সহ নাববতু।  সহ নৌ ভুনক্ত্ু। সহ বীর্যং করবাবহৈ।
 তেজস্বি নাবধীতমস্ত্ু মা  বিদ্বিষাবহৈ।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।।

আজ আমরা দেবতাদের অবাস স্থল নিয়ে আলোচনা করবো। আমরা যে নাম সংকীর্তন করি, বা বিভিন্ন নাম জপ্ করি, এর উৎস কোথায় ? আমরা কেউ কৃষ্ণ  নাম করি, কেউ রাম  নাম করি, কেউ শিবের নাম জপ্ করি। কেন করি ? কেউ বলেন,  এই নামে  ধ্বনির  মাহাত্ম। কেউ বলেন, মন্ত্রের  অর্থ না বুঝে জপ্ করলে কিছু হয় না। কেউ বলেন, নির্দিষ্ট সংখ্যাক জপ্ করলে তবে জপ্  সার্থক হয়। আজ আমরা সেই রহস্যঃ বোঝার চেষ্টা করবো।   

আমাদের দেহের তিনটি ভাগ।  স্থুল -সুক্ষ - কারন। সাধু-মহাত্মারা এটা অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে উপলব্ধি করেছেন। তাঁরা স্থুল -সুক্ষ -কারন ভেদে দেহের অন্তর-পথকে তিনটি নামে উল্লেখ করেছেন। পিন্ডদেশ, অন্ডদেশ, এবং ব্রহ্মদেশ। আমাদের তিনটি জিনিস প্রধান - দেহ-মন-আত্মা। এছাড়া আছেন, পরমাত্মা। এখন পরমাত্মাকে অনুভব করতে গেলে, এই আত্মাকে দিয়েই অনুভব করা যায়। বিজ্ঞানীরা যেমন কোনো জিনিষকে বিশ্লেণ করতে গেলে, বস্তূর স্থুলতা থেকে ধীরে ধীরে, সুক্ষ তত্বের দিকে এগিয়ে যান , তেমনি সাধু-মহাত্মারাও স্থুল থেকে সূক্ষ্মের দিকে এগিয়ে যান, সাধনার সাহায্যে। 

সাধু-মহাত্মারা, মূলাধার ইত্যাদি ছয়টি চক্র সমন্বিত দেবাদিলোককে  বলছেন, পিণ্ডদেশ। প্রলয়ে এগুলোর লয় হয়। এর উপরে আছে অন্ডদেশ।  এখানেও ছয়টি স্তর আছে। সেগুলো কাল বা সময় দ্বারা রচিত। প্রলয়কালে এগুলোরও  লয়  হয়। পিন্ড ও অণ্ডদেশের  অতীত হচ্ছে ব্রহ্মান্ড। এই ব্রহ্মান্ডদেশ   মহাকাল দ্বারা রচিত। এখানেও কিঞ্চিৎ মায়া বর্তমান। এখানেও ছটা স্তর  আছে। সাধারণ প্রলয়ে এর লয় হয় না।  কিন্তু মহাপ্রলয়ে এর লয় হয়। 

এই ব্রহ্মান্ড ভূমির অতীত হচ্ছে পরমভূমি,  যাকে চৈতন্যভূমি বলা হয়। এখানে মায়ার লেশমাত্র নেই। সাধু-মহাত্মাদের মতে, প্রলয়কালে, এমনকি মহাপ্রলয়কালেও, এই পরমবস্তু ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। সাধু-মহাত্মাদের এখানেই গন্তব্য, এখান থেকেই আমরা আসি, এখানেই রক্ষিত আছে সমস্ত সৃষ্টির বীজ।  এখানেই জীবের সত্যিকারের মুক্তি। 

পিন্ডদেশ : ১. মূলাধার চক্র - এর অধিপতি হচ্ছেন শ্রী গনেশ।  চতুর্দল পদ্ম ২. স্বাধিষ্ঠান চক্র - এর অধিপতি ব্রহ্মা। ষটদল পদ্ম।  ৩. মনিপুর চক্র - এর অধিপতি বিষ্ণু - অষ্টদল পদ্ম। 
৪. অনাহত চক্র - দ্বাদশদল পদ্ম - অধিষ্ঠাত্রী দেবী, কালী-দূর্গা ইত্যাদি শক্তি। ৫. বিশুদ্ধচক্র - ষোলো দল পদ্ম - এখানকার অধিপতি হচ্ছেন শিব। ৬. এর উপরের ভূমি আজ্ঞাচক্র - দ্বিদলপদ্ম - এর অধিপতি ব্রহ্ম। 

এখানে একটা জিনিস খেয়াল করুন, মূলাধারে শ্রীগণেশ। স্বাধিষ্ঠানে ব্রহ্মা, মনিপুরে বিষ্ণু, অনাহতে শক্তির দেবী - কালী-দূর্গা ইত্যাদি, বিশুদ্ধে শিব, এবং আজ্ঞাচক্রে ব্রহ্ম ।  অর্থাৎ এই শিবভূমির নিচে সমস্ত দেবতাদের অবস্থান বলে শিবকে বলা হয়েছে দেবাদিদেব মহাদেব। মহাদেবের উপরে অর্থাৎ বিশুদ্ধচক্রের উপরে আজ্ঞাচক্র যেটা ব্রহ্ম-ভূমির অন্তর্গত।   

