Saturday, 31 October 2026

মুখের কথায় আগুন জ্বলে ?

মুখের কথায় আগুন জ্বলে ? 

আমরা জানি মুখের কথায় চিড়ে ভেজে না। কিন্তু অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণ শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল বলছেন, মুখের কথায় যে আগুন জ্বলতে পারে তার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি, যখন তিনি নর্মদা পরিক্রমা করছিলেন। আর এই কাজটি  সম্পন্ন হয়েছিলো  নাকি এক সাধিকার শ্রীমুখ নিঃসৃত মন্ত্র উচ্চারণের কারনে। আমরা শুনেছি, সমস্ত স্ত্রীকুল মুনুস্মৃতি অনুসারে হচ্ছে শুদ্র।  আর শূদ্রদের নাকি বেদশাস্ত্র পাঠে  নিষেধাজ্ঞা আছে।   অর্থাৎ স্ত্রীজাতির  - যাঁদের  বেদ  পাঠে অধিকার নেই, সেই মাতৃ জাতির এক উচ্চকোটি সাধিকার শ্রীমুখ নিঃসৃত বেদমন্ত্র ধ্বনিতে উৎসাহিত হয়ে নাকি স্বয়ং অগ্নিদেব প্রকটিত হয়ে উঠেছিলেন এক যজ্ঞস্থলে - যজ্ঞকুণ্ডে।   আমরা আজ জানার চেষ্টা করবো কি সেই মন্ত্র ? আর বোঝার চেষ্টা করব কিভাবে এই মন্ত্র থেকে অগ্নি প্রজ্বলিত হয় ? এটি কি কেবল মন্ত্রের  শক্তি, নাকি এই সাধক/সাধিকার নিজেস্ব কেরামতি। 

আমরা ঘটনাটা একবার শৈলেন্দ্র নারায়ণের দৃষ্টিতে প্রতক্ষ্য করবার চেষ্টা করি। মা যুক্তেশ্বরী যজ্ঞকুন্ডের  চারিদিকে নমস্কারের ভঙ্গিতে মাথা দোলাতে দোলাতে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। মুখে ঋষি মধুছন্দা প্রণীত একটা মন্ত্র, গায়েত্রী ছন্দে  উচ্চারণ করতে লাগলেন। এবং যজ্ঞাকাষ্ঠের  উপরে এক কষায় ঘি সিঞ্চন করলেন। অর্থাৎ যজ্ঞকাষ্ঠকে ঘি দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া হলো।  ঘি আসলে অগ্নির সবচেয়ে কাছের উদ্দীপক। ঘি সহজেই অগ্নিকে উজ্জীবিত করবার প্রাকৃতিক শক্তি রাখে।   

মন্ত্রটি আমাদের ঋক্বেদের প্রথমেই লিপিবদ্ধ আছে।  

মন্ত্রটি এই রকম :

ঋক্বেদ (প্রথম মন্ডল সুক্ত - ১/১)

"(ওঁ) অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবম-ঋত্বিজং। হোতারং রত্নধাতমম । " 

এই মন্ত্রটিকে তিনি ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করতে লাগলেন।  অর্থাৎ ওঁ অগ্নিম  ঈলে।  ওঁ পুরঃহহিতং ঈলে। ওঁ হোতারং  ঈলে। ওঁ ঋত্বিজং ঈলে। ওঁ রত্নধাতমং দেবং ঈলে।  ওঁ 

ওঁ যজ্ঞস্য পুরোহিতং হোতারং ঋত্বিজং রত্নধাতমং দেবং অগ্নিং ঈলে ।

এইভাবে সুক্তের প্রতিটি শব্দকে ভেঙে ভেঙে গানের তালে তালে গায়ত্রী ছন্দে উচ্চারণ করতে লাগলেন। 

এবার সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে দীর্ঘ শ্বাস টানলেন, এবং দেড় মিনিট কুম্ভক করলেন, অর্থাৎ শ্বাসকে ধরে রাখলেন।  এবং শেষে ধীরে ধীরে ঘি মাখানো কাঠের উপরে ছাড়তে লাগলেন।  এই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করলেন ঋক্বেদের প্রথম মন্ডলের ১৪ নং শুক্ত।  মন্ত্রটি এই রকম। 

