Thursday, 26 September 2019

ভগবান যখন মানুষকে মারে


ঈশ্বর সম্পর্কে কতকগুলো মৌলিক প্রশ্ন ও তার জবাব।

ভগবান যখন মানুষকে মারে, তখন, মানুষ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ যখন মানুষকে মারে, তখন ভগবান মানুষকে বাঁচাতে পারে না। কেন এমন হয় ? এই প্রসঙ্গে আপনাদের সবার জানা  একটা গল্প বলি। ভগবান বুদ্ধ তখন শ্রাবন্তি নগরে বর্ষা যাপন করছেন। কিসা গৌতমী নামে এক পুত্র-শোকাতুরা মা কাঁদতে কাঁদতে তার পায়ে পড়লো। সে শুনেছে, বুদ্ধ স্বয়ং ভগবান। মানুষের জ্বরা-ব্যাধি-মৃত্যুর দুঃখ মোচন করবার জন্য, তিনি অবতীর্ন হয়েছেন। বুদ্ধের পাদুটো চেপে ধরে, আর্তি জানাতে লাগলো, তার মৃত একমাত্র সন্তানকে বাঁচানোর জন্য। হাজার হাজার লোক তার পেছনে ছুটছে। নিশ্চয় তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। মায়ের কান্না থামছে না দেখে, বুদ্ধ তাকে হাত ধরে তুললেন। বললেন, মা আমি তোমার সন্তানকে বাঁচাতে পারি।  কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে। যে বাড়িতে কেউ কখনো মারা যায়নি, শোকের ছায়া পড়েনি, সেই বাড়ি থেকে একমুঠ সর্যে এনে দিতে হবে। নয়নের জল মুছে, শোকাতুর নারী ছুটলো, বাড়ি বাড়ি একমুঠো সর্ষের জন্য। কিন্তু হায়, এমন কোনো বাড়ি সে খুঁজে পেল না, যে বাড়িতে কেউ কখনো মারা যায় নি।  শোকের ছায়া পড়ে  নি। আসলে বিশ্বসংসারে সবারই একই দশা।  মৃত্যু শোক মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ভগবান এসে সেই শোকে শান্তি বাড়ি ছেটান মাত্র। নিয়তিকে রোধ করতে পারেন না। মরা মানুষ কখনো বেঁচে উঠতে পারে না। 
মানুষ তো ছাড়,  দেবাদি দেব মহাদেব হিন্দুদের মতে সংহারকর্তা।  অর্থাৎ সমস্ত সংহারের দায়িত্ত্ব নাকি তার। তো তার স্ত্রী, স্বয়ং মহামায়ার অংশ দেবী সতী, স্বামীর অপমান সহ্য না করতে পেরে, দেহ ত্যাগ করলেন। স্বয়ং মহাদেব, সতীর মৃতদেহ নিয়ে সারাবিশ্বে উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারলেন না।
মহাত্মা ভীষ্ম মৃত্যুর আগে খেদের সঙ্গে বলেছিলেন,  স্বয়ং ভগবান যাদের নিত্যসঙ্গী, সেই পাণ্ডবদের দুঃখের শেষ নেই। ভগবানের লীলা বোঝা বড় দায়। 
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কি সেই শক্তি যা স্বয়ং মহাদেবকে কষ্ট  দেয়।  কি সেই শক্তি যা ভগবানের সাথী, পান্ডবদের কষ্ট দেয় ? এমনকি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার অর্থাৎ সৃষ্টির পালনকর্তা শ্রীকৃষ্ণকে জন্ম থেকে শুরু করে, মৃত্যু পর্যন্ত কষ্ট দেয় ?
প্রশ্ন জাগে, ভালো থাকার জন্য,ঈশ্বরকে খোজা কি নিরর্থক ? এই কথাটা, যারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস  করেন , তাদের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি যারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন  না তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যারা বিশ্বাস  করেন , যে ঈশ্বর বলে কিছু নেই, তারা কেন ঈশ্বরকে খুঁজতে যাবেন  ? আর যারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন  তারা এর মধ্যে জেনে গেছে যে ঈশ্বর অব্যক্ত। তাহলে তাকে যত  খোঁজ না কেন, তার সন্ধান কেউ পাবে না।ঈশ্বর অকর্তা, টি নিজে থেকে কিছু করতেই পারেন না।  এর পরে, আমরা ভাবতাম,ঈশ্বর সর্ব্বশক্তিমান।  তিনি সব কিছু করতে পারেন। তো  ঈশ্বর যদি সর্ব্বশক্তিমান না হন, তবে সেই মঙ্গলময় ঈশ্বরকে খোজ করে আমাদের কি লাভ ?  

এসব কথা বুঝতে গেলে আমাদের ঈশ্বরকে বুঝতে হবে। তার ক্রিয়াপদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। হিন্দুরা  বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর এক,  কিন্তু তিনি তিন মূর্তিতে কর্ম করেন।  আর তা হচ্ছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব। অর্থাৎ  একজন সৃজন করেন, একজন পালন করেন, একজন ধ্বংস করেন। 
এই যে বিচিত্র জগৎ আমাদের চোখের সামনে বা চোখের অন্তরালে বর্তমান, তার নিশ্চয় একজন নির্মাতা আছেন। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব স্বীকার করতে হয়। কিন্তু তিনি যে ঈশ্বর তার কোনো প্রমান নেই। আর  আমি যাকে দেখি নাই, সে আছে বা নেই দুটোই হতে পারে। যদি আমরা তর্কের খাতিরে ধরে নেই, যে ঈশ্বর আছেন, তাহলে প্রশ্ন জাগে ঈশ্বরের প্রকৃতি কি প্রকার ? ঈশ্বর বিশ্বাসীরা বলেন, ঈশ্বরের ইচ্ছাতে জগতের সৃষ্টি হয়েছে।  কেউ কেউ বলে থাকেন,   এসব কথা কাল্পনিক, এর কোনো প্রমান নেই। আর এর সত্যতা জানবার উপায় ও আমাদের জানা নেই। তাহলে এটা ধরে নিতে পারি, ঈশ্বর যদি থেকেও থাকেন, তিনি অজ্ঞেয়। ঈশ্বরবাদীরা ঈশ্বরের তিনটি গুনের কথা বলে থাকেন, সৎ-চিৎ-আনন্দম। কেউ বলেন, শক্তি-জ্ঞান-দয়া। কেউ বলেন, সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ। কেউ বলেন,ঈশ্বরের গুন্ অনন্ত।  কেউ বলেন, ঈশ্বর সর্ব্বশক্তিমান, ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, তিনি দয়াময়। কেউ বলেন, ঈশ্বর অকর্তা, তিনি কিছু করেন না। তার শক্তি হচ্ছে প্রকৃতি আর এই  প্রকৃতিই  সমস্ত কিছু করেন। তো যিনি ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে সব কিছু করতে পারেন, তার আবার এত কায়দা কলমের কি দরকার। তার প্রকৃতিরই বা কি দরকার ? যিনি ইচ্ছে করলেই সব করতে পারেন, তার আবার কারুর সাহায্যের   দরকার পড়ে নাকি ? 
দেখুন, নির্মাতা আর সৃষ্টিকর্তা এক নয়। রাজমিস্ত্রি বাড়ি তৈরি করতে পারেন। রাজমিস্ত্রি বাড়ি সৃষ্টি করতে পারেন না। তো সৃষ্টিকর্তার কারুর সাহায্যের প্রয়োজন নেই, কিন্তু নির্মাতার বস্তুর সাহায্যের এবং  কৌশলের বা প্রযুক্তি বিদ্যার  প্রয়োজন। মানুষের দেহে দেখুন, কত কলা-কৌশল,  এবং তা নির্মাণে কত শক্তি ব্যয় হয়েছে, তাকে রক্ষার জন্য কত শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। এর পরেও দেখুন, শরীর বেশিদিন থাকে না। এত কায়দা করে, শক্তি ক্ষয় কোরে, যে মনুষ্য দেহ ঈশ্বর বানিয়েছেন, কিছু দিন পরেই তা বিনষ্ট হয়ে যায়। তার মানে আমরা ধরে নিতে পারি, আমাদের নির্মাণকর্তা  সর্ব্বশক্তিমান নয়।  তা যদি হতো তিনি এমন মানুষ তৈরি করতে পারতেন, যা চিরস্থায়ী। তা তিনি পারেন না। তাহলে এটা বলা যেতে পারে, তিনি সর্ব্বশক্তিমান নয়।  তার কোনো একটা বিরুদ্ধ শক্তি আছে। আমি পাহাড় উল্টে ফেলতে পারি না। কারন মাধ্যাকর্ষন শক্তি আমাকে বাধা দেয়।  আমি আকাশে উড়তে পারি না, কারন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আমাদে টেনে আনে। অতএব, প্রকৃতিকে   নির্মাণকারী বলা যেতে পারে।  কিন্তু স্রষ্টা  বলা যেতে পারে না। 

বলা হয়ে থাকে, ঈশ্বর সর্বজ্ঞ। ঈশ্বর যদি সর্বজ্ঞ হতেন তবে তার নির্মাণের ত্রূটি  তিনি ধরতে পারতেন।একটা আসুরিক শক্তি আছে, যাকে  তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। যাকে বলা হয়ে থাকে অদৃষ্ট, অর্থাৎ যা দেখা যায় না। অর্থাৎ ঈশ্বরও তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। শিবকে বলা হয়ে থাকে সংহার কর্তা। সেই  শিবের স্ত্রী সতী দেহত্যাগ করলে, স্বয়ং মহাদেবও তাকে বাঁচাতে পারেন নি।  তাই কেউ কেউ বলেন এই অদৃস্ট শক্তিই জগতের অনিষ্টের কারন। তাকে রোধ স্বয়ংঈশ্বর ও করতে পারেন না। জীবের অশেষ কষ্ট, সব সময় সে অবিরত দুঃখ কষ্ট  ভোগ করছে। আসলে জীবের কাজ হচ্ছে, সারাজীবন ধরে, কেবল দুঃখ মোচনের চেষ্টা  করা। একটা জিনিস ভাবুনতো, ঈশ্বর তো মঙ্গলময়। তবে তারই সৃষ্ট জগতে এত অমঙ্গল কেন ? তা হলে ধরে নিতে হয়, হয় ঈশ্বর মঙ্গলময় নয়। নতুবা জীব ভালো থাকুন, তা তিনি চান না। 
এর উত্তরে কেউ কেউ বলে থাকেন, ঈশ্বর দয়াময় মানে এই নয় যে তিনি সব সময় মানুষকে সুখে রাখবেন, তিনি আসলে মানুষকে ধর্মপথে চালিত করতে চান। তাই দুঃখের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তিনি শোধন করে নেন। তবে এই উত্তরে বলি, সুখ-দুঃখ কিন্তু ধার্মিক ও অধার্মিক সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ধার্মিক ব্যক্তি সুখে আছেন , আর অধার্মিক ব্যক্তি দুঃখে আছেন, এমন তো নয়।  ধার্মিক ব্যক্তির যেমন দুঃখ আছে, আবার অধার্মিক ব্যক্তির সুখ আছে।  এসব আমরা চোখের  সামনে দেখতে পাচ্ছি। যদি ধর্মের শাসনে সংসার চলতো, তবে অধার্মিক সব সময় দুঃখী থাকতো, আর ধার্মিক সবসময় সুখে থাকতো।  তা তো নয়। এর উত্তরে, আবার তারা বলেন, দুস্কৃতিকারী পরলোকে গিয়ে দুঃখ ভোগ করে। আর সুকৃতিকারী পরলোকে  গিয়ে পরম-আনন্দে থাকেন। দেখুন, মানুষ শুধু নিজের কর্মদোষে কষ্ট  পায়  তা নয়,  পরিবার-সমাজ-জাতি-দেশ-প্রকৃতি - এদের জন্যও মানুষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে। তাহলে মানুষ নিজে ,  ধার্মিক হলেই ভালো থাকে, তা কিন্তু নয়। এইজন্য, একথা বলা যেতে পারে, ধর্ম-অধর্ম যাই বলুন না কেন, দুটো শক্তি এই সৃষ্টির পিছনে কাজ করছে। শুভ-অশুভ, সুর-অসুর, দেবতা-দানব। তার মানে একটা শক্তি মঙ্গলময়, আর একটা শক্তি অমঙ্গলের। আর দুইয়ে মিলে সৃষ্টি চলছে। 
এইজন্য, পন্ডিতগণ বলছেন, এই জগতের যেমন নির্মাণ  কর্তা আছেন, তেমনি আছেন পালনকর্তা, আবার সংহার কর্তাও   আছেন। এই তিন শক্তি জগৎ পরিচালনা করছেন। তাই জগতে জন্ম-জীবন-মৃত্যু একসাথে ক্রিয়া করছে। এইখানে খেয়াল করুন ব্যাপারটা। ঈশ্বর নিরাকার। কিন্তু যখন তিনি ক্রিয়া শুরু করেন, তখন তিনি রূপ পরিগ্রহ করেন, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের রূপ আছে, বা যদি ধরেও নেই, যে এগুলো কাল্পনিক রূপ। তাহলেও সত্য হচ্ছে দেহ ভিন্ন কর্ম সম্পাদন করা যায় না। ঈশ্বর যখন কাজ করতে চান, তখন তিনি মায়ার আশ্রয় নেন। রূপের আশ্রয় নেন। যাকে আমরা বলি জীব। আর ঈশ্বর যখন প্রকৃতির আশ্রয় নেন, তখন তিনি প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য থাকেন। এই প্রকৃতির নিয়ম তারই সৃষ্ট। তারই সৃষ্ট নিয়মে তিনি আবদ্ধ হয়ে যান। নিরাকার ঈশ্বর কখনো মানুষকে সাহায্য করতে পারেন না। যখনই তিনি জীবকে সাহায্যের কথা মনে ভাবেন, তখন তাকে রূপ পরিগ্রহ করতে হয়। রামপ্রসাদকে সাহায্য করবার জন্য তিনি তার মেয়ের রূপ নেন। বা মেয়ের মধ্যে আসেন। মানুষ যখন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে কিছু পাবার জন্য, তখন ভগবান মানুষের রূপ ধরেই তাকে সাহায্য করেন। সুরদাসের বাড়িতে যখন অন্নের অভাব, তখন দুটো বাচ্চা এসে খাবার দিয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে দিয়ে, ভগবান মানুষকে ভালোবাসেন, কষ্ট  দেন, সাহায্য করেন। মানুষ যখন মানুষকে মারে, আমরা ভাবি, মানুষ মানুষকে মারছে। আসলে ঈশ্বর ঈশ্বরকে মারছে। তিনিই ভোক্তা, তিনিই ভোগ । তিনিই দ্রষ্টা, তিনিই দৃশ্য।  
বিজ্ঞান বলছে, ভৌতিক বস্তুর সমাহারে জীবের নির্মাণ। সৃষ্টি আসলে কালের উর্দ্ধে। সৃষ্টি বলে কিছু হয় না। যা কিছু হয়, তা হলো নির্মাণ। কলসি কুম্ভকার তৈরি করে, জল-মাটি-আগুন-বায়ু-আকাশ, অর্থাৎ যা দিয়ে কলসি তৈরি হয়েছে, তা কুম্ভকার নির্মাণ করে নি। এগুলো আগে থেকেই ছিল। ছিলোনা শুধু সমাহার।  কুম্ভকার এই কাজটা করছেন মাত্র। কেউ কিছু সৃষ্টি  করতে পারে না। সমাহার করতে পারে মাত্র। একত্রীকরণ করতে পারে মাত্র।  তাই নির্মাতার ইচ্ছে অনুযায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। সৃষ্টি বলে কিছু হয় না। আর সৃষ্টি বলে যদি কিছু না হয়, তবে স্রষ্টা বলেও কিছু হতে পারে না। ঈশ্বর আমাদের কল্পনা বিলাস মাত্র।  
সেইদিক থেকে  বলা যেতে পারে, জগৎ একটা নিয়মের ফল মাত্র। জন্ম জাগতিক নিয়মের ফলে হচ্ছে, রক্ষা জাগতিক নিয়মের ফলে হচ্ছে, আবার ধংশও সেই জাগতিক নিয়মের ফলে সংগঠিত হচ্ছে। এখন এই নিয়মের স্রষ্টা, নিয়মের রক্ষা, নিয়মের পালনের নিয়ন্তা যিনি তাকেই আমরা ঈশ্বর বলতে পারি। বা স্রষ্টা বলতে পারি।  জগতের স্রষ্টা  নয়, নিয়মের স্রষ্টা । 
যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সংযোজন হয়, সেই একই রাসায়নিক বিক্রিয়াতেই রক্ষা হয়, আবার একই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলেই বিলুপ্তি হয়। যে অম্লজানের সংযোগে  জীবের দেহ গঠিত হয়েছিল, পরিপুষ্ট হয়েছিল, শেষদিনে সেই অম্লজানের সংয়োগেই তা বিনষ্ট হয়ে যাবে। অতয়েব পালনকর্তা-রক্ষাকর্তা আর সংহারকর্তা একই। 
এখন কথা হচ্ছে, সৃজন-পালন একই কর্তার কাজ এটা মেনে নিলেও সংহারকর্তা একই, অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গলের কর্তা  একই এটা মেনে নেওয়া সহজ নয়। আর স্রষ্টা যদি তার সৃষ্টিকে রক্ষা করতে না পারেন, তবে তাকে সৃষ্টি করতে যাবেন কেন ? আর একটা জিনিস দেখুন, জীবের দ্বারা জীবের সৃষ্টি হচ্ছে। জীব ভিন্ন জীবের সৃষ্টি  হচ্ছে না। আকাশ থেকে কেউ নেবে আসে না। আবার অসংখ্য সম্ভাবনাময় বীজ অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। তাহলে কি ধরে নিতে পারি, সৃষ্টিকর্তার থেকে সংহার কর্তার শক্তি বেশী ? অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা যখন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বীজের প্রেরণ করলেন, সম্ভাবনাময় সেই বীজ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেললেন, সংহার কর্তা। জীবের সাহায্য ছাড়াই সংহারকর্তা সবাইকে সংহার করতে পারেন, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা জীবের সাহায্য ছাড়া জীব সৃষ্টি করতে পারেন না। তাহলে কি সংহার কর্তা অধিক শক্তিশালী ? আমরা শ্রীকৃষ্ণকে  ঈশ্বর বলে মানি, বা ঈশ্বরের অবতার  হিসেবে মানি, এই ভগবানের অবতারদেরকেও  আমরা দেখেছি, অশুভ শক্তির দ্বারা পদে পদে অপদস্থ হতে। কখনো কখনো পরাজিত  হতে, অন্ততঃ পৌরাণিক কাহিনীতে এমনটাই লেখা। ভীষ্ম যার জন্য, বলেছিলেন, স্বয়ং ভগবান যাদের সহায়, তারা প্রতি পদে অপদস্থ হচ্ছে, অশেষ কষ্ট পাচ্ছে। এর পেছনে কোনো যুক্তি না পেয়ে, বলেছিলেন - ভগবানের লীলা বোঝা দায়। 
মানুষ যখন মানুষকে মারে, বা জীব যখন আর একটা জীবকে মারে, তখন তার শরীরটাকে মারে, শরীরের অঙ্গগুলোকে ক্ষতবিক্ষত করে। ভগবান তো শরীর তৈরি করেন নি। শরীর আমাদের প্রকৃতির দান। আর প্রকৃতিপ্রদত্ত সমাহার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, মানুষই পারে জোড়া লাগাতে, অর্থাৎ প্রকৃতিই পারে জোড়া লাগাতে। তাই আমাদের শরীরের মধ্যেই আছে, নিরাময়ের শক্তি ।  ঈশ্বর এসবের উর্দ্ধে। ঈশ্বর স্রষ্টা, আর প্রকৃতি নির্মাতা। প্রকৃতি নিয়মে আবদ্ধ। ঈশ্বর নিয়মের উর্দ্ধে। 
আসলে সংহার বা শেষ বলে কিছু হয় না। সংহার উন্নতির সোপান। সতী আবার জন্ম নেয় পার্বতী হয়ে।আসলে এটি একটি যাত্রা।   কষ্ট মানুষকে সঠিক পথ দেখায়।কামার লোহাকে গরম করে, দমাদম হাতুরি  দিয়ে পেটায়। নিজের ইচ্ছে মতো জিনিষ তৈরী করবার জন্য।  পছন্দ না হলে আবার তাকে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ঢোকায়।   ভগবানের ইচ্ছে জগতের উন্নতি, জীবের উন্নতি । ঈশ্বরের সংহার শক্তি তাই শক্তিশালী। সংহার অশুভ নয়, সংহার শোধন প্রক্রিয়া মাত্র । সব শেষে একটা কাহিনী দিয়ে শেষ করবো। গুরুনানক একবার পরিব্রাজন করতে করতে এক গরিবের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেই বাড়ির কর্তা  ছিলেন, রাজকর্মচারী। রাজার বাড়িতে কাজ করতেন। রাজার   অনেক হাতি, ঘোড়া, গরু ছিল।  সেই হাতিশালে হাতিদের পরিচর্য্যা  করতেন। তো সেই সময় একটা হাতি প্রাণত্যাগ করলো। লোকটি আতঙ্কিত হলো, কান্নাকাটি জুড়লো,এবার তার চাকরি যাবে। হাতি মারা গেছে। নানক-এর কাছে সংবাদ গেলো। নানক বললেন, কোথায় সেই হাতি, তার কাছে আমাকে নিয়ে চলো। হাতির কাছে গিয়ে, নানক হাতির কানে কানে কি বললেন, হাতিটি অমনি সোজা হয়ে বসলো। রাজার কাছে, এই সম্বাদ পৌছালো। রাজা নানককে দেখতে এলেন। রাজা নানককে বললেন, আপনি মরা হাতিকে জ্যান্ত করতে পারেন ? নানক  মুচকি হাসলো। রাজা বললেন, আপনি আবার হাতিটিকে মারুন তো দেখি। তখন নানক আবার হাতিটিকে কানে কানে কি বললেন, আর হাতিটি মরে  গেল। রাজা বললেন, এবার বাঁচান তো দেখি। নানক বললেন, ভগবান  যখন জীবকে মারেন , তখন তাকে বাঁচানো যায়। কিন্তু জীব যখন জীবকে মারে তখন তাকে বাঁচানো  যায় না। 
মানুষ যখন নিজেকে মারতে চায়, তখন তাকে বাঁচায় কার সাধ্যি।       

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ - হরি ওম।  



   

বঙ্কিমের বাঁকা কথা :

আমাদের বঙ্কিম হরিদাস বাবাজিকে ভালোও বসে আবার তাকে বিরক্ত করতে ছাড়ে  না। মাঝে মাঝে বাবাজিকে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করে বিব্রত করে তোলে। তো বঙ্কিম নবমী পূজার দিন বাবাজিকে খুঁজে পাচ্ছে না। বাবাজি হয়তো হরিনাম করে ভিক্ষে করে বেড়াচ্ছে। নামের বিনিময়ে চাল জোগাড় করে বেড়াচ্ছে। বদান্যতা আর কি। অমূল্য হরিনাম শুধু দুটো চালের বিনিময়ে বিতরণ করে দিচ্ছেন।শেষমেশ বাবাজিকে এক পূজাবাড়িতে প্রসাদ নিতে দেখতে পেলো। দেখে বঙ্কিমের বাঁকামন জাগ্রত হয়ে উঠলো।

বঙ্কিম - বৈষ্ণব বাবাজি দেখছি শক্তিদেবীর প্রসাদ ভক্ষণ করছেন ? বা বা প্রভুর ক্ষুধার সময় ধর্মের উদারতা বৃদ্ধি পায়  দেখছি।

বাবাজি : কেন একথা বলছো বঙ্কিম ?