পিণ্ডদেশের এই ছটা ভূমি অণ্ডদেশের অনুকরণে মায়া রচনা করেছে। যাতে সাধক প্রকৃত তত্ত্বের সন্ধান না পায়। 

অন্ডদেশ : এবার অণ্ডদেশ সম্পর্কে শুনুন। আসলে অন্ডদেশের অনুকরণেই তৈরী হয়েছে পিন্ডদেশ। অর্থাৎ আমরা আগে যেটা আলোচনা করলাম। এখানে আছে :

১. চতুর্দল কমল  : মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহংকার প্রভৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
২. ষটদল কমল : আমাদের থার্ড আই বা তৃতীয় নেত্রের ঠিক নিচে।  এই শক্তিপ্রবাহ থেকেই আমাদের জন্ম, বেঁচেথাকা, বৃদ্ধি, ক্ষয়, ভবিষ্যৎ, এবং মৃত্যুর কাজ পরিচালিত হয়।
৩. অষ্টদল কমল : আমাদের তৃতীয় নেত্রের মধ্যে অবস্থিত। পঞ্চতত্ব  (ক্ষিতি, অপি, তেজ, মরুৎ , ব্যোম ) এবং ত্রিগুণের (সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ) উৎপত্তি স্থান এটি।
৪. দ্বাদশদল পদ্ম : এটি সহস্রদল কমলের অন্তর্গত।
৫. শ্বেত শূন্য - এর প্রতিবিম্ব পিণ্ডদেশের বিশুদ্ধ চক্রে শেতাম্বর শিবস্থানে পড়েছে।
৬. দ্বাদশদল পদ্ম - এটি ত্রিকুটির নিম্নভাগে।

এখানে কালের খেলা। উচ্চতর কেন্দ্রের ঠিক অবিকল চিত্র ফুটে উঠেছে নিম্ন কেন্দ্রে। এইজন্য সাধকরা এখানে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এখানে  অর্থাৎ পিন্ডদেশে এসেই, সাধক মনে করেন, উচ্চকেন্দ্রে  অর্থাৎ অন্ডদেশে  এসে গেছেন।

ব্রহ্মান্ডদেশ :  ব্রহ্মান্ডদেশ আজ্ঞাচক্র থেকে সহস্রার  চক্রের মধ্যে। এই সহস্রার -ভূমির অধিপতি হচ্ছেন, পরমপুরুষ-নিরঞ্জন পুরুষ। এখন থেকে দশটি ধুন বা নাদ প্রকট হয়েছে। আসল বিষ্ণুভূমি, শিবভূমি, এবং ব্রহ্মভূমি এখানে। অর্থাৎ সহস্রদল পদ্মে এই তিন ভূমি অবস্থান করছে। এর উপরিভাগে আছে পরব্রহ্ম। পিন্ডদেশ ও অণ্ডদেশ  হচ্ছে  ব্রহ্মান্ড দেশের নকল, যা  তৈরি করে রেখেছেন  কাল এবং মায়া । কাল ও মায়া মাইল  তৈরি করেছেন, অন্ডদেশ আর মায়া তৈরি করেছেন পিন্ডদেশ।

সে যাই হোক, পিণ্ডদেশ ও অণ্ডদেশের  আসল কেন্দ্র হচ্ছে ব্রহ্মান্ডভূমি। আর এই ব্রহ্মান্ডভূমি থেকে দশটি ধুন  বা নাদ অর্থাৎ   শব্দ তরঙ্গ বিভিন্ন দেশে এবং  বিভিন্ন ভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, পরব্রহ্ম থেকেই সমস্ত নাদের উৎপত্তি।  কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় এসে, এই শব্দ তরঙ্গ বিভিন্ন ভাবে শ্রুত হচ্ছে, অর্থাৎ শব্দ তরঙ্গ পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে তার শক্তিমত্তার । যেমন একই নদী বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধ্বনি উৎপাদন করে থাকে।  উৎসে একরকম, পাহাড়ের গায়ে এক রকম, সমতল ভূমিতে একরকম, আবার সমুদ্রের নিকটে আরএক রকম। তাই একই ধ্বনি যখন প্রবাহিত হয়, কালক্রমে তার শক্তি ও পর্যায়ের পরিবর্তন হচ্ছে ।  আর এই ব্রহ্মান্ডদেশের সর্বোচ্চ ধাম থেকে যে ধ্বনি প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে, তা পিন্ডদেশের মূলাধার পর্য্যন্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এবং বিভিন্ন স্তরে  এসে তার শক্তি ও তরঙ্গের মাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে।

ব্রহ্মভূমিতে  এটা হচ্ছে রাং বা ক্লিং ( কৃষ্ণের বাঁশির সুর )
দ্বিদলপদ্মে হচ্ছে প্রণব বা ওঙ্কার ( অনাহত নাদ )
ত্রিকূতি মন্ডলে অর্থাৎ ত্রিনয়ন স্থানে বেদের চারি মহাবাক্য রূপে চারিধারার প্রকাশ পাচ্ছে অর্থাৎ জ্ঞানের প্রকাশ ।
বিশুদ্ধ চক্র -  অর্থাৎ শিবভূমিতে এসে বম্ বম্ ববম্ রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।
অনাহত চক্রে - এই ধ্বনি হয়ে যাচ্ছে ক্রিং।
মূলাধারে - গং গং রূপ পাচ্ছে।