ঋক বেদ - (প্রথম মন্ডল - সুক্ত ১৪/৯) 

(ওঁ) আকীং সূর্যস্য রোচনাদ্বিশান দেবাং  ঊষরবুধঃ বিপ্রো হোতেহ বক্ষতি। (ওঁ)`

শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল মহাশয় তাঁর তপোভূমি নর্মদা বইয়ের ষষ্ঠ খন্ডের  ৩৯ পৃষ্ঠায় বলছেন। 

"তাঁর (যুক্তেশ্বরী মা) মন্ত্র উচ্চারণ শেষ হলো আর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বলে উঠলো। "... বিনা অগ্নিতে কেবল মন্ত্র শক্তিতে এইভাবে অগ্নি দেবতার আবির্ভাব দৃশ্য জীবনে এই প্রথম দেখলাম, দেখলাম এই ঘোর কলিকাল নামক নিন্দিত যুগে, প্রতক্ষ্য দিবালোকে। ...... তাঁর প্রশ্ন - এ  কি তপঃশক্তি ? যোগবল ? নাকি না বিশুদ্ধ ছন্দ  ও সুর-স্বরে বেদমন্ত্র উচ্চারণের মহিমা ? "

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে তপঃ শক্তিতে অনেক ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া যায় - এ কথা সত্য হলেও, বাস্তব জীবনের সমস্যা দূরীকরণে এর ক্ষমতা সীমিত। আজও সাধক ভিক্ষে করে।  আজও  সন্ন্যাসী গৃহস্থের  দ্বারে দ্বারে ভিক্ষে  করে জীবন নির্বাহ করে। হ্যাঁ এঁদের সব অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে, আমরা আমাদের সর্বস্য দান  করে থাকি। আমাদের সারা জীবনের উপার্জিত ধন এঁদেরকে  দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি।  মন্দিরে মন্দিরে, আশ্রমে আশ্রমে,  সোনার পাহাড় জমে ওঠে, কিন্তু ভারতবাসীর দৈন্য যায় কী ? একসময় দস্যুরা  এসে লুট করে নিয়ে যায়। আমরা ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মতো লাফাতে থাকি। 

প্রথম যে মন্ত্রটির কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ "অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবম-ঋত্বিজং। হোতারং রত্নধাতমম । "

এটি ঋক সংহিতার প্রথম খন্ডের প্রারম্ভে একটা প্রার্থনা মন্ত্র। এটি বাস্তবে যাগ-যজ্ঞের জন্য অগ্রি প্রজ্বলনের মন্ত্র নয়।  এটি জ্ঞানযজ্ঞের উপাচারের  জন্য প্রার্থনা। এই মন্ত্রের অর্থ হচ্ছে, সৎ-কর্মকারক, - মানুষের হিতসাধক, সৎ-কর্মের দেবতা, আর সৎকর্ম জাত দীপ্তিদানাদি গুণস্বরূপ, সর্বদা সৎকর্মে নিয়োজক, দেবগনের বা দেবভাবসমূহের আহ্ববানকারী, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ স্বরূপ পরমধনের  বিধাতা, জ্ঞান-দেবতাকে  - সেই তেজোময় চৈতন্যস্বরূপ জ্ঞানাগ্নিকে আমি স্তব করি।

 অর্থাৎ এই মন্ত্রটি একদিকে যেমন আত্ম-উদ্ভোদক, অন্যদিকে এই একটি জ্ঞানের (জ্ঞানালোকের) জন্য প্রার্থনা। এর সঙ্গে ঘৃত সংযোগে কাঠে অগ্নি প্রজ্বলনের কোনো নেই।  কোনোদিন ছিলোও  না। আজও  নেই। সাধু সাবধান। 

দ্বিতীয় মন্ত্র : "আকীং সূর্যস্য রোচনাদ্বিশান দেবাং  ঊষরবুধঃ বিপ্রো হোতেহ বক্ষতি।" ঋক্বেদ - ১ম-মন্ডল সুক্ত ১৪/৯) 