বঙ্কিম : না বলছিলাম, শক্তির প্রসাদে বৈষ্ণবের সেবা ?
- তাতে দোষ কি ?

বঙ্কিম - কৃষ্ণের উপাসক, প্রসাদ খাবে শক্তি পুজোর  ?
- শক্তিটা কে, শক্তিটা কি জানো তুমি ?
বঙ্কিম - জানবো  না কেন।  দেবতার স্ত্রীকে বলে শক্তি।  দেবতার শক্তি। নারায়ণের শক্তি লক্ষ্মী, শিবের শক্তি দূর্গা, ব্রহ্মার শক্তি ব্রহ্মাণী।
-  দূর হয় পাপিষ্ঠ। তো মুখ দেখে প্রসাদ খেলে প্রসাদ পন্ড হয়ে যাবে। দেবতা কি তোর মতো বৈষ্ণবী নিয়ে ঘরকন্না করে নাকি ? দূর হ।

বঙ্কিম - তবে শক্তি কি ?
- এই ঘটির জলটা তোল তো  দেখি। - বঙ্কিম  ঘটির জল তুললো। - এই জলের জালাটা তোলতো দেখি।
বঙ্কিম - তাও কি পারা  যায় ?
-ঘটি তোলার শক্তি আছে,  তোলার শক্তি নেই।

Sunday, 15 September 2019

গায়ত্রী ও মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র

সাফল্যের চাবি

গায়ত্রী ও মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র 

ॐ त्रयम्बकं यजामहे सुगन्धिं पुस्टिबरधनं ।
ऊर्बारुक्मिब बन्धनान मृत्युर्मुक्षीय मामृतात।।


ওঁং ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্ । 
উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যুর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।

 হে ভগবন, পার্বতীবল্লভে, আপনি ত্রিনেত্র ও সুগন্ধিযুক্ত।  ভক্তদের আপনি পুষ্টি বর্ধন করেন। আমরা আপনার পূজা করি। কর্কটি (ফুটি) ফল পাকলে যেমন অনাসায়ে খসে পড়ে, তেমনি আমরা যেন মৃত্যুর পর সহজেই মুক্ত হই, মোক্ষ হতে যেন বিযুক্ত না হই।

এই মন্ত্রের একটা বাঁধন আছে। সেই বাঁধন  দিয়ে মন্ত্রটি হবে এই রকম। 

মহা-মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র

ওঁং হৌং জূং স্বঃ ওঁং ভূর্ভূবঃ স্বাঃ
ওঁং  ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টি বর্ধনম। 
উর্ব্বারুক্মিব বন্ধনান্ মৃত্যুর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।
ওম্ স্বাহা ভুবঃ ভূঃ ওম্ স্বঃ জূং হৌং ওঁং 


গায়ত্রী মন্ত্র

ॐ भुर्भुब स्वः। ॐ  ततसबिटुर बरेण्यं ।
भर्गो देबष्य धीमहि। धियो यो नः प्रोचोदयात ॐ ।। 

ওঁং ভূর্ভুবঃ স্বঃ।   তৎসবিতুর্বরেন্যং। 
ভর্গো দেবস্য ধীমহি। 
ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ ।
 হে (ভূঃ-ভূবঃ-স্বঃ) ত্রিলোকেশ্বর ! সবিতাদেবের পরব্রহ্মাত্মক সেই বরণীয় তেজকে আমরা ধ্যান করি। সেই সবিতা আমাদের বুদ্ধি-বৃত্তিকে প্রেরিত করুন।

এই মন্ত্রেরও  একটা বাঁধন আছে। সেই বাঁধন  দিয়ে মন্ত্রটি হবে এই রকম। 

  ওঁং ভূর্ভুবঃ স্বঃ। ওঁং  তৎসবিতুর্বরেন্যং। 
ভর্গো দেবস্য ধীমহি। 
ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ ওঁং।


ভোরবেলা সূর্যোদয়ের দেড় ঘন্টা আগে উঠে পড়ুন। আধা ঘন্টার মধ্যে বাহ্যক্রিয়া সম্পন্ন করুন। হাতে, পায়ে, চোখে, মুখে ভালো করে জলের ছিটে  দিন। এর  পর একটা নির্দিষ্ট কম্বলের আসনে মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন, নিচে না বসতে পারলে চেয়ারে বসুন।  চেয়ারে কম্বল বিছিয়ে নিন । পা-টা মাটিতে না রেখে কম্বল বা কাঠের উপরে রাখুন। সূর্যোদয়ের ঠিক একঘন্টা আগে থেকে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠ করুন। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগে মহামৃত্যুঞ্জয় পাঠ শেষ করুন।পাঁচ/দশ মিনিট চুপচাপ বসে থাকুন। এরপর আবার একঘন্টা গায়েত্রী মন্ত্র অর্থাৎ সূর্যোদয়ের থেকে একঘন্টা গায়েত্রী মন্ত্র পাঠ করুন। এটি আপনি মাত্র সাতদিন করুন। সোমবার থেকে শুরু করুন। রোববার অবধি করুন। তারপর আপনার অভিজ্ঞতা এখানে লিখে জানান।  
















Saturday, 14 September 2019

ইচ্ছামৃত্যু - আমরা কি আমাদের মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে পারি ?

ইচ্ছামৃত্যু


আমরা কি আমাদের মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে পারি ?

যার জন্ম আছে তার মৃত্যুও আছে।  হাজার সাধ্য-সাধনা করেও কেউ অমরত্ত্বের বর লাভ করতে পারেনি।   এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ইচ্ছে করলে কি আমরা আমাদের মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারি ? আমাদের কি ইচ্ছামৃত্যু সম্ভব ? না আমি আত্মহত্যার কথা বলছি না। আত্মহত্যা যে করা যায়, অর্থাৎ যেকোনো সময় যে আমি নিজেকে মেরে ফেলতে পারি, সেটা তো আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। কিন্তু আমরা কি আমাদের মৃত্যুকে কিছু দিনের জন্য হলেও পিছিয়ে দিতে পারি।

আমরা মহাভারতে পড়েছি, মহাত্মা ভীষ্ম যখন যুদ্ধক্ষেত্রে শর-শয্যায় শায়িত হলেন,  তখন দক্ষিণায়ন চলছে। মহাত্মা ভীষ্ম দক্ষিণায়নে দেহত্যাগ করতে চান নি। উত্তরায়নের অপেক্ষায় নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অচেতন অবস্থায় নয়, সচেতন ভাবেই তিনি বেঁচে ছিলেন। আর এই সময় যুধিষ্ঠিরকে যে  আপ্তবাক্য শুনিয়েছিলেন,তা  আমাদের কাছে চিরস্বরণীয় হয়ে আছে।

এতো গেলো পূরাণের কথা।  কিন্তু আমরা মহাযোগী গোরক্ষনাথের কথা শুনেছি। এই মহাযোগী নাকি মৃত্যুর সময়  বলেছিলেন, এই দেহ ছাড়ার  পরে আমি সিদ্ধ দেহে অবস্থান করবো, তোমরা আমার দর্শন পাবে, সাহায্য পাবে। এই বলে মন্দির কক্ষে প্রবেশ করলেন, এবং তৎক্ষণাৎ মন্দির কক্ষ এক স্বর্গীয় সুগন্ধে ও স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে। উপস্থিত শিষ্যরা নাকি দেখেছিলো, গোরক্ষনাথের স্থূল দেহ, একটা শুভ্র জ্যোতিমণ্ডলে পরিণত হয়ে গেছে।  এবং খানিক্ষন পরে, তার লোকত্তর সিদ্ধ দেহ উর্ধাকাশে মিলিয়ে যায়। এসব কি গল্পকথা, নাকি এর মধ্যে সত্যতা আছে ?
  
আমরা আদিগুরু শঙ্করাচার্য্যের কথা শুনেছি, তার গুরুদেব ছিলেন, মহাত্মা গোবিন্দপাদ।  তিনি নাকি আসলে মহর্ষি পতঞ্জলি। আর এই মহর্ষি পতঞ্জলি হাজার হাজার বছর  ধরে অপেক্ষা করছিলেন, নর্মদা নদির তীরে, একটা গুহার মধ্যে,  আচার্য্য শঙ্করকে দীক্ষা দেবার জন্য।

আমরা বাবাজির নাম শুনেছি।  যিনি কয়েক'শ  বছর অপেক্ষা করেছিলেন, শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে দীক্ষা দেবার জন্য। বাবাজি নাকি শ্যামাচরণ লাহিড়ীর আগের জীবনের গুরুও  ছিলেন।

আমরা যোগাচার্য্য শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতীর কথা শুনেছি।  তিনি বলেছিলেন, যোগীদের ইচ্ছামৃত্যু হয়।

ভারতবর্ষে হাজার হাজার মহাপুরুষ ছিলেন, এমনকি এখনো হয়তো আছেন, যারা ইচ্ছামৃত্যু বরন করতে পারেন, বা করে থাকেন ।

এখন কথা হচ্ছে এটা কি আদৌ সম্ভব। দেখুন এই ব্যাপারটা বুঝতে গেলে আমাদের প্রাণত্যাগের বা মৃত্যু প্রক্রিয়াটা ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর এটাও আমাদের বুঝতে হবে, আমার অর্থাৎ আত্মার কিন্তু মৃত্যু নেই।  কেবল মাত্র স্থূল শরীরের মৃত্যু। আসলে মৃত্যু হয় আমাদের দুটো শরীরের, সেটা হচ্ছে, অন্নময় ও প্রাণময় শরীরের। এর মধ্যে একটা হচ্ছে স্থুল (অনন্ময়) আর একটা হচ্ছে সূক্ষ্ম (প্রাণময়) . বাকি যে শরীর  অর্থাৎ মনময়, বিজ্ঞানময়, ও আনন্দময় শরীরের কিন্তু এক্ষুনি মৃত্যু হচ্ছে না। সে যাই হোক, আমরা যাকে  মৃত্যু বলতে বুঝি, অর্থাৎ আমাদের দেহের মৃত্যু, সেটা কি ভাবে সংগঠিত হয় ?

মৃত্যুর সময় আমাদের কি হয় ? প্রথমে আমাদের খাদ্য গ্রহণ করবার ইচ্ছা চলে যায়। অর্থাৎ আমাদের অন্নময় শরীরের  ক্ষয় বৃদ্ধি হতে থাকে। আমরা জানি আমাদের শরীরে প্রতিদিন অসংখ্য কোষ  জন্মাচ্ছে, আবার প্রতিদিন অসংখ্য কোষ মারা যাচ্ছে। যতদিন কোষ জন্মের হার মৃত্যুর থেকে বেশি থাকে, ততদিন আমাদের শরীর  বৃদ্ধি পেতে থাকে। আবার ঠিক যখন উল্টোটা ঘটে অর্থাৎ যখন  আমাদের কোষের মৃত্যুর হার জন্মের থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন আমাদের শরীরের নাশ হতে থাকে । কিন্তু  এসব সত্ত্বেও, অর্থাৎ না খেয়ে, বা শুধু জল খেয়ে  মানুষ বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারে, কারন কিছু কোষ আছে, যারা সর্বাধিক ৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু এই কোষ গুলো বেঁচে থাকার জন্যও খাদ্যের প্রয়োজন। আর এই খাদ্য শুধু অন্ন নয়, এর মধ্যে আছে প্রধানত বায়ু, তারপরে অগ্নি।

আমাদের জীবন হচ্ছে শ্বাসের খেলা। শ্বাসের ক্রিয়া শুরুতে আমাদের জীবনের শুরু হয়, আবার শ্বাসের শেষে আমাদের জীবন শেষ হয়।  এই শ্বাসের মাধ্যমেই আমাদের শরীরের  সমস্ত প্রক্রিয়া চলে।  পঞ্চভূতের মধ্যে  মরুৎ অর্থাৎ বায়ু সবথেকে শক্তিশালী ও সংযোগকারী। উপনিষদে একেই  ব্রহ্ম বলে আখ্যা  দেওয়া হয়েছে।এবং প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে আত্মাও আমাদের শরীর  ছেড়ে চলে যায়।  অর্থাৎ প্রাণের সঙ্গে আত্মার একটা সংযোগ আছে।  প্রাণ আমাদের শরীরের সমস্ত জায়গায়  পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। এই বায়ুকে বা মরুৎকে  পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রাণ-অপান-সমান-উদান-ব্যান। আমাদের শরীরে প্রাণের বা বায়ুর ক্রিয়াটাকে একটু বুঝে নেই। শ্বাসের সঙ্গে আমরা যে বায়ু গ্রহণ করি, ফুসফুস এই বায়ুকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করে দেয়।  আর তা হলো :

প্রাণ - অর্থাৎ উইন্ড অফ লাইফ (wind of  life ) : এর কাজ হচ্ছে, শ্বাসগ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগ।  অর্থাৎ ফুসফুসকে পরিচালনা করা। আমরা খাবার সঙ্গে সঙ্গে যে খাবার পেটে চলে যায়, এটা এই প্রাণবায়ুর কাজ।
অপান - অর্থাৎ ইন্টেস্টিনাল ওইন্ড (intestinal wind) : এই বায়ু সাধারণত আমাদের নিম্নাঙ্গে প্রবাহিত হয়।  অর্থাৎ মলমূত্র-শুক্র এমনকি সন্তানকে নিচে নাবিয়ে আনতে  সাহায্য করে এই বায়ু।
সমান - সমান কথাটার ইংরেজি হতে পারে smooth  । অর্থাৎ যে বায়ু প্রাণ ও অপান বায়ুর ক্রিয়ার মধ্যে  একটা সমতা বজায় রাখে, তাকে বলে সমান বায়ু ।
উদান - গুট্টুরাল ওইন্ড guttural air  এই উদ্যান বায়ুর সাহায্যেই  আমরা কথা বলি। আবার এই উদ্যান বায়ুর সাহায্যে আমরা কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করতে পারি।
ব্যান - ব্যান বায়ুর সাহায্যে আমরা আমাদের সর্ব শরীরে এমনকি মস্তিষ্কে রক্ত প্রেরণ করতে পারি। এই ব্যান বায়ুর সাহায্যে আমরা রোগমুক্ত হতে পারি।

আমাদের  শরীরের শ্বাসক্রিয়া শুরু হলেতবেই  আমাদের  কৰ্মইন্দ্রিয় (বাক,পানি,পাদ, পায়ু,উপস্থ ) জ্ঞান ইন্দ্রিয় (কর্ন, চর্ম, চক্ষু, জিহবা, ও নাসিকা)  ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। শ্বাস-প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা চিন্তা করে ভগবান বোধহয়,  স্বাস প্রক্রিয়ার জন্য দুটো অঙ্গ বা দুটো ইন্দ্রিয় ব্যবহার করার ব্যবস্থা করেছেন । এই জন্য  শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো বিশ্রাম নিলেও, নিদ্রা গেলেও এই প্রাণশক্তির ক্রিয়া চলতে থাকে।  কখনই বিশ্রাম নিতে পারে না। দিন-রাত অনবড়ত  কাজ করতে থাকে। যতক্ষন এই প্রাণশক্তি প্রবাহমান থাকে ততক্ষনই আমাদের আয়ু থাকে। প্রাণ যতক্ষন কর্মক্ষম থাকে ততক্ষনই আমাদের জীবিত বলা হয়।  এই প্রাণশক্তির কাজ শেষ হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এই প্রাণের শক্তিতেই দৃষ্টি-শক্তি, এই প্রাণের শক্তিতেই শ্রবণ শক্তি, এই প্রাণের শক্তিতেই ঘ্রান শক্তি, বাক শক্তি, জ্ঞানশক্তি, পাচন  শক্তি। প্রাণের ক্রিয়া শুরুতে জীবন শুরু হয় - আবার প্রাণের ক্রিয়া শেষে জীবনের শেষ হয়। ত্রিলোকে যা কিছু বর্তমান সবই প্রাণের অন্তর্গত।

অতএব এই প্রাণক্রিয়া আমাদের স্থূল শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের মৃত্যুর সময়, আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়শক্তি সংকুচিত হতে থাকে। এবং অপানবায়ু প্রথমে আমাদের শরীর  ছেড়ে দেয়। ফলতঃ মৃত্যুকালীন সময় আমরা মল-মূত্র ত্যাগের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারাই। তার পারে ধীরে ধীরে ব্যান, উদ্যান, সমান এবং সব শেষে প্রাণবায়ু আমাদের দেহ ছেড়ে দেয়। এই প্রাণবায়ুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেতনশক্তি, বা আত্মা আমাদের স্থূল শরীর ছেড়ে দিয়ে আমাদের সংস্কারকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ তখন আমরা সাধারণ মানুষরা মনোময় দেহে অবস্থান করি। উন্নত মহাত্মারা মনময় দেহকে  ছেড়ে দেন, তারা বিজ্ঞানময় দেহে অবস্থান করেন। অর্থাৎ বাসনা-সংকল্প বিহীন অবস্থায় শুধু জ্ঞানময় জগতে  তাঁরা অবস্থান করেন।

এতো গেলো আমাদের পার্থিব শরীর  দেহত্যাগের কথা। কিন্তু আমাদের মূল যে প্রশ্ন পার্থিব দেহ ত্যাগের সময় নির্ধারণ কি আমরা নিজেরা করতে পারি? অর্থাৎ এই ত্যাগের প্রক্রিয়াকে আমরা কি পিছিয়ে দিতে পারি ? যদি পারি, তবে তা কি ভাবে সম্ভব হতে পারে ?