আর এই কারণেই আমরা দেখি শ্রীকৃষ্ণের বীজ মন্ত্র হচ্ছে ক্লীং।  রামের বীজ মন্ত্র হচ্ছে রাং।  ব্রহ্মের  বীজ মন্ত্র হচ্ছে ওং বা ওঁ। মাকালীর বীজ মন্ত্র হচ্ছে ক্রীং।  শ্রীগণেশের বীজ মন্ত্র হচ্ছে, গং।

প্রসঙ্গত একটা কথা বলি, এই যে চক্রগুলোর কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের শরীরের মেরুদণ্ডের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত। এগুলো আর কিছুই নয়, গ্রন্থিচক্র, অর্থাৎ এই সব জায়গায়, বিভিন্ন গ্রন্থির বিভাগ স্থল। গ্রন্থিগুলো নেবে এসেছে উচ্চ মস্তিস্ক থেকে, এখানে গ্রাহক ও প্রেরক গ্রন্থির বিভাগ স্থল। এবং এই স্থলগুলোর আকার খানিকটা ওই বীজ অক্ষরের মত। অর্থাৎ দেবনাগরী  ভাষায় যদি ওই মন্ত্রগুলো লেখা যায়, তা আমাদের গ্রন্থিচক্রের আকারের মতোই হবে।  আমাদের ঋষিদের এ এক অদ্ভুত পর্যবেক্ষন। শরীরবিদ্যার বইতেও আজকাল এইসব গ্রন্থিচক্রের কথা লেখা আছে।

তাই আমাদের কোনো দেবতাকে পেতে হলে সেই দেবভূমি হতে আগত  তরঙ্গের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে হবে। ধ্বনিটা  আসল। অর্থাৎ আমি যদি, মা কালীকে বা শক্তিদেবীকে অনুভব করতে চাই, তবে অনাহত চক্রে যে ক্রীং ধ্বনিত হচ্ছে, তার সঙ্গে আমাকে একাত্ম করতে হবে। শুধু মুখে বা মনে মনে মন্ত্র উচ্চারণ করলে হবে না। এই ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। অর্থাৎ আপনি যদি মাকালীকে পেতে চান তবে অনাহত চক্রে যে ধ্বনি ক্রীং  ক্রীং  ধ্বনি অনবরত ঝংকৃত হচ্ছে তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে হবে। এই ধ্বনির তরঙ্গ প্রবাহ  আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে মা কালির কাছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ এই  ক্রীং  ক্রীং ধ্বনির সঙ্গে বা অনাহত চক্রের ধ্বনির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন বলে, তিনি মাকালীর দর্শন পেয়েছিলেন। ঠিক তেমনি ব্রহ্মান্ডভূমির মন্ত্র  হচ্ছে বা ধ্বনি হচ্ছে ক্লীং। যিনি ব্রহ্মান্ডভূমির সঙ্গে বা কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হতে চান তাকে এই ব্রহ্মান্ড ভূমির ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। আবার বিশুদ্ধ চক্রের যে ধ্বনি বম বম, তার সাথে যুক্ত হতে পারলে আপনি শিবময় হয়ে যাবেন।

এখন কথা হচ্ছে, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এই জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি। আমাদের পিন্ডদেশ থেকে অণ্ডদেশে উত্তরণ করতে হবে, নিজেকে এবং তার পরে অণ্ডদেশ থেকে ব্রহ্মান্ডদেশ-এ যেতে হবে। দেবভূমির তুলনায়, পরব্রহ্ম ভূমি অধিকতর চৈতন্যময়।  এবং এটাই প্রকৃত অক্ষয় ধাম বা আনন্দ ধাম।  এই নির্মল চৈতন্যদেশ আমাদের ইষ্ট , আমাদের মালিক, আমাদের উপাস্য। জীবের এটাই পরম পুরুষার্থ। এখান থেকে যে পবিত্র ধ্বনি উদ্গীত হচ্ছে তার সঙ্গে একাত্ম হতে  হবে। এটাই সত্যিকারের  নাম। বা নামের উদ্দেশ্য। নাম্ জপের  উদ্দেশ্য।


ওম শান্তি, শান্তি, শান্তিঃ।  হরি  ওম।















৩. 

    


Saturday, 27 July 2019

শান্তির সন্ধানে

মহাভারত - শান্তি পর্ব্ব  


সূচনা : 

ওম সর্বেষাম শান্তির্ভবতু ; ওম সর্বেষাম স্বস্তির্ভবতু।। 
ওম সর্বেষাম পূর্নম ভবতু ; ওম সর্বেষাম মঙ্গলম ভবতু।।
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।।