অর্থাৎ হে জ্ঞানদেব, আপনি সকল দেবভাবের সাথে মিলিত হয়ে, আমাদের মধ্যে শুদ্ধসত্ত্বযুত মধুর ভক্তিসুধা সঞ্চার করে, সকল শক্তিযুত ইন্দ্রদেবের এবং সর্বত্রগ বায়ুদেবের সাথে, মিত্র দেবতার ন্যায় আমাদের হিতসাধন রূপে এসে, তা গ্রহণ করুন, আমাদের মধ্যে অধিষ্টিত হোন। মোদ্দাকথা হচ্ছে এটিও একটা প্রার্থনা মন্ত্র - যাতে বলা হচ্ছে আমাদের সকলকে সৎ-ভাব-সমন্বিত ভক্তিযুক্ত করে সকল দেবতার ও দেবভাবের সাথে আমাদের মধ্যে অধিষ্ঠান করুন। 

এই মন্ত্রের সঙ্গেও বাস্তবে ঘিয়ে ভেজা কাঠে অগ্নি সংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। অতএব, বেদের অপব্যাখ্যাকে জ্ঞানদৃষ্টিকে  প্রত্যাখ্যান করুন। বিভ্রান্ত হয়ে অন্ধের মতো অপ-ধর্ম্মের আগুনে আহুতি দেবেন না। বেদ আমাদের সবার মধ্যে জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করতে পারে সত্য কিন্তু বেদ কখনও  কারুর পার্থিব বস্তুর আহবানকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম নয়। বেদের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন। ভালো থাকুন সবাই। 

---------  


-------  



 








                                                








সনাতন

 ৩১.১০.২০২৬

সনাতন 

আজকাল সনাতন কথাটা খুব শোনা যাচ্ছে। সনাতন ধর্ম্ম, সনাতন সত্য, সনাতনী ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ করা হচ্ছে। সনাতন শব্দের অভিধানিক অর্থ হচ্ছে নিত্য, চিরস্থায়ী, চিরদিনের। হিন্দুশাস্ত্রে এঁকে নির্গুণ চৈতন্যের অস্তিত্ত্বকে বোঝানো হয়েছে। আবার এই নির্গুণ চৈতন্য হচ্ছে অব্যক্ত, অজ্ঞেয়।  নির্গুণ চৈতন্যকে  ব্যক্ত করা যায় না, আবার জানাও  যায় না বা বুদ্ধির অতীত। যে জানে, তাকে কে জানে ? 

একটু ভালো করে পর্যবেক্ষন করলে আমরা বেশ অনুভব করতে পারি, যে এই যে জগৎ একটা বিশেষ সময়ে আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তা পরমুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা নতুন দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে।আর এই প্রক্রিয়া এতটাই দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে, যে আমাদের অনুভূতিতে তা ধারা পড়ছে না। 

একটা শব্দ একটা বিশেষ সময়ে অনুভূত হচ্ছে, আবার তা মিলিয়ে যাচ্ছে। এক অনুভূতি যা এই মুহূর্তে অনুভব হচ্ছে, তা ক্ষণিক পরেই হারিয়ে যাচ্ছে। 

তো একদিকে যেমন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মিথ্যে বলে কিছু দৃশ্যমান থাকে না, বা শ্রুতিগোচর থাকে না,  আবার সত্য প্রতি মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তো বর্তমানের বিশ্ব যা দৃশ্যমান, তা সত্য।  এখানে মিথ্যে বলে কিছু থাকতেই  পারে না। তো আমি বলি, জগৎ মিথ্যে নয়, জগতে মিথ্যে বলে কিছু হয় না। প্রকৃতির সব কিছুই এই মুহূর্তের জন্য সত্য ও বাস্তব। আসলে মিথ্যে হচ্ছে সেই দৃষ্টি বা অনুভূতি যা মানুষের বুঝবার বা বোঝাবার অক্ষমতা। আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বাস্তব বিশ্বকে ভুল বোঝায়। সে মিথ্যেকেও সত্য বলে ভুল করে। 