আমরা এতক্ষনে বুঝতে পেরেছি, জীবন হচ্ছে শ্বাসের ক্রিয়া। তো এই শ্বাস-প্রশ্বাস যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে আমাদের আয়ু আমরা নিজেরাই বর্ধিত করে নিতে  পারি। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, প্রাকৃতিক নিয়মে আমাদের শরীরের ক্ষয় হবে। এই ক্ষয়কে নিবারণ করবার কথা ক্ষমতা কারুর নেই। তবে এই ক্ষয় বৃদ্ধির মাত্রা কমানো যেতে পারে। আমরা আজ সেই আলোচনায় যাবো না। আমাদের প্রশ্ন প্রাণবায়ুকে ধরে রাখা, বা প্রাণবায়ুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা । এই শ্বাস-প্রশ্বাস এর প্রক্রিয়া করে আমাদের শরীরের একটা মূল্যবান অঙ্গ যার নাম  ফুসফুস।  অতএব  আমাদের ফুসফুসকে সবসময় সক্রিয় রাখতে হবে।  সুস্থ  সবল রাখতে হবে। তার জন্য আমাদের এই ফুসফুসের ব্যায়াম  করতে হবে। আর সেটা হচ্ছে প্রাণায়াম। আর এই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের ফুসফুস যাতে কোনো রকমে সংক্রামিত না হয়।  অর্থাৎ অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। আর এই কাজটাই করে থাকেন, আমাদের সাধু-সন্তেরা। অর্থাৎ নেশা না করা। ধোঁয়া আমাদের ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। নির্মল বাতাসের পরিবেশে নিজেকে রাখা।  এইজন্য, নির্জন পাহাড়ে থাকা ফুসফুসের জন্য ভালো।  এইবার মূল যে কাজ সেটা হচ্ছে  অনুলোম-বিলোম বা সহজ প্রাণায়াম দিয়ে শুরু করে, শেষে কুম্ভক  অভ্যাস করা।অর্থাৎ বাতাসকে একবার নিজের শরীরের মধ্যে আটকে  রাখা। আবার বাতাসকে একবার সম্পূর্ণ শরীরের বাইরে আটকে রাখা।   আমরা জানি ধ্যানের একটা প্রক্রিয়া হচ্ছে, শ্বাস-প্রশ্বাস গতিকে পর্যবেক্ষন করা, শেষে তাকে নিজের ইচ্ছে মতো নিয়ন্ত্রণ করা, এবং সব শেষে  শরীরের ভেতরে  বা বাইরে মরুৎকে  আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নিজেকে সামিল করা। এইভাবে আমরা শ্বাস প্রশ্বাস কে যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে  পারি তবে আমরা  আমাদের মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে পারি। আর একটা কথা বলি, ফুসফুসকে ভালো রাখবার জন্য, দুবেলা শঙ্খ বাজানো, ধূপের গন্ধ নেওয়া, বা সুগন্ধি ফুলের বাস নেওয়া, কাঁসর-ঘন্টার ধ্বনি শোনা - খুবই উপকারী।

এখন কথা হচ্ছে, এইসব কথা যদি সত্যি হয়, তবে তো মানুষ অমর  হয়ে যেতে পারে। না পারে না, কারন আমরা জন্মগ্রহণ করি আমাদের বাসনা পূরণের জন্য, সংকল্প সাধনের জন্য। আর স্থুল দেহ ভিন্ন আমাদের সঙ্কল্প বা বাসনা পূরণ সম্ভব সম্ভব নয়।  তো শরীর যখন আমাদের সংকল্প পূরণের অযোগ্য হয়ে যাবে। তখন আমরা অবশ্য়ই এই পার্থিব দেহ ছেড়ে অন্য দেহে চলে যেতে চাইবো। তাই আমরা কখনোই অমর হতে চাইবো না।

সব শেষে একটা কথা বলি, আমরা কি করে বুঝবো যে আমার জন্মের সময় নির্ধারিত আয়ু বাড়লো কি কমলো ? দেখুন আমি জন্মেছি, ১৯৫৪ সালের ৯-ই অক্টোবর শনিবার, সকল ছটায় । আর আমার মারা যাবার কথা ২০৩০ সালের ২০ নভেম্বর, বুধবার, দুপুরের একটু আগে।  না এটা আমার মনগড়া কথা নয়।  আমার কুষ্টিতে সেরকম লেখা আছে। তো আমার কথার সত্যতা প্রমান করবার জন্য আমাদের সবাইকে  অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

এই প্রসঙ্গে তিব্বতিবাবার একটা গল্প বলি, তিব্বতিবাবা কলকাতার এক ভক্তের গৃহে এসেছেন।  সেখানে তিনি তার গুরুদেব পরমানন্দ ঠক্কর বাবার সাধন ঐশর্য্য এবং তার দীর্ঘ আয়ুষ্কালের কথা শোনাচ্ছিলেন। বলছেন, ঠক্কর বাবার বয়স কয়েকশত বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। একথা শুনে, এক শিক্ষিত ভদ্রলোক বলে বসলেন, বাবাজি আজকের দিনে এসব কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, বরং বলবে, এসব "ঠাকুরমার ঝুলির গল্প"।একথা শুনে তিব্বতি বাবা বললেন, শুনে রাখ নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের নামই জীবন। এদুটোর ক্রিয়া বন্ধ  করার কৌশল যে জানে, সে-ই পারে জীবনের গতিকে স্তম্ভন করতে, সেই পারে শত শত বৎসর জীবিত থাকতে। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আপন-ভোলা নিরাসক্ত মনে যদি সংকল্প জেগে ওঠে, শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া যায় নিরুদ্ধ হয়ে, আর জীবনের পরিধিও হয়ে যায় বিস্তৃততর। আমার গুরুদেবের শক্তির পরিমান তোরা শালা কি বুঝবি ? (ভারতের সাধক - খন্ড - ৬ পৃষ্ঠা -১৯০)

 
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।


Sunday, 25 August 2019

মানুষের আসা যাওয়া - মৃত্যু রহস্য - (দুই ও তিন)

মানুষের আসা যাওয়া - মৃত্যু রহস্য - (দুই ও তিন)

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ন ঘটনা হচ্ছে তার জন্ম ও মৃত্যু। জন্মের আগে সে ভাবা শেখেনি, তাই জন্মের কারন নিয়ে সে ভাবে নি। কিন্তু মৃত্যুর আগে ভাবতে শিখেছে। তাই মৃত্যুর কারন নিয়ে সে ভাবে।  এক জিজ্ঞাসু একদিন আচার্য্যের  কাছে গিয়ে এই জন্ম - মৃত্যুর  রহস্য নিয়ে প্রশ্ন করে বসলো।
জিজ্ঞাসু : হে পিত  জন্ম -মৃত্যুর রহস্যঃ আমার কাছে অজানা। আপনি দয়া করে এ ব্যাপারে আমাকে জ্ঞান দান  করুন।

আচার্য্য  : দেখো মানুষের জন্ম-মৃত্যু এক গভীর রহস্য । এই রহস্য উন্মোচন করতে গেলে আমাদের মুনি ঋষিদের কথার উপর নির্ভর করতে হবে। অর্থাৎ আপ্ত বাক্যের উপর নির্ভর করতে হবে। আমি যা বলবো তার সত্যতা যাচাই করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমার কথা শোনো ও অন্তরের গভীরে অনুসন্ধান করো। পরা-বিদ্যাজ্ঞানীরা এই  রহস্যের  উন্মোচন করেছেন এই ভাবে। পরাবিদ্যা জ্ঞানীরা বলছেন :
মানুষের যে দেহটা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তা আসলে অন্ন দ্বারা গঠিত, অন্ন দ্বারাই পরিপুষ্ট। একেই আমরা স্থুল  দেহ বলি। এই দেহই  আমাদের সকল দোষ-গুনের আধার, এই ধারণা কিন্তু ঠিক নয়।মৃত্যুর পরে, আমাদের দোষ-গুন্ শেষ হয়ে গেলো, এমনটা নয়। মৃত্যুর পরেও আমাদের কর্মফল, আমাদের জ্ঞান, আমাদের স্মৃতি অর্থাৎ আমাদের সঞ্চিত দোষগুণ বা অর্জিত সংস্কার, প্রারব্ধ রূপে  আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। এসব বুঝতে গেলে আগে আমাদের দেহকে আগে বুঝতে হবে।

আমরা সবাই জানি, পঞ্চভূতের তৈরী  এই দেহ।  এই দেহ বিনষ্ট হয়ে গেলে, পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের আর একটা দেহ আছে, সেটা হচ্ছে সূক্ষ্মদেহ বা লিঙ্গদেহ। এই দেহে স্থুল কোনো উপকরণ নেই। আমাদের আবেগ, কামনা, বাসনা, প্রভৃতি সূক্ষ্ম উপকরণে এই দেহ গঠিত।

এই সূক্ষ্ম দেহের ভেতরে আছে  একটি দেহ  তার নাম মানস দেহ।

এই মানস দেহের অভ্যন্তরে অতি সূক্ষ্ম উপকরণে  তৈরী,আর একটি দেহ আছে তার নাম কারণদেহ। এটাই আমাদের মন, বুদ্ধির আধার।

জিজ্ঞাসু : তাহলে কি আমাদের দেহ একটা ফলের মতো। প্রথমে খোসা, তারপরে মাংস, তার পরে আঁটি  ?

আচার্য্য  : না পুত্র, ব্যাপারটা এমন নয়। আমাদের দেহ আসলে পঞ্চকোষের সমষ্টি।  এগুলো হচ্ছে, অন্নময় , প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময়, এবং আনন্দময়।

ধরো জলের মধ্যে একটা স্পঞ্জের বল - স্পঞ্জের বল হচ্ছে আমাদের এই স্থুলদেহ, আর স্পঞ্জের মধ্যে যে জল সেটা হচ্ছে সূক্ষ্ম দেহ, আর জলের মধ্যে যে বাতাস সেটা হচ্ছে মনোময় দেহ। বাতাসের মধ্যে যে ইথার আছে সেটা হচ্ছে বিজ্ঞানময় দেহ,  আর ইথারের মধ্যে আরো সূক্ষ্ম পদার্থ আছে তাকে বলা হয় আনন্দময় কোষ। অর্থাৎ আমাদের শরীরের সর্বত্র পরস্পরের মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে সব দেহ একত্রে অবস্থান করছে।

অন্নময় কোষ : অন্ন অর্থাৎ খাবার, অন্নময়  কোষ মানে খাবার দিয়ে  তৈরি যে কোষ রয়েছে আমাদের শরীরে।
প্রাণময় কোষ : অর্থাৎ উর্জা শরীর।  এই শরীর বায়ুর শক্তিতে তৈরী।

মনময়  কোষ : অর্থাৎ মানসিক শরীর, মনের চিন্তার জগৎ ।

এই তিন শরীরকে  ভৌতিক শরীর  বলে। অন্নময়  শরীর স্থূল।  প্রাণময় শরীর  সূক্ষ্ম  ও মনময়  শরীর অতি সূক্ষ্ম।  কিন্তু এই তিন শরীর-ই  ভৌতিক। এই তিন শরীরের উপরেই আমাদের কর্মের প্রভাব পড়বে। স্থূল শরীর  অর্থাৎ অন্নময় কোষ দ্বারা গঠিত শরীরের উপরে কর্মের ছাপ পড়বে।  তেমনি প্রাণময় ও মনময় শরীরের উপরেও কর্মের প্রভাব আছে। কর্ম-বন্ধন  এই তিন শরীরকে জুড়ে রেখেছে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, সিমেন্ট বা আঠার মতো কর্ম এই তিন শরীরকে জুড়ে রাখতে সাহায্য করে। কর্ম বন্ধন এই তিন শরীরকে জুড়ে রাখে। অর্থাৎ আমাদের কামনা বাসনা থেকে উদ্ভুত কর্ম এই শরীরকে সজীব রেখেছে।

এর পরে আছে :
বিজ্ঞানময় কোষ : এটি ভৌতিক নয় কিন্তু ভৌতিক শরীরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।

আনন্দময় কোষ :  পুরোপুরি অভৌতিক।

বিজ্ঞানময় শরীর যা আসলে অভৌতিক, এই আনন্দময় শরীরের অর্থাৎ অভৌতিক শরীর ও ভৌতিক শরীরের  সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। তার মানে বিজ্ঞানময় কোষ নিজে অভৌতিক, কিন্তু তিনি ভৌতিক ও অভৌতিক শরীরের মধ্যে সম্পর্ক জুড়ে রাখে।

ভৌতিক শরীরের রূপ বা আকার আছে। অন্নময় শরীর অতি স্থূল, তাই আমরা দেখতে পাই। প্রাণময় ও মনময় সূক্ষ্ম কিন্তু আমাদের অনুভূতির বাইরে নয়। এদুটো আসলে আউড়া বা জ্যোতি। দেখতে না পেলেও আমরা এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি।

যদি ভৌতিক শরীর নষ্ট হয়ে যায়, তবে এই বিজ্ঞানময় শরীর আনন্দময় শরীরের সঙ্গে মিশে যায় ,এবং তৎপর  আনন্দময় শরীর বিশ্বব্রমান্ডের সাথে বিলীন হয়ে যায় বা একাত্বিভূত হয়ে যায়।

ভৌতিক শরীর পঞ্চভূতের মিশ্রণ।  মৃত্যুর পরে, আমাদের ভৌতিক শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের কর্মবন্ধন, আমাদের আবার দেহধারণের জন্য উদগ্রীব হয়। ও আমরা আবার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করি। যখন আমরা কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি তখন আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে এক হয়ে যাই।  জন্মমৃত্যুর চক্রের থেকে মুক্ত হয়ে যাই। একে বলে, মুক্তি।  কেউ বলে সমাধি।

আর একটা গূঢ় কথা শোনো, আমাদের এই দেহ যা তোমার চোখে পড়ছে, এটি কিন্তু তুমি যা দেখছো, তার থেকে আকারে অনেক বড়। অর্থাৎ তোমার এই স্থূল দেহের চতুর্দিকে ১৫/১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত এর বিস্তৃত, একটা আউড়া দেহ আছে । যেটা তুমি বুঝতে পারো না। কিছুদিন, ধ্যান অভ্যাস করলে, তোমার এই আউড়া উপলব্ধি করতে পারবে। ধ্যানের  সময় এই আউড়া ঘনীভূত হয়। এবং আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এঁকে  কেউ কেউ বলেন, আতিবাহিক  দেহ। এই আতিবাহিক দেহ বা আউড়া সূক্ষ্ম ও স্থুল  দেহের সংযোগ সাধন করে। আমাদের কোনো চিন্তা, আমাদের মনের আবেগ, আমাদের বুদ্ধি, ভাবনা প্রভৃতি স্থুল দেহে প্রকাশিত হবার জন্য, এই ইথারিক দেহ, বা আউড়া বা এর মধ্যে যে  অনুকৃতি থাকে, তার সাহায্য নেয়। এটাই আমাদের অনুভূতির কারন, জীবনী শক্তির কারন, চেতনার কারন। এই ইথারিক  শরীর না থাকলে, মন, চিন্তা,বুদ্ধি, বিবেক আমাদের স্থূল দেহে প্রকাশিত হতে পারতো না। প্রত্যেক মানুষের চারদিকে, এই  বলয় বা জ্যোতির্ময় মন্ডল দেখা যায়। এবং এটা দেখলে মনে হয় একটা ডিম্বাকৃতি বলয়ের মধ্যে একটা স্থুল দেহ  ভাসছে। তুমি যখন বসে আছো. তখনও  এই আউড়া তোমাকে ঘিরে থাকে।

মানুষ যখন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে সুস্থ সবল,  থাকে তখন এই বলয়  ডিম্বাকৃতি থাকে। যদি তার অন্যথা হয়, অর্থাৎ শরীর সুস্থ না থাকে, মন ঠিক না থাকে, বা মনে কোনো ভয়, বা দুশ্চিন্তা থাকে, এমনকি মনে কোনো অশুভ ভাব থাকে, তবে এই ইথারিক শরীর কিঞ্চিৎ বক্র দেখতে লাগে। অর্থাৎ আঁকাবাঁকা লাগে। এই জ্যোতির্মণ্ডল বা ইথারিক দেহ সুক্ষ, এবং কারন, মনময়, ও প্রাণময়  দেহের উদ্ভাসিত কিরণ। এই জ্যোতির মধ্যে আবার সূক্ষ্ম দেহের জ্যোতি কিঞ্চিৎ চঞ্চল। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মনের ভাব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির বর্ণের পরিবর্তন হয়। যেমন, তোমার মনে যদি
কাম ভাব বা তুমি যদি ইন্দ্রিয় পরায়ন  হও তবে তোমার জ্যোতি গাঢ় লাল রঙের হবে। তুমি যদি স্বার্থপর হও তবে তোমার জ্যোতি বাদামি বর্ণের হবে। আবার তুমি যদি মানসিক অবসাদে ভোগো  তবে তোমার জ্যোতির রং হবে ধূসর বর্ণ। তেমনি তুমি যদি উৎকৃষ্ট মানসিকতার হও তবে তোমার জ্যোতি হবে হলুদ  রঙের। তুমি যদি ঈশ্বর ভক্ত হও তবে তোমার জ্যোতির বর্ণ হবে বেগুনি। আর তুমি যদি আধ্যাত্মিক দিক থেকে উন্নত ব্যক্তি হও তবে তামার জ্যোতির বর্ণ হবে গাঢ় নীলবর্ণ। তুমি যখন, সাধনা করতে করতে, দিব্য দৃষ্টি সম্পন্ন হবে, তবে তুমি এসব দেখতে পাবে। এগুলো কোনো কাল্পনিক ব্যাপার নয়। সাধনায় উপলব্ধ জ্ঞান।  অতএব তুমি নিশ্চই  বুঝতে পারছো, স্থূল দেহের সূক্ষ্ম অংশের নামই ইথারিক দেহ বা আউড়া  দেহ।

জিজ্ঞাসু : এতো গেল দেহের কথা। কিন্তু এই স্থুল দেহের মৃত্যুর পরে কি হয় সেটা আমাকে একটু বলুন দয়া করে।

আচার্য্য : দেখো পুত্র, আমাদের শাস্ত্রে, সাতটি লোকের উল্লেখ আছে। তুমি সেসব শুনেছো । যা  তুমি সকালবেলা প্রতিদিন,  উচ্চারণ করে থাকো।  আর সে গুলো হচ্ছে, ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ, সত্যম।  এই লোককে সপ্ত-ব্যাহৃতি বলা হয়ে থাকে। মানুষ তার স্থুল দেহ নিয়ে, এই পৃথিবী বা ভূ-লোকে বিচরণ করে থাকে। যখন তার এই স্থুল-শরীর নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে সূক্ষ্ম দেহে ভুবঃ-লোকে বাস করে। স্থুল দেহের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই অর্থাৎ বেশি হলে ৪ থেকে ৫ ঘন্টার মধ্যেই ইথারিক দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম দেহ ধারণ করে। এর পরে সাধারণত ২০/২৫ বছর পরে সূক্ষ্ম দেহ ত্যাগ করে স্বর্লোকে  অবস্থান করে। স্বর্লোকে সাধারণত এক হাজার বছরের কাছাকাছি অবস্থান করে। এই স্বর্লোক-ই মানুষের প্রকৃত বাসভূমি। এখান থেকেই মানুষ আবার পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে। এটাই স্বর্গলোক। অতিশয় উন্নত না হলে, মানুষ এই স্বর্গলোক থেকে উপরে অর্থাৎ মহঃ-জনঃ-তপঃ লোকে যেতে  পারে না। আমরা যেহেতু মানুষের আসা যাওয়া নিয়ে আলোচনা করবো, তাই এই সব লোক অর্থাৎ মহঃ-জনঃ-তপঃ এই লোকগুলো নিয়ে আপাতত আলোচনা করবো না।

জিজ্ঞাসু : হে পিত ! মানুষ কি ভাবে মারা যায় ? অর্থাৎ এক শরীর  থেকে আর এক শরীরে যাত্রা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন, দয়া করে।

আচার্য্য : দেখো তুমি যদি দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন হও তবে তুমি মানুষ কি ভাবে মারা যায়, তা তুমি দেখতে পাবে। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যুকালে, এই ইথারিক অনুকৃতি কিভাবে দেহ ত্যাগ করে, তা তুমি দেখতে পাবে। মৃত্যুমুখে পতিত মানুষের দেহ থেকে একটা অতি  বেগুনি রঙের কুয়াশা-কুন্ড ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে, ওই ব্যক্তির দেহের ন্যায় আকৃতি বিশিষ্ট হয়। এই অতি বেগুনি রঙের দেহের সঙ্গে একটা উজ্বল সুতোর মতো সংযোগকারী রেখা থাকে, যা শরীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।  কিছুক্ষনের মধ্যেই এই সংযোগকারী সুতো দেহ থেকে ছিন্ন হয়ে যায়।  মানুষের মৃত্যু হয়। এর পরে, এই বেগুনি দেহ কিছুক্ষন স্থুল মৃতদেহের কাছেই থাকে।  ঘোরাফেরা করে। হয়তো কাছে কোথাও প্রিয়জনের কাছে যায়। কোনো কোনো সময়, যে প্রিয়জন দূরে থাকে, তার কাছেও যায়। যতক্ষন দেহ থাকে, ততক্ষন এই বেগুনি দেহ স্থুলদেহকে ছেড়ে যায় না।  এমনকি, সে নানা রকম নির্দেশ দিতে থাকে। কিন্তু নিস্প্রান স্থুল দেহ কোনো নির্দেশ পালন করে না , কোনো ডাকে সারা দেয় না। এতে সে অসহায় বোধ করে। শরীরের সৎকার না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে। এর পরে সে সজ্ঞানে ভুর্বলোকে প্রবেশ করে। মৃত্যুর মুহূর্তে  অজ্ঞান থাকে , কিন্তু মৃত্যুর পরে তার জ্ঞান হয়।  শারীরিক লঘুতা অনুভব করে। মৃত্যুর আগে প্রতিদিন যেমন ঘর বাড়ি, আত্মীয়স্বজন সব দেখতে পারতেন, এখনো সবই তিনি দেখতে, শুনতে পারেন। কিন্তু কোথায় যেন ফারাক অনুভব করেন। সবই তো ঠিক আছে।  তবে সবাই শোকার্ত কেন ? কেউ আমার কথার জবাব দিচ্ছে না কেন ? আমার নিজেকে এত হালকা লাগছে কেন ? দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে আমি যাতায়াত করতে পারছি কিভাবে ।  তাহলে কি স্বপ্ন দেখছি, নাকি মারা গেছি ? এইসব  অসম্ভব সত্য তাকে উদ্বিগ্ন করে দেয়। চঞ্চল করে দেয়।  আর এই সময় তাকে সত্য বোঝাতে, এগিয়ে আসে, সূক্ষ্মলোকবাসী।  তা সে তার মৃত আত্মীয়রা হতে পারে, অথবা অন্য কোনো সত্বা  যাঁরা এই সূক্ষ্ম লোকে বাস করেন তারাও  হতে পারে।এঁরা সবাই নতুন অথিতিকে স্বাগত জানায়। উপদেশ দিতে থাকে। যাতে নতুন জগতে সে স্বাছন্দ বোধ করে।

জিজ্ঞাসু : হে পিত ! এই ভুবর্লোক  কোথায় ?

আচার্য্য : হে পুত্র ! সমস্ত লোকই, এই পৃথিবী ঘিরেই অবস্থান করছে। ভূলোক বলতে আমরা বুঝি, পৃথিবী থেকে একশত মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত বায়ুমণ্ডল-সমন্বিত স্থান। আমাদের সূক্ষ্ম  দেহ যেমন স্থুল দেহের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন লোক এই ভূ-লোকের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সমস্ত লোকই অর্থাৎ সমস্ত সূক্ষ্ম লোকই পৃথিবীর অভ্যন্তরের কিছুদূর হতে আরম্ভ করে, চন্দ্রের ভ্রমনপথ অর্থাৎ চন্দ্র যে অক্ষপথে ভ্রমন করে, সেই  পর্যন্ত বিস্তৃত। চাঁদ যখন ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর কাছাকাছি এসে পরে তখন সূক্ষ্মলোক চন্দ্রকে স্পর্শ করতে পারে। অতিশয় সূক্ষ্ম পদার্থে এই জগৎ নির্মিত। আমাদের যেমন সূক্ষ্ম দেহ আছে, বহির্জগতের সমস্ত পদার্থের সূক্ষ্ম রূপ আছে। সুতারাং এই সূক্ষ্ম জগৎ স্থুলের মতোই একই রকম।  তাই মানুষ মৃত্যুর পরে যখন এই জগতে প্রবেশ করে, তখন সে প্রথমে বুঝতেই পারে না যে সে অন্য কোথাও এসেছে।

জিজ্ঞাসু : হে আচার্য্যদেব ! সূক্ষ্মলোকবাসী মানুষের কি কোনো আকৃতি থাকে ?

