ধর্ম-নিরপেক্ষতা (Secularism)
"জাত না পুছো সাধুকি, পুছ লিজিয়ে জ্ঞান।
মোল কর তলোয়ার কা, পড়ি রহন দো ম্যান।"
সাধুকে জাতের কথা জিজ্ঞেস করো না, জ্ঞানের কথা জেনে নাও। তলোয়ারে ধার আছে কিনা দেখো, খাপ নিয়ে চিন্তা করো না।
বিচিত্র এই বিশ্ব। প্রতি পাতায় পাতায় এর বৈচিত্র। মানবজাতিকে ঈশ্বর একটা ছাঁচে তৈরী করেন নি। ভবিষ্যতেও করবেন না। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি জীবকনাকে নতুন ছাঁচে ফেলছেন। আর নতুন এক শিশুর জন্ম হচ্ছে। পৃথিবীতে যত মুখ, তত চোখ, তত কন্ঠস্বর। একের কন্ঠস্বর অন্যের থেকে ভিন্ন। এটাই ঈশ্বরের সৃষ্টির বৈচিত্র। এই বৈচিত্রকে বোঝার চেষ্টা করুন, মেনে নিতে শিখুন। এই সত্যকে উপলব্ধি করবার জন্য কোন কঠিন পাঠ নিতে হবে না। শুধু মনোযোগ দিলেই আপনার সামনে প্রকৃতি এই বৈচিত্রের খেলাকে তুলে ধরবে। আপনি শুধু আপনার বদ্ধমূল সংস্কার, যা ছোটবেলা থেকে আপনার পরিবার, সমাজ আপনার উপরে চাপিয়ে দিয়েছে, তাকে ক্ষনিকের জন্য সরিয়ে রাখুন।
পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই, যার কোনো ধর্ম নেই, এমনকি এমন কোনো জীব-জন্তু নেই যার কোনো ধর্ম্ম নেই। পশু বলুন, পাখী বলুন, কীট পতঙ্গ বলুন সবার একটা ধর্ম আছে, আর তা সে জন্মসূত্রে পেয়ে থাকে। এই ধর্ম্ম থেকে বিচ্যুত হলে, তার জীবন-সংশয় দেখা দেবে। তাই প্রত্যেকে তার নিজ-নিজ ধর্মকে রক্ষা করতে চায়। এই ধর্মই বেঁচে-বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। আর এই ধর্মের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভয়, বিদ্বেষ, ঘৃণা, পছন্দ, অপছন্দ।
ধর্ম্মনিরপেক্ষতা এই ভয়কে, ঘৃনাকে, বিদ্বেষকে দূর করবার একটা অমোঘ প্রক্রিয়া। সর্ব্ব ধর্ম্মের প্রতি সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, এবং নিজ-নিজ ধর্মকে রক্ষা করা, সভ্য সমাজের লক্ষণ। এখান থেকে বিচ্যুত হলে, শুরু হয় নৈরাজ্য। আর এই নৈরাজ্য শুধু সমাজকে কলুষিত করে তাই নয়, সৃষ্টির মধ্যেও শুরু হয় অসাম্য।
স্বামীজী বলেছিলেন, "আমি মুসলমানদের মসজিদে যাবো, আমি খ্রিষ্টানদের গির্জায় গিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর সামনে নতজানু হব। বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করে আশ্রয় নেবো, বুদ্ধ ও তার অনুশাসনের কাছে। আমি যাবো অরণ্যে, তপস্যায় বসবো হিন্দুদের সঙ্গে, যারা জ্ঞানালোক প্রাপ্তির জন্য সাধনায় রত। এই আলোক প্রতিটি হৃদয়কে আলোকিত করবে।"
ধর্ম্মনিরপেক্ষতা মানে কোনো ধর্ম্মের প্রতি অবজ্ঞা বা উপেক্ষা নয়। এমনকি ধর্ম্ম সন্মন্ধে উদাসীনতাও নয়। বরং ধর্ম্মে গভীরে প্রবেশ করা। ধর্ম্ম সন্মন্ধে বিষদে জ্ঞাত হওয়া। সবার ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টি। ধর্ম্মনিরপেক্ষ হতে গেলে, শুধু নিজের ধর্ম্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ রূপে জ্ঞাত হওয়া নয়, সমস্ত ধর্ম্ম সন্মন্ধে জ্ঞান অৰ্জনের জন্য সচেষ্ট হওয়া। ধর্ম্ম মানে শুধু আচার-বিচার নয়। একটা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। প্রত্যেক ধর্মের একটা মূল মন্ত্র আছে, আবার তার কিছু বাচ-বিচার আছে। ধর্মে ধর্মে পার্থক্য হচ্ছে এই বাচ -বিচারের কারনে, মূল মন্ত্রে নয়। সব ধর্মের মূল এক । আর তা হচ্ছে নিজে বাঁচো, অপরকে বাঁচতে দাও। প্রত্যেকের মধ্যে সেই একইসত্ত্বা বিরাজ করছে, তাকে তুমি ঈশ্বর বা আত্মা বা আল্লা যে নামেই ডাকো না কেন। আসলে সেই সত্ত্বা তো চিরন্তন, চিরনবীন, আবার চির-পুরাতন। আর এই সত্যকে উপলব্ধি করবার জন্য প্রয়াস করো, যে সবার মধ্যেই "আমিই" আছি। আমি মরে গেলে জগৎ/সংসার বলে কিছুই থাকবে না। আমি মরে গেলে জাত-ধর্ম বলে কিছু থাকবে না। আমি মরে গেলে ঈশ্বর/আল্লা বা আত্মা বলে কিছুই থাকবে না। এই "আমির" সুরক্ষা করো। নিজে বাঁচো, আবার অপরকে বাঁচতে দাও। এতে করে তোমার মধ্যে থেকে ভয় দূর হয়ে যাবে, হিংসা দূর হয়ে যাবে, বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। কেননা, তখন জগৎ আমিতে পরিপূর্ন, আমি ভিন্ন কিছু নেই। তো আমি আমার সঙ্গে কিভাবে দ্বন্দে লিপ্ত হবো ?
-----