মহাভারতের যুদ্ধের পরে পঞ্চপাণ্ডব, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর ইত্যাদি সবাই মিলে  ভাগীরথীর জলে, যুদ্ধে নিহত সবার জন্য সলিলক্রিয়া সম্পাদন করলেন। এর পর পান্ডবরা ভাগীরথীর তীরে একমাস ছিলেন। এইসময় বহু মহাত্মা যেমন ব্যাসদেব  নারদ কন্ব  ইত্যাদি সবাই তাদের কাছে দেখা করতে আসতেন।এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঋষি তাদের  মূল্যবান উপদেশ দান করতেন।  এই সময় যুধিষ্ঠির মনমরা হয়ে থাকতেন।
তো একদিন মহর্ষি নারদ  বললেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, আপনি নিজ বাহুবলে, বাসুদেবের প্রসাদে ও ভাগ্যবলে এই অখন্ড ভূমন্ডল পরাজয় করেছেন, যুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এখন আপনার সুখের সময়, এই সময় আপনি বিষণ্ণ কেন ?
যুধিষ্ঠির বললেন : ভগবন, আমি আমার বাহুবলে নয়, এই যুদ্ধে বাসুদেবের অনুগ্রহে, আর ভীম  অর্জুন, এদের বাহুবলে আমি এই পৃথিবীকে জয় করেছি। কিন্তু আমার রাজ্য লোভের  জন্য, আমাদের জ্ঞাতিকুল ক্ষয় করেছি। দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে হারিয়েছি, অভিমন্যুকে হারিয়েছি , এতে করে আমার এই জয়লাভ পরাজয়ের ন্যায় বোধ হচ্ছে। জানিনা শ্রীমধুসূদন  দ্বারকায় গেলে পুত্রহীনা সুভদ্রা তাকে কি বলবে। পুত্রহীনা দ্রৌপদীকে দেখলে আমার শোকানল বাড়তে থাকে। না জেনে, আমাদের বড়ভাই কর্নকে আমরা নিহত করেছি। এতে করে আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।
নারদ বললেন : হে ধর্মরাজ আপনার বড়ভাই কর্ন বড় যোদ্ধা ছিলেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি একজন অভিশাপগ্রস্থ, বঞ্চিত মানুষ ছিলেন। অতয়েব তার জন্য শোক করা কর্তব্য নয়। সবই পূর্ব্ব নির্দিষ্ট। পুরুষার্থের দ্বারা ভাবিতব্যকে খণ্ডানো  যায় সত্য, কিন্তু বিনাশকালে পুরুষার্থঃ নেতিবাচক কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। তাই নিয়তির অবধ্য কেউ নয়। অতয়েব বৃথা শোক করো না।
ভাগীরথীর তীরে পঞ্চপাণ্ডব একমাস অবস্থান করেছিলেন। এইসময় বহু মূল্যবান উপদেশ তিনি বিভিন্ন ঋষি মহাঋষিদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তাতে রাজধর্ম পালনের কথা যেমন আছে, তেমনি জীবন ধর্মের উপদেশ।  আছে দেহতত্ত্বের কথা, আছে জীবাত্মা-পরম-আত্মার কথা, আছে মোক্ষের কথা । আমরা এই দেহতত্ত্ব ও  আত্মার কথা শুনবো।কিন্তু তার আগে শুনবো, শোক নিবারণের উপায়।  
এই শান্তিপর্ব্বে একটা অধ্যায় হচ্ছে মোক্ষপর্ব্ব। সেখানে যুধিষ্ঠির পিতামহ ভীষ্মকে একটি চিরন্তন প্রশ্ন  করেছিলেন,  - মানুষ কি ভাবে শোক তা সে যে কারণেই হোক  অর্থাৎ ধনক্ষয় বা পিতা -মাতা পুত্র-কন্যা প্রভৃতির মৃত্যুতে আমাদের যে শোক হয় তার থেকে আমরা কি ভাবে পরিত্রান পাবো ?