আচার্য্য :  হ্যাঁ পুত্র, জীব যখন মৃত্যুর পরে, সূক্ষ্ম দেহপ্রাপ্ত হয়, তখন তার আকৃতি তার মৃত্যুর আগে যেমন ছিল তেমনই হয়। এজন্য, মানুষ মৃত্যুর পরে পরলোকে গিয়ে যখন সে তার বন্ধু, বান্ধব, মা বাবা,ভাই বোন ইত্যাদির সাক্ষাৎ পায়, তখন সে তাকে চিনতে পারে। তুমি যখন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন হবে,তখন যদি তুমি সূক্ষ্ম জগৎ পর্যবেক্ষন করো তখন তুমি এই সব ব্যক্তিদের চিনতে পারবে।
কিন্তু সূক্ষ্ম জগতের লোকেরা কখনো আমাদের এই স্থুল জগৎ দেখতে পায় না। এই স্থূল জগতের অনুরূপ আর এক সূক্ষ্ম জগৎ তার দেখতে পান মাত্র। এবং এর দ্বারা তারা আমাদেরকে দেখতে পান। কিন্তু, আমাদের সাথে কথাও বলতে চান।  কিন্তু তারা অসহায় হয়ে যান যখন দেখেন যে, তাদের কথায়  আমরা সারা দেই  না। কেন সারা দেয় না সেটা তারা বুঝতে পারে  না। আসলে জীবিত অবস্থায় আমরা যে আউড়া দ্বারা আবিষ্ট থাকি, সেই আউড়া তারা দেখতে পায়। এবং আউড়ার রং দেখেই তারা বুঝতে পারেন, আমরা সুখে আছি না দুঃখে আছি। রাত্রে আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, তখন, আমাদের সূক্ষ্ম দেহ স্থুল দেহ থেকে বেরিয়ে মৃত আত্মীয়দের সূক্ষ্ম দেহের  সাথে কথা বলতে পারি।  ভাবের আদান প্রদান করতে পারি।  কিন্তু আমরা সব সময় সে সব মনে রাখতে পারি না। আবার কখনো কখনো সেসব কথা আমাদের মনে থাকে, আমরা তখন বলি, স্বপ্নে আমি বাবাকে দেখেছি। জাগ্রত অবস্থায় এটা হয় না। অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে আমরা কখনো কখনো সূক্ষ্ম দেহে ভ্রমন করি, এই সূক্ষ্ম জগতে। আমরা যদিও জাগ্রত অবস্থায় মৃত ব্যক্তিদের দেখতে পাই না, কিন্তু মৃত ব্যক্তিরা সব সময়ই আমাদের আউড়া-দেহ দেখতে পান। এই দৃষ্টিতে দেখলে, আমরা বলতে পারি, যারা এই স্থূল দেহ ছেড়ে চলে গেছেন, তারা সব সময় আমাদের দেখছেন, আমাদের সঙ্গে আছেন। তুমি যাকে ভাবছো, মারা গেছে, সে কিন্তু তোমার সঙ্গেই আছে সব সময়। অন্তত প্রিয়জনরা সব সময় তোমার দিকে খেয়াল করছে। শুধু তাই নয়, তারাও আমাদের মতো সুখ দুঃখের অধীন। তারা যখন  স্থুল দেহে ছিলেন, ঠিক সেই মতো জ্ঞান, বুদ্ধি, স্মৃতি, এমনকি স্নেহ, ভালোবাসা, সংস্কার সবই  অক্ষুন্ন আছে। মৃত্যু আসলে, মানুষের একটা ক্রমন্নতির সোপান মাত্র।  বা বলা যেতে পারে, মৃত্যু মানে একটা উন্নতির স্তর  পেরোনো। আর একটা কথা শোনো। তুমি যখন কোনো কিছু চিন্তা করো, তার কোনো অস্তিত্ব মনের বাইরে থাকে না।  কিন্তু সূক্ষ্ম জগতে এই ভাব,একটা  মূর্তি গ্রহণ করে। আমরা যখন কোনো গভীর চিন্তা বা ভাবাবেশে থাকি তার  দ্বারা সূক্ষ্ম জগতে  একটা স্পন্দন শুরু হয়, এবং এর দ্বারা সূক্ষ্ম জগতের পরমাণু সকল ঘনীভূত হতে শুরু করে, এবং মূর্তি ধারণ করে। চিন্তার গভীরতা অনুসারে, এই সব মূর্তি স্বল্প স্থায়ী বা দীর্ঘ স্থায়ী হয় - সবল অথবা দুর্বল হয়। যাদের চিন্তাশক্তি ভীষণ গভীর, তারা চিন্তা প্রসূত ফল প্রতক্ষ্য দেখতে পান। আর একটা কথা বলি, সূক্ষ্ম জগতেও চিন্তাশীল জীব আছেন।

এতো গেল দেহ ত্যাগের কথা। কিন্তু আবার দেহ ধারণ করে কি করে ও কেন এসব নিয়ে আমরা আবার আলোচনা করবো।  কিন্তু আজ নয়।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি  ওঁং ।।

বিবেকানন্দ বলছেন, "সত্য তাদের কাছেই প্রকাশিত হয়, যারা শুধু সত্যের জন্য ভয় ত্যাগ করে, লাভালাভের চিন্তা ত্যাগ করে, সত্যের মন্দিরে উপাসনা করেন। মানুষের বুদ্ধির সচেতন প্রচেষ্টার দ্বারাই এই ব্যাপারে আলোকপ্রাপ্ত হওয়া যায়।"

আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রীর হেফাজতে একটা কৌটার মধ্যে কতকগুলো দানা  আছে।  তো আমি একদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কি ? তো আমার স্ত্রী বললেন এগুলো ফুলের বীজ।  তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা কিসের বীজ  তুমি চেনো কি করে ? আর এগুলো লাগিয়ে দিচ্ছো না কেন ? তো তিনি বললেন, প্রত্যেকটি বীজ লাগাবার একটা সময় আছে।  সময়মতো না লাগালে এর থেকে গাছ হবে না। আর তা ছাড়া, এর মধ্যে কোনো কোনো বীজ অপুষ্ট যা থেকে কোনো গাছ হবে না। সেগুলো আমাকে বেছে বার করতে হবে। আর আমি এগুলো চিনি কি করে ? এটা আমার অভিজ্ঞতার ফল। যখন এগুলো সংগ্রহ করেছি, তখন এগুলো আমি ভালো করে দেখে রেখেছি, কোন গাছে  কেমন বীজ হয়। তাই কোন বীজে কি ফুল বা ফল হবে তা আমি বুঝতে পারি।  আর কবে হবে তাও আমি জানি।

আমাদের চিন্তা হচ্ছে কর্মের বীজ। আসলে সমস্ত জিনিস আমাদের মনের মধ্যে আছে। অতীতে যা ঘটেছে, এমনকী বর্তমানে যা ঘটছে সবই আমাদের অবচেতন মনে সংস্কার আকারে সঞ্চিত হয়ে  থাকছে। আমরা যদি আমাদের অবচেতন মনের সংস্কারকে ধরতে পারি তবে সব ঘটনার আগাম খবর বলে দেওয়া যায়। আমাদের অবচেতন মনের সংস্কারকে চেতন স্তরে নিয়ে আসতে গেলে একটা কম্পন তুলতে হয়।এই কম্পন হচ্ছে মাধ্যম। চেতন ও অবচেতন মনের সংযোগের মাধ্যম।  এই কম্পনের ফলে  অবচেতন মনের সংস্কার চেতন স্তরে উদ্ভাসিত হয়। তখন আমরা ভূত ভবিষ্যৎ জানতে পারি।  এমনকি আমরা অন্যের অবচেতন মনের সংস্কারকে এই কম্পনের মাধ্যমে আমাদের চেতন স্তরে টেনে আনতে  পারি।  তখন আমরা অন্যের ভূত ভবিষ্যৎও  জানতে পারি। আর এটি তারাই পারেন, যারা মানসিক উচ্চ শক্তি সম্পন্ন, অর্থাৎ মহাত্মারা, যাদের মনের শক্তি বিশেষ ভাবে বিকাশ লাভ করেছে ।

আমরা যখন দেহ ছেড়ে অনন্তের যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি, তখন আমরা মানস দেহে অবস্থান করি। মানস দেহ অর্থাৎ আমাদের চিন্তা-ভাবনার যে মূর্তি তাকে বলে মানস দেহ। আমরা এখন জগতের তৃতীয় স্তরে আছি। অর্থাৎ স্থুল দেহে আছি। স্থুল দেহের বিনাশ হলে আমরা মানস দেহে অবস্থান করি।   অর্থাৎএই মানস দেহ আমাদের চতুর্থ স্তরের বাসিন্দা। আমরা জানি অসংখ বিন্দুর সমষ্টি দিয়ে তৈরি হয় একটা ছবি। এখন এই বিন্দুর-সমষ্টি যখন অসীমে ছাড়িয়ে পড়ে বা  কমতে থাকে তখন ছবি  অস্পষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয় স্তরে আসতে  গেলে আমাদের আবার ঘনীভূত হতে হয়। আমাদের মৃত্যুর পরে আমরা আমাদের স্পন্দন বা কম্পন  নিজের সঙ্গে নিয়ে যাই। আর এই কম্পনের গতি অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট স্তরে প্রবেশ করি। এগুলো স্বয়ংক্রিয়। তাই আমাদের চিন্তা ভাবনা জ্ঞান অনুযায়ী আমাদের মৃত্যু পরবর্তী স্থান নির্দিষ্ট  হয়।  এই সময় প্রথম দিকে  আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকি। যারা পৃথিবীতে থাকাকালীন, উকন্ঠা, না পাবার দুঃখ-যন্ত্রনা নিয়ে ছিলেন, অপূর্ন বাসনা রেখে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের তন্দ্রাঘোর  কাটতেই, চঞ্চলতা অনুভব করেন। পৃথিবীর মায়া-মোহ-আসক্তি তাকে তাকে অস্থির করে তোলে। আর যখন সে দেখে তার কোনো নির্দেশ শরীর, বা অন্য কেউ পালন করছে না তখন  সে অসহায়, অস্থির  ও শোকাচ্ছন্ন হয়ে যায় । আর যারা জ্ঞানত দেহ ত্যাগ করে, তারা মৃত্যুকালীন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কাটিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত থাকে। এই অবস্থাটা আমাদের খানিকটা স্বপ্নের মতো। স্বপ্নে যেমন আমরা একটা জাগতিক পৃথিবীতে ঘুরে  বেড়াই। সুখ-দুঃখ ভোগ করি, এই অবস্থাতেও আমরা একই রকম অনুভব করি। বাসনা যাদের বেশি থাকে তারা ভোগ ভূমিতে নেবে আসে। আত্মীয়স্বজনদের পাশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। আমরা যেমন আমাদের ঘুমের মধ্যে ঘুরে বেড়াই, এরা তখন তাদের আত্মীয়স্বজনদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সাহায্য করতে চায়। তারা তখন বুঝতেই পারে না, যে তারা মারা গেছে। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় তাদের বেশ কিছু সময় কেটে যায়। আর একদল আছেন, যারা মৃত্যুর পরে বুঝতে পারেন। তারা দেহাতীত হয়ে গেছেন। এরা  তখন শান্তিতে নিদ্রা যান। অর্থাৎ সুসুপ্তির স্তরে অবস্থান করেন। এই সময় তাদের কোনো জ্ঞান থাকে না। এমনকি সময়জ্ঞানও থাকে না। এইজন্য বলা হয়ে থাকে মানুষের বাসনা অনুযায়ী, জ্ঞান অনুযায়ী মানুষ মৃত্যুর পরে, স্বর্গ-নরকে অবস্থান করেন, ভালো বা মন্দ থাকেন । এই জন্য বিভিন্ন আত্মার জন্য বিভিন্ন স্তর নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এবং এগুলো সবই আমাদের চিন্তা-ভাবনার ফল। তাই আমাদের চিন্তা -ভাবনা যেমন  সবার আলাদা আলাদা, আমাদের সবার চিন্তা-ভাবনার কম্পনও তেমনি আলাদা আলাদা। আর এই কম্পনের  মাত্রা অনুযায়ী আমাদের বসবাসের স্তর নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এখানে ঈশ্বরেরও কিছু করার নেই। একটা কথা আমাদের বোঝা দরকার যে, আমাদের এই যে মনময় শরীর, এটি সুক্ষ কিন্তু অপার্থিব নয়। স্থূল শরীর  যেমন পার্থিব এই সূক্ষ্ম শরীরও পার্থিব। অর্থাৎ অন্নময়, প্রাণময় শরীর যেমন পার্থিব, মনময় শরীরও পার্থিব। এবং এই মনময় শরীর চিরস্থায়ী নয়।  এটিরও পরিবর্তন আছে, নাশ আছে। অন্ন না পেলে যেমন  অন্নময় শরীরের ধংশ হয়ে যায়,  বায়ু না পেলে যেমন প্রাণময় শরীর নাশ হয়ে যায়, আমাদের কামনা বাসনা সংকল্প শেষ হয়ে গেলে এই মনময় শরীরেরও  নাশ হয়ে যায়। এইজন্য স্বাভাবিক মৃত্যুতে দেখবেন, মানুষ প্রথমে খাওয়া ছেড়ে দেয়।অর্থাৎ খাবার থেকে যে শক্তি সে সংগ্রহ করছিলো, তা বন্ধ হয়ে যায়।  এর পরে হৃদযন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দেয়, অর্থাৎ বায়ু থেকে যে উর্জাশক্তি সে  সংগ্রহ করছিলো, সেটা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মনময় শরীর থেকে যায়। অর্থাৎ কামনা বাসনা আমাদের সহজে ছেড়ে যায় না। এইজন্য, ঋষি-মহাপুরুষরা আমাদের কামনো বাসনা পরিত্যাগ বা নিয়ন্ত্রণ  করতে বলেছেন। অর্থাৎ অন্নময় এবং প্রাণময় শরীর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মে শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মনময়  শরীর, তখনি নাশ হবে, যখন আমরা কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করতে পারবো। আর এই তিনটে শরীর নাশ হয়ে গেলে বিজ্ঞানময় শরীর আনন্দময় শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। এবং আনন্দময় শরীর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়।

মনময় সূক্ষ্ম দেহকে সহজে নাশ করা যায় না। এটি তার কামনা বাসনা পূরণের জন্য আবার দেহ ধারনের জন্য উদগ্রীব হয়। কারন সে জানে দেহ ভিন্ন কামনা বাসনা পূরণের কোনো উপায় নেই।  এই জন্য বলা হয়ে থাকে, মানুষ তার কামনা বাসনা অনুযায়ী দেহ প্রাপ্ত হয়।  এবং এই চক্রের মধ্যেই আমরা অর্থাৎ  বেশির ভাগ প্রাণী ঘুরপাক খাচ্ছি।
মানুষ মৃত্যুর পরে অজ্ঞানের ঘুমে সে আচ্ছন্ন হয়ে পরে, এবং ধীরে ধীরে ঘন্টা চারেকের মধ্যেই  তার আচ্ছন্নতা কেটে যায়। তখন থেকে  বায়বীয় দেহ নিয়ে  সে জীবনের চতুর্থ স্তরে ধাতস্ত হবার চেষ্টা করে।  এই চতুর্থ স্তরের মধ্যেই স্বর্গ-নরক বলতে আমরা যা বুঝি, তা এইখানেই।  এই চতুর্থ জগতের সঙ্গে আমাদের বুঝবার জন্য আমাদের স্বপ্নাবস্থার সাথে তুলনা করতে পারি। আমাদের স্বপ্নের জগতে যেমন এই পৃথিবীর জগতের মতো একটা জগৎ উপলব্ধি করি, এখানেও  আমাদের দৃশ্যমান জগতের অনুরূপ একটা জগৎ বিদ্যমান। পার্থক্য হচ্ছে আমাদের স্বপ্ন ৬ বা ৮ ঘন্টার পরে ভেঙে যায়। আমরা বুঝতে পারি যে আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম।  আর এই জগতের স্থিতিকাল দীর্ঘ। এবং এক একজনের ক্ষেত্রে এক এক রকম। তবে অনন্তকাল নয়। এখানেও আমরা ইহজগতে থাকা কালীন যেমন কাজ কর্ম করতাম।  এখানেও সেইরূপই করে থাকি। কেউ যদি ইহজগতে পুজো-অর্চনা করতে ভালো বাসতেন, তবে এখানেও তিনি সেটাই করেন। এখানে চিন্তামাত্র তার কাছে সবকিছু উপস্থিত হয়ে যায়। এমনকি তারা ইহজগতের সবাইকে যাদের তিনি স্মরণ করেন, তাদেরই সাথে মিলিত হতে পারেন। এগুলো তাদের কল্পনা প্রসূত। এমনকি এখানে তারা আহার-পানীয় গ্রহণ করেন। অর্থাৎ এটাকে বলা যেতে পারে চিন্তা বা কল্পনার রাজ্য। আসলে আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, সেই মূহুর্তের জন্য স্বপ্নকে আমাদের সত্য বলে মনে হয়। আমরা জানি স্বপ্ন আমাদের চিন্তার আকার বা পরিণতি বিশেষ। স্বপ্নে আমরা যেমন স্পর্শসুখ পাই,  শ্রবণসুখ এবং দৃশ্যসুখ পাই বা বিপরীত ভাবে বলা যেতে পারে, স্বপ্নে আমরা যেমন দুঃখ বা  ভয় পাই,  আতঙ্কগ্রস্থ হই, তেমনি  এখানেও  আমরা মানসিক  দেহ নিয়ে আমরা সমস্ত সুখ-দুঃখ ভোগ করি। এই ভোগেচ্ছা একটা সময় সমাপ্ত হয়। তখন আবার আমরা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।
এই অবস্থায় এক একজনের ক্ষেত্রে এক একরকম সময়-কাল ধরে চলে। কেউ কেউ বলেন, ২৫/৩০ বছর থাকার পরে, তার আবার ধরণীতে দেহ ধারণের ইচ্ছা প্রবল হয়। কেউ বলেন, হাজার বছর। আসলে বাসনার প্রবলতা অনুসারে এই স্তরে স্থায়ীকাল নির্দিষ্ট হয়।  এই দেহ ধরনের ইচ্ছা যখন প্রবল হয়, সে  সময় আবার সে অজ্ঞান-আচ্ছন্ন হয়ে পরে। এবং এই অবস্থাতেই সে তার ইচ্ছে পূরণের জন্য বা বাসনা পূরণের জন্য উপযুক্ত শরীরের  ভ্রূণের  মধ্যে প্রবেশ করে। এটাকেই বলি আমরা গর্ভধারণ। পার্থিব শরীর  ভিন্ন আমাদের আমাদের ইচ্ছে পূরণের কোনো সুযোগ নেই।  তা সে ভালো ইচ্ছেই বলুন আর ভোগের ইচ্ছেই বলুন। শরীর যন্ত্র ছাড়া আমাদের কোনো আদর্শ বা লক্ষ্য পূরণের কোনো উপায় নেই। তাই অনন্ত কাল কেউ স্বর্গে অর্থাৎ আনন্দে থাকে না বা অনন্ত কাল কেউ নরকে বা নিরানন্দে  থাকে না। এখানেই ফিরে ফিরে আসে। ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর  বড় ছিল, ভীষ্ম কথাটা এসেছে ভ্রম থেকে, এই ভ্রম মানুষের সহজে যায় না।ভীষ্মেরও সহজে মৃত্যু ঘটে না। তীরের ঊপরে বিদ্ধ হয়ে, শ্বর-শয্যায়  তাকে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদের ভোগেই সুখ, এই ভ্রম যতদিন না যাবে ততদিন আমাদের বার বার ফিরে আসতে  হবে।

এখানথেকে আদর্শবান পুরুষ, বা  প্রাজ্ঞপুরুষ যাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলে থাকি, তারা আর এই জগতে সাধারণত ফিরে আসেন না। তারা আরো উর্দ্ধে অর্থাৎ পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম  অর্থাৎ মহঃ, জনঃ তপঃ এবং সব শেষে সত্যম বা ব্রহ্মলোকে  যাত্রা করেন।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম। 



পূর্বজীবন :


আমাদের সবার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই জন্মের আগে আমি কি ছিলাম ? না, আমি জাতিস্মরের কথা বলছি না। জাতিস্মর  তার নিজের পূর্বজীবনের কথা বলতে পারে। আমাদের অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরা  কিভাবে  জন্মেছি মানুষ হয়ে, কোথায় ছিলাম, কিভাবে এলাম।  আর কিভাবে সমস্ত  মানুষের যাত্রা প্রক্রিয়া সংগঠিত হয় ।  মহাত্মারা বলে থাকেন, জীব তার বাসনা পূরণের জন্য দেহ ধারণ করে। জীব যদি সত্যিই  বাসনা পূরণের জন্যই দেহ ধারণ করে থাকে, তবে বাসনা পূরণের আগেই কেন মানুষের চলে যেতে হয় এই দেহ ছেড়ে। বিশেষ করে  শিশুমৃত্যু তো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যে,  কোনো বাসনা পূরণের আগেই তার দেহপাত হয়ে গেল। আর বয়স হয়ে গেলে অর্থাৎ আমি যদি ৮০ বা ১০০ বছর বাঁচি, তাহলেও কি, আমাদের বাসনা পূরণ হয় ? আর যদি বাসনা পূরণ না হয় তবে আমাদের কেন চলে যেতে হয় ? আমাদের দেহ ধারণ ও দেহ ত্যাগ কি পূর্ব নির্ধারিত ? কেউ কেউ বলেন, আমাদের কর্মও নাকি পূর্বনির্ধারিত। ঈশ্বর মানুষকে মারতে পারে কি না জানি না, তবে মানুষ মানুষকে মারতে পারে, এটা তো আমরা চাক্ষুস দেখতে পারছি। তাহলে আমাদের জন্ম মৃত্যুতে কার ভূমিকা বেশি ? ভগবানের, নাকি মানুষের, নাকি প্রকৃতির। আমরা এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।