এই যে বিশ্ব  বা প্রকৃতি এর বাইরে অর্থাৎ প্রকৃতির উর্দ্ধে একটা অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ইচ্ছেশক্তি আছে, যা আমাদের এই দৃশ্যমান প্রকৃতির মধ্যে নিরন্তর পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। এইটে  হচ্ছে পরম সত্য। এই যে পরম সত্য বা সনাতন এটি আমাদের অনেকের কাছে মহা-মূল্যবান। বিচার-বুদ্ধির উর্দ্ধে এই সত্যকে চিরন্তন বলা হয়েছে। এই সনাতন বা চিরন্তন সত্য আসলে একটা নিষ্ফলা শব্দ। এটি মূল্যবান কিন্তু বোধবুদ্ধিহীনের কাছেই এই সত্য ধরা পরে। বিচার-বুদ্ধিযুক্ত মানুষকে মূর্খ বানাবার জন্য এটি একটি অমোঘ যাদুমন্ত্র। আমরা ভাবি মিথ্যেকেই  শুধু বানাতে হয়, সত্য চিরন্তন। কিন্তু  সত্য হচ্ছে সত্যকেও  বানাতে হয়। অহরহ মিথ্যে যেমন সৃষ্টি  হয়ে চলেছে, তেমনি সত্যকেও বানাতে হয়। চিরন্তন  সত্য বলে যেমন কিছু হয় না, তেমনি চিরন্তন  মিথ্যে বলে কিছু হয় না। সত্য-মিথ্যে  ব্যক্তি বিশেষে, সময় বিশেষে, দেশ বিশেষে আলাদা হয়ে থাকে। যুগের প্রারম্ভে যেমন সত্যের জন্ম হয়, তেমনি মিথ্যেরও জন্ম হয়। যুগের পরিবর্ত্তনে সত্যের পরিবর্ত্তন ঘটে, আবার মিথ্যের  পরিবর্ত্তন ঘটে থাকে। আসলে যুগপুরুষ এসে একটা সত্য-মিথ্যের  ধারণা  প্রচার করে থাকেন। আর আমরা সাধারণ বুদ্ধির মানুষ সেই প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে ছুঁটে  চলি।  

সত্য হচ্ছে সেটাই যা  তোমার কাছে  সত্য, তা আমাদের শাস্ত্রবাক্যের বিরোধী হলেও তা সত্য।  আবার তোমার কাছে যা মিথ্যে তা শাস্ত্রের বিরোধী হলেও তা মিথ্যে। চোখ বুজে, বিচারবুদ্ধির বাইরে গিয়ে কোনো বিষয়কেই সত্য বা মিথ্যে বলে মেনে যাবার মধ্যে কোনো কৃতিত্ত্ব নেই। অন্যের অনুভূতিকে সত্য বলে প্রচার করার চেয়ে নিজের অনুভূতির সত্যকে স্বীকার করাই ভালো। ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম্মগ্রন্থে মতাদর্শের পার্থক্য রয়েছে। আবার আমরা লক্ষ করেছি, যে ধর্ম্মগ্রন্থ নিজেই অনির্বচনীয় বলছে, তাকেই নিয়েই বচনের ভান্ডার গড়ে তুলছে। দেখুন, যা আপনার অনুভূতিতে নেই, যা আপনার বুদ্ধির বাইরে, তাকে আপনি আপনার অজ্ঞানের ভান্ডার বা জ্ঞানের ভান্ডার থেকে বাইরে  রাখুন। যা বুদ্ধির অগম্য তা আলোচনার যোগ্য নয়, যা অজ্ঞেয় তা জানার বিষয় নয়, তাকে ক্রমাগত জানার চেষ্টা বা প্রমানের চেষ্টা না করাই  ভালো। 

সত্য সবসময় দেশ-কাল-ব্যক্তির সন্মন্ধে সম্পর্কযুক্ত। সত্য দেশ-কাল-পাত্র ভেদে আলাদা হতেই পারে। এ নিয়ে বিতর্ক বৃথা। তুমি তোমার মতো করে সত্যকে বোঝার, জানার চেষ্টা করো।  অন্ধের মতো অন্যের অনুভূতিকে নিজের বলে মিথ্যে জাহির করতে যেও না। আর তা যদি করো, তা হবে নিজের সঙ্গে প্রতারণা। এমন ভাবার কোনো কারন নেই যে আমাদের পূর্ব্বপুরুষ সেই ঋষি-মানবগন আমাদের জন্য সব ভেবে  বসে আছেন। এমন ভাবনার কোনো কারন নেই, যে সমস্ত ভাবনার শেষ হয়ে গেছে। ঋষিরাই সব ভেবে  ফেলেছেন, এখন আর নতুন করে কিছু ভাববার নেই। সত্য হচ্ছে দুনিয়ায় পুরাতন বলে কিছু নেই - সবই নতুন।  নিত্যদিন নতুনের সৃষ্টি হয়ে চলেছে।  তাই ত্রিকালজ্ঞ ঋষিগণ চিন্তার সব ভাবনার ভান্ডার শেষ করে ফেলেছেন, এমনটা নয়। ভাবনার ভান্ডার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাবনার  বিষয় যোগ করে চলেছেন।  তাই আপনার ভাবনা আপনিই ভাবুন, আমার ভাবনা আমাকে ভাবতে দিন। ভাববেন না যে সব চিন্তার শেষ হয়ে গেছে, আর কিছুই চিন্তা করবার নেই। জগৎ-বিষয় যতদিন পরিবর্ত্তন হচ্ছে চিন্তার ধারা ততদিন চলতে থাকবে, আর তা হবে একটা চিরন্তন ধাবমান প্রবাহ । এর কোনো শুরু নেই, এর কোনো শেষ নেই। 