ভীষ্ম বললেন : কারুর মৃত্যু হলে বা অর্থনাশ হলে আমরা শমগুণাদির দ্বারা এই শোক নিবারণ করতে পারি। শম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়।  এই ইন্দ্রিয় দমনের দ্বারা আমরা আমাদের শোক নিবারণ করতে পারি। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলেছেন মহামতি ভীষ্ম। গল্পটা আমরা শুনবো। 
শোনজিৎ রাজার স্ত্রী-পুত্র মারা গেছেন। এই সময়  এক ব্রাহ্মণ শোকসন্তপ্ত শোনজিৎ রাজার কাছে এসে বললেন, মহারাজ আপনি অজ্ঞানের ন্যায় শোক করছেন কেন ? ভেবে দেখেছেন কি, দুদিন পরে, লোকে আপনার জন্যই শোক করবে। কি আপনি, কি আমি, আমরা সবাই পুরুষ হতে এই ইহলোকে এসেছি, আবার সেই পুরুষেই লয়  প্রাপ্ত হবো। 
সমস্ত জীব, কি মানুষ কি দেবতা, কি পশু কি পাখি আমরা সবাই নিজেদের কর্মের জন্যই  দুঃখ ভোগ করছি। আমরা নিজের আত্মাকে নিজের বলে জ্ঞান করি না। অথচ এই অনিত্য জগৎকে নিজের বলে জ্ঞান করে থাকি। আমরা জানি এই পৃথিবীর সমস্ত বস্তুতে সবার অধিকার আছে। অথচ সেইসব বস্তু আমরা আমার সংগ্রহে রাখতে চাই।  এজন্য আমাদের অন্তরে সুখ বা দুঃখের উদ্রেক হয় না। বিশাল সমুদ্রে দুটো কাঠের টুকরো ক্ষনিকের জন্য মিলিত হয়, আবার আলাদা হয়ে যায়। ঠিক তেমনি এই সংসার সমুদ্রে আমরা পরস্পর ক্ষনিকের জন্য মিলিত হই।  আবার আলাদা হয়ে যাই। স্ত্রী, পুত্র, জ্ঞাতি-বান্ধব এরা সবাই ক্ষনিকের  জন্য মিলিত হয়, আবার আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এই সমুদ্রেই তারা অবস্থান করে। তাই মায়া, মোহ, স্নেহ, এগুলো সবই বন্ধনের  কারন। এসবে আমাদের অভিভূত হওয়া উচিত নয়।  মিলন অবসম্ভাবী নয়, কিন্তু মিলন হলে বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। এরা সবাই  আমাদের চোখের অগোচর চিন্ময় সত্ত্বা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, আবার সেই চিন্ময় সত্ত্বাতেই বিলীন হয়ে যায়। তোমার এই মৃত পুত্রের স্বরূপ তুমি জানো  না। তাহলে তুমি কিসের জন্য শোক করছো ? বিষয় ভোগে অতৃপ্তি আমাদের দুঃখের কারন। আবার দুঃখের নাশেই   সুখ। সুখ থেকেই দুঃখ আবার দুঃখ থেকে সুখ উৎপন্ন হয়ে থাকে।
এই জগতে সুখ-দুঃখ চক্রাকারে ঘুরছে। সুখের পরেই দুঃখ।  আবার দুঃখের পরেই সুখ। কেউ চিরকাল সুখে, বা কেউ চিরকাল দুঃখে থাকে না। তুমি আগে সুখ ভোগ করেছো, তাই এখন দুঃখ ভোগ করতে হচ্ছে। কিছুদিন পরেই আবার সুখ ভোগ করতে পারবে। 
সুখ-দুঃখ আমাদের শরীরকে আশ্রয় করে থাকে। অতয়েব আমরা, যারা নিজেদেরকে দেহ মনে করি, তারা  দেহকে আশ্রয় করেই  যেমন কর্ম করে থাকি, তেমনি ফলভোগও  আমাদের করতে হয়। জীবন আমাদের শরীরের সাথে উৎপন্ন হয়, শরীরের সাথে বর্তমান থাকে, আবার শরীরের সাথেই বিনষ্ট হয়ে যায়। বিষয়-আসক্ত অকৃতার্থ মানুষ  মায়া-মোহ-স্নেহপাশে আবদ্ধ হয়ে জলের মধ্যে বালির সেতুর মতো ভেঙে পড়ে । কলু  যেমন তিলকে চাকায় পেষণ করে, ঠিক তেমনি অজ্ঞান-জাত ক্লেশ আমাদেরকে সংসারচক্রে পেষণ করছে। নির্বোধ মানুষ স্ত্রী-পুত্র-আত্মীয়দের ভরন পোষণ করবার জন্য কুকর্ম করে, এবং শেষে একমাত্র নিজেই সেই কুকর্মের জন্য ক্লেশ ভোগ করে থাকে। আবার এদের মৃত্যুতে নিজেই নিজেকে দগ্ধ করে।
এই সংসারে সুখ দুঃখ ঐশ্বর্য্য - অনৈশ্বর্য্য সবই দৈবায়ত্ত। আমরা সবাই দৈব প্রভাবে সুখ-দুঃখ ভোগ করে থাকি। কেউ আমাদের সুখের বা দুঃখের কারন নয়। শত্রু আমাদের দুঃখের কারন নয়, আবার মিত্র আমাদের সুখের কারন নয়। আমাদের জ্ঞান বা কর্ম আমাদের অর্থ এনে দিয়েছে, এবং সেই অর্থ থেকে আমরা সুখ ভোগ করছি, এমনটা নয়। আবার আমাদের বোকামি আমাদের অর্থ নাসের কারন, বা আমাদের দুঃখের কারন এমনটা নয়। একমাত্র দৈবই আমাদের সুখের বা দুঃখের কারন। দৈব অনুকুল না হলে, সুখভোগের চেষ্টা নিরর্থক। গরুর বাচ্চা, গোপালক, গোস্বামী, গো-চোর এর মধ্যে যে গরুর দুধ পান করে, সেই গরুর দুধের অধিকারী। অন্যের উপর মমতা প্রকাশ বিড়াম্বনা মাত্র। 