জড়বাদীরা আত্মায় বিশ্বাস করে না।  ঈশ্বরেও  বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে, জীবসত্ত্বা কতক গুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। প্রকৃতির সমুদ্রে বুদ্বুদের মতো জীব ভেসে উঠছে, আবার প্রকৃতির সঙ্গেই মিশে যাচ্ছে। এ সবই প্রকৃতির খেলা। অসংখ্য কারণে জীবের যেমন সৃষ্টি  হয়, আবার অসংখ্য কারণেই জীব প্রকৃতির মধ্যে লয় প্রাপ্ত হয়।  জীবের কোনো ব্যক্তি সত্ত্বা নেই। জীব প্রকৃতির অঙ্গ।  এতে জীবের কোনো ভূমিকা নেই। জীবের মরণের সাথে সাথে জীব গঠনের উপাদানসমূহের বিভাজন ও বিনাশ ঘটে থাকে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনগঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জীব ইচ্ছে করলেই জন্ম গ্রহণ করতে পারে না। আবার মরতেও পারে না। আসলে জীবের ইচ্ছা, অর্থাৎ জীবন-মৃত্যু, প্রাণের  অর্থাৎ বায়ুর সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। বায়ু নিষ্কাশনের সঙ্গে সঙ্গে জীবসত্ত্বার বিলোপ ঘটে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক কারণেই জীবনের বিলোপ ঘটে।

আমাদের সবার মন এই সমাধানে তৃপ্ত হয় না। পদার্থ কখনো চেতন সত্ত্বার সৃষ্টিকারী হতে পারে না। আমাদের ধীশক্তি পদার্থ দিয়ে উৎপত্তি হয়েছে, এমন কথা বিজ্ঞান প্রমান করতে পারে নি । জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় অবশ্য়ই আলাদা। আর যদি আলাদা না হয়, তবে ধরে নিতে হয় দুজনই চেতন সত্ত্বার অংশ, জড় নয়। মস্তিস্ক কখনো মনকে সৃষ্টি করতে পারে না। মস্তিস্ক বা জড় পদার্থ একটা বাদ্যযন্ত্র বিশেষ। এরমধ্যে সুর আছে, সেটা সত্য।  কিন্তু এই সেই সুর তুলতে গেলে একটা চেতন সত্ত্বার দরকার। আর চেতন সত্ত্বা হচ্ছে শিল্পী। শিল্পী বাদ্যযন্ত্রে সুর তোলেন । জড় আর চেতন সত্ত্বার  সঙ্গে এটাই পার্থক্য। তো চেতন সত্ত্বা একটা আছে।  তা কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক। ঈশ্বরকে আপনি  ছাড়তে পারেন , কিন্তু ঈশ্বর আপনাকে  ছাড়বে না। তা আপনি  যে অবস্থায়ই  থাকুন না কেন  ।

জগতে কোনোকিছু অকারণে হয় না।  এই কথাটা বিজ্ঞান স্বীকার করে। তাহলে জীবন মরনেরও একটা কারন আছে নিশ্চয়। আর এই কথাটা যখন মনে হয়, তখন ইচ্ছে জাগে কারণের অনুসন্ধান করি। আর আমরা এও জানি, কারন কখনো বাইরে থাকতে পারে না। গাছের বীজ গাছের মধ্যেই থাকে। অনু আকারে যে বীজ গাছের মধ্যে থাকে, কালে কালে পরিবেশের দোলায়, সেই বীজ গাছে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। শুধু পরিবেশে গাছ হতে পারে না।  তাহলে জীব সৃষ্টির বীজ জীবের মধ্যেই নিহিত আছে। সুপ্ত সেই বীজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আর খুঁজে বের করতে গেলে আমাদের জীবনচক্রকে পেছনের দিকে ঘোরাতে হবে। আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানে যেতে হবে। আমাদের মায়ের গর্ভে যেতে হবে। আমাদের শুক্রে যেতে হবে। শুক্রের উৎসে যেতে হবে। "জীবনচক্র" সিনেমাটাকে আমাদের রেউইন্ডিং করতে হবে, অর্থাৎ পিছন দিকে চলা হবে । মায়ের গর্ভ বা পৃথিবী,  বীজকে অংকুরিত করবার  পরিবেশ দেয়।  বেড়ে ওঠার খাদ্য দেয়। কিন্তু বীজ আসে বাবার কাছ থেকে। আর এই বীজ স্থানান্তরিত হয়েছিল কামনার উদ্ভবে। কামনা আমাদের পিতাকে চঞ্চল করে তুলেছিলো অবয়ব তৈরির জন্য।  দেহ ধারনের জন্য। এই কামনা কি পিতার ইচ্ছে ? নাকি আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের ইচ্ছে। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। এই অন্তরকে আমাদের বুঝতে হবে। উপনিষদ প্রাণ সৃষ্টির উৎসকে বলছেন শ্রদ্ধা। অর্থাৎ জলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অংশকে বলে শ্রদ্ধা। এটিই জীব সৃষ্টির প্রাথমিক ও আবশ্যিক  উপাদান। তাই বলা হয়ে থাকে যে গ্রহে জল নেই সেখানে প্রাণ থাকবে না। কিন্তু জল আমাদের আবরণ বা দেহসৃষ্টির কারন। আমি নই। আমি কিন্তু সবত্র সমস্ত গ্যালাক্সিতে আমি। ঈশ্বরকণা।

আবার,বিজ্ঞান প্রথম প্রাণকে বলছেন, protozoa প্রটোজোয়া  বা প্রথম প্রাণ।  প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম নির্দিষ্ট আকারবিহীন এককোষী প্রাণী হচ্ছে amoeba এমিবা।  একে কেবলমাত্র অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা যায়। ক্ষনে ক্ষনে এরা রূপ পরিবর্তন করতে পারে। একটা মাত্র কোষ দিয়েই এদের সমস্ত জৈবিক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরা কখনো গোল, কখনো ডিম্বাকৃতি, কখনো লম্বা, ইত্যাদি যেকোনো আকার ধারণ করতে পারে। একেই বলে protozoa প্রটোজোয়া বা প্রথম প্রাণী। এমনও তো হতে পারে, এই প্রটোজোয়া কালের সঙ্গে সঙ্গে মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এর মধ্যেই মানুষের সমস্ত শক্তি অদৃশ্য ভাবে লুক্কায়িত ছিল। বেদান্ত দর্শন একেই বলছে সুক্ষ শরীর  বা প্রাণবীজ । আর এর মধ্যেই আছে, আমাদের মন, বুদ্ধি, চিন্তা, ইচ্ছাশক্তি, এবং সমস্ত ইন্দ্রিয়সকল।  আবার এর মধ্যেই আছে আমাদের প্রারব্ধ। এর মধ্যেই আছে এক ইথারীয় শক্তি, বা তরঙ্গ শক্তি  যাকে  আমরা বলি প্রাণশক্তি। সমস্ত দ্রব্যের আদিমতম সূক্ষ্ম সংস্করণ। এবং এই শক্তি আমাদের সবার মধ্যে বর্তমান। তাই প্রাণ  থেকে প্রাণের সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ থেকে মানুষের সৃষ্টি হচ্ছে।

সূক্ষ্ম শরীর আমাদের প্রকৃত মানব সত্ত্বা। এই সূক্ষ্ম শরীরই  মনুষ্য দেহের আকার ধারণ করে। ভোগের জন্য অবয়বের সৃষ্টি  করে। এর জন্য আমাদের বাইরের থেকে কোনো কিছু নেবার প্রয়োজন পড়ে  না।
চেতনশক্তিই শরীর  তৈরি করে, শরীর কখনো চেতন শক্তি তৈরি করে না। এই সুক্ষ শরীরের মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা থাকে। জীবের যখন মৃত্যু হয়, তখন সে তার সমস্ত শক্তি অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, স্মৃতি, চিত্ত, অহংকার, চিন্তা, ইচ্ছা এমনকি ইন্দ্রিয় শক্তি অর্থাৎ শ্রবণশক্তি, ঘ্রান শক্তি, দর্শনশক্তি, স্পর্শশক্তি, বাকশক্তি, অর্থাৎ সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে এমনকি আমাদের সংস্কার ও প্রারব্ধ নিয়ে একটা বিদ্যুৎতরঙ্গ আকারে ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ সমস্ত পদার্থের অতি সূক্ষ্মকণা সন্নিবদ্ধ হয়ে ঘুরতে থাকে। এটি অব্যক্ত অবস্থা নয়। ব্যক্ত, এবং  ভৌতিক। প্রথম দিকে এরা চতুর্থ স্তরে থাকে।  কালে কালে যারা জ্ঞানলোকের আলো ধরতে পারে, তারা পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম স্তরে প্রবেশ করে। এই রকম স্তর আছে ৫১টি।  যে যত  উপরের স্তরে চলে যায়, তাদের ফিরে আসতে তত দেরি হয়। আমরা বলি  এদের পুনরাবৃত্তি হয় না। কেবল মাত্র চতুর্থ স্তর  থেকেই আমরা আমাদের এই তৃতীয় স্তরে নেবে আসি। এটাই পুনর্জন্ম। অর্থাৎ চতুর্থ স্তর  থেকে তৃতীয় স্তরে নেবে আসা জন্ম। আর তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরে চলে যাওয়ায় মৃত্যু।

আমরা আগেই শুনেছি , মৃত্যুকালে,আমাদের চেতন সত্ত্বা বা আত্মা ব্যক্তিবিশেষের সমস্ত শক্তিকে সংকুচিত ক'রে, নিউক্লিয়াসে, প্রাণবিন্দুতে, বা শ্রদ্ধাতে  পরিণত হয়। কালে কালে অনুকূল পরিবেশ পেলে এই শ্রদ্ধা বা প্রাণবিন্দু আবার দেহ ধারণ করে। এখানে মা-বাবা এই দেহ গঠনে সহায়ক হয় মাত্র। দেহগঠনকারী নয়। দেহ হচ্ছে আত্মার আবরণ মাত্র । এবং এই দেহ আত্মাই সৃষ্টি করে থাকে । রেশম কিট  যেমন নিজের লালা নিঃসরণ ক'রে, নিজেকে আচ্ছাদিত করে তেমনি  রেশমকীটের মতো, জীবাত্মা নিজেকে আচ্ছাদিত করে, নিজেরই লালার বা রসের সাহায্যে। এই রসকে উপনিষদ বলছে শ্রদ্ধা । অর্থাৎ জীবের  সূক্ষ্মতম সংস্করণ। মা বাবা কখনোই তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী শিশুর জন্ম দিতে পারে না। যতক্ষন না পর্যন্ত পিতার মধ্যে শুক্রের আবির্ভাব না হয়, যতক্ষন না পর্যন্ত মাতার মধ্যে রজের আবির্ভাব না হয় ততক্ষন মা-বাবা কোনো  দেহের বা শিশুর জন্মে কারন হতে পারে না। আর এই শুক্র  বা রজ  প্রক্রিয়া, মানুষের মধ্যে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বা  সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনি এমনি হয়। এর জন্য মানুষের আলাদা করে কিছু করতে হয় না। সূক্ষ্ম শরীর জল কনার মতো। জল  যখন বাষ্পাকারে থাকে তখন সে মেঘ, যখন সে তরল আকারে থাকে তখন সে সমুদ্র। এটি কখনো ধংশপ্রাপ্ত হয় না। অবস্থার পরিবর্তন হয় মাত্র।

আমাদের এই মূলসত্ত্বা  সত্ত্বা যেমন এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হতে পারে, তেমনি অন্য যে কোনো গ্রহে, অন্য যে কোনো মন্ডলে আবির্ভূত হতে পারে। এই সত্ত্বা আলো  ও শব্দ তরঙ্গের সাহায্যে মহাবিশ্বের যে কোনো স্থানে বিচরণ করতে পারে। এটি তখন অভৌতিক অবস্থায় থাকে। পরিবেশ পেলে, প্রাণবিন্দুর মধ্যে নিজেকে অবাধ করে।  ভৌত রূপ নেয়। আর একটা কথা, যে  শক্তি আমাদের এই স্তর পরিবর্তন করায়, তাকেই আমরা বলি পরম-আত্মা। তাকে প্রতিরোধ করবার শক্তি কারুর নেই।

দেখুন মাধ্যাকর্ষন শক্তি যেমন আমাদের এই দেহকে ধরে রেখেছে, আমাদের আত্মাও আকার নেয়, এই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য। আর এই জগৎটাও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নিয়মে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ধ্রুব সত্য আপনি মানুন আর না মানুন, তাতে কিছুই এসে যায় না।

আমাদের মূল সত্ত্বা এই প্রাণবিন্দু  অর্থাৎ শ্রদ্ধা সৃষ্টির অতীত। এটি পরমাত্মার প্রতিফলিত জ্যোতি সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর একে সংরক্ষণ করে, প্রাণবায়ু, মন, ইন্দ্রিয়শক্তি,সংস্কার। এই প্রাণবিন্দু দেহ ধারণ ক'রে, আবার নতুন অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়, সংস্কারের জন্ম দেয়, আবার ভোগের দ্বারা সংস্কারের বিলোপ সাধন করে। এই প্রক্রিয়াই  চলছে যুগের পর যুগ, কাল থেকে কালান্তরে।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম

পূর্ব জীবন (২) 
একটা কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি যে ৮৪ লক্ষ যোনি পরিভ্রমন করে আমরা এই মনুষ্য দেহ পেয়েছি। এই ৮৪ লক্ষ যোনি ব্যাপারটা কি ?
জীবের বেঁচে থাকার জন্য দুটো জিনিসের প্রয়োজন।  এক - প্রাণক্রিয়া অর্থাৎ ফুসফুসের ক্রিয়া। আর একটা হচ্ছে চেতন শক্তি। মায়ের পেটে  যখন থাকি, তখন আমাদের প্রাণক্রিয়া মায়ের প্রাণক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে। পরে, আমাদের নিজস্ব ফুসফুস ক্রিয়াশীল হয়। এই প্রাণক্রিয়ার শুরু কি এখানেই না, না এর কোনো ইতিহাস আছে ? দুই - চেতন শক্তি আমাদের শরীরে কখন শুরু হয় ? অর্থাৎ আত্মা আমাদের শরীরে কখন প্রবেশ করে ?  আচ্ছা, মানুষের মৃত্যুর পরে কি আবার সেই ৮৪ লক্ষ যোনি ঘুরে তবে আবার আমি মানুষ হতে পারবো ? এমনি অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যে জাগে।
এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের প্রাণের উৎসে যেতে হবে। আত্মার গমন নির্গমন ব্যাপারটা বুঝতে হবে। প্রাণ সৃষ্টির একটা প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু আত্মা অজন্মা। আত্মার না আছে শুরু না আছে শেষ। ফুসফুস সম্প্রসারণ ও সংকোচনের মাধ্যমে আমরা প্রাণকে গতিশীল করতে পারি। কিন্তু চেতন শক্তি আসা যাওয়া করে কি করে ? এমনি অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যে জাগে, আমরা আজ তার জবাব শুনবো।
আমরা সবাই জানি, আমাদের দেহ পঞ্চকোষের সমষ্টি। আর তা হচ্ছে, অন্নময়, প্রাণময়, মনময়, বিজ্ঞানময়, ও আনন্দময়। এখন কথা হচ্ছে, কোষ বলতে আমরা কি বুঝি ? বিজ্ঞান বলছে, প্রোটোপ্লাজম সমন্বিত জীবদেহের ক্ষুদ্র একককে বলে কোষ। জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। আমাদের দেহে আছে পাঁচ ধরনের কোষ। কিন্তু সমস্ত জীবের দেহে এই পাঁচ ধরনের কোষ নেই। এখন কথা হচ্ছে, প্রোটোপ্লাজম কি ? প্রোটোপ্লাজম হচ্ছে, একধরনের অর্দ্ধ তরল জেলির মতো সজীব পদার্থ। এই প্রোটোপ্লাজম-ই আসলে জীবের প্রাণ পদার্থ। এই প্রোটোপ্লাজম তৈরি হয় কতকগুলো মৌল পদার্থ দিয়ে।  আর তা হচ্ছে - কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, সালফার, ফসফরাস ইত্যাদি মৌল পদার্থ দিয়ে তৈরি। জীবের সমস্ত জৈবিক বা বায়োলজিক্যাল ক্রিয়াগুলো এই প্রোটোপ্লাজমের মধ্যেই  ঘটে থাকে । আর কোষের বৈচিত্র দেখা যায়, তার গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্যেই। অর্থাৎ মৌল পদার্থের পরিমান ভেদের জন্য তাদের মধ্যে তারতম্য দেখা যায়।
আমরা বা মনুষ্যদেহ যেমন পাঁচ ধরনের কোষ দ্বারা গঠিত, তেমনি এক ধরনের জীব আছে যারা একটি মাত্র  কোষ দ্বারা গঠিত। যেমন, ব্যাক্টেরিয়া, অ্যামিবা ইত্যাদি।
কতকগুলো কোষ একত্র হয়ে গঠিত হয় টিসু বা কলা। অর্থাৎ কতকগুলি কোষের সমষ্টিকে বলে কলা। আবার কতকগুলো কলার সমষ্টিকে বলে অরগ্যান বা অঙ্গ। আবার কতকগুলো অঙ্গের সমষ্টিকে বলে তন্ত্র, আর কতকগুলো তন্ত্রের সমষ্টিকে বলে জীব। এই জীব আবার অনেক রকম হয়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পোকা একটা জীব, আবার কুকুর-ছাগল জীব, আবার উদ্ভিদ-এরও প্রাণ আছে।   এদের সবার আকৃতি যেমন আলাদা আলাদা তেমনি গঠনশৈলী ও বেঁচে থাকার কাল বা সময়  আলাদা আলাদা। উদ্ভিদের শাখা, প্রশাখা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদি তাদের অংগ।   তেমনি জীবের  চোখ, মুখ, কান, ফুসফুস, পাকস্থলী, হৃৎপিন্ড এক-একটা আলাদা অঙ্গ। এই অঙ্গগুলোকে একত্রিত করে তৈরি হয় একটা তন্ত্র যাকে  আমরা বলি সিস্টেম। স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, পেশিতন্ত্র ইত্যাদি।
পৃথিবীতে জীব সৃষ্টির আদিতে ছিল, এককোষী, যা কেবলমাত্র অণুবীক্ষণ দ্বারাই দেখা যেতে পারে।  কোটি কোটি বছর  ধরে নানান পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আজকের জীব তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন এখনো চলছে, এবং আজ থেকে কোটি বছর পরে, জীবের আকার, গঠন ও ক্ষমাতাগত পরিবর্তন  হবে। এবং উন্নততর জীব সৃষ্টি হবে। আর একটা কথা, জীবের যেমন জন্ম আছে, তেমনি জীবের মৃত্যু অবধারিত। তবে কোনো জীব, স্বল্পক্ষন বাঁচে, আবার কোনো জীব বহুদিন যাবৎ বেঁচে থাকে। প্রাণীদের মধ্যে যেমন কচ্ছপ অনেকদিন বাঁচে, তেমনি উদ্ভিদের মধ্যে বটগাছ অনেক দিন বাঁচে। জন্মের পর জীব ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায়, বংশ বিস্তার করে, আবার বিপাকীয় ক্রিয়াগুলো যখন হ্রাস পেতে থাকে, তখন জীবের বার্ধক্য আসে. এবং একদিন মৃত্যু হয়।  এটাকেই জীবনচক্র  বলে। অর্থাৎ নতুন কোষ জন্মানো ও পুরাতন কোষের অপসারণ বা মৃত্যু - এটাই আমাদের জীবন বা শারীরিক যাত্রাবৃত্ত ।কোষের মৃত্যুর থেকে যখন কোষের জন্মের হার বেশি থাকে তখন আমরা শিশু থেকে যৌবনে পৌঁছাই। আবার  কোষের জন্মের থেকে মৃত্যুর হার যখন বেশি হয়, তখন আমরা বৃদ্ধাবস্থায় চলে যাই। এর পরে আমাদের প্রাণপাত হয়।
পৃথিবীতে দুই ধরনের বস্তু আছে। যে বস্তুর প্রাণ আছে অর্থাৎ প্রোটোপ্লাজম আছে, তাকে বলা হয় প্রাণী।  আর যাদের এই প্রোটোপ্লাজম নেই বা শুকিয়ে গেছে, তাদের বলা হয় প্রাণহীন বা জড় বস্তু। প্রাণহীন বস্তুর আকৃতির বৃদ্ধি নেই , বংশ বিস্তার করতে পারে না, চলন বা গমন নেই, উত্তেজনাতেও সাড়া দেয় না।  আর যাদের প্রাণ আছে, তাদের আকৃতির বৃদ্ধি আছে, বংশ বিস্তার করতে পারে, চলন বা গমন আছে, এবং উত্তেজনায় সাড়া দেয়।
এখন কথা হচ্ছে, মানুষের বা সমস্ত জীবের প্রাণ আছে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। এমনকি এমন উদ্ভিদ আছে যারা উত্তেজনায় সাড়া দেয়, যেমন লজ্জাবতী গাছ। এরা বাতাসের বা মানুষের স্পর্শে নিজেকে সংকুচিত করে নেয়। আবার এমন উদ্ভিদ আছে, যারা গমনে সক্ষম। এমনকি মাংসাশী উদ্ভিদ আছে।  যারা পোকা মাকড় খেয়ে থাকে। সব থেকে গুরুত্ত্বপূর্ন কথা হচ্ছে, এমন কিছু এককোষী জীব আছে, যাদের মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর উভয় লক্ষণ আছে। যেমন ক্রাইস এমিবা ইত্যাদি।  এইজন্য বিজ্ঞানীরা মনে করে থাকেন,  আজকের যে উন্নততর জীব, তা এই সব এককোষী জীব থেকেই হয়েছে।
এত গেলো দেহের কথা, এবং  প্রাণের কথা। পৃথিবীতে যখন প্রাণ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে, তখন আত্মা কোথায় ছিল ? এই দেহে আছে আমাদের আত্মা বা চেতন শক্তি। আমরা আগেই শুনেছি যে, জীবের যখন মৃত্যু হয়, তখন সে তার সমস্ত শক্তি অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, স্মৃতি, চিত্ত, অহংকার, চিন্তা, ইচ্ছা এমনকি ইন্দ্রিয় শক্তি অর্থাৎ শ্রবণশক্তি, ঘ্রান শক্তি, দর্শনশক্তি, স্পর্শশক্তি, বাকশক্তি, অর্থাৎ সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে এমনকি আমাদের সংস্কার ও প্রারব্ধ নিয়ে একটা বিদ্যুৎতরঙ্গ আকারে ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ সমস্ত পদার্থের অতি সূক্ষ্মকণা সন্নিবদ্ধ হয়ে ঘুরতে থাকে। এটি অব্যক্ত নয় ব্যক্ত। জীব সৃষ্টির প্রক্রিয়া যখন পৃথিবীতে  চলছিল, তখন আত্মা এই প্রক্রিয়ার অব্যক্ত অকর্তা ছিলেন। জীবন যে এই পৃথিবীতে প্রথম শুরু হয়েছে, তা তো নয়। এর আগে জীবনের খেলা চলছিল চন্দ্রে। তখন চন্দ্র ছিল, গ্রহ। এসব কথা আমরা সৃষ্টিতত্ত্বে শুনেছি। জীবন সৃষ্টির প্রাথমিক প্রক্রিয়া এখন শুরু হয়েছে বুধে। এমনকি এই মুহূর্তে আমাদের থেকে উন্নত জীব আছে শুক্রে। এবং এর পরে পৃথিবীতে যখন প্রাণের কাজ শেষ হয়ে যাবে, তখন বুধে প্রাণ স্থানান্তরিত হবে। পৃথিবী আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাবে। এসব কথা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু পরাবিদ্যাবিদদের কাছে এসব  সত্য।
এখন কথা হচ্ছে, আমাদের মৃত্যুর পরে আমাদের কি আবার প্রোটোপ্লাজম থেকে শুরু করতে হবে, মানুষ হবার জন্য ? অর্থাৎ যদি প্রাণ বা প্রোটোপ্লাজম থেকে জীবের শুরু হয়, তবে কি আমাদের আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে ? পরাবিদ্যাবিদগন বলছেন  না, তবে ব্যতিক্রমও  আছে। মানুষ যদি নিকৃষ্ট জীব হয়ে জন্মাতে চায়, তবে সে তা হতে পারে। কিন্তু সাধারণত তা কেউ চায় না, তাই সে আবার মানুষ হয়েই জন্মাবে।
আত্মা সম্পর্কে  আমরা বিভিন্ন রকম মত শুনতে পাই। চার্বাক বলছেন, চৈতন্য শক্তি হচ্ছে  মিশ্র বস্তুর অতিরিক্ত গুন্। অর্থাৎ যে গুন্ মৌল পদার্থের মধ্যে ছিল না। সেই একাধিক মৌল বস্তু যখন একত্রিত হয়ে যৌগবস্তুতে পরিণত হয়, তখন তার মধ্যে একটা বিশেষ বা অতিরিক্ত গুনের সমাহার লক্ষ করা যায়। আমাদের চৈতন্য শক্তি হচ্ছে এই যৌগবস্তুর অতিরিক্ত গুন্, যা মৌল বস্তুর মধ্যে লক্ষ করা যায় নি।  দুটো রঙ মেশালে একটা নতুন রঙের সৃষ্টি হয়। যা ওই মূল রঙ গুলোর  মধ্যে ছিল না, বা দেখা যায় নি। আপনি চুন সুপুরি খয়ের দিয়ে পান খেয়েছেন, এর মধ্যে কোনোটাই লাল ছিল না। কিন্তু যখন   চুন-সুপুরি-খয়ের-পান  চিবোলেন, অর্থাৎ মেশালেন, তখন একটা নতুন রঙের দেখা মিললো, আর তা হলো লাল। ঠিক তেমনি - কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, সালফার, ফসফরাস ইত্যাদি মৌল পদার্থ দিয়ে তৈরি প্রোটোপ্লাজম । এইসব মৌল  পদার্থ  একত্রিত হয়ে যা তৈরি হলো তা প্রাণ বা প্রোটোপ্লাজম। আবার বিভিন্ন মিশ্রনের  কোষগুলো যখন একত্রিত হলো, তখন আর একটা শক্তি সৃষ্টি হলো আর  তা হচ্ছে চেতন শক্তি।  যাকে আমরা আত্মা বলে থাকি।
বৈদিক যুগে এই মত প্রত্যাহার করা হয়। কারন যোগঋষিগন উপলব্ধি করেছিলেন, প্রকৃতির উপরে আর একটা সত্ত্বা আছে , যাকে তারা বলছেন পুরুষ। এই বিরাট পুরুষ অর্থাৎ ব্রহ্মান্ডের অব্যক্ত শক্তি, যা পরবর্তীতে পুরুষের মধ্যেই ব্যক্ত হয়েছে। যাকে আমরা বলছি, প্রকৃতি।  প্রকৃতি যে সনাতন শক্তির সাহায্যে শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ থাকছে, তা ওই নিত্যশক্তির খেলা।  প্রকৃতি নিয়মে আবদ্ধ।  আর পুরুষ নিয়মের স্রষ্টা। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল, আর পুরুষ অপরিবর্তনীয়। একেই বেদ বলছে ব্রহ্ম। এই বিরাটপুরুষের প্রতিফলিত শক্তি নিয়ে জীব চেতনাসম্পন্ন হয়েছে। প্রাণ ও চেতনা আলাদা, কিন্তু একের সঙ্গে অন্যের একটা সংযোগ আছে। জীবের দেহ থেকে যখন প্রাণের উৎক্রমন ঘটে, তখন আত্মাও দেহকে  ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ পুরুষ সত্ত্বা দেহের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়, প্রাণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর স্থুল দেহকে বাঁচিয়ে রাখে প্রাণশক্তি। আর প্রাণহীন আমাদের মনময় দেহ বা বিজ্ঞানময় দেহ, ও আনন্দময় দেহ - এদের সাথেও থাকে সেই পুরুষের প্রতিফলিত শক্তি। তাই আমরা যখন দেহের মধ্যে আসি, তখন আমাদের যেখান থেকে পুনরাবৃত্তি হয়, সেখানেই আমরা বীজ আকারে আত্মার প্রতিফলিত শক্তিকে আশ্রয় করে  ছিলাম। তাই প্রাণ যখন শরীরে আসে, অর্থাৎ মাতৃগর্ভে ৪৫-৫০ দিনের মধ্যেই মায়ের প্রাণের সঙ্গে আমাদের সংযোগ তৈরি হয়। আবার মায়ের প্রাণের সঙ্গে যখন আমাদের প্রাণের বিচ্ছিন্নতা ঘটে, অর্থাৎ মায়ের গর্ভের বাইরে আসি তখন আমাদের নিজস্ব প্রাণের ক্রিয়া শুরু হয়।  চৈতন্য শক্তির আবির্ভাব ঠিক একই  সময় হয়ে থাকে। তাই মায়ের পেটে আমরা মায়ের প্রাণ ও চৈতন্য শক্তির আশ্রয়ে থাকি। তখন আমাদের শরীর মায়ের শরীরের একটা অঙ্গবিশেষ মাত্র।  আর মায়ের শরীর  থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আমরা আমাদের নিজস্ব প্রানক্রিয়ার  সাথে আমাদের চৈতন্যশক্তিকে আশ্রয় করি।
একটা কথা শোনা যায়, যে আমরা নাকি ৮৪ লক্ষ যোনী পরিভ্রমন করে মনুষ্য দেহ লাভ করেছি। সত্য হচ্ছে  চুরাশি লক্ষ একটা কথার কথা, আসলে অসংখ্য যোনী ভ্রমণের  পর আমরা মনুষ্য দেহ লাভ করেছি। কিন্তু আমাদের আবার মনুষ্য দেহ ধারনের জন্য,  প্রথম থেকে শুরু করতে হবে, তা নয়। যারা একবার মানুষ হয়ে জন্মেছেন , তারা মৃত্যুর পরে, যে দেহে অবস্থান করবেন , অর্থাৎ মনময়, বা বিজ্ঞানময় দেহে বা আনন্দময় দেহে সেখান থেকেই  নিজেদের  প্রারব্ধকে সঙ্গে নিয়ে আবার মানুষ হিসেবেই জন্ম গ্রহণ করবেন , তাদের  সংকল্প বা বাসনা পূরণের জন্য। তবে একটা কথা বলি, যারা মনময় দেহে অবস্থান করবেন, তারা  তাড়াতাড়ি আবার আসতে  পারবেন, বা বলা যেতে পারে, আসতে  হবে। আর যারা বিজ্ঞানময় দেহে অবস্থান করবেন, তারা আসতে অনেক দেরি করবেন। আর আনন্দময় দেহে যারা অবস্থান করবেন, তারা শুধু সৃষ্টির কাজে সাহায্য করবার জন্যই এসে থাকেন। আমরা যে উন্নত বা উন্নততর মহাত্মাদের দেখতে পাই, এই পৃথিবীতে তাদের আগমন হয়  বিজ্ঞানময় বা আনন্দময় দেহ থেকে। গীতায় ভগবান যে বলেছেন, আমি ধর্মের পালনের জন্য, অধর্মের নাশের জন্য, এই পৃথিবীতে এসে থাকি।  অর্থাৎ এঁরা আনন্দময় দেহে অবস্থান করছিলেন। এদের ভোগ বা বাসনা বা সংকল্প বলে কিছু নেই।  কেবলমাত্র সৃষ্টিকে সহায়তা করবার জন্য, এঁরা  এসে থাকেন। এদের নিজেদের জন্য এঁরা  কিছু করেন না। জগতের হিত , জগৎবাসীদের শিক্ষা দেবার জন্য এসে থাকেন।
ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।

