মুখের কথায় আগুন জ্বলে ?
আমরা জানি মুখের কথায় চিড়ে ভেজে না। কিন্তু অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণ শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল বলছেন, মুখের কথায় যে আগুন জ্বলতে পারে তার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি, যখন তিনি নর্মদা পরিক্রমা করছিলেন। আর এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছিলো নাকি এক সাধিকার শ্রীমুখ নিঃসৃত মন্ত্র উচ্চারণের কারনে। আমরা শুনেছি, সমস্ত স্ত্রীকুল মুনুস্মৃতি অনুসারে হচ্ছে শুদ্র। আর শূদ্রদের নাকি বেদশাস্ত্র পাঠে নিষেধাজ্ঞা আছে। অর্থাৎ স্ত্রীজাতির - যাঁদের বেদ পাঠে অধিকার নেই, সেই মাতৃ জাতির এক উচ্চকোটি সাধিকার শ্রীমুখ নিঃসৃত বেদমন্ত্র ধ্বনিতে উৎসাহিত হয়ে নাকি স্বয়ং অগ্নিদেব প্রকটিত হয়ে উঠেছিলেন এক যজ্ঞস্থলে - যজ্ঞকুণ্ডে। আমরা আজ জানার চেষ্টা করবো কি সেই মন্ত্র ? আর বোঝার চেষ্টা করব কিভাবে এই মন্ত্র থেকে অগ্নি প্রজ্বলিত হয় ? এটি কি কেবল মন্ত্রের শক্তি, নাকি এই সাধক/সাধিকার নিজেস্ব কেরামতি।
আমরা ঘটনাটা একবার শৈলেন্দ্র নারায়ণের দৃষ্টিতে প্রতক্ষ্য করবার চেষ্টা করি। মা যুক্তেশ্বরী যজ্ঞকুন্ডের চারিদিকে নমস্কারের ভঙ্গিতে মাথা দোলাতে দোলাতে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। মুখে ঋষি মধুছন্দা প্রণীত একটা মন্ত্র, গায়েত্রী ছন্দে উচ্চারণ করতে লাগলেন। এবং যজ্ঞাকাষ্ঠের উপরে এক কষায় ঘি সিঞ্চন করলেন। অর্থাৎ যজ্ঞকাষ্ঠকে ঘি দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া হলো। ঘি আসলে অগ্নির সবচেয়ে কাছের উদ্দীপক। ঘি সহজেই অগ্নিকে উজ্জীবিত করবার প্রাকৃতিক শক্তি রাখে।
মন্ত্রটি আমাদের ঋক্বেদের প্রথমেই লিপিবদ্ধ আছে।
মন্ত্রটি এই রকম :
ঋক্বেদ (প্রথম মন্ডল সুক্ত - ১/১)
"(ওঁ) অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবম-ঋত্বিজং। হোতারং রত্নধাতমম । "
এই মন্ত্রটিকে তিনি ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করতে লাগলেন। অর্থাৎ ওঁ অগ্নিম ঈলে। ওঁ পুরঃহহিতং ঈলে। ওঁ হোতারং ঈলে। ওঁ ঋত্বিজং ঈলে। ওঁ রত্নধাতমং দেবং ঈলে। ওঁ
ওঁ যজ্ঞস্য পুরোহিতং হোতারং ঋত্বিজং রত্নধাতমং দেবং অগ্নিং ঈলে ।
এইভাবে সুক্তের প্রতিটি শব্দকে ভেঙে ভেঙে গানের তালে তালে গায়ত্রী ছন্দে উচ্চারণ করতে লাগলেন।
এবার সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে দীর্ঘ শ্বাস টানলেন, এবং দেড় মিনিট কুম্ভক করলেন, অর্থাৎ শ্বাসকে ধরে রাখলেন। এবং শেষে ধীরে ধীরে ঘি মাখানো কাঠের উপরে ছাড়তে লাগলেন। এই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করলেন ঋক্বেদের প্রথম মন্ডলের ১৪ নং শুক্ত। মন্ত্রটি এই রকম।
ঋক বেদ - (প্রথম মন্ডল - সুক্ত ১৪/৯)
(ওঁ) আকীং সূর্যস্য রোচনাদ্বিশান দেবাং ঊষরবুধঃ বিপ্রো হোতেহ বক্ষতি। (ওঁ)`
শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল মহাশয় তাঁর তপোভূমি নর্মদা বইয়ের ষষ্ঠ খন্ডের ৩৯ পৃষ্ঠায় বলছেন।
"তাঁর (যুক্তেশ্বরী মা) মন্ত্র উচ্চারণ শেষ হলো আর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বলে উঠলো। "... বিনা অগ্নিতে কেবল মন্ত্র শক্তিতে এইভাবে অগ্নি দেবতার আবির্ভাব দৃশ্য জীবনে এই প্রথম দেখলাম, দেখলাম এই ঘোর কলিকাল নামক নিন্দিত যুগে, প্রতক্ষ্য দিবালোকে। ...... তাঁর প্রশ্ন - এ কি তপঃশক্তি ? যোগবল ? নাকি না বিশুদ্ধ ছন্দ ও সুর-স্বরে বেদমন্ত্র উচ্চারণের মহিমা ? "
আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে তপঃ শক্তিতে অনেক ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া যায় - এ কথা সত্য হলেও, বাস্তব জীবনের সমস্যা দূরীকরণে এর ক্ষমতা সীমিত। আজও সাধক ভিক্ষে করে। আজও সন্ন্যাসী গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষে করে জীবন নির্বাহ করে। হ্যাঁ এঁদের সব অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে, আমরা আমাদের সর্বস্য দান করে থাকি। আমাদের সারা জীবনের উপার্জিত ধন এঁদেরকে দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি। মন্দিরে মন্দিরে, আশ্রমে আশ্রমে, সোনার পাহাড় জমে ওঠে, কিন্তু ভারতবাসীর দৈন্য যায় কী ? একসময় দস্যুরা এসে লুট করে নিয়ে যায়। আমরা ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মতো লাফাতে থাকি।
প্রথম যে মন্ত্রটির কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ "অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবম-ঋত্বিজং। হোতারং রত্নধাতমম । "
এটি ঋক সংহিতার প্রথম খন্ডের প্রারম্ভে একটা প্রার্থনা মন্ত্র। এটি বাস্তবে যাগ-যজ্ঞের জন্য অগ্রি প্রজ্বলনের মন্ত্র নয়। এটি জ্ঞানযজ্ঞের উপাচারের জন্য প্রার্থনা। এই মন্ত্রের অর্থ হচ্ছে, সৎ-কর্মকারক, - মানুষের হিতসাধক, সৎ-কর্মের দেবতা, আর সৎকর্ম জাত দীপ্তিদানাদি গুণস্বরূপ, সর্বদা সৎকর্মে নিয়োজক, দেবগনের বা দেবভাবসমূহের আহ্ববানকারী, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ স্বরূপ পরমধনের বিধাতা, জ্ঞান-দেবতাকে - সেই তেজোময় চৈতন্যস্বরূপ জ্ঞানাগ্নিকে আমি স্তব করি।
অর্থাৎ এই মন্ত্রটি একদিকে যেমন আত্ম-উদ্ভোদক, অন্যদিকে এই একটি জ্ঞানের (জ্ঞানালোকের) জন্য প্রার্থনা। এর সঙ্গে ঘৃত সংযোগে কাঠে অগ্নি প্রজ্বলনের কোনো নেই। কোনোদিন ছিলোও না। আজও নেই। সাধু সাবধান।
দ্বিতীয় মন্ত্র : "আকীং সূর্যস্য রোচনাদ্বিশান দেবাং ঊষরবুধঃ বিপ্রো হোতেহ বক্ষতি।" ঋক্বেদ - ১ম-মন্ডল সুক্ত ১৪/৯)
অর্থাৎ হে জ্ঞানদেব, আপনি সকল দেবভাবের সাথে মিলিত হয়ে, আমাদের মধ্যে শুদ্ধসত্ত্বযুত মধুর ভক্তিসুধা সঞ্চার করে, সকল শক্তিযুত ইন্দ্রদেবের এবং সর্বত্রগ বায়ুদেবের সাথে, মিত্র দেবতার ন্যায় আমাদের হিতসাধন রূপে এসে, তা গ্রহণ করুন, আমাদের মধ্যে অধিষ্টিত হোন। মোদ্দাকথা হচ্ছে এটিও একটা প্রার্থনা মন্ত্র - যাতে বলা হচ্ছে আমাদের সকলকে সৎ-ভাব-সমন্বিত ভক্তিযুক্ত করে সকল দেবতার ও দেবভাবের সাথে আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠান করুন।
এই মন্ত্রের সঙ্গেও বাস্তবে ঘিয়ে ভেজা কাঠে অগ্নি সংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। অতএব, বেদের অপব্যাখ্যাকে জ্ঞানদৃষ্টিকে প্রত্যাখ্যান করুন। বিভ্রান্ত হয়ে অন্ধের মতো অপ-ধর্ম্মের আগুনে আহুতি দেবেন না। বেদ আমাদের সবার মধ্যে জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করতে পারে সত্য কিন্তু বেদ কখনও কারুর পার্থিব বস্তুর আহবানকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম নয়। বেদের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন। ভালো থাকুন সবাই।
---------
-------
No comments:
Post a Comment