এইজগতে সেই সুখী, যে সুষুপ্তি লাভ করতে পেরেছেন । এই জগতে সেই সুখী যে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করতে পেরেছেন । যারা ভেদ-দর্শী,  যারা সর্বত্র বৈষম্য দেখেন, তারা সুখী হতে পারেন না। সুষুপ্তি ও সমাধি দ্বারাই যথার্থ সুখ ভোগ হয়ে থাকে। 
যারা উন্নত বুদ্ধি সম্পন্ন - যারা সুখে থেকেও সুখ দুঃখ-শুন্য, যারা দুঃখে থেকেও সুখ-দুঃখ শুন্য এবং মাৎসর্য্যবিহীন হয়েছেন, অর্থ বা অনর্থ তাদেরকে কখনোই বিচলিত করতে পারে না। যারা বহুশাস্ত্রে পণ্ডিত, অথচ তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে পারেন নি, তাদের অবশ্য়ই নিরন্তর সুখ দুঃখ ভোগ করতে হবে। বিবেকহীন বোকারা শত্রূকে পরাস্ত করে আনন্দ পায়। আর ভোগ বিলাসে মত্ত থাকে। আলস্যে দিন যাপন  করে, তাদের পরিণামে দুঃখই হয়। সময়মতো দক্ষতার সাথে কাজ করাই সুখ উৎপত্তির কারন। ঐশর্য্য ও বিদ্যা উৎসাহী-দক্ষ ব্যক্তিকে আশ্রয় করে থাকে। সুখ দুঃখ, প্রিয়-অপ্রিয় যাই উপস্থিত হোক না কেন, অবিচলিত চিত্তে তাকে অনুভব করাই  বুদ্ধিমানের কাজ। 
শরীরের কোনো অঙ্গও  যদি শোক, ত্রাস, আয়াসের কারন হয়, তবে তাকে পরিত্যাগ করা  কর্তব্য। ত্যাগেই প্রকৃত সুখ হতে পারে। বিষয় অনুরাগী পুরুষ বিষয়ের অনুসন্ধান করতে করতেই জীবন শেষ করে দেয়। মানুষ তো পূর্ব্ব জন্মাকৃত কর্মফল ভোগ করবার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। অর্থাৎ প্রারব্ধ ভোগ করার জন্য জন্মায়। কি পণ্ডিত, কি মূর্খ, কি বলবান, কি দুর্বল সবাইকে প্রারব্ধ ভোগ করতে হয়। তাই বর্তমানের সুখ দুঃখের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, অকর্তা জ্ঞানে যথাযথ কর্তব্য করে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। 
কামনা আমাদের ক্রোধের হেতু। ক্রোধ আমাদের বুদ্ধিনাশের হেতু। বুদ্ধিনাশ আমাদের ধংসের হেতু। শোক আমাদের উৎসাহকে নষ্ট করে দেয়। অনুৎসাহ আমাদের আলস্য এনে দেয়। আলস্য  আমাদের কর্মে অনীহা জন্মায়। কর্মে অনীহা আমাদের কর্তব্যকে অবহেলা করে। কর্তব্যে অবহেলা আমাদের বিনাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। 
যখন আমরা ভয়, বিষয়-অনুরাগ, বিদ্বেষ বুদ্ধি কায়-মন-বাক্যে পরিত্যাগ করতে পারবো, তখন আমাদের চিত্ত প্রসন্ন হয়ে উঠবে, এবং আমরা যথার্থ সুখী হতে পারবো।  পিঙ্গলা নামে  এক প্রেমিকা  একবার তার  বাঞ্চিত প্রিয়তমের কাছ থেকে বঞ্চিত হয়ে বলছে : যে  সর্ব্ব অন্তর্যামী নির্বিকার পুরুষ, আমরি হৃদয়ে বসবাস করছেন, আমি তাকে কামাদি দ্বারা সমাচ্ছন্ন করে রেখেছি  ।  একদিনও তার স্মরনাপন্ন হইনি।  আজ আমি আত্মজ্ঞান বলে  অজ্ঞানরূপ  খুঁটির উপর, এই নবদ্বার সম্পন্ন গৃহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন   করবো।  এতদিন যারপ্রতি আমি অনুরক্ত ছিলাম, এর পরে সে এলে তাকে আর আমার প্রিয়তম বা স্বামী বলে মনে করবো না। আজ আমার তত্ত্বজ্ঞান  উদয় হয়েছে, আমাকে আর এই নররূপী ধূর্তরা  বঞ্চনা করতে পারবে না। ভগবান তুমি অসীম দয়াময়, আমাকে এই বঞ্চনার মাধ্যমে তুমি আমাকে বিষয়বাসনা ত্যাগের জ্ঞান দিয়েছো। এই  বিরহব্যথার মাধ্যমে তুমি আমাকে জিতেন্দ্রিয় হবার পথ দেখিয়েছো।   আশা পরিত্যাগই পরমসুখের কারন। আশাহীন মানুষ সুখে নিদ্রা যায়।      