অকাল মৃত্যু কেন হয় ? আমরা কেন মারা যাই ?

কথা হচ্ছিলো বাসনা পূরণের আগে কেন মানুষ মারা যায়। শিশুরা অকালে কেন চলে যায়। দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের প্রাণ এক মুহূর্তে চলে যায় কেন ? যুদ্ধে অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ যায় কেন ?  আমাদের যখন দেশ  ভাগ হয়েছিল, তখন অসংখ মানুষ দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছিল।  কেন এমন হয়।
আয়ুষ্কাল সম্পর্কে জানতে গেলে, আমাদের আগে বুঝতে হবে, আমরা কেন জন্ম নেই। আর কখন আমাদের মৃত্যুর ডাক আসে। দেখুন আয়ুষ্কাল আমাদের পূর্ব নির্দিষ্ট। আবার এর অন্যথাও আছে।আপনি যে দেহ ধারন করেছেন, সেই দেহ প্রাকৃতিক কিছু বস্তুর সমাহার মাত্র। আর এই সমাহার একটা গতিশীল প্রক্রিয়া। এটি স্থির নয়। প্রতিনিয়ত যাচ্ছে আসছে। এই আসা যাওয়ার গতি আমরা ধরতে পারি না তাই আমাদের মনে হয়, আমরা বা আমাদের দেহ  স্থির আছে । এবং একটা অবয়ব আমাদের চোখের সামনে ভাসছে। একটা কথা আছে, স্রোতের জলে  কখনো দুবার ডুব দেওয়া যায় না। অর্থাৎ এখন যে জলে আপনি ডুব দিলেন, পরের ডুব আপনি অন্য জলে দিচ্ছেন। আমাদের শরীর একটা স্রোতস্বীনি নদী। একটা কম্পন মাত্র। আর কম্পনের  প্রবাহ গতিশীল। আপনারা জানেন, আমাদের শরীরের কোষ প্রতিনিয়ত মরছে, আবার প্রতিনিয়ত জন্মাচ্ছে। এবং ৭ বছর  পরে, আমরা সম্পূর্ণ নতুন দেহ পাই। অর্থাৎ ৭ বছর যে কোষ আমার শরীরকে আশ্রয় করেছিল, তা আর নেই।এবং এই কারণেই আমরা শিশু থেকে ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পৌঁছে যাই। এই প্রক্রিয়া আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।  প্রতিটি জীবের এই দেহ গঠন ও বিনাশ প্রক্রিয়া মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্তিম সীমায় পৌঁছে যায়। তাই বিভিন্ন জীবের বেঁচে থাকা বা আয়ু মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট কালের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। মানুষ যেমন ৮০-১২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্তু একটা কুকুরের শরীর, ৮-১০ বছর বা একটা পোকার শরীর আরো কম দিন বাঁচে। তো সীমা অতিক্রম করা কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। এই দিক থেকে দেখতে গেলে মানুষের আয়ুর একটা উর্দ্ধ সীমা আছে। এই জন্য বলা হয় মানুষের আয়ু পূর্ব নির্ধারিত।
এতো গেলো দেহের কথা, কিন্তু আমরা কেন জন্মাই, অর্থাৎ আমরা কেন দেহ ধারণ করি ?আমি তো দেহ নোই, আমি আত্মা, তো  আমার দেহ ধারনের দরকার কি ? আমরা দেহ ধারণ করি, বাসনা পূরণের জন্য, সংকল্প সাধনের জন্য । এই বাসনা বা সংকল্প  পূরণ হয়ে গেলে আমরা দেহ ছেড়ে দেই। আবার প্রাকৃতিক নিয়মে দেহ অকেজ হয়ে গেলে আমরা দেহত্যাগ করি। অতএব আমাদের দেহ ত্যাগের দুটো কারন (এক)  বাসনা বা সংকল্প  পূরণের অযোগ্য হয়ে যায় যখন আমাদের দেহ,  আর (দুই) বাসনার শেষ হয়ে গেলে।  আমাদের এই দেহ  ভোগায়তন দেহ। পরমাত্মার প্রতিফলন যে জীবাত্মা, সেই জীবাত্মার ভোগ সাধনের জন্য এই দেহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, আবার এই দেহ ভোগের অযোগ্য বা বাসনার পূরণের শেষে আমরা দেহ ত্যাগ করে থাকি। ফুলে ততক্ষনই মৌমাছি থাকে, যতক্ষন ফুলে মধু থাকে। ফুল প্রকৃতির নিয়মে শুকিয়ে যায়। মৌমাছি অন্য ফুলে মধু খেতে চলে যায়। 
শিশুমৃত্যু প্রসঙ্গে একটা প্রচলিত গল্প বলি। শ্রীবাস অঙ্গনে মহাপ্রভু দলবল নিয়ে নাম-সংকীর্তন করছেন।   কীর্তন চলাকালীন শ্রীবাস পন্ডিতের  এক শিশুপুত্র দেহরক্ষা করে। বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। শ্রীবাস পণ্ডিত বাড়ির সবাইকে কান্না করতে নিষেধ করলো, পাছে কান্নার শব্দে মহাপ্রভুর কীর্তনের ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু মহাপ্রভু তো সর্বজ্ঞাতা। তিনি বললেন, "দেখো, আজ যেন কীর্তনের আনন্দ তেমন জমে উঠতে পারছে না। কারন কি বলতো ? সবাই চুপ । প্রভু আবার বললেন, আমার হৃদয় আজ যেন বড় উদ্ভ্রান্ত। আমার মনে আনন্দের কোনো সাড়া জাগছে না। নিশ্চয় শ্রীবাসের বাড়িতে কোনো শোকের ছায়া পড়েছে। তখন কয়েকজন তাকে বললেন : হ্যাঁ প্রভু  শ্রীবাসের শিশুপুত্র আড়াই ঘন্টা আগে মারা গেছে  . পাচ্ছে আপনার কীর্তনের ব্যাঘাত হয়, তাই এই সংবাদ কাউকে বলা হয় নি। শ্রীবাসের এই অপূর্ব ভক্তি নিষ্ঠা দেখে, প্রভুর চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে বললেন : আমার জন্য,কীর্তনের জন্য,কেউ  পুত্রশোক ভুলে যায়, এমন ভক্ত আমি কোথায় পাবো ? তো তিনি সেখানে এক আশ্চর্য্য ঘটনা সংগঠিত করলেন।
মৃত শিশুটিকে শ্মশানে নিয়ে যাবার উদ্যোগ চলছে। সবাই শিশুটিকে ঘিরে রেখেছে। প্রভু তখন, মৃত শিশুটিকে ডেকে বললেন - বৎস, শ্রীবাসের গৃহ ছেড়ে কেন যাচ্ছো তা একবার বলতো ? তো প্রাণহীন দেহে তখন প্রাণের সঞ্চার হলো। ঠোঁট কেঁপে উঠলো - স্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো, প্রভু, এ দেহে বাস করে, শ্রীবাস পন্ডিতের ঘরে যে স্নেহ ও আদার আপ্যায়ন পাবার কথা নির্দিষ্ট ছিল তা পেয়েছি।  এবার বিধির নিবন্ধ অনুযায়ী নতুন আবাসে আমি চলে যাচ্ছি। প্রণাম। অপরাধ মার্জনা করবেন।  কথা কয়টি বলে শিশুটি আবার নিস্প্রান হয়ে গেলো। সবাই নির্বাক। আসলে জীবন-মৃত্যুর ভেদ রেখা তেমন কিছু নয়। সময় অথবা কাজ শেষ হয়ে গেলে, আবার নতুন আবাসে আমাদের যেতে হবে। জীবের এই পরিক্রমা  কাল থেকে  কালান্তর ধরে চলছে।
আসলে ভোগ আমার নয় ভোগ আমার উপাধির।আমি আত্মা। এই দেহ তো আমি নোই, এই দেহ আমার উপাধি মাত্র।  বিখ্যাত সেই উপমা আপনারা সবাই জানেন। একটা গাছে সুমিষ্ট ফল।  গাছের ডালে বসে আছে  দুটো পাখী।  তার একটিতে সুমিষ্ট ফল খায়, আর একটা দেখে। পরম আত্মার কোনো ভোগ নেই।  তিনি দ্রষ্টা। তার কোনো কর্ম নেই, তিনি অকর্তা। তিনি নিঃসঙ্গ তার কোনো সঙ্গী নেই। আর জীবাত্মা বাসনা ভোগের জন্য দেহ ধারণ করে, সঙ্কল্প পূরণের জন্য দেহ ধারণ করে। অফিসের বড়বাবু, অফিস থেকে ফ্লাট পেয়েছেন, গাড়ি পেয়েছেন। প্রচুর অর্থ মাইনে  পান। বড়বাবুর পদ চলে গেলে ফুটুস। বাড়ি, গাড়ি, মাইনে সব বন্ধ  হয়ে যায়। আর এই পদ পাবার জন্য আমাদের সারা জীবনের  প্রয়াস। বড়বাবু হবার জন্য আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করে ডিগ্রি নিচ্ছি। কিন্তু ষাট বছর বয়স হয়ে গেলে পদ ক্ষতম। তখন কেই বা চাপরাশী আর কেই বা বড়বাবু। চাকরির যেমন একটা নির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে, প্রকৃতির জগতেও পদ পাবার জন্য অর্থাৎ দেহ ধারণ করবার জন্য নিয়ম আছে। নিয়ম না মানলে, যেমন ষাট বছর না হতেও আপনার চাকরি যেতে পারে। ঠিক তেমনি দেহরক্ষার জন্য আমাদের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। দেহরক্ষার নিয়ম অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম যদি আমরা না মেনে চলি তবে আমাদের অকাল মৃত্যু হতে পারে। আবার অনেক সময়, নিজে ভুল না করলেও, যাকে  আমরা বলি কপাল দোষে আমাদের চাকরি চলে যেতে পারে। আসলে কিছু জিনিস আমার নিয়ন্ত্রণে, আবার কিছু জিনিস আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে আমার চাকরি চলে যেতে পারে।আবার কোম্পানির  নিয়মবহির্ভূত কর্মের জন্য আমার চাকরি যেতে পারে।ঠিক তেমনি, এই জীবদ্দশায়  আমার কর্ম, আমার পরিবারের কর্ম, আমার আত্মীয়স্বজনের কর্ম, আমার প্রতিবেশীর কর্ম, আমাদের জাতির কর্ম্ম, আমি যে দেশে বাস করি, সেই দেশনায়কদের কর্ম, এ সবই আমার ভবিষ্যৎকে  প্রভাবিত করবে। আমাকে সুখ দুঃখের ভাগিদার করবে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বা বিপর্যয়ও  আমাকে প্রভাবিত করবে। 
এই প্রোসঙ্গে গুরু নানকের একটা গল্প বলি। দিল্লিতে তখন লোদী বংশের রাজত্ত্ব চলছিল। মোগল সম্রাট বাবর সেইসময় তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ভারতের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মোগল সৈন্যরা তখন অকথ্য অত্যাচার করেছিল, সাধারণ মানুষের উপরে। এই সময় পরিব্রাজক গুরুনানক ও তার সঙ্গী মর্দানাকেও  জেলে যেতে হয়েছিল ।  আজকের গুজরানওয়ালা জেলার আমিনাবাদ, সেসময় সঈয়দপুর নামে পরিচিত  ছিল।  মোঘল সৈন্যদের হাতে পড়ে এই সঈদপুরবাসীদের বাড়িঘর অগ্নিদগ্দ্ধ হয়েছিল। অবাধে চলেছিল লুণ্ঠন। এখানেই গুরুনানক সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েছিলেন । সাধুর বেশ দেখে, সৈন্যরা তাদের প্রাণে মারে নি বটে, কিন্তু বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, গুরুনানকের অলৌকিক কার্যকলাপ দেখে, পরে  বাবর তাকে ছেড়ে দিয়েছিলো।
তো বন্দি অবস্থা কেটে গেলে, নানক আবার পরিব্রাজন শুরু করে দিলেন। সেদিনকার সঈয়দপুরের এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে মর্দানা গুরুনানককে প্রশ্ন করলেন, ঈশ্বরের রাজত্ত্বে এই মর্মান্তিক ঘটনা কেন ঘটে ? মুষ্টিমেয় পাঠান হয়তো অপরাধী থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার নিরপরাধ নিরীহ মানুষ কেন এই নির্মম দণ্ডের  সম্মুখীন হয় ? ঈশ্বরের এ কেমন ধারা বিচার।?
তো, সেদিন যে বাড়িতে মর্দানা ও গুরুনানক আশ্রয় নিয়ে ছিলেন, সেই বাড়ির সামনে ছিল একটা সুস্বাদু ফলের গাছ। নানক বললেন, তুমি এই গাছের নিচে আজ শুয়ে থাকো।  কাল এর উত্তর পেয়ে যাবে।
গুরুভক্ত মর্দানা সেই রাতে ওই গাছের নিচে একটা কম্বল পেতে শুয়ে পড়ে। এখন হয়েছে কি, ভোর রাতে দিকে পাখির ঠোঁটের আঘাতে পাকা ফল থেকে রস চুইয়ে চুইয়ে মর্দানার দেহের উপরে ঝরে পড়ে। এখন মিষ্টি রসের গন্ধে, পিঁপড়ে চলে আসে। দুচারটে পিঁপড়ে, মর্দানাকে কামড়ে দেয়।  আর মর্দানা ঘুমের ঘোরে, হাত চালিয়ে প্রায় সমস্ত পিঁপড়েকে মেরে  ফেলে।
সকালবেলা গুরুদেব বললেন, মর্দানা চেয়ে দেখো, কম্বলের উপরে তোমার কালকের প্রশ্নের জবাব। ঠিক এই ভাবেই, সঈয়দপুরের হাজার হাজার নিরীহ মানুষ সেদিন মারা গেছিলো। তোমাকে কামড়েছে  মাত্র দুচারটি পিঁপড়ে, কিন্তু দেখো তুমি কয়েক'শ পিঁপড়ে মেরে ফেলেছো। জন্ম-মৃত্যুর এই অমোঘ লীলা চলছে নিরন্তর। অখন্ড সত্ত্বায় সবকিছু বিধৃত।  কর্তা নিজেই যেখানে সর্বত্র ওতপ্রোত ভাবে বিরাজ করছে, সেখানে বিচার - অবিচারের প্রশ্ন ওঠে না। দন্ড আর পুরস্কার সেখানে এক হয়ে যায়।  জীবন একটা যাত্রা। মৃত্যু মানে জীবন পথে বাঁক নেওয়া। মৃত্যুর পর মৃত্যু অতিক্রম করে, জীব এগিয়ে চলেছে, অনন্তের  সাথে নিজেকে বিলিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে চলছে ।  মেঘ থেকে জল  পাহাড় বেয়ে, গ্রাম গঞ্জ পার হয়ে সমুদ্রে মিলবে।  এটাই পরিণতি। চলার পথে সুখ দুঃখের অনুভূতি মাত্র। অনন্তে শান্তি।
আমরা যাকে ভালো বা মন্দ বলি, সেটা আমাদের ভাবনাপ্রসূত। প্রকৃতির কাছে ভালো বা মন্দ বলে কিছু নেই। সে একটা শৃঙ্খলে আবদ্ধ।  তার বাইরে যাবার তার উপায় নেই। সূর্য্য ইচ্ছে করলে তাপ  প্রদান বন্ধ করতে পারে না। বায়ু রুদ্ধ হতে পারে না। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরন করলে শাস্তি পেতে হবে এটা  চিরসত্য।  এর অন্যথা হবার উপায় নেই। তাই আমাদের শরীর যা কিনা প্রকৃতির অঙ্গ  বিশেষ, তা প্রকৃতির নিয়মেই নিঃশেষিত হবে। আপনি তথাকথিত ভালো কাজ করলে আপনি বেশি দিন বাঁচতে পারবেন, আর খারাপ কাজ করলে, বা কিছুই না করলে আপনি তাড়াতাড়ি মারা যাবেন, এর কোনো মানে নেই। আপনি জ্ঞানী হলে আপনি বেশি দিন বাঁচতে পারবেন, আর অজ্ঞানীরা তাড়াতাড়ি মারা যাবেন, এমন অঙ্গীকার প্রকৃতি করে না।
তাই আমাদের আয়ু, দুটো কারণের উপরে নির্ভরশীল। এক আমি কি জন্য এই দেহ ধারণ করেছি। অর্থাৎ আমার বাসনা বা সংকল্প ।  আর যা দিয়ে দেহ ধারণ করেছি, অর্থাৎ প্রকৃতি, আর তার স্থিতিকাল বিষয়ে প্রকৃতির কি নিয়ম। আসলে এই মর্তলোক একদিকে যেমন কর্ম্মক্ষেত্ৰ, অর্থাৎ যার দ্বারা আমরা উন্নত স্তরে থাকতে পারি, ঠিক তেমনি এই মর্তলোক একটা মৃত্যুপুরি, যার দ্বারা আমরা অমৃতের পথে যাত্রা করতে পারি।    