চিন্তাবিদ অনেক মহাপুরুষ পৃথিবীতে এসেছেন, যাঁরা  ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন, আবার এমন অনেক মহাপুরুষ এসেছেন, যারা ঈশ্বর সম্পর্কে  চুপ ছিলেন।  আবার কেউ এই ঈশ্বরকে নিয়ে আস্ফালন করেছেন। এঁরা কেউ পাগোল, আবার কেউ পণ্ডিত বলে খ্যাত হয়েছেন। আবার আজ যারা  পাগোল, তাঁদেরকেই  যুগের পরিবর্ত্তনে পণ্ডিত বলে মেনে নিয়েছেন, নতুন প্রজন্ম ।  

উপনিষদের  ঋষিগণ  বলছেন,  যাঁকে  কেউ দেখতে পায়  না, কিন্তু যিনি সবাইকে দেখেন তিনিই সেই পরমেশ্বর। ইনি  সনাতন। পৃথিবী ধংশ হয়ে গেলেও যার ধংশ হয় না, তিনিই সনাতন। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধংস হয়ে গেলেও যিনি থাকবেন, আবার এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পরেও যিনি থাকেন, তিনিই সনাতন ঈশ্বর। এঁকে কেউই দেখেনি, জানেনি, এমনকি অনুভবেও আসে না, তিনিই সেই সনাতন সত্য বস্তু।  তো বোঝাই যাচ্ছে এই ধারণা  আমাদের কল্পনা বা অন্ধ-বিশ্বাস  ছাড়া কিছু নয়। সবার পিছনে কেউ একজন আছেন, এটি আমাদের কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। আর এই অদ্ভুত কল্পনা নাকি সিন্ধু নদের তীরের অধিবাসীর (হিন্দু) মধ্যে থেকে প্রথম প্রচারিত হয়। তাই হিন্দু  ধর্ম্মের মানুষরা নিজেদের সনাতনী বলে দাবি করে থাকেন । 

আসলে সনাতন বলে কিছুই নেই।  জগৎ একটি পরিবর্তনশীল সত্ত্বা মাত্র। এর একমাত্র ধর্মই হচ্ছে পরিবর্তনের  মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া।  একটি সত্ত্বা থেকে অন্য সত্ত্বায় ধাবিত হওয়া।  একটা রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন হওয়া। এমনকি জীবাত্মা যা পরমাত্মার অংশ, তাও  এক শরীর  ছেড়ে অন্য শরীরে ধাবিত হচ্ছে। তো সনাতন হচ্ছে একটা নিয়ম বা অনুশাসন যা জগৎকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই নিয়মের কোনো পরিবর্ত্তন নেই। এই নিয়মই চিরন্তন। একেই বলে সনাতন।  তাই সনাতন হচ্ছে শ্বাশ্বত অনুশাসন মাত্র। যার কোনো পরিবর্ত্তন নেই। যা চিরকালীন। সৃষ্টির আগেও ছিল, আবার এই সৃষ্টির প্রলয়ের পরেও থাকবে। সনাতন হচ্ছে বিশ্বজগতের ধর্ম।  বিশেষ কোনো মনুষ্য-গোষ্ঠীর নয়। এমনকি শুধু জীবকুলের নয়, সনাতন হচ্ছে জড়-অজড়, উভয়ের ধর্ম। 

-----