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম। 

শান্তির  সন্ধানে (২) - কালের অমোঘ গতি :

একদিন যুধিষ্ঠির পিতামহ ভীষ্মকে জিজ্ঞেস করলেন, হে পিতামহ, কাল বড় ভয়াবহ। কাল অর্থাৎ সময়  কখনো দাঁড়িয়ে থাকে না। প্রতিনিয়ত কাল অতীত হচ্ছে। এই অবস্থায় আমাদের কি করা 
কর্তব্য ?

পিতামহ ভীষ্ম বললেন, একটা ইতিহাসের গল্প বলি। একসময় তথাকথিত ধর্ম-কর্মে নিপুন এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। তার এক মেধাবী নামে পুত্র ছিল। এই পুত্র ছিল মোক্ষধর্মে কুশল। পিতাকে মেধাবী মোক্ষ লাভে অক্ষম দেখে, একদিন জিজ্ঞেস করলেন, হে পিতা মানুষের জীবিতকাল অতি সত্বর প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা একথা জেনে, কি ধরনের অনুষ্ঠান করে থাকেন, এ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত বলুন।  আমি সেই অনুযায়ী কাজ করবো। 

পিতা বললেন :  হে পুত্র মানুষের শৈশব উত্তীর্ন হলে, ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করা উচিত। এই সময় গুরুগৃহে থেকে  বেদ অধ্যয়ন করা  উচিত। তার পরে পিতৃলোকের পরিত্রানের জন্য, সংসারে থেকে পুত্র উৎপাদন করা উচিত। প্রৌঢ় অবস্থায় যথাবিহিত নিয়মে যাগযজ্ঞ করা উচিত।  একদম শেষে জঙ্গলে গিয়ে মুনিবেশে সাধন ভজন করা উচিত।

পুত্র বললেন : হে পিতা প্রতিনিয়ত লোক ব্যাধিগ্রস্থ হচ্ছে, জ্বরাগ্রস্থ হচ্ছে, নিহত হচ্ছে, মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। কাল প্রতিনিয়ত  সবকিছু গ্রাস করছে,কালের গতি অপ্রতিরোধ্য।  কিন্তু আপনি এসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নন। আপনি কি সুন্দর ভালো ভালো কথা বলছেন, আর নিশ্চিন্ত আছেন ।

পিতা : কে মানুষকে আক্রমন করছে ? কে নিহত করছে ? কে সেই অবিনাশী যে নিয়ত যাতায়াত করছে ?

পুত্র : আপনি কি বুঝতে পারছেন না, যে জ্বরা-ব্যাধি মানুষকে প্রতিনিয়ত আক্রমন  করছে। মৃত্যু মানুষকে নিধন করছে। দিন চলে যাচ্ছে, রাত্রি আসছে, আবার রাত্রি চলে যাচ্ছে দিন আসছে। আপনি এদের গতাগতি কি একদম অনুধাবন করতে পারছেন না ? আমার নিশ্চিত ধারণা, মৃত্যু কখনো কাউকে তোয়াক্কা করে না, কাউকে পরিত্যাগ করে না। এই অবস্থায় আমরা কি অন্ধের মতো কালের অপেক্ষায় থাকবো ? প্রতিদিন মানুষের পরম-আয়ু ক্ষয় হচ্ছে। এই জগতে কারুরই সুখের প্রত্যাশা প্রত্যাশা নেই। অথচ আমরা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে বিষয় ভোগে প্রবৃত্ত হয়ে আছি। কিন্তু এই বিষয়ভোগ পরিতৃপ্ত হতে  না হতেই মৃত্যু দ্বারা আমরা আক্রান্ত হয়ে থাকি। আমাদের কাজ, আমাদের ভোগ  শেষ হতে হতে পারে না,  তার আগেই মৃত্যু আমাদের আক্রমন  করে থাকে। 

হে পিতা কোনো কর্তব্য কর্ম আমাদের ফেলে রাখা উচিত নয়। আজকের কাজ এখনই করা উচিত। কালকের কাজ আজকেই করা উচিত। আমাদের কাজ শেষ হোক না হোক, মৃত্যু কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করবে না। কার কখন মৃত্যু হবে, কেউ তা জানে না। তাই আমরা যেহেতু জানিনা, মৃত্যু কখন আমাদের ডেকে নেবে, তাই বৃদ্ধাবস্থা অবধি অপেক্ষা করে, তবে আমাদের ধর্মাচরণ করতে হবে, এটা ঠিক নয়। তাই যখন যে অবস্থাতে থাকুন, আর যে বয়সে থাকুন, সব সময় আমাদের ধর্মানুষ্ঠান করা উচিত। ধর্মানুষ্ঠান করলে কি ইহলোক কি পরলোক সর্বত্র শাশ্বত আনন্দে থাকতে পারবো। 

মানুষ মোহে আবিষ্ট হয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার নিমিত্ত কাজ করে থাকে এমনকি কেউ কেউ এদের সন্তুষ্টির জন্য কুকার্যে লিপ্ত হয়। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা যাতে ভালো থাকে, সুখে থাকে, আনন্দে থাকে তার জন্য, তার জন্য সে ভালো-মন্দ সব কিছুই করবার জন্য প্রস্তুত থাকে। কিন্তু কাল কাউকে রেহাই দেয় না। মৃত্যু কোনোদিন  কোনোকিছুর জন্য অপেক্ষা করে না। যে বিষয়ের প্রতি আমরা  আসক্ত ছিলে, যে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতি আমরা  মোহগ্রস্থ, সবার কাছ থেকে মৃত্যু আমাদের  ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাবে। কোন কাজ করা হয়েছে, কোন কাজ করা হয় নি, কোন কাজ অর্ধেক করা হয়েছে, সবই যথাপূর্ব্ব পড়ে থাকবে। তুমি শুধু অসমাপ্ত কাজের কথা চিন্তা করতে থাকবে, আর মৃত্যু সবাইকে  টেনে নিয়ে চলে যাবে। কাল কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করে না।  কার  কি কাজ সমাপ্ত হয়েছে, আর কোন কাজ  বাকি রয়েছে, কোনো কিছুর জন্য সে অপেক্ষা করবে না। এমনকি  রাজা কি ভিক্ষারী,  দুর্বল কি বলবান, জ্ঞানী কি অজ্ঞানী কাউকেই তোয়াক্কা করে না মৃত্যু । যখন মানুষের এই অবস্থা, মানুষ যখন প্রতিনিয়ত জরা ব্যাধি মৃত্যুতে আক্রান্ত হচ্ছে, আপনি, হে পিতা কি ভাবে নিশ্চিন্তে অবস্থান করছেন ?

জনশ্রূতি যাতে আপনি বিশ্বাস করেন, অরণ্য হচ্ছে দেবভূমি। সংসারে বা নগরে অবস্থান বন্ধন-সম। পুণ্যাত্মারা এই বন্ধন ছিন্ন করতে পারে, কিন্তু পাপাত্মারা এই বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। কিন্তু এই কথা ঠিক নয়।  আপনি কোথায় আছেন, সেটা বড়ো কথা নয়। আপনি কার আশ্রয়ে আছেন সেটাও বড়ো কথা নয়, আপনার প্রবৃত্তি কেমন সেটাই বড় কথা। আপনি যদি হিংসাকে বর্জন করতে পারেন, আপনি যদি কায়-মন-বাক্যে অন্যের অনিষ্ট চিন্তা না করেন, আপনার জীবিকা যেন অন্যের জীবিকাকে অপহরণে প্রবৃত্ত না হয়। সত্যব্রত পরায়ণ ও শমদমনাদি  গুন্ সম্পন্ন হয়ে কেবল সত্য়বলে মৃত্যুকে পরাজয় করা অবশ্য কর্তব্য। 

আমাদের এই ঈশ্বর প্রদত্ত দেহের মধ্যে মৃত্যু ও অমৃতত্ত্ব উভয়ই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মোহে যারা অন্ধ তারাই মৃত্য়ুলাভ করে। আর যারা সত্যপথ অবলম্বন করে, তারা অমৃত লাভ করে। অতএব আমরা হিংসা, কাম, ক্রোধ পরিত্যাগ করে একমাত্র সুখপ্রদ সত্যকে অবলম্বন করে মৃত্যুকে পরিহাস করবো। এবং সূর্য্যের উত্তরায়ণের সময়ে শান্তিমার্গ অবলম্বন, জ্ঞান অর্জন, বাক্য-মন-কার্য্যে সংযম আয়ত্ত্ব করবো। আমাদের কারুরই পশুবলি যজ্ঞ বা ক্ষত্রিয়দের মতো বিনাশকারী কার্য্যে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। আমার সন্তান বলে কিছু হয় না। বা আমি কারুর সন্তান বলে কিছু হয় না। সন্তান সব সময় সয়ম্ভূ।আমাদের উচিত পুত্র-উৎপাদনের বাসনা পরিত্যাগ করে, আত্মনিষ্ঠ হয়ে জীবাত্মাকে পরম-আত্মায় আহুতি প্রদান করা। এটাই আসল যজ্ঞ মনুষ্য জীবন এই সৎ-কর্মের জন্য। সৎকর্ম প্রভাবে এই মানুষ এই মঙ্গলময় যজ্ঞ করতে পারে। বিদ্যার মতো চোখ, ফল-ত্যাগের মতো সুখ, এবং বিষয়স্পৃহার মতো দুঃখ আর কিছুই নেই। 

ঈশ্বরের প্রতি আমাদের একাগ্র হতে হবে, সর্বভূতে আমাদের সমভাব রাখতে হবে, সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকে হবে। অন্যকে দন্ড দেবার ভাবনা পরিত্যাগ করতে হবে। সরলতা অভ্যাস করতে হবে। তবেই আমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারবো। এসবই মানুষের পরম ধন। 

হে পিতা আপনাকে নিশ্চয়ই কালের কবলে পড়তে হবে, তখন আপনার জন্য, এই ধন-মান-যশ দারা -পুত্র পরিবার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন কোন কাজে লাগবে না । এখন আপনার এই দেহ মধ্যে প্রবিষ্ট আত্মাকে অনুধ্যান করুন। আপনার পিতা-পিতামহ-মাতা-মাতামহ কোথায় গিয়েছে তাকি আপনি জানেন ? কে বলেছে আপনাকে আপনার পুত্র উদ্ধার করবে ? স্বয়ং স্বয়ংকে উদ্ধার ভিন্ন কোনো রাস্তা নেই। তাই পরলোকে কেউ কারুর নয়, কেউ কারুর প্রতি নির্ভরশীল নয়। এই জগতে আমরা ভাবি, আমরা কারুর না কারুর প্রতি নির্ভরশীল, আমরা প্রতিও  আমার পরিবার নির্ভরশীল। এইরকম আমাদের পূর্বপুরুষেরাও ভাবতেন।  কিন্তু সত্য হচ্ছে, বাস্তব হচ্ছে আমরা কেউ কারুর প্রতি নির্ভরশীল নয়। আমার পূর্বপুরুষেরা সবাই দেহ ত্যাগ করেছেন। আমরাও দেহ ত্যাগ করে চলে যাবো।  জগৎ জগতের মতো চলবে। 

এই কথা বলে মহাত্মা ভীষ্ম বললেন - হে ধর্মরাজ জ্ঞানবান পুত্র এই কথা বললে পিতা তার কথায় আস্থা রেখে সত্যধর্মের অনুষ্ঠান করে কাটিয়েছিলো। তুমিও সত্যধর্ম পরায়ণ  হয়ে পরম-সুখে কালাতিপাত করো। 

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।