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম  

Sunday, 18 August 2019

ব্রহ্ম-সূত্র

ব্রহ্ম-সূত্র

তৃতীয় অধ্যায় - প্রথম পাদ
বেদে আত্মাকে বলা হয়েছে ব্রহ্ম। আজ আমরা ব্রহ্মসূত্র ধরে ব্রহ্মের  খোঁজে বা আত্মার খোঁজে  বেরোবো। জীবাত্মা কোথা থেকে আসে আর কোথায়ই  বা যায় ? আমরা সেই খোঁজ করবো। আমরা বর্তমানে  অসংখ্য জীব-আত্মার সঙ্গে আছি। একটু দেখে নেই জীবের মৃত্যুর পরে তার আত্মা  কোথায় যাচ্ছে। এখানে একটা কথা বলি, ব্রহ্মা আর ব্রহ্ম কিন্তু এক নয়। ব্রহ্মা হচ্ছেন, এই সূর্যলোকের মালিক, আর ব্রহ্ম হচ্ছেন সমস্ত জগতের মালিক।
  
ব্রহ্মসূত্র বলছেন, মৃত্যুকালে জীবের দেহ থেকে যখন প্রাণবায়ু উৎক্রান্ত হয়, তখন জীবাত্মা এই স্থূল দেহের সূক্ষ্ম অনুর দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। জীৱাত্মা যখন শরীর ছেড়ে অনন্তের  যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে, তখন সে  এই স্থূল দেহের অনুরূপ সূক্ষ্ম দেহের দ্বারা আবৃত থাকে। এবং একটি নতুন দেহপ্রাপ্তির আশায় ঘুরতে থাকে। এই দেহান্তরের প্রক্রিয়ায় জীবাত্মা তার স্থূল দেহের সূক্ষ্ম অংশকে ভাবি দেহের বীজ রূপে গ্রহণ করে।

জীব আত্মা যখন স্থুল শরীর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে তখন তার সঙ্গে তার ইন্দ্রিয়গুলোও যাত্রা শুরু করে। জীবাত্মা যখন বেরিয়ে পড়ে, তখন প্রাণের উৎক্রমন ঘটে। আর প্রাণের যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রিয়গুলোও বেরিয়ে পড়ে। আর ইন্দ্রিয়গুলোর যখন  যাত্রা শুরু হয়, তখন আমাদের অবশ্য়ই ধরে নিতে হবে যে এই ইন্দ্রিয়গুলোরও  স্থূল আকার আছে। এইভাবেই জীবের  ভাবি বা ভবিষ্যৎ জন্মের একটা সূচনা বা ভিত্তি স্থাপন হয়। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বৃহদারণ্যক উপনিষদ বলছে  : মানুষের মৃত্যুতে বাক অগ্নিতে প্রবেশ করে, প্রাণ বায়ুতে প্রবেশ করে। মন চন্দ্রে, শ্রোত্র অর্থাৎ শ্রবণ শক্তি   দিকসমূহেপ্রবেশ করে, শরীর পৃথিবীতে, হৃদয় মহাকাশে, লোমসকল ঔষধিগাছে, কেশ বনস্পতিতে, শুক্র ও শোনিত জলের মধ্যে প্রবেশ করে।  তাই যদি হয়, তবে ইন্দ্রিয় সমূহ জীবাত্মার সঙ্গে গমন করে, সেটা কি বলা যায় ? 

আবার কারুর কারুর মতে, জীবাত্মা কখনোই তার পূর্ব দেহের সূক্ষ্ম অংশগুলোকে অর্থাৎ সূক্ষ্ম দেহকে  সঙ্গে নিয়ে যায় না। তার কারন হচ্ছে শরীর  ধারণের উপযুক্ত উপাদান সমূহ সর্বত্র সহজলভ্য। তাই জীবাত্মা কখনোই তার পূর্ব দেহের ভূতবর্গের সূক্ষ্ম-অংশকে সঙ্গে নিয়ে যায় না সঙ্গে নেবার দরকারও  পড়ে না।

এই ব্যাপারটা বুঝতে গেলে, এটা বুঝতে হবে পঞ্চভূতের আহুতি হয়ে গেলে আমাদের কি হয় সেটা সম্পর্কে সম্যক  ধারণা রাখতে হবে। পঞ্চ আহুতি অর্থাৎ শ্রদ্ধা অর্থাৎ তরল আহুতির সুক্ষরূপ হচ্ছে শ্রদ্ধা এছাড়া সোম, বৃষ্টি, অন্ন, বীজ এগুলো পঞ্চ অগ্নিতে অর্পণ করা হয়। এই পঞ্চ অগ্নি হচ্ছে, স্বর্গ, পৰ্জন্য অর্থাৎ বৃষ্টি, পৃথিবী, মনুষ্য ও মানবী ইত্যাদিতে অর্পণ করা হয়। এইজন্য পঞ্চ আহুতি জলকে বলা হয় মনুষ্য। জীবাত্মা জলের দ্বারা আবৃত্ত হয়ে উর্দ্ধলোকে গমন করে। যদিও শরীরের সমস্ত উপাদান সমূহ সহজলভ্য, কিন্তু বীজ সহজলভ্য নয়। এমনকি জীবের যেসব উপাধি অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদি আছে, সেগুলো যেহেতু সে সঙ্গে করে নিয়ে যায়।  তাই  এই ইন্দ্রিয়াদি ও  জীবের  পদার্থগত অস্তিত্ত্ব অবশ্য়ই আছে এটা ধরে নিতে হয়, তা না থাকলে ইন্দ্রিয়াদি  জীবের সঙ্গে যেতে পারে না। 

জলের তিনটি উপাদান, শ্রদ্ধা-সোম-বৃষ্টি।  জল এই তিনটি উপাদান সমন্বিত বলে, মানব শরীরে জলের আধিক্য দেখা যায়। আমরা জানি পঞ্চভূতের মধ্যে অপ একটি। অর্থাৎ জল একটি।  কিন্তু আসলে এই জলের  মধ্যে আছে জলের সূক্ষ্মরূপ অর্থাৎ শ্রদ্ধা, সোম ও বৃষ্টি। তরল আহুতির সূক্ষ্ম রূপকে বলে শ্রদ্ধা।

ব্রহ্মসূত্র বলছে, এই জলই , কালক্রমে মনুষ্যে রূপান্তরিত হয়।  জীব মৃত্যুকালে জলাদি সমন্বিত হয়ে উৎক্রমন করে,এবং তারপরে আবার মনুষ্যরূপে জন্ম গ্রহণ করে।

আমাদের সৎকর্মের ফলভোগ শেষ হয়ে গেলে আমরা আবার পৃথিবীতে নেবে আসি। আমরা যে পথে গিয়েছিলাম আবার সেই পথেয় নেবে আসি। এখন কথা হচ্ছে, আমরা যদি কর্মফল ভোগ করার পরে  , নেবে আসি আবার পৃথিবীতে, তবে যে বলা হয়ে থাকে যে আমরা প্রারব্ধ ফল ভোগ করার জন্য পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করি, সেটা কি তা হলে সত্য নয় ? আসলে দেবতা হয়ে মানুষ তার সৎকর্মের ফল ভোগ করে।  কিন্তু তার যে অসৎ কর্মফল সঞ্চিত হয়েছে, তার কি হবে ? শুভ কর্মফল ভোগের জন্য যেমন দেব-দেহের প্রয়োজন, তেমনি মন্দ কর্মের ফল ভোগের জন্য  পশু দেহ বা কর্ম অনুযায়ী ফলভোগের উপযুক্ত দেহের প্রয়োজন। তাই আমরা আবার দেহ ধরনের জন্য উদগ্রীব হই  কিন্তু জীবের যাতায়াতের রাস্তাটা কি ?

ব্রহ্মসূত্র বলছে, মানুষ যে পথে আসে সেই পথেই যায়। কোথা থেকে আসে আর কোথায়ই বা যায়। ব্রহ্মসূত্র বলছে, মানুষ তার সুকর্মের জন্য স্বর্গ বা চন্দ্রলোকের দিকে যাত্রা করে। আর সেই একই মানুষের, তার দুস্কর্মের জন্য তাকে যেতে হয় যমলোকে। আর সঞ্চিত কর্মফলের ভোগ-অবশিষ্ট অংশ ভোগই নব জন্মের কারন। কতকগুলো কর্ম আছে, যার ফল দেহ ভিন্ন ভোগ সম্ভব নয়। তা সে ইতর জীবদেহ হতে পারে, আবার উৎকৃষ্ট মনুষ্য দেহ হতে পারে।

এই চন্দ্রলোক ও  যমলোক কোথায়, এবং কাকে বলে, সে  সম্পর্কে আমরা একটু জেনে নেবো।   পড়াবিদ্যাবিদগণ বলছেন, এই পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টির পূর্বে চন্দ্রে জীবনের খেলা চলছিল। এই চন্দ্র তখন ছিল গ্রহ।  কালে কালে চন্দ্রে জীবনীশক্তির  বিস্তার ও রক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে। চন্দ্র নিজেও আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকে। একটা সময় চন্দ্র ধোঁয়াশায় পরিণত হবে। এবং অদৃশ্য হয়ে যাবে।

সুতরাং আমরা যে ক্রমবিকাশ শক্তির অন্তর্গত  তার মধ্যে স্থূল গ্রহ - মঙ্গল, পৃথিবী, বুধ। বাকি চারটি অদৃশ্য। আর আমরা ক্রমবিকাশ শক্তির চতুর্থ শৃঙ্খলের, চতুর্থ প্রদক্ষিণকালের চতুর্থ গ্রহ, এবং পঞ্চম মূল জাতির অন্তর্গত। পরাবিদগন বলছেন, পৃথিবীতে এখন পঞ্চম ও ষষ্ঠ শাখাজাতি বর্তমান আছে।      যতদিন যাবে, ততই পৃথিবীতে সর্ববিধ উন্নতির বিকাশ দেখা যাবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম মূল জাতির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে  বর্তমান জগতের শিক্ষিত ব্যক্তিগণ, ক্রমশ ধর্মবুদ্ধি লাভ ক'রে, সিদ্ধ শ্রেণীভুক্ত হবেন। এই সপ্তম মূল-জাতির অস্তিত্ব শেষ হতে কত লক্ষ বৎসর লাগবে, তা বলা যায় না। 

পৃথিবী শৃঙ্খল শেষ হলে, নতুন গ্রহকে অবলম্বন করে পঞ্চম শৃঙ্খলের কাজ আরম্ভ হবে। আর তখন asteroids নামক যে গ্রহপুঞ্জ দেখতে পাওয়া যায়, সেটা পিণ্ডীভূত হয়ে একটা বড়ো গ্রহ হবে। এবং ছয়টি অদৃশ্য গ্রহকে নিয়ে, পঞ্চম শৃঙ্খলের কাজ আরম্ভ হবে।

পৃথিবী তখন, জরাজীর্ন ও ক্ষুদ্রাকার হয়ে, নতুন গ্রহের উপগ্রহ রূপে গণ্য  হবে। 

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শৃঙ্খলের কাজ শেষ হয়ে গেছে। একমাত্র চাঁদ ছাড়া, আর কোনো গ্রহের চিন্হ নেই। চাঁদও  কালক্রমে জ্যোতির্ময় কুয়াশায় পরিণত হবে। চন্দ্রলোকে যারা জন্তু ছিলো, তারা এখন মানুষ হয়ে জন্মেছে, আর চাঁদে যারা উদ্ভিদ ছিল তারা এখন জন্তু হয়ে জন্মেছে। পৃথিবীর শৃঙ্খলকাজ শেষ হলে, এখানেও এই প্রকার ঘটবে। যে নতুন গ্রহে, পঞ্চম শৃঙ্খল-এর  কাজ আরম্ভ হবে সেখানেও এই প্রকার হবে। আমাদের উদ্ভিদ ওখানে জন্তু হবে, আমাদের জন্তু ওখানে মানুষ হবে, কিন্তু অপেক্ষা করতে হবে, যতদিন না মানুষ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হয়।  আর যে সব মানুষ পৃথিবীতে আত্মউন্নতি লাভ করতে পারবে না, তাদের তাদেরও  অপেক্ষা করতে হবে, যতদিন না ওখানে মানুষের আবির্ভাব হয়। এই অপেক্ষাকাল হবে, দীর্ঘ থেকে  দীর্ঘতর। এটাকে বিচারাধীন কাল (Aeoniam  Condemnation Period  ) বলা যেতে পারে। 

পরাবিদ্যা আর ব্রহ্মবিদ্যা মেলাতে গেলে একটা জিনিস মনে হয়, প্রাচীন মুনি ঋষিরা এই চন্দ্রলোক থেকে এসেছিলেন। তাই তারা মনে করতেন, পৃথিবীতে তাদের কাজ শেষ হয়ে গেলে, তারা আবার চন্দ্রে ফিরে যাবেন। কিন্তু যারা আত্মউন্নতি লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ অজ্ঞান তাদের স্থান হবে "অসূর্য্যা নাম তে লোকা"অর্থাৎ এক অন্ধকার আচ্ছন্ন জগতে। এইলোককে ব্রহ্ম বিদ্যাবিদগন বলছেন যমলোক। 


আমরা জানি উদ্ধারের দুটো রাস্তা একটা কর্ম আর একটা জ্ঞান। কর্মের মাধ্যমে মানুষ পিতৃযানের প্রাপ্তি ঘটে, আবার বিদ্যা বা জ্ঞান দ্বারা মানুষ দেবযানের প্রাপ্তি ঘটে। আর একটা আছে ভক্তি যোগ, এরা  কর্ম করে না আবার জ্ঞানের রাস্তাতেও যায় না  কেবল  জন্মায় আর মরে - "জায়স্ব-ম্রিয়স্ব" .। এরা  তৃতীয় লোকের বাসিন্দা।

পৃথিবীতে চার ধরনের প্রাণী দেখা যায়।  জরায়ুজ, অণ্ডজ, একটা স্বেদজ বা শ্যাওলা আর একটা হচ্ছে উদ্ভিদ ।  শ্যাওলা জল থেকে জাত। উদ্ভিদ  পৃথিবীতে থেকে জাত,  অর্থাৎ এই প্রকার প্রাণী স্ত্রী-পুরুষের মিলন ছাড়াই জন্ম নিয়ে থাকে।

জীব চন্দ্রলোক থেকে যাত্রা ক'রে, বিভিন্ন বাহনের মাধ্যমে, অর্থাৎ  প্রথমে আকাশ, তার পড়ে বায়ু, বায়ু থেকে ধুম, ধুম থেকে কুয়াশা, কুয়াশা থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি। তারপর ব্রীহি অর্থাৎ উৎকৃষ্ট ধান উৎপাদনের শক্তি, বা অন্ন -  ঔষধি গাছ, অর্থাৎ যে সব গাছ ফল উৎপাদনের পরেই মারা যায়।  তার পরে বনস্পতি ইত্যাদি রূপে জাত  হন। এবার যে কেউ এই ব্রিহী বা অন্ন যখন ভক্ষণ করে, তখন তার দেহে শুক্র উৎপন্ন হয়। এই শুক্র আবার যোনিপথে গর্ভে প্রবেশ করে। এবং গর্ভ থেকে একটা নতুন দেহের জন্ম হয়। যোনিকে আশ্রয় করে জীব স্বীয় ভোগায়তান দেহ লাভ করে। "যোনেঃ শরীরম।"

একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, মানুষ কিন্তু এই ব্রীহি বা উদ্ভিদ হয়ে যান না। এগুলো হচ্ছে তাদের বাহন। এই বাহন গুলোতে চেপে জীব পৃথিবীতে আসে। মানুষ যখন মারা যায়, তখন তাকে চিতার অগ্নিতে বা কবরে চড়িয়ে দেওয়া হয়। এবার এই দেহ থেকে উদ্ভূত জল ধোঁয়া হয়ে উপরে উঠে যায়। এবং চন্দ্রলোকে গিয়ে ভোগ শরীর  নির্মাণ করে। চন্দ্রলোকে হচ্ছে ভোগক্ষেত্র। চন্দ্রলোকে জীবগন দেবভোগ্য।  অর্থাৎ দেবগন এদেরকে পেয়ে, দর্শন করে তৃপ্তি অনুভব করেন।

মানুষ যখন উর্দ্ধলোকে যান, তখন জ্ঞানীগণ পূর্ণমাত্রায় সচেতন থাকেন, অর্থাৎ আমাদের যেমন ইন্দ্রিয় অনুভূতি আছে, তাঁরাও ইন্দ্রিয় অনুভূতি সম্পন্ন থাকেন।তাদের গতি সম্পর্কে তারা পূর্ণমাত্রায় সচেতন থাকেন।  কিন্তু যখন তারা ইহজগতে নেবে আসেন, তখন তারা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। পাহাড় থেকে মানুষ পড়ে গেলে মানুষ যেমন কিছুটা সময়ের জন্য  সংজ্ঞাহীন হয়ে যান, পরে আত্মীয়স্বজনরা তাকে সেবাসুশ্রতা দিয়ে, সুস্থ করে তুললে  তিনি আবার  জ্ঞান ফিরে পান। ঠিক তেমনি নেবে আসার যে যাত্রাপথ, জীবের এই অবস্থায়, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই তার থাকে না। এবং তার ভাবনা অনুযায়ী বা সংকল্প-বাসনা অনুযায়ী তার দেহধারন হয়। জ্ঞানী আত্মা স্বর্গলোককেই নিজেদের বাসভূমি মনে করেন, আর পৃথিবীতে তাদের  স্থিতিকালকে স্বপ্নাবস্থা মনে করেন।

এখন এই যে আমাদের যাত্রা এটি কে পরিচালনা করে ? উপনিষদ বলছেন এটি বৈশ্বানর।  এখন এই বৈশ্বানর কে ?  এই সম্পর্কে একটা গল্প শুনুন।

উপমন্যুর পুত্র প্রাচীনশাল, পুলস্ত পুত্র সত্যযজ্ঞ, ভাল্লবির পুত্র ইন্দ্রদ্যুম্ন, এবং শর্করাক্ষ পুত্র জন এছাড়া  অশ্বতরাশ্বের পুত্র বুড়িল এই কয়জন গৃহস্থ সন্যাসীর মনে প্রশ্ন জাগলো, আমাদের আত্মা কে ? ব্ৰহ্মই বা কি ? তো এই প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য উদ্দালক,  আরুণি মুনির কাছে গেলেন। তিনি এদের  কেকয়  পুত্র অশ্বপতির কাছে নিয়ে গেলেন।

অশ্বপতি বললেন : ১. যাকিছু সুন্দর, যাকিছু উজ্বল তাই বৈশ্বানর। কিন্তু এই দ্যুলোক আত্মার মস্তক মাত্র   ২. আদিত্য বা সূর্য ও তার তেজ, আলোক রশ্মি, ও তার বিচিত্রপূর্ন রঙ এটি আত্মার চোখ। এর নাম বিশ্বরূপ  ৩. এই যে বায়ু এর নাম পৃথকবর্ত্ম , ইনি হলেন আত্মার প্রাণ। ৪. এই যে আকাশ এটিকে বলা হয় বহুল বা বিস্তৃত , আত্মার মধ্যভাগ হলো আকাশ। ৫. জল হচ্ছে আত্মার মূত্রাশয়। ৬. পৃথিবীকে বলা হয় প্রতিষ্ঠা। যিনি হচ্ছেন আত্মার পা।

এখানে আত্মার বিভিন্ন অংশকে আলাদা ভাবে, বোঝানো হয়েছে।  অর্থাৎ বৈশ্বানর বা পরম-আত্মা হচ্ছেন, একটা বিরাট পুরুষ যার ব্যাপ্তি অসীম। আর তার অঙ্গগুলো  হচ্ছে দ্যুলোক, সূর্য, বায়ু, আকাশ, জল  ও পৃথিবী।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ :

আজ আমরা শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ থেকে ব্রহ্ম কথা শুনবো।একবার কিছু ব্রহ্ম জিজ্ঞাসু একত্রিত হয়ে পরস্পরকে প্রশ্ন করলেন - ব্রহ্মইকি এই জগতের কারন ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? আমাদের পালনপোষন কে করেন ? মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাবো ? আমরা কেন সুখ দুঃখ ভোগ করি ? আসলে এই প্রশ্নগুলো  আমাদের সকলের, এবং সর্বকালের । প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে জগতের কারন কি ?

কেউ বলছেন, কালই জগতের কারন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জগৎ আজ এই অবস্থায় এসেছে। আবার কালের প্রভাবে এই জগতের নিস্পত্তি হয়ে যাবে। কেউ বলছেন, জগতের সমস্ত বস্তুর একটা নিজস্ব স্বভাব আছে, বা ধর্ম আছে। এই স্বভাবই জগৎ সৃষ্টির কারন। আবার কেউ বলছেন ওসব কিছুই নয়, জগৎ সৃষ্টির কারন হচ্ছে নিয়তি, অর্থাৎ কার্য্য-কারন প্রক্রিয়ার সমষ্টি। আবার কেউ বলছেন, যদৃচ্ছা অর্থাৎ সৃষ্টি কোনো নিয়মে আবদ্ধ নয়, ঈশ্বরের ইচ্ছে হয়েছে তাই এই সৃষ্টি হয়েছে। এর কোনো কারন নেই।  ইচ্ছের আবার কোনো কারন হয় নাকি ? প্রাণ কেন সৃষ্টি হলো ? এর কোনো জবাব হয় নাকি ? কতকগুলো উপাদান অকারণেই একত্রিত হয়েছিল, তাই এমিবার সৃষ্টি হলো। কিন্তু কেন এগুলো অর্থাৎ এমিবার উপাদানগুলো একত্রিত হলো, তা কেউ জানে না। কেউ বললেন, ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, এই পঞ্চভূত মিলেমিশে এই জগতের উদ্ভব হয়েছে। কেউ বললেন, পরম-আত্মা আর জীবাত্মা মিলে এই জগতের সৃষ্টি করেছে। কেউ বললেন, তোমরা যা বললে সেগুলো সবই সত্যি। একটা সম্মিলিত ক্রিয়ার ফলেই এই জগতের উদ্ভব। অন্যজন বললেন, দেখো যা কিছু ঘটছে, তার একজন কর্তা  আছেন। তাহলে সেই কর্তাটি কে ? মানুষ বড় দুর্বল। মানুষ কখনো পঞ্চভূতকে একত্রিত করে জগৎ সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষ নিজেই তার সুখ-দুঃখ দূর করতে পারে না। মানুষ যদি জগৎ সৃষ্টি করতো, তবে সুখ বই দুঃখ থাকতো না। কারন মানুষ কখনোই দুঃখ চায় না। জগৎটা তো ভালো-মন্দের, সুখ দুঃখের আগর। মানুষ যদি এই জগৎ সৃষ্টি করতো তবে সেটা খুবই মনোরম হতে পারতো।  দেখছো না মানুষ দিনে দিনে সুখের সম্পদ বাড়িয়েই চলেছেন।  প্রকৃতিকে টেক্কা দিয়ে কেমন নকল আলো বানাচ্ছে, হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে, দিন দিন কম কষ্টে কি করে বেশি লাভ করা যায়, তার সফল প্রয়াস কেবলমাত্র মানুষই করতে পারে। তাই এই সৃষ্টি  যদি জীবাত্মা বা মানুষ করতো তবে না জানি কত সুন্দর হত আমাদের এই বাসভূমি।
এই আলোচনা যখন চলছে, তখন একজন বয়স্ক ঋষি  ভাবলেন, এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু গভীর ভাবে ভাবতে হবে। তো বললেন এস আমরা ধ্যান করি।
ঋষিরা গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। এবং আত্মশক্তি বলে তারা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে  দেখলেন  জ্যোতির্ময় পরমাত্মার শক্তিই এই জগতের কারন। আর এই পরমাত্মাকে আড়াল করে রেখেছে মায়া। মায়া তার তিন গুণের সাহায্যে পরমাত্মাকে আড়াল করে রেখেছে। জ্যোতির্ময় পরমাত্মার শক্তিই এই জগতের কারন। আগে ঋষিরা জগৎ সৃষ্টির কারন বলে যা ভেবেছিলেন, সেগুলো কোনোটাই ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ন। আর এই সৃষ্টির কারন বলে তারা যা ভেবেছিলেন, তাদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করছেন এই পরমাত্মা।
ব্যাপারটা যেন কেমন মনে হয়।  ধ্যানে বসলেন, আর সব কিছু পরিস্কার হয়ে গেল ? তাহলে এই প্রশ্ন (জগৎ কে সৃষ্টি করেছেন ?) হাজার বছর  ধরে কেন চলছে। আর যদি কেউ এটা  বুঝেই থাকেন, তো আমরা বুঝতে পারছিনা কেন ? অর্থাৎ ঋষিরা যদি এটা বুঝেই থাকেন, তবে আমরা বুঝতে পারছি না কেন ? আমাদের কাছে, এগুলো সব শোনা কথা, আমরা কেউ বিশ্বাস করি আর কেউ করি না। কেন ? আর যারা বিশ্বাস করেন , তারাও কি সত্যিই জানেন  যে এই বিশ্বের নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন, ব্রহ্ম।
থমাস নেওকমেন বা ধরুন অন্য কিছু নাম ভদ্রলোকের, চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। আর লক্ষ করছিলেন, কেটলির জল গরম হয়ে, কেটলির মুখটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিচ্ছে। তার মাথার মধ্যে চিন্তা উঠলো, কেন এমন হয় ? এই চিন্তা থেকেই একসময় আবিষ্কার হয় স্টিম ইঞ্জিনের। কিংবা ধরুন, গাছ থেকে আপেলটা পরে গেল, আর নিউটন ভাবতে লাগলেন, আপেলটা কেন গাছ থেকে নিচে পড়লো, উপরে গেল না কেন ? এর থেকেই আবিষ্কার হয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির। আমরা দেখি, শুনি, কিন্তু বুঝি না। আর যদি বুঝিও তা হলো - আপেলটা মাটিতেই পড়ে - এই জ্ঞান সঞ্চয় করি মাত্র আমরা। আগুনে জ্বাল দিলে জল গরম হয়, এটা আমাদের সঞ্চিত বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, তারা ভাবেন, কেন হয় ? এই কেন হয় যারা ভাবেন, তারা শুধু প্রতক্ষ্য জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তারা একটা অনুভবের জ্ঞান অর্জন করেন, এটাকে বলা হয় প্রজ্ঞা।  জ্ঞান হচ্ছে প্রতক্ষ্য বা শোনা, বা বই পড়ে জানা। আর প্রজ্ঞা হচ্ছে অন্তরের অনুভূতি। আর এই অন্তরের অনুভূতি সব সময় ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। যে কোনোদিন রসোগল্লা খায় নি, তাকে আপনি কি করে বোঝাবেন যে রসোগল্লা কেমন। আপনি বড়জোর বলতে পারেন, এটি মিষ্টি। কিন্তু মিষ্টি ও অনেক কিছুই হয়, রসোগোল্লা রসোগোল্লাই ।  তোমার তুলনা তুমি। ব্রহ্মও অনুভূতি লব্ধ জ্ঞান।  এটি প্রাজ্ঞ ব্যক্তির হয়ে থাকে। অন্যকে বোঝানো সম্ভব নয়। আর এই জ্ঞানকে বলে স্বজ্ঞা। মনের গভীরে যখন জ্ঞান আপনা-আপনি জেগে ওঠে তখন তাকে বলে স্বজ্ঞা। যেকোনো প্রশ্ন নিয়ে মনের গভীরে প্রবেশ করলে মনের মধ্যেই এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। আসলে আমাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই আমাদের মনের গভীরে গ্রোথিত হয়ে আছে। আমাদের কাজ হচ্ছে আমাদের অন্তর্চক্ষুকে সেই দিকে ফেরানো। ধ্যান হচ্ছে মনকে একমুখী করার প্রক্রিয়া। আর প্রজ্ঞা বা আমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর যখন আমাদের চেতন স্তরে ভেসে ওঠে, তখন তাকে বলে প্রজ্ঞা । তো ঋষিগণ এই ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করে, ব্রহ্মকে জানলেন। আর যেহেতু ব্রহ্ম ভাষার অতীত, তাই তারা একটা উপমার সাহায্যে আমাদের ব্রহ্মজ্ঞান দেন করলেন।
তো ঋষিগণ একটা উপমার সাহায্যে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।  বলছেন : ব্রহ্ম যেন  একটা বিশাল চক্র। যার নাম ব্রহ্মচক্র।  এই ব্রহ্মচক্র, মহাবিশ্বকে ধারণ করে রয়েছেন। কি দেবতা, কি মানুষ, কি জীব-জন্তু, উদ্ভিদ, কীটাণুকীট,এমনকি গ্রহ, উপগ্রহ, তারকমণ্ডলী, সবকিছুই এই চক্রের অন্তর্গত। অর্থাৎ ব্রহ্ম এই মহাবিশ্বের রূপ দিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেমন করে এই রূপটা দিলেন। সৃষ্টি হচ্ছে ব্রহ্মর মায়াগুনের ক্রিয়া। ব্রহ্ম তার মায়া গুনের সাহায্যেই এই সৃষ্টি করেছেন।  এই মায়া গুন হচ্ছে ব্রহ্মচক্রের পরিধি মাত্র। ব্রহ্ম হচ্ছে বিশ্বের অতীত। আর বিশ্ব হচ্ছে ব্রহ্মসমুদ্রের  মধ্যে বুদ্বুদ  মাত্র। ব্রহ্ম দ্বারা, ব্রহ্মের ভিতরে সৃষ্ট  অর্থাৎ ব্রহ্মর একটা ফোটা এই বিশ্বের মধ্যেও আছেন। অর্থাৎ তিনি বিশ্বের মধ্যেও আছেন, আবার বিশ্বের বাইরেও আছেন। ব্রহ্মকে দেখা যায় না। কারন তিনি তিনটি গুনের দ্বারা আবৃত। এগুলো হচ্ছে সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমঃ। এই তিনটি গুনের দ্বারা আবৃত আছেন বলে কেউ তাকে দেখতে পান না।
এই ব্রহ্ম চক্রের ষোলোটি কলা অর্থাৎ পঞ্চ ভূত, পঞ্চ কর্ম-ইন্দ্রিয়, পাঁচটা জ্ঞান ইন্দ্রিয় এবং মন।
পঞ্চভূত : আকাশ, বাতাস, আগুন, জল ও মাটি।
কৰ্মইন্দ্রিয় পাঁচটি : মুখ, হাত, পা, মলদ্বার, ও জনন-ইন্দ্রিয়।
জ্ঞান ইন্দ্রিয় : চোখ, কান, নাক, জিহ্ববা, ত্বক।
এর উপরে আছে আমাদের মন। এই মোট ষোলোটি অঙ্গ বা অংশ মিলিয়ে আমাদের বিশ্ব ।
 এখন আমরা জানি, প্রত্যেকটি চাকায় কতকগুলো স্পোক বা শলাকা থাকে।  ঋষিরা বলছেন, ব্রহ্মচক্র-তেও এইরকম পঞ্চাশটি শলাকা আছে। এই শলাকাগুলো আর কিছু নয় আমাদের মনের অবস্থা বিশেষ।
এগুলো হচ্ছে :প্রথম হচ্ছে ভ্রম : ভ্রম পাঁচরকম  - আত্মপ্রীতি, আসক্তি, ঘৃণা, জীবনতৃষ্ণা এবং বিপর্যয়জ্ঞান।
দ্বিতীয়ত ত্রূটি বা আমাদের দুর্বলতা : এগুলো আছে ২৮টি। মিথ্যা তুষ্টি।
তৃতীয়ত : আমাদের অষ্টসিদ্ধি অর্থাৎ প্রথমতঃ অনিমা (ইচ্ছেমত ছোট হয়ে যাওয়া),
দ্বিতীয়তঃ : লঘিমা (ইচ্ছেমত বড়ো বা হালকা হয়ে যাওয়া), তৃতীয়তঃ  প্রাপ্তি (যেখানে খুশি যেতে পারেন), চতুর্থতঃ  প্রাকাম্যম (যা চাইবেন তাই পেতে পারেন), পঞ্চমতঃ মহিমা (পাহাড়ের মতো বিশাল হয়ে যেতে পারেন), ষষ্ঠত ঈশিত্বম (অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি), সপ্তমতঃ  বশিত্বম (সবাইকে বশ  করার ক্ষমতা) , এবং অষ্টমতঃ বা সবশেষে কাম-অবসাইত ( সব কামনা অপসারণ হয়ে গেল) ।
চতুর্থত : নয়রকম আছে তুষ্টি। এগুলো নিয়ে আমরা ভবিষ্যতে আলোচনা শুনবো।
তো আমরা জানলাম  মোট ৫০টি স্পোক বা শলাকা  আছে এই ব্রহ্মচক্রে।

এরপরে আছে আরো কতকগুলো আছে উপশালাকা এদের সংখ্যা হচ্ছে কুড়িটি
এরমধ্যে দশটা ইন্দ্রিয়।   অষ্টৈক ষড়ভিঃ, অর্থাৎ মানবদেহে আটটি ধাতু। সেগুলো হচ্ছে -ত্বক, চর্ম, মাংস, রুধির, মেদ, অস্থি, মজ্জা, ও শুক্র।
ঋষিগণ বলছেন, এই জগৎ বাসনার বন্ধনে আবদ্ধ। এই বাসনাই আমাদের জগৎ অনুভূতি দিচ্ছে। জড় বস্তুর প্রতি আমরা আসক্ত। বিভিন্ন সম্পর্কের প্রতি, অর্থাৎ দারা-পুত্র-পরিবার এর প্রতি  আমরা মোহগ্রস্থ।   ইন্দ্রিয়সুখের প্রতি আমরা  আসক্ত। আমাদের এই আসক্তি, মোহ, বাসনা যদি না থাকতো  তবে আমরা মুক্ত পুরুষ হয়ে যেতে পারতাম। জগতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিকোণ পালটে যেতো। জগৎ বলে আর আমাদের কাছে কিছুই  থাকতো না।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম

সুষুপ্তি : 

আমরা জানি আমাদের মনের তিনটি/চারটি স্তর আছে। প্রথম হচ্ছে চেতন অবস্থা।  দ্বিতীয়টি হচ্ছে স্বপ্নাবস্থা। তৃতীয়টি হচ্ছে সুসুপ্তির স্তর। চতুর্থটি হচ্ছে তুরীয় অবস্থা। আজ আমরা এই  সুসুপ্তির অবস্থা সম্পর্কে জানবো।

আমরা যখন জেগে থাকি, তখন আমরা মনের চেতন অবস্থায় থাকি। আমরা যখন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি, তখন আমরা স্বপ্নাবস্থায় থাকি।  এই স্বপ্নঅবস্থার পরে ঘুমের মধ্যে  আমাদের যে অবস্থা হয় তাকে বলে সুষুপ্তি। শ্রূতি বা উপনিষদ  বলছে, জীব যখন নিদ্রায় মগ্ন হয়, এবং কিছুই জানে না, তখন সে নাড়ীসমূহ অবলম্বনে হৃদয় আকাশে প্রবেশ করে। আমরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকি তখন আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় শান্ত হয়ে যায়। কোনো ইন্দ্রিয় অনুভূতি তখন আমাদের থাকে না। এই সময় সে চিন্তা রোহিত হয়ে যায়। না থাকে কোনো সংকল্প, না থাকে কোনো দুশ্চিন্তা, না থাকে কোনো দুর্ভাবনা। না থাকে ভালো লাগার অনুভূতি, না থাকে খারাপ লাগার অনুভূতি। এই সময় আমাদের ইন্দ্রিয়শক্তি আমাদের নাড়ীর মধ্যে অবস্থান করে। এই সময় আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো নিজের মধ্যে মিশে যায়। বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। আমাদের নাড়ীগুলো তখন সূর্য্য রশ্মির তেজে পূর্ন  হয়ে যায়। ইন্দ্রিয়গুলো কৰ্মরহিত হয়ে যায়। এই সময় আমাদের ভালো মন্দ জ্ঞান থাকে না। আর এই সময়টাতেই আমরা শুদ্ধ, মুক্ত, বন্ধনহীন অবস্থায়, আমরা আমাদের প্রকৃত স্বরূপে অবস্থান করি।

মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ বা জীব যখন পরলোকে যাত্রার প্রস্তূতি নিচ্ছেন, এই সময় যদি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা তাকে ঘিরে থাকে, তবে একটা প্রচলিত প্রশ্ন আমরা করে থাকি।  আমাকে কি চিনতে পারছেন ? এই সময় তার একটা আচ্ছন্ন ভাব বা ঘোরের মধ্যে তিনি থাকেন। প্রাণ বায়ু যতক্ষন আসা যাওয়া করে, ততক্ষন তিনি  চিনতে পারেন। কিন্তু প্রাণবায়ু চলে গেলে তিনি আর দেখতে পান না, চিনতেও পারেন  না। কথাও বলতে পারেন না। মৃত্যুর ঠিক আগে আমরা এই সুসুপ্তির অবস্থায় বা আচ্ছন্ন অবস্থায়  কিছুক্ষন অবস্থান করি। তার পরেই আমরা মনোময় দেহে স্থানান্তরিত হই।

মানুষ যখন স্বপ্নাবস্থায় থাকে তখন আমাদের আত্মা স্বপ্নবৃত্তি অবলম্বনে ইন্দ্রিয়গনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের শরীরে যেমন ইচ্ছে ভ্রমন করেন।  কখনো রাজা, কখনো ফকির, কখনো জলে কখনো আকাশে বিচরণ করেন। আবার তিনি যখন সুসুপ্তিতে থাকেন, তখন তিনি কিছুই জানেন না, কিছুই করেন না । আমাদের শরীরে যে বাহাত্তর হাজার নাড়ী আছে, সেই নাড়ীগুলোকে অবলম্বন করে এই শরীরেই অবস্থান করেন। অর্থাৎ সুসুপ্তির সময় আত্মা শরীর ছেড়ে কোথাও যান না। কিন্তু শরীরে ইন্দ্রিয়গুলোর সঙ্গে তিনি থাকেন না। সূর্য্য যেমন একস্থানে থেকে সমস্ত জগৎকে আলোকিত করেন, তেমনি এই  আত্মা আমাদের হৃদয়ে থেকে সর্ব শরীরে চৈতন্য ব্যাপ্ত করে রাখেন।  জাগ্রত অবস্থায় আমরা বুদ্ধির অনুসরণ করি, স্বপ্ন-অবস্থায় আমরা বুদ্ধি সংকুচিত হন।  আর সুসুপ্তির অবস্থায় বুদ্ধির লোপ পায়। এইখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, আত্মার গমন নির্গমন বলে কিছু হয় না। কারন আত্মা সর্বত্র।

আসলে সুষুপ্তি কালে জীবাত্মা পরম-আত্মাতে উপাধিগুলোকে নিয়ে অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়াদি সহ  অবস্থান করে  থাকে। কিন্তু জীবাত্মা যেহেতু মায়াদ্বারা আছন্ন হয়ে থাকে, তাই সুষুপ্তি কালে জীবাত্মার এই একত্ত্ব অনুভব করে পারে না। এই সুষুপ্ত জীব আবার জাগ্রত অবস্থায় আসে।

আমরা যখন সঙ্গাহীন হয়ে যাই, অর্থাৎ সাময়িক মূর্ছা যাই, তখন আমাদের আংশিক সুসুপ্তির উপলব্ধি করতে পারি। অর্থাৎ মূর্ছা-কালীন অবস্থার স্মৃতি আমাদের থাকে না।  তেমনি সুসুপ্তির সময় আমরা কি অবস্থায় ছিলাম সেই স্মৃতিও আমাদের থাকে না।

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ হরি ওম।

বিজয়বাবুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানটি যিনি বা যারা রেকর্ড করেছিলেন, তারা আমাকে প্রচারের স্বার্থে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন আমাদের চ্যানেলটি অর্থ উপার্জনের যোগ্য হয়েছে, তখন অন্য কারুর রেকর্ড করা জিনিস থেকে অর্থ উপার্জন অনৈতিক বলে এটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার অসুবিধার জন্য দুঃখিত। আপনার ফোন / জিমেল ঠিকানা দেবেন, যাদের ভিডিও তাদের বলে দেব। নমস